Image default
ঘটমান বর্তমান

USAID ও ট্রাম্প-মাস্কের যত পাঁয়তারা

ইলন মাস্ক USAID-কে “একটি অপরাধী সংস্থা” হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং বলেছেন যে- “এটি একটি পচা আপেল নয়, বরং পুরোপুরি পচা একগুচ্ছ পোকা”।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প সরকার ক্ষমতায় আসার পর বাতিল করা হয়েছে দুই শতাধিক চুক্তি। এমনকি মার্কিন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা USAID ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। সংস্থাটির কর্মীদের দপ্তরে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে;  খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না তাদের ওয়েব সাইট এবং টুইটার পেজ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইলন মাস্ক USAID এর ব্যয়ের কঠোর সমালোচনা করে সংস্থাটিকে ‘অপরাধী সংগঠন’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। 

এখন প্রশ্ন হলো কেন ট্রাম্প-মাস্ক সরকার বন্ধ করে দিতে চান বিশ্বের সবচেয়ে বড় এই উন্নয়ন সংস্থাটি? বর্তমান বিশ্বের টেক জায়ান্ট ইলন মাস্কের এর পেছনে কী উদ্দেশ্য রয়েছে? ট্রাম্প কি আসলেই বন্ধ করে দিতে পারবেন USAID কে? 

USAID কী

USAID এর পূর্ণ রুপ ইউনাইটেড স্টেটস এজেন্সি ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট(United States Agency for International Development)।

মূলত স্নায়ুযুদ্ধের সময় সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাব মোকাবিলার একটি কৌশল হিসেবে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জন এফ. কেনেডি ১৯৬১ সালে সংস্থাটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কেনেডি চেয়েছিলেন সংস্থাটি এমন একটি কার্যকরী প্রতিষ্ঠান হবে, যা বিদেশে সহায়তা প্রদান করার মাধ্যমে, মার্কিন স্বার্থ রক্ষা করে চলবে। বৈদেশিক সম্পর্ক রক্ষার জন্য প্রতিটি দেশেরই পররাষ্ট্র দপ্তর থাকে। কিন্তু, প্রেসিডেন্ট কেনেডি পররাষ্ট্র দপ্তরকে অত্যন্ত জটিল ও ধীরগতি সম্পন্ন একটি বিভাগ মনে করতেন, আর এ থেকেই USAID এর সৃষ্টি।

USAID-এর সদর দপ্তর

১৯৬১ সালে মার্কিন কংগ্রেস Foreign Assistance Act পাস করে, যার ফলে USAID একটি স্বাধীন সংস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরেও USAID তার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। সমর্থকদের মতে, এই সংস্থার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন দেশে সহায়তা প্রদান করে—ভূ-রাজনীতি এবং বিশ্ব বাজারে রাশিয়া ও চীনের প্রভাব মোকাবিলা করছে। এদিকে চীনও তার নিজস্ব “Belt and Road” কর্মসূচির মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন দেশে-বিদেশে সহায়তা দিচ্ছে। 

USAID কিভাবে কাজ করে?

USAID সংস্থাটি সাধারণত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ত্রাণ ও উন্নয়ন সহায়তা প্রদান করার মাধ্যমে নিজেদের প্রভাব বজায় রাখে। এসব সহায়তার মধ্যে রয়েছে- 

খাদ্য সহায়তা: দুর্ভিক্ষপীড়িত অঞ্চলে খাদ্য সরবরাহের পাশাপাশি বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত দুর্ভিক্ষ শনাক্তকরণ ব্যবস্থা পরিচালনা করা।

স্বাস্থ্য কার্যক্রম: পোলিও টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনা, মহামারির বিস্তার রোধ করা এবং বিভিন্ন সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে কাজ করা।

উন্নয়ন ও শিক্ষা: অবকাঠামো নির্মাণ, দারিদ্র্য বিমোচন, শিক্ষা প্রসার এবং গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রসারে সহায়তা করা।

USAID এর বাংলাদেশ অফিস

এসব লক্ষ্য বাস্তবায়নে USAID-এর প্রায় ১০,০০০ কর্মী রয়েছে, যার দুই-তৃতীয়াংশ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কাজ করে। এখন পর্যন্ত সংস্থাটির ৬০টিরও বেশি দেশে অফিস রয়েছে এবং মোট ১০০টিরও বেশি দেশে USAID সরাসরি বা পরোক্ষভাবে সহায়তা প্রদান করে। তবে, মাঠপর্যায়ের কাজ সাধারণত বিভিন্ন চুক্তিভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ও অলাভজনক সংস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হয়।

