Image default
নগর পরিচিতি

লাহোর – পাকিস্তানের সাংস্কৃতিক রাজধানী

যে একবার লাহোরে পা রেখেছে, সে এই শহরের জীবনের অংশ হয়ে গেছে। এ শহরের অধিবাসীরা বলেন – “লাহোর না দেখা, তো কিয়া দেখা” অর্থাৎ যে কোনদিন লাহোর দেখেনি; সে জীবনের কিছুই দেখেনি। মসজিদ থেকে শুরু করে গুরুদার, কাওয়ালী সংগীত অথবা জিভে জল আনা খাবার; এসব কিছুর জন্য শহরটি বিশ্বজোড়া খ্যাতি লাভ করেছে। 

মসজিদ থেকে শুরু করে গুরুদার; কাওয়ালি সংগীত অথবা জিভে জল আনা খাবার; এসব কিছুর জন্য লাহোর বিশ্বজোড়া খ্যাতি লাভ করেছে। এমনকি লাহোরের সংস্কৃতিতেও হিন্দু , মুঘল, শিখ, পাঠান এবং ব্রিটিশ সংস্কৃতির মিশ্র প্রভাব রয়েছে স্পষ্ট। এ শহরের অধিবাসীরা বলেন – “লাহোর না দেখা, তো কিয়া দেখা” অর্থাৎ যে কোনদিন লাহোর দেখেনি; সে জীবনের কিছুই দেখেনি। এমন বিচিত্র প্রবাদের জন্ম কিভাবে হলো তা কেউ বলতে না পারলেও, কথাটি শতভাগ সত্য। শুধু শিল্প সংস্কৃতি নয়, শহরটি পাকিস্তানের শিক্ষা ও সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দু। 

দেশ পাকিস্তান
অঞ্চল/রাজ্য পাঞ্জাব
আয়তন ১৭২ বর্গকিমি  (৬৮৪ বর্গমাইল)
জনসংখ্যা  ১১, ১২৬,২৮৫ জন  (২০১৭ সালের আদমশুমারি) 
সরকারি ভাষা উর্দু
প্রধান মুদ্রা রুপি 
সময় অঞ্চল UTC+5(PKT)
আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর আল্লামা ইকবাল

লাহোরের নামকরণ 

লাহোর পাকিস্তানের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর এবং পাঞ্জাব প্রদেশের রাজধানী। একই সাথে এটি বিশ্বের ২৬ তম বৃহত্তম শহর। ১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান বিভক্তির সময় লাহোর পাকিস্তান সীমান্তে চলে যায়। সীমান্তবর্তী শহর হওয়ায় স্থানটির সাথে অনেক ভারতীরই রয়েছে আত্মিক সম্পর্ক। 

লাহোর শহরটির নামের ব্যুৎপত্তি অজানা। নামটিকে ঘিরে রয়েছে বিভিন্ন তত্ত্ব। কেউ কেউ মনে করেন রাভী নদী থেকে লাহোর শহরটির নাম এসেছে। যেখানে “রাভাওয়ার” শব্দের অপভ্রংশ হয়ে ওঠে লাহোর। 

প্রথম দিকের মুসলিম ঐতিহাসিকরা বিভিন্ন স্থানে শহরটিকে লুহাওয়ার, লাহানুর, লহুর সহ বিভিন্ন ভাবে লিপিবদ্ধ করেছেন। 

আবার অনেকে মনে করেন, ‘লোহার’ শব্দ থেকে শহরটির নাম হয়েছে। লোহার অর্থ কামার। তবে, হিন্দু পুরান মতে, এই শহরে রাম ও সীতার পুত্র ‘লাভ’ এর জন্ম হয়। আর সেখান থেকেই স্থানটির নাম হয় লাভপুরী। যা পরবর্তীত অপভ্রংশ রুপ হয়েছে লাহোর।

ম্যাপ 

লাহোরের আয়তন ও জনসংখ্যা

১,৭৭২ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে লাহোর শহরটির অবস্থান। এটি একটি দ্রুতবর্ধনশীল জনসংখ্যার শহর। ২০১৭ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, লাহোরের জনসংখ্যা ছিল ১ কোটি ১১ লক্ষেরও বেশি। মজার বিষয় হলো, এই শহরের ৪০% এর বেশি বাসিন্দার বয়স ১৫ বছরের নিচে, যা শহরটিকে যুবসমাজের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত করেছে। তবে, শহরবাসীর গড় আয়ু ৬০ বছরেরও কম। 

