Image default
দক্ষিণ আমেরিকাদেশ পরিচিতি

তেলের অভিশাপে অভিশপ্ত দেশ-ভেনেজুয়েলা

কথায় বলে, ‘আপনা মাংসে হরিণা বৈরী’— ঠিক তেমনই ভেনেজুয়েলার তেল সম্পদ। যা ছিল এক সময় দেশটির সমৃদ্ধির প্রতীক, তা এখন দেশের জন্য এক বিপর্যয়ের কারণে পরিণত হয়েছে।

ভেনেজুয়েলা, দক্ষিণ আমেরিকার উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত এক বিস্ময়কর দেশ। প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য, সমৃদ্ধ ইতিহাস এবং বর্ণাঢ্য সংস্কৃতির জন্য এই দেশটি সারা পৃথিবীতে পরিচিত। বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেলের রিজার্ভের অধিকারী এই দেশ তার অপরূপ সৌন্দর্য দিয়ে পৃথিবীকে মুগ্ধ করে।xa0

তেলের উপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা, অব্যাহত মুদ্রাস্ফীতি, খাদ্য ও চিকিৎসা সংকট এই সবই দেশটির জনগণের দৈনন্দিন জীবনে গভীর প্রভাব ফেলছে। কিন্তু, এর মধ্যেও, ভেনেজুয়েলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও ঐতিহ্যের প্রতি বিদেশি পর্যটকদের আগ্রহ কমেনি।

রাজধানী কারাকাস
সরকারি ভাষা স্প্যানিশxa0
জনসংখ্যা ২ কোটি ৮২ লক্ষ
মোট আয়তন ৯ লক্ষ ১৬ হাজার ৪৪৫ কিলোমিটার
মুদ্রা ভেনেজুলিয়ান বলিভারxa0
সময় অঞ্চল ইউটিসি -৪

ম্যাপ

ভেনেজুয়েলার ভৌগলিক অবস্থান

ভেনেজুয়েলা দক্ষিণ আমেরিকার উত্তর উপকূলে, ক্যারিবীয় সাগরের তীরে অবস্থিত। দেশটির উত্তরে আন্দিজ পর্বতমালা থেকে শুরু করে দক্ষিণে ক্রান্তীয় অরণ্যের বিস্তৃত অঞ্চল পর্যন্ত প্রসারিত। দেশের মধ্যভাগে রয়েছে রুক্ষ উঁচু ভূমি এবং তৃণভূমি। এই বৈচিত্র্য দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে আরও বৈচিত্র্যময় করে তোলে।

ভেনেজুয়েলার উপকূল জুড়ে নয়টি গুরুত্বপূর্ণ নাভিরাম বেলা ভূমি অবস্থিত।xa0 এই অঞ্চলগুলো ভেনেজুয়েলার সামুদ্রিক বাণিজ্য এবং পরিবহন ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।xa0

ভেনেজুয়েলার আয়তন ও জনসংখ্যা

ভেনেজুয়েলার আয়তন প্রায় ৯ লক্ষ ১৬ হাজার ৪৪৫ কিলোমিটার। এটি দক্ষিণ আমেরিকার একটি উল্লেখযোগ্য আয়তনবিশিষ্ট দেশ হিসেবে পরিচিত। ভেনেজুয়েলার রাজধানী এবং বৃহত্তম শহর হলো “কারাকাস“।xa0

বর্তমানে, ভেনেজুয়েলায় প্রায় ২ কোটি ৮২ লক্ষ মানুষের বসতি রয়েছে। এই দেশের অধিকাংশ জনগণ প্রোটেস্ট্যান্ট খ্রিস্টান। এছাড়াও, বিপুল সংখ্যক ক্যাথলিক খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীও রয়েছে। তবে দেশটিতে মুসলিম এবং অন্যান্য ধর্মাবলম্বী মানুষের সংখ্যা খুবই কম। ভেনেজুয়েলার সরকারি ভাষা হলো স্প্যানিশ।xa0

