‘এপ্রিল ফুল’ কি আসলেই নিছক মজা নাকি এর পেছনে রয়েছে কোন গল্প! অল্প পরিসরে পালিত হলেও এটি সংস্কৃতিতে জায়গা করে নিচ্ছে।
এটা কোন দিবস না, ঘটা করে কোথাও পালন হয় বলেও জানা যায় না। কিন্তু তবুও এই দিনটি পালিত হয়। সকলে এই দিবসটি তামাশা করে পালন করে। এটাকে ‘বোকা বানানোর দিন’ ও বলা যায়। কারণ, তামাশার সূত্রপাতই হয় একে অন্যকে বোকা বানিয়ে।
এপ্রিল ফুলের ইতিহাস
শুনতে নিছক ব্যাপার মনে হলেও এই এপ্রিল ফুলের রয়েছে নিজস্ব ইতিহাস। তবে, এপ্রিল ফুলের ইতিহাসে মতান্তর রয়েছে।
ফ্রান্স থেকে এপ্রিল ফুল
এখানে, একদল ইতিহাসবেত্তা মনে করেন, এই দিনটি এসেছে ফ্রান্সের মধ্যযুগীয় রীতি থেকে। সে সময়ে ১লা এপ্রিল থেকে নতুন বছর শুরু হতো। ১৫৬৪ সালে ফ্রান্স এই রীতি বদলে ১লা জানুয়ারি থেকে নতুন বছর গণনা শুরু করে।
এরপর, জনগণের মধ্যে অনেকেই নতুন এই রীতি গ্রহণে অনাগ্রহ দেখায়। এরা ১লা জানুয়ারির পরিবর্তে ১লা এপ্রিলকেই নতুন বছরের শুরু বলে মানতেন। আর তাই, এদেরকে সবাই ঠাট্টা-তামাশা করা হতো। পরবর্তীতে তাদের মাঝে মজা করে ঠকানোর রীতিও শুরু হয়। এভাবে এই দিনটি বর্তমান এপ্রিল ফুলের সূচনা করে।
হোলি উৎসব থেকে এপ্রিল ফুল
আরেকদল ইতিহাসবেত্তাগন আবার মনে করেন যে, প্রাচীন রোমের বিখ্যাত ‘হোলি উৎসব’ থেকে এটি এসেছে। কারণ, তৎকালীন হোলি উৎসবেও এসব হাসি-তামাশা, বোকা বানানো চলতো। তাই তারা মনে করেন বর্তমান এপ্রিল ফুল হোলি উৎসবেরই একটি বিবর্তিত রূপ।
কিভাবে পালিত হয় এপ্রিল ফুল?
এই দিনে মজা করে লোকদের বানানো হয় আর এটা নিয়ে শত ঠাট্টা-তামাশা চলে। কিন্তু এই ‘ঠাট্টা-তামাশা’র ধরণ সব স্থান, দেশ, সংস্কৃতিতে এক না। প্রত্যেকেরই নিজস্ব ধরন বা স্টাইল আছে। চলুন দেখা যাক কত বিচিত্র রকমভাবে এটি পালন করা হয় ।
মিথ্যা সংবাদ শুনিয়ে
কেউ কেউ মিথ্যা সংবাদ শুনিয়ে কাউকে হয়রান করে তোলার মাধ্যমে এপ্রিল ফুল পালন করা হয়। যেমন ধরেন কাউকে বলা হলো যে বাটা’য় ৮০% ছাড় দিচ্ছে।এটা শুনে ব্যক্তিটি উত্তেজিত হলো এবং জুতা কেনার উদ্দেশ্যে বের হয়ে পড়লো।
বাটা’য় ৮০% ছাড় চলছে এটা বলে আপনাকে এপ্রিল ফুল বানানো হলো।
কিন্তু একটু পরই বুঝলো যে এটা আসলে সত্য না, পুরোটাই বানানো।এইভাবে আপনাকে এপ্রিল ফুল বানানো হলো।
নকল পণ্য দিয়ে বোকা বানানো
অবিকল নকল পণ্য দিয়ে বোকা বানিয়েও এপ্রিল ফুল পালন করা হয়। যেমন- আপনি বালিশে কেবল মাথা দিতে যাচ্ছেন এমন সময়ে দেখলেন বিছানায়, বালিশের পাশে মনুষ্য বর্জ্য পড়ে আছে!
বিছানায় পড়ে থাকা নকল, প্লাস্টিকের তৈরি,অবিকল মনুষ্য বর্জ্য দিয়ে এপ্রিল ফুল বানানো।
আপনার তো মাথাই নষ্ট! আপনি হকচকিয়ে উঠতে গিয়েছেন এমন সময় বুঝতে পারলেন যে এখানে আপনাকে বোকা বানানো হয়েছে।বর্জ্য পদার্থ অবিকল অমনই দেখতে হলেও এটি আসল না।প্লস্টিক দিয়ে বানানো নকল জিনিস এটা।এভাবে হুটহাট জব্দ করে এপ্রিল ফুল পালন করা হয়।
অযথা ভয় দেখানো
অযথা ভয় দেখানো এপ্রিল ফুল পালন করার একটা খুব সাধারণ রীতি।যেমন- হুট করে কেউ আপনাকে বললো যে আপনার পায়ের পাশে বিশাল গোখরা সাপ ফণী তুলে বসে আছে!