লাহোর বরাবরই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ একটি শহর। এদের মধ্যে ৯৭% মুসলমান, বাকি ২% খ্রিস্টান এবং ১% হিন্দু ও শিখ সহ অন্যান্য ধর্মাবলম্বী রয়েছে। তবে, সবসময় কিন্তু এমনটি ছিলো না! ১৯৪১ সালে লাহোরে ৬০% মুসলিম ধর্মাবল্মবী বসবাস করতেন। 

লাহোরের ইতিহাস

লাহোর – যেন বহু যুগের কাহিনিতে সূতায় বোনা একটি শহর। আর এর প্রতিটি অধ্যায়েই রয়েছে নতুন গল্প। শহরটি প্রায় এক হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রচীন সভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বিকাশ লাভ করেছে। 

লাহোর বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন শাসকের অধীনে ছিল। ১৬০০ শতক থেকে ১৮০০  শতক পর্যন্ত এটি ছিল মুঘলদের রাজধানী। এরপর ১৮৪৯ সালে লাহোর ইংরেজদের অধীনে চলে যায়। বিংশ শতকে শহরটি ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। 

১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় পাঞ্জাব প্রদেশকে দু ভাগে ভাগ করা হলে লাহোর পাকিস্তানের অংশ হয়ে যায়। এ সময় হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা দেখা দেয়। এই দাঙ্গায় হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটে। ১৯৪৭ এর হিন্দু মুসলিম দাঙ্গা লাহোরবাসির মনে এক গভীর বেদনার জন্ম দেয়।

দিল্লি সালতানাত ও মঙ্গলদের আক্রমণ  

দিল্লি সালতানাতের প্রতিষ্ঠাতা কুতুবুদ্দিন আইবেকের অধীনে লাহোর শাসিত হতো। দিল্লি থেকে তার শাসন শুরু হলেও, লাহোর ছিল অন্যতম প্রিয় শহর। এমনকি মৃত্যুর পরও তাকে এখানেই সমাহিত করা হয়। তার সমাধী আজও শহরের অন্যতম প্রাচীন নিদর্শন হিসেবে পরিচিত। কিন্তু, কুতুবউদ্দিন আইবেক মারা যাওয়ার পর ১৩ শতকে মঙ্গলবাহিনী পুনরায় লাহোর আক্রমণ করেন এবং সম্পূর্ণরূপে শহরটি ধ্বংস করে দেয়। 

মুঘল সাম্রাজ্য

১৫২৪ সালে মুঘল সম্রাট বাবর এর সৈন্যরা লাহোর দখল করে নেয়। ১৬৭০ খ্রিস্টাব্দে মুঘল সম্রাট আকবর শহরটিকে পুনর্নির্মাণ করেন এবং মুঘল আমলের রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলেন।  মুঘলদের সময় থেকেই লাহোরের শিল্প-সংস্কৃতি এবং স্থাপত্যের চরম বিকাশ ঘটে। সে সময় সম্রাট আকবর যেসব ঐতিহাসিক স্থাপত্য এবং নিদর্শন গড়ে তুলেছিলেন তা আজও লাহোরের ঐতিহাসিক সৌন্দর্য এবং গৌরবময় অতীতের নিদর্শন হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা পেয়ে আসছে। 

শিখ শাসন 

মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের পর লাহোর আফগান দূর্বাণী, মারাঠা এবং শিখসহ বিভিন্ন বাহিনীর দ্বারা লুণ্ঠিত হয়েছে। উনিশ শতকের প্রথম দিকে শিখ সাম্রাজ্যের মহারাজা রঞ্জিত সিং লাহোর দখল করতে সক্ষম হন। এসময় তিনি শহরের শান্তি ও স্থিতিশীলতার এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেন।  লাহোরের প্রতি রঞ্জিত সিংয়ের বিরাট অবদানের জন্য মৃত্যুর পর তাকে বাদশাহী মসজিদের পাশে সমাহিত করা হয়। 