ভেনেজুয়েলার ইতিহাস

আধুনিক আমেরিকার প্রেক্ষিতে ভেনেজুয়েলা একটি পুরনো জনপদ। ১৪৯৯ খ্রিষ্টাব্দে আমেরিকার প্রকৃত আবিষ্কারক আমেরিগো ভেসপুচিxa0 মারাকেইবো হ্রদের পাশে একটি জনবসতিপূর্ণ স্থান দেখেছিলেন। সেই বসতিকে তিনি তুলনা করেছিলেন ভেনিস নগরীর সঙ্গে, আর নাম দিয়েছিলেন ‘লিটল ভেনিস’। স্প্যানিশ উচ্চারণের ক্রমবিবর্তনে সেই স্থানের নাম লিটিল ভেনিস থেকে ভেনেজুয়েলা হয়ে যায়।xa0

উপনিবেশিক যুগ এবং প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম

দেশটিতে খুঁজে পাওয়া প্রাচীন অস্ত্র ও কাঠের তৈরি পুরনো বাড়ি সমূহ থেকে প্রমাণ পাওয়া যায়, আজ থেকে প্রায় ১৫ হাজার বছর আগে এ দেশে মানব বসতি শুরু হয়েছে। তবে, ভেনেজুয়েলার মূল ইতিহাসের শুরু হয় ১৫ শতকে। ১৪৯৮ সালে এখানে স্প্যানিশ অভিযাত্রী ক্রিস্টোফার কলম্বাসের আগমনের পরের শতাব্দীতে দেশটি স্প্যানিশ উপনিবেশ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।xa0

স্বাধীনতা সংগ্রাম

১৮১০ সালে, সাইমন বলিভার স্পেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেন। তার নেতৃত্বে ভেনেজুয়েলা, কলম্বিয়া, পানামা, ইকুয়েডর, পেরু এবং বলিভিয়া স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করে। বলিভারের উল্লেখযোগ্য বিজয়ের মধ্যে বোয়াকার যুদ্ধ এবং কারাবোবোর যুদ্ধ অন্যতম।xa0

নতুন প্রজাতন্ত্র এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা

১৮১২ সালে ভেনেজুয়েলা প্রথম প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলেও, এটি বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। বরং, ১৮১৫ সালে স্প্যানিশ বাহিনী এটি ধ্বংস করে দেয়। এর ফলে বলিভার এবং তার অন্যান্য সহযোগীরা নির্বাসিত হন।xa0

এরপর, ১৮২১ সালে তিনি পুনরায় ভেনেজুয়েলা পুনরুদ্ধার করেন এবং দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু স্প্যানিশ বাহিনী আবার আক্রমণ শুরু করলে তা বেশিদিন টিকেনি।

আধুনিক রাজনৈতিক পরিবর্তন

১৮৭০ থেকে ১৮৮৮ পর্যন্ত ‘আন্তোনিও গুজমান ব্লাঙ্কো’ ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপতি ছিলেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত অহংকারপূর্ণ এবং স্বৈরাচারী, যার ফলে ক্রমান্বয়ে জনগণের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়।xa0

এরপর, হুগো শ্যাভেজ ১৯৯৯ সালে ক্ষমতায় এসে ভেনেজুয়েলায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনেন। তিনি দীর্ঘ ১৪ বছর রাষ্ট্রপতি থাকেন। তার মৃত্যুর পর ২০১৩ সালে তার উত্তরসূরি নিকোলাস মাদুরো ক্ষমতা গ্রহণ করেন।

নিকোলাস মাদুরো শাসনামলে ভেনেজুয়েলা অর্থনৈতিক মন্দা, মুদ্রাস্ফীতি এবং খাদ্য সংকটসহ একাধিক সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে। তার শাসনকাল তীব্র রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অভ্যন্তরীণ সংকটের কারণে দেশটি বিপুল রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে।

