Image default
পথে প্রান্তরে

শাল গাছের মেলাঃ মধুপুর উদ্যান ভ্রমণ

মধুপুর উদ্যানের ইতিহাস মান্দিদের  আপন জায়গায় জমি হারানোর ইতিহাস

হাজার বছরের প্রাচীন মধুপুর শালবন। ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন ও চট্টগ্রামের পাহাড়ি বনাঞ্চলের পর বাংলাদেশের তৃতীয় বৃহত্তম প্রাকৃতিক বন মধুপুর শালবন। এ বনকে দেশের মধ্যাঞ্চলীয় বনভূমি হিসেবেও আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে। এ বনের বিস্তৃতি গাজীপুর, টাঙ্গাইল ও ময়মনসিংহ জেলার অংশজুড়ে। একসময় রাজধানী ঢাকার কাঁটাবন পর্যন্ত এ বনের সীমানা থাকলেও আজ তা শুধুই অতীত, বইয়ের পাতায় লেখা ইতিহাস। 

টাঙ্গাইল ও মোমেনশাহী জেলার অংশটুকু মধুপুর গড় বা শালবন নামে পরিচিত। শালগাছের মোলা বা শিকড় থেকে গজানো চারায় গাছ হয় বলে স্থানীয়রা একে গজারি বনও বলে থাকে। এটি মধুপুর গড় অঞ্চলের অংশ, যা ভূতাত্ত্বিক ও পরিবেশগতভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। উদ্যানটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, বন্য প্রাণীর বৈচিত্র্য এবং গ্রামীণ শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ঘেরা। এটি ভ্রমণপ্রেমী এবং প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য একটি আদর্শ গন্তব্য হতে পারে।  

মধুপুর জাতীয় উদ্যান: মান্দি জনগোষ্ঠীর আপন জায়গায় জমি হারানোর ইতিহাস

মধুপুর জাতীয় উদ্যানের ইতিহাস প্রাচীন। অঞ্চলটি প্রাকৃতিক বনভূমি হিসেবে পরিচিত ছিল। ব্রিটিশ উপনিবেশ আমলে মধুপুর শালবন নাটোর রাজার অধীনে আসে। রাজা শ্রী যোগীন্দ্রনাথ রায় বাহাদুরের সঙ্গে ১৮৬০ থেকেই মান্দি গ্রাম প্রধানদের জমিবিষয়ক চুক্তি হয় এবং বনের অধিবাসীরা রাজার ‘রায়ত’ হিসেবে চার্জশিটের রাজাকে খাজনা প্রদান শুরু করে। 

বছরে একবার চানপুর চণ্ডীমণ্ডপ, চাড়ালজানি, রসুলপুরের কাচারীতে একটাকা পাঁচসিকা খাজনা দিতে হতো। ফসল ঘরে তোলার পর গ্রামে গ্রামে আয়োজিত হতো ‘ওয়ান্না’ বা নবান্ন উৎসব। ফসল রোপণের আগে গ্রামে গ্রামে আয়োজিত হতো ‘গালমাকদুআ’ পরব। যেখানে সঙনকমা পরিবারের সদস্যসংখ্যা অনুয়ায়ী বীজবণ্টন বিনিময় করতেন। 

১৯৫০ সনে প্রজাস্বত্ব আইনের মাধ্যমে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হলে “হাজিরি হাব্রেং”(ফেলে রাখা পতিত জমি) এক বিশাল অংশ হয়ে যায় ‘রাষ্ট্রীয় বনভূমি’। কয়েকশ’ বছর ধরে বসবাসরত মান্দি-কোচরা হারায় ভূমির প্রথাগত মালিকানা। মাতৃসূত্রীয় মান্দিসমাজে জমির মালিকানা ও বংশপরিচয় নির্ধারিত হয় মা এর বংশ পরম্পরায়। পারিবারিক জমির মালিকানা সাধারণত পায় পরিবারের ছোট মেয়ে (নকনা)। 

১৯৫৫ সনে মধুপুরে জুম চাষ নিষিদ্ধ করা হয়। ১৯৫৬ সনে ফরেস্টার আফাজউদ্দিন ভূঁইয়ার নেতৃত্বে দোখলা রেঞ্জের চুনিয়ায় প্রাকৃতিক বন কেটে গাছের চারা রোপণ করে বনবিভাগ। প্রাচীন এক বনের নাম পাল্টে হয়ে যায় ‘উডলট বাগান’। 

