ইসরায়েল সম্পর্কে মানুষ ততোটুকুই জানে যতোটুকু তারা জানাতে চায়। আর এই দেশটি হলো বিশ্বের একমাত্র এমন দেশ, যার নাগরিকত্ব শুধুমাত্র ‘ইহুদি’ হলেই পাওয়া যায়। এজন্য ইসরায়েলকে প্রমিজ ল্যান্ডও বলা হয়।
পৃথিবীর একমাত্র ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েল নিয়ে একটি কথা প্রচলিত আছে যে, এ দেশটি সম্পর্কে মানুষ ততোটুকুই জানে যতোটুকু তারা জানাতে চায়। এ যেনো রহস্যে ঘেরা এক রাষ্ট্র! পৃথিবীতে আর এমন কোনো রাষ্ট্র নেই, যারা জন্মলগ্ন থেকেই এতোটা বিতর্কিত। জেনে অবাক হবেন, ইসরায়েলকে ঘিরে থাকা ১৭টি আরব দেশের অনেকেই এর অস্তিত্বকে স্বীকার করে না।
ইসরায়েল পৃথিবীর সর্বনিম্ন অঞ্চলে অবস্থিত একটি দেশ। সারা বিশ্বে ১ কোটি ৭২ লাখ ইহুদির বাস হলেও, এর মধ্যে শুধু ইসরায়েলেই বসবাস করে ৯০ লাখ ইহুদি। ইহুদিরা মুসলমানদের পুরো উল্টো নিয়ম-কানুনের অনুসারী জাতি। যেমন, ইসলাম ধর্মে মদ্যপান হারাম। অন্যদিকে, ইহুদিদের জন্য মদ্যপান করা হালাল। আবার, উটের মাংস ও চিংড়ি মাছ মুসলমানদের জন্য বৈধ কিন্তু ইহুদিদের জন্য তা অবৈধ। চলুন জেনে আসা যাক ইসরায়েল সম্পর্কে আরও কিছু খুটিনাটি তথ্য।
রাজধানী | জেরুজালেম |
সরকারি ভাষা | হিব্রু |
জনসংখ্যা | ৮৬ লাখ ৭১ হাজার ১০০ জন |
মোট আয়তন | ২২ হাজার ৭২ বর্গ কিলোমিটার |
মুদ্রা | শেকেল |
সময় অঞ্চল | ইউটিসি +২:০০ |
ইসরায়েলের নামকরণ
ইসরায়েল দেশের নামকরণের ইতিহাসটি একই সাথে বেশ গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল। নামকরণের গল্পটি নিয়েও কিছুটা দ্বন্দ্ব রয়েছে। অনেকের মতে, ইসরায়েল নামটি এসেছে নবী ইয়াকুব (আ.) এর নাম থেকে। আদি পুস্তক ‘বুক অব জেনেসিস’ অনুযায়ী ইয়াকুব (আ.) একজন আগন্তুকের সাথে কোনো এক নদীর হাঁটুজলে কুস্তি লড়াই করছিলেন। প্রবল অধ্যবসায় তাকে এ লড়াইয়ে জয়ী হতে সাহায্য করে। ফলে তাকে নাম দেয়া হয় ইসরায়েল। ইসরায়েল শব্দের আক্ষরিক অর্থ ঈশ্বরের জন্য সংগ্রামকারী।
অপরদিকে, ইহুদি সাহিত্যিক ও ইতিহাসবেত্তাগণের মতে, ইসরায়েল নামের উৎপত্তি হয়েছে ‘আম ইসরায়েল’ ও ‘বনী ইসরায়েল’ থেকে। তাই, ইসরায়েল দেশটির নামের পেছনে আরেক অর্থ হচ্ছে বনী ইসরায়েল এবং তাদের সন্তানদের বসবাসের স্থান।
ইসরায়েলের অবস্থান, আয়তন এবং জনসংখ্যা
পশ্চিম এশিয়ার ভূমধ্যসাগরের পূর্ব উপকূলে ইসরায়েল এর অবস্থান। দেশটির দক্ষিণে রয়েছে বিশাল মেকে মরুভূমি আর উত্তরে বরফাবৃত পর্বতমালা। দক্ষিণ দিকেই আবার লোহিত সাগরের এক চিলতে প্রবেশপথও রয়েছে। ইসরায়েলের গাজা উপত্যকার পশ্চিম তীর ও কোলান মালভূমি ইসরায়েলের দখলে থাকা বিতর্কিত স্থান। এই নিয়ে দেশটির আয়তন ২১,৬৪০ বর্গকিলোমিটার।
বর্তমানে ইসরায়েলের জনসংখ্যা প্রায় ৯৩ লক্ষ ৪৮ হাজার ৮৫০। এদের মধ্যে ৭৪.২% ইহুদি এবং ২০.৯ % আরব ও কিছু অন্যান্য জাতির মানুষও বসবাস করে। ধর্মের দিক থেকে এদের ৭৪.২% ইহুদি ধর্ম, ১৭.৮% ইসলাম ধর্ম, ২.০% খ্রিস্টধর্ম এবং ১.৬% দ্রুজ ধর্মের অনুসারী।
দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পাবার পর থেকে ইসরায়েলে প্রায় ৩৪ লক্ষ ৬০ হাজার মানুষ বসবাসের জন্য আসে। এই সংখ্যার ৮৩% এসেছে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে।
ম্যাপ
ইসরায়েল জন্মের ইতিহাস
ইসরায়েলের জন্ম, রাজনীতি ও ইতিহাসের সাথে ‘মধ্যপ্রাচ্য সংকট’ গভীরভাবে জড়িত। স্বাধীনতা ঘোষণার পর থেকেই ইসরায়েল তার প্রতিবেশী আরব রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে বেশ কয়েকবার যুদ্ধে জড়িয়েছে। তারপরও, পৃথিবীর ১৬১টি দেশ ইসরায়েলকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
