শাহজাহানের সময় দিল্লির ‘লাল কেল্লা’ ছিল সাদা রঙের!
লাল কেল্লা নাকি আদৌ লাল ছিল না, ছিল ধবধবে সাদা। ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিকদের এক গবেষণা হতে জানা যায় যে, কেল্লার দালানের বিভিন্ন অংশে ব্যবহার করা হয়েছিল চুনাপাথর। তাই এর প্রকৃত রঙ ছিল শ্বেতবর্ণ। কিন্তু, আবহাওয়া, জলবাযু ও দূষণের প্রভাবে একসময় এই শুভ্রতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। এর উজ্জ্বলতা মলিন হতে থাকায় ইংরেজরা দুর্গের দেয়ালে লাল রং করে দেয়। উঁচু লাল দেয়ালে ঘিরে থাকা কেল্লাটির রঙই দিনে দিনে মানুষের মুখে মুখে ফিরতে থাকে। আর, ইংরেজরাও দুর্গটিকে ‘রেড ফোর্ট’ নামে ডাকতে শুরু করে।
লাল কেল্লার ইতিহাস
তাজমহল যেমন ভালোবাসার সাক্ষী, তেমন লালকেল্লা হলো ভারতের পরাধীনতা ও স্বাধীনতার সাক্ষী। ভারতের মুঘল সাম্রাজ্যের স্বর্ণ যুগ থেকে ইংরেজদের ভারত দখল। আবার, ইংরেজদের হাত থেকে ভারতবর্ষের স্বাধীনতার দীর্ঘ ইতিহাসের সাক্ষী ছিলো এ লাল কেল্লা।
মুঘল সম্রাট শাহজাহান তৈরি করেছিলেন এ বিশাল কেল্লা। তবে, এ কেল্লা নির্মানের কিছুদিন পরেই তিনি বন্দি হয়েছিলেন নিজের ছেলে আওরঙ্গজেবের হাতে। আবার, শেষ মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরকেও এ কেল্লায় বন্দি করে অত্যাচার করছিলো বৃটিশরা।
কহিনূর হীরা, বহুমূল্য ময়ূর সিংহাসন এবং প্রচুর ধনরত্নে পরিপূর্ণ ছিলো এ কেল্লা। তবে সেসব আজ অতীত। প্রশ্ন হলো আগ্রাতে একটি দূর্গ থাকা সত্ত্বেও শাহজাহান কেন দিল্লিতে এ লাল কেল্লা নির্মাণ করেছিলেন! কি এই লাল কেল্লার ইতিহাস! জানতে হলে ঘাটতে হবে অতীতের লালকেল্লার রহস্যঘেরা ইতিহাস।
লাল কেল্লা নির্মাণ
মোঘল সম্রাট শাহজাহান নিজে এই কেল্লার নাম দিয়েছিলেন কিলা-ই-মুবারক। সম্রাট শাহজাহান একটি বিশেষ কারণে এ কেল্লা তৈরি করেছিলেন। কারণটি হলো, তিনি মোঘল সাম্রাজ্যের রাজধানী আগ্রা থেকে দিল্লিতে নিয়ে আসতে চেয়েছিলেন। আকবরের সময়কালে মোঘলদের রাজধানী ছিলো আগ্রা। আকবর দিল্লি পছন্দ করতেন না। কারণ, দিল্লিতে শেরশাহ সুরির সাথে যুদ্ধে তার পিতা হুমায়ুন পরাজিত হয়েছিলেন। দিল্লি শহর তার পিতার পরাজয়কে মনে করিয়ে দিতো।
কিন্তু, শাহজাহান আগ্রার অতিরিক্ত গরমের কারণে বিরক্ত হয়ে উঠেছিলেন। তাই, তিনি মোঘলদের রাজধানী আগ্রা থেকে দিল্লিতে নিয়ে আসার কথা ভাবেন এবং তার সিদ্ধান্তেই রাজধানী দিল্লিতে স্থানান্তরিত করা হয়। এই সিদ্ধান্ত ঘোষণার পরেই শাহজাহান দিল্লিতে শাহজাহানাবাদ নামের একটি শহর তৈরি করেন। আর, এ শহরের মাঝেই লাল কেল্লার নির্মাণ শুরু হয়।
১৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে শাহজাহান লাল কেল্লা তৈরির হুকুম দেন এবং ১০ বছর পর ১৬৪৮ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন শাহজাহানাবাদে লাল কেল্লার নির্মাণ কাজ শেষ হয়। যখন শাহজাহানাবাদে(বর্তমানে পুরনো দিল্লি), লাল কেল্লার নির্মাণ কাজ শেষ হয়, সেই সময় সম্রাট শাহজাহান আফগানিস্তানের কাবুলে ছিলেন। নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার খবর পেলে, তিনি লাল কেল্লা দেখার জন্য তড়ি ঘড়ি করে দিল্লি ফেরত আসেন।
লাল কেল্লার সর্বশেষ উত্তরাধিকারী
শেষ মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর এই কেল্লার সর্বশেষ উত্তরাধিকারী ছিলেন। ইংরেজদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করার অপরাধে বাহাদুর শাহ জাফরকে দোষী সাব্যস্ত করে তাকে নির্বাসিত করা হয়। বাদশাহ জাফরকে ইংরেজরা হিন্দুস্তান থেকে তাড়িয়ে রেঙ্গুনে পাঠিয়ে দিয়েছিলো এবং রেঙ্গুনেই তিনি নিজের শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন। রেঙ্গুনে থাকার সময় বাহাদুর শাহ জাফর তার একটি লেখায় লেখেন- “এ জাফর তোর ভাগ্য এতটাই খারাপ যে, নিজের রাজ্যে কবর পাওয়ার জন্য দু’ গজ জমিটুকুও তুই পেলিনা।”
পরবর্তীতে ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনী লাল কেল্লা অধিকার করে নেয় এবং কেল্লার একটি অংশে ক্যান্টনমেন্ট হিসেবে ব্যবহার করতে থাকে। ১৯৪৫ সালে আজাদ হিন্দ ফৌজের স্বাধীনতা আন্দোলন ব্যর্থ হওয়ার পর লাল কেল্লাতেই যুদ্ধবন্দীদের বিচার হয়।
ইংরেজদের হাতে লাল কেল্লা
লাল কেল্লার অধিকার নেয়ার পর ব্রিটিশরা এই কেল্লায় নির্বিচারে লুণ্ঠন চালায়। বিলাসবহুল, দামী ফার্নিচার, তৈজসপত্র, মূল্যবান মণি-মাণিক্য, অলঙ্কার, নগদ অর্থ লুট করে নিয়ে যায় ব্রিটিশরা। কেল্লার অনেক স্থাপনা ভেঙে ফেলা হয়। তবে, ভাইসরয় লর্ড কার্জনের নির্দেশে ১৮৯৯-১৯০৫ সালের দিকে কেল্লার সীমানা প্রাচীর, বাগান এবং পানি সরবরাহ ব্যবস্থা পুনরায় চালু করা হয়।
লাল কেল্লা দখল করার পর সেটিকে এক প্রকার ধ্বংসই করে ফেলে ব্রিটিশ সেনারা। দামী জিনিসপত্র ভেঙে সেগুলো থেকে রত্ন ও মূল্যবান ধাতু খুবলে নেয় তারা। প্রচুর দামি জিনিস বিক্রি করে দেওয়া হয়। এক সময় যে কেল্লায় সারা ভারতের ভাগ্য নির্ধারিত হত সেই কেল্লাকে একরকম শেষ করে দেয় ব্রিটিশরা।
ইংরেজরা লাল কেল্লার অনেক ভবন ভেঙ্গে নিজেদের প্রয়োজন মতো ঘর এবং ফাঁকা জায়গা বানিয়ে নিয়েছিলো। ইংরেজদের বানানো এসব স্থাপত্য ভিক্টোরিয়ান আর্কিটেকচারের উদাহরণ। লাল কেল্লার ভেতরের স্থাপত্যেগুলোতে মোঘল আর ভিক্টোরিয়ান আর্কিটেকচারের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়।
বর্তমান সময়ে লাল কেল্লা
১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীনতা পাওয়ার পর থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত লাল কেল্লা ভারতীয় সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল। বর্তমানে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া এই কেল্লা রক্ষণাবেক্ষণের সার্বিক দায়িত্বে রয়েছে।