ব্রিটিশ শাসন

শিখ সাম্রাজ্যের পতনের পর ১৮৪৯ সালে লাহোর চলে যায় ব্রিটিশ শাসনের হাতে। ব্রিটিশরা লাহোরের আধুনিকায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ সময় প্রাচীন লাহোরের অবকাঠামো ও প্রশাসনিক ব্যবস্থায় অভূতপূর্ব পরিবর্তন আসে, যার ফলে লাহোরে উন্নত রাস্তাঘাট, ভবন এবং অন্যান্য স্থাপনা গড়ে ওঠে। পাশাপাশি শিক্ষা, যোগাযোগ, স্বাস্থ্য ক্ষেত্রেও বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে এবং এরই মধ্য দিয়ে লাহোর একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক নগরীতে পরিণত হয়। তৎকালীন লাহোরের এ অভূতপূর্ব উন্নয়নের জন্য স্যার গঙ্গারামের অবদান অনস্বীকার্য। স্যার গঙ্গারাম ছিলেন একাধারে একজন ব্রিটিশ স্থপতি এবং সমাজসেবক। 

লাহোরের আবহাওয়া ও মানুষের জীবনধারা

লাহোরের আবহাওয়া সাধারণত গরম।  গ্রীষ্মকালে এর তাপমাত্রা প্রায় ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত  পৌছে যায়। গ্রীষ্মের তীব্র গরমের পর শুরু হয় বর্ষা। এ সময় শহরের প্রাণচাঞ্চল্যতায় নতুন মাত্রা যোগ হয়। শীতকালে, তাপমাত্রা অনেকটা কমে যায়, এবং সেসময় লাহোরের পরিবেশ আরও রোমান্টিক হয়ে ওঠে। এখানকার বাসিন্দারা জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত উদযাপন করতে ভালোবাসে। লাহোর শহরটিও বেশ কোলাহল পূর্ণ ও কর্মব্যস্ত।

লাহোরের মানুষের জীবনধারা এই শহরেরই সমৃদ্ধ সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং আধুনিকতার মিশ্রণে গড়ে উঠেছে। একই সাথে তাদের জীবনধারা বেশ বৈচিত্র্যময় এবং উৎসবমুখর। লাহোরের মানুষ খুব অতিথিপরায়ণ। কবিতা ও গানের প্রতি রয়েছে তাদের বিশেষ অনুরাগ। লাহোরবাসী চা পান করতে খুব ভালোবাসেন। রাস্তায় দাঁড়িয়ে চা খেতে খেতে আড্ডা দেওয়া লাহোরবাসীর খুব পছন্দের একটি কাজ। 

উৎসব মুখর বা আড্ডাবাজ হলেও লাহোর কিন্তু মোটেও আলস্যের স্থান নয়। এটি পাকিস্তানের অন্যতম প্রাণবন্ত এবং বৈচিত্র্যময় শহর। কর্মচাঞ্চল্য এ শহরে রয়েছে নানা ধরণের শিল্প কারখানা, বাণিজ্যিক ভাবন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। পাকিস্তানের মোট জিডিপির প্রায় ১৩% লাহোর থেকে আসে, যা একে দেশের অন্যতম ধনী শহরে পরিণত করেছে।

লাহোরের শিল্প ও সংস্কৃতি

লাহোর শুধুমাত্র অর্থনৈতিকভাবেই সমৃদ্ধ নয়, বরং এটি শিল্প-সাহিত্য এবং সংস্কৃতির অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। মজার বিষয় হলো, পাকিস্তানের প্রায় ৮০% বই লাহোর থেকেই প্রকাশিত হয়। এমনকি বিখ্যাত সংগীত ঘরানা কাওয়ালীর জন্মস্থান হচ্ছে এই লাহোর, যা এখানকার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক অনবদ্য অংশ। লাহোরের সর্বত্রই রয়েছে শিল্পের ছোঁয়া।

ললিউড ও চলচ্চিত্র

এক সময় লাহোর ছিল পাকিস্তানি চলচ্চিত্র নির্মাণের তীর্থস্থান। শহরটি একসময় পাকিস্তানি সিনেমার স্বর্ণযুগকে নেতৃত্ব দিয়েছে। এখান থেকেই বিখ্যাত “ললিউড” –  চলচ্চিত্র নগরী গড়ে উঠেছে। উল্লেখ্য যে, পাকিস্তানের স্বাধীনতা লাভের পর লাহোরই ছিল একমাত্র শহর যেখানে একটি সক্রিয় চলচ্চিত্র শিল্প গড়ে উঠেছিল |

