Image default
নগর পরিচিতি

ফুটবলের রাজধানী মাদ্রিদ

রেস্তোরাঁর ভিড়, নাইট ক্লাবে তালে তালে নাচের ছন্দ, আলো আঁধার, ওয়াইনের মৃদু গন্ধ মাদ্রিদের রাত জীবনের মাদকতার মূল উপাদান! মাদ্রিদে আসা মানেই, নাকি অনেক রাত পর্যন্ত এই শহরের রাতের জীবনকে উপভোগ করা।

ভূমিকা

মাদ্রিদ, ফুটবল প্রেমীরা নামটা হরহামেশাই শুনে থাকেন। অনেকে তো এটাও মনে করতে পারেন যে,  মাদ্রিদকে ফুটবলই পরিচিত করেছে দেশ বিদেশের মানুষের কাছে। কিন্তু ফুটবল ছাড়াও মাদ্রিদ শহরের পরতে পরতে রয়েছে ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং আভিজাত্যের ছোঁয়া। আর এই উপাদানগুলোই মাদ্রিদকে যুগ যুগ ধরে পরিচিতি দিয়ে আসছে বিশ্ববাসীর কাছে।

বর্তমানে মাদ্রিদ শুধু স্পেনের নয়, বরং, ইউরোপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহর। এখানে রয়েছে বিশ্বখ্যাত রিয়াল মাদ্রিদ ফুটবল ক্লাব, মিউজিয়াম এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রভাবশালী সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান। মাদ্রিদ তার উদীয়মান শিল্প, ডিজিটাল প্রযুক্তি, এবং, উদ্ভাবনী নগর উন্নয়ন দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে একটি অন্যতম প্রভাবশালী শহর হয়ে উঠেছে।

দেশ স্পেন 
অঞ্চল/রাজ্য মাদ্রিদ 
আয়তন ৬০৭ বর্গকিমি  (২৩৪ বর্গমাইল)
জনসংখ্যা  ৩২,৭৩,০৪৯ জন
সরকারি ভাষা স্প্যানিশ 
প্রধান মুদ্রা ইউরো 
সময় অঞ্চল ইউটিসি +১ , ইউটিসি +২ (গ্রীষ্মকালীন)
আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর অ্যাডলফো সুয়ারেজ মাদ্রিদ-বারজাস বিমানবন্দর

ম্যাপ 

মাদ্রিদের জনসংখ্যা ও আয়তন 

মাদ্রিদ শহরের ভৌগোলিক আয়তন প্রায় ৬০৭ বর্গ কি.মি.। এই আয়তনের মধ্যে আনুমানিক ৩৩ লক্ষ মানুষের বসবাস। জনসংখ্যার ভিত্তিতে লন্ডন ও বার্লিনের পরেই মাদ্রিদ ইউরোপের ৩য় বৃহত্তম শহর হিসেবে অবস্থান করেছে।

১৯ শতকের পর থেকে মাদ্রিদের জনসংখ্যা দ্রুত বেড়ে যায়। ২০১১ সালে মাদ্রিদের জনসংখ্যা ছিল ৩,১৯৮,৬৪৫, এবং ২০১৮ সালে এটি বেড়ে প্রায় ৩,২২৩,৩৩৪ হয়ে যায়। শহরের অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক গুরুত্বের কারণে এটি বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ শহর হয়ে ওঠে।

মাদ্রিদ শহরের আবহাওয়া খুবই বৈচিত্র্যময়। শহরটি স্পেনের আইবেরিয়ান উপদ্বীপের ভৌগলিক কেন্দ্রে অবস্থিত। গ্রীষ্মকালে শহরে তাপমাত্রা ৩৮-৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছতে পারে, তবে শীতকালে তাপমাত্রা নেমে যেতে পারে শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি।

বসন্ত ও শরৎকাল মাদ্রিদে সবচেয়ে অনুকূল ঋতু হিসেবে বিবেচিত হয়। কারণ এ সময় তাপমাত্রা স্বস্তিদায়ক থাকে। এবং বৃষ্টিপাতও অপেক্ষাকৃত কম থাকে।

মাদ্রিদের ইতিহাস

মাদ্রিদের ইতিহাস বেশ পুরোনো। তবে, মাদ্রিদের যে ঐতিহাসিক দলিল পাওয়া গেছে তা দশম শতক শুরু।

