Image default
রহস্য রোমাঞ্চ

খুনেই আনন্দ!-জোডিয়াক কিলার

“This is the Zodiac speaking. By the way have you cracked the last cipher I sent you? My name is…” একটা খুনী কতটা দাম্ভিক হলে খুন করার পর পুলিশের কাছে কোড করা চিঠি পাঠায়?

“সিরিয়াল কিলার” একটি শব্দ যা রক্ত হিম করে দিতে পারে! এই ভয়ঙ্কর কাহিনিগুলো আমরা সচরাচর বইপত্র বা সিনেমাতেই বেশি পাই। তবে বাস্তবেও এমন নৃশংস অপরাধীরা ছিল, যারা তাদের অপরাধের ছাপ রেখে গিয়েছে ইতিহাসের পাতায়। আমাদের দেশে হয়তো এমন সিরিয়াল কিলিংয়ের ঘটনা বিরল, তবে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে এমন বহু ঘটনা রয়েছে যা শুনে গা শিউরে ওঠার মতো। 

কিছু সিরিয়াল কিলার থেকে যায় অন্ধকারে; অজ্ঞাত—আর কিছু তাদের অপরাধকে প্রচারের আলোয় এনে নিজেদের কুখ্যাতি প্রতিষ্ঠা করতে চায়। ঠিক এমনই এক রহস্যময় সিরিয়াল কিলার ছিল জোডিয়াক।

জোডিয়াক কিলারের পরিচয় রহস্য

জোডিয়াক কিলারের আবির্ভাব ঘটে ১৯৬৮ সালে আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়াতে। কিন্তু সে কেবল খুন করেই থেমে থাকেনি; বরং, তার অপরাধের খবর নিজেই পুলিশ আর সংবাদমাধ্যমকে জানিয়ে পুরো শহরের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। 

একের পর এক ঠান্ডা মাথার খুনের পর সে পত্রিকায় সাংকেতিক বার্তায় ভরা চিঠি পাঠিয়ে জানিয়েছিল তার কৃতকর্মের বিবরণ। এসব বার্তা শুধু তথ্য নয়, একটি ধাঁধার মতো ছিল, যেন সে পুলিশ আর সাধারণ মানুষকে তার খেলা বোঝার আমন্ত্রণ জানাচ্ছিল।

জোডিয়াকের লোগো

জোডিয়াক নিজে দাবি করেছিল, সে মোট ৩৭ জনকে খুন করেছে। তার প্রতিটি খুনের কৌশল ছিল ভিন্ন, কিন্তু আতঙ্ক ছড়ানোর পরিকল্পনা ছিল নিখুঁত। পুলিশ আর গোটা আমেরিকা তার পরিচয় খুঁজে বের করতে মরিয়া হয়ে উঠেছিল, কিন্তু সব চেষ্টাই ব্যর্থ হয়। তার চিঠি এবং সাংকেতিক বার্তাগুলো ছিল এতটাই জটিল যে, বিশেষজ্ঞদের অনেক বছর লেগে যায় সেগুলোর সমাধান করতে। 

এমন একজন অপরাধীর গল্প শুধুই ভয়ানক নয়, এটি এমন এক রহস্য যা আজও মানুষের মনে চরম কৌতূহল আর আতঙ্কের জন্ম দেয়। জোডিয়াক কিলার শুধুই একজন সিরিয়াল কিলার নয়, সে ছিল একজন মাষ্টারমাইন্ড। যার অপরাধ কৌশল এবং বার্তা তাকে অপরাধ জগতের ইতিহাসে চিরকালের জন্য কুখ্যাত করে তুলেছে।

জোডিয়াক নামের পেছনের রহস্য

প্রত্যেক হত্যাকাণ্ডের পর, সেই খুনি জোডিয়াক নিজেই স্থানীয় পুলিশ এবং সংবাদমাধ্যমকে চিঠি দিয়ে জানাত তার অপরাধের কথা। চিঠিগুলিতে সে নিজেকে “জোডিয়াক” নামে পরিচয় দিত। তার দেওয়া এই নামই তাকে ইতিহাসে চিরকালের জন্য কুখ্যাত করে তুলেছে। কিন্তু কেন তাকে “জোডিয়াক কিলার” বলা হয়?

