Image default
নগর পরিচিতি

সিঙ্গাপুর- দক্ষিণ এশিয়ার লায়ন সিটি

একসময়ের “জেলে পল্লীখ্যাত’’, দেশটি বিশ্বের বুকে প্রমান করে দিয়েছে যেখানে সৃজনশীলতা এবং পরিশ্রম একত্রিত হয় সেখানে অসম্ভবকে সম্ভব করা  বড় কোন ব্যাপার না

বরার্ট ব্রুস এবং মাকড়সার গল্পটি নিশ্চয় সবার মনে সবার মনে আছে? গল্পে মাকড়সাটি বার বার ব্যর্থ হওয়ার পরও নিরাশ হয়নি। সে একনিষ্ঠ চেষ্টা ও পরিশ্রম করে তার লক্ষ্য অর্জনে সফল হয়। 

ঠিক তেমনি বিশ্বের বুকে এমন একটি দেশ রয়েছে, যে দেশটিতে প্রারম্ভিককালে মাত্র ১২০ টি জেলে পরিবার বাস করত। কয়েক বছরের আন্তরিক ও পরিকল্পিত চেষ্টায় দেশটি বর্তমানে পরিণত হয়েছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য কেন্দ্রে। 

কাউকে যদি প্রশ্ন করা হয় বিশ্বের সবচেয়ে সুশৃঙ্খল, সজ্জিত এবং সমৃদ্ধ দেশ কোনটি? তবে এক মুহূর্ত অপেক্ষা না করে প্রথম সারির যে দেশগুলোর নাম আসবে তার মধ্যে সিঙ্গাপুর একটি। হ্যাঁ, সিঙ্গাপুর। বর্তমানে দেশটি পুরোপুরিভাবে দুর্নীতিমুক্ত, পরিচ্ছন্ন এবং উন্নত একটি দেশ।  

বিশ্বের যেখানে যা কিছু ভালো সবই যেন এখানে কপি-পেস্ট করে রাখা হয়েছে সিঙ্গাপুরে। সর্বাধিক বিশেষণে বিশেষিত দেশটির দক্ষিণ এশিয়ার বাঘ হয়ে ওঠার পথ মোটেও মসৃণ ছিল না। চলুন আজকে সিঙ্গাপুরের ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প জানা যাক।

অফিসিয়াল নাম সিঙ্গাপুর প্রজাতন্ত্র 
রাজধানী  সিঙ্গাপুর সিটি
সরকারি ভাষা ইংরেজি,মান্দারিন,অন্যান্য চীনা উপভাষা
মূদ্রা সিঙ্গাপুরী ডলার
প্রধান ধর্ম বৌদ্ধ,খ্রিষ্টান,ইসলাম,হিন্দু
সময় অঞ্চল  (GMT +8) সিঙ্গাপুর মানক সময়

সিঙ্গাপুরের আয়তন ও জনসংখ্যা

এশিয়ার দ্বিতীয় ক্ষুদ্রতম দেশ সিঙ্গাপুর। মজার বিষয় হলো, সিঙ্গাপুরের প্রশাসন সমুদ্রতলের মাটি, পর্বত, ও অন্যান্য দেশ থেকে মাটি সংগ্রহ করে দেশটির স্থলভাগের আয়তন বৃদ্ধি করে চলেছে। 

১৯৬০ এর দশকে সিঙ্গাপুরের আয়তন ছিল প্রায় ৫৮২ বর্গকিলোমিটার। বর্তমানে দেশটির আয়তন ৭২৮ বর্গকিলোমিটার এবং ২০৩৩ সাল নাগাদ বৃদ্ধি পাবে আরও ১০০ বর্গ কিলোমিটার। 

৭২৮ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের এই দেশটিতে মোট জনসংখ্যা প্রায় ৫৭ লক্ষ ৩৬ হাজার। সিঙ্গাপুরের জনসংখ্যা অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় এবং এর অনেক বাসিন্দায় বিদেশী বংশভূত। 