সেই ইতিহাস অনুযায়ি, অতীতে মাদ্রিদ নগরীর নাম ছিলো মাহিরিত। তখন এ শহর শাসন করতো স্পেনীয় মুসলিম শাসকরা। পরবর্তীতে খ্রিস্টান রাজা ষষ্ঠ আলপোসো মুসলমানদের কাছ থেকে ১০৮৩ সালে শহরটি নিজের দখলে নিয়ে নেন। এরপর ১৫৬১ সালের দিকে স্পেনের রাজা ফিলিপ মাদ্রিদে স্পেনের রাজদরবার স্থাপন করেছিলেন। পরবর্তীতে ১৬০৭ সালে মাদ্রিদ আনুষ্ঠানিকভাবে স্পেনের স্থায়ী রাজধানীর মর্যাদা পায়।

দ্বিতীয় ফিলিপ II এবং মাদ্রিদের উত্তরণ 

স্প্যানিশ রাজা দ্বিতীয় ফিলিপ ১৫৬১ সালে মাদ্রিদে তার আদালত স্থানান্তরিত করেন। এর মাধ্যমে মাদ্রিদ তার উত্থান শুরু করে এবং স্পেনের রাজকীয় কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। দ্বিতীয় ফিলিপ মাদ্রিদকে রাজধানী হিসেবে বেছে নেওয়ার মূল কারণ, ছিল শহরটির কোনো কৌশলগত বা অর্থনৈতিক গুরুত্ব না থাকা। পাশাপাশি এটি তখনকার রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্য নিরপেক্ষ ও নিরাপদ ছিল।

তৃতীয় ফিলিপ এর মাদ্রিদকে আনুষ্ঠানিক রাজধানী ঘোষণা 

১৫৬১ সালে দ্বিতীয় ফিলিপ মাদ্রিদকে কেন্দ্র করে রাজনীতি শুরু করলেও, ১৬০০ সালে তৃতীয় ফিলিপ মাদ্রিদকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্পেনের জাতীয় রাজধানী ঘোষণা করেন। এর ফলে মাদ্রিদ দ্রুত স্পেনের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। 

১৬ থেকে ১৭ শতকে, মাদ্রিদ তার পুরনো শহর কেন্দ্রটি সংরক্ষণ করেছিল। পাশাপাশি শহরের চারপাশে নানা ধরনের প্রাসাদ, কনভেন্ট, গীর্জা এবং পাবলিক ভবনও গড়ে ওঠে। মাদ্রিদ তখনকার সময়ের শিল্প ও সংস্কৃতির একটি প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে। লোপে ডি ভেগা এবং তার যুগের অন্যান্য নাট্যকাররা শহরের সাংস্কৃতিক ধারাকে সমৃদ্ধ করেছিলেন। ফলে মাদ্রিদ শিল্পী ও সাহিত্যিকদের জন্য একটি পছন্দের স্থান হয়ে ওঠে।

মাদ্রিদের আধুনিকীকরণ 

১৯ শতকে মাদ্রিদ আধুনিক নগরায়ণের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। শহরে শিল্পকলা, শিক্ষা এবং প্রযুক্তির বিপ্লব ঘটে, যা মাদ্রিদকে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম এবং প্রভাবশালী শহরগুলির মধ্যে একটিতে পরিণত করে। নতুন ভবন, সড়ক এবং স্থাপত্যের মাধ্যমে শহরের ভৌগোলিক পরিবর্তন ঘটে, এবং মাদ্রিদ তার আধুনিক রূপ পায়।

শহরের রাতের জীবন

রেস্তোরাঁর ভিড়, নাইট ক্লাবে তালে তালে নাচের ছন্দ, আলো আঁধার, ওয়াইনের মৃদু গন্ধ মাদ্রিদের রাত জীবনের মাদকতার মূল উপাদান! মাদ্রিদে আসা মানেই, নাকি অনেক রাত পর্যন্ত এই শহরের রাতের জীবনকে উপভোগ করা। ইউরোপের কোন শহর এতো রাত পর্যন্ত জেগে থেকে না – এমনকি প্যারিসও মাঝ রাতে একটা সময়ের পর স্তিমিত হয়ে যায়, কিন্তু স্পেনের রাজধানী শহরটি ইউরোপিয়ানদের কাছে এর প্রাণবন্ত, জীবন্ত রাতের জন্যেই পরিচিত। নাইট ক্লাব, পাব কালচার এই শহরের প্রাণ। তাই, রাতে হলুদ আলো জ্বলা পুরনো দিনের গলি পথে হোটেলে পৌঁছতে পৌঁছতে চড়া সুরের মিউজিক কানে আসে। আর এই হলুদ আলো হলো মাদ্রিদের অতীত ঐতিহ্যের প্রতীক।