 “তেরি ইয়াদ” নামক ঐতিহাসিক চলচ্চিত্রটি ছিল পাকিস্তানের প্রথম উর্দু ভাষার পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা। এটি ১৯৪৮ সালের ৭ আগস্ট মুক্তি পায়। বর্তমানে পাকিস্তানের অধিকাংশ সিনেমা করাচিতে নির্মিত হলেও লাহোরের চলচ্চিত্র ইতিহাস এখনও গুরুত্বপূর্ণ।

“তেরি ইয়াদ” সিনেমা

লাহোরের বিখ্যাত খাবার

লাহোরের সংস্কৃতির অন্যতম আকর্ষণ হলো খাবার। দুই হাজার বছরের পুরনো শহর লাহোর ভোজন রসিকদের জন্য যেন স্বর্গের টুকরো। এখানকার অসাধারণ স্বাদের খাবারগুলি মূলত পাঞ্জাব ও মুঘল ঘরানা থেকে অনুপ্রাণিত। লাহোরের রাস্তায় বেরোলেই আশেপাশে লোভনীয় বিভিন্ন স্ট্রিট ফুড এর দেখা মিলবে। লাহোরের বিখ্যাত একটি ফুড স্ট্রিটের নাম হচ্ছে গাউয়ালমন্ডি ফুড স্ট্রিট। এখনকার লোভনীয় এবং জনপ্রিয় খাবার হলো দহিভাল্লা, ফল চাট, নিহারী, ছোলে পুরী। এছাড়াও লাহোরের অন্যতম কিছু জনপ্রিয় খাবারের মধ্যে রয়েছে-

লাহোরি চারঘা:  একটি জনপ্রিয় খাবার হল লাহোরি চারঘা। একটি  আস্ত মুরগিকে বিভিন্ন ধরনের স্থানীয় মসলা মাখিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে মেরিনেট করে, বারবিকিউ এর মত করে রান্না করা হয়। 

লাহোরি চারঘা

পায়ে: খাসি ভেড়া এবং গরুর পা কে মসলা দিয়ে ধীরে ধীরে রান্না করে তৈরি করা খাবারের নাম পায়ে। এটি লাহোরের অত্যন্ত বিখ্যাত এবং প্রসিদ্ধ খাবারের মধ্যে অন্যতম। বিশেষ ধরনের রুটির সাথে এই পায়ে খাওয়া হয়ে থাকে।

মোরগ জামনি: মুরগির মাংসকে ছোলা এবং মসলা দিয়ে ধীরে ধীরে রান্না করে যে তরকারি তৈরি করা হয়, তা এখানে মোরগ জামনি নামে পরিচিত। এটি খেতে অত্যন্ত সুস্বাদু। লাহোরের  স্থানীয়দের কাছে এবং পুরো পাকিস্তান জুড়ে মোরগ জামনি অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি খাবার।

মোরগ জামনি

কারাহি: বিশেষ এক ধরনের কড়াইয়ে নানা রকম মসলা ও সবজি সহযোগে রান্না করা এই খাবারের নাম কারাহি। খাবারে বৈচিত্র আনতে মাঝে মাঝে মুরগি, খাসি, ভেড়া বা মাছ দেওয়া হয়।

কারাহি

লাচ্ছি: লাহোরের সবথেকে জনপ্রিয় পানিও হচ্ছে  লাচ্ছি। টক দই দিয়ে তৈরি এ পানীয় স্বাদে মিষ্টি বা টক হতে পারে। যেকোনো বিয়ে বাড়ি বা অনুষ্ঠানে বিভিন্ন স্বাদের লাচ্ছির আয়োজন করা হয়।

লাহোরের মেলা ও উৎসবসমূহ

জাসান-ই – বাহার

লাহোরে উদযাপিত সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে পরিচিত উৎসব হচ্ছে “জাসান-ই – বাহার”। এটি একটি পাঞ্জাবী উৎসব যা বসন্ত ঋতুর শুরুতেই উদযাপন করা হয়। একে বসন্ত ঘুড়ি উৎসবও বলা হয়ে থাকে।