১২টি রাশিচক্রের চিহ্ন এবং চিঠির কোড পাশাপাশি

এই নামের পেছনে রয়েছে তার পাঠানো সাংকেতিক বার্তা ও চিঠিগুলোর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য। জোডিয়াক কিলারের কোড এবং চিঠিতে কিছু চিহ্ন ব্যবহার করা হয়েছিল। এই চিহ্নগুলো ছিলো রাশিচক্রের ১২টি চিহ্নের মতো। এই প্রতীকগুলো ছিল ধাঁধাময় এবং জটিল, যা অনেকটা জ্যোতিষশাস্ত্রের রাশিচক্রের মতো বিভ্রান্তিকর। এই কারণেই খুনির নামের সঙ্গে “জোডিয়াক” শব্দটি জুড়ে যায়।

চিঠিতে শুধু তার অপরাধের স্বীকারোক্তি থাকত না, বরং লুকিয়ে থাকত একেকটি ধাঁধা। এই ধাধাগুলো সমাধান করতে গিয়ে পুলিশ এবং তদন্তকারীরা দিশেহারা হয়ে যেত।

ক্যালিফোর্নিয়ায় জোডিয়াক কিলারের তাণ্ডব

জোডিয়াক; গত শতাব্দীর ৬০ থেকে ৭০ এর দশকে এ নামটিই নর্দার্ন ক্যালিফোর্নিয়ায় ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টি করে রেখেছিল। এই সময়কালে জোডিয়াকের দাবী অনুসারে, সে মোট ৩৭ জন নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করেছিল!

যদিও সংবাদপত্র এবং তদন্তকারী গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এই দাবীর মাঝে শুধুমাত্র ৭ জন ভিক্টিমের বিষয়ে একমত হতে পেরেছে। এই ভয়ঙ্কর সিরিয়াল কিলারের সিরিয়াল কিলিংয়ের গল্পগুলো জানতে ফিরে যেতে হবে ১৯৬৮ সালের ২০ ডিসেম্বর, লেক হারমান রোড, ক্যালিফোর্নিয়ায়।

জোডিয়াক কিলারের প্রথম হত্যাকাণ্ড

জোডিয়াক কিলারের প্রথম স্বীকৃত শিকার ছিলেন ১৬ বছরের ‘বেটি লউ জেনসেন’ এবং ১৭ বছরের ‘ডেভিড আর্থার ফ্যারাডে’। সেদিন ছিল তাদের প্রথম ডেট। প্রেমিক ডেভিড তার প্রেমিকাকে নিয়ে গিয়েছিল ক্যালিফোর্নিয়ার নির্জন লেক হেরমান রোডে। সেই নির্জন রাস্তায় গাড়ির পাশে তাদের দেহ পাওয়া যায়।

এক পথচারী তাদের মৃতদেহ আবিষ্কার করেন। দু’জনের শরীরেই ছিল গুলির চিহ্ন। বেটি লউ গাড়ি থেকে বেরিয়ে দৌড়ানোর চেষ্টা করেছিল, কিন্তু পেছন থেকে গুলির আঘাতে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছিল। ডেভিডকে গুলি করা হয়েছিল খুব কাছ থেকে, তার দেহ গাড়ির পাশেই পড়ে ছিল।

এই নৃশংস খুনের পেছনে থাকা মুখটি তখনো এক অজানা রহস্য। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি জোডিয়াক কিলারের প্রথম ভয়ঙ্কর অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত হয়। লেক হেরমান রোডে ঘটে যাওয়া এই ঘটনাই পরবর্তীতে এক রক্তাক্ত অধ্যায়ের সূচনা করেছিল। সেখানে জোডিয়াক নিজের ঠান্ডা মাথার পরিকল্পনা ও সাংকেতিক বার্তায় পুরো ক্যালিফোর্নিয়া এবং তার বাইরেও আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করেছিল।

জোডিয়াক কিলারের চাঞ্চল্যকর দ্বিতীয় হামলা 

জোডিয়াক কিলারের দ্বিতীয় শিকার ছিলেন ২২ বছরের তরুণী ডারলেন ফেরিন। সদ্য মা হওয়া ডারলেনকে ১৯৬৯ সালের ৪ জুলাই ভাল্লেজোর একটি পার্কিং লটে গুলি করে হত্যা করা হয়। কিন্তু এটি শুধুই একপেশে খুন নয়। ডারলেনের গাড়িতে বসা ১৯ বছরের মাইকেল ম্যাজেউ-ও আততায়ীর গুলিতে গুরুতর আহত হন। তবে মাইকেল অলৌকিকভাবে প্রাণে বেঁচে যান।