১৯৪৮ সালে দেশটির স্বাধীনতা লগ্নে এর নাম রাখা হয় ‘স্টেট অব ইসরায়েল’। ইসরায়েলকে প্রথম স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয় তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন।
ইসরায়েলের জন্ম, গ্লিসারিন সংকট ও অ্যাসিটন আবিষ্কার
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পূর্বে গ্লিসারিন ছিলো পুরো পৃথিবীর সামরিক বাহিনীর কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ দ্রব্য। কারণ, এটি অস্ত্র সুরক্ষা ও পরিচর্যায় ব্যবহৃত হতো। আর, ইউরোপের দেশগুলো তুরস্ক থেকে গ্লিসারিন আমদানি করতো। কিন্তু, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন তুরস্ক গ্লিসারিন রপ্তানি বন্ধ করে দেয়। এমন অবস্থায় এগিয়ে আসেন ইহুদি বিজ্ঞানি কাইম ওয়াইসম্যান।
কাইম ওয়াইসম্যান এ্যাসিটন আবিষ্কার করেন, যা গ্লিসারিনের পরিবর্তে সমরাস্ত্র পরিচর্যার কাজে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু এর বিনিময়ে বৃটিশ প্রধানমন্ত্রীর কাছে ওয়াইসম্যান ইহুদিদের জন্য আলাদা আবাসভূমির দাবি করে বসেন।
অটোমান সাম্রাজ্যের পতন
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পূর্বে বর্তমান ইসরায়েল-ফিলিস্তিন অঞ্চল অটোমান সাম্রাজ্যের অধীনে ছিলো। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় মুসলমান শাসকদের অদূরদর্শিতা এবং বৃটিশদের ষড়যন্ত্রের কারণে তুরস্কে মুসলিম খিলাফত ভেঙে যায়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে বৃটিশ বাহিনী ইরাক, সিনাই উপত্যকা, ফিলিস্তিন ও পবিত্র জেরুজালেম দখল করে নেয়।
বেলফোর ঘোষণা
অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর বর্তমান ইসরায়েল, ফিলিস্তিন, সিরিয়া, জর্ডান, লেবানন অঞ্চলগুলো ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের দখলে চলে যায়।
সেসময় ইহুদিরা তাদের ‘আদি ভুমি’ ফিলিস্তিন অঞ্চলে ফিরে যাওয়ার জন্য তীব্র আন্দোলন শুরু করে। ফলে, পূর্ব প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, ১৯১৭ সালের ২ নভেম্বর, তৎকালীন বৃটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী লর্ড আর্থার জেমস বেলফোর ইহুদিবাদি জায়ানিস্ট গোষ্ঠীর কাছে একটি চিঠি লেখেন। সেখানে তিনি ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে একটি ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেন।
এটি বিখ্যাত বেলফোর ঘোষণা নামে পরিচিত। এ ঘোষণার মাধ্যমে ফিলিস্তিন এলাকায় ইহুদিদের আলাদা রাষ্ট্রের সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়। বিপুল সংখ্যক ইহুদি ইউরোপ থেকে ফিলিস্তিনে এসে বসতি স্থাপন শুরু করে।
ইহুদি অভিবাসন ও হাগানাহ বাহিনী
১৯১৪ সাল পর্যন্ত ফিলিস্তিন অঞ্চলে এক হাজার ইহুদি বসবাস করতো। এরপরে সংখ্যাটা দ্রুত বাড়তে থাকে। ১৯১৮ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশদের সহায়তায় ফিলিস্তিনে ইহুদিদের সংখ্যা গিয়ে ঠেকে ২০ হাজারে। এমনকি ব্রিটেনের সহায়তায় ‘হাগানাহ’ নামে ইহুদিদের একটি গুপ্ত বাহিনীও গঠিত হয়।
এ বাহিনীর প্রাথমিক কাজ ছিল ফিলিস্তিনি জনগণের বিরুদ্ধে ইহুদিবাদীদের সহায়তা করা। পরবর্তীতে তারা সংঘবদ্ধ সন্ত্রাস বাহিনীতে পরিণত হয়। ফিলিস্তিনি জনগণের বাড়িঘর এবং ক্ষেত খামার দখল, বাজার ও রাস্তাঘাটসহ জনসমাবেশে বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করা ছিলো এই বাহিনীর মূল কাজ। এভাবেই নিজ ভূমি থেকে তারা ফিলিস্তিনিদের বিতাড়িত করে।
এছাড়াও, পৃথিবীর বিভিন্ন স্থান থেকে ইহুদি অভিবাসীদের ধরে এনে ফিলিস্তিনে জড়ো করা হয়, যার ফলে ফিলিস্তিন ভূমিতে দ্রত গতিতে বাড়তে থাকে ইহুদিদের সংখ্যা।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও ইহুদি রাষ্ট্রের আকাঙ্ক্ষা
