Image default
রহস্য রোমাঞ্চ

কামুক, শিশু ভক্ষণকারী ডাইনি ‘লিলিথ’

কোনো যুবক পুরুষের জন্য রাতের বেলায় ঘরে একা একা ঘুমানো নিষিদ্ধ। কারণ, লিলিথ তাকে ছলে বলে গ্রাস করবে। লিলিথ একলা পুরুষের বীর্যে নিজেকে গর্ভবতী করে আরো শয়তানের জন্ম দেবে- ব্যাবিলনীয় তালমুদে (শাবাত ৫)।  লিলিথ কামুক, লিলিথ শিশু ভক্ষণকারী ডাইনি। সে এক অশুভ আত্মার অধিকারী; রাতজাগা প্যাঁচার রূপে সে ঘুরে বেড়ায়। 

দেবী নাকি দানবী তিনি? নাকি তিনি রক্তমাংসেরই মানবী? উত্তর মেলে না। কাহিনি, কিংবদন্তি, লোকশ্রুতি ইত্যাদিতে আচ্ছন্ন হয়ে রয়েছেন তিনি। আজও তাঁকে নিয়ে বিভিন্ন বিতর্ক বিদ্যমান। কারও কাছে তিনি মূর্তিমতী অশুভ। আবার অনেকেই মনে করেন, তিনি নারী স্বাধীনতার প্রথম সৈনিক। তাঁর নাম লিলিথ। তাঁর খোঁজ পেতে গেলে পাড়ি দিতে হবে সুদূর অতীতে। সেই মেসোপটেমীয় বা ইহুদি পুরাণসমূহ রচনার কালে।

লিলিথের পরিচয় 

‘লিলিথ’, কি সুন্দর নাম! কিন্তু এই নামটি যে চরিত্রের জন্য বিখ্যাত, তাঁর বৈশিষ্ট্যের সৌন্দর্য্য নিয়ে আছে বিতর্ক। কে এই লিলিথ?

আদি পিতা আদমের প্রথম স্ত্রী লিলিথ 

শুনতে অবাক লাগলেও, এক অর্থে লিলিথই আমাদের আদি-মাতা। যদিও আধিপত্যবাদের করাল হস্তক্ষেপে চিরকালের জন্য সেই ইতিহাস আজ লুপ্তপ্রায়। ইহুদি কিংবদন্তি অনুসারে, লিলিথ প্রথম মানব আদমের প্রথম স্ত্রী। হিব্রু ‘বাইবেল’-এর ‘বুক অব ইসাইয়া’-য় তাঁর উল্লেখ রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ইভের আগে লিলিথই ছিলেন আদমের স্ত্রী। কিন্তু, আদমের আনুগত্য স্বীকার না করায় ঈশ্বর তাঁকে স্বর্গোদ্যান থেকে বিতাড়িত করেন।

লিলিথের সৃষ্টি

‘বাইবেল’-এর ‘জেনেসিস’ অধ্যায়ে লিখিত আছে যে, ঈশ্বর আদমের পাঁজর থেকে ইভকে তৈরি করেছিলেন। আর আদমকে তৈরি করেছিলেন মাটি দিয়ে। ইহুদি কিংবদন্তি জানায়, লিলিথকেও ঈশ্বর সেই মাটি দিয়েই তৈরি করেন, যা থেকে আদমকে তৈরি করা হয়ে ছিলো। অনেক কিংবদন্তি আবার এ কথাও বলে যে, লিলিথকে তৈরির সময়ে ঈশ্বর মাটির সঙ্গে কিছু ময়লাও মিশিয়ে দিয়েছিলেন।

ঈশ্বর লিলিথকে তৈরি করছেন

লিলিথের দানব সন্তান ও সাকুবাস-ইনকুবাস

ইহুদি পুরাণ অনুসারে লিলিথ এবং আদম আদমের যৌন মিলন থেকে অশুভ এবং অতিপ্রাকৃত সত্তা জন্ম নেয়। যাদের মধ্যে ইনকুবাস এবং সাকুবাস উল্লেখযোগ্য। ইনকুবাসরা ঘুমন্ত নারীদের সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করে। পুরাণে বিশ্বাস করা হয়, ইনকুবাস নারীদের ঘুমের মধ্যে আক্রমণ করে এবং তাদের শক্তি শোষণ করে। অন্যদিকে, সাকুবাস হচ্ছে নারী দানব। যারা ঘুমন্ত পুরুষদের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করে। 