এই কেল্লা ভারতের সার্বভৌমত্বের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। দেশ স্বাধীনের পর ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু স্বাধীনতা দিবসে লাল কেল্লার মূল ফটকের উপরে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ প্রদান করেন। সেই থেকে এখন পর্যন্ত এই রেওয়াজ চালু আছে।
লাল কেল্লা ভ্রমণে যা দেখবেন
লাল কেল্লার নির্মাণশৈলী সত্যিই অবাক করার মতো। কেল্লার অভ্যন্তরীণ অলঙ্করণ ও শিল্পকর্ম ছিল বিশ্বমানের। পাশ্চাত্য ও ভারতীয় শিল্পকলার এক অপূর্ব মেলবন্ধনে তৈরি এই স্থাপত্য। এই দুই সংস্কৃতির সংমিশ্রণে সৃষ্ট এই অপরূপ শৈল্পিক ব্যঞ্জনা এবং বর্ণময় রঙের ব্যবহার নিঃসন্দেহে চমকপ্রদ। ভারতীয় ঐতিহ্যের এক অনন্য নিদর্শন দিল্লির এই লাল কেল্লা। আর তাই ১৯১৩ সালে লাল কেল্লাকে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়।………কে দেয়? ভারত নাকি ইউনেস্কো
প্রবেশদ্বার
লাল কেল্লার প্রধান আকর্ষণ এর বিশালাকার প্রাচীর। কেল্লার দু’টো প্রবেশদ্বার আছে। একটি লাহোর গেট, অন্যটি হলো দিল্লি গেট। লাহোর গেটকেই প্রধান প্রবেশদ্বার বলা হয়ে থাকে। এই গেটটি পাকিস্তানের লাহোরের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে বলে এই রকম নাম। পরবর্তীতে জানা যায়, কেল্লাটিতে তৃতীয় একটি বহির্গমণ পথ ছিল। যমুনা নদীর তীরে হওয়ায় নদীর সাথে সংযোগ রাখতেই নির্মাণ করা হয়েছিল এই গেটটি, যা ওয়াটার গেট হিসেবে পরিচিত।
নহবত খানা
নহবত শব্দের অর্থ হলো গান-বাজনার স্থান। লাল কেল্লার প্রবেশদ্বার দিয়ে ঢুকে সামান্য এগিয়ে গেলেই চোখে পড়বে এক বিশাল নহবত খানা বা ড্রামা হাউজ। এই নহবত খানাকে এককথায় কেল্লার প্রাণ কেন্দ্রও বলা হয়ে থাকে। কেল্লায় সম্রাটদের প্রবেশের সময় এখানে নানা রকমের সঙ্গীতের আয়োজন করা হতো। সঙ্গীতের সুর-মূর্চ্ছনায় মহা সমারোহে সম্রাটদের স্বাগত জানানো হতো।
দিওয়ান-ই-আম
লাল কেল্লার দুটি প্রধান মহলের একটি হলো দিওয়ান-ই-আম। মহলটি তিনদিকে খোলা। মহলের একদিকে রাখা ছিল সম্রাটের সিংহাসন। নানা মূল্যবান পাথরের কারুকার্য দিয়ে মহলটি সজ্জিত করা হয়েছিল। মহলের প্রতিটি দেওয়ালে আছে ভারতের নানা রকম পাখি, ফুল ইত্যাদির ছবি।
মহলের সম্রাটের বসার আসনটি ছিল মণিমুক্তো, সোনা-রুপোয় কারুকার্য করা। শুধুমাত্র ভাস্কর্যের নেশায় সম্রাট এই মহল তৈরি করেননি। সম্রাট শাহজাহানের রাজত্বকালে এই মহলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজকর্ম হতো। এই মহলকে বলা হতো সর্বসাধারণের সভাগৃহ। এই মহলে বসে সম্রাট প্রজাদের কথা শুনতেন। সম্রাট তার নিজের সিংহাসনে বসতেন। প্রজাদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা রাখা হতো। প্রজারা নিয়মিত সেখানে উপস্থিত থাকতো। সম্রাট তার প্রজাদের নিয়ে এই মহলে নিয়মিত সভা করতেন। এই মহলে বসেই সম্রাট সাধারণ মানুষের নানা সুবিধা-অসুবিধার কথা শুনতেন।