জনসংখ্যার মাত্র ৬৩% আসলে সিঙ্গাপুরের নাগরিক ৩৭% অতিথি কর্মী বা স্থায়ী বাসিন্দা। জাতিগতভাবে সিঙ্গাপুরের বাসিন্দাদের ৭৪% চীনা,১৩.৪% মালয়, ৯.২% ভারতীয় এবং প্রায় ৩% মিশ্র জাতি বা অন্যান্য গোষ্ঠীর অন্তর্গত।

ভৌগোলিক অবস্থান ও জলবায়ু

সিঙ্গাপুর সিটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অবস্থিত একটি প্রধান শহর-রাষ্ট্র এবং দ্বীপপুঞ্জ। এটি ভৌগোলিকভাবে মালয় উপদ্বীপের দক্ষিণ প্রান্তে, মালেশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মধ্যবর্তী একটি কৌশলগত স্থানে অবস্থিত। 

সিঙ্গাপুর প্রণালী ও জোহর প্রণালী দিয়ে ইন্দোনেশিয়া ও মালয়শিয়া থেকে পৃথক হয়েছে। সিঙ্গাপুরের মূল ভূখন্ডটি একটি হীরকাকৃতি দ্বীপ, তবে এর চারপাশে প্রায় ৬০ টিরও বেশি ক্ষুদ্র দ্বীপপুঞ্জ রয়েছে। প্রধান দ্বীপটি “পুলাউ উজং” নামে পরিচিত। 

সিঙ্গাপুরে সারা বছরই প্রচুর বৃষ্টি হয়। নভেম্বর থেকে জানুয়ারী মাস পর্যন্ত উত্তর-পূর্ব মৌসুমী বর্ষা এবং জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমী বর্ষা দেখা যায়। দেশটির বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত ২২০০ মি.মি.।

ম্যাপ 

সিঙ্গাপুরের ইতিহাস 

সিঙ্গাপুরের ইতিহাসের শুরুর দিকটি মূলত মালয় সংস্কৃতি এবং সামুদ্রিক ব্যবসার সাথে সম্পর্কিত। 

প্রাচীনকালে এটি তেমাসেক নামে পরিচিত ছিল, যার অর্থ সমুদ্র নগর। সিঙ্গাপুর বিভিন্ন সম্রাজ্য ও রাজা অধীনে শাসিত হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে, মাজাবাহিত সাম্রাজ্য, মালাক্কা সালতানাত এবং জোহর সালতানাত।

ব্রিটিশ উপনেবিশক আমলে সিঙ্গাপুর

১৮১৯ সালে ব্রিটিশ উপনিবেশিক কর্মকর্তা স্টামফোর্ড রেফেলস সিঙ্গাপুরে আসেন। তিনি এই দ্বীপকে বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। ব্রিটিশদের শাসনে সিংগাপুর দ্রুত বাণিজ্যের কেন্দ্রে পরিণত হয়। চীন, ভারত এবং মালয় অঞ্চল থেকে প্রচুর অভিবাসীরা শহরের ব্যস্ত বন্দরে কাজ করতে আসায় এর জনসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পায়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সিঙ্গাপুর

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪২ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত সিঙ্গাপুর জাপানি বাহিনীর দখলে ছিলো। এ সময়টি সিঙ্গাপুরের ইতিহাসের এক অন্ধকার অধ্যায়। যুদ্ধ শেষে সিঙ্গাপুর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের একটি শীর্ষ ঔপনিবেশে পরিণত হয় এবং স্ব-শাসনের দিকে অগ্রসর হতে শুরু করে। ১৯৫৯ সালে শহরটি স্বায়ত্তশাসিত রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। 

মালয়েশিয়ার অধীনে সিঙ্গাপুর

১৯৬৩ সালে এটি মালয়েশিয়ার সাথে অধীনে ছিল। কিন্তু, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মতভেদের কারণে, ১৯৬৫ সালে সিঙ্গাপুর সম্পূর্ণ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। স্বাধীনতার পর সিঙ্গাপুরের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউ এর নেতৃত্বে দেশটি দ্রুত উন্নতির শিখরে পৌছায়। 

