‘পানামা পেপার্স’ কেলেঙ্কারির কথা কি মনে পড়ে? যে ঘটনা গোটা বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছিল।
শুধুই কি পানামা পেপার্স কেলেঙ্কারিতে গল্প শেষ? না, ঠিক এই সময়ে পানামা সিটি তার আধুনিক রূপে গড়ে উঠছিল। একদিকে আধুনিক দালানের সারি, অন্যদিকে শতবর্ষ পুরোনো স্থাপত্য। পানামা সিটি যেন সময়ের দুই ধারাকে একসঙ্গে ধরে রেখেছে! দিনের আলোয় ব্যস্ত বাণিজ্যিক নগরী, আর রাত নামতেই রঙিন আলোয় সাজানো এক উৎসবের শহর।
পানামা সিটি, একই সঙ্গে আকর্ষণীয় এবং বিতর্কিত। চলুন আকাশচুম্বী ভবন আর বিশ্বের দুই প্রান্তকে একত্রিত করা ঐতিহাসিক ক্যানালের এই শহরটি সম্পর্কে জেনে আসি।
দেশ | পানামা |
অঞ্চল/প্রদেশ | পানামা প্রদেশ |
আয়তন | ২৭৫ বর্গকিলোমিটার |
জনসংখ্যা | প্রায় ৯ লাখ |
সরকারি ভাষা | স্প্যানিশ |
প্রধান মুদ্রা | পানামানিয়ান বালবোয়া (PAB) এবং মার্কিন ডলার (USD) |
সময় অঞ্চল | ইস্টার্ন স্ট্যান্ডার্ড টাইম (UTC-৫) |
আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর | তোকুমেন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (Tocumen International Airport) |
ভৌগোলিক অবস্থান ও জলবায়ু
পানামা সিটির ভৌগোলিক অবস্থান এক কথায় অসাধারণ! এই শহরটি মধ্য আমেরিকার পানামা প্রজাতন্ত্রের রাজধানী। পানামা সিটি দেশটির দক্ষিণ-পূর্ব অংশে প্যাসিফিক মহাসাগরের কোল ঘেঁষে গড়ে উঠেছে। শহরটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২৭ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত। এর উত্তর-পূর্ব দিকে রয়েছে সবুজ পাহাড়ের সারি। পানামা সিটিকে বলা হয় “বিশ্বের সংযোগদ্বার।” কারণ, এখানেই রয়েছে বিখ্যাত পানামা খাল। এই খাল আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগরকে সংযুক্ত করেছে।
পানামার জলবায়ু
পানামা সিটির জলবায়ু পৃথিবীর গুটিকয়েক “ট্রপিকাল সাভানা” জলবায়ুর মধ্যে অন্যতম। এখানে সারা বছর গড় তাপমাত্রা থাকে ২৭-২৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে। শহরটিতে দুটি ঋতু রয়েছে, বর্ষা ঋতু (মে থেকে নভেম্বর) এবং শুষ্ক ঋতু (ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল)। বর্ষাকালে ভারী বৃষ্টি হলেও তাপমাত্রার খুব বেশি পরিবর্তন হয় না। শুষ্ক ঋতুতে শহরটি হয়ে ওঠে একেবারে রৌদ্রোজ্জ্বল। এই সময়টি পর্যটকদের জন্য আদর্শ।
ম্যাপ
পানামা সিটির ইতিহাস
প্রাচীন আদিবাসী সংস্কৃতি থেকে শুরু করে উপনিবেশিক শাসন, বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে উত্থান, এবং আধুনিক নগরায়ণ! প্রতিটি অধ্যায়ই এই শহরের অনন্য পরিচয় বহন করে।
প্রাচীন যুগের সূচনা
পানামা সিটির ইতিহাসের শিকড় বহু প্রাচীন। গবেষকদের মতে, প্রায় ১৩,০০০ বছর আগে এই অঞ্চলে বসতি স্থাপন শুরু হয়। এ সময়ের আদিবাসী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে কুনা, এম্বেরা, এবং গোয়ামি জাতিগোষ্ঠীর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এদের জীবনধারা ছিল মূলত শিকার, মাছ ধরা এবং কৃষিকাজ নির্ভর ছিল।