নিকোলাস মাদুরো

ভেনেজুয়েলার সংস্কৃতি

ভেনেজুয়েলা পোশাক

প্রতিটি দেশের জনগণ তাদের পোশাকের মাধ্যমে তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং ঐতিহ্যকে রক্ষা করে থাকে।

ভেনেজুয়েলার পুরুষদের মধ্যে ‘লিকুই-লিকুই’ নামক বিশেষ ধরনের পোশাক খুবই জনপ্রিয়। দেশটির শহরের পুরুষেরা বিশেষ অনুষ্ঠানে এই পোষাক পরিধান করে থাকে।xa0

দেশটির নারীদের পোশাকও ভিন্ন এবং ঐতিহ্যবাহী। তারা সাধারণত হাঁটু পর্যন্ত লম্বা পোশাক পরিধান করে। এছাড়া, ভেনেজুয়েলায় নারীদের মধ্যে ব্লাউজ ও স্কার্ট পরার প্রচলনও ব্যাপক, যা আধুনিক ফ্যাশনের সঙ্গে ঐতিহ্যের একটি মিশ্রণ তৈরি করে।

ভেনেজুয়েলার নারী ও পুরুষদের পোশাক

ভেনেজুয়ালার খাদ্য

ঐতিহ্য কেবলমাত্র তাদের পোশাকেই নয়, পাওয়া যায় তাদের খাদ্যাভ্যাসেও। দেশটির খাবারের মধ্যে রয়েছে অনেক ঐতিহ্যবাহী উপাদান, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চালু হয়ে এসেছে।xa0xa0

হালাকাস

দেশবাসীর সবচেয়ে প্রিয় খাবারের একটি হল হালাকাস। সাধারণত মাংস পেঁয়াজের রিং এবং অন্যান্য উপকরণ দিয়ে খাবারটি প্রস্তুত করা হয়। খাবারটি প্রস্তুত করতে বেশ সময় লাগে বলে অনেকগুলো পরিবার একত্রিত হয়ে এই খাবারটি প্রস্তুত করেন।xa0

হালাকাস

পিসকা আন্দিনা

ভেনেজুয়েলার একটি পুরনো এবং ঐতিহ্যবাহী খাবার হল পিসকা আন্দিনা। শীতল আবহাওয়ার দেশ হওয়ায় ভেনেজুয়েলায় এই সুপটি বেশ জনপ্রিয়। আলু, ডিম, দুধ, পনির এবং বিভিন্ন মসলার দিয়ে বৈচিত্র্যময় রন্ধন প্রণালীতে তৈরি করা হয় এই খাবারটি।xa0

পিসকা আন্দিনা একদিকে যেমন ঐতিহ্যবাহী তেমনি বেশ স্বাস্থ্যকরও বটে। বিভিন্ন রোগ নিরাময়ের জন্য ভেনেজুয়েলার চিকিৎসকেরা খাবারটি খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন।xa0

পিসকা আন্দিনা

ভেনেজুয়েলার উৎসবxa0

শুধু খাদ্যের দিক থেকেই নয়, সংস্কৃতি দিক থেকেও সমৃদ্ধ এই দেশ– ভেনেজুয়েলা। বছরের পুরোটা সময় জুড়ে দেশবাসী মেতে থাকেন বিভিন্ন উৎসব অনুষ্ঠানে।xa0

ফেস্টিভ্যাল দি ভার্জিন দি কোরোমোটো

ভেনিজুয়েলায় বছরের সবচেয়ে জনপ্রিয় উৎসব হচ্ছে ‘ফেস্টিভ্যাল দি ভার্জিন দি কোরোমোটো’। প্রতিবছর ১১ সেপ্টেম্বর ভেনেজুয়েলার ‘লেডি অফ কোরোমোর’ স্মরণে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। মনে করা হয়, তিনি এই দিনটিতে তার ঐশ্বরিক রূপে পৃথিবীতে এসেছিলেন এবং তাঁর পবিত্রতার প্রমাণ স্বরূপ পানির উপর দিয়ে হেঁটে দেখিয়েছিলেন।xa0