USAID এর তহবিল ও কার্যক্রম

USAID এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ২০২৩ সালে ছয় বিলিয়নেরও বেশি ডলার আন্তর্জাতিক সহায়তায় ব্যয় করেছে, যার মধ্যে শুধু USAID এককভাবেপ্রায় চার বিলিয়ন ডলার ব্যবহারের দায়িত্বে ছিল। এই সহায়তার বেশিরভাগ অংশ এশিয়া, সাব-সাহারান আফ্রিকা ও ইউরোপে, বিশেষ করে ইউক্রেনের মানবিক সহায়তায় ব্যয় করা হয়েছে। 

USAID এর ত্রাণ সহায়তা

একই অর্থবছরে বিশ্বের নানা প্রান্তের সংঘাত কবলিত অঞ্চলে নারীদের স্বাস্থ্য থেকে শুরু করে বিশুদ্ধ পানি, এইচআইভি চিকিৎসা, জ্বালানি সুরক্ষা ও দুর্নীতি দমন কাজের পেছনে প্রায় ৭২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সহায়তা দিয়েছে সংস্থাটি। ২০২৪ সালের এক প্রতিবেদনে জানা যায়, শুধুমাত্র BBC Media Action নামক একটি আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থায় USAID ৩.২৩ মিলিয়ন ডলার সহায়তা দিয়েছে। 

কেন ডোনাল্ড ট্রাম্প USAID বন্ধ করতে চান

সব কিছু মিলিয়ে বিশ্বব্যাপী USAID-এর তার বিশেষ প্রভাব তৈরি করেছে। সংস্থাটি শুধু যুক্তরাষ্ট্রের নয়, এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ উন্নয়ন সহায়তা সংস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে নবনির্বাচিত ট্রাম্প সরকার আসার পর থেকে USAID নিয়ে তৈরি হয়েছে বিশেষ বিতর্ক। 

ডোনাল্ড ট্রাম্প মনে করেন, সংস্থাটির মাধ্যমে সহায়তা প্রদান আমেরিকান জনগণের করের অর্থের সঠিক ব্যবহার নয়। তিনি USAID কে ‘উগ্র বামপন্থীদের’ নিয়ন্ত্রিত একটি সংস্থা বলেও মন্তব্য করেন।  সমালোচকদের মতে, USAID-এর অনেক প্রকল্প অপ্রয়োজনীয় এবং এটি শুধু একটি উদারনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য ব্যবহৃত হয়। এ ছাড়া একটি জনমত জরিপে দেখা গেছে, বেশির ভাগ আমেরিকান ভোটারই বৈদেশিক সহায়তার খরচ কমানোর পক্ষে। 

USAID নিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্য

২০২৪ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফিরে, ট্রাম্প প্রথমেই ৯০ দিনের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা ব্যয় স্থগিত রাখার নির্বাহী আদেশ জারি করেন। এরপর স্টেট ডিপার্টমেন্ট USAID এর বেশির ভাগ প্রকল্প বন্ধ করে দেয়। কিন্তু এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক উন্নয়ন খাতে বিশাল অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে।

USAID বন্ধ হলে ইলন মাস্কের লাভ কোথায় 

এই ইস্যুতে ট্রাম্পের পাশে দাড়িয়েছেন বর্তমান বিশ্বের প্রযুক্তি জগতের মহামানব ইলন মাস্ক। তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের ফেডারেল বাজেটের ব্যয় সংকোচনের দায়িত্বে আছেন। ইলন মাস্ক এক আলোচনায় বলেন, তিনি প্রেসিডেন্টের সাথে USAID বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্তে একমত।

USAID বন্ধের পেছনে ইলন মাস্কের যুক্তি হলো- 

রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ – মাস্ক দাবি করেছেন যে USAID একটি রাজনৈতিকভাবে পক্ষপাতদুষ্ট সংস্থা, যা বিশ্বজুড়ে বামপন্থী এজেন্ডা প্রচার করছে এবং সংস্থাটি “আমেরিকা-বিরোধী” কার্যক্রমে যুক্ত।

“অপরাধী সংস্থা” হিসেবে আখ্যা – তিনি USAID-কে “একটি অপরাধী সংস্থা” হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং বলেছেন যে- 

“এটি একটি পচা আপেল নয়, বরং পুরোপুরি পচা একগুচ্ছ পোকা”।

সরকারি ব্যয় কমানো USAID প্রতি বছর বিলিয়ন ডলার আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রদান করে, যা মাস্ক ও ট্রাম্প প্রশাসন “অপচয়” বলে মনে করছেন। তারা মনে করেন, এই অর্থ আমেরিকান জনগণের স্বার্থে ব্যবহার করা উচিত।

DOGE-এর মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা – মাস্কের তৈরি Department of Government Efficiency (DOGE) ইতোমধ্যে USAID-এর নিরাপত্তা ও কর্মী সম্পর্কিত নথিতে প্রবেশ করেছে এবং সংস্থাটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের বরখাস্ত করেছে।