দিওয়ান-ই-খাস
লাল-কেল্লার মধ্যে দ্বিতীয় মহলটি হলো দিওয়ান-ই-খাস। অপার সৌন্দর্য ও মনভোলানো ভাস্কর্যে তৈরি এই মহল। এ মহলেও সম্রাটের সিংহাসনটি মূল্যবান সব পাথর দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল। এ মহলটি মূলত সম্রাটের ব্যক্তিগত দরবার মহল। মহলটিতে শুধুমাত্র সম্রাটের বিশেষ প্রজা বা বিশেষ অতিথি এবং তার সভাসদদের প্রবেশাধিকার ছিল।
এখানে বসেই সম্রাট তার সভাসদদের নিয়ে নানা গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করতেন। বিভিন্ন বিষয়ে তাদের মতামত শুনতেন এবং সেসব মতামত পর্যালোচনা করে নিজের দিক নির্দেশনামূলক বক্তব্য রাখতেন। এই মহলের আরেকটি নাম ‘শাহ মহল’। সাদা মার্বেল পাথরের পিলার, মেঝেতে কারুকার্যময় মার্বেল পাথরের মোজাইক এবং নানা শৈল্পিক অলঙ্করণে সজ্জিত করা হয়েছিল মহলের দেয়াল। এই মহলেই ছিল সম্রাট শাহজাহানের বিখ্যাত ময়ূর সিংহাসন এবং সেই সিংহাসনে শোভা পেত বিখ্যাত কোহিনূর হীরা।
রঙ মহল
কেল্লার বিভিন্ন মহলের মধ্যে আরেকটি আশ্চর্য মহল হচ্ছে ‘রঙ মহল’। রঙ মহল প্রকৃত অর্থেই ছিল রঙের প্রাসাদ। এই মহলের প্রতিটি দেওয়াল নানা রকম পাথরের কাজ দিয়ে সাজানো। এর সিলিংটি তৈরি করা হয়েছিল সোনা ও রুপো দিয়ে। সোনা ও রুপোর চমক প্রতিফলিত হয়ে পড়তো নীচের শ্বেতপাথরের উপর। এখানে থাকতেন সম্রাটের পত্নী, উপপত্নী এবং দাসীগণ। পাশের খাস মহলেই থাকতেন সম্রাট। ফলে সম্রাট তার ইচ্ছেমতো যেকোনো সময়ে এই মহলে প্রবেশ করতে পারতেন। তবে, সম্রাট ছাড়া আর কারো এই মহলে প্রবেশের অনুমতি ছিল না।
নহর-ই-বেহিস্ত বা স্বর্গের জলধারা
সম্রাট ও তার পরিবারের সদস্যদের নিজস্ব মহলগুলো থেকে যমুনা নদীর বহতা ধারা দেখা যেত, দেখা যেত প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য। মহলগুলোর মাঝে ছিল এক জলধারা, যার নাম দেওয়া হয়েছিল নহর-ই-বেহিস্ত বা স্বর্গের জলধারা। যমুনা নদীর পানি দিয়ে এই জলধারার পানি বহমান রাখা হতো। এখানেই শাহী বুর্জ নামে একটি মহল আছে। এই মহলে সম্রাট শাহজাহান তার ব্যক্তিগত নানা রকম কাজ করতেন।
সেলিম গড়ের কেল্লা
দিল্লির লাল কেল্লার সাথে জুড়ে আছে আরো একটি বিশাল কেল্লা। যেটাকে বলা হয় সেলিম গড়ের কেল্লা। শেরশাহ সুরির ছেলে সেলিম শাহ সুরি ১৫৪৬ সালে এই কেল্লা বানিয়েছিলেন। সেলিম গড়ের কেল্লা একটি পুলের মাধ্যমে লাল কেল্লার সঙ্গে যুক্ত।
জাফর মহল
শেষ মোঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর ১৮৪২ সালে এ মহল বানিয়েছিলেন। লাল কেল্লার ভেতর মোঘল সম্রাটদের তৈরি শেষ স্থাপত্য ছিলো এ মহল। এ লাল কেল্লাতেই ইংরেজরা বাহাদুর শাহ জাফরের উপর অত্যাচার চালায়। নিজের কেল্লাতেই বাদশাহ জাফরকে ইংরেজদের সামনে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে।