প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় জানা যায়, এই অঞ্চলের আদিবাসীরা মক্কা ভুট্টা, মিষ্টি আলু, এবং কাসাভা উৎপাদন করত। পানামার উর্বর মাটি এবং জলবায়ু কৃষি ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা এনে দিয়েছিল। এছাড়া, এম্বেরা ও কুনা গোষ্ঠী শিল্প ও কারুশিল্পে দক্ষ ছিল। তারা মাটি ও পাথর দিয়ে বাসস্থান নির্মাণ এবং জাহাজ তৈরিতে পারদর্শী ছিল।
পানামার ভৌগোলিক অবস্থান উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার মধ্যে একটি প্রাকৃতিক সেতু হিসেবে কাজ করত। এই অঞ্চলের মাধ্যমে পণ্য, সংস্কৃতি, এবং ধর্মীয় বিশ্বাসের আদান-প্রদান হতো। উদাহরণস্বরূপ, কুনা জাতিগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী শিল্পকর্ম, বিশেষ করে “মোলা,” আজও তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রতীক।
ইউরোপীয়দের আগমন ও উপনিবেশিক যুগ
১৫১৩ সালে স্প্যানিশ অভিযাত্রী ভাস্কো নুনিয়েজ দে বালবোয়া প্রথম ইউরোপীয় হিসেবে প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূলে পৌঁছান। এই ঘটনা ইউরোপীয় ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়। বালবোয়া এই মহাসাগরটির নাম দেন “দক্ষিণ সাগর” (Mar del Sur)।
১৫১৯ সালে পেদ্রারিয়াস দাভিলা স্প্যানিশ উপনিবেশ হিসেবে পানামা সিটি প্রতিষ্ঠা করেন। এটি দ্রুতই স্পেনের দক্ষিণ আমেরিকান উপনিবেশগুলোর সাথে বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। তবে ১৬৭১ সালে ইংরেজ জলদস্যু হেনরি মরগানের আক্রমণে শহরটি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। এরপর, ১৬৭৩ সালে বর্তমান স্থানে শহরটি পুনর্নির্মিত হয়।
পানামা খালের নির্মাণ
পানামা খালের নির্মাণ এই অঞ্চলের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ১৮৮১ সালে ফরাসি প্রকৌশলী ফার্দিনান্দ দে লেসেপস খাল নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। পরবর্তীতে আর্থিক ও স্বাস্থ্যগত সমস্যার কারণে প্রকল্পটি ব্যর্থ হয়। ১৯০৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে পুনরায় কাজ শুরু হয় এবং ১৯১৪ সালে খালটি উদ্বোধন করা হয়।
এই খাল আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগরকে সংযুক্ত করে। এছাড়াও খালটি বিশ্ব বাণিজ্যে বিপ্লব ঘটায়। ১৯৯৯ সালে পানামা খালের নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্র থেকে পানামার হাতে ফিরে আসে। যা দেশেটির জন্য একটি মাইলফলক।
পানামা সিটির অর্থনীতি ও শিল্প
পানামা সিটি শুধু পানামার রাজধানীই নয়, লাতিন আমেরিকার অর্থনৈতিক কেন্দ্র! এই শহরের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হল পানামা খাল। এই খাল থেকে বছরে প্রায় ২.৭ বিলিয়ন ডলার আয় হয়। তবে এর বাইরেও শহরটির অর্থনৈতিক সাফল্যের পেছনে কাজ করছে নানা বৈচিত্র্যময় শিল্প ও কৌশলগত সুবিধা।
পানামা খাল
বিশ্বের মোট বাণিজ্যের প্রায় ৬% এই খালের উপর নির্ভরশীল। প্রতি বছর প্রায় ১৪ হাজার জাহাজ পানামা খালের মধ্য দিয়ে যাতায়াত করে। এর মধ্যে বেশিরভাগই এশিয়া এবং আমেরিকার মধ্যে পণ্য পরিবহন করে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, প্রতি জাহাজের জন্য এই খাল ব্যবহারের খরচ গড়ে ১৫ লক্ষ ডলার পর্যন্ত হতে পারে! এমনকি একবার পানামা খাল ব্যবহার করার জন্য ডিজনি ক্রুজ লাইনের জাহাজ ৩ লাখ ডলারের বেশি খরচ করেছিল।
করমুক্ত জোন