মাদ্রিদ শহরের রাতের জীবন

মাদ্রিদে রাতের জীবনকে নিরাপদ রাখার জন্য শক্তিশালী নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে। শহরের প্রতিটি রাস্তায় পুলিশ টহল দেয় এবং অনেক জায়গায় সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে নজরদারি করা হয়। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এখানে পুলিশ ঘোড়ায় চড়ে শহরের বিভিন্ন জায়গায় টহল দেয়, যা পর্যটকদের জন্য অনন্য আকর্ষণ। মাদ্রিদের কেন্দ্রীয় এলাকায় মনে হয় যেন সবকিছু নিয়ন্ত্রিত এবং সুরক্ষিত। অনেক পর্যটক এই দৃশ্য ক্যামেরায় ধারণ করেন, যা শহরের রাতের জীবন উপভোগের একটি বিশেষ অংশ হয়ে ওঠে।

মাদ্রিদের দর্শনীয় স্থান ও জাদুঘর 

মাদ্রিদ হলো স্পেনের হৃদয়। এর বিশাল সাংস্কৃতিক সম্পদ, ঐতিহাসিক স্থাপত্য, এবং জাদুঘরের সমৃদ্ধ সংগ্রহ পর্যটকদের জন্য একটি অতুলনীয় অভিজ্ঞতা তৈরি করে।

প্রাডো মিউজিয়াম 

মাদ্রিদের প্রাডো মিউজিয়াম বিশ্বের অন্যতম সেরা শিল্প সংগ্রহের একটি স্থান এবং শহরের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। এখানে রয়েছে স্প্যানিশ এবং ইউরোপীয় শিল্পীদের বিখ্যাত কাজের সমাহার। যেমন- ভেলাজকুয়েজ, গোয়া, রুবেনস, এবং এল গ্রেকো। “লাস মেনিনাস” এবং “দ্য থার্ড অফ মে এর মতো মাস্টারপিসগুলোর দেখা মিলবে এখানে। মিউজিয়ামটি তিনটি তলায় ছড়িয়ে রয়েছে এবং এটি চিত্রকর্ম ও ভাস্কর্যের মেলবন্ধনের একটি বিশাল সংগ্রহশালা।

প্রাডো মিউজিয়াম

রেটিরো পার্ক 

এটি মাদ্রিদের সবচেয়ে জনপ্রিয় পার্ক, যেখানে নিশ্চিন্তে পর্যটকেরা প্রকৃতির মাঝে আরাম করতে পারেন। এছাড়াও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে হাঁটার জন্য পার্কটি একদম উপযুক্ত। পাশাপাশি এখানকার লেকে বোটিং করার সুবিধাও রয়েছে। এখানকার নয়নাভিরাম ক্রিস্টাল প্যালেস এবং লা রোজালেদা গোলাপ বাগানগুলো পর্যটকদের বিশেষভাবে আকর্ষণ করে।

রেটিরো পার্ক

রাজকীয় প্রাসাদ 

মাদ্রিদের রাজকীয় প্রাসাদ ‘প্যালাসিও রিয়াল’ এক বিরাট ঐতিহাসিক এবং সাংস্কৃতিক স্মৃতিস্তম্ভ। এটি ইউরোপের অন্যতম বৃহত্তম রাজকীয় প্রাসাদ। প্রাসাদের ভেতরের রাজকীয় সজ্জা, চিত্রকর্ম, বাদ্যযন্ত্র এবং বিশাল থ্রোন রুম দেখতে প্রতিবছর লাখো পর্যটক এখানে ভিড় জমান। এছাড়া এখানকার বিশ্ববিখ্যাত রাজকীয় অস্ত্রাগারটিতে মধ্যযুগীয় অস্ত্র ও বর্ম সংরক্ষিত আছে।