১৯৩১ সালের ভেতর ইহুদিদের সংখ্যা বেড়ে ১ লাখ ৮০ হাজার এ পৌঁছে যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইউরোপ জুড়ে ব্যাপক ইহুদি নিধন শুরু হয়। ফলে, প্রতিবাদীদের একটি রাষ্ট্রের জন্য আকাঙ্ক্ষা তীব্রতর হয়ে ওঠে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পরপরই এ লক্ষ্যে কাজ শুরু করে বিশ্ব নেতারা।
জাতিসংঘের প্রস্তাব ও বিভক্তি
১৯৪৭ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ফিলিস্তিন ভূখণ্ডকে দ্বিখন্ডিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সাধারণ পরিষদে এ সংক্রান্ত প্রস্তাবটি ‘১৮১ (২) প্রস্তাব’ হিসেবে গৃহীত ও বাস্তবায়িত হয়। যেখানে ফিলিস্তিনিদের নিজেদের ভূখণ্ডের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়।
এ প্রস্তাব অনুসারে, নিজেদের মাতৃভূমির মাত্র ৪৫ শতাংশ ফিলিস্তিনিদের জন্য, বাকি ৫৫ শতাংশ ভূমি ইহুদীদের হাতে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এভাবেই জোরপূর্বক ভূমি দখলের মাধ্যমে ইসরায়েল রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা হয়।
ইসরায়েলের স্বাধীনতা ঘোষণা
১৯৪৮ সালের ১৪ই মে, ইসরায়েল স্বাধীনতা ঘোষণা করে। দেশটি স্বাধীন হওয়ার পরপরই বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনকে প্রেসিডেন্ট হওয়ার জন্য প্রস্তাব দেওয়া হয়। যদিও তিনি বিনয়ের সাথে, এই প্রস্তাব নাকচ করে দেন।
ইসরায়েল স্বাধীন হলেও বিশ্বের ৫০টি মুসলিম রাষ্ট্রের ৩০ টি রাষ্ট্র এখনও ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয়নি। যার মধ্যে অন্যতম বাংলাদেশ।
ইসরায়েলের শিক্ষা – গবেষণা
ইসরায়েল বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির নিরিখে বিশ্বের সেরা দেশগুলির একটি। উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রেও ইসরায়েল পৃথিবীর প্রথম স্থানে। জেনে অবাক হবেন, আজ পর্যন্ত ইসরায়েল যতগুলো ভাষায় এবং যত সংখ্যক পুস্তকের অনুবাদ প্রকাশ করেছে, তা পৃথিবীর আর অন্য কোন জাতি করতে পারেনি। প্রতিবছর দেশটিতে প্রচুর বই ছাপা হয়, আর তা কেবল ছাপার জন্যই ছাপা এমনটি নয় বরং মানুষও বইগুলো আগ্রহ নিয়ে পড়ে। এখন পর্যন্ত যত জন বিজ্ঞানী নোবেল পেয়েছেন তার মধ্যে ২২ শতাংশই ইহুদি।
ইসরায়েলে মোট সাতটি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। যার মধ্যে জেরুজালেমের হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয় সবচেয়ে পুরনো এবং মর্যাদাপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়। পাশাপাশি এটি মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় মেডিকেল স্কুল হিসেবেও পরিচিত। এছাড়াও, প্রাকৃতিক সংরক্ষণে বিশেষজ্ঞ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে বের্শেবা শহরের বেন-গুরিয়ন বিশ্ববিদ্যালয় অত্যন্ত খ্যাতিসম্পন্ন।
বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিশেষায়িত সাহিত্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যেমন- হাইফার টেকনিওন বিশ্ববিদ্যালয় এবং গবেষণা ও শিক্ষায় বিশেষায়িত রেহোভোট শহরের ওয়েইজম্যান ইনস্টিটিউট এর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
ইহুদি সমাজে ধর্মীয় একাডেমিগুলোর এক বিশেষ স্থান রয়েছে। এগুলো ইয়েশিভোট নামে পরিচিত। ইয়েশিভোটগুলো সাধারণত রাব্বি ও ইহুদি ধর্মীয় পণ্ডিত হিসেবে ভবিষ্যৎ নেতাদের প্রস্তুত করে। তোরাহ, তালমুদসহ অন্যান্য ধর্মীয় শাস্ত্রের গভীর অধ্যয়ন করা হয় এ একাডেমিগুলোতে। ইয়েশিভোট সাধারণত পুরুষদের জন্য সংরক্ষিত। মহিলাদের জন্য সেরকম ভাবে উন্মুক্ত না থাকলেও মহিলাদের ধর্মীয় শিক্ষা লাভের জন্য আলাদা ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