পানামা সিটি বিশ্বের অন্যতম বড় করমুক্ত জোনের মালিক। হংকংয়ের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ফ্রি ট্রেড জোন এখানে অবস্থিত। এখানে ১,৭০০ এর বেশি কোম্পানি প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য রি-এক্সপোর্ট করে। শূন্য কর্পোরেট ট্যাক্স, গোপনীয়তা আইন, এবং মার্কিন ডলারভিত্তিক অর্থনীতি বৈদেশিক বিনিয়োগকে আকর্ষণ করে।
অফশোর ব্যাংকিং
পানামা সিটির ব্যাংকিং খাত বেশ শক্তিশালী। এখানে প্রায় ৮০টিরও বেশি ব্যাংক কার্যক্রম চালায়। যার মধ্যে আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলোর সংখ্যাই উল্লেখযোগ্য। যেমন HSBC, Citibank, এবং Banco General। অফশোর অ্যাকাউন্টগুলোর গোপনীয়তা নীতি পানামাকে অর্থনৈতিক দিক থেকে ব্যতিক্রমী করে তুলেছে।
ট্যুরিজম: প্রাচীন ইতিহাস ও আধুনিকতার মেলবন্ধন
প্রতি বছর ২০ লাখ পর্যটক পানামা সিটি আসেন। এর মধ্যে ৭০% আসেন ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে, বাকিরা আসেন পানামা ঘুরে দেখতে। বছরে ৩ লাখেরও বেশি ক্রুজ প্যাসেঞ্জার পানামা খাল বা শহরের বন্দর ব্যবহার করেন। এছাড়াও উন্নত স্বাস্থ্যসেবা ও কম খরচে আমেরিকানরা ডেন্টাল সার্জারি বা চেকআপের জন্য আসেন।
পানামা সিটির পর্যটন
পানামা সিটির কথা শুনলেই প্রথমে মনে ভাসে বিশ্ববিখ্যাত পানামা খালের ছবি। কিন্তু এই শহরের গল্প শুধু খালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়! ক্যারিবিয়ান সাগর আর প্রশান্ত মহাসাগরের কোলে অবস্থিত এই শহর যেন ইতিহাস, সংস্কৃতি আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অনন্য মিশেল।
কাসকো ভিয়েজো
পানামা সিটির কেন্দ্র হল ‘কাসকো ভিয়েজো’। ১৬৭৩ সালে স্প্যানিশ উপনিবেশকারীদের হাতে গড়া এই অঞ্চল ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান পেয়েছে। সংকীর্ণ পাথুরে রাস্তা, রঙবেরঙের ঔপনিবেশিক বাড়ি, প্রাচীন গির্জা আর আর্ট গ্যালারির মাঝে হাঁটলে মনে হবে যেন সময় থমকে আছে।
এখানে বিখ্যাত ইগলেসিয়া সান হোসে গির্জার সোনার বেদী (Golden Altar) দেখতে ভুলবেন না। কিংবদন্তি অনুযায়ী, এটি জলদস্যুদের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য কালো রঙে রাঙিয়ে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। এছাড়াও প্লাজা ডে লা ইন্ডিপেন্ডেন্সিয়ায় বসে কফি খাওয়ার সময় শুনতে পাবেন স্থানীয় সংগীতশিল্পীদের গান। এই গান যেন ইতিহাসের সঙ্গে বর্তমানের নীরব কথোপকথন! এটি আমেরিকায় প্রথম ইউরোপীয় শহর হিসেবে বিবেচিত।
পানামা খাল: মানবসৃষ্ট অষ্টম আশ্চর্য
বিশ্ব বাণিজ্যের রক্তনালী এই খাল দেখতে প্রতিদিন হাজারো পর্যটক ভিড় জমান মিরাফ্লোরেস লকসে। এখানে জাহাজগুলোকে কীভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২৬ মিটার উঁচুতে তোলা হয়, তা দেখে চোখ কপালে ওঠার জোগাড়! ইন্টারঅ্যাকটিভ মিউজিয়ামে খালের নির্মাণ ইতিহাস জানলে বুঝবেন, কী অসাধারণ সংগ্রামের ফসল এই প্রকৌশলী বিস্ময়।
বায়োমিউজিও
বিখ্যাত স্থপতি ফ্র্যাঙ্ক গেরির ডিজাইন করা এই জাদুঘরটির দেয়ালে যেন ফুটে উঠেছে পানামার জীববৈচিত্র্যের রঙিন ছোঁয়া। আটটি গ্যালারিতে পানামার ভূ-তাত্ত্বিক ইতিহাস, প্রাণী আর উদ্ভিদের বিবর্তনের গল্প বলা হয়েছে ইনস্টলেশন আর মাল্টিমিডিয়ার মাধ্যমে। এই ভবনে পুরো একটি মহাদেশের গল্প দেখতে পাবেন!