সুমেরীয় পুরাণে লিলিথের অবতার

প্রাচীন সুমেরিয়ার ‘গিলগামেশ’ মহাকাব্যে লিলিথের উল্লেখ রয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্ন অবতারে। সেখানে লিলিথ প্রেম, যুদ্ধ, সৌন্দর্য, রাজনৈতিক ক্ষমতা, ন্যায়বিচার এবং যৌনতার দেবী ইনান্না বা ইসথারের সহচরী। 

লিলিথ এবং দেবী ইনান্না

লিলিথ মূলত একটি প্রাচীন মেসোপটেমীয় চরিত্র, দেবী ইনান্নার উপাসনার সাথে যার সম্পর্ক রয়েছে। দেবী ইনান্নার উপাসনায় যৌনতা ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সেখানে যৌনতার মাধ্যমে পবিত্রতার অনুশীলন এবং দেবী-দেবতার সাথে সম্পর্ক স্থাপন করা হত। 

লিলিথের সাথেও এই যৌনতা সম্পর্কিত উপাচারগুলির ধারণা প্রচলিত ছিল। যেখানে তাকে যৌনতার শিক্ষা প্রদানকারী হিসেবে দেখা হয়। অর্থাৎ, লিলিথ দেবী ইনান্নার সহযোগী বা সঙ্গী হিসাবে উপাসকদের যৌন মহোৎসব ও উপাচারের পদ্ধতিগুলোর শিক্ষা দেন।

লিলিথ ও দেবী ইনান্না

লিলিথের ইতিহাস: এক অভিশপ্ত নারীর কাহিনী

লিলিথের কাহিনী মূলত ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মধ্যে একটি জটিল এবং বিতর্কিত উপাখ্যান। তার নাম অনেকের কাছেই অজানা, অথচ তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। তার ইতিহাস বহুবিধ ধারায় বিবৃত হয়েছে। ইহুদি মিথোলজি, বিশেষ করে ‘জেনেসিস রাব্বাহ’ এবং ‘এলফাবেট অফ বেন সিরা’ তে লিলিথের কথা বিস্তারিতভাবে বলা হয়েছে। তার ভূমিকা এবং অবস্থান আজও অনেকের কাছে রহস্যময়।

লিলিথের প্রাচীন উৎস

লিলিথ পৃথিবীর সবচেয়ে পুরোনো অপদেবী। খ্রিষ্টের জন্মেরও তিন হাজার বছর আগে তার পূজা শুরু হয়। গিলগামেসের গল্পে তাকে “হৃদয়হরণকারী সকল ইন্দ্রিয় সুখের উৎস” হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিভিন্ন প্রাচীন ধর্মে তাকে “কিসকিলিলাকে” নামেও উল্লেখ করা হত।

আদমের সাথে সম্পর্ক

ইহুদিদের প্রাচীন ধর্মগ্রন্থ ‘দ্যা বুক অব জেনেসিস’ এ বলা ছিল- প্রথম মানবী ইভ নয়, ইভের আগেও আরেকজন নারী ছিলেন আদমের জীবনে। সৃষ্টিকর্তা আদমকে পৃথিবীর যে মাটি দিয়ে তৈরি করেছিলেন, তাকেও সেই একই মাটি দিয়ে একই সময়ে তৈরি করেছিলেন। ইভের মত আদমের শরীরের কোন অংশ থেকে তাকে তৈরি করা হয়নি। তিনি ছিলেন আদমের প্রথম স্ত্রী’ – লিলিথ। যাকে ‘রহস্যময় এবং বিদ্রোহী বলেও আখ্যায়িত করা হয়।