অন্যান্য স্থাপনা
লাল কেল্লার আরো অনেক দর্শনীয় মহলও আছে। কেল্লার পশ্চিমে রয়েছে ‘মোতি মসজিদ’। সম্রাট আওরঙ্গজেব ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য মসজিদটি তৈরি করেছিলেন। এটি একটি ছোট, তিন গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদ, পুরো শ্বেতপাথরে নির্মিত। কেল্লার উত্তরে রয়েছে একটি উদ্যান, যার নাম দেওয়া হয়েছে হায়াত বক্স বাগ বা জীবন প্রদায়ী উদ্যান।
কেল্লার সুরক্ষা ব্যবস্থা
স্থাপত্যশিল্পীরা শুধু কেল্লা নির্মাণ করেই ক্ষান্ত হননি। এর সুরক্ষার কথাও চিন্তা করেছিলেন। সেজন্য কেল্লার চতুর্দিকে নির্মাণ করা হয় বিশাল পরিখা। এর পানি আসতো যমুনা নদী থেকে। কেল্লার সুরক্ষায় পরিখায় রাখা হতো কুমির। যদি কেউ সেই পরিখা অতিক্রম করেও ফেলতো, তারপরও তার পক্ষে কেল্লার ভিতরে প্রবেশ করা সম্ভব হতো না । কারণ, কেল্লার দেওয়াল এমন পিচ্ছিল রাখা হতো যাতে কেউ দেওয়াল বেয়ে উঠতে না পারে। এই পিচ্ছিল বিশাল উঁচু খাড়া দেওয়াল বেয়ে প্রবেশ করা এক কথায় ছিল অসম্ভব। তারপরেও কেল্লার সুরক্ষায় সারা দিন-রাত পালাক্রমে প্রহরী নিয়োজিত রাখা হতো।
ইন্ডিয়ান ওয়ার মেমোরিয়াল মিউজিয়াম
লাল কেল্লার বিভিন্ন দর্শনীয় জিনিসের মধ্যে একটি হলো ‘ইন্ডিয়ান ওয়ার মেমোরিয়াল মিউজিয়াম’। লাল কেল্লার নহবতখানার কিছুটা অংশ এবং পুরাতন মমতাজ মহলকে নিয়ে ১৯১১ সালে এই জাদুঘর তৈরি করা হয়েছে। যেসব ভারতীয় সৈনিক বিশ্বযুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছে তাদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে এই জাদুঘরটি নির্মাণ করা হয়েছে। এই জাদুঘরে যুদ্ধকালীন সৈনিকদের ব্যবহৃত নানা অস্ত্রশস্ত্র, কামান, তলোয়ার, বর্ম, পোশাক ইত্যাদি সব রাখা আছে। এককথায়, এই জাদুঘর সেই সময়ের ইতিহাস দর্শকদের সামনে তুলে ধরে।
লাল কেল্লা কীভাবে পৌঁছাবেন
বাংলাদেশী পর্যটকদের লালকেল্লা দর্শনের জন্য প্রথমে পৌঁছাতে হবে দিল্লি ।
ঢাকা থেকে বিমানে দিল্লি
বাংলাদেশ থেকে বিমানে সরাসরি দিল্লি যাওয়ার ফ্লাইট আছে। ইন্ডিয়া গো বিমান বাংলাদেশ, এয়ার ইন্ডিয়া এয়ারলাইন্স গুলোর ফ্লাইট ঢাকা টু দিল্লি সরাসরি অথবা ঢাকা টু কলকাতা টু দিল্লি ফ্লাইট পরিচালনা করে থাকে। ঢাকা থেকে দিল্লি যেতে সময় লাগবে প্রায় ২ ঘন্টা।ফ্লাইটের ওপর নির্ভর করে একেক রকম সময় লাগতে পারে। তবে সাধারণত সর্বনিম্ন ৫ ঘন্টা থেকে সর্বোচ্চ ১৪ ঘন্টার মধ্যে বিমান যোগে ঢাকা থেকে দিল্লি পৌঁছানো যায়।
বাংলাদেশ থেকে কলকাতা হয়ে দিল্লি
বাংলাদেশ থেকে সরাসরি দিল্লি যাওয়ার কোন ট্রেন নেই। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ থেকে প্রথমে কলকাতা যেতে হবে,এরপর কলকাতা থেকে দিল্লি। বাংলাদেশ থেকে কলকাতা হয়ে দিল্লি অনেকভাবেই যাওয়া যায়। যেমন- ঢাকা থেকে মৈত্রী এক্সপ্রেস ট্রেনে প্রথমে কলকাতা পৌঁছাতে হবে। এরপর কলকাতা থেকে যাওয়ার ট্রেন ধরে দিল্লি পৌঁছাতে হবে।
