Image default
এশিয়াদেশ পরিচিতি

ইসলামের আদি ঐতিহ্যের সিরিয়া

       মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর জীবনের শেষ দিকের একটি হাদিস অনুযায়ী ইমাম মাহাদি হযরত ঈসা আঃ এর সাথে সর্বপ্রথম সিরিয়ায় সাক্ষাৎ করবেন।

সিরিয়া, মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মুসলিমদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি রাষ্ট্র। উর্বর সমতল ভূমি, সুউচ্চ পর্বত ও মরুভূমির দেশ হিসেবে এই দেশটির বেশ খ্যাতি রয়েছে। সিরিয়ার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হল এ দেশের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। কিন্তু বর্তমানে দেশটি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সমস্যায় ভীষণভাবে জর্জরিত। 

অভ্যন্তরীণ অবস্থা যেমনই হোক না কেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ঐতিহাসিক মনোমুগ্ধকর স্থানগুলো সিরিয়ার প্রাণ। ইসলাম এবং খ্রিস্ট ধর্মের পূণ্যভূমি হিসাবে সিরিয়ার যথেষ্ট তাৎপর্য রয়েছে। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর জীবনের শেষ দিকের একটি হাদিস অনুযায়ী ইমাম মাহাদি হযরত ঈসা আঃ এর সাথে সর্বপ্রথম সিরিয়ায় সাক্ষাৎ করবেন। অতীত জৌলুসে মোড়ানো সিরিয়া নিয়েই থাকছে আজকের গল্প।

রাজধানী দামেস্ক 
সরকারি ভাষা আরবি
জনসংখ্যা ২ কোটি ১১ লক্ষ 
মোট আয়তন লক্ষ ৮৫ হাজার ১৮০ বর্গ কিলোমিটার
মুদ্রা সিরীয় পাউন্ড বা লিরা
সময় অঞ্চল ইউটিসি+২ 

ইউটিসি +৩ (গ্রীষ্মকালীন)

সিরিয়ার ভৌগোলিক অবস্থান

ভূমধ্যসাগরের পূর্ব প্রান্তে আরব উপদ্বীপের উত্তর পাশে অবস্থিত, পশ্চিম এশিয়ার দেশ সিরিয়া। এই অঞ্চলকে বলা হয় শাম অঞ্চল। এটি দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ার একটি বৃহৎ ঐতিহাসিক অঞ্চল। ইউরোপীয় মতানুসারে, পূর্ব দিকের এই অঞ্চল থেকে সূর্যোদয় হয় বলে এর নামকরণ করা হয় শাম। আবার, আরবিও উপদ্বীপের মানুষের ব্যাখ্যায় পাওয়া যায়, উত্তর দিকে পড়া অঞ্চলগুলোকে বোঝাতে তারাশাম’ শব্দটি ব্যবহার করতো। বর্তমান সাইপ্রাস জর্দান, লেবানন, সিরিয়া, ফিলিস্তিন, ইসরাইল এবং দক্ষিণ তুরস্কের অংশবিশেষ নিয়ে এই শাম অঞ্চল গঠিত। 

সিরিয়ার উত্তরে রয়েছে তুরস্ক, পশ্চিম এবং দক্ষিণ-পশ্চিমে রয়েছে লেবানন ও ইসরাইল, পূর্বে রয়েছে ইরাক, এবং সর্বশেষ দক্ষিনে রয়েছে জর্ডান। 

সিরিয়ার ভূ প্রাকৃতিক গঠন বেশ বিচিত্র। দেশটির এক প্রান্তে রয়েছে মরুভূমি, অন্য প্রান্তে সারি সারি স্তম্ভের মতো দাঁড়িয়ে আছে পর্বতমালা। এই পর্বতমালার মধ্যে জাবাল আল-দ্রুজ অন্যতম। ১৯৭৩ সালের ফেরাত নদীর উপর নির্মিত একটি বাঁধের ফলে আসাদ নামে একটি জলাধারের সৃষ্টি হয় যেটি সিরিয়ার বৃহত্তম হ্রদ। 