ট্রাম্পের পাশে ইলন মাস্ক দাঁড়িয়ে আছে

USAID বন্ধ হলে ইলন মাস্কের লাভ 

এদিকে সংস্থাটি বন্ধ হলে ইলন মাস্কও বিভিন্নভাবে লাভবান হবেন। এক নজরে দেখতে গেলে- 

– সরকারি বাজেট কমানোর মাধ্যমে ইলন মাস্ক নিজেকে “দক্ষ প্রশাসক” প্রমাণ করতে পারবেন।
– যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক সহায়তা কমিয়ে ভেতরের খাতে বিনিয়োগের প্রস্তাবনা তুলবেন।
– USAID বন্ধ হলে প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা খাতে তহবিল স্থানান্তরের সুযোগ তৈরি হবে।
– তার কোম্পানির (যেমন: SpaceX, Starlink) জন্য নতুন সরকারি চুক্তির সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাবে।

মূলত, বিশ্বের অন্যতম সফল ও ধনী এই ব্যক্তি আরও বেশি ধনী ও সফল হয়ে উঠবেন। 

USAID বন্ধের প্রভাব 

এখন USAID যদি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়, তার সাথে বিশ্বজুড়ে বিপুলসংখ্যক উন্নয়নমূলক প্রকল্পও বন্ধ হয়ে যাবে। এই সিদ্ধান্ত বিশেষত দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ব্যাপক প্রভাব ফেলবে। যেমন— সাব-সাহারান আফ্রিকায় খাদ্য সংকট ও স্বাস্থ্যসেবায় বিপর্যয় ঘটবে। HIV নিয়ন্ত্রণে USAID-এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল; কিন্তু এখন এই প্রকল্পগুলোর অধীনে পরিচালিত ক্লিনিকগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

মেক্সিকোতে USAID-এর সহায়তায় পরিচালিত একটি ব্যস্ত শরণার্থী আশ্রয়কেন্দ্র এখন চিকিৎসকবিহীন হয়ে পড়েছে। ভেনিজুয়েলা থেকে পালিয়ে আসা সমকামী যুবকদের মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা দেওয়ার একটি কর্মসূচি সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে।

এছাড়াও USAID-এর স্থগিতাদেশের ফলে হাজার প্রকল্প এবং প্রকল্পের অধীনে হাজারো কর্মী বেকার হয়ে পড়ছে। সে সম্পর্কে পুরো তথ্য এখনো প্রকাশ করছে না ট্রাম্প প্রশাসন। তবে এটি পরিষ্কার যে USAID বন্ধ হলে বিশ্বজুড়ে মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে মারাত্মক প্রভাব পড়বে। 

ট্রাম্প কি পারবেন USAID বন্ধ করতে

ট্রাম্প প্রশাসনের USAID এর ওপর বড় ধরনের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে, তবে, আইনগতভাবে এটি সরাসরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। 

কংগ্রেস ‘ফরেন অ্যাসিস্ট্যান্স অ্যাক্ট’ পাস করার মাধ্যমে USAID একটি স্বাধীন এবং স্বতন্ত্র নির্বাহী সংস্থা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ফলে নির্বাহী আদেশ দিয়ে এটি বিলুপ্ত করা সম্ভব নয়। এমন কিছু করতে গেলে কংগ্রেস ও আদালতে আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হতে পারে ট্রাম্প প্রশাসনকে। কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া সংস্থাটি পুরোপুরি বন্ধও করা যাবে না। আবার এদিকে বর্তমানে রিপাবলিকানরা কংগ্রেসের দুই কক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও ব্যবধান খুবই কম, তাই বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও রাজনৈতিক লড়াইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে।

USAID বন্ধ নিয়ে আন্দোলন

যুক্তরাষ্ট্র যে কৌশলগত কারণেই USAID প্রতিষ্ঠা করুক না কেন তারা সফল, এবং, বিশ্বজুড়ে তাদের প্রভাব অব্যাহত ছিলো। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প এবং মাস্ক প্রসাশন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকের অর্থ বাঁচাতে গিয়ে USAID কে হয়তো সরাসরি পররাষ্ট্র অধিদপ্তের অধীনে নিয়ে আসবেন। কিন্তু সেক্ষেত্রেও, বিশ্ব বাজারে চীনের আধিপত্য বেড়ে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে, যা ট্রাম্প তথা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নেতিবাচক হতে পারে। সংস্থাটি নিয়ে এখনও অনেক হিসাব নিকাশ বাকি।

সোর্স

Related posts

বাংলাদেশে যত সন্ত্রাসবিরোধী অপারেশন – অপারেশন ডেভিল হান্ট ও অন্যান্য

ফেক নিউজ ও পৃথিবীজোড়া যত অদ্ভুত কাণ্ড

পুশরাম চন্দ্র

‘কিংস পার্টি’ বাহাস: শুরুতে আলোচনায়, শেষে ধরাশায়ী

Leave a Comment

Table of Contents

    This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More