মাদ্রিদের রাজকীয় প্রাসাদ

প্লাজা মেয়র

১৭ শতকের এই ঐতিহাসিক স্কয়ারটি মাদ্রিদের একটি অন্যতম জনপ্রিয় স্থান। স্কয়ারটি একসময় বাজার, থিয়েটার এবং আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানগুলো পালনের স্থান ছিল। বর্তমানে এর অভ্যন্তরীণ অংশে অনেক ক্যাফে এবং রেস্টুরেন্ট তৈরি হয়েছে। 

প্লাজা মেয়র

পুয়ের্তা দেল সোল 

শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত পুয়ের্তা দেল সোল, মাদ্রিদের অন্যতম প্রধান চত্বর। এই চত্বরটি মাদ্রিদের পাবলিক ট্রান্সপোর্ট হাব হিসেবেও পরিচিত, যেখানে বেশ কয়েকটি বাস স্টপ এবং মেট্রোর প্রবেশপথ রয়েছে। পুয়ের্তা দেল সোলকে “কিলোমিটার জিরো” হিসেবে অভিহিত করা হয়, কারণ এখান থেকেই স্প্যানিশ জাতীয় সড়ক নেটওয়ার্কের সমস্ত দূরত্ব পরিমাপ করা হয়।

পুয়ের্তা দেল সোল

এস্তাদিও সান্তিয়াগো বার্নাব্যু 

ফুটবল প্রেমীদের জন্য, রিয়াল মাদ্রিদের স্টেডিয়াম সান্তিয়াগো বার্নাব্যু একটি অপরিহার্য দর্শনীয় স্থান। এটি ফুটবল ভক্তদের জন্য একটি বিশেষ গন্তব্য। ক্লাবটি গর্বের সঙ্গে দাবি করে যে, তাদের স্টেডিয়ামটি “বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ স্টেডিয়াম”।

এখানে পর্যটকেরা স্টেডিয়ামটি ভ্রমণ করতে পারবেন এবং ক্লাবের ট্রফি সংগ্রহ, দলের শিল্পকর্ম, এবং বিভিন্ন অস্থায়ী প্রদর্শনী দেখতে পাবেন। 

এস্তাদিও সান্তিয়াগো বার্নাব্যু

জাতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘর 

জাতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘর মাদ্রিদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক স্থান। যা ১৮৬৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। স্পেনের ইতিহাস সম্পর্কে জানতে আগ্রহীদের জন্য এটি একটি আদর্শ স্থান হতে পারে। এখানে প্রাগৈতিহাসিক থেকে ১৯ শতক পর্যন্ত নানা নিদর্শন সংগ্রহ করা আছে।  

প্রদর্শিত সংগ্রহের মধ্যে মিশরীয় মমি, হিস্পানো-রোমান ও ইসলামিক প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার, ভিসিগোথিক মুকুট, মুদেজার সিরামিক উল্লেখযোগ্য। এ জাদুঘরের সংগ্রহের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হল এর আবক্ষ মূর্তি “এলচে লেডি” এবং  জামোরা থেকে হাতির দাঁতের পাত্র।

জাতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘর মাদ্রিদ

জাদুঘর সোরোলা 

মাদ্রিদের জাদুঘর সোরোলা স্প্যানিশ ইম্প্রেশনিস্ট চিত্রশিল্পী জোয়াকুইন সোরোলা এর কাজের জন্য উৎসর্গকৃত। এখানে সোরোলার ১,২০০টিরও বেশি পেইন্টিং এবং ছবি সংগ্রহীত আছে। এই জাদুঘরে সোরোলার নানা ধরনের শিল্পকর্ম যেমন রেনেসাঁ, বিস্তারিত প্রকৃতি চিত্রণ, বিশেষ করে সমুদ্র ও আউটডোর দৃশ্য প্রদর্শিত হয়।সোরোলা তার চিত্রকর্মে প্রকৃতির দৃশ্য, বিশেষ করে সমুদ্রের এবং সূর্যাস্তের চিত্র খুবই জীবন্তভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। সোরোলা মিউজিয়াম এ আধুনিক দৃশ্যকল্প বা “moderno” ধরনের চিত্রকর্মও প্রদর্শিত হয়। যা মূলত স্প্যানিশ সমাজের জীবনের চিত্র। 