উৎসবের বিশেষ আয়োজন হিসেবে বেশ কয়েকটি শোভাযাত্রার এবং কুচকাওয়াজের আয়োজন করা হয়। এখানে প্রচুর উৎসাহ উদ্দীপনার সাথে যোগ দেন সমগ্র ভেনেজুয়েলাবাসি।xa0

ফেস্টিভ্যাল দি ভার্জিন দি কোরোমোটো

এল দিয়া দে সান জোসে

‘এল দিয়া দে সান জোসে’ মূলত একটি স্প্যানিশ উৎসব। পুরনো ঐতিহ্যের স্মারক হিসেবে ভেনেজুয়েলায়ও প্রচুর ঘটা করে এ উৎসবটি পালন করা হয়ে থাকে। এ অনুষ্ঠান উপলক্ষে ষাঁড়ের লড়াইয়ের আয়োজন করা হয়। দেশজুড়ে বিভিন্ন স্থানে পরিবার এবং বন্ধুবান্ধবদের সাথে আড্ডায় মেতে ওঠেন অধিবাসীরা।xa0

ফিয়েস্টা দে সান বেনিতো

ঐতিহ্যের মতো ধর্মীয় দিক থেকেও মিল রেখে কিছু উৎসব প্রচলিত আছে দেশটিতে। ‘ফিয়েস্টা দে সান বেনিতো’ এমনি এক অনুষ্ঠান। ডিসেম্বর মাসের শেষে বড়দিনের সময়ই এই উৎসব অনুষ্ঠিত হয়।xa0

মজার ব্যাপার, এই উৎসবের আরেক নাম ‘এল মুরো’। বলা হয়, কোন এক ক্রীতদাসের পুত্র ছিলেন ‘মুর’ নামক একজন ব্যক্তি এবং তার স্মরণেই ভেনেজুয়েলাবাসি উৎসবটি এমন নাম দিয়েছেন। তিনি এখন ভেনেজুয়েলায় “কালো সাধু” নামে সর্বাধিক পরিচিত। এই উৎসবে সর্বস্তরের জনগণ জমকালো পোশাক পড়ে নাচ-গানে মেতে থাকেন।xa0

ফিয়েস্টা দে সান বেনিতো

ভেনেজুয়েলার পর্যটন স্থানxa0

অ্যান্ঞ্জল ফলস

৯৭৯ মিটার উচ্চতাসম্পন্ন “অ্যান্ঞ্জল ফলস” এদেশের অন্যতম আকর্ষণ। গড় উচ্চতা হিসেব করলে বিশ্বের সবথেকে উঁচু জলপ্রপাত এটি। স্থানটি এতটাই জনপ্রিয় যে, কেউ ভেনেজুয়েলা এলে এঞ্জেল ফলসে একবার হলেও আসেন।xa0

বিশেষ করে বর্ষাকালে এই স্থানের সর্বাধিক ভিড় থাকে.। “টেপুই” পর্বতের প্রান্তে ক্যানাইমা উদ্যানের পাশ দিয়ে নদীতে মিশে গেছে এই জলপ্রপাত। তাই পায়ে হেঁটে বা নৌকায় চড়ে এর আশেপাশের এলাকা ভ্রমন করা যায়, সাথে মনোমুগ্ধকর দৃশ্যগুলো দেখতে পাওয়া যেন একটা বাড়তি পাওনা।