কলকাতা থেকে ট্রেনে দিল্লি
কলকাতা থেকে দিল্লি যাবার অনেক ট্রেন রয়েছে। সুযোগ-সুবিধা ও কত সময় লাগে তার ওপর নির্ভর করে ট্রেনগুলোর ভাড়া কম বেশি হয়ে থাকে। কলকাতার হাওড়া স্টেশন থেকে ছেড়ে যাওয়া হাওড়া রাজধানী এক্সপ্রেস এসি ট্রেনটি সবচেয়ে আরামদায়ক এবং মাত্র ১৭ ঘন্টায় দিল্লি পৌঁছানো যায়। এই ট্রেনটি বিকেল ৪:৫৫ মিনিটে হাওড়া স্টেশন থেকে দিল্লির উদ্দেশ্যে রওনা দেয় ।
ভালো কিছু ট্রেন সার্ভিসের মধ্যে রয়েছে শিয়ালদাহ রাজধানী এক্সপ্রেস, নিউ দিল্লি এসি দুরন্ত এক্সপ্রেস। এছাড়াও তুলনামূলক কম খরচে ট্রেনের মধ্যে আছে হাওড়া কালকা মেইল।
বাসে কিংবা গাড়িতে দিল্লি
কোলকাতার হাওড়া স্টেশন থেকে বাসেও দিল্লি যাওয়া যায়। একটু মোটামুটি মানের বাসের ভাড়া ১০০০-১২০০ রূপি হয়ে থাকে। কিন্তু বাস জার্নি অনেক কষ্টের, ২৪-৩৬ ঘন্টা সময় লাগতে পারে, এত দুরের পথ তাই বাসে খুব কম মানুষই ভ্রমণ করতে চায়। অনেকে আবার বিভিন্ন ইন্ডিয়ান ট্রাভেল এজেন্সির থেকে গাড়ি ভাড়া করে নেন কন্ট্যাক্টে। কিন্তু, এটাও বুদ্ধিমানের কাজ না। কারণ, কলকাতা থেকে দিল্লি ১৫০০ কি.মি. আর প্রতি কি.মি. ২৫ রূপি করে চার্জ করে থাকে কার রেন্টাল সার্ভিসগুলো।
দিল্লি থেকে লালকেল্লা
শহরের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত এই দুর্গ। বাংলাদেশি পর্যটকরা সহজেই দিল্লি শহরে অবস্থিত শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট থেকে মেট্রোরেল যোগে লাল কেল্লায় যেতে পারেন।
চাঁদনী চক রেলওয়ে স্টেশনে পৌঁছে সহজেই দুর্গে যাওয়া সম্ভব। সেখান থেকে ১০ মিনিটে হেঁটে যাওয়ার পথ রয়েছে। এছাড়া, দিল্লি শহর থেকে বাসযোগেও লাল কেল্লায় পৌঁছানো সম্ভব।
নিকটতম মেট্রো স্টেশন দুটি হল লাল কেল্লা মেট্রো স্টেশন (ভায়োলেট লাইন) এবং চাঁদনী চৌক মেট্রো স্টেশন (হলুদ লাইন)।
লাল কেল্লা মেট্রো স্টেশন ভায়োলেট লাইনটি (Line 6) লাল কেল্লার একেবারেই নিকটস্থ। এই স্টেশন থেকে বের হলে, লাল কেল্লা মাত্র ৫-১০ মিনিটের হাঁটার দূরত্বে, যা দর্শনার্থীদের জন্য অত্যন্ত সুবিধাজনক।
অন্যদিকে, চাঁদনী চৌক মেট্রো স্টেশনের হলুদ লাইনটি দিল্লির পুরানো শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত। চাঁদনী চৌক মেট্রো স্টেশন থেকে লাল কেল্লা পৌঁছানো খুবই সহজ। এই স্টেশনটি লাল কেল্লার সঙ্গে সোজা সড়ক পথে যুক্ত, এবং হাঁটাপথে এটি প্রায় ১৫-২০ মিনিটের দূরত্বে। চাঁদনী চৌক এলাকা দিল্লির ঐতিহাসিক মুনসেফ বাজার, কালী মন্দির এবং অন্য সংস্কৃতিগত স্থানগুলোর জন্যও বিখ্যাত।
ভ্রমণের জন্য উপযুক্ত সময়
দিল্লি শহরে গ্রীষ্মকাল অত্যন্ত উত্তপ্ত থাকে, বিশেষ করে আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে। এ সময় তাপমাত্রা এতটাই বৃদ্ধি পায় যে, লাল কেল্লার মতো ঐতিহাসিক স্থানে ভ্রমণ করা বেশ অস্বস্তিকর হতে পারে। তাই এই ঋতুতে ভ্রমণের পরিকল্পনা এড়িয়ে চলা বুদ্ধিমানের কাজ।