এই উৎসবে সারা শহরে ঘুড়ি উরানোর প্রতিযোগীতার আয়োজন করা হয়। প্রতিবছরই এ দিনটিতে দেখা যায় আকাশে  নানান রঙ-বেরঙের ঘুরির সমারোহ। এই সময় শহরের প্রতিটি বাসার ছাদে ছাদে শুরু হয় ঘুড়ি উড়ানোর প্রতিযোগিতা ঘুড়ি। এর পাশাপাশি ফাঁকা গুলি ছুড়ে, নেচে গেয়ে আনন্দে মাতোয়ারা হন, শহরের সব বয়সী মানুষেরা। মহিলারা সাধারণত এই দিনে উজ্জ্বল হলুদ রঙের পোশাক পরিধান করেন। 

দুঃখজনকভাবে,  ২০০৭ সালে ঘুড়ির সূতায় বেধে মৃত্যুর কারণে উৎসবটিকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।  এরপরেও লাহোর অধিবাসী নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে উৎসবটি পালন করেন। এ সময় উৎসবে অংশ নিতে সারাদেশ এবং দেশের বাইরের পর্যটকেরাও ভিড় জমান লাহোরে। 

ঘুড়ি উৎসব

উৎসবের মধ্যে আরও রয়েছে ইদ-উল-ফিতর ও ইদ-উল আজহা। এই দুই ইদ লাহোরের সবথেকে বড় দুটি উৎসব। লাহোরে বিভিন্ন মেলাও উদযাপিত হয়ে থাকে। নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে ১৫ দিনের জন্য অনুষ্ঠিত হয় লহোরের জাতীয় শিল্প প্রদর্শনী। প্রদর্শনীতে মূলত পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রদেশ থেকে আসা ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্পের  প্রদর্শন এবং কেনাবেচা হয়ে থাকে।

এছাড়াও প্রতিবছরই বিভিন্ন মেলা যেমন পাকিস্তানের প্রয়াত কবি ফয়েজের সম্মানে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে ফয়েজ আহমেদ মেলা এবং মহাকাব্যিক পাঞ্জাবি কবি প্রফেসর আলী আরশাদ মিরের সম্মানে আলী এরশাদ মীর মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। 

লাহোরের ঐতিহাসিক মসজিদসমূহ

বাদশাহী মসজিদ

মুঘল শহর হিসেবে লাহোরের দিকে তাকালে সবার আগে চোখে ভেসে উঠবে লাল ইটের অসামান্য এক স্থাপনা বাদশাহী মসজিদ। উচু মিনার, গোলাকার গম্বুজ আর বিস্তৃত চত্বর নিয়ে আজও পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় এ স্থাপনা মুঘল ইতিহাসের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। 

পাকিস্তানের লাহোরে অবস্থিত পাকিস্তান ও দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম মসজিদ এবং পৃথিবীর পঞ্চম বৃহত্তম মসজিদ হলো এই বাদশাহী মসজিদ। ষষ্ঠ মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব ১৬৭১ সালে এ মসজিদটি নির্মাণ করেন এবং ১৬৭৩ সালে এর নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়। মসজিদটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এর ধারণ ক্ষমতা। এখানে প্রায় এক লাখ মুসল্লি একসাথে নামাজ আদায় করতে পারেন।               

বাদশাহী মসজিদ

ওয়াজির খান মসজিদ

১৬৪১ সালে এই মসজিদটি নির্মাণ করেন সম্রাট শাহজাহান। তার সময়ের অন্যান্য স্থাপত্যের মতোই এই মসজিদটি ভীষণ সুন্দর। এটি একই সাথে পাকিস্তানের অন্যতম একটি পবিত্র স্থান। এই মসজিদে প্রায় ৭০ হাজার মানুষ একত্রে নামাজ আদায় করতে পারেন। মসজিদটিতে একটি ইসলামিক জাদুঘরও রয়েছে, যেখানে বিভিন্ন নকশার কোরআন শরীফ সংরক্ষিত আছে।

ওয়াজির খান মসজিদ

লাহোরের দর্শনীয় স্থান এবং ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাসমূহ  

