Image default
নগর পরিচিতি

পার্থ: সোনালী সৈকতের রঙিন শহর

পার্থকে “সিটি অব লাইটস” বলা হয়। কারণ, এটি ছিল বিশ্বের প্রথম শহরগুলোর মধ্যে একটি, যেখানে বৈদ্যুতিক বাতির আলো ব্যবহার শুরু হয়েছিল।

পার্থ, অস্ট্রেলিয়ার পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত একটিআধুনিক এবং সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধ শহর। এটি পশ্চিম অস্ট্রেলিয়া রাজ্যের রাজধানী। শহরটি তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, উন্নত অবকাঠামো এবং উচ্চমানের জীবনযাত্রার মান এর জন্য বিশ্বের সবচেয়ে বাসযোগ্য শহরগুলির মধ্যে একটি হিসেবে খ্যাতি লাভ করেছে। নির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে, পার্থ তার শহুরে জীবন, সোনালি সৈকত, সবুজ পার্ক, এবং অতুলনীয় সৌন্দর্য দিয়ে হাজার হাজার পর্যটক এবং স্থানীয়দের আকর্ষণ করে। 

দেশ পশ্চিম অস্ট্রেলিয়া
অঞ্চল/রাজ্য পার্থ
আয়তন ৬,৪১৮ বর্গ কিলোমিটার (২, ৪৭৮ বর্গ মাইল) 
জনসংখ্যা  ২,৩০৯,৩৩৮ জন
সরকারি ভাষা ইংরেজি 
প্রধান মুদ্রা অস্ট্রেলিয়ান ডলার 
সময় অঞ্চল ইউটিসি +৮
আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পার্থ বিমানবন্দর 

পার্থের আবহাওয়া ও জনসংখ্যা 

পশ্চিম অস্ট্রেলিয়া রাজ্যের রাজধানী হচ্ছে পার্থ। সোয়ান নদীর তীরে এ নগরটি গড়ে উঠেছে। প্রায় ২৩ লক্ষ ৯ হাজার ৩৩৮ জন অধিবাসী এ নগরে বসবাস করেন। সিডনি, মেলবোর্ন ও ব্রিসবেনের পর এটি অস্ট্রেলিয়ার চতুর্থ বৃহত্তম নগর। প্রতি বছর এই শহরের জনসংখ্যা প্রায় ৩.৬% হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এটি দ্রুততম বর্ধনশীল রাজধানী শহরগুলোর মধ্যে একটি।

পার্থের আবহাওয়া বৈচিত্র্যে পরিপূর্ণ। ডিসেম্বর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত এখানে গ্রীষ্মকাল থাকে। তখন সূর্য তার তীব্র তাপ ছড়িয়ে দেয় শহরের উপরে। ফেব্রুয়ারিতে পার্থের তাপমাত্রা প্রায় সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছে। সেই সময় রোদে স্থির থাকা একপ্রকার অসম্ভব হয়ে পড়ে। তবে, বিকেলের দিকে “ফ্রেমম্যান্টল ডক্টর” গরম থেকে মুক্তি এনে শহরবাসীকে প্রশান্তি দেয়। ফ্রেম্যান্টল ডক্টর হলো একধরনের সমুদ্রের হাওয়া। মে মাস থেকে সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে এখানে শীতকাল বিরাজ করে। এ সময় পার্থের পাহাড়ি অঞ্চলে মাঝে মাঝে হালকা তুষারপাত হয়।

ম্যাপ

পার্থের ইতিহাস 

ইউরোপীয় অন্বেষণ ও প্রথম বসতি

১৬৯৭ সালে ডাচ অভিযাত্রী ‘উইলেম ডি ভ্লামিংহ’ সোয়ান নদী আবিষ্কার করেন। এবং এটিকে “সোয়ার্ট সোয়াইন-রিভিয়ার” নাম দেন। 

ব্রিটিশ উপনিবেশবাদী স্যার জেমস ডান্স এর স্ত্রী হেলেন ডান্স, ১৮২৯ সালের ১২ আগস্ট, একটি গাছ কাটার মাধ্যমে পার্থ শহরের প্রতিষ্ঠার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন। এই ঘটনা ঐতিহাসিক ঘটনাকে সোয়ান রিভার কলোনি স্থাপনের সূচনা হিসাবে গণ্য করা হয়। 