জাদুঘরের একটি বিশেষ আকর্ষণ হল এর বাগানের বাইরের অংশ। সোরোলা নিজে এই অংশটি ডিজাইন করেছিলেন। এই বৃক্ষ-ছায়াযুক্ত স্থান, যেখানে একটি ফোয়ারা এবং আন্দালুসীয় শৈলীর টাইলস এর কাজ রয়েছে। 

জাদুঘর সোরোলা

মাদ্রিদের বিখ্যাত খাবার 

মাদ্রিদে তাপাস খাওয়া একটি সাধারণ প্রথা। তাপাস হল স্প্যানিশ রন্ধনশিল্পের অ্যাপেটাইজার বা স্ন্যাকস, যা একসাথে পরিবেশন করে একটি পূর্ণাঙ্গ খাবারে পরিণত করা যায়। কিছু স্প্যানিশ বার এবং রেস্তোরাঁতে তাপাস এখন একটি উন্নত রন্ধনশিল্পে পরিণত হয়েছে। 

সোলডাডিটোস ডে পাভিয়া

সোলডাডিটোস ডে পাভিয়া হল একটি ভাজা কড মাছের খাবার যা রোস্ট করা লাল মরিচের একটি টুকরোতে মোড়ানো থাকে। এটি আন্দালুসিয়ান রন্ধনপ্রণালীর একটি জনপ্রিয় পদ এবং স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদে তাপাস বারগুলিতে সাধারণত পাওয়া যায়। কড মাছটি একটি পাপরিকা এবং লেবুর রসের মিশ্রণে মেরিনেট করা হয়।

সোলডাডিটোস ডে পাভিয়া

ক্যারাকোলেস এ্য লা মাদরিলেনা

ক্যারাকোলেস এ্য লা মাদরিলেনা, এই খাবারটি শামুকের একটি জনপ্রিয় রেসিপি। বিশেষভাবে প্রস্তুত মসলাযুক্ত সসে রান্না করা হয় এ খাবার। এটি মাদ্রিদের জনপ্রিয় তাপাস হিসেবে পরিচিত।

ক্যারাকোলেস এ্য লা মাদরিলেনা

বেসুগো এ্য লা মাদরিলেনা

মাদ্রিদের একটি জনপ্রিয় প্রধান খাবার হল বেসুগো। এটি মূলত একটি সি-ব্রিম মাছ, যা স্থানীয়ভাবে ঐতিহ্যবাহী উপায়ে বেকড করা হয়। এই খাবারটি বিশেষ করে স্থানীয় রেস্তোরাঁগুলিতে পাওয়া যায়।

বেসুগো এ্য লা মাদরিলেনা

কারনে আল ডেসারেগলো

এটি একটি গরুর মাংসের স্টু, যা মাদ্রিদে বিশেষভাবে তৈরি করা হয়। গরুর মাংসের সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের মশলা এবং শাকসবজির সাথে হালকা আঁচে রান্না করা হয়। এই কারণে খাবারটি অত্যন্ত সুস্বাদু এবং স্বাস্থ্যকর।

মাদ্রিদে ‘নগ্ন ক্যান’ রেস্তোরাঁর আকর্ষণ

মাদ্রিদে একটি অভিনব রেস্তোরাঁ রয়েছে, যেখানে খাবারের পরিবেশন পদ্ধতি একেবারেই আলাদা। এই রেস্তোরাঁটি গ্রাহকদের শুধু টিনে ভরা খাবার পরিবেশন করে, তবে এর মান চমৎকার এবং স্বাদেও কোনো কমতি নেই। স্পেনে টিনবন্দি খাবারের একটি দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে, এবং এটি পিকলড বা সংরক্ষিত খাদ্য প্রস্তুতিতে বিশ্বখ্যাত।

মাদ্রিদে এই ধরনের খাবারের বিশাল পসার রয়েছে, যার মধ্যে মাছ, সামুদ্রিক প্রাণী, শাকসবজি এবং ফলমূল অন্তর্ভুক্ত। তবে, যেহেতু টিনে খাবার আসা মানে সবসময় একরকম মানের নয়, তাই গ্রাহকদের সতর্ক থাকতে হয়। যেমন, চুয়েকা এলাকার স্থানীয় বাজারে পাওয়া যায় উচ্চ মানের টিনের খাবার, যা এখানে পরিবেশন করা হয়।

এই রেস্তোরাঁর অন্যতম আকর্ষণ হলো তার নতুন দৃষ্টিভঙ্গি: টিনের খাবার যা শুধু স্বাদে নয়, তার পরিবেশন পদ্ধতিতেও এক নতুন অভিজ্ঞতা প্রদান করে।