সিঙ্গাপুরের নাম লায়ন সিটি রাখার কারণ

সিঙ্গাপুরের নাম লায়ন সিটি রাখার পেছনে একটি ঐতিহাসিক ও পৌরাণিক কাহিনী রয়েছে। 

১৩ শতাব্দীতে সুমাত্রা শাসক রাজা সঙ্গ নীলা উত্তমা সিঙ্গাপুর দ্বীপে আসেন। তিনি সেখানে প্রথমবারের মতো একটি প্রাণী দেখতে পান, যা তিনি সিংহ বলে ধারণা করেন। এই ঘটনায় অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি সেই স্থানের নাম রাখেন সিংহপুরা।

যদিও আধুনিক বিজ্ঞান বলছে সিঙ্গাপুরে কখনো সিংহ ছিল না, তিনি সম্ভবত একটি মালোয়ান বাঘ দেখেছিলেন। এভাবেই সিঙ্গাপুর শহরটি লায়ন সিটি হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে। তবে, এই কাহিনী সিঙ্গাপুরের ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই পৌরাণিক গল্পটি দেশটির দুইটি গুরুত্বপূর্ণ সিম্বলের মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়। এই সিম্বল দুইটি হলো লায়ন হেড সিম্বল ও মেরলিয়ন। এদের একটি হলো সিংহ এবং আরেকটি হলো মাছ। 

সিঙ্গাপুরের শাসনব্যবস্থা ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

সিঙ্গাপুরের শাসন ব্যবস্থা হল একক সংসদীয় প্রজাতন্ত্র । দেশটি তার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং দক্ষ প্রশাসনিক ব্যবস্থার জন্য সুপরিচিত। 

সিঙ্গাপুরের রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের প্রধান এবং প্রধানমন্ত্রী হলো সরকার প্রধান। সিঙ্গাপুরে ওয়েস্টমিনিস্টার সিস্টেমের মতো সরকারের তিনটি পৃথক শাখা রয়েছে। এগুলো হলো আইন সভা, নির্বাহী বিভাগ এবং বিচারবিভাগ।

১৯৫৯ সালের সাধারণ নির্বাচনের পর থেকে সিঙ্গাপুরের রাজনীতিতে পিপলস অ্যাকশন পার্টির (পিএপি) আধিপত্য রয়েছে। পিএপি দীর্ঘ সময় ধরে সিঙ্গাপুরের রাজনীতিতে প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করছে। 

সিঙ্গাপুরের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য

সিঙ্গাপুর একটি বহুজাতিক এবং বহুধর্মীয় দেশ। সিঙ্গাপুরের সংস্কৃতি অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় এবং বহুজাতিক। দেশটির সংস্কৃতিতে প্রধান চারটি জাতিগোষ্ঠীর প্রভাব রয়েছে। এই প্রধান চারটি জাতিগোষ্ঠী হলো- চীনা, মালয়, ভারতীয় এবং ইউরোপীয়। যেখানে বিভিন্ন সংস্কৃতির মিলনের ফলে অনেক জনপ্রিয় উৎসব উদযাপিত হয়। এখানে কয়েকটি প্রধান এবং জনপ্রিয় উৎসবের তালিকা দেওয়া হলো:

চাইনিজ নিউ ইয়ার 

চীনা সম্প্রদায়ের অন্যতম বড় উৎসব এটি। জানুয়ারি বা ফেব্রুয়ারি এই উৎসব পালিত হয়। বাড়ি সাজানো, লাল রঙের পোশাক পরা, লায়ন ড্যান্স এবং পরিবারিক ভোজ এই উৎসবের মূল আকর্ষণ।

হরি রায়া পূআসা-ঈদুল ফিতর 

মূলত ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব, যা ঈদুল ফিতর নামে পরিচিত। এটি রমজান মাসের রোজা রাখার পর, শাওয়াল মাসের প্রথম দিনেপালিত হয়। পরিবার-পরিজনের সঙ্গে দেখা করা, খাবার ভাগাভাগি করা এবং ঘরবাড়ি সাজানো এই উৎসবের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

দীপাবলি (Deepavali)

হিন্দু সম্প্রদায়ের জন্য দীপাবলি (আলো উৎসব) খুব গুরুত্বপূর্ণ। এটি অন্ধকারের উপর আলো এবং জ্ঞানের উপর অজ্ঞতার বিজয় উদযাপন করে। হিন্দু মন্দিরে পূজা, ঘরবাড়ি সাজানো, এবং লিটল ইন্ডিয়া এলাকায় আলোকসজ্জা এই উৎসবের অংশ।