নুনগারদের সঙ্গে দ্বন্দ্ব

নুনগার জনগণ পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার একটি আদিবাসী গোষ্ঠী। যারা মূলত পার্থ এবং তার আশেপাশের অঞ্চলে বাস করতেন। তারা শিকার ও সংগ্রহের মাধ্যমে জীবনযাপন করতেন এবং প্রকৃতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তাদের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল । নুনগাররা তাদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, ভাষা এবং আধ্যাত্মিক বিশ্বাসের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী সমাজ গড়ে তুলেছিল।

ব্রিটিশ বসতি স্থাপনের পর, নুনগার জনগণের জীবনযাত্রা গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাদের ঐতিহ্যবাহী ভূমি দখল এবং শিকারী-সংগ্রাহক জীবনধারার ব্যাহত হওয়া নিয়ে তাদের মধ্যে গভীর ক্ষোভ এবং উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। এতে সংঘর্ষের ঘটনা বেড়ে যায়। 

এই দ্বন্দ্বের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল ১৮৩৪ সালের পিঞ্জরা গণহত্যা। এই গণহত্যায় নুনগার জনগণের অনেক সদস্যকে হত্যা করা হয়, যা তাদের সমাজকে ভেঙে ফেলে এবং ব্রিটিশ উপনিবেশের বিরুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধ হিসেবে চিহ্নিত হয়।

সোনার খনি এবং দণ্ডপ্রাপ্তদের যুগ

১৮৫০ সালে, ব্রিটিশরা অপরাধীদের পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ায় পাঠানো শুরু করে। এটি ছিলো মূলত উপনিবেশের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে ছিল। পার্থে এসে তারা খনিজ সম্পদ উত্তোলন, খামারি কাজ বা অন্যান্য বাধ্যতামূলক কাজ করত।

একই সময়ে, কালগুর্লি এবং কুলগার্ডি অঞ্চলে সোনার সন্ধান পাওয়া যায়। আবিষ্কার ক্রমে পার্থের অর্থনীতিকে চাঙা করে তোলে। সোনার খনি আবিষ্কারের ফলে পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ায় ব্যাপক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটে। হাজার হাজার খনির শ্রমিক এবং ব্যবসায়ী পার্থে চলে আসে এবং সোনার উত্তোলন শিল্প দ্রুত প্রসারিত হয়। এর ফলে পার্থের জনসংখ্যা এবং অবকাঠামো দ্রুত বৃদ্ধি পায়। 

২০শ শতাব্দী ও অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেশন

১৯০১ সালে, পশ্চিম অস্ট্রেলিয়া, অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেশনে যোগ দেয়। তখন থেকে পশ্চিম অস্ট্রেলিয়া, অস্ট্রেলিয়ার আনুষ্ঠানিক অংশ হয়ে ওঠে। ফেডারেশন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর, অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন উপনিবেশ একত্রিত হয়ে একটি একক জাতীয় সরকার প্রতিষ্ঠা করে।

সাম্প্রতিক ইতিহাস

২০২১ সালে, ফেডারেল আদালত পার্থ অঞ্চলে “নেটিভ টাইটেল” চূড়ান্তভাবে স্বীকৃতি দেয়। যার মাধ্যমে নুনগার জনগণকে আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের ঐতিহ্যবাহী ভূমির মালিকানা দেওয়া হয়। এই ঐতিহাসিক রায়টি আদিবাসী জনগণের দীর্ঘ সংগ্রামের ফসল। 

পার্থ শহরের বিখ্যাত পর্যটন স্থান 

পার্থ শহরটি তার ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত। এখানে রয়েছে অসংখ্য জাদুঘর, ঐতিহাসিক স্থান, শিল্পকর্ম এবং পার্ক। এসব স্থান পর্যটকদের জন্য এক অনবদ্য অভিজ্ঞতা । 

সাইটেক ডিসকভারি সেন্টার

পশ্চিম পার্থে অবস্থিত সাইটেক ডিসকভারি সেন্টার হলো একটি “ইন্টারেক্টিভ বিজ্ঞান জাদুঘর”। জাদুঘরটিতে রয়েছে শিশু ও বড়দের জন্য সৃজনশীল এবং শিক্ষামূলক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক প্রদর্শনীর ব্যবস্থা। 