সিরিয়ার জলবায়ু মূলত শুষ্ক। দেশটির একটি বৃহৎঅংশ জুড়ে বছরে মাত্র ২৫০ মিলিমিটারের কম বৃষ্টিপাত ঘটে থাকে। 

ম্যাপ

সিরিয়ার আয়তন ও জনসংখ্যা

সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় নাম সিরিয়ান আরব রিপাবলিক। এক সময় পৃথিবীর রাজধানী খ্যাত ‘দামেস্ক’ সি শহরটি হলো সিরিয়ার রাজধানী। 

আয়তনের দিক থেকে পৃথিবীর ৮৮ তম দেশ সিরিয়ার সর্বমোট আয়তন ১,৮৫,১৮০ বর্গ কিলোমিটার। দেশটির জনসংখ্যা ২ কোটি ১১ লক্ষ প্রায়। সিরিয়ানদের মধ্যে ৯০ শতাংশই আরব জাতির মানুষ। এছাড়াও, দেশটিতে তার্কেমিন, আর্মেনিয়ান, কার্কাশীয় সহ আরো বেশ কয়েকটি  জনগোষ্ঠীর অবস্থান লক্ষ্য করা যায়। কুর্দিরা সিরিয়ার সবচেয়ে বড় মাইনোরিটি। এছাড়াও, সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের আস-সিরিয়ানরাও দেশটিতে বসবাস করছে।  

সিরিয়ার জনসংখ্যা

সিরিয়ার ইতিহাসঃ পৃথিবীর প্রথম কৃষির শুরু

যীশু খ্রীষ্টের জন্মের ১০,০০০ বছর পূর্বে, সিরিয়া ছিল নবপ্রস্তরযুগীয় সংস্কৃতির অন্যতম কেন্দ্র। জেনে অবাক হবেন, পৃথিবীতে প্রথম বারের মতো কৃষি এবং গবাদি পশু প্রজনন এখানেই শুরু হয়। প্রত্নতাত্ত্বিকদের ভাষায় সিরিয়ান সভ্যতা পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন সভ্যতা। ধারণা করা হয়, এর আগে কেবল মেসোপটেমিয়া সভ্যতা পৃথিবীতে গড়ে উঠেছিল। 

প্রাচীন সময়ে সিরিয়া

কালের বিবর্তনে সপ্তম শতাব্দীতে সিরিয়ায় ইসলাম ছড়িয়ে পড়ে। সেই সময় থেকেই সিরিয়ায় বিভিন্ন আরব রাজাদের উত্থান এবং পতন ঘটতে থাকে। ১৬ শতক থেকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষ পর্যন্ত সিরিয়া প্রায় ৪০০ বছর তুরস্কের অটোমান সাম্রাজ্যের শাসনাধীন ছিল। 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে এবং স্বাধীনতা লাভের আগ পর্যন্ত সিরিয়া ছিল একটি ফরাসি শাসিত অঞ্চল। এই সময়কালীন সিরিয়ায় একটি ব্যাপক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংঘটিত হয়, যেখানে সিরিয়ার প্রায় সকল পুরুষ মানুষ মারা যায়। ইতিহাসের যুদ্ধটি ‘সিরিয়ান ওয়ার’ নামে পরিচিত। সিরিয়া দেশটির রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের ইতিহাসটা বেশ পুরনোই বলা চলে। পরবর্তীতে শুরু হওয়া সিরিয়ান গৃহযুদ্ধ সমসাময়িক একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা।

সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধের ছবি

সিরিয়ার রাজনীতি ও মেকি গণতন্ত্র

সিরিয়ায় একটি সংসদীয় প্রজাতন্ত্রের কথা উল্লেখ আছে। আসলে এই ব্যবস্থা একটি একক দলীয় প্রজাতন্ত্র। কার্যত বহুদিন ধরে সিরিয়ায় একনায়ক তান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা বিদ্যমান রয়েছে। সংবিধান মোতাবেক রাষ্ট্রের কাঠামো ও সরকার পরিচালনার নিয়ম নীতি নির্ধারণ হওয়ার কথা থাকলেও বিগত কয়েক দশক ধরেই সংবিধান অনুযায়ী সরকার পরিচালিত হতে দেখা যায় না। 

