হ্যারি পটার মুভির কুইডিচ ম্যাচ এর কথা মনে আছে? সেটি পুরোপুরি কাল্পনিক খেলা হলেও, জেনে অবাক হবেন যে বাস্তবেও এমন একটি খেলা রয়েছে, যে খেলাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে একটি পুরো সভ্যতা
মধ্য আমেরিকার অন্যতম প্রাচীন ও সমৃদ্ধ সভ্যতা হলো মায়া সভ্যতা। তাদের সমাজব্যবস্থা, ধর্ম, স্থাপত্য, বিজ্ঞান, এবং রাজনীতি সময়ের তুলনায় ছিল বেশ উন্নত। তবে খুব কম মানুষ জানে যে, মায়া সভ্যতার বিকাশে একটি বিশেষ খেলার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। সেই খেলার নাম “পোক-তা-পোক” (Pok-Ta-Pok)।
আপনি নিশ্চয়ই ভাবছেন যে,কিভাবে একটি খেলা, একটি সম্পূর্ণ সভ্যতাকে গড়ে উঠতে সাহায্য করে? তাহলে চলুন আজকে সেই ইতিহাসটা জেনে আসি।
মায়া সভ্যতার বল গেমের ইতিহাস
মায়ান বলগেমের ইতিহাস ৩,০০০ বছরেরও বেশি পুরোনো। মায়া সভ্যতা (প্রায় ২০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ – ১৬৯৭ খ্রিস্টাব্দ) মধ্য আমেরিকার অন্যতম সমৃদ্ধ ও উন্নত সভ্যতা হিসেবে বিবেচিত হতো। ধর্ম, জ্যোতির্বিজ্ঞান, স্থাপত্য এবং ভাষার পাশাপাশি খেলাধুলাও তাদের সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। তাদের সবচেয়ে বিখ্যাত খেলা ছিল পোক-তা-পোক, যা একটি ঐতিহ্যবাহী বল গেম।
পোক-তা-পোক খেলার উৎপত্তি
পোক-তা-পোক (Pok-Ta-Pok) ছিল মেসোআমেরিকার অন্যতম প্রাচীন বল খেলা। এই খেলার শিকড় প্রায় ১৪০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের ওলমেক সভ্যতার সময়ে পাওয়া যায়। ধারণা করা হয়, সেখানেই প্রথম এই ধরনের বল খেলার উদ্ভূত হয়েছিল। যদিও ওলমেকরা এই খেলার সূচনা করেছিল, তবে এটি মায়া সভ্যতায় সর্বাধিক বিকাশ লাভ করে। মূলত, সেই সময়েই এই খেলা বিশেষ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব অর্জন করে।
খেলার নিয়ম
হ্যারি পটার এবং চেম্বার অফ সিক্রেটস মুভির কুইডিচ ম্যাচ এর কথা মনে আছে? সেই উত্তেজনাপূর্ণ খেলাটা ছিল পুরোপুরি কাল্পনিক। কিন্তু মায়া সভ্যতার পোক-তা-পোক খেলার সঙ্গে এর অনেক মিল আছে! যদিও এখানে জাদুর ঝাড়ু ছিল না, তবুও খেলাটি ছিল ঠিক ততটাই চ্যালেঞ্জিং আর রোমাঞ্চকর।
খেলোয়াড়দের সংখ্যা ও দল
পোক-তা-পোক খেলা সাধারণত দু’টি দলের মধ্যে খেলা হত। প্রতিটি দলে থাকত ২ থেকে ৫ জন। তবে কখনো কখনো আরও বেশি খেলোয়াড় নিয়েও খেলা হতো।
বল ও খেলার কোর্ট
এই খেলাটি মূলত বিশেষভাবে নির্মিত “বল কোর্ট” বা পেলোটে ড্রোম (Pelote Drome)-এ খেলা হত। কোর্টগুলো ছিল আয়তাকার আকৃতির এবং এর দুপাশে ছিল উঁচু দেওয়াল, যা বলকে মাঠের বাইরে যাওয়া থেকে রোধ করত। কিছু কোর্টে পাথরের তৈরি রিং (হুপ) থাকত। যেটার মধ্যে দিয়ে বল ফেলা হতো।
খেলায় ব্যবহৃত বলটি ছিল রাবারের তৈরি, যার ওজন ছিল প্রায় ৩-৪ কেজি। বুঝাই যাচ্ছে, বলটি বেশ ভারী ও শক্ত হত। তাই খেলোয়াড়দের জন্য এটাকে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ ছিল না।