এখানে আরও রয়েছে “হরাইজন প্ল্যানেটোরিয়াম”; যেখানে মহাকাশ এবং মহাকাশীয় রহস্যগুলো সম্পর্কে অডিও ভিজ্যুয়ল প্রদর্শনী। এছাড়াও শিশুদের জন্য রয়েছে বিজ্ঞান কুইজ, রোবটিক্স প্রদর্শনী, এবং ফিজিক্সের নানা মজার কার্যক্রম। 

সাইটেক ডিসকভারি সেন্টার

ফ্রেম্যান্টল ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ান মেরিটাইম মিউজিয়াম

সমুদ্র ইতিহাসের এক অসাধারণ সংগ্রহশালা হল ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ান মেরিটাইম মিউজিয়াম। এই জাদুঘরটি পার্থের উপকূলবর্তী শহর ফ্রেম্যান্টলে অবস্থিত। এ সংগ্রহশালায় অস্ট্রেলিয়ার সমুদ্র যাত্রা এবং সামুদ্রিক আবিষ্কারের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। 

এখানে একদিকে যেমন  রয়েছে ১৯৮৩ সালের আমেরিকা কাপ জয়ী ‘ইয়ট অস্ট্রেলিয়া II’। তেমনি এখানে ইতিহাসের অংশ হিসেবে রয়েছে “রয়্যাল অস্ট্রেলিয়ান নেভি সাবমেরিন”। সুযোগ রয়েছে সাবমেরিনের ভেতরের অংশ দেখারও। 

ফ্রেম্যান্টল ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ান মেরিটাইম মিউজিয়াম

ফ্রেম্যান্টল আর্মি মিউজিয়াম

ফ্রেমম্যান্টল আর্মি মিউজিয়াম একটি ঐতিহাসিক স্মৃতিস্তম্ভ। এটি পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার সামরিক ইতিহাসের একটি অমূল্য সম্পদ। এটি ফ্রেম্যান্টলে অবস্থিত একটি পুরনো আর্টিলারি ব্যারাক ভবনে অবস্থিত। ভবনটি একসময় সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হত। 

এই মিউজিয়ামের সবচেয়ে বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল ভিক্টোরিয়া ক্রস, যা বিশ্বের অন্যতম সম্মানজনক সামরিক পুরস্কার। এখানে প্রদর্শিত তিনটি ভিক্টোরিয়া ক্রস সাহসী সৈন্যদের শৌর্য ও ত্যাগের প্রতীক। এছাড়া, মিউজিয়ামে বিভিন্ন সামরিক ইতিহাস সম্পর্কিত ছবি, ডকুমেন্ট এবং মডেল রয়েছে। এসব মডেল এবং ডকুমেন্ট বিশ্বযুদ্ধ, কোরীয় যুদ্ধ, এবং ভিয়েতনাম যুদ্ধ সম্পর্কিত কাহিনী তুলে ধরে। 

ইয়াগান স্কয়ার

ইয়াগান স্কয়ার পার্থ শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত একটি আধুনিক সাংস্কৃতিক স্থান। এ স্থানটি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক, শিল্পকর্ম এবং পাবলিক ইভেন্টের জন্য অত্যন্ত জনপ্রিয় গন্তব্য। এখানে দুটি উল্লেখযোগ্য আকর্ষণ রয়েছে:

ইয়াগান স্কয়ার

৪৫ মিটার উঁচু ডিজিটাল টাওয়ার 

এই ডিজিটাল টাওয়ারকে মনে হয় যেন পার্থ শহরের আকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। টাওয়ারটি প্রতিদিন নতুন নতুন সৃজনশীল ডিজাইন, ভিডিও এবং বিজ্ঞাপন প্রদর্শন করে। এটি শহরের আধুনিকতার এবং প্রযুক্তির প্রতীক। 

৯ মিটার উঁচু “উইরিন” মূর্তি 

উইরিন মূর্তিটি তৈরি করেন নুনগার শিল্পী টিজিলিউঙ্গু। এটি তাদের দেশীয় জনগণের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যর প্রতীক। “উইরিন” মূর্তিটি নুনগার জনগণের ঐতিহ্য এবং আধ্যাত্মিক মূল্যবোধকে উপস্থাপন করে। 