রাষ্ট্রপতি

রাষ্ট্রপতি হলেন সিরিয়ার সর্বোচ্চ রাজনৈতিক ক্ষমতাধর ব্যক্তি। তিনি প্রকৃতপক্ষে দেশের শাসকের ভূমিকায় থাকেন। রাষ্ট্রপতি সাত বছরের জন্য নির্বাচিত হন। কিন্তু এই নির্বাচনের ক্ষেত্রে অন্য বিরোধী দলের হস্তক্ষেপ নেই বললেই চলে। 

সিরিয়ায় বেশিরভাগ সময়েই জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে রাখা হয়। ইসরাইলের সাথে ক্রমাগত আগ্রাসনকে, দেশটির সরকার আরোপিত জরুরী অবস্থার একমাত্র কারণ হিসেবে জনগণের সামনে উপস্থাপন করে। 

সিরিয়াতে রাষ্ট্রপতি সর্বেসর্বা, তিনিই দেশটির সামরিক বেসামরিক প্রশাসনের প্রধান। সিরিয়ার প্রয়াত রাষ্ট্রপতি ছিলেন হাফিজ আল- আসাদ। তিনি প্রায় তিন দশক জুড়ে গণভোটে বিজয়ের মাধ্যমে ক্ষমতায় বহাল ছিলেন। পরবর্তীতে তার ছেলে বাসার আল আসাদুল ২০০০ সালে  গণভোটে সিরিয়ার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।

বাথ পার্টি

‘বাথ আরব সোশ্যালিস্ট পার্টি’ দীর্ঘদিন ধরে সিরিয়ার প্রধান রাজনৈতিক দল এবং মূল রাজনৈতিক পরাশক্তি। এই দলটি প্যান-আরব নীতি অনুসরণ করে। দলটির মূলনীতি হলো আরব ঐক্য ও সমাজতান্ত্রিক আদর্শ। ১৯৬৩ সালের পর থেকেই বাথ পার্টি মূলত সিরিয়ার রাজনীতিতে প্রধান ভূমিকা পালন করে আসছে। 

বাথ পার্টির সমাবেশ

সিরিয়ার সংসদ

সিরিয়ায় এক কক্ষ বিশিষ্ট সংসদ রয়েছে, যার সদস্য সংখ্যা ২৫০ জন। সদস্যরা চার বছরের জন্য নির্বাচিত হন। তবে নির্বাচনের প্রক্রিয়া এবং স্বচ্ছতা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে যথেষ্ট সমালোচনা এবং প্রশ্ন রয়েছে। দীর্ঘদিন যাবত বাথ পার্টির একনায়কতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা সিরিয়ার রাজনীতি  ও প্রশাসনকে নিয়ন্ত্রণ করে আসছে।

আঞ্চলিক বিভাজন

সিরিয়া বিভিন্ন প্রশাসনিক অঞ্চলে বিভক্ত। তবে, যুদ্ধ এবং অভ্যন্তরীণ সংকটের কারণে দেশের বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠী, কুর্দি এবং আইএসের মত সংগঠনগুলোর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলের সৃষ্টি হয়েছে। 

সিরিয়ার বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল। গৃহযুদ্ধ, আন্তর্জাতিক সংঘাত, মানবাধিকার লঙ্ঘনের মত বিষয়ের কারণে দেশটি একটি দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক ও মানবিক সংকটে ভুগছে। 

সিরিয়ার কুর্দিদ যোদ্ধা

গৃহযুদ্ধে জর্জরিত সিরিয়া ও আরব বসন্ত

সিরিয়ায় বাসার আল আসাদ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার আগে থেকেই সিরিয়ান তরুণদের মধ্যে  ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব,  রাজনৈতিক ও বাক স্বাধীনতার অভাব, দুর্নীতি  ইত্যাদির কারণে ক্ষোভের জন্ম হতে থাকে।  সেই ক্ষোভকে উসকে দেয় ‘আরব বসন্ত’। 