লিলিথের বিদ্রোহ

লিলিথ এবং অ্যাডাম সম্পর্ক শুরুতেই ছিলো দ্বন্দ্বময়। সৃষ্টির পরপরই লিলিথের সাথে অ্যাডামের দ্বন্দ্ব শুরু হয় মূলত যৌন সঙ্গমকে কেন্দ্র করে। নিজেকে শ্রেষ্ঠ দাবি করা অ্যাডাম লিলিথকে বোঝাতে চায় যৌন ক্রিয়ার সময় তার স্থান উপরে নয়, নীচে। মাটির একই অংশ থেকে উভয়ের সৃষ্টি হলেও, অ্যাডাম চেয়েছিলো লিলিথ তার অধীনে থাকুক। কিন্তু লিলিথ তার এই আধিপত্য মানতে অস্বীকার করে। লিলিথের বিশ্বাস ছিল, সে অ্যাডামের সমকক্ষ, এবং সেজন্য তার অধীনে থাকতে পারবে না। এই বিরোধের ফলে একসময় লিলিথ স্বর্গ ছেড়ে পৃথিবীতে চলে আসে।

লিলিথ এবং আদমের দ্বন্দ্ব

ফেরেশতাদের শাস্তির  হুমকি 

অ্যাডাম, লিলিথের বিদ্রোহে ভীষণ কষ্ট পায় এবং ঈশ্বরের কাছে অভিযোগ করে বসে। ঈশ্বর এই পরিস্থিতি শান্ত করতে এবং শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে তিনজন ফেরেশতা পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন। এই তিন ফেরেশতা হলেন সেনয়, সেনসেনয় এবং সেমানগেলফ, যারা ঈশ্বরের বার্তা নিয়ে পৃথিবীতে লিলিথকে খুঁজতে যান। 

ফেরেশতারা লিলিথকে বলেন, যদি সে ফিরে আসে এবং অ্যাডামের অধীনে শর্তসাপেক্ষে জীবনযাপন করতে রাজি হয়, তাহলে তাকে ক্ষমা করা হবে এবং তার শাস্তি প্রত্যাহার করা হবে। কিন্তু লিলিথ তাদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। 

লিলিথের অভিশাপ

লিলিথের এই অস্বীকৃতি ঈশ্বরের রোষে পড়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ফেরেশতারা লিলিথকে জানিয়ে দেন যে, তার শাস্তি হবে গুরুতর। তার সামনে প্রতিদিন ১০০ সন্তানের মৃত্যু হবে। এই অভিশাপ তার জীবনে এক ভয়ঙ্কর ও যন্ত্রণাদায়ক বাস্তবতা নিয়ে আসে। লিলিথের উপর এই অভিশাপটি তার নৃশংসতার প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়।

অভিশাপের পর, তাকে প্রতিদিন ১০০ সন্তানের মৃত্যু দেখতে বাধ্য করা হয় এবং একসময়ে সে হয়ে ওঠে পৃথিবীর এক বিভীষিকাময় প্রতীক। এই শাস্তির পরিণতি হিসেবে সে শিশুদের প্রতি তার প্রতিশোধমূলক আধিপত্য প্রকাশ করতে শুরু করে।

লিলিথের পরিণতি

লিলিথের শাস্তির পর, সে হয়ে যায় এক বিভীষিকার প্রতীক। তাকে মনে করা হয় এক অভিশপ্ত, ক্ষুধিত নারী, যে তার প্রতিশোধের জিঘাংসা চরিতার্থ করতে নারীদের অসহায়ত্বের সাহায্য নেন। আবার, বিভিন্ন সংস্কৃতিতে তাকে নারী স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। যার মধ্যে রয়েছে, তার শক্তি, আত্মসম্মান, এবং পুরুষদের প্রতি বিদ্রোহ।  

বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থে লিলিথের উল্লেখ 

ইসলাম ধর্মগ্রন্থে লিলিথ

ইসলাম ধর্মগ্রন্থ অনুযায়ী, সৃষ্টির আদিতে ছিলেন প্রথম মানব আদম (আঃ) এবং তারপর প্রথম মানবী হাওয়া (আঃ)। হাওয়াকে সৃষ্টিকর্তা তৈরি করেছিলেন আদমের পাঁজরের একটি হাড় থেকে। খ্রিস্টানদের ধর্মগ্রন্থও একই কথা বলে। শুধু আদমকে তারা বলেছেন, ‘অ্যাডাম’ এবং হাওয়াকে বলেছেন ‘ইভ’। 

ধারাবহিকতা, ক্রমানুসারে মৌলিকত্ব এবং রুপান্তর এসব কারণে ধর্মগ্রন্থগুলোর মধ্যে মিল এবং অমিল দুটোই উপস্থিত। তবে, কোরআন শরিফ সবার শেষে নাজিল হওয়ায় এটা হচ্ছে আসমানী ধর্মগ্রন্থের সর্বশেষ রূপ। আদম এবং হাওয়ার ব্যাপারে কিন্তু ইহুদিরাও দ্বিমত পোষণ করেন না, বরং সেখানে এর সাথে যোগ করা ছিল আরও বেশি কিছু। কিন্তু কোরআনে এই প্রসঙ্গে তেমন কিছু আলোচনা করা হয়নি।

ইহুদি ধর্মগ্রন্থে লিলিথ

লিলিথের উল্লেখ ইহুদি ধর্মগ্রন্থ তালমুদ এবং তাওরাতে পাওয়া যায়, যেখানে তাকে নিষিদ্ধ এবং বিপজ্জনক দেবী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। “এনলিলের স্ত্রী লিলিথ” নামের এক ধরনের সতর্কবাণীও সেখানে শোনা যায়।

ডেড সি স্ক্রল থেকে লিলিথের পরিচিতি

ডেড সি স্ক্রল হলো প্রাচীন বাইবেলের অন্যতম একটি সংস্করণ। সেখানে লিলিথের চরিত্র সম্পর্কে আরো বিস্তারিত কিছু তথ্য রয়েছে। এতে বলা হয়, 

“লিলিথের মন্দিরের প্রবেশদ্বার হলো নিশ্চিত মৃত্যুর প্রবেশদ্বার, এবং যারা তার পূজা করেন, তাদের স্থান হবে নরকের শেষ ধাপে।”

ডেড সি স্ক্রল

লিলিথের মূর্তির আবিষ্কার ও প্রতীকী অর্থ

প্রায় দেড়শো বছর আগে, বাগদাদের কাছে একটি প্রাচীন মন্দিরের ধ্বংসাবশেষের মধ্যে লিলিথের একটি দুর্লভ মূর্তি আবিষ্কৃত হয়। মূর্তিটি লিলিথের পূজা ও তার প্রতীকী অর্থ সম্পর্কে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে। মূর্তির পায়ের কাছে প্রাচীন কিউনির্ফম লিপিতে লেখা ছিল,  

“রাতের রাণী লিলিথ তার বোন এরেশকিগালকে নিয়ে ব্যাবিলনের সমস্ত বেশ্যালয় নিয়ন্ত্রণ করে।”

এ থেকে ধারণা করা হয়, লিলিথ এবং তার বোন এরেশকিগাল ব্যাবিলনের যৌন অঙ্গন এবং বেশ্যালয়গুলোর নিয়ন্ত্রক ছিলেন। 

লিলিথের মূর্তি

মূর্তিটিতে আরো দেখা যায়, লিলিথের মূর্তিতে একটি মোটা সাপ তার শরীরের সাথে জড়ানো এবং সাপের মাথা তার ডান কাঁধে ঝুলে আছে। এই চিত্রের মধ্যে গভীর প্রতীকী অর্থ পরিলক্ষিত হয়। সাপ প্রাচীন যুগের অনেক সংস্কৃতিতে শয়তানি, প্রলোভন, এবং বিপদজনক শক্তির প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। সাপের মধ্যে লুকানো বিষাক্ততা, ষড়যন্ত্র এবং বিপথগামী শক্তির সাথে লিলিথের চরিত্র পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ।