পার্থের সমুদ্র সৈকত

পার্থ শহরের সমুদ্র সৈকতগুলি তার স্বচ্ছ জল, সোনালি বালু এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত। 

কটেসলো বিচ

পার্থের সবচেয়ে পরিচিত এবং জনপ্রিয় সৈকতগুলোর মধ্যে একটি হলো কটেসলো বিচ। এটি শহরের পশ্চিমে অবস্থিত। সাঁতার, সানবাথিং বা সূর্যস্নান করার জন্য একটি আদর্শ স্থান। সৈকতের সোনালি বালু এবং শান্ত জল পার্থবাসী ও পর্যটকদের কাছে খুবই প্রিয়।

এছাড়া, কটেসলো বিচে প্রতি বছর বৃহৎ আকারে সূর্যাস্ত উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। বিশেষ করে এটি দর্শনার্থীদের জন্য একটি অসাধারণ অভিজ্ঞতা। 

কটেসলো বিচ

সানসেট কোস্ট

পার্থের উত্তরে অবস্থিত একটি দৃষ্টিনন্দন এলাকা সানসেট কোস্ট। যা তার অসংখ্য সুন্দর সৈকত এবং মারমিওন মেরিন পার্ক এর জন্য পরিচিত। এই অঞ্চলের সৈকতগুলো সমুদ্রপ্রেমীদের জন্য এক আদর্শ স্থান। এখানে ডাইভিং, স্নর্কেলিং এবং অন্যান্য সামুদ্রিক কার্যকলাপের মাধ্যমে ভ্রমণকারীরা প্রকৃতির দৃষ্টিনন্দন সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেন।

সানসেট কোস্ট

এখানে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় মাছ, অস্ট্রেলিয়ান সামুদ্রিক সিংহ, এবং বটলনোজ ডলফিন সহ একাধিক সামুদ্রিক প্রাণী দেখা যায়। এই এলাকা মেরিন জীববৈচিত্র্য এবং জীবন্ত প্রবাল প্রাচীরের জন্য একটি জনপ্রিয় গন্তব্য।

সানসেট কোস্টের সৈকতগুলো থেকে সূর্যাস্তের দৃশ্য সত্যিই অবিশ্বাস্য সুন্দর। এটি পর্যটকদের জন্য পার্থের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। সূর্য যখন সমুদ্রের মাঝে ডুবে যায়, তখন আকাশ এবং সমুদ্রের রঙ পরিবর্তিত হয়ে এক অপরূপ দৃশ্য তৈরি করে।

পার্থের বিখ্যাত পার্ক

পার্থ শহরে রয়েছে অনেক আকর্ষণীয় পার্ক, যা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর।

কিংস পার্ক 

কিংস পার্ক

কিংস পার্ক, পার্থ সিবিডি এবং পশ্চিম অস্ট্রেলিয়া বিশ্ববিদ্যালয় এর মধ্যে অবস্থিত বিশ্বের বৃহত্তম অভ্যন্তরীণ সিটি পার্ক। এটি ৪০০.৬ হেক্টর এলাকায় বিস্তৃত, যা পার্থ শহরের স্থানীয়দের জন্য একটি জনপ্রিয় অবকাশকেন্দ্র।

কিংস পার্কের মধ্যে রয়েছে একাধিক উল্লেখযোগ্য আকর্ষণ, যেমন-

ডিএনএ টাওয়ার 

এই টাওয়ারটি পার্কের একটি বিশিষ্ট চিহ্ন। এর শীর্ষে উঠলে দর্শনার্থীরা পার্থ শহরের বিস্তীর্ণ দৃশ্য উপভোগ করতে পারবেন।

জ্যাকবস ল্যাডার 

এটি একটি ঐতিহাসিক সিঁড়ি। এই সিঁড়িটি পার্কের ভেতর দিয়ে উঠে গেছে এবং পার্থ শহরের কেন্দ্রের দিকে চলে গিয়েছে। সিঁড়ির মাধ্যমে শহরের সুন্দর দৃশ্যের পাশাপাশি পার্কের সবুজ প্রকৃতির সৌন্দর্যও উপভোগ করা যায়।

ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ান বোটানিক গার্ডেন 

এটি পার্কের একটি অন্যতম আকর্ষণ। এখানে পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার স্থানীয় উদ্ভিদ ও গাছপালা সংরক্ষণ করা হয়েছে। এখানে প্রায় ৩,০০০ প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে। বোটানিক্যাল গার্ডেন প্রেমীদের জন্য এটি একটি আদর্শ স্থান।