ক্রিসমাস (Christmas)

সিঙ্গাপুরের  ক্রিসমাস উদযাপন অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ এবং বৈচিত্র্যময়। শহরটি এই সময়ে বিশেষভাবে আলোকিত হয় এবং বিভিন্ন স্থানে বড়দিনের সাজসজ্জা দেখা যায়। সিঙ্গাপুরের অর্চার্ড রোড রঙিন আলোকসজ্জা, বিশাল ক্রিসমাস ট্রি, এবং থিম-ভিত্তিক সাজসজ্জার জন্য বিখ্যাত। ক্রিসমাস উপলক্ষে সিঙ্গাপুরের শপিং মলে বড় ছাড় এবং বিশেষ অফার থাকে। এ সময় পর্যটকেরা কেনাকাটায় মেতে ওঠেন।

সিঙ্গাপুরের ক্রিসমাস উদযাপন

মিড-অটাম ফেস্টিভ্যাল (Mid-Autumn Festival)

মিড-অটাম ফেস্টিভ্যাল, যা চন্দ্র উৎসব বা ল্যান্টার্ন ফেস্টিভ্যাল নামেও পরিচিত, সিঙ্গাপুরে অত্যন্ত জনপ্রিয়ভাবে উদযাপিত হয়। এটি চীনা ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসব, যা সাধারণত চন্দ্র ক্যালেন্ডারের ৮ম মাসের ১৫তম দিনে পালিত হয়। এই উৎসবের মূল আকর্ষণ চাঁদ। 

সিঙ্গাপুরে এটি বিভিন্ন উপায়ে উদযাপন করা হয়। সিঙ্গাপুরের বিভিন্ন পার্ক এবং চীনা বাগানে রঙিন ল্যান্টার্ন প্রদর্শনী হয়। এগুলোতে চীনা পুরাণ, প্রাণী, এবং ঐতিহাসিক চরিত্রের প্রতীকী চিত্র দেখা যায়। মুনকেক খাওয়া এবং উপহার দেওয়া এই উৎসবের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

সিঙ্গাপুরের জনপ্রিয় খাবার 

সিঙ্গাপুরের রন্ধন প্রণালী তার জনগণের মতোই জাতিগতভাবে বৈচিত্র্যময়। এদেশের খাবারে মালয়, চীনা, ইন্দোনেশিয়ান, ভারতীয় এবং পশ্চিমা প্রভাব রয়েছে। কিছু জনপ্রিয় সিঙ্গাপুরিয়ান খাবার হলো- 

হাইনানিজ কারি রাইস

এটি সিঙ্গাপুরের জাতীয় খাবার গুলোর মধ্যে একটি। হাইনানিজ কারি রাইস হলো একটি থালা যাতে প্রচুর পরিমাণে বাষ্প যুক্ত সাদা ভাত থাকে। এটি তরকারি এবং শুয়োরের মাংসের গ্রেভি দিয়ে সাজিয়ে পরিবেশন করা হয়। 

লাকসা 

চিংড়ি, মাছের কেক, ডিম ও মুরগির মাংসের সাথে মশলাদার নারিকেল কারি স্যুপে রাইস নুডলস। চাইনিজ এবং মালয় খাবারের সংমিশৃত রূপ লাকসা। লাকসার অনেক রূপ রয়েছে। লাকসাতে কখনো কখনো cookles এবং tofu puffs যোগ করা হয়। 

মরিচ কাঁকড়া 

টমেটো চিলি বেস দিয়ে আধা পুরু গ্রেভিতে রান্না করা শক্ত খোসা কাঁকড়া। স্টিম করা কাঁকড়াগুলি আংশিকভাবে ফাটানো হয়, তারপরে চিলি সস, কেচাপ এবং ডিমের পেস্টে হালকা করে ভাজা হয়। এটি সিঙ্গাপুরের অতিশয় সুস্বাদু একটি খাবার। 