মাদ্রিদের সংস্কৃতি 

মাদ্রিদ একটি শহর যা শুধুমাত্র তার ইতিহাস ও ঐতিহ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং, আধুনিক সাংস্কৃতিক চর্চায়ও সমৃদ্ধ। এই শহরটি তার শিল্প, সাহিত্য, খেলা এবং উত্সবের মাধ্যমে শহরবাসী ও পর্যটকদের একটি অমূল্য সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা প্রদান করে।

সাহিত্যের ঐতিহ্য

মাদ্রিদ তার বিশিষ্ট সাহিত্যিকদের জন্য বিখ্যাত। এখানে লোপে দে ভেগা, পেড্রো ক্যাল্ডেরন দে লা বার্কা, মিগুয়েল ডি সার্ভান্তেস, ফ্রান্সিসকো গোমেজ দে কুয়েভেদো ই ভিলেগাস, বেনিটো পেরেজ গাল্ডোস, মারিয়ানো জোসে দে লারা, পিও বারোজা এবং আজোরন এর মত মহান সাহিত্যিকদের জন্মস্থান। এই শহরটি আজও স্প্যানিশ-ভাষী বিশ্বের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনা কেন্দ্র হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

লাস ভেন্টাস: ষাঁড়ের লড়াই

মাদ্রিদের একটি অন্যতম সাংস্কৃতিক আকর্ষণ হলো লাস ভেন্টাস, যেখানে বিশ্বের বৃহত্তম ষাঁড়ের লড়াই অনুষ্ঠিত হয়। স্থানটিতে প্রায় ২৫,০০০ দর্শকের ধারণ ক্ষমতা রয়েছে। এটি একটি ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠান এবং যুগ যুগ ধরে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। 

এই লড়াই এ ষাঁড়ের লড়াইকারীরা তাদের প্রথম ষাঁড় হত্যা করার মাধ্যমে নিজেদের দক্ষতা প্রদর্শন করে। এ ষাঁড়ের লড়াইয়ের মৌসুম মার্চ থেকে অক্টোবর পর্যন্ত চলে। সুতরাং, লাস ভেন্টাস উপভোগ করতে হলে পর্যটকদের নির্ধারিত মৌসুমে মাদ্রিদ সফর করতে হবে।

ষাঁড়ের লড়াই

ফুটবল: রিয়াল মাদ্রিদ এবং অ্যাটলেটিকো ডি মাদ্রিদ

মাদ্রিদ তার ফুটবল ক্লাবগুলির জন্যও বিখ্যাত, বিশেষ করে রিয়াল মাদ্রিদ এবং অ্যাটলেটিকো ডি মাদ্রিদ। এই দুই দলের মধ্যে বার্ষিক ম্যাচগুলো শহরের সবচেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ এবং জনপ্রিয় ইভেন্টগুলির মধ্যে অন্যতম। সান্তিয়াগো বার্নাবেউ এবং ভিসেন্তে ক্যালেদেরন স্টেডিয়াম অনুষ্ঠিত ম্যাচগুলির কেন্দ্রস্থল।

বার্বেনাস এবং ঐতিহ্যবাহী উৎসব

বার্বেনাস মাদ্রিদের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও প্রাণবন্ত উৎসবগুলির মধ্যে একটি।

এটি প্রতি বছর আগস্ট মাসে মাদ্রিদের সেন্ট্রাল এলাকা “লা লাতিনা” অঞ্চলে অনুষ্ঠিত হয়। উৎসবটি মাদ্রিদের পবিত্র মাতা “ভার্জিন অব দ্য পালোমা” এর সম্মানে পালিত হয়।

এই দিনে প্রচুর লোকের  সমাগমে আনন্দ উল্লাসে মেতে ওঠে শহরটি। ঐতিহ্যবাহী পোশাক, ফ্লামেঙ্কো নাচ, স্থানীয় সঙ্গীত, এবং ধর্মীয় প্রার্থনা অনুষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে শহরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের দিনটি উদযাপিত হয়। উৎসবে স্থানীয় বিভিন্ন খাবার যেমন কোকিডো, চুরোস, এবং নানা ধরনের পানীয় উপভোগ করা হয়। যা মাদ্রিদের সামাজিক জীবন ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক অসাধারণ মেলবন্ধন সৃষ্টি করে।