মুঘলদের শহর হিসেবে লাহোরে অনেক দর্শনীয় স্থান গড়ে উঠেছে। লাহোর ভ্রমণের জন্য উপযুক্ত সময় হল শরৎ এবং শীতকাল, অর্থাৎ অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত। এই সময়ে লাহোরের আবহাওয়া বেশ আরামদায়ক হয়। গ্রীষ্মের তীব্র গরম এড়াতে এ সময়টা ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে ভালো। এছাড়া, শীতকালে শহরের প্রধান ঐতিহাসিক স্থাপনা, যেমন বাদশাহী মসজিদ, শাহী কিলা, শালিমার গার্ডেন, এবং মিনারে পাকিস্তান দর্শন করাও বেশ ঝামেলাহীন হয়ে ওঠে। লাহোরের কিন্তু বিখ্যাত দর্শনীয় এবং ঐতিহাসিক স্থান হলো- 

মিনার-ই-পাকিস্তান

মিনার-ই-পাকিস্তান হল লাহোরে অবস্থিত পাকিস্তানের জাতীয় স্তম্ভ। এটি ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দের ৩০ মার্চ লাহোর সম্মেলনের স্মৃতিতে নির্মিত। এটি একটি ঐতিহাসিক স্থান। এই মিনারে পাকিস্থানেই মুসলিম লীগ কর্তৃক মুসলমানদের জন্য একটি পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের প্রথম ডাক হিসেবে ‘লাহোর প্রস্তাব’ ঘোষণা করা হয়। মিনারে পাকিস্তান দেশটির বিভিন্ন জাতীয় দিবস ও অনুষ্ঠানে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে কাজ করে, যেখানে মানুষ স্বাধীনতা ও ঐতিহ্যের প্রতি তাদের শ্রদ্ধা নিবেদন করে।

মিনার-ই-পাকিস্তান

লাহোর দুর্গ

লাহোর দুর্গটি স্থানীয়ভাবে শাহী কিল্লা বলে পরিচিত। বাদশাহী মসজিদ থেকে খানিক দূরে এর অবস্থান। ১১ শতাব্দীতে নির্মিত এই দুর্গটি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন শাসক দ্বারা ধ্বংস এবং পুনঃনির্মিত হয়েছে। কাদা মাটির তৈরি বিশাল দুর্গে রয়েছে সম্রাট শাহজাহান কর্তৃক নির্মিত শিশ মহল। 

১৯৮১ খ্রিস্টাব্দে শালিমার উদ্যানের পাশাপাশি এই দুর্গকেও ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।দুর্গেটিতে মুঘল স্থাপত্যের বিভিন্ন নিদর্শন পাওয়া যায়। এবং দুর্গের ভেতর বিখ্যাত কিছু স্থানের মধ্যে রয়েছে আলমগীরী ফটক, নওলাখা প্যাভেলিয়ন এবং মোতি মসজিদ। 

লাহোর দুর্গ

লাহোরি গেট

লাহোরি গেট হল লাহোরের প্রাচীরঘেরা শহরের ১৩টি প্রবেশদ্বারের মধ্যে একটি।১৬ শতকের মুঘল আমলে লাহোর শহরকে রক্ষা করার জন্য এ গেট গুলো নির্মিত হয়েছিল| তবে বর্তমানে মুঘল ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে রয়ে গেছে এ গেটগুলো।প্রতিটি গেটেরই নিজস্ব নাম এবং তাৎপর্য রয়েছে।এই গেট গুলো শহরের সমৃদ্ধ সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যের স্মৃতি চিহ্ন বহন করে এবং অতীত- বর্তমানের মধ্যে একটি সংযোগ প্রদান করে।

লাহোরি গেট ‘লোহারি’ গেট নামেও পরিচিত। নামটির সাথে উর্দু ভাষার সম্পর্ক বিদ্যমান, যেখানে “লোহার” অর্থ কামার। তবে এখানে কামাররা বসবাস করতেন বা কাজ করতেন এমন কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় না।

লাহোর জাদুঘর

লাহোরের সব থেকে বিখ্যাত জাদুঘর হচ্ছে লাহোর মিউজিয়াম। লাহোরের ইতিহাস সম্পর্কে জানতে হলে এই জাদুঘরে ভ্রমণ করতেই হবে। এখানে রয়েছে বিরল সব পান্ডুলিপি, পুরনো মুদ্রা এবং খোদাই করা কাঠের কাজ থেকে শুরু করে প্রাচীন সব গহনা, বাদ্যযন্ত্রসহ বিভিন্ন ঐতিহাসিক এবং সাংস্কৃতিক নিদর্শন। 