লিলিথের পূজা যতটা সহজ ততই বিপজ্জনক

লিলিথের পূজা ছিল সহজ, তবে অত্যন্ত বিপজ্জনক। সন্ধ্যার সময়, লিলিথের মূর্তির দু’দিকে দু’টি মোমবাতি জ্বালালে তাকে পূজারি হিসেবে গ্রহণ করা হতো। এই পূজায় পূজারি সৎ ও নিষ্ঠাবান হওয়ার পরিবর্তে এক ধরনের অশুভ শক্তির সাথে যুক্ত থাকতো। 

তবে, যত সহজ ছিল পূজা, ততই বিপজ্জনক ছিল তার প্রভাব। লিলিথের পূজারী প্রায়শই অসতর্ক হলে, তাদের জীবন বিপদগ্রস্ত হতে পারত। লিলিথের পূজা সংক্রান্ত ধর্মীয় আচরণগুলোর মধ্যে থাকতো নানা ধরনের নিষিদ্ধ কাজ, যেমন বিকৃত যৌনাচার।

লিলিথের পূজার রীতি

এ কারণে, বিভিন্ন ধর্মীয় গুরু এবং সম্প্রদায়গুলো দীর্ঘকাল ধরে লিলিথের মূর্তি ধ্বংস করে আসছে। তারা বিশ্বাস করতেন যে, এটি এক ধরনের অশুভ শক্তির উৎস। ধর্মীয় নেতারা লিলিথকে বিপজ্জনক শক্তি হিসেবে দেখতেন এবং তার পূজা ও মূর্তি সম্পর্কে জনগণকে সতর্ক করতেন।

লিলিথ যখন নারী অধিকারের প্রতীক

লিলিথকে কেন্দ্র করে কয়েকটি প্রতীক সমাজে প্রচলিত আছে। যদিও প্রতীকগুলো শয়তানের চিহ্ন হিসেবেই স্বীকৃতি পেয়ে আসছে বহুকাল থেকে। কারণ, প্রাচীনকাল থেকেই লিলিথ যেহেতু শয়তানের চরিত্র হিসেবে স্বীকৃতি পেয়ে আসছে সেহেতু এই প্রতীকগুলোও পবিত্রতার নয়, বরং, অশুভ প্রতীক হিসেবেই বিবেচনা করা হয়। ধর্মে কিংবা সমাজে ‘নারী’কে শয়তান কিংবা নারী শয়তানের সঙ্গী’ এসব ধারণা হাজার বছরের ধরে বিভিন্ন গল্পে বিভিন্ন মিথের মাধ্যমে একস্থান হতে আরেক স্থানে ছড়িয়ে পড়েছে।

নারী পুরুষের সমান অধিকার চাইলেই নারী’র উপর শয়তান ভর করেছে কিংবা সে শয়তান হয়ে উঠছে বলে অপবাদ দেওয়া হয়। ইউরোপে অসংখ্য নারী’কে পিশাচ হিসেবে অপবাদ দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। আমাদের সমাজেও নারী’কে শয়তানের সহযোগী কিংবা নারী খারাপ কাজ করতে উৎসাহিত করে এমন ধারণা আছে। পুরুষ তান্ত্রিক সমাজের ঈশ্বরও একজন পুরুষতান্ত্রিক খোদা। ফলে তিনিও নারী’কে পুরুষের মতন সমঅধিকার দিতে নারাজ। আজকে আমাদের সমাজের নারী’রা যে সমঅধিকারের দাবী তোলে, ধর্মীয় গ্রন্থ অনুসারে সেই দাবী সর্বপ্রথম তোলেন সৃষ্টির প্রথম নারী, লিলিথ।