এই ঘটনায় আমেরিকাজুড়ে নতুন করে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। ডারলেনের নৃশংস মৃত্যু এবং মাইকেলের বেঁচে যাওয়ার ঘটনা মানুষের মনে আতঙ্ক এবং কৌতূহলের জন্ম দেয়। তখন থেকেই ক্রমাগত আলোচনা শুরু হয় এই অজ্ঞাত সিরিয়াল কিলারকে নিয়ে।

জোডিয়াক কিলারের উদ্দেশ্য এবং মনস্তত্ত্ব

ভাল্লেজোর পার্কিং লটের এই হামলা ছিল এমন এক ঘটনা, যা জোডিয়াক কিলারকে আমেরিকায় আরও কুখ্যাত করে তোলে। তার অপরাধ ছিল ঠান্ডা মাথার, সুপরিকল্পিত এবং বেপরোয়া। পুলিশ দিশেহারা হয়ে যায়, কারণ অপরাধীর পেছনে কোনো সাধারণ মোটিভ ছিল না।

দ্বিতীয় হামলার কিছুদিন পর, একাধিক স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে আততায়ীর পাঠানো চিঠি পৌঁছায়। চিঠিতে সে নিজেকে “জোডিয়াক” বলে পরিচয় দেয়। প্রতিটি চিঠির সঙ্গে থাকত একটি নির্দিষ্ট চিহ্ন। বৃত্তের মধ্যে ক্রস, যা হয়ে ওঠে তার পরিচয়ের প্রতীক।

চিঠিগুলো ছিল অত্যন্ত সাংকেতিক, এবং তার ভেতরে এমন সব বার্তা লুকানো ছিল যা তার নিজস্ব পরিচয় এবং মনস্তত্ত্ব প্রকাশ করত। প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের পর এই চিঠি ও সাংকেতিক বার্তা নতুন করে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করত। আর সেই সঙ্গে সৃষ্টি করত এক অমোঘ রহস্য, যা আজও অমীমাংসিত।

জোডিয়াক কিলার এবং তার কুখ্যাত সংকেত

১৯৬৯ সালের পহেলা অগস্ট; আমেরিকার সান ফ্রান্সিসকো ক্রনিকল, ভালেজো টাইমস-হেরাল্ড এবং সান ফ্রান্সিসকো এগজামিনার পায় তিনটি অদ্ভুত চিঠি। 

প্রত্যেকটি চিঠির সঙ্গে সংযুক্ত ছিল সাংকেতিক বার্তা। যার মধ্যে নাকি খুনির পরিচয় লুকানো। চিঠিতে লেখা ছিল, সে লেক হেরমান রোড এবং ব্লু রক স্প্রিংসে সংঘটিত খুনগুলির দায় স্বীকার করছে। আরও হুমকি দেওয়া হয়েছিল, এই চিঠিগুলি পত্রিকার প্রথম পাতায় প্রকাশিত না হলে সে রাতের বেলায় এক ডজন মানুষকে হত্যা করবে।

প্রথম চিঠিগুলো প্রকাশের পর সান ফ্রান্সিসকো জুড়ে এক অদ্ভুত আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় পুলিশ ও এফবিআই জোডিয়াকের খোঁজ শুরু করে। কিছুদিন পরেই ডোনাল্ড হার্ডেন নামক এক শিক্ষক এবং তার স্ত্রী জোডিয়াকের সাংকেতিক বার্তা ভেদ করেন। 

বার্তার অর্থ ছিল, “আমি মানুষ মারতে ভালোবাসি কারণ তা অত্যন্ত আনন্দদায়ক! বন্য পশু শিকারের থেকেও বেশি মজা। কারণ, মানুষই সবচেয়ে বিপজ্জনক প্রাণী।”