পায়ের নিচে সাপ ফণী তুলে আছে এমনটা শুনে আঁতকে উঠা ব্যক্তি।
আতঙ্কে আপনি লাফ দিয়ে উঠতে যেইই গিয়েছেন তৎক্ষনাৎ হাসির রোল পড়ে গেল চারিদিকে। এভাবে হুটহাট ভয় দেখিয়ে এপ্রিল ফুল বানানো হয় কোথাও কোথাও।
এপ্রিল ফুল ও একটি মজার সত্য ঘটনা
১৯৬৮ সালের ১লা এপ্রিলে ইংল্যান্ডের টাওয়ার অব লন্ডনে “ওয়াশিং দ্যা লায়ন্স” (সরাসরি সিংহের গোসল করা দেখানো) অনুষ্ঠানের নাম করে টিকেট বিক্রি করা হয়। হাজার হাজার দর্শক এতে টিকেট সংগ্রহে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। এরপর নির্দিষ্ট সময়ে দর্শকরা হাজির হয় কিন্তু দেখে যে সেখানে অনুষ্ঠানের কোন নামগন্ধই নাই! এভাবে সেদিন হাজারো মানুষ বোকা বনে যান।
এপ্রিল ফুলের ইতিবাচক দিক
উৎসব মানেই আনন্দের কিছু। প্রতিটা উৎসবই মানুষকে মানুষের কাছে টানার এক উপলক্ষ্য। ১লা এপ্রিলে নিকট প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন বন্ধু-বান্ধবদের আমরা সচরাচর এপ্রিল ফুল বানিয়ে থাকি। এক্ষেত্রে সকলে মিলে হাসি-তামাশাময় একটি মুহুর্ত কাটানো যায়। এতে মানুষে মানুষে দূরত্ব কমে। মানুষের গৎবাঁধা জীবনে কিছু সময়ের জন্য এক আনন্দের সঞ্চার ঘটে। বোকা বানানো এবং বোকা হওয়ার মাঝে, মানুষের ভেতরের যে নিষ্পাপ সত্তা আছে তাকে জাগিয়ে তোলা হয়। মানুষ মানসিকভাবে পরিতৃপ্তি লাভ করে।
এপ্রিল ফুল পালনে সতর্কতা
আনন্দ ততক্ষণ অবধিই আনন্দ, যতক্ষণ অবধি এটা বেশি বাড়াবাড়ি না হয়ে যায়। এপ্রিল ফুল পালনে তাই সতর্কতা জরূরী। এক্ষেত্রে আমাদের বুঝতে হবে যে আমাদের এসব ঠাট্টা-তামাশা যেন কারোর অনুভূতিতে আঘাত না করে।আবার,এই বোকা বানানোর খেলায় সামাজিক ব্যাপার গুলোও খেয়াল রাখা জরুরী। নতুবা উৎসব দুঃখে বদলাতে সময় লাগবেনা।
আবার যদি অন্যভাবে বলা যায় তবে, তাৎক্ষণিকভাবে মানুষকে বোকা বানানো যেন শরীরের প্রতি কাল না হয়ে দাঁড়ায়!
ব্যক্তির হার্ট দুর্বল থাকলে ব্যক্তি তৎক্ষনাৎ আতঙ্কে স্ট্রোক করে ফেলতে পারে যা আমাদের কারোরই কাম্য নয়।
তাই আামাদের এপ্রিল ফুল পালনে কিছু বিষয়ে সতর্ক থাকা অতীবও জরূরী।
ইসলাম ধর্মে এপ্রিল ফুল
ইসলামে নৈতিক শিক্ষা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। তাই মিথ্যা বলা, প্রতারণা করা, অপরকে হয়রানি করা এসব ইসলামে অবশ্যই নেতিবাচক। যে উদ্দেশ্যেই করা হোক না কেন, ইসলামে এসব কাজ নিষিদ্ধ।
পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে,
“হে যারা ঈমান এনের্,তোমরা একে অপরকে যেন উপহাস না করো।“
–সূরা আল হুজুরাত, আয়াত নং:১১
আবার হাদীসে বলা আছে যে,
“যে ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইয়ের প্রতি হাস্যরস করতে মিথ্যা বলে, সে আমাদের (মুসলিমদের) দলভুক্ত নয়।“
–বুখারী ও মুসলিম।
সততা ও বিশ্বাসযোগ্যতার সাথে ইসলাম কখনও আপোষ করে না। তাই এপ্রিল ফুলের বিষয়টা ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে যায়। ইসলামে এটি বিতর্কিত একটি বিষয় ছাড়া আর কিছুই না।
এপ্রিল ফুল নিয়ে ইসলাম ধর্মে মিথ
ইসলাম এপ্রিল ফুলকে সমর্থন করে না। এ থেকে একটা ধারার চিন্তা তৈরি হয় যে নিশ্চয়ই এর পেছনে ঐতিহাসিক কারণ রয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশে এই ধারণা বহুল প্রচলিত। এ মতানুসারে,
স্পেনে ১৫ শতকের শেষের দিকে মুসলিম শাসনের অবসান ঘটে। আর এটা ঘটান তৎকালীন রাজা ফার্দিনান্ড ও রাণী ইসাবেলা। তারা স্পেনের মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় (গ্রানাডা) হামলা করেন এবং অসংখ্য মুসলিম জনগণদের পুড়িয়ে হত্যা করেন। আর সেই ভয়ংকর দিনটিই ছিলো ১লা এপ্রিল!