প্রযুক্তিক উৎকর্ষ
প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে ইহুদিরা অবিশ্বাস্য রকম এগিয়ে। আধুনিক প্রযুক্তি উদ্ভাবনে ইসরায়েল বিশ্বের শ্রেষ্ঠ দেশ হিসেবে পরিচিত। এখানে প্রতি ১০ লক্ষ অভিবাসীর জন্য ৮ হাজার ৩৪১ জন গবেষক এবং প্রকৌশলী আছেন, যা পুরো বিশ্বে সর্বোচ্চ।
প্রতিদিন অত্যাধুনিক টেকনোলজি ও আকর্ষণীয় সফটওয়্যার আবিষ্কার করছে ইসরায়েলীরা। ইসরায়েলের ছোট্ট ভুখণ্ডে রয়েছে ৩ হাজার ৫০০ টি অতি উচ্চ প্রযুক্তি সম্পন্ন বিশালাকার কোম্পানি। উচ্চ প্রযুক্তি সম্পন্ন আধুনিক কোম্পানির সংখ্যা গবেষণা ও আবিস্কারের ধরন বিবেচনায় যুক্তরাষ্ট্রের সিলিকন ভ্যালির পরপরই ইসরায়েলের অবস্থান।
পৃথিবীর যেসকল দেশ-মহাকাশে কৃত্রিম উপগ্রহ প্রেরণ করেছে, তার মধ্যে ইসরায়েল অন্যতম। জেনে অনেকেই বিষ্মিত হবে যে, মটোরোলা কম্পানি ইসরায়েলই সর্বপ্রথম মোবাইল সেলফোন আবিষ্কার করে। এসব আধুনিক আবিষ্কার পুরো পৃথিবীর মানুষের জীবনযাত্রার মান বাড়িয়ে দিয়েছে।
মজার ব্যপার হচ্ছে, প্রযুক্তিগতভাবে এগিয়ে থাকলেও ইসরায়েলের মানুষ স্রষ্টার সাথে যোগাযোগের জন্য বেছে নেয় ডাক বিভাগকে। জেরুজালেমের ডাকবিভাগ প্রতিনিয়ত এমন সব চিঠি পায় যেখানে প্রাপকের নাম লেখা থাকে ইশ্বর।
ইসরায়েলের অর্থনীতি এবং স্টার্টআপ কালচার
বানিজ্যের ক্ষেত্রেও পিছিয়ে নেই ইসরায়েল। স্টার্টআপ কোম্পানির সংখ্যাতেও তারা অন্যান্য দেশকে পেছনে ফেলছে। বানিজ্যিক সমৃদ্ধি হার বিবেচনায় ইসরায়েলের স্থান পৃথিবীতে তৃতীয়। এখানকার ৫৫ ভাগ নারী-পুরুষ বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে জড়িত। সাথে সাথে কৃষি ক্ষেত্রেও তারা অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে।
তবে, বিগত ৩০ বছরে দেশটির কৃষিতে সাত গুণ বিস্তার ঘটলেও কৃষিকাজে পানি ব্যবহারের পরিমাণ একই রয়ে গেছে। অথচ, দেশটির মূল ভূখণ্ডের ৬০ শতাংশই মরুভূমি। ইসরায়েলিরা তাদের খাদ্য চাহিদার প্রায় শতভাগই নিজেরাই উৎপাদন করে।
ফুল উৎপাদনেও তারা বেশ খ্যাতিসম্পন্ন। কেবল ভালোবাসা দিবসে ইসরায়েল থেকে সাত মিলিয়নেরও বেশি ফুল ইউরোপে পাঠানো হয়। দুঃখজনক হলেও এতো সমৃদ্ধি অর্জনের পরও দেশটিকে ধনী দেশের কাতারে রাখা হয় না। এর কারন হচ্ছে, ইসরায়েল তাদের নিরাপত্তার স্বার্থে প্রচুর পরিমান অর্থ ব্যয় করে, যা বিশ্বের অন্য কোনো দেশ করেনা। এ খরচ অর্ধেক কমালেও ইসরায়েল পৃথিবীর এক নম্বর ধনী দেশে পরিণত হতে পারবে।
ইসরায়েলের সংস্কৃতি
ইসরায়েলের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি মূলত এর জনসংখ্যার বৈচিত্র্য থেকে এসেছে। সারা বিশ্ব থেকে ইহুদিরা যখন ইসরায়েলে আসে, তারা বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যকেও সাথে করে নিয়ে এসে ইসরায়েলে স্থায়ী হয়েছে। একারণেই, তাদের জীবন-যাপনে পাশ্চাত্য এবং প্রাচ্যের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।
ইসরায়েল বিশ্বের একমাত্র দেশ যেখানে হিব্রু ক্যালেন্ডারের ব্যবহার দেখা হয়। কর্মক্ষেত্র ও স্কুল ছুটির ক্ষেত্রেও ইহুদিদের ধর্মের প্রভাব রয়েছে। যেমন- শনিবার তাদের সাপ্তাহিক ছুটির দিন।
কঠোর অর্থোডক্স ইহুদি সম্প্রদায়ের মধ্যে ধর্মীয় অনুশাসনের সাথে সাথে ধর্মীয় পোশাকের কড়া রীতি মেনে চলা হয়। পুরুষদের মধ্যে সাধারণত কালো পোশাক পরিধান পরিলক্ষিত হয় এবং মহিলাদের বিয়ের পরে মাথা ঢেকে রাখার রীতি রয়েছে। ঐতিহ্যগতভাবে, অনেক কট্টর ইহুদি মহিলারা তাদের মাথার চুল কামিয়ে পরচুলা পরেন। এর মাধ্যমে তারা সতীত্বের প্রতি প্রতিশ্রুতি পালন করে।