অ্যান্ঞ্জল ফলস

ক্যানাইমা উদ্যান

ক্যানাইমা উদ্যান হলো ৩০ হাজার বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এক অপরূপ স্থান। ইউনেস্কো এ উদ্যানকে “ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট” হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ক্যানাইমা জাতীয় উদ্যানের প্রধান আকর্ষণ হলো এর অসাধারণ সমতল-শীর্ষ পর্বতগুলো।এ পর্বতগুলো ‘টেপুইস’ নামে পরিচিত।প্রকৃতিরxa0 অপরূপ সৃষ্টিxa0 টেপুইগুলো পার্কের প্রায় ৬৫% এলাকা জুড়ে বিস্তৃত রয়েছে। প্রতি বছর এখানে প্রায় ১০০,০০০ পর্যটক আসেন। তাদের মধ্যে অধিকাংশই এই বিস্ময়কর মালভূমি ও টেপুইগুলো দেখতে আসেন।xa0xa0

মজার ব্যাপার হচ্ছে, বিশ্বের বৃহত্তম এই উদ্যানটি পুরো বেলজিয়াম দেশের সমান। নদী সবুজ গাছপালার মিশালে তৈরি মনোরম এই স্থানটিতে প্রতিবছর দেশ বিদেশের অনেক প্রকৃতি প্রেমীরা ছুটে আসেন।xa0

ক্যানাইমা উদ্যান

রোরাইমা

মাউন্ট রোরাইমা, ভেনিজুয়েলার এক রহস্যময় পর্বত, বিজ্ঞানীদের কাছে এখনো এক অমীমাংসিত ধাঁধা! প্রায় দুই বিলিয়ন বছর পুরনো এই পর্বতকে পৃথিবীর প্রাচীনতম শিলা গঠন হিসেবে মনে করা হয়। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩,০০০ মিটার উঁচুতে অবস্থিত এই পর্বতটির আকৃতি এতটাই অস্বাভাবিক, যেন কেউ বিশাল একটি ছুরি দিয়ে এটিকে কেকের মতো করে কেটে ফেলেছে। এর শীর্ষভাগ সম্পূর্ণ সমতল, যা প্রায় ৩০ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত।

মাউন্ট রোরাইমার চারপাশে রয়েছে খাড়া পাহাড়, মনোমুগ্ধকর জলপ্রপাত, এবং এমন কিছু ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য যা পৃথিবীর অন্য কোথাও দেখা যায় না। এই পর্বতের শীর্ষে পাওয়া যায় দুটি উদ্ভিদ, যা শুধু এখানেই পাওয়া যায়। একটি হচ্ছে মাংশাসী উদ্ভিদ হেলিয়াম্ফোরা।এর নলাকার পাতা শিকার ধরার জন্য বিশেষভাবে তৈরি। এই অঞ্চলে দেখা মিলে বিশেষ প্রজাতির কালো ব্যাঙ যার নাম রোরাইমা বুশ টোড। মাউন্ট রোরাইমা তাই উদ্ভিদবিজ্ঞানী ও প্রাণীবিজ্ঞানীদের জন্য এক আকর্ষণীয় গন্তব্য।

মাউন্ট রোরাইমা

লস রোকোস

সমুদ্র প্রেমিকদের জন্য ভেনেজুয়েলার একটি জনপ্রিয় গন্তব্য হচ্ছে ” লস রোকোস”। এটি উত্তর-পূর্ব ভেনেজুয়েলার কোস্টলাইন থেকে কিছুটা দূরে অবস্থিত। লস রোকোস আসলে একটি আর্কিপেলাগো বা দ্বীপপুঞ্জ।যা মোট ৩৫টি ছোট ছোট দ্বীপ নিয়ে গঠিত। এখানে সাদা বালির সৈকত, পরিষ্কার নীল জল, এবং অসাধারণ প্রাণীজগত রয়েছে। লস রোকোসের অন্যতম আকর্ষণ হলো এর অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, যেখানে পর্যটকরা সাঁতার কাটতে, স্নোরকেলিং করতে, ডাইভিং করতে এবং বোট ট্যুর উপভোগ করতে পারেন।xa0

জায়গাটি স্কুবাডাইভিং এর জন্য বিশেষভাবে উপযোগী। সাদা বালুরxa0 সৈকতগুলো উপভোগ এবং সেখানে খানিক বিশ্রাম নিতে চাইলে পর্যটকদের কাছে আদর্শ জায়গা হতে পারে লস রোকোস।