হাইড পার্ক 

হাইড পার্ক ১৮৯৭ সালে পাবলিক পার্ক হিসেবে গেজেট করা হয়েছিল। এটি পার্থ সিবিডি থেকে মাত্র ২ কিমি উত্তরে অবস্থিত। পার্কটি মূলত একটি লেকের অংশ ছিল। বর্তমানে এখানে সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশ বিদ্যমান। জলাভূমি এলাকা থাকার কারণে এখানে নানা ধরনের পাখি, উদ্ভিদ এবং স্থানীয় প্রাণী বসবাস করে। যা প্রকৃতি প্রেমীদের জন্য একটি আদর্শ গন্তব্য। 

হাইড পার্ক

হোয়াইটম্যান পার্ক 

হোয়াইটম্যান পার্ক পার্থের উত্তর শহরতলিতে অবস্থিত। এই বিশাল পার্কটি ৪,০০০ হেক্টর এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। এটি একটি প্রাকৃতিক অভয়ারণ্য, যেখানে বুশওয়াকিং ট্রেইল, বাইক পাথ এবং বিভিন্ন খেলাধুলার সুবিধা রয়েছে।

পার্কটির ভেতরে ‘ক্যাভারশাম ওয়াইল্ডলাইফ পার্ক’ নামে একটি বিখ্যাত বন্যপ্রাণী পার্কও রয়েছে। এখানে দর্শকরা অস্ট্রেলিয়ার স্থানীয় প্রাণী যেমন- কোয়ালা, কঙ্গারু, ডিঙ্গো এবং নানা ধরনের পাখি দেখতে পারেন।

হোয়াইটম্যান পার্ক

অ্যাভন ভ্যালি, জন ফরেস্ট এবং ইয়ানচেপ জাতীয় উদ্যান 

অ্যাভন ভ্যালি, জন ফরেস্ট এবং ইয়ানচেপ জাতীয় উদ্যান পার্থের উত্তর এবং পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত প্রাকৃতিক সংরক্ষিত এলাকা। এই অঞ্চলগুলো প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং জীববৈচিত্র্যের জন্য পরিচিত। 

এখানে রয়েছে বুশল্যান্ড। বুশল্যান্ড হল এমন একটি প্রাকৃতিক এলাকা, যেখানে সাধারণত ছোট ছোট গাছপালা, তৃণভূমি এবং ঝোপঝাড়ে পূর্ণ থাকে। এই অঞ্চলে প্রাকৃতিক জীবনধারা, স্থানীয় উদ্ভিদ ও প্রাণী বিশেষভাবে সমৃদ্ধ থাকে। এছাড়া, এর জীববৈচিত্র্য এবং রঙিন প্রাকৃতিক দৃশ্য সারা বছর ধরে দর্শকদের মুগ্ধ করে চলেছে।

পার্থেখাবার

রক লবস্টার

পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে বিখ্যাত সামুদ্রিক খাবার হলো রক লবস্টার। যাকে ‘ক্রে ফিশ’ও বলা হয়। পার্থ থেকে দুই ঘণ্টার ড্রাইভে সেরভানটেসে সরাসরি নৌকা থেকে কিনে রক লবস্টার খাওয়া যায়। তবে, মূল শহরেও এটি সহজেই পাওয়া যায়। পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার রক লবস্টার সস্তা নয়। একটি পূর্ণ লবস্টারের জন্য কমপক্ষে ৪০ ডলার খরচ হবে।

রক লবস্টার

মিট পাই

অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় খাবারগুলির মধ্যে একটি হলো মিট পাই। পার্থে এই ঐতিহ্যবাহী খাবারের অনেক কয়টি সংস্করণও রয়েছে। সাধারণ এ পাইটি গরুর মাংস দিয়ে পেস্ট্রির মতো করে তৈরি করা হয়। এছাড়াও মাশরুম, মুরগি, ম্যাশড পটেটো এমনকি চিজ ও বেকন দিয়ে তৈরি করেন অনেকে। 