পর্যটন আকর্ষণ ও দর্শনীয় স্থান 

সিঙ্গাপুর একটি আধুনিক ও জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্য। এদেশে রয়েছে বিশ্বমানের দর্শনীয় স্থান স্থাপত্যশৈলী ও বিনোদনের ব্যবস্থা। অপরূপ সৌন্দর্যে পরিবেষ্টিত দেশটিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে লোকজন পাড়ি জামায়। চলুন সিঙ্গাপুরে কিছু পর্যটন ও দর্শনীয় স্থান সম্পর্কে জানা যাক- 

বার্ড প্যারাডাইস 

সিঙ্গাপুরের বার্ড প্যারাডাইস একটি আধুনিক পাখি অভয়ারণ্য। সদ্য খোলা বার্ড প্যারাডাইস কেবল ছোট বাচ্চাদেরকেই নয় খুব প্রাপ্তবয়স্কদের জন্যও বেশ আনন্দদায়ক একটি পর্যটন স্থান। স্থানটি ৪০০ প্রজাতিরও বেশি পাখির আবাসস্থল। বার্ড প্যারাডাইসের লক্ষ্য কেবল বিনোদন নয়, এখানকার কতৃপক্ষরা পাখির সংরক্ষণের ব্যবস্থাও করে থাকেন। 

মেরলাইন পার্ক 

মেরলাইন পার্ক (Merlion Park) সিঙ্গাপুরের একটি বিখ্যাত পর্যটন স্থল। এটি সিঙ্গাপুর নদীর তীরে অবস্থিত। সিঙ্গাপুরের ঐতিহাসিক এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অন্যতম প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয় স্থানটি।

মেরলাইন পার্ক সিঙ্গাপুর

মেরলাইন হল সিংহ ও মাছের মূর্তি। এটি সিংহের মাথা এবং মাছের শরীরের সংমিশ্রণ। মাছের শরীর সিঙ্গাপুরের ঐতিহাসিক শিকড়। সিঙ্গাপুর যে সমুদ্র পথে মাছ ধরার গ্রাম ছিল এই প্রতীক সেই ইতিহাসেরই প্রতিফলন ঘটায়। ৮.৬ মিটার উঁচু এবং প্রায় ৯০ টন ওজনের মূর্তিটি ফোয়ারা হিসেবে কাজ করে এবং এর মুখ থেকে অনবরত পানি বের হয়। 

মেরিনা জলপ্রপাত 

মেরিনা জলপ্রপাত সিঙ্গাপুরের একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্রকেন্দ্র। এটি দেশটির জুয়েল চাঙ্গী এয়ারপোর্টের ভেতরে অবস্থিত বিশ্বের সর্বোচ্চ ইনডোর জলপ্রপাত। এর উচ্চতা প্রায় ৪০ মিটার, জলপ্রপাতটি একটি বিশাল গম্বুজাকৃতির কাঁচের ছাদের নিচে অবস্থিত। এর চারপাশ ঘন সবুজ উদ্যান দিয়ে ঘেরা। বৃষ্টির পানি ব্যবহার করে এই জলপ্রপাতটি পরিচালিত হয়।

আইসক্রিম মিউজিয়াম 

সিঙ্গাপুরের `মিউজিয়াম অফ আইসক্রিম` অনন্য এবং আকর্ষণীয় একটি স্থান। এটি আইসক্রিম প্রেমীদের জন্য বিশেষভাবে তৈরি করা হয়েছে। আইসক্রিমের জন্য উৎসর্গ করা একমাত্র আন্তর্জাতিক জাদুঘরটি ২০২১ সালে প্রথম চালু করা হয়।

আইসক্রিম মিউজিয়াম সিঙ্গাপুর

জাদুঘরটির প্রধান আকর্ষণের মধ্যে রয়েছে, জাদুঘরটি বিভিন্ন থিমযুক্ত কক্ষ নিয়ে গঠিত, যেখানে প্রতিটি কক্ষে ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতা উপভোগ করা যায়। পর্যটকরা পাঁচটি ভিন্ন ভিন্ন স্টেশনে বিভিন্ন স্বাদের আইসক্রিম উপভোগ করতে পারেন। মিউজিয়ামটিতে একটি স্প্রিংকল পুল রয়েছে, পুলটিতে রং বেরঙের স্প্রিংকল দিয়ে ভরা, পর্যটকরা এখানে ডুব দিয়ে মজা করতে পারেন। 