অক্টোবর থেকে মার্চ মাসের মধ্যে দিল্লির আবহাওয়া তুলনামূলকভাবে শীতল ও আরামদায়ক থাকে, যা ভ্রমণের জন্য উপযুক্ত। এই সময়ের মধ্যে অনেক পর্যটক, বিশেষ করে বাংলাদেশি পর্যটক, লাল কেল্লা ঘুরতে যান। তবে, শীতকালে কুয়াশার প্রভাবের কারণে মাঝেমধ্যে দর্শনসুখ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তাই আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেখে ভ্রমণের পরিকল্পনা করা উত্তম।
লালকেল্লা পরিদর্শনের সময়সীমা ও ফি
লাল কেল্লার অভিজ্ঞতা নিতে চাইলে সেরা সময় হলো সকাল ৭টা থেকে বিকেল ৫:৩০টা। এটি মঙ্গলবার থেকে রবিবার দর্শনার্থীদের জন্য খোলা থাকে এবং সপ্তাহের প্রথম দিন অর্থাৎ সোমবার, থাকে সাপ্তাহিক ছুটি। লালকেল্লা একেবারে পুরোটা পরিভ্রমণ করতে প্রায় ২-৩ ঘণ্টা সময় লাগবে।
এখানে প্রবেশের ফি খুবই সাশ্রয়ী। ১৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য পুরোপুরি ফ্রি। ভারতীয় নাগরিক, সার্ক এবং বিমসটেক দেশের নাগরিকদের জন্য মাত্র ১০ টাকা, আর বিদেশী দর্শনার্থীদের জন্য ২৫০ টাকা।
এছাড়াও, লাল কেল্লার লাইট ও সাউন্ড শো দেখতে গেলে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য টিকিটের মূল্য ৬০ টাকা, এবং শিশুদের জন্য ২০ টাকা। তবে, সপ্তাহান্তে বা সরকারি ছুটির দিনে টিকিটের দাম বেড়ে যায়। এক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ৮০ টাকা এবং শিশুদের জন্য ৩০ টাকা।
লাল কেল্লার লাইট ও সাউন্ড শোঃ টাইম ট্রাভেল
লাল কেল্লার লাইট ও সাউন্ড শো দিল্লি ভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণ। আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে এটি লাল কেল্লার ইতিহাসকে জীবন্ত করে তোলে। ৬০ মিনিটের এই প্রদর্শনীতে দর্শনার্থীরা মুঘল সাম্রাজ্যের গৌরবময় ইতিহাস, লাল কেল্লার নির্মাণকাল এবং ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলো উপভোগ করতে পারেন।
এই শো দর্শকদের এক বিশেষ ধরনের “টাইম ট্রাভেল”-এর অনুভূতি দেয়, যেখানে তারা অতীতের গল্পগুলোকে বাস্তবিক রূপে অনুভব করেন। এটি লাল কেল্লার ঐতিহ্যকে নতুন করে অনুধাবন করতে সাহায্য করে এবং দর্শনার্থীদের জন্য একটি অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা হিসেবে স্মৃতিপটে থেকে যায়।
দুর্গের ভিতরে অবস্থিত বুথ থেকে সরাসরি এই শো এর টিকিট সংগ্রহের ব্যবস্থা রয়েছে, অথবা, অনেকে চাইলে অনলাইনেও বুকিং দিতে পারেন। মৌসুম অনুযায়ী শো এর সময়সূচি করা হয়ে থাকে। হিন্দি শো শুরু হয় সাধারণত সন্ধ্যা ৭:৩০ টা থেকে, আর শেষ হয় ৮:৩০টায়। হিন্দি শো শেষ হওয়ার পরপরই ইংরেজি শো শুরু হয় এবং তা চলতে থাকে রাতের দশটা পর্যন্ত।