সাহিত্যে লিলিথ

ইহুদী মিথলজিতে লিলিথকে একদিক থেকে যেমন দেখানো হয়েছে অন্ধকারের প্রতিরূপ হিসাবে, আরেক দিকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে তার এক বিদ্রোহী রূপ। লিলিথকে যেভাবেই প্রকাশ করা হোক না কেন, সাহিত্যিকদের চোখে লিলিথ বরাবরই এক আকর্ষণীয়া নারী চরিত্রেই প্রতীয়মান হয়েছে। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন শিল্পীর কল্পনা থেকে আঁকা লিলিথ দেখলেই তা বোঝা যায়। এমনকি লিলিথের উপাখ্যান নিয়ে রচিত হয়েছে সনেট! দান্তে গ্যাব্রিয়েল রোসেতি নামক এক ব্রিটিশ কবি ও চিত্রশিল্পী নিজের কল্পনা থেকে এঁকেছেন লিলিথকে। সেই সাথে ‘লিলিথ’ নামে এক সনেটে বর্ণনা করেছেন তার কল্পনার লিলিথকে-

Of Adam’s first wife, Lilith, it is told

(The witch he loved before the gift of Eve,)

That, ere the snake’s, her sweet tongue could deceive,

And her enchanted hair was the first gold.

লিলিথের চরিত্র নিরীক্ষণ নির্ভর করে দৃষ্টিভঙ্গির উপর। ইহুদী সাহিত্যিক রুথ ফেল্ডম্যানের ‘Lilith’ সবচেয়ে সুন্দর করে লিলিথের রূপটি প্রকাশ করেছে- 

 “Half of me is beautiful,

But you were never sure which half”

উপসংহার 

মানুষ যেন লিলিথের গল্প বলে শেষ করতে পারছেন না। সেই প্রাচীন কাল থেকে ঘুরে ফিরে লিলিথের যতগুলো রূপ চালু রয়েছে সেখানে লিলিথ সবসময়ই রহস্যময় একজন নারী। কখনো পিশাচী, কখনো বিদ্রোহী স্ত্রী, ছলনাময়ী এবং আরো কত কি। লিলিথের যতগুলো রূপ রয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী রূপ হচ্ছে, মাথা অবনত না করার রূপ। লিলিথ আদমের অধীনতাকে অস্বীকার করেছিলেন কারণ যুক্তিতে তিনি আদমের সমান সমান। আত্মমর্যাদা রক্ষা করতে লিলিথ যেন চিরকালের জন্য সেচ্ছা নির্বাসন নিয়েছেন।

এই রহস্যময় নারী যেন মানব সভ্যতার সাথে সাথে হেঁটে চলেছেন অনন্তকাল ধরে, আর আহত হয়ে দেখছেন পৃথিবীর মানুষ কে কি বলছে তার সম্বন্ধে!  আধুনিক সময়ে এসে অনেকে লিলিথকে বিবেচনা করতে শুরু করেছেন নারী স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে। অর্থাৎ লিলিথ সাম্যতায় বিশ্বাস করতেন। বৈষম্যের প্রতিবাদ করতে গিয়েই তিনি হলেন বিদ্রোহী। অন্ধকারে নির্বাসিত জীবন যাপনের কারণেই তিনি হলেন রহস্যময়ী।

 

রেফারেন্স 

https://www.anandabazar.com/photogallery/meet-lilith-the-first-wife-of-adam-dgtl-photogallery/cid/1353449

https://archive.roar.media/bangla/main/art-culture/lilith-a-terrifying-beauty-of-jewish-mythology

https://www.banglatribune.com/literature/articles/147059/%E0%A6%B2%E0%A6%BF%E0%A6%B2%E0%A6%BF%E0%A6%A5-%E0%A6%86%E0%A6%A6%E0%A6%BF-%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%A4%E0%A6%BE-%E0%A6%93-%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%A5%E0%A6%AE-%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%A6%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A7%8B%E0%A6%B9%E0%A7%80

https://m.somewhereinblog.net/mobile/blog/bidrohy/30152971

Related posts

পৃথিবীর প্রথম ভিডিও গেমের গল্প

ম্যান্ডেলা ইফেক্ট – প্যারালাল ইউনিভার্সের প্রমাণ নাকি মস্তিষ্কের ধোঁকা

ইসরাত জাহান ইরা

ভৌতিক গ্রাম কুলধারা: বাস্তবতা নাকি নিছক গল্প!

Leave a Comment

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More