কিন্তু বাস্তবে এই কাহিনির কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক, ড. মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান এটাকে ‘ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই’ বলে আখ্যা দেন। কেননা ইতিহাস বলে, উক্ত সময়টা ছিলো ১ লা জানুয়ারি। আর এখানে আনুষ্ঠানিক চুক্তির মাধ্যমে গ্রানাডা দখল করা হয়েছিলো। তিনি এই ঘটনাাকে একটি ‘মিথ’ হিসাবে উল্লেখ করেন যার সাথে ইতিহাসের কোনই সংযোগ নেই।
এপ্রিল ফুলের সাংস্কৃতিক প্রভাব
এটি একটি ছোট্ট উৎসব হলেও বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতিতে প্রভাব ফেলেছে। যেমন:
স্পেন ও লাটিন আমেরিকার এটি ‘ডিয়াস ডি ইনোসেন্টেস’ নামে পরিচিত। মজার ব্যাপার হলো, এটি ১লা এপ্রিলে পালিত না হয়ে, ২৮ ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত হয়। এই দিনে বিশেষ করে বাচ্চাদেরকে আনন্দ-ফূর্তি করার সুযোগ দেয়া হয়।
কতক দেশের টেলিভিশন চ্যানেল,সংবাদপত্র এবং সামাজিক মাধ্যমে এপ্রিল ফুল পালন করা হয়। এখানে তারা মজার মজার মিথ্যা তথ্য দেয় যা মানুষদের মধ্যে ব্যাপক হাস্যরসের সৃষ্টি করে।
অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এই দিনটাতে ব্যবসার প্রচারণা চালান অভিনব উপায়ে। তারা কাস্টমারদের জন্য অভিনব প্র্যাঙ্ক ও ধাঁধার আয়োজন করে, যা সকল বয়সের মানুষদের হাসাতে বাধ্য।
অতএব, আমরা বুঝলাম যে এপ্রিল ফুল শুধুমাত্র মজার খোরাক না, বরং, এটা একটি সাংস্কৃতিক ব্যাপারও বটে।আর এটা মানুষও ওভাবেই গ্রহণ করছে।
বাংলাদেশে এপ্রিল ফুলের সাংস্কৃতিক প্রভাব
বাংলাদেশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠের দেশ তা সত্ত্বেও এখানে এপ্রিল ফুলের বৈশ্বিক প্রভাবটা আছে। আর ব্যক্তি পরিসরে, ছোটখাটোভাবে এটি এখানে পালিত হয়। যেমন; নিজ পরিবারের ছোট ভাই-বোনদেরকে বোকা বানিয়ে জব্দ করা। তবে আস্তে আস্তে এর পরিধি বাড়ছে।
বর্তমান যুগ তথ্য প্রযুক্তির। এটার সাহায্য নিয়েও এপ্রিল ফুল পালিত হচ্ছে। যেমন;
একটা ছেলে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিলো যে “আগামী শুক্রবার আমার বিয়ে”। এতে বন্ধুমহলে হৈ চৈ পড়ে গেল। কিন্তু বাস্তবে আসলে ছেলেটি এসব তার বন্ধুদেরকে বোকা বানানোর জন্য দিয়েছে।বন্ধুরাও জব্দ হয়ে মজা পেলো।
বর্তমানে এটি একটি জনপ্রিয় ব্যবসার কৌশলেও রূপান্তরিত হয়েছে। এক্ষেত্রে এই অভিনব উপায়ে বিজ্ঞাপন দেয়া হয়। যেমন:
রকমারি ১লা এপ্রিল ঘোষণা দিলো যে সকল বইয়ের উপরে ১০০% ছাড় দেয়া হয়েছে। পরে জানা গেল যে এটি একটি প্রাঙ্ক ছিলো!
এভাবে এটি আস্তে আস্তে আমাদের সংস্কৃতির অংশ হয়ে যাচ্ছে।