সিঙ্গাপুর ক্যাবল কার 

১৯৭৪ সালে প্রথম চালু হওয়া সিঙ্গাপুর ক্যাবল কার দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার প্রথম ক্যাবল কার সিস্টেম। একই সাথে এটি সিঙ্গাপুরের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনা আকর্ষণ। এই ক্যাবল কার সেন্টোসা দ্বীপ এবং মাউন্ট ফ্যাবারকে যুক্ত করেছে। এটি দর্শনার্থীদের সিঙ্গাপুরের প্রকৃতির একটি চমৎকার বার্ডস আই ভিউ উপভোগ করার সুযোগ দেয়। সিঙ্গাপুরের আইকনিক ক্যাবল কারের সাহায্যে পুরো শহরটি ঘুরে দেখারো সুযোগ রয়েছে। 

সিঙ্গাপুরের কেবল কার

সিঙ্গাপুর চিড়িয়াখানা

সিঙ্গাপুর চিড়িয়াখানা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম চিড়িয়াখানা। এটি ওপেন কনসেপ্ট চিড়িয়াখানা হিসেবে পরিচিত। এই চিড়িয়াখানার বিশেষত্ব  হচ্ছে এখানে প্রাণীদের খাঁচায় রাখা হয় না বরং প্রাকৃতিক মুক্ত পরিবেশে ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়। চিড়িয়াখানা টি ২৮ হেক্টর এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এবং এখানে প্রায় ৩১৫ প্রজাতির ৩০০০ প্রাণী রয়েছে। চিড়িয়াখানার নকশা এমন ভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে দর্শকরা নিজেকে গ্রীষ্মমন্ডলীও বনের মধ্যে মনে করেন, এখানে নাইট সাফারি অর্থাৎ রাতে প্রাণীদের কার্যকলাপ দেখার সুযোগ রয়েছে। সিঙ্গাপুর চিড়িয়াখানাটি পরিবার ও বাচ্চাদের জন্য দুর্দান্ত ভ্রমণের স্থান।

জেলে পল্লী থেকে যেভাবে এশিয়ার বাঘ হয়ে ওঠলো সিঙ্গাপুর 

জেলে পল্লীখ্যাত দেশটি এশিয়ার অর্থনৈতিক হাব হয়ে ওঠার গল্পটি বিশ্ব অর্থনীতির ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ছোট একটি দ্বীপ দেশ যার নিজস্ব কোন প্রাকৃতিক সম্পদ নেই, তবে, সঠিক নেতৃত্বে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা এবং কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে সিঙ্গাপুর নিজেকে বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে গড়ে তুলেছে। 

আধুনিক সিঙ্গাপুর

আধুনিক সিঙ্গাপুরের জনক লি কুয়ান ইউ বিধ্বস্ত দেশকে আধুনিক, উন্নত এবং দারিদ্র্যমুক্ত রাষ্ট্রে রূপান্তরের জন্য সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। তিনি ভবিষ্যৎ গঠনের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেন। এসব পদক্ষেপের মধ্যে অন্যতম ছিলো আন্তর্জাতিক বানিজ্যে মনোনিবেশ, ব্যাবসাবান্ধব পরিবেশ ও সরকারি খাতে দক্ষ জনবল।

স্বাধীনতা অর্জনের ৫০ বছরের মধ্যে এশিয়ার হাব হয়ে ওঠা খুব একটা সহজ ছিল না। আরো একটি বিষয় বলা গুরুত্বপূর্ণ সিঙ্গাপুরের স্বাধীনতা অর্জন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন খুব কাছাকাছি সময়ের। যথোপযুক্ত পরিকল্পনার কারণেই সিঙ্গাপুর জেলে পল্লী থেকে উন্নয়নের চরম শিখরে আরোহণ করেছে। বর্তমানে যাকে এশিয়ার বাঘ বলা হয়।