অপরদিকে, তুলনামূলক কম রক্ষণশীল ইহুদিরা, সাধারণত, পশ্চিমা ধাঁচের পোশাক পরিধান করে থাকেন। এরা ধর্মীয় পোশাকের রীতিনীতি কঠোরভাবে মেনে না চললেও, ইহুদি ঐতিহ্যের প্রতি তাদের শ্রদ্ধাবোধ থাকে। বিশেষ ধর্মীয় অনুষ্ঠানে তারা ধর্মীয় পোশাকের রীতিনীতি মেনে চলার চেষ্টা করেন। তবে, এ ধরনের ইহুদিদের সংখ্যা খুব বেশি নয়।
ইসরায়েলি উৎসব
ইসরায়েলিরা ইহুদি এবং খ্রিস্টান ধর্মের বিশেষ কিছু ধর্মীয় উৎসব ও অনুশাসন মেনে চলে। এসব উৎসব অনুষ্ঠানের আধ্যাত্মিক তাৎপর্য এবং ঐতিহাসিক ও বিশ্বাসগত ভিত্তি রয়েছে।
ইয়োম কিপ্পুর
ইহুদি ধর্মমত অনুযায়ী, এ দিনটি তাদের জন্য অনুতাপ এবং আত্মশুদ্ধির এক মহৎ দিন। টানা দশদিন অনুশোচনার পরে এই দিনটি আসে, যখন তারা নিজেদের পাপের প্রায়শ্চিত্তের জন্য ঈশ্বরের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে।
বহুকাল পূর্বে পাপের প্রায়শ্চিত্তের জন্য ইহুদি মহাযাজকরা ধর্মীয় পবিত্রস্থানে পশু বলি দিতেন। তবে, এখন আর এর প্রচলন নেই। এখন শুধু অনুশোচনা ও ঈশ্বরের করুণা প্রার্থনার মধ্য দিয়ে প্রায়শ্চিত্ত করা হয়।
সুকোট
সুকোট হলো ইহুদিদের ফসল কাটার উৎসব। ফসল কাটার শেষ দিনে ইহুদিরা নানা উৎসাহ আমেজের সাথে এই উৎসবটি উদযাপন করে। এই দিনটিতে তারা তাদের প্রান্তরে বসবাসকালীন অস্থায়ী জীবন যাপনের কথা স্মরণ করে। ঐতিহ্যগতভাবে তারা এ দিনটিতে একটি ছোট কুঁড়েঘরে বসবাস করে যা সেই প্রান্তরের অস্থায়ী বসবাসের স্মৃতি বহন করে। এদিনে তারা মন্দিরে শীতের বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা করে ।
ইহুদি ধর্মমত অনুযায়ী, সুকোটের অর্থ চূড়ান্ত বিশ্রাম। দিনটিকে তারা শান্তির প্রতীক হিসেবে মানে।
সিমচ্যাট তোরাহ
সুকোট উৎসবের শেষ দিনে তারা তাওরাত পাঠের মধ্যে দিয়ে বার্ষিক পাঠচক্র শেষ করে। দিনটিতে
সিনাগগে তাওরাত কে সম্মান জানিয়ে মিছিল এবং গানের মাধ্যমে এর প্রশংসা করা হয়। সিমচ্যাট তোরাহ মূলত ইহুদিদের একটি আনন্দ মিছিল ।
হানুক্কাহ
যদিও এ উৎসবের কথা বাইবেলে নেই, তবে ইহুদিদের কাছে এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে। মাকাবিদের নেতৃত্বে সিরিয়ায় গ্রীকদের বিরুদ্ধে সফল বিদ্রোহের স্মরণে এ উৎসবটি পালন করা হয়। হানুক্কাহকে আলোর উৎসবও বলা হয়। আটদিন ধরে চলা এই উৎসবে প্রতিদিন একটি করে মোমবাতি জ্বালানো হয়।
শব্বাত
শব্বাত অথবা বিশ্রামবার হলো ইহুদিদের সাপ্তাহিক পবিত্র বিশ্রামের দিন। এই দিনটি শুক্রবার সূর্যাস্ত থেকে শনিবার সূর্যাস্ত পর্যন্ত পালিত হয়। তাদের মতে, সৃষ্টির সপ্তম দিনে ঈশ্বর বিশ্রাম নিয়েছিলেন, এই স্মরণে ইহুদিরা শব্বাত উদযাপন করে থাকে। অন্যান্য কাজ থেকে বিরত থাকা, পরিবার ও বন্ধুদের সাথে খাবার ভাগাভাগি করা এবং ধর্মীয় উপাসনার মাধ্যমে তারা এ দিনটি পালন করে। শব্বাতকালীন অনেক ইহুদি গাড়ি চালানো, বৈদ্যুতিক ডিভাইস ব্যবহার, রান্না করা এবং জনসমক্ষে কোন জিনিস বহন করার মত ব্যাপারগুলোও এড়িয়ে চলে।
রোশ হাশানা
রোশ হাশানা হচ্ছে ইহুদি নববর্ষ এবং শরৎকাল উদযাপনের জন্য একটি উৎসব। এই উৎসবে বিশেষভাবে দুই দিনের ছুটি থাকে। দিনটিতে সিনাগগের প্রার্থনাসেবা অনুষ্ঠিত হয় হয়ে থাকে। যেখানে শোফার নামক শিং আকৃতির বিশেষ বস্তু দ্বারা বাঁশির মতো আওয়াজ করা হয়। এই সময়ে মানুষ বিগত বছরের ভুলের জন্য অনুতপ্ত হয় এবং আগামী বছরে ভালো কাজের জন্য সংকল্প নেয়।
এ বিশেষ দিনের প্রচলিত খাবারের মধ্যে রয়েছে মধুতে ডোবানো আপেল এবং ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি চাল্লা রুটি। এই খাবারকে নতুন বছরের জন্য মঙ্গলের প্রতীক মনে করা হয়। রোশ হাশানার দিনে আত্মবিশ্লেষণের দশদিন শুরু হয়, যার শেষ হলো ইয়োম কিপ্পুর।
ইসরায়েলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা
ইসরায়েলের নিরাপত্তানীতির আড়ালে রয়েছে আগ্রাসন। স্নাতক পাশের পর ইসরায়েলের প্রত্যেক নারী পুরুষকেই বাধ্যতামূলকভাবে সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতেই হয়। প্রশিক্ষণ গ্রহণের এ সময়সীমা পুরুষদের জন্য তিন বছর ও মহিলাদের জন্য দুই বছর। ইসরায়েলের বিমানবাহিনীর পরিধি ও শক্তি বিবেচনায় তারা বিশ্বে চতুর্থ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের পরই এর স্থান।
মোসাদ
বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ংকর গোয়েন্দা সংস্থার অপর নাম মোসাদ। ইসরায়েলের নিরাপত্তা বিরোধীদের তথ্য সংগ্রহ এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া ছিলো মোসাদের প্রাথমিক লক্ষ্য। ১৯৬০ সালে আর্জেন্টিনা থেকে হিটলারের ঘনিষ্ঠ সহযোগি এডলোভ আইখম্যানকে অপহরণ করে ইসরায়েলে নিয়ে এসে বিচারের মুখোমুখি করার পর থেকে মোসাদ পুরো বিশ্বে দারুণভাবে সাড়া ফেলে।
আরব দেশগুলোসহ বিভিন্ন দেশে দুর্ধর্ষ সব অপারেশন চালিয়ে সারা বিশ্বে কুখ্যাতি অর্জন করেছে এ গুপ্ত বাহিনীটি। বর্তমানে বিশ্বের এক নম্বর গোয়েন্দা সংস্থা হলো মোসাদ। বলা হয়ে থাকে, মোসাদ না থাকলে ইসরায়েল বিলীন হয়ে যেতো। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ইসরায়েলকে হারানোর একাধিক প্রচেষ্টা নিষ্ঠুরভাবে নস্যাৎ করে দিয়েছে এই সংস্থাটি ।
ইসরায়েলি জনপ্রিয় খাবার
ইসরায়েলি রন্ধনপ্রণালীতে ভূমধ্যসাগরের সাধারণ খাবারগুলোর বিশেষ প্রভাব রয়েছে। ইহুদিদের খাদ্য আইন যা স্থানীয় ভাষায় ‘কশ্রুত’ নামে পরিচিত, এর নিয়মানুযায়ী তৈরি হয়ে থাকে। ইহুদিদের ছুটির দিনের জন্য একটি নির্দিষ্ট খাদ্যাভ্যাস রয়েছে।
এ খাবারগুলো ইসরায়েলের খাদ্যসংস্কৃতিতে ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সংমিশ্রণ তুলে ধরে। ইহুদি রান্না, ইহুদি ঐতিহ্যের উদাহরণ হিসেবে কয়েকটি জনপ্রিয় খাবার উল্লেখ করা যায়-
চাল্লা: চাল্লা ইহুদী রন্ধনশৈলীর একটি বিশেষ ধরন। এটি হলো মিষ্টি ও একধরনের নরম রুটি। সাধারণত বিনুনি আকৃতিতে রুটিগুলো তৈরি করা হয়। বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠান যেমন শাবাত এবং ইহুদি ছুটির দিনগুলোতে এ খাবারটি পরিবেশন করা হয়।
জাচনুন: ধীরে ধীরে বেক করা জাচনুন মূলত এক প্রকার ইসরায়েলি পেস্ট্রি। হালকা আঁচে এই পেস্ট্রিগুলোকে বেক করা হয়। রাস্তার পাশের স্টল এবং রেস্তোরাঁ, দাওয়াত, কিংবা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ফাস্টফুড হিসেবে এর তুমুল জনপ্রিয়তা রয়েছে।
মালাওয়াচ: মালাওয়াচ এক ধরনের ইসরায়েলি – ইয়েমেনি প্যানকেক, যা ফ্রাইং প্যানে পাতলা করে প্যানকেকের মত করে ভাজতে হয়। সাধারণত ডিম ও টমেটো দিয়ে খাবারটি খাওয়া হয়।
হামিন: শীতের জন্য ইহুদিদের মধ্যে তুমুল জনপ্রিয় খাবার। এটি একপ্রকারের স্ট্যু যা মাংস ও সবজি দিয়ে তৈরি করা হয়। দীর্ঘসময় ধরে মাংস, মটরশুঁটি, আলুসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি এবং স্থানীয় মসলা সহযোগে সেদ্ধ করে এটি তৈরি করা হয়। শীতকালের জন্য হামিন ইসরায়েল অঞ্চলের একটি উৎকৃষ্ট খাদ্য বলা যায় ।
মেওরাভ ইরুশালমি: মেওরাভ ইরুশালমি জেরুজালেমের একটি ঐতিহ্যবাহী খাবার। এটি মূলত মাংসের গ্রিল। ভেড়ার মাংসের সাথে পেঁয়াজ, রসুন, গোলমরিচ, জিরা, হলুদ, জলপাই তেল এবং ধনে দিয়ে গ্রিল রান্নার মত করে এই খাবার রান্না করা হয়। এছাড়াও, মুরগির হৃদপিণ্ড, প্লীহা এবং কলিজা ভেজেও অনেকে মেওরাভ ইরুশালমি রান্না করে।