লস রোকোস

মেরিডা

ভেনেজুয়েলা এসে সুন্দর আবহাওয়া এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ উপভোগ করতে চাইলে যেতে হবে মেরিডায়। এটি আন্দেস পর্বতশ্রেণীতে অবস্থিত এবং এর উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১,৬০০ মিটার। মেরিডার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো তার চমৎকার পরিবেশ, বিশাল পাহাড়, এবং হিমালয়ের মতো ঠাণ্ডা আবহাওয়া।যা এটিকে গ্রীষ্মকালীন বিশ্রামের জন্য একটি আদর্শ গন্তব্য করে তোলে। এই শহরকে সবাই ভালোবেসে “শাশ্বত বসন্তের শহর” বলে ডাকেন।xa0

এখানকার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পর্যটন স্থানগুলির মধ্যে রয়েছে পিকো বোলিভার। ৫,০০০ মিটার উচ্চতার এই পর্বতটি পর্বতারোহীদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তবুও, এর চূড়ায় পৌঁছানো পর্বতারোহীদের জন্য একটি অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা।xa0

পিকো বোলিভার, মেরিডা

আয়লা মার্গারিটা

অবকাশ যাপনের জন্য “আয়লা মার্গারিটা” দ্বীপটি দেখতে প্রতিবছর অনেকেই ভেনেজুয়েলায় পাড়ি জমান। আয়লা মার্গারিটা (Isla Margarita) ভেনেজুয়েলার একটি জনপ্রিয় দ্বীপ। আয়লা মার্গারিটা ক্যারিবিয়ান সাগরের মধ্যে অবস্থিত এবং এটি দেশটির সবচেয়ে বড় পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। এটি ভেনেজুয়েলার নিউ এস্পারিতু সান্তো রাজ্যের অংশ, এবং দেশটির প্রধান পর্যটন গন্তব্যগুলির মধ্যে অন্যতম।

অপূর্ব সুন্দর সৈকত, ঢেউয়ের খেলা এবং প্রাণবন্ত নাইট লাইফের জন্য পরিচিত এই স্থানটি। দর্শনার্থীরা “উইন্ডসার্ফিং ও কাইটবোর্ডিং”xa0 উপভোগ করতে পারেন এখানে। আয়লা মার্গারিটা আরও একটি দারুণ গন্তব্য হচ্ছে এর ঐতিহ্যবাহী বাজার। পর্যটকরা এখানে স্থানীয় হস্তশিল্প, রঙিন পোশাক, এবং ভেনেজুয়েলার ঐতিহ্যবাহী খাবারের স্বাদ নিতে পারেন।

আয়লা মার্গারিটা

ভেনেজুয়েলার অর্থনৈতিক সংকট- ডাচ ডিজিজxa0

ভেনেজুয়েলার অর্থনৈতিক সংকটের পেছনে এক গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব রয়েছে, যাকে ‘ডাচ ডিজিজ’ বলা হয়। এটি এমন একটি অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, যেখানে একটি দেশের প্রাকৃতিক সম্পদের উদ্বৃত্তি (যেমন তেল) একটি অস্থির, একমুখী অর্থনীতির সৃষ্টি করেছে। এর ফলে, অন্যান্য শিল্প খাতগুলো দুর্বল হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতি দেশকে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং সংকটের দিকে পরিচালিত করতে পারে।

একসময়, লাতিন আমেরিকার মধ্যে ভেনেজুয়েলা ছিল সবচেয়ে সম্ভাবনাময় দেশ। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় তেলের রিজার্ভ আবিষ্কারের পর, দেশটির জনগণ আশাবাদী ছিল যে, তারা আধুনিক শিল্পনির্ভর অর্থনীতি তৈরি করতে সক্ষম হবে তারা। তবে এক শতাব্দী পর, ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি তেলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার কারণে সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। এ অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা ভেনেজুয়েলার জন্য ‘ডাচ ডিজিজ’ -এর মতো পরিস্থিতি তৈরি করেছিল।