জোডিয়াক কিলারের কৌশল ছিল নিখুঁত এবং ঠান্ডা মাথার। সে প্রতিটি খুনের আগে সংবাদমাধ্যমে চিঠি লিখে নিজের পরিচয় দিয়ে খুনের বিবরণ দিত। ১৯৬৯ সালে তার চতুর্থ খুনে পল স্টাইন নামে এক ট্যাক্সিচালককে হত্যা করার পর জোডিয়াক খবরের কাগজে চিঠি লিখে জানায়, সে খুনটি করেছে। শুধু তাই নয়, প্রমাণ হিসেবে পাঠিয়েছিল পলের রক্তমাখা জামা। এই চিঠিতে সে একটি স্কুলবাসের চাকায় গুলি করার হুমকি দিয়েছিল, যাতে শিশুদের অপহরণ করে খুন করা যায়।

১৯৭৪ সালে শেষবারের মতো জোডিয়াক চিঠি পাঠায়। এরপর তার আর কোনো বার্তা পাওয়া যায়নি। যদিও তদন্ত বন্ধ হয়নি, তবে, খুনিকে আজও ধরা যায়নি। জোডিয়াক তার অপরাধের মধ্য দিয়ে শুধু মানুষকে খুন করেনি, বরং, আতঙ্ক এবং রহস্যের এক স্থায়ী অধ্যায় রচনা করে গেছে। তার সাংকেতিক বার্তা আর ঠান্ডা মাথার খুনের ধারা আজও রহস্যময় এবং বিভীষিকাময়।

পত্রিকায় জোডিয়াকের পাঠানো কোডগুলো

 

জোডিয়াক কিলারের রহস্যময় চিঠিগুলোর বিশ্লেষণ

জোডিয়াক কিলারের প্রতিটি চিঠিতে ছিল তার নিজস্ব পরিচয়ের প্রতীক। আর তা হলো একটি বৃত্তের মধ্যে ক্রস। এই প্রতীক যেন তার হত্যাকাণ্ডের এক চিহ্ন হয়ে উঠেছিল। তবে তার চিঠিগুলির সবচেয়ে আকর্ষণীয় এবং বিভ্রান্তিকর দিক ছিল সাংকেতিক বার্তা। এই বার্তাগুলো এতই জটিল এবং সূক্ষ্মভাবে তৈরি ছিল যে, সেগুলি ভেদ করতে গবেষকদের দশকের পর দশক লেগে যায়।

২০২০ সালে, প্রথম খুনের ৫২ বছর পর, একদল গবেষক দাবি করেন যে, তারা অবশেষে জোডিয়াকের সাংকেতিক বার্তার অর্থ উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছেন। 

বার্তার অর্থ ছিল- “আমাকে খুঁজে পেতে মজা পাচ্ছেন? আমি গ্যাস চেম্বারকে ভয় পাই না। বরং তা আমাকে স্বর্গের কাছাকাছি নিয়ে যাবে। আমি এই পৃথিবীতে একাধিক ক্রীতদাস রেখে যাব, যারা আমার জন্য কাজ করবে।”

তার সাংকেতিক বার্তাগুলোকে বোঝা ছিল অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। কোনো আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার না করেও, সংকেতগুলি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল যাতে তাদের অর্থ বোঝার জন্য বিশেষ পদ্ধতিতে ডিকোড করতে হয়। সংকেত চিহ্নগুলো কোনাকুনি, ওপর থেকে নিচে ও নিচ থেকে ওপরে পর্যায়ক্রমে বিশ্লেষণ করার পর তাদের অর্থ উদঘাটন সম্ভব হয়েছিল।

তবে, ডিকোড করা বার্তাগুলি শুধু জোডিয়াক কিলারের ধাঁধাই উন্মোচন করেনি, বরং আরও গভীর রহস্য তৈরি করেছে। এই সাংকেতিক ভাষা ১৯৫০ এর দশকের মার্কিন সেনাবাহিনীতে ব্যবহৃত এক বিশেষ সাংকেতিক পদ্ধতির সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। 

প্রশ্ন ওঠে, কিন্তু ‘জোডিয়াক কিলার’ সেই ভাষা জানল কী করে? সে কি তবে আমেরিকার সেনাবাহিনীর সদস্য ছিল? 