আরব বসন্তে সিরিয়ান যুবকেরা

এরপর, আসে ২০১১ সালের ১৫ই মার্চ। এই দিনটি সিরিয়ার ইতিহাসে গণ আন্দোলনের প্রথম দিন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সেদিন এক বড় ধরনের বিক্ষোভ দেখা যায়। একটা সময় বাসার আল আসাদের বিরোধী শক্তি হাতে অস্ত্র তুলে নিয়ে যুদ্ধ শুরু করে। কিন্তু সরকার তাদের ‘বিদেশি শক্তির মদদে পরিচালিত সন্ত্রাসী’ হিসাবে আখ্যায়িত  করে। 

শুরু হয় চরম দমন পীড়ন। সিরিয়া জুড়ে শতাধিক সশস্ত্র গোষ্ঠীর জন্ম তৈরি হয় এবং তারা আসাদের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করে। আস্তে আস্তে একের পর এক এলাকা সরকারের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতার বাইরে চলে যায়। দেশটিতে শুরু হয় ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ। 

২০১১ সালের মার্চ থেকে ২০২১ সালের মার্চ; এই এক দশকের যুদ্ধে সিরিয়ায় সামরিক বেসামরিক মিলে প্রাণ গেছে তিন লাখ পঞ্চাশ হাজারের বেশি মানুষের। তবে ধারণা করা হয়, এর প্রকৃত সংখ্যা আরো অনেক বেশি। 

সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে আহত যুবক

বিদেশি বিভিন্ন মহল সিরিয়ান এই গৃহযুদ্ধের সুবিধা নেয়। রাশিয়া এবং ইরান, বাসার আল আসাদের সরকারকে প্রকাশ্যে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স সহ পশ্চিমা দেশগুলো বাসার আল আসাদ সরকার বিরোধী। তাদের সাথে আরও রয়েছে তুরস্ক এবং সৌদি আরবের মত দেশগুলো।

সিরিয়ার সৌন্দর্যঃ কোথায় কোথায় ঘুরবেন

সিরিয়া যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ হলেও দেশটি প্রাচিন ঐতিহ্য সম্বলিত একটি স্থান। এখানে রয়েছে প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য এবং অসংখ্য প্রাচীন নিদর্শন। 

কাসিয়ুন পর্বত

পাহাড় প্রেমীদের জন্য কাসিয়ুন পর্বত হতে পারে একটি স্বর্গরাজ্য। এই পর্বত থেকে প্রাচীন দামেস্ক শহরকে পর্যটকরা পাখির চোখে দেখতে পারবেন। জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্রের পাশাপাশি এই পর্বতটি দামেস্ক শহরের প্রতীক হিসেবে বিখ্যাত। কয়েক শতাব্দি পুরানো এই পর্বতটির কথা বিভিন্ন ঐতিহাসিক গ্রন্থ এবং ধর্মগ্রন্থে উল্ল্যখ করা আছে।

কাসিয়ুন পর্বত

জিনওয়ার গ্রামঃ নারীদের গ্রাম

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য মুখ্য না হলে জিনওয়ার গ্রামটি বড়ই অদ্ভুত। জিনওয়ার এর শাব্দিক অর্থ নারী। অবাক করার বিষয় হলো, এই গ্রামে মাত্র ৩০ জন বাসিন্দা রয়েছে। আরো মজার বিষয় হচ্ছে, সবাই নারী এবং শিশু। এর মূল কারণ হচ্ছে, সিরিয়ান যুদ্ধে বিধবা নারীদের এই গ্রামে এনে পুনর্বাসন করা হয়েছিল।

জিনওয়ার গ্রাম

পালমিরা

‘মরুর মুক্তা’ হিসেবে পরিচিত পালমিরা একটি প্রাচীন শহর। শহরটির অবস্থান সিরিয়ার হমস প্রদেশে। পালমিরাতে প্রত্নতাত্ত্বিকগণ নিউলিথিক যুগের নিদর্শনের সন্ধান পেয়েছেন। পালমিরার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো হলো ‘বাল সামিনের মন্দির’; যা প্রাচীন সেমেটিক দেবতা ‘বাল’ কে উৎসর্গ করে তৈরি করা হয়েছে। এটি একটি ইউনেস্কোর স্বীকৃত ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট। 

পালমিরার মতো আরো একটি সুন্দর গ্রাম হল ‘বুশরা’। এটিও একটি ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট।