সিঙ্গাপুরের পরিছন্নতার রহস্য 

স্বাধীনতা অর্জনের দিক থেকে বাংলাদেশের মাত্র ৬ বছরের বড় সিঙ্গাপুর। বাংলাদেশের রাজধানী যেখানে বিশ্বের অন্যতম দূষিত নগরী, সেখানে সিঙ্গাপুর এশিয়ার সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন দেশ। পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যকর দেশে পরিণত হওয়ার মূলে রয়েছে জনসচেতনতা। দেশটির কোথাও কোথাও ময়লা আবর্জনা তো দূরের কথা বালু কণাও চোখে পড়বে না।

১৯৬০ সালের দিকে সিঙ্গাপুর ছিল কর্দমাক্ত নদী, দূষিত খাল ও বর্জ্যপানির প্রবাহ সহ একটি দেশ। ১৯৬৮ সালে সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রথম প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউ দেশটির পরিছন্নতা ও সবুজায়নের লক্ষে কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করে। ১৯৭১ সালে ক্লিন এয়ার এক্ট চালু করেন এবং ১৯৭৩ সালে একটি পরিবেশ মন্ত্রণালয় স্থাপন করে। ১৯৭০ সালের মধ্যে ৫৫ হাজারের বেশি নতুন গাছ রোপন, ১৯৭১ সালে চালু করা হয়  বার্ষিক বৃক্ষরোপন দিবস।

প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউ এর ‘কিপ সিঙ্গাপুর ক্লিন’ প্রচারাভিযান

এরপর ১৯৭৬ সালে শুরু করে ব্যতিক্রমধর্মী প্রচারণা “আপনার হাত ব্যবহার করুন” এর আওতায় সাপ্তাহিক ছুটির দিনে শিক্ষক- শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের পাশাপাশি সরকারি কর্মচারীরাও স্কুল পরিষ্কার এ অংশ নেয়। ১৯৮৩ সালে টয়লেট পরিষ্কারে জনসচেতনতার উদ্দেশ্যে চালানো হয় ব্যাপক প্রচারণা। এমনকি নগরীর পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার জন্য ১৯৯২ সালে চুইংগাম আমদানি ও বিক্রি নিষিদ্ধ করা হয়। 

লি কুয়ান সদূর প্রসারী লক্ষ্য নিয়েই পরিচ্ছন্নতা ও সবুজায়ন নীতি গ্রহণ করে। ১৯৬৮ সালে সিঙ্গাপুর সিটিতে অনুষ্ঠিত এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, “প্রশান্তির শহর গড়াই আমাদের একমাত্র উদ্দেশ্য নয়, প্রকৃতপক্ষে একটি পরিচ্ছন্ন নগরই গড়বে শক্তিশালী অর্থনীতি। 

সিঙ্গাপুরে প্রায় ৯০ শতাংশ গাছ আছে। ২০৩০ সালের মধ্যে দেশটিতে প্রায় ১ মিলিয়ন গাছ লাগানোর লক্ষ্য নির্ধারিত হয়েছে। “ওয়ান মিলিয়ন ট্রি’’ প্রকল্পের মধ্যে অন্তর্দেশীয় ও ম্যানগ্রোভ উভয় বন পুনরুদ্ধার অন্তর্ভুক্ত আছে। 

সিঙ্গাপুরের পরিবহন ব্যবস্থা 

সিঙ্গাপুরের স্মার্ট ট্রাফিক ব্যবস্থ

সিঙ্গাপুরের পরিবহন ব্যবস্থা অত্যন্ত উন্নত এবং দক্ষ। শহরের পরিবহন নেটওয়ার্ক বিভিন্ন ধরনের গণপরিবহন যেমন মেট্রো, বাস, ট্যাক্সি এবং সাইকেল শেয়ারিং সিস্টেমের মাধ্যমে চলে। সিঙ্গাপুরের পরিবহন ব্যবস্থা অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে পরিকল্পনা করা হয়েছে। 

সিঙ্গাপুরের পরিবহন ব্যবস্থায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয় যেমন- স্মার্ট ট্রাফিক সিস্টেম, আইটি ভিত্তিক ট্র্যাকিং এবং রিয়েল টাইম তথ্য প্রদান, যানজট কমাতে সহায়তা করে।