লাহোর জাদুঘর

শালিমার বাগান

মুঘল শাসকদের কাছে বাগান ছিলো খুব পছন্দের। আর তাই তারা শালিমার বাগান নামের অমর সৃষ্টি তৈরি করেন। বিখ্যাত এই বাগানটি সম্রাট শাহজাহান ১৬৪২ সালে নির্মাণ করেন। বাগানে অসংখ্য ফুলের গাছের পাশাপাশি রয়েছে বিশাল একটি পুকুর এবং ৪১০ টি ফোয়ারা। ১৯৮১ সালে শালিমার উদ্যানটিকে ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে ঘোষণা করা হয়।                   

শালিমার বাগান

রেপ্লিকা আইফেল টাওয়ার

অনেকেই এটা জেনে অবাক হতে পারে যে লাহোরের নিজস্ব আইফেল টাওয়ার রয়েছে। প্যারিসের আইফেল টাওয়ারের অনুকরণে নির্মিত এই স্থাপনাটি অবস্থিত লাহোরের ব্যারিয়া টাউনে। এটি লাহোরবাসী ও পর্যটকদের জন্য একটি জনপ্রিয় আকর্ষণ। এই রেপ্লিকা আইফেল টাওয়ারটি রাতের বেলায় অনন্য সুন্দর আলোকসজ্জায় সজ্জিত হয়, যা শহরের সৌন্দর্যকে বহুগুনে বাড়িয়ে তোলে। প্যারিসের মূল টাওয়ারের মতো উচ্চতা না হলেও, লাহোরের রেপ্লিকা আইফেল টাওয়ারটি পাকিস্তানের একটি অন্যতম দর্শনীয় স্থান হিসেবে লাহোরের প্রাচীন ঐতিহ্য আর আধুনিক স্থাপত্যের মধ্যে এক অনন্য সংযোগ তৈরি করেছে।

রেপ্লিকা আইফেল টাওয়ার

খাল

ঐতিহাসিক স্থাপত্য ছাড়াও লাহোরে দেখার মত রয়েছে চমৎকার লম্বা একটি খাল। শহরের পূর্ব দিক বরাবর এই খালটি বয়ে চলেছে। ৮২ কিলোমিটার দীর্ঘ এই খালটি এক সময় শহরের পানির চাহিদা মেটাতো, যা এখন পরিণত হয়েছে শহরের অন্যতম বিনোদন কেন্দ্রে।

ওয়াঘা 

পাঞ্জাব প্রদেশের লাহোরে অবস্থিত ওয়াঘা গ্রামটি। এই গ্রামটি বিখ্যাত হওয়ার পেছনে রয়েছে এক অদ্ভুত গল্প। ভারত-পাকিস্তানের সীমান্তে অবস্থিত এই গ্রামটি দুই দেশের সৈন্যদের মধ্যে একটি আনন্দঘন অনুষ্ঠানের জন্য বিখ্যাত। এই অনুষ্ঠানকে বলা হয় বিটিং রিট্রিট। প্রতিদিন সূর্যাস্তের আগে সীমান্তে ভারত- পাকিস্তান সৈন্যদের মধ্যে এই অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। বছরের পর বছর একই রীতি মেনে চললেও, দুই দেশের উৎসবমুখর ও দেশপ্রেমী মানুষদের দ্বারা সীমান্ত প্রতিদিনই ভরে ওঠে, যা এই অনুষ্ঠানের বিশেষ আকর্ষণ।

ওয়াঘা সীমান্ত

লাহোরের সবথেকে বড় বাজার

দাতা গঞ্জ বকশ  শহরে অবস্থিত লাহোরের সবথেকে বড় বাজারের নাম হচ্ছে আনারকলি বাজার।এছাড়া আনারকলি লাহোরের একটি উপশহর এবং দাতা গঞ্জ বকশ তহশিলের একটি ইউনিয়ন পরিষদ হিসেবেও কাজ করে। এটি ওয়ার্ল্ড সিটির লাহোরি গেটের দক্ষিণ থেকে শুরু করে মল রোড পর্যন্ত বিস্তৃত। আনুমানিক ২০০ বছর ধরে টিকে আছে বাজারটি। ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীনতম টিকে থাকা বাজার গুলির মধ্যে অন্যতম হচ্ছে আনারকলি বাজার।