আমাদোর কজওয়ে
প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে চার কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়কটি পানামা খালের মাটি দিয়ে তৈরি। সাইকেল চালিয়ে যাওয়ার সময় দেখতে পাবেন পানামা সিটির নাগরিক জীবনের প্রাণচাঞ্চল্য। সন্ধ্যায় এখানকার রেস্তোরাঁয় বসে সাম্বা মিউজিকের তালে তালে ল্যাটিন আমেরিকার স্বাদ নিতে ভুলবেন না!
অ্যানকন হিল
শহরের কেন্দ্রে থাকা এই পাহাড়টি প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে স্বর্গ। হাঁটার পথে দেখতে পাবেন টুকটুকে রঙের প্রজাপতি, ক্যাপুচিন বানর আর শতবর্ষী গাছ। চুড়ায় উঠলে পুরো শহর, খাল আর প্রশান্ত মহাসাগরের নীলাভ জলরাশি এক সাথে দেখা সত্যিই অসাধারণ।
মেট্রোপলিটান নেচার পার্ক
মেট্রোপলিটান নেচার পার্ক হলো বিশ্বের একমাত্র শহুরে রেইনফরেস্ট। এখানে প্রায় ২৫০ প্রজাতির প্রাণী বাস করে, যার মধ্যে অনেক বিরল পাখি ও প্রাণী রয়েছে। আপনি যদি প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে চান, তাহলে পার্কের ক্যানোপি টাওয়ারে উঠুন। এখান থেকে পাখিদের আকাশে উড়ে বেড়ানোর মনোমুগ্ধকর দৃশ্য দেখতে পাবেন। এছাড়াও, অভিজ্ঞ গাইডের সাথে জঙ্গল সাফারিতে ঘুরে দেখা অনন্য অভিজ্ঞতা।
পানামা সিটির সংস্কৃতি ও জীবনধারা
পানামা সিটি, এখানে মিশে আছে শতাব্দীর ইতিহাস, বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি আর প্রাণবন্ত জীবনধারা। কার্বিবীয় সাগর আর প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝে অবস্থিত এই শহরটিকে মনে হয় বিশ্বের সব রঙের মেলবন্ধন।
ইতিহাস আর আধুনিকতার একসাথে বসবাস
পানামা সিটির সংস্কৃতি হলো লাতিন আমেরিকা, ক্যারিবিয়ান, স্প্যানিশ ও আদিবাসী সংস্কৃতির মিশেল। পুরনো শহর কাস্কো ভিয়েজো যেন জীবন্ত জাদুঘর। এখানে স্প্যানিশ কলোনিয়াল স্থাপত্যের পাশেই দাঁড়িয়ে আছে রঙবেরঙের স্ট্রিট আর্ট। স্থানীয় শিল্পীরা এখানে ঐতিহ্য আর আধুনিকতাকে এক সুরে বেঁধেছেন। শহরের প্রতিটি গলিতে শোনা যায় সালসা, মেরেঙ্গে আর রেগেটনের তাল।
ঐতিহ্য ও উৎসব
পানামানীয়দের উৎসবপ্রিয়তা দেখলে মনে হয়, জীবনটাই যেন এক অবিরাম পার্টি! বছরের সবচেয়ে বড় উৎসব হল কার্নিভাল। চার দিন ধরে চলে রঙিন প্যারেড, নাচ, মুখোশ আর সাজসজ্জার ঢল। অগাস্টের ১৫ তারিখে পালিত হয় শহরের প্রতিষ্ঠাদিবস। এই সময় পুরানো পানামার ধ্বংসাবশেষে জ্বলে ওঠে আতশবাজি। আর স্থানীয় পোলোরা উৎসবতে আদিবাসী নৃ-গোষ্ঠীর নৃত্যে ফুটে ওঠে তাদের প্রাচীন বিশ্বাস।