দ্য সান ফ্র্যান্সিস্কো ক্রোনিকলে পাঠানো খুনীর ১ম চিঠি

জোডিয়াক কিলার তদন্ত: প্রধান সন্দেহভাজন

আর্থার লেই অ্যালেন

কে ছিল এই জোডিয়াক কিলার? আজ পর্যন্ত নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারেনি কে ছিল জোডিয়াক। তবে পুলিশ অনেককেই সন্দেহ করেছে। তাদের মধ্যে অন্যতম আর্থার লেই অ্যালেন। 

আসলে অনেকের নামই উঠে এসেছিল প্রাথমিক ভাবে। এই ধরনের খুনের ক্ষেত্রে সেটা স্বাভাবিকও। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ধোপে টেকেনি বাকিদের নাম। থেকে গিয়েছেন একা আর্থার। কিন্তু কেন? 

প্রথমত, সে একজন দোষী সাব্যস্ত হওয়া শিশু যৌন নির্যাতনকারী। 

দ্বিতীয়ত, প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী জোডিয়াক কিলারের আদলের সঙ্গে তার আশ্চর্য সাদৃশ্য। 

আর্থার ১৯৯২ সালে মারা যায়। কিন্তু এরপর মেলে আরও একটা ‘ক্লু’। একটা জোডিয়াক ওয়াচ তথা রাশি চিহ্ন ওয়ালা ঘড়ি। অর্থাৎ, সেই ঘড়ির মধ্যে ছিল রাশিচক্রের ছবি। এরই পাশাপাশি জানা যায়, প্রায়ই নাকি বন্ধুবান্ধবদের কাছে জোডিয়াক কিলার নিয়ে মন্তব্য করত আর্থার। এই সব কিছু একত্র করে অনেকেরই মনে হয় আর্থারই আসলে জোডিয়াক কিলার। কিন্তু প্রমাণ মিলল কই? 

তার মৃত্যুর তিন দশক পরেও জটিলতা অব্যাহত। কেননা সংবাদপত্রে লেখা তার চিঠিগুলির মূল কপির ডিএনএ টেস্ট করা হয়েছিল। তা আর্থারের সঙ্গে মেলেনি। ফলে ‘অফিসিয়ালি’ তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা যায়নি। কিন্তু আজও এই মামলায় কুয়াশামাখা তার উপস্থিতি।

আর্থার লেই অ্যালেন

গ্যারি ফ্রান্সিস পোস্টে

২০২১ সালে আমেরিকার কোল্ড কেইস ইনভেস্টিগেশন টিম দাবি করে যে, তারা রহস্যময় সিরিয়াল কিলার জোডিয়াকের পরিচয় উদঘাটন করেছে। তাদের অনুসন্ধানে উঠে আসে গ্যারি ফ্রান্সিস পোস্টে নামের একজন ব্যক্তির নাম। এই ব্যক্তি ২০১৮ সালে ৮০ বছর বয়সে মারা যান। টিমের দাবি, পোস্টে ছিলেন জোডিয়াক কিলার, এবং তার বিরুদ্ধে তারা বেশ কিছু প্রমাণ সংগ্রহ করেছে।

কোল্ড কেইস ইনভেস্টিগেশন টিম জানায় যে, তারা ডিএনএ প্রমাণ পেয়েছে, যা গ্যারি ফ্রান্সিস পোস্টেকে জোডিয়াক কিলার হিসেবে শনাক্ত করে। এছাড়া তাদের দাবি অনুযায়ী, পোস্টে অন্তত ছয়জনের কাছে সরাসরি স্বীকার করেছিলেন যে তিনিই কুখ্যাত জোডিয়াক কিলার।

তবে, এফবিআই এই দাবিকে সরাসরি সমর্থন করেনি। তাদের মতে, জোডিয়াক কিলারের তদন্তে নতুন কোনো নিশ্চিত প্রমাণ তারা পায়নি। যদিও পোস্টের বিরুদ্ধে সন্দেহ প্রকাশিত হয়েছে, তবু এটি কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত বা নিশ্চিত পরীক্ষার মধ্যে দিয়ে প্রমাণিত হয়নি। 