প্রাচীন শহর পালমিরা

আপামিয়া

সিরিয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় শহর আপামিয়া। শহরটির খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীতে ‘আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট’ এর অন্যতম সেনাপতি সেলুকাস আইনিকেটর প্রতিষ্ঠা করেন। এই শহরের হেলেনিক যুগের চিন্তাকর্ষক নগর পরিকল্পনা এবং অসাধারণ স্থাপত্য যে কাউকেই মুগ্ধ করবে। ১২ শতকে তৈরি ‘ক্রাক দেস মোয়াবিটস বা মোয়াবের কারাক’ এখানকার অন্যতম স্থাপনা। ক্রুসেডার আমলে তৈরি এ স্থাপত্য মূলত পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত একটি দুর্গ।

সিরিয়ার আপামিয়া শহর

আলেপ্পো সিটাডেল

আলেপ্পো সিটাডেল এদেশের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। সিরিয়ান গৃহযুদ্ধের সময় দুর্গটি ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পর্যটকরা এখানে ঘুরতে এসে এর আশেপাশের মনোমুদ্ধকর সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন।

মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠের দেশ সিরিয়ায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে অসংখ্য ধর্মীয় স্থান। এসব ধর্মীয় স্থানও হতে পারে পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু।

উমায়েদম মসজিদ, ভানু উমায়া মসজিদ, জায়নাব মসজিদ, সায়েদা রুকায়া মসজিদ, বাব আল-সাগির সমাধি, আল নুকতাহ মসজিদ, কায়েস আল কারনি মসজিদ, সিনান পাশা মসজিদ, আকসাব মসজিদ উল্লেখযোগ্য। কিন্তু, চলমান যুদ্ধে এসব মসজিদে অনেকগুলোই বর্তমানে ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় আছে।

আলেপ্পো সিটাডেল

সিরিয়ার অর্থনীতি

১৯৭০ এর দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত কৃষি ছিল সিরিয়ার প্রাথমিক অর্থনৈতিক ক্ষেত্র। স্বাধীনতার সময়ও কৃষি বিশেষ করে বনায়ন এবং মাছ ধরা ছিল অর্থনীতির সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ খাত। ১৯৪০ ও ৫০ এর দশকের শুরুতে সিরিয়ার কৃষি দ্রুত বর্ধনশীল ছিল। প্রাচীনকাল থেকে আজ অবধি দামেস্কের লৌহজাতক পণ্য ছিল পৃথিবীব্যাপী বিখ্যাত। দামাকাস স্টিলের তৈরি ছুরিগুলো সারা পৃথিবীতে সুপরিচিত।

সিরিয়ার কৃষি

সিরিয়ার অবকাঠামো ৯ বছরের গৃহযুদ্ধের ধকল সইতে সইতে একেবারে ভেঙে পড়েছে। যুদ্ধক্ষেত্র ছাড়াও সরকারপন্থী বাহিনী এবং তাদের রুশ মিত্রদের নিরবিচ্ছিন্ন বোমা হামলায় দেশটির প্রায় সবকিছুই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। খাদ্য ও বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে শুরু করে অন্যান্য শিল্পক্ষেত্রেও ভয়াবহ পতন দেখা দিয়েছে। সিরিয়ার মুদ্রার মান প্রতিনিয়ত কমছে এবং নিত্যপণ্যের দাম আকাশচুম্বী। 

লেবাননের মানুষদের জীবনযাপন কঠিন হলেও, যুদ্ধ-বিধ্বস্ত সিরিয়ায় জীবন আরও কঠিন। সেখানে জনসাধারণকে রেশনের রুটি পেতে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হয়, জ্বালানি পেতে অপেক্ষা করতে হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। নাগরিকরা অভিযোগ বর্তমানে সিরিয়া তার ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ খাদ্য ও জ্বালানি সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমে গেছে এবং তেলের উচ্চমূল্যের কারণে ব্যবসা পরিচালনা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে।