লাল কেল্লা ভ্রমণে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা
দিল্লি ভ্রমণকে সাশ্রয়ী করে তুলতে, সবচেয়ে ভালো থাকার জায়গা পাওয়া যাবে পাহাড়গঞ্জ ও নিজামুদ্দিন রোডে। এছাড়া চাঁদনী চক ও লাল কেল্লার কাছেও বাজেটের মধ্যে বেশ কিছু ভালো মানের হোটেল পাওয়া যায়। অনলাইনেও এসব হোটেল বুকিং-এর সুব্যবস্থা আছে।
ভোজন রসিকদের জন্য দিল্লিকে রীতিমত স্বর্গ বলা যেতে পারে। প্রতিটি দর্শনীয় জায়গায় তো আছেই, পাশাপাশি থাকার হোটেলগুলোর কাছেও বেশ ভালোমানের খাবার হোটেল আছে।
সবচেয়ে জনপ্রিয়গুলো হলো কাবাব গোলির ভারতীয় খাবার, কারিমের পুরাতন দিল্লির খাবার, হালদিরামের সব্জি আইটেম, সাগর রত্নার দোসা, সুশি হাউজের সুশি, দিশ বিরিয়ানি ও চাওলা চিকের ইন্ডিয়ান কারি।
দিল্লি দর্শন
পরিবার নিয়ে দিল্লিতে ঘোরার মতো লালকেল্লা ছাড়াও অনেক জায়গা আছে। যেমন, তাজমহল, ইন্ডিয়া গেট, কুতুবমিনার, জামে মসজিদ, হুমায়ুনের স্মৃতিসৌধ, চাঁদনী চক ইত্যাদি। ৪-৫ দিন থেকে এক সপ্তাহ সময় নিয়ে দিল্লি গেলে সবগুলো জায়গা ঘোরা সম্ভব। দিল্লি মূলত মুঘল ও পরবর্তীতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ঐতিহাসিক কিছু স্থাপত্যের জন্য বিখ্যাত। আর এই জায়গাগুলো পরিবার ও বাচ্চাদের নিয়ে ঘুরতে যাওয়ার জন্য একদম উপযুক্ত।
দিল্লি ভ্রমণ খরচ
সরাসরি দিল্লির ফ্লাইটে করে ঢাকা ছাড়তে হলে ১৭ থেকে ২৫ হাজার টাকা খরচ পড়বে। কিন্তু, কলকাতায় ট্রাঞ্জিট নিয়ে দিল্লি গেলে এই ভাড়া কিছুটা কমে আসে। এছাড়া খরচটা এয়ারলাইন্স কোম্পানি এবং কতদিন আগে টিকিট কাটা হচ্ছে তারও ওপর নির্ভর করে।
ঢাকা থেকে কলকাতা ট্রেন ভাড়া সর্বনিম্ন ২,৩০০ থেকে সর্বোচ্চ ৬,৭২০ টাকা। বাস যাত্রায় বিভিন্ন কোম্পানি ভেদে গুনতে হবে ৮৯০ থেকে ২,১০০ টাকা।
কলকাতা থেকে দিল্লির ট্রেন ভাড়া ৫৫০ থেকে ৫,৩০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। বাসে যাওয়ার ক্ষেত্রে বিভিন্ন কোম্পানির বাসের উপর নির্ভর করে ভাড়া ১,৩৫০ থেকে ১,৬০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
দিল্লিতে হোটেল ভাড়া সর্বনিম্ন ৬৫০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৫০০০ টাকা হতে পারে। খাওয়া-দাওয়ার ক্ষেত্রে দিন প্রতি খরচ হতে পারে মাথাপিছু ১ থেকে ১৫০০ টাকা।
উপসংহার
এ লাল কেল্লা একদিকে যেমন মোঘল সম্রাটদের উন্নতির সূর্য উঠতে দেখেছে, তেমনি অন্য দিকে সে সূর্যকে অস্ত যেতেও দেখেছে। তৈরি হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত না জানি কতো শতো ঘটনার সাক্ষী হয়ে আছে এ লাল কেল্লা। লাল কেল্লা শুধু মোঘলদেরই নয় বরং ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনেরও সাক্ষী। কতো সম্রাট – বাদশাহ শুরু থেকে শেষ হয়েছে এ কেল্লাতে। কিন্তু বয়ে যাওয়া সময়ের হাজার কাহিনি নিয়ে আজও একই ভাবে দাঁড়িয়ে আছে দিল্লির এ লাল কেল্লা।