গ্যারি ফ্রান্সিস পোস্টে একজন প্রাক্তন সৈনিক ছিলেন এবং তার জীবন সম্পর্কে আরও কিছু সন্দেহজনক তথ্য পাওয়া গেছে। এসব কিছুই তাকে এই মামলার সাথে জড়িয়ে ফেলে। টিমের দাবি মতে, পোস্টের অপরাধের ধরণ এবং জোডিয়াক কিলারের কর্মকাণ্ডের মধ্যে মিল পাওয়া যায়।

অনেক তদন্তকারী এবং অপরাধ বিশেষজ্ঞ মনে করেন, গ্যারি ফ্রান্সিস পোস্টে জোডিয়াক হতে পারেন, তবে তার বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই। এই দাবিগুলো জোডিয়াক কিলারের রহস্যকে আরও গভীর করেছে। 

এছাড়া আরও ডজন খানেকের উপরে মানুষকে সন্দেহ করা হয়েছে জোডিয়াক হিসাবে। তবে নিশ্চিত ভাবে কিছুই বের করা যায় নি। আজও কেউ জানে না যে, জোডিয়াক কিলার আসলে কে ছিল !

সান ফ্রান্সিস্কো পুলিশ ডিপার্টমেন্ট দ্বারা প্রকাশিত জোডিয়াকের ওয়ান্টেড পোস্টার

 

জোডিয়াক কিলারের প্রভাবিত জনপ্রিয় সংস্কৃতি

সান ফ্রান্সিসকো পুলিশের ‘ল’ এনফোর্সমেন্ট অফিসার ডেভ টোশির প্রায় গোটা জীবন ফুরিয়ে গিয়েছে এই রহস্যের সমাধান করতে করতে। কিন্তু হদিশ মেলেনি ‘জোডিয়ায়ক কিলার’ এর। 

২০০৭ সালে, জনপ্রিয় পরিচালক ডেভিড ফিঞ্চার এই অপরাধের কাহিনিকে চলচ্চিত্রে রুপ দেন, “জোডিয়াক” নামক মুভির মাধ্যমে। ছবিটি ছিল এক বিশাল থ্রিলার, যা সারা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। বাস্তবের মতোই ফিঞ্চারের ছবির শেষেও দেখা যায়, কোনও ভাবেই খুনিকে ধরা গেল না। এক হিসেবে দেখলে, ফিঞ্চারের ছবি শেষ হয়েছিল ‘অসমাপ্ত’ ভাবেই।

এমন কোনও ক্রাইম থ্রিলার মুভি প্রেমী পাওয়া যাবে না, যারা ‘দিস ইজ দ্য জোডিয়াক স্পিকিং’, দ্য জোডিয়াক, মিথ অফ দ্য জোডিয়াক কিলার, এ্যাওয়েকেনিং দ্য জোডিয়াক’ – নামগুলো শোনেনি। 

জোডিয়াক এতটাই কুখ্যাত হয়ে যায় অন্তত দু’জন কপি ক্যাট কিলার তাকে কপি করে খুন করে ধরা পড়ে! 

জোডিয়াক মুভির পোস্টার

সর্বোপরি, যদিও বহু বছর ধরে তদন্ত চালানো হয়েছে, এবং, বহু সন্দেহভাজনকে খতিয়ে দেখা হয়েছে। তবে, জোডিয়াক কিলারের পরিচয় একটি রহস্য হয়ে থেকেই গেছে, যা আজও বহু মানুষকে চিন্তিত করে রেখেছে। তার চিঠি, সাইফার এবং সৃষ্ট অপরাধের সাসপেন্স আজও আমেরিকার ইতিহাসের অন্যতম বড় কেস হয়ে আছে। হয়তো কখনোই আর জানা সম্ভব হবে না কে ছিলো জোডিয়াক বা সে আসলে কতগুলো খুন করেছিলো। হয়তো দুনিয়ার অসংখ্য অমীমাংসিত রহস্যগুলোর তালিকায় আরো একটি রহস্য হয়েই থেকে যাবে জোডিয়াক!

রেফারেন্স

Related posts

চিলির শয়তানের মন্দির – শয়তান যেখানে মুক্তির পথ

আবু সালেহ পিয়ার

এডগার অ্যালান পো-এর মৃত্যু রহস্য: দুর্ঘটনা, হত্যা নাকি ষড়যন্ত্র?

কামুক, শিশু ভক্ষণকারী ডাইনি ‘লিলিথ’

Leave a Comment

Table of Contents

    This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More