ব্যারামুন্ডি

ব্যারামুন্ডি অস্ট্রেলিয়া এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের একটি স্থানীয় মাছ। যার সাদা মাংসের মৃদু স্বাদ এবং কম চর্বিযুক্ত খাবার পছন্দ করেন তাদের জন্য এই মাছটি উপযোগী। পার্থে এই মাছ সাধারণত গ্রিল করে খাওয়া হয়। 

ব্যারামুন্ডি মাছের গ্রিল

ক্যাঙ্গারু মাংস

অস্ট্রেলিয়ার অনেক সুপারমার্কেট ও রেস্টুরেন্টে ক্যাঙ্গারু মাংস পাওয়া যায়। এর স্বাদ সাধারণত খুব কম চর্বিযুক্ত গরুর মাংসের মতো। 

পার্থের উৎসব ও সংস্কৃতি

পার্থ ফেস্টিভ্যাল 

পার্থ ফেস্টিভ্যাল অস্ট্রেলিয়ার দীর্ঘতম চলমান সাংস্কৃতিক উৎসব। উৎসবটি  ১৯৫৩ সাল থেকে পালিত হয়ে আসছে। পার্থ ফেস্টিভ্যাল প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হয়। ফেস্টিভ্যালের মধ্যে নানা ধরনের শিল্প প্রদর্শনী, থিয়েটার, সঙ্গীত, নৃত্য, কবিতা পাঠ, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, এবং পারফর্মিং আর্টস এর মিলিত আয়োজন থাকে। এ আয়োজনগুলো শহরের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলকে আরও সমৃদ্ধ করে তোলে।

পার্থ ফেস্টিভ্যালের অংশ হিসেবে পার্থ রাইটার্স ফেস্টিভ্যাল এবং উইন্টার আর্টস ফেস্টিভ্যালসহ আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ উপ-ইভেন্ট অনুষ্ঠিত হয়। পার্থ রাইটার্স ফেস্টিভ্যাল এ প্রখ্যাত সাহিত্যিকরা তাদের লেখনীর মাধ্যমে অংশগ্রহণ করেন। অন্যদিকে, উইন্টার আর্টস ফেস্টিভ্যাল এ বিভিন্ন ধরনের শীতকালীন শিল্প প্রদর্শনী ও সংস্কৃতি উপস্থাপন করা হয়।

পার্থ ফেস্টিভ্যাল

ফ্রিঞ্জ ওয়ার্ল্ড ফেস্টিভ্যাল

ফ্রিঞ্জ ওয়ার্ল্ড ফেস্টিভ্যাল পার্থের অন্যতম বৃহত্তম এবং সবচেয়ে জনপ্রিয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এটি প্রতি বছর জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত হয়। দ্রুতই এ উৎসবটি পার্থের সাংস্কৃতিক ক্যালেন্ডারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছে।

এটি বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে শিল্পী, পারফর্মার এবং সৃজনশীল মানুষের সমাগম ঘটায়। থিয়েটার, কমেডি, নাচ, সংগীত, শিল্পকলা, এবং অন্যান্য পারফরমিং আর্টসের অসংখ্য প্রদর্শনী হয় এ উৎসবটিতে। উৎসবটি একটি বৈশ্বিক মঞ্চে পরিণত হয়েছে।

ফ্রিঞ্জ ওয়ার্ল্ড ফেস্টিভ্যাল

পার্থ ইন্টারন্যাশনাল কমেডি ফেস্টিভ্যাল

পার্থ ইন্টারন্যাশনাল কমেডি ফেস্টিভ্যাল পার্থের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে একটি মজাদার সংযোজন। উৎসবটি এস্টর থিয়েটার এবং মাউন্ট ললির আশেপাশের বিভিন্ন ভেন্যুতে অনুষ্ঠিত হয়। যেখানে দর্শকরা হাস্যরস ও কমেডি পারফরম্যান্সের একটি বৈচিত্র্য উপভোগ করতে পারেন। কমেডির বিভিন্ন শৈলীর মধ্যে রয়েছে স্ট্যান্ড-আপ কমেডি, স্কেচ, এবং কৌতুকপূর্ণ পারফরম্যান্স। 

পার্থ ইন্টারন্যাশনাল কমেডি ফেস্টিভ্যাল

মাইনিং ইকোনমি পার্থ

পার্থ শহরের অর্থনীতি মূলত খনি, পেট্রোলিয়াম এবং কৃষি রপ্তানি শিল্পের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। যদিও শহরের অধিকাংশ অর্থনৈতিক কার্যকলাপ খনি ও কৃষি থেকে আসে, তবে পার্থ তার ব্যবসা, প্রশাসনিক কেন্দ্র এবং জনসংখ্যার আকারের কারণে বিভিন্ন ধরনের নতুন বাজার তৈরি করেছে। 