বার্বেনাস উৎসব

মাদ্রিদ ভ্রমণের উপযুক্ত সময়

মাদ্রিদ ভ্রমণের জন্য বসন্তকাল এবং শরৎকাল সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। গ্রীষ্মকাল অর্থাৎ জুন থেকে আগস্ট এখানে অত্যন্ত গরম থাকে। তাই এই সময় ভ্রমণ না করাই ভালো। বসন্ত এবং শরতের সময়, শহরটি তার প্রকৃত সৌন্দর্যে উদ্ভাসিত হয়। আবহাওয়া থাকে আরামদায়ক এবং শহরের পার্ক ও স্কয়ারগুলো এক নতুন জীবন লাভ করে। 

উপসংহার 

মাদ্রিদ শুধু একটি শহর নয়, এটি একটি অনুভূতি, যেখানে প্রতিটি কোণে অপেক্ষা করছে নতুন কিছু; একটি স্মরণীয় অভিজ্ঞতা, একটি অজানা গল্প, অথবা একটি নতুন স্মৃতি। 

শহরের প্রাণবন্ত রাস্তাগুলো, ঐতিহাসিক স্থাপত্য, চিত্তাকর্ষক জাদুঘর, রঙিন উৎসব এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য একে এমন এক স্থান করে তুলেছে, যা দর্শনার্থীদের হৃদয়ে দীর্ঘকাল স্থায়ী প্রভাব রেখে যাবে।বলা বাহুল্য , মাদ্রিদ শহরের প্রতিটি কোণ আপনাকে কিছু না কিছু শিখাবে।  ইতিহাস, শিল্প এবং মানুষের সঙ্গে এক নতুন সম্পর্ক তৈরি করবে।

মাদ্রিদ নিয়ে কিছু মজার তথ্য

বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফুটবল স্টেডিয়াম: মাদ্রিদের সান্তিয়াগো বার্নাবেউ স্টেডিয়াম বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় এবং বৃহত্তম ফুটবল স্টেডিয়ামগুলির মধ্যে একটি। এটি রিয়াল মাদ্রিদ ফুটবল ক্লাবের ঘর এবং প্রতি বছর লাখ লাখ দর্শক এখানে খেলা দেখতে আসে।

মাদ্রিদে পানির অভাব: মাদ্রিদ ইউরোপের এমন একটি শহর, যেখানে একটি বড় নদী নেই। শহরটি মানজানারেস নদী এর পাশে অবস্থিত হলেও, এটি ইউরোপের অন্যান্য শহরের মতো প্রধান নদী দ্বারা সজ্জিত নয়। তাই মাদ্রিদের পানির চাহিদা মেটানোর জন্য বেশ কিছু জলাশয় ও বাঁধ তৈরি করা হয়েছে।

জোরে হাঁটা: মাদ্রিদের লোকেরা সাধারণত দ্রুত হাঁটতে পছন্দ করে। এটি তাদের সাধারণ জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে এবং তাই মাদ্রিদের রাস্তায় হাঁটার সময় আপনি সব সময় দ্রুত হাঁটতে দেখতে পাবেন।

সেরা চকলেট ডিপিং: মাদ্রিদের চোকো কন চুরোস (চকলেট ডিপিং) খাওয়া খুব জনপ্রিয়। এটি একটি মিষ্টি খাবার, যেখানে গরম চকলেট দিয়ে চুরোস (তেল ও ময়দা দিয়ে বানানো একটি মিষ্টান্ন) ডুবিয়ে খাওয়া হয়। এটি মাদ্রিদের অন্যতম জনপ্রিয় সকালের নাস্তা!

বিশ্বের সবচেয়ে পুরনো রেস্টুরেন্ট: মাদ্রিদে অবস্থিত সান্টা মারিয়া রেস্টুরেন্ট ১৬২০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়, যা এখনও কার্যকরী এবং বিশ্বের সবচেয়ে পুরনো রেস্টুরেন্ট হিসেবে পরিচিত।

রেফারেন্স লিংক :

 

Related posts

হংকং – এক দেশ দুই নীতির শহর

পুশরাম চন্দ্র

সাত পাহাড়ের শহর রোম

রোমান্সের শহর-প্যারিস

Leave a Comment

Table of Contents

    This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More