খেলার নিয়ম
পোক-তা-পোক খেলার মজার বিষয় হল, খেলোয়াড়রা হাত দিয়ে বল ধরতেই পারত না! শুধু কাঁধ, কোমর, হাঁটু আর কনুই দিয়ে বলটিকে আঘাত করতে হতো। ভাবতে পারছেন, কতটা কঠিন? তার ওপর, বলটির ওজনের কারণে এটিকে ঠিকমতো নিয়ন্ত্রণ করাও বিশাল বড় চ্যালেঞ্জ।
খেলার মূল ব্যাপার ছিল বলটাকে বাতাসে ভাসিয়ে রাখা আর প্রতিপক্ষের কোর্টে পাঠানো। কেউ যদি বল মাটিতে ফেলে দিত, তাহলে প্রতিপক্ষ সুবিধা পেত। কিন্তু সবচেয়ে কঠিন কাজ ছিল বলটাকে দেয়ালের পাথরের রিংয়ের ভেতর দিয়ে পাঠানো। যেটা করতে পারলেই, খেলা শেষ—সরাসরি জয়!
খেলার ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক গুরুত্ব- পরাজয়ের অর্থ বলি
মায়া বলগেম শুধুমাত্র একটি বিনোদনমূলক খেলা ছিল না, বরং, এটি তাদের ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক বিশ্বাসের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিল। মায়ারা বিশ্বাস করতেন যে, এই খেলার মাধ্যমে আলো এবং অন্ধকারের শক্তির লড়াই প্রকাশ পায় এবং এটি জীবনের চক্র—যেমন জন্ম, মৃত্যু এবং পুনর্জন্মের প্রতীকও বটে!
মায়া ধর্মগ্রন্থ “পোপোল ভুহ” অনুযায়ী, মায়া বলগেম ছিল আধ্যাত্মিক জগতের একটি প্রতিনিধিত্ব। খেলার সঙ্গে পোপোল ভুহের যমজ ভাইদের কাহিনি জড়িত, যেখানে তারা ভূগর্ভস্থ দেবতাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল। মায়ারা বিশ্বাস করতেন যে, দেবতারা এই খেলায় অংশ নিতেন। তাই রাজা ও পুরোহিতরাও প্রায়ই এই খেলায় অংশ নিতেন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল শুভ শক্তির আহ্বান এবং দেবতাদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা।
তবে, এটি শুধুমাত্র একটি প্রতিযোগিতা ছিল না। অনেক সময় এই খেলা জীবন-মরণের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াত। কিছু খেলায়, বিজয়ী বা পরাজিত দলকে বলি দেওয়া হতো, যা দেবতাদের প্রতি শ্রদ্ধা ও তাদের আশীর্বাদ লাভের একটি উপায় হিসেবে দেখা হতো।
পোক-তা-পোক: রাজনৈতিক গুরুত্ব
মায়াদের জন্য পোক-তা-পোক খেলা ছিল এক ধরনের শান্তিপূর্ণ যুদ্ধ! রাজা এবং শাসকরা প্রায়ই এই খেলাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতেন। অনেক সময় দুটি শহরের মধ্যে বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য যুদ্ধের পরিবর্তে এই খেলাই সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো। যে দল জিতত, তারা নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারত এবং অন্য শহর তাদের শাসন মেনে নিত।
মায়ান খেলার সামাজিক সংহতি ও শ্রেণীবিন্যাস