সুফগানিয়াহ: সুফগানিয়াহ একধরনের জ্যাম-ভর্তি গোলাকার ডোনাট। প্রথমে, ডোনাটটি ভালোভাবে ভাজা হয়; এরপর এর ভেতরে জ্যাম বা কাস্টার্ড পুর হিসেবে দেওয়া হয়। অত্যন্ত সুস্বাদু এই ডোনাটটি পরিবেশন এর আগে উপরে গুড়ো চিনি ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এটি বিশেষত হানুক্কাহ উৎসবে খাওয়া হয়।
ইসরায়েলের দর্শনীয় স্থান
ইসরায়েলের পর্যটন মূলত ইহুদী ধর্মের পবিত্র ও ঐতিহাসিক স্থানগুলিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত। ইসরায়েলের সর্বত্রই ইহুদী ধর্মের ও সভ্যতার স্মৃতিবিজড়িত নানা প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।
পবিত্র বায়তুল মুকাদ্দাস
জেরুজালেমের পুরনো শহরে অবস্থিত পবিত্র বায়তুল মুকাদ্দাস যা মুসলিম, ইহুদি ও খ্রিস্টান, তিন ধর্মের কাছেই পবিত্রতম স্থান। ইসলামের বর্ণনা অণুযায়ী, মুহাম্মদ (সা.) মিরাজের রাতে মসজিদুল হারাম থেকে আল-আকসা মসজিদে এসেছিলেন এবং এখান থেকে তিনি ঊর্ধ্বাকাশের দিকে যাত্রা করেন।
বিভিন্ন শাসকের সময় মসজিদটি পুনর্নির্মাণ এবং অতিরিক্ত বিভিন্ন অংশ যোগ করা হয়েছে। মসজিদটির ভেতরে রয়েছে গম্বুজ, আঙ্গিনা, মিম্বর, মিহরাব, এবং দৃষ্টিনন্দন অভ্যন্তরীণ কাঠামো।
বর্তমানে শহরটি ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণে থাকলেও মসজিদটি ফিলিস্তিনি নেতৃত্বাধীন ইসলামি ওয়াকফের তত্ত্বাবধানে রয়েছে।
মৃত সাগর
আশ্চর্যজনক হলেও সত্য যে, লবনাক্ত মৃত সাগরের পানিতে ভেসে থাকা যায়। এর পানিতে লবনের পরিমান প্রায় ৩৪.২ শতাংশ। যা সাধারণ সমুদ্রের পানির চেয়ে ৮.৬ গুন বেশি লবনাক্ত। অত্যাধিক লবনাক্ততার কারণে সৃষ্ট প্রতিকূল পরিবেশে জলজ প্রাণিরা বসবাস ও জীবনযাপন করতে পারেনা। তাই, এ সাগরে কোনো প্রাণীর নেই। এ কারনেই একে মৃত সাগর বা ডেড সি নামে ডাকা হয়।
তেলআবিব সমুদ্র সৈকত
পুরো ইসরায়েলজুড়ে প্রায় ১৩৭ টি সমুদ্র সৈকত রয়েছে যায় অধিকাংশই লোহিত সাগরের তীরে অবস্থিত। তাছাড়া, বেশ কয়েকটি ভূমধ্য সাগরীয় সৈকতও রয়েছে দেশটিতে। এর মধ্যে তেলআবিব সমুদ্র সৈকতগুলো পৃথিবীর অন্যতম জাঁকজমকপূর্ণ সমুদ্র সৈকত।
জেরুজালেম
ইসরায়েলের সর্বত্র ছড়িয়ে রয়েছে বিভিন্ন ধর্মের প্রাচীন সভ্যতার স্মৃতি বিজরিত নানা প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান। এর মধ্যে জেরুজালেম নগরী অন্যতম।
জেনে অবাক হবেন, জেরুজালেমে এ পর্যন্ত ২৩ বার ভয়াবহ আগুন লেগেছে এবং বহির্বিশ্বের আক্রমণের শিকার হয়েছে ৫২ বারের মতো। জেরুজালেম দখল ও পুনরুদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে ৪৪ বার।
জেরুজালেমের ধর্মীয় গুরুত্ব
ইসরায়েলের রাজধানী, প্রাচীন এবং বড় শহর – জেরুজালেম বিশ্বের প্রধান তিনটি ধর্মের পবিত্র স্থান হিসেবে বিবেচিত হয়। জেরুজালেমের পুরনো শহরে ইসলাম, খ্রিস্টান ও ইহুদি ধর্মের অনুসারীরা প্রতিদিনই প্রদক্ষিণ করেন। আর এই কারণেই এই শহরের ধর্মীয় তাৎপর্য অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। শহরটির ধর্মীয় তাৎপর্য তিন হাজারের বেশি বছরের। তিন ধর্মের কাছেই পবিত্র বলে স্বীকৃত এই শহরটিতে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন ধর্মীয় স্থাপনা ও তীর্থস্থান।
হারাম শরীফ
মক্কা এবং মদিনার পর মুসলমানদের তৃতীয় পবিত্র স্থান হচ্ছে হারাম শরীফ। এটি আল আকসা মসজিদ এবং পাথরের গম্বুজের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে।
ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর (রা.) সর্বপ্রথম এখানে একটি ছোট মসজিদ নির্মাণ করেন। পরবর্তীতে ৭০৫ সালে এই মসজিদ বড় আকারে পুনর্নির্মাণ করা হয়। এটি ভূমিকম্পে পরপর দু’বার ধ্বংসও হয়ে যায়। এখন যে মসজিদটি দেখতে পাওয়া যায় তা নির্মিত হয়েছিল ১০৩৫ সালে।