খাদ্যাভ্যাস
পানামানীয় খাবারের প্লেটে মিশেছে স্প্যানিশ, আফ্রিকান ও আদিবাসী রান্নার ঐতিহ্য। এখানকার জাতীয় খাবার হল সানকোচো। সমুদ্রের কাছাকাছি সিজ ফুডের জয়জয়কার। টাটকা সেভিচে বা নারকেল দুধে রান্না রন্ডনও জনপ্রিয়। রাস্তার পাশের দোকানে পাবেন এম্পানাডাস (মাংসের প্যাটি) আর কারিমানিওলাস (ইউকা ক্রোকোটাস)। আর এক গ্লাস সেকো হেরেরানো (স্থানীয় রাম) ছাড়া তো পানামার স্বাদই অসম্পূর্ণ!
জীবনধারা
শহরের এক দিকে দ্রুতগতির ব্যবসায়িক জেলা, অন্যদিকে কাস্কো ভিয়েজোর ঢিলেঢালা কফিশপ কালচার। স্থানীয়রা কাজে কর্মঠ হলেও ছুটির দিনে পরিবার-বন্ধুদের সঙ্গে বারবিকিউ বা সমুদ্রসৈকতে সময় কাটাতে ভালোবাসেন। পানামানীয়দের আত্মীয়তা ভাব অনেক গভীর। এখানকার মানুষের হাসি, রাস্তার গন্ধ, সংগীতের তাল আপনাকে মুহূর্তে টেনে নেবে এক অদেখা জগতে।
পানামা সিটির যোগাযোগ ব্যবস্থা
মেট্রো: দ্রুতগামী ও সুবিধাজনক
পানামা সিটির মেট্রো হলো এই অঞ্চলের প্রথম এবং একমাত্র মেট্রো ব্যবস্থা। এর ৩টি লাইন শহরের প্রধান এলাকাগুলোকে দ্রুত সংযুক্ত করেছে। সময় বাঁচানোর জন্য মেট্রো একদম আদর্শ। মেট্রো স্টেশনগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন এবং অত্যন্ত নিরাপদ।
বাস: সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী
পানামা সিটির সিটি বাস সার্ভিস রয়েছে। “মেট্রোবাস” নামে পরিচিত এই পরিবহন ব্যবস্থা বেশ সাশ্রয়ী। মাত্র কয়েক ডলারে শহরের প্রায় সব জায়গায় ঘুরে বেড়ানো যায়। বাসগুলোতে টিকিট সিস্টেম অত্যন্ত আধুনিক। আপনাকে শুধু একটি প্রিপেইড কার্ড কিনতে হবে, আর সব ঝামেলা শেষ।
ট্যাক্সি: সহজ ও নমনীয়
যদি আপনি দ্রুত এবং ব্যক্তিগতভাবে কোথাও যেতে চান, তবে ট্যাক্সি আপনার জন্য আদর্শ। পানামা সিটিতে ট্যাক্সি ভাড়া তুলনামূলকভাবে সস্তা এবং সহজলভ্য। তবে এখানে ট্যাক্সি মিটারের ব্যবহার নেই। তাই ভাড়া ঠিক করার সময় একটু দর-কষাকষি করে নেওয়া ভালো।
উবার এবং অন্যান্য রাইড-শেয়ারিং সেবা
উন্নত প্রযুক্তির যুগে পানামা সিটিও পিছিয়ে নেই। উবার, ডিডি’র মতো রাইড-শেয়ারিং সেবাগুলো এখানে অত্যন্ত জনপ্রিয়। এই অ্যাপগুলোর মাধ্যমে আপনি অল্প সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবেন এবং ভাড়ার হিসাবও থাকবে একদম স্বচ্ছ।
সাইকেল ও হেঁটে চলা