পার্থ শহরের ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতার কারণে এখানকার বাসিন্দারা সহজে প্রয়োজনীয় উপকরণ আমদানি করতে পারেন, যেমন খনি ও কৃষি থেকে সম্পর্কিত পণ্য। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর, পার্থ শহরের শহরতলির প্রসার ঘটেছে, যার ফলে গাড়ির মালিকানা বৃদ্ধি পায় এবং নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হয়। পরিবহন ব্যবস্থার উন্নতির ফলে শহরতলিতে ছোট আকারের উৎপাদন প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে।

পার্থ শহরের খনি শিল্প

আজকের দিনে, পার্থ শুধুমাত্র খনি ও পেট্রোলিয়াম রপ্তানি ও ভারী শিল্পের জন্য পরিচিত নয়, শহরটি ২০০০ সালের পর থেকে প্রযুক্তি ও স্টার্টআপ ব্যবসার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। পার্থ থেকে কিছু সফল প্রযুক্তি কোম্পানি, যেমন অ্যাপবট, এগওয়ার্ল্ড এবং হেলথইঞ্জিন, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সাফল্য অর্জন করেছে। এর ফলে শহরের প্রযুক্তি খাতও অর্থনৈতিক দিক থেকে বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

পার্থ, যতটা সুন্দর, ততটাই বৈচিত্র্যময়। নিঃসন্দেহে পার্থ একটি আদর্শ গন্তব্য, যেখানে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ঐতিহাসিক স্থান এবং আধুনিকতা একসঙ্গে মিলে তৈরি করেছে এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ইতিহাস, আধুনিক জীবন, সোনালি সৈকত, প্রাণবন্ত শহুরে জীবন, এবং সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র শহরটিকে এক দুর্দান্ত গন্তব্যে পরিণত করেছে।

পার্থ সম্পর্কে আরো কিছু মজার তথ্য 

  • পার্থকে “সিটি অব লাইটস” বলা হয়। কারণ, এটি ছিল বিশ্বের প্রথম শহরগুলোর মধ্যে একটি, যেখানে বৈদ্যুতিক বাতির আলো ব্যবহার শুরু হয়েছিল। 
  • ওয়েভ রক হল একটি বিশাল পাথর যা প্রাকৃতিকভাবে সময়ের সাথে সাথে বাতাস এবং পানির ক্ষয়ের মাধ্যমে তৈরি হয়েছে। এটি এক বিস্ময়কর প্রাকৃতিক সৃষ্টি যা পৃথিবীজুড়ে পর্যটকদের আকর্ষণ করে।
  • রটনেস্ট আইল্যান্ড শুধু একটি জনপ্রিয় পর্যটন স্থান নয়, এটি কোয়োক্কাস নামক প্রাণীর জন্যও পরিচিত। কোয়াক্কাসকে বলা হয় বিশ্বের সবচেয়ে সুখী প্রাণী বলা হয়। এই প্রাণীরা এখন এলাকার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ।
  • পার্থ গোল্ডেন মাইল নামক একটি বিশেষ উপকূলীয় অঞ্চল অবস্থিত। যেখানে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সোনার খনি। শতাধিক বছর ধরে এই অঞ্চলটি অস্ট্রেলিয়ার সোনার উৎপাদনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে।
  • লেক হিলিয়ার হল মিডল আইল্যান্ড-এ অবস্থিত একটি আশ্চর্যজনক প্রাকৃতিক বিস্ময়। এর গোলাপী রঙের পানি বিশেষ ধরনের জলজ শৈবাল দ্বারা তৈরি, এবং এটি এমন এক অদ্ভুত, অন্যধরনের দৃশ্য উপস্থাপন করে, যা দর্শকদের মুগ্ধ করে রাখে।

সোর্স

Related posts

কায়রো – প্রাচীন কোলাহলের শহর

অ্যানিমের শহর- টোকিও

সিওলঃ কে-পপ, কে-ড্রামা এবং হাজারো গল্পের রাজধানী

Leave a Comment

Table of Contents

    This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More