আনারকলি ছিলেন মূলত মুঘল দরবারের একজন বিখ্যাত তাওয়ায়েফ, যার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠেছিল সম্রাট আকবর পুত্র সেলিমের সঙ্গে। কথিত আছে, তাকে জীবন্ত কবর দেওয়া হয়েছিল, এবং সেই কবরটির স্থানেই আজকের এই আনারকলি বাজার।তাওয়ায়েফ আনারকলির নামের সূত্র ধরেই এ বিখ্যাত বাজারের নামকরণ করা হয়েছে আনারকলি বাজার।

আনারকলি বাজার

লাহোরের যোগাযোগ ব্যবস্থা

লাহোর শহরের যোগাযোগ ব্যবস্থা বেশ উন্নত। তবে, এই শহরের যোগাযোগ ব্যবস্থার কথা বললে অরেঞ্জ লাইনের কথা না বললেই নয়। অরেঞ্জ লাইন হল লাহোরের স্বয়ংক্রিয় দ্রুত ট্রানজিট লাইন এবং পাকিস্তানের প্রথম চালক বিহীন মেট্রো। এটি পাঞ্জাব মাস ট্রানজিট অথরিটি দ্বারা পরিচালিত হয় এবং লাহোর মেট্রো সিস্টেমের একটি অংশ। 

এছাড়াও এই শহরের প্রধান রেলওয়ে জংশন হল লাহোর জংশন ।পাকিস্তানের তৃতীয় বৃহত্তম এবং ব্যস্ততম বিমানবন্দর ‘আল্লামা ইকবাল ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট’ এর অবস্থানও লাহোরে।                                      

‘লাহোর’- শহর যার ইতিহাসে মিশে আছে সোনালি দিনের পান্ডুলিপি। প্রাণ-প্রাচুর্যে ভরা প্রতিটি পথ, প্রতিটি ইট , প্রতিটি গলি, প্রতিটি স্থাপনা সবই যেন সময়ের সাক্ষ্য। সংগীত, সংস্কৃতি, আর খাবারের অনন্ত মেলবন্ধন লাহোরকে বিশ্ববাসীর কাছে এক অনন্য মর্যাদায় পৌঁছে দিয়েছে লাহোরবাসির মতো বিশ্ববাসীও তাই বলতে বাধ্য হয়- “জিন্দা দিল্লি লাহোর”। এ শহর শুধু একটি স্থান নয়, এ শহর যেন একটি জীবন্ত প্রাণ।

লাহোর সম্পর্কে কিছু মজার তথ্য  

দূষণ প্রতিযোগীতাঃ মজার ব্যাপার হলো দিল্লির সাথে লাহোরের দূষণের প্রতিযোগিতা চলতে থাকে। 

অতিরিক্ত বায়ু দূষণঃ লাহোরে বায়ু দূষণের মাত্রা এতই বেশি যে, একবার অতিরিক্ত বায়ু দূষণের কারণে শহরের সব স্কুল বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল।

মিনি পাকিস্তানঃ লাহোরকে মিনি পাকিস্তান বলা হয়ে থাকে।

পাকিস্তানের বৃহত্তম স্টেডিয়ামঃ পাকিস্তানের বৃহত্তম স্টেডিয়াম- গাদ্দাফি স্টেডিয়াম লাহোরে অবস্থিত, যা একসাথে ৬০০০০ দর্শক ধারণ করতে সক্ষম।

কিংবদন্তি মো. রাফিঃ এই তথ্যটি অনেক কম লোকই জানেন যে কিংবদন্তি বলিউড গায়ক মো. রাফি লাহোরে তার ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন।

বাসস্টপে ফ্রি ওয়াইফাইঃ লাহোর শহরের প্রতিটি বাসস্টপে ফ্রি ওয়াইফাই এর সুবিধা রয়েছে।

Related posts

সুখের রাজধানী – থিম্পু

রোমান্সের শহর-প্যারিস

সিঙ্গাপুর- দক্ষিণ এশিয়ার লায়ন সিটি

আশা রহমান

Leave a Comment

Table of Contents

    This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More