পানামা সিটির কিছু অংশে সাইকেল চালানো বা পায়ে হেঁটে চলাফেরা বেশ উপভোগ্য। শহরের কোস্টাল বেল্ট এবং ক্যাসকো ভিয়েজোর রাস্তাগুলোতে হাঁটার সময় শহরের সৌন্দর্য আপনাকে মুগ্ধ করবে।
নৌপরিবহন
পানামা খালের কথা কি ভুলে গেছেন? শহরের জলপথে নৌযাত্রাও একটি দারুণ অভিজ্ঞতা হতে পারে। পানামা খাল ধরে চলা নৌযানগুলো হবে যেন একটি ঐতিহাসিক সফর। আপনি পর্যটক হন বা স্থানীয় বাসিন্দা, এই শহরের পরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিতভাবেই আপনার জীবনকে করবে সহজ ও আনন্দময়।
পানামা সিটি: বিনোদনের এক অদ্ভুত জগৎ
পানামা সিটির হৃদয়ে জ্বলজ্বলে সিনেমা হলগুলোতে হালকা পপকর্নের গন্ধে মিশে আছে হলিউড, বলিউড, আর লাতিন সিনেমার মিশ্রণ। কিন্তু পানামার আসল ম্যাজিক লুকিয়ে আছে ঐতিহাসিক থিয়েটারে। Teatro Nacional-এর মতো স্থাপত্য-সৌন্দর্য্যে ঘেরা মঞ্চে মাঝেমধ্যেই জমে ওঠে স্প্যানিশ নাটক, স্থানীয় সংস্কৃতির অনুষ্ঠান বা জ্যাজ সঙ্গীতের রাত। এখানে শিল্পের স্বাদ নিতে আসা মানুষগুলোই যেন হয়ে ওঠেন গল্পের চরিত্র!
Multiplaza Pacific বা Albrook Mall-এ ঢুকলে সময়ের হিসেব ভুলে যাবেন। লাক্সারি ব্র্যান্ড থেকে হস্তশিল্পের দোকান, প্রতিটি কর্নারে লুকিয়ে আছে চমক! এখানে ফুড কোর্টে টেস্ট প্যানামানিয়ান কফি আর সেভিচে খেতে খেতে লাইভ মিউজিকের মজাও উপভোগ করা যায়। পানামা সিটির Amador Causeway-এ গাড়ি চালানোর পাশাপাশি কায়াকিং বা জেট স্কিইং। এছাড়াও সন্ধ্যার পর ক্যাসিনো বা রুফটপ বারগুলোতে গ্ল্যামারাস লাইফস্টাইলের স্বাদ মিলবে।
পানামা সিটি এক জীবন্ত ইতিহাসের বই, যেখানে প্রতিটি পাতায় লুকিয়ে আছে বিশ্ব বাণিজ্যের গোপন রহস্য, সংস্কৃতির মিশ্রণ আর প্রকৃতির অদম্য লড়াই। “বিশ্বের ক্রসরোড” খ্যাত এই শহরটি তার অতীতকে বুকে ধারণ করে আধুনিকতার ঝলমলে আলোয় উদ্ভাসিত। তাই, যখনই কেউ পানামা সিটির নাম শুনবে, মনে হবে যেন শুনছে এক মহাকাব্যের সুর। আপনার কানে কি সে সুর পৌঁছাল?
পানামা সিটি নিয়ে আরও কিছু মজার তথ্য
১. পানামা সিটি প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলে প্রথম ইউরোপীয় বসতি হিসেবে পরিচিত।
২. পানামা খাল নির্মাণের সময় খননকৃত মাটি দিয়ে তৈরি আমাদোর কজওয়ে রাস্তাটি চারটি দ্বীপকে মূল ভূখণ্ডের সাথে সংযুক্ত করেছে।
৩. পানামা সিটিতে মধ্য আমেরিকার প্রথম মেট্রো রেল চালু হয়। এটি ২০১৪ সালে উদ্বোধন করা হয়।
৪. পানামা কোনো সেনাবাহিনী নেই!