পোক-তা-পোক খেলা ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক কর্মকাণ্ড, যা সমাজের বিভিন্ন স্তরের মধ্যে সংহতি এবং শ্রেণীবিন্যাসের প্রতীক হিসেবে কাজ করত। মনে হতে পারে, এই খেলা শুধু অভিজাতদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
তা কিন্তু নয়, এটি সাধারণ জনগণের মধ্যেও ছিল জনপ্রিয়। ধর্মীয় উৎসব বা অন্যান্য সামাজিক অনুষ্ঠানে সাধারণ মানুষও এই খেলার সাক্ষী হতো। তবে, খেলোয়াড়রা সাধারণত অভিজাত শ্রেণির অংশই হতেন। কার,ণ পোক-তো-পোক খেলা ছিল একটা কৌশল, দক্ষতা আর শারীরিক সক্ষমতার খেলা। তাই শাসক শ্রেণী আর ধর্মীয় নেতারা এতে বেশি অংশ নিতেন। তারা এই খেলার মাধ্যমে নিজেদের ক্ষমতা, মর্যাদা আর সামাজিক অবস্থান প্রকাশ করতেন। তাছাড়াও তারা নিজেদের নেতৃত্ব আর দক্ষতার প্রদর্শনও সুযোগ পেতো ।
পোক-তা-পোক খেলার অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত প্রভাব
রাবার উৎপাদন ও ব্যবহার
একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে, মায়া সভ্যতা ছিল মধ্য আমেরিকায় রাবার ব্যবহার করা প্রথম জাতিগুলোর মধ্যে অন্যতম। পোক-তা-পোক খেলার বল ছিল রাবার দিয়ে তৈরি। আর এই রাবার ছিল মায়া সভ্যতার একটি বড় আবিষ্কার। মায়ারা এক ধরনের বিশেষ পদ্ধতি ব্যবহার করে রাবার তৈরি করত। তবে রাবার শুধু খেলার কাজে ব্যবহৃত হতো না, এটা তাদের অর্থনীতি, বিশেষ করে বাণিজ্য এবং নির্মাণের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত।
স্থাপত্য ও নগর পরিকল্পনা
পোক-তা-পোক খেলার জন্য মায়ারা বিশেষ ধরনের কোর্ট বানাত, যা ছিল তাদের নগর পরিকল্পনার খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা অংশ। চিচেন ইৎজা, কোপান, টিকালসহ অনেক মায়া নগরে বিশাল আকারের বল কোর্ট পাওয়া গেছে, যা মায়াদের স্থাপত্যশৈলী আর নগর পরিকল্পনার নৈপূন্যতা প্রদর্শন করে। এই কোর্টগুলো শুধু খেলার জন্যই ছিল না, বরং এক ধরনের সামাজিক আর ধর্মীয় কেন্দ্র হিসেবেও কাজ করত।
এছাড়া, খেলার মাধ্যমে বিভিন্ন অঞ্চল নিজেদের ক্ষমতা প্রদর্শন করত, যা বাণিজ্যের প্রসারেও সাহায্য করেছিল।
সামরিক প্রশিক্ষণ ও শারীরিক সক্ষমতা
মায়ারা যুদ্ধবাজ জাতি হিসেবে পরিচিত ছিল। তাদের সৈন্যদের শারীরিকভাবে শক্তিশালী এবং চটপটে হতে হতো। আর পোক-তা-পোক খেলা ছিল তাদের শারীরিক সক্ষমতা আর দক্ষতা বাড়ানোর এক দারুণ উপায়। এই খেলা খেলোয়াড়দের দ্রুততা, সহনশীলতা, কৌশল এবং শারীরিক শক্তি বাড়াতে সাহায্য করত, যা তাদের যুদ্ধের প্রস্তুতির জন্য খুবই কার্যকর ছিল। এমনও বলা হতো, এই খেলার জন্য যে ধরনের শারীরিক পরিশ্রম এবং মনোযোগ প্রয়োজন, তেমনই এই গুণ যুদ্ধের সময়ও প্রয়োজন।
যদিও প্রাচীন এই বল খেলার জটিল নিয়ম হয়তো আপনাকে বিস্মিত করবে। তবে এটা স্পষ্ট যে, এই বল খেলা ছিল মেসোআমেরিকান সমাজের জন্য তাদের সভ্যতার বিকাশের মূল মেরুদণ্ড। ধর্মীয় আচার থেকে শুরু করে রাজনীতি, অর্থনীতি এবং সংস্কৃতির প্রতিটি স্তরে এই খেলা গভীর প্রভাব ফেলেছিল।