আজ মধুপুর আনারস ও কলার জন্য বিখ্যাত। মধুপুর উপজেলাতে তৈরি হয়েছে ‘আনারস চত্বর’। চালাজমিতে চাষের অধিকার হারিয়ে মধুপুরে এই আনারস চাষের সূচনা করেছিলেন ইদিলপুরের মিজি মৃ। ১৯২৭ সনের উপনিবেশিক বনআইনের ৬ ধারার মাধ্যমে তৎকালীন ‘পূর্ববঙ্গীয় বনবিভাগ’ ১৯৫৫ সনে একটি ‘ফরেস্ট গেজেট’ প্রকাশ করে। 

মধুপুর জাতীয় উদ্যানের মেইন ফটক

১৯৬২ সালে আইয়ুব খান ও মোনায়েম খানের আমলে মান্দিদের উচ্ছেদের জন্য ‘জাতীয় উদ্যান’ নাম দিয়ে ২০,৮২৭.৩৭ একর শালবনে তারের বেড়া দেয়া হয়। ১৯৭৭-৭৮ সালে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণের জন্য বনবিভাগ দখলকৃত ‘সংরক্ষিত বন এলাকায়’ করা হয় বম্বিং রেঞ্জ। ১৯৮২ সনে ‘আটিয়া অধ্যাদেশের’ মাধ্যমে টাঙ্গাইল জেলার ৫৫,৪৭৬.৩৮ একর ভূমি ‘আটিয়া সংরক্ষিত বন’ হিসেবে ঘোষিত হয়। এর ভেতরেই মান্তি গ্রাম উচ্ছেদ করে প্রাকৃতিক শালবনে তৈরি হয় বিমানবাহিনীর ফায়ারিং ও বোম্বিং রেঞ্জ।

১৯৮৪ সনে মধুপুর বনে বসবাসরত মান্দি-কোচদের বনবিভাগ আবার উচ্ছেদ নোটিশ দেয়। ১৯৮৯-১৯৯৫ সাল পর্যন্ত এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের ঋণের টাকায় টিএনডিপির সাড়ে সাত হাজার একর উডলট ও এগ্রোফরেস্ট্রি বাগান করার ফলে অনেক মান্দিরা আপন জায়গা-জমিন হারায়।

মধুপুর এর প্রাকৃতিক পরিবেশ ও বন্য প্রাণী

মধুপুর বনের বৃক্ষরাজী 

মধুপুর জাতীয় উদ্যানে আছে নানান প্রজাতির লতাগুল্ম ও বৃক্ষরাজি। এসবের মধ্যে শাল, বহেড়া, আমলকি, হলুদ, আমড়া, জিগা, ভাদি, অশ্বথ, বট সর্পগন্ধা, শতমূলী, জয়না, বিধা, আজুকি/হারগাজা, বেহুলা ইত্যাদি অন্যতম।

শুধু বড় বড় বৃক্ষরাজিই নয়, এই বন ভেষজ উদ্ধিদের জন্যও অনেক সমৃদ্ধ। ভেষজ উদ্যানের গাছ-গাছরার মধ্যে রয়েছে- আমলকি, হরিতকি, বহেরা, নিম, অর্জুন, নিশিন্দা, মহুয়া, নাগেশ্বর, উলুটকম্বল , বকুল, সোনালু, চন্দন, আগর, আমড়া, জলপাই, খাড়াজড়া, পিতরাজ, পেয়ারা, জাম, তেতুল, বেল, কালমেঘ, বাসক, হাতিশুর, চম্পাফুল, পিপুল, আকন্দ, ঘৃতকাঞ্চন, কেউকলা, মেহেদী, নয়নতারা,শতমূল, চাপালিশ, অশোক, শেফালী, চালতা, সর্পগন্ধা, পাথরকুচি, তুলসি, ধুতুরা, তেজপাতা, জাম্বুরা, ঢাকি জাম, কুম্বি, ঢেউয়া, গর্জন, হৈমন্তী, কন্যারী, পুত্রঞ্জীব, গোলাপ জাম, দুধকচু, আতা, কদবেল, কামরাঙ্গা, বার্মাশিমূল, লটকন, কালেন্ড্রা, সিভিট, কানাইডিঙ্গা, পান, খয়ের, অনন্তমূল, গন্ধাসাগর, আগুনসর, নীলমনি, অড়হড় প্রভৃতি।