বিশ্বব্যাংকের মতে, ৯০ লাখ ৩০ হাজার সিরীয় নাগরিক জানে না, তাদের পরবর্তী খাবার কোথা থেকে আসবে। অথচ, চলতি বছরের শুরুতে এই সংখ্যা ছিল ১০ লাখ ৪০ হাজার। সিরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে একসময় বলা হতো দেশের ‘রুটির ঝুড়ি’, কিন্তু এটি এখন কুর্দি-নিয়ন্ত্রিত, এবং সরকারের সাথে খাদ্য সরবরাহ নিয়ে তাদের কোনো সমঝোতা হয়নি। 

সিরিয়ায় জাতিসংঘের সাহায্য

এক সময়ের গম রপ্তানিকারক সিরিয়া এখন রাশিয়ার গম সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল। যুক্তরাষ্ট্র তেল ও গ্যাসের বিরুদ্ধে অবরোধ ঘোষণা করায় সিরিয়া, ইরানের অপরিশোধিত তেলের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছে। মৌলিক সম্পদের অভাবে দেশটির কৃষি ও জ্বালানি খাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সিরিয়ার শিল্প ও সংস্কৃতি

সিরিয়ার মানুষের পোশাক পরিচ্ছেদ থেকে শুরু করে খাদ্যাভাসে রয়েছে বৈচিত্র্যের ছাপ। আরব পার্শিয়ান, অটোম্যান এবং ভূমধ্যসাগরীয় রান্নার কৌশল গুলোকে একত্রিত করে এখানকার অধিবাসীরা অনন্য কিছু রেসিপি তৈরি করেছে। 

সিরিয়ার খাবার

সিরিয়ান রন্ধন প্রণালীতে শাক সবজি, লেবু, শস্য, ঔষধি গাছের মতো বিভিন্ন তাজা উপাদান ব্যবহার করা হয়। স্বাদের জন্য দারুচিনি, জিরা, সুমাগ এর ব্যবহার বিশেষভাবে লক্ষণীয়। অল্প আচে মাটির চুলায় রান্না করা সিরিয়ান ঐতিহ্যের একটি অংশ। এতে খাবারের প্রকৃত স্বাদ অপূর্ণ থাকে বলে বিশ্বাস করে এ দেশের রন্ধন শিল্পীরা।

সিরিয়ান শর্মা

এ পদ্ধতি মেনে প্রস্তুত করা শর্মা সিরিয়ার সবথেকে জনপ্রিয় খাবার। এই খাবারটির প্রচলন প্রথম সিরিয়াতে হয় বলে অনেকে মনে করেন। হুমাস, ফালাফেল সিরিয়ানদের সর্বাধিক পছন্দের দুইটি খাবার। 

সিরিয়ান হুমাস

 

এখানকার মসলাযুক্ত খাবারের পাশাপাশি মিষ্টান্ন দারুন জনপ্রিয়। বাদাম এবং খেজুর দিয়ে তৈরি করা নানা রকম পেস্ট্রি এবং  কুকিজের মধ্যে বাকলাভা ও মামউল অধিক সুপরিচিত। 

সিরিয়ার চলচ্চিত্র

সংস্কৃতির দিক থেকে সিরিয়ানরা বেশ সমৃদ্ধ। দামেস্ক আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব সিরিয়া এবং আরব  বিশ্বের একটি বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এখানে আন্তর্জাতিক এবং আরব বিশ্বের চলচ্চিত্র নির্মাতাদের চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হয়ে থাকে। এই উৎসবের লক্ষ্য সাংস্কৃতিক সৌহার্দ বৃদ্ধি এবং চলচ্চিত্র নির্মাতাদের উৎসাহিত করা।  প্রখ্যাত চলচ্চিত্র The Message ( ১৯৭০) মূলত একজন সিরিয়ান চলচ্চিত্র নির্মাতার তৈরি। 

সিরিয়ার কথা বলতে গেলে আপনাআপনি চলে আসে দাবকে নাচের কথা। সম্মিলিতভাবে হাত ধরে গোল হয়ে প্রদর্শন করা এ নৃত্য  সিরিয়ান সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।