সরকার যানবাহনের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করতে ভেহিকল ইন্সেনটিভ স্কিম  (VPS) এবং পার্কিং সুবিধা গুলো সীমিত করেছে। একই সাথে পাবলিক ট্রান্সপোর্টে বিনিয়োগ বাড়ানো হয়েছে। এসব পদক্ষেপ গুলো গ্রহণের মাধ্যমে সিঙ্গাপুরের পরিবহন ব্যবস্থা আরো বেশি উন্নত হয়েছে। 

ছবিঃ সিঙ্গাপুরের স্মার্ট ট্রাফিক ব্যবস্থা 

মালয়েশিয়া যখন সিঙ্গাপুরকে আলাদা করে দেয়, তখন লি কুয়ান এর কাছে মনে হয়েছিল এত প্রাণ ছাড়া শরীর, অথচ, সেই সিঙ্গাপুর এখন প্রায় সব ক্ষেত্রেই মালয়েশিয়াকে ছাড়িয়ে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এ দ্বীপ রাষ্ট্রটির অর্থনৈতিক অগ্রগতি বিস্ময়কর। অর্থ, শিক্ষা ও প্রযুক্তির সমন্বয়ে দেশটি হয়ে উঠেছে আধুনিক থেকে আধুনিকতর। সিঙ্গাপুরের নান্দনিক সৌন্দর্যের কারণে সিঙ্গাপুর বরাবরই পর্যটকদের পছন্দের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করে।

সিঙ্গাপুর সম্পর্কে আরও কিছু মজার তথ্য

★ সিঙ্গাপুরের এক হাজার ডলারের নোটের পেছনে দেশের জাতীয় সংগীত লেখা থাকে। সিঙ্গাপুরের জাতীয় সংগীত মালয় ভাষায় রচিত।

★ সিঙ্গাপুরের বিল্ডিং ২৮০ মিটারের বেশি হতে পারে না। বর্তমানে সেই উচ্চতায় তিনটি ভবন রয়েছে, OUB সেন্টার, UOB প্লাজা এবং রিপাবলিক প্লাজা।

★ দেশটি ১৯০৫ সাল থেকে মোট ছয়বার টাইম জোন পরিবর্তন করেছে। ১৯৮২ সালে সিঙ্গাপুর শেষবার তাদের টাইম জোন পরিবর্তন করে। এখন সিঙ্গাপুরের টাইম জিএমটি-র থেকে আট ঘন্টা এগিয়ে।

★ সিঙ্গাপুরকে লায়ন সিটি বলা হয়। অথচ বাস্তবে গোটা সিঙ্গাপুরে একটাও সিংহ নাই।

★ কঠোর আইনের কারণে সিঙ্গাপুরকে ‘ভালো শহর’ বলা হয়। 

★ সিঙ্গাপুরকে জরিমানার শহর বা ফাইন সিটি বলা হয়। কারণ, সিঙ্গাপুর আইন ও নিয়মের কঠরতা এবং প্রয়োগের জন্য পরিচিত। ছোট ছোট কারণে এখানে জরিমানার ব্যবস্থা রয়েছে। যেমন- ইন্টারনেটে গান বা সিনেমা ডাউনলোড করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ, এমনকি অনুমতি না নিয়ে কাউকে জড়িয়ে ধরা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। 

★ সিঙ্গাপুরে সমকামিতা বেআইনি, কিন্তু জুয়া আইন সিদ্ধ।

★ সিঙ্গাপুরের নাগরিকরা বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুততম হাঁটা মানুষ। তারা ঘন্টায় প্রায় ৬.১৫ কিলোমিটার হাঁটে।

★ সিঙ্গাপুরিয়ানরা সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার মধ্যে ডিনার সেরে ফেলে।

★ সিঙ্গাপুরের নাগরিকরা কথার শেষে ‘লা’ শব্দটি বেশি ব্যবহার করে। 

সূত্র

Related posts

হংকং – এক দেশ দুই নীতির শহর

পুশরাম চন্দ্র

অ্যানিমের শহর- টোকিও

ফুটবলের রাজধানী মাদ্রিদ

Leave a Comment

Table of Contents

    This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More