শাল বাগান

মধুপুর এর জীববৈচিত্র

সবুজ অরণ্যের প্রাকৃতিক দৃশ্যের পাশাপাশি মধুপুর জাতীয় উদ্যানে আছে প্রায় ১১ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ৭ প্রজাতির সরীসৃপ, ৪ প্রজাতির উভচর এবং ৩৮ প্রজাতির পাখি। এর মধ্যে মুখপোড়া হনুমান, চিত্রা হরিণ, মায়া হরিণ, পেঁচা, কাঠ ময়ূর, বন মোরগ, লাল মুখ বানর, বন্য শুকর ইত্যাদি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

মধুপুর উদ্যানে লহরিয়া বন বিট কার্যালয় সংলগ্ন একটি হরিণ প্রজনন কেন্দ্রে আছে এবং এর পাশে রয়েছে একটি পর্যবেক্ষণ টাওয়ার আছে। পর্যবেক্ষণ টাওয়ারের চূড়ায় উঠে বনের পুরোটা সৌন্দর্য একনজরে উপভোগ করা যায়।

জাতীয় মধুপুর উদ্যানে আদিবাসীদের নিজস্ব তাঁতে তৈরী বিভিন্ন ধরণের রেশম বস্ত্রের কারিতাস নামে একটি বিক্রয় কেন্দ্রও রয়েছে।

মহাবিপন্ন লজ্জাবতী বানর

যাবার উপযুক্ত সময়

মধুপুর জাতীয় উদ্যানে ভ্রমণের জন্য শীতকাল (নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি) সবচেয়ে উপযুক্ত। এই সময় আবহাওয়া শুষ্ক ও ঠান্ডা থাকে। 

গ্রীষ্মকালে বেশি গরম এবং বর্ষাকালে বৃষ্টি হওয়ায় ভ্রমণে অসুবিধা হতে পারে। তবে প্রকৃতির সবুজ সৌন্দর্য উপভোগ করতে চাইলে বর্ষাকালও একটি ভালো সময় হতে পারে।  

মধুপুর উদ্যান কীভাবে যাবেন

টাঙ্গাইল জেলা শহর থেকে ময়মনসিংহ যাবার পথে রসুলপুর মাজার নামক স্থানে গিয়ে বামপাশে মধুপুর জাতীয় উদ্যানের প্রধান ফটক। 

ফটকের পাশেই মধুপুর জাতীয় উদ্যান রেঞ্জ অফিস ও সহকারী বন সংরক্ষকের অফিস অবস্থিত। সেখানে গাড়ি থামিয়ে গেটে অনুমতি নিয়ে বনের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে হয়। 

তাছাড়া আরও একটু সামনে ২৫ মাইল নামক স্থানে গিয়ে ডানদিকে প্রায় ৯ কিঃ মিঃ পথ পাড়ি দিয়ে দোখলা রেঞ্জ অফিস এবং দোখলা রেস্ট হাউজ-এর অবস্থান। সেখানেও অনুমতি নিয়ে বনের অভ্যন্তরে ঢুকতে হয়।

পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা

ফটক দিয়ে গহিন জঙ্গলে প্রবেশ করে ইট বিছানো সর্পিল পথ ধরে একটু এগোলেই মধুপুর জাতীয় উদ্যান রেঞ্জ কার্যালয় ও সহকারী বন সংরক্ষকের কার্যালয়। আরো গহিনে প্রবেশ করতে অনুমতি নিয়ে নিতে হবে এখান থেকেই। 

উদ্যানের প্রবেশপথ থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার ভেতরেই দোখলা পিকনিক স্পট, রয়েছে জলই ও মহুয়া নামের দুটি বিশ্রামাগার। চলতি পথে আপনার চোখে পড়বে বনের চোখধাঁধানো সৌন্দর্য,  কিংবা দেখা হয়ে যেতে পারে কোনো বন্য প্রাণীর সঙ্গে। তখন আপনি পুলকিত না হয়ে পারবেন না। 