২০১০ সালে শ্যাভেজের “অর্থনৈতিক যুদ্ধ” ঘোষণা; পরবর্তীতে মাদুরো সরকারের অধীনে তেলের দাম কমে যাওয়ায় এসব সংকটকে আরো তীব্র করে তোলে। তেলের রাজস্ব হ্রাস, সরকারি ব্যয়ের অভাব, এবং দুর্নীতি এই সংকটের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। জাতিসংঘের ২০১৭ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়, “প্রায় ৭৫% জনগণ খাদ্য সংকটে ভুগছে, এবং প্রায় অর্ধেকেরও বেশি মৌলিক খাদ্য চাহিদা পূরণে অক্ষম।”

ভেনেজুয়েলার তেলের খনি

একসময় যে ভেনেজুয়েলা তেলের জন্য সম্ভাবনাময় এবং শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত ছিল; এখন সে রাষ্ট্রটি সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক দুরাবস্থায় ভুগছে। এরপরও সবমিলিয়ে সমৃদ্ধ ইতিহাস, দেশবাসীর বৈচিত্র্যময় জীবনধারা-xa0 সবকিছুই ভেনেজুয়েলাকে কে অনন্য করে তুলেছে। দেশের পর্যটন খাত গুলো এতে যোগ করেছে বিচিত্র মাত্রা। আকর্ষণ করেছে বিশ্বের লাখ লাখ উৎসুক দর্শনার্থীদের। সবদিক থেকে ভেনেজুয়েলা এমনই পরিপূর্ণ থাকুক এমনটাই কামনা বিশ্ববাসীর।

ভেনেজুয়েলা সম্পর্কে আরো কিছু মজার তথ্যxa0

প্রাণী বৈচিত্র

ভেনেজুয়েলায় দেখা মিলবে অদ্ভুত প্রাণী বৈচিত্রের। এরমধ্যে অন্যতম বিশ্বের বৃহত্তম ইঁদুর,”ক্যাপিবারাধ”। মজার ব্যাপার, এই ইদুঁর গুলোকে প্রায় সময়ই নদীর তীরে বসে থাকতে বা সাঁতার কাটতে দেখা যায়। এরা নাকি পানিতে ডুবে ডুবে ঘুমাতেও পারে।

সুন্দরীদের দেশxa0

ভেনেজুয়েলা প্রায়ই বিশ্ব সুন্দরী প্রতিযোগিতায় শিরোপা জয় করে থাকে।

সারাবছরই ঝড়ের তীব্রতা

ভেনেজুয়েলায় একটি জায়গা রয়েছে যেখানে বছরের বেশিরভাগ সময় ঝড় চলে। ভেনেজুয়েলার মেরাকাইবো হ্রদে এমন একটি জায়গা রয়েছে যেখানে প্রায় সারাবছরই ঝড়ের তীব্রতা থাকে।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য

ভেনেজুয়েলায় ৫৪.১% এলাকা রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা অধীনে রয়েছে, যা এদেশটির মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য রক্ষা করে।

ভ্রমণে নিরুৎসাহিতকরণxa0

xa0রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক সমস্যা এবং নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে অনেক দেশ ভেনেজুয়েলায় ভ্রমণ করা পরামর্শ দেয় না।xa0

সূত্র

Related posts

লেবানন – পৃথিবীর প্রাচীনতম সংস্কৃতির দেশ

শেখ আহাদ আহসান

সোমালিয়ার ভেতর আরেক দেশ: সোমালিল্যান্ডের রহস্য

সিয়েরা লিওন – যে দেশের ইতিহাসে রয়েছে বাংলাদেশের অবদান

আবু সালেহ পিয়ার

Leave a Comment

Table of Contents

    This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More