এ মসজিদটির পাশেই রয়েছে সোনালী গম্বুজবিশিষ্ট ‘কুব্বাত আল-শাখরা’ বা ‘ডোম অফ দ্য রক’। রোমানরা এক কালে এখানে দেবতা জুপিটারের একটি মন্দির তৈরি করেছিল। পরে ৬৮১ সালের দিকে উমাইয়া খলিফা আবদ-আল মালিকের শাসনামলে নির্মিত হয় এই ‘ডোম অব দি রক’। আট কোন বিশিষ্ট এই গম্বুজের ভেতরে রয়েছে একটি পাথরের ভিত্তি, যেখান থেকে নবী করিম (সা.) মিরাজে গিয়েছিলেন। অনেকেই বিশ্বাস করেন, মহানবী (সা.) যেই বোরাকে চড়ে মিরাজ ভ্রমণ করেছিলেন তার পায়ের ছাপ এখনো পাথরে দেখা যায়।
পবিত্র সমাধির গির্জা
খ্রিস্টান ধর্মের প্রবর্তক যিশু খ্রিস্টকে রোমানরা এই জেরুজালেমেই বিচার ও ক্রুশবিদ্ধ করে। যে পথ দিয়ে যিশুকে হাঁটিয়ে নেওয়া হয়েছিল সেই পথটি এখনও বিদ্যমান। এই পথেই যাওয়া যায় যিশুর ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার স্থান ও সমাধিতে।এখানে বাইজেন্টাইন সম্রাজ্ঞী হেলেনা ১৭০০ বছর আগে দ্য চার্চ অব দ্য হলি নামে পবিত্র সমাধির গির্জা নির্মাণ করেন।
তীর্থযাত্রী
প্রাচীন শহর জেরুজালেমে প্রতিদিন ইসলাম, খ্রিস্টান ও ইহুদি – তিন ধর্মের বিপুল সংখ্যক অনুসারী ভ্রমণ করেন। ইহুদিদের ধর্মীয় প্রদক্ষিণের সঙ্গে যোগ দেয় খ্রিস্টানরাও।
ইহুদিরা ডেভিড স্ট্রিট থেকে শুরু করে আল-বরাক দেওয়াল, আল খলিল গেট, আল আমুদ গেট (দামেস্ক গেট) পর্যন্ত প্রদক্ষিণ করেন। খ্রিস্টানরা যিশু খ্রিস্টের শেষ দিনের পথ অর্থাৎ যে পথ দিয়ে হাঁটিয়ে তাকে ক্রুশবিদ্ধ করা হয়েছিল, সে রাস্তা দিয়ে হারাম শরিফে গিয়ে পৌঁছায়।
উপসংহার
ইসরায়েলের সাফল্যের পেছনে তাদের মানবসম্পদে বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। প্রাকৃতিক সম্পদের অভাব সত্ত্বেও, ইসরায়েলের সাফল্যের পেছনে তাদের মানবসম্পদে বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এর কারণ তারা শিক্ষা, প্রযুক্তি, ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে উন্নতি করে বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে। তবে, ফিলিস্তিনি ভূমি দখল ও সেখানকার মানুষদের উচ্ছেদ, ইসরায়েলের সাফল্যকে বিতর্কিত করে তুলছে। সাম্প্রতিক ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত আবারো উভয় পক্ষের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনার দিকে ইঙ্গিত করছে, যা গাজা ও পশ্চিম তীরে সংঘাতের রূপ নিয়েছে।
আরো মজার কিছু তথ্য
শান্তিতে নোবেল পুরস্কার: ইসরায়েল এমন একটি দেশ, যেখানে প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সেনাবাহিনী সকলেই ফিলিস্তিনি গনহত্যাসহ নানা হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত। এরপরেও দেশটির তিনজন প্রধানমন্ত্রী জিতেছেন শান্তির জন্য নোবেল পুরষ্কার। যা নিয়ে বিতর্ক বরাবরই বিদ্যমান।
বিশ্বের সবথেকে বিতর্কিত দেশ: ফিলিস্তিনি ভূমি দখল, গনহত্যা সহ পৃথিবীতে নানা ষড়যন্ত্রের কারণে ইসরায়েল বিশ্বের সবচেয়ে বিতর্কিত দেশ।
নতুন শহরের খোঁজ: কিছু দিন আগে জেরুজালেমে মাটি খুঁড়ে পাওয়া গেছে ৯ হাজার বছরের পুরনো এক শহরের খোঁজ।
ইসরায়েল ভ্রমণ নিষিদ্ধ: বাংলাদেশের পাসপোর্টে স্পষ্ট করে লেখা রয়েছে- এ পাসপোর্ট নিয়ে কোনো বাংলাদেশী ইসরায়েলে ভ্রমণ করতে পারবে না ।
কুকুর সমাধি: পৃথিবীর প্রাচীনতম কুকুর সমাধি ইসরায়েলি উপকূল এলাকা এস্কেলনো আবিষ্কৃত হয়েছে। এখানে রয়েছে হাজারেরও অধিক কুকুরের সামাধি। ধারণা করা হয়, এখানে ৫০০ থেকে ৩০০ খ্রিষ্টপূর্ব পর্যন্ত কুকুরদের কবর দেয়া হতো।
সংবাদপত্র পঠনের জনপ্রিয়তা: মজার ব্যাপার হলো, ইসরায়েলিদের অবসরের সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্রিয়াকলাপগুলির মধ্যে একটি হল একটি সংবাদপত্র পড়া। ২০ বছরের বেশি বয়সী ইসরায়েলিদের ৮৪ শতাংশ বলেছেন যে, তারা অবসরে সংবাদপত্র পড়ে।