সেখান থেকে একটু দূরেই পাবেন দোখালা রেস্ট হাউজ, যেখানে বসে তৈরি হয়েছিল বাংলাদেশের সংবিধান। আরো পাবেন চুনিয়া আর বকুল নামে দুটি মনোরম কটেজ। 

এগুলো আপনি ইচ্ছা করলে দিয়ে রাখতে পারেন অগ্রিম বুকিং এবং আস্বাদন করতে পারেন জঙ্গলে রাত্রিযাপনের এক সুন্দর এবং রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। 

মধুপুর উদ্যানের ভ্রমণ খরচ

মধুপুর জাতীয় উদ্যানে ভ্রমণ খরচ তুলনামূলকভাবে কম। পরিবহনে ঢাকা থেকে আসা-যাওয়ার খরচ বাসে ৫০০-১০০০ টাকা (প্রতি ব্যক্তি)।  

এখানে প্রবেশ ফি প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য প্রতি ২০-৩০ টাকা এবং শিশুদের জন্য ১০-১৫ টাকা। এছাড়াও কেউ  স্থানীয় গাইড ভাড়া করতে চাইলে খরচ পড়বে ৫০০-১০০০ টাকা।  খাবারবাবদ স্থানীয় রেস্তোরাঁয় জনপ্রতি খরচ হতে পারে ১৫০-৩০০ টাকা।  

যারা বাজেচ ট্যুর দিতে চায় এবং প্রকৃতিপ্রেমী তাদের জন্য মধুপুর জাতীয় উদ্যান একটি পারফেক্ট জায়গা হতে পারে।

পিকনিক ও ক্যাম্পিং

মধুপুর জাতীয় উদ্যান পিকনিক এবং ক্যাম্পিংয়ের জন্য একটি দারুণ জায়গা হতে পারে। এখানে পিকনিক করার জন্য নির্ধারিত জায়গা রয়েছে, যেখানে টেবিল ও ছাউনি ভাড়া নেওয়া যায়।  স্বল্প টাকা খরচ করেই এখানে খুব সুন্দর পিকনিক করা যায়। এখানে পিকনিক খরচ 

৫০০-১০০০ টাকা লাগতে পারে। তবে এটা একবারে নির্ধারিত নয়। এছাড়াও ক্যাম্পিংয়ের জন্য আলাদা ফি দিতে হয়ে এবং আগে থেকেই অনুমতি নিতে হয়। ক্যাম্পিং করার ইচ্ছে থাকলে পর্যটকদের ক্যাম্পিংয়ের সরঞ্জাম নিয়েই আসাই ভালো। 

পর্যটকদের জন্য পরামর্শ 

  • উদ্যানের পরিবেশ রক্ষার জন্য যেখানে সেখানে পলিথিন, প্লাস্টিক না ফেলাই উত্তম। 
  • ভালোভাবে জায়গাটা ঘুরে দেখার জন্য স্থানীয় গাইডের সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।প্রাকৃতিক জূব বৈচিত্র রক্ষার্থে বন্য প্রাণী বিরক্ত না করে দূর থাকা উচিত। 
  • পর্যাপ্ত পানীয় জল ও প্রয়োজনীয় ওষুধ সঙ্গে রাখা ভালো। 

মধুপুর জাতীয় উদ্যান প্রকৃতিপ্রেমী ও ভ্রমণকারীদের জন্য একটি চমৎকার স্থান। এর বন্য পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং শালবনের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য যে কোনো ভ্রমণকারীর মন জয় করতে সক্ষম। ব্যস্ত শহুরে জীবনের ক্লান্তি দূর করতে প্রকৃতির মাঝে হারিয়ে যাওয়ার জন্য মধুপুর জাতীয় উদ্যান একটি আদর্শ গন্তব্য। 

সোর্স

Related posts

স্বপ্নের গন্তব্য- ‘সাগরকন্যা কুয়াকাটা’

আশা রহমান

পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন ‘সুন্দরবন’ ভ্রমণ

সাবরিনা শায়লা ঊষা

মেঘের স্রোতে, সাজেকের পথে

Leave a Comment

Table of Contents

    This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More