সিরিয়ার শিক্ষা ব্যবস্থা

সিরিয়ান গৃহ যুদ্ধের কবলে পড়ে এদেশে শিক্ষা ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শিক্ষার বেহাল দশার জন্য দেশটির অধিকাংশ জনগণ দারিদ্রসীমার নিচে বসবাস করছে। ১৫ বছর বা তার বেশি বয়সের সিরিয়ানদের  সাক্ষরতার হার পুরুষদের ক্ষেত্রে ৯০.৭% এবং মহিলাদের ৮২.২%। 

সিরিয়ায় ছয়টি রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় এবং ১৫টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে প্রধান দুটি বিশ্ববিদ্যালয় হলো দামেস্ক বিশ্ববিদ্যালয় এবং  আলেব্য বিশ্ববিদ্যালয়। 

সিরিয়ার স্বাস্থ্য ব্যবস্থা

সিরিয়ার স্বাস্থ্যব্যবস্থা বর্তমানে অত্যন্ত সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে। ২০১১ সালে শুরু হওয়া গৃহযুদ্ধ এবং ধারাবাহিক সহিংসতা দেশের স্বাস্থ্যখাতকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। স্বাস্থ্যসেবা পরিকাঠামোর বড় অংশ ধ্বংস হয়ে গেছে, যার ফলে হাসপাতাল, ক্লিনিক এবং অন্যান্য চিকিৎসা সেবাদান কেন্দ্রের অভাব দেখা দিয়েছে।

বাব আল-হাওয়া হাসপাতাল

যবনিকা

সব মিলিয়ে সিরিয়াকে বলা যেতে পারে এক অপার সৌন্দর্যের এবং ইতিহাসের পণ্যভূমি। রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক দিক থেকে বিপর্যস্ত হলেও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং ধর্মীয় দিক থেকে সিরিয়া বেশ গুরুত্ব বহন করে। এখানকার অধিবাসীরা খাদ্যাভাস কিংবা সংস্কৃতি সব দিক থেকেই বেশ সমৃদ্ধ। সকল বিপদ কাটিয়ে উঠে সিরিয়া সফল এবং সমৃদ্ধশালী দেশে পরিণত হবে এমনটাই হতে পারে যুদ্ধ বিশ্বস্ত দেশের অধিবাসীদের জন্য এক বিশাল আশার বাণী। 

 

সিরিয়া সম্পর্কে কিছু মজার তথ্য

ধূমপায়ীদের দেশ সিরিয়া

অবাক করা বিষয় হলো সিরিয়ার  অধিবাসীরা অতিমাত্রায় ধূমপানে অভ্যস্ত।  একজন  সিরিয়ান  প্রতিবছরে ২৩০০টির  বেশি সিগারেট সেবন করেন।

অতি প্রাচীন জনগোষ্ঠীর সিরিয়া

৭০০,০০০ বছর আগে থেকে সিরিয়ায় মানুষের বসবাস ছিল। যা পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন মানব সভ্যতা।

প্রাচীনতম লাইব্রেরির দেশ সিরিয়া

মনে করা হয়, যীশু খ্রিস্টের জন্মের প্রায়তিন হাজার বছর আগে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীনতম লাইব্রেরি ইবলা স্থাপন করা হয়েছিল। 

উমাইইয়াদ মসজিদের দেশ সিরিয়া

প্রায়শই ইসলামের চতুর্থ পবিত্র স্থান হিসেবে পরিচিত উমাইয়াদ মসজিদ পৃথিবীর ইতিহাসে সবথেকে পুরাতন পাথরের তৈরি মসজিদ।

স্বল্প অ্যালকোহল ভোক্তার দেশ সিরিয়া

বিশ্বজুড়ে কম অ্যালকোহল সেবনের হিসাবে সিরিয়া  ৯ নম্বর স্থানে রয়েছে। একজন সিরিয়ান বছরে গড়ে ০. ১৩ লিটার অ্যালকোহল সেবন করে।

Related posts

মেক্সিকো – পৌরাণিক সভ্যতার দেশ

আবু সালেহ পিয়ার

ইউরোপের রুটির ঝুড়ি ইউক্রেন

লেবানন – পৃথিবীর প্রাচীনতম সংস্কৃতির দেশ

শেখ আহাদ আহসান

Leave a Comment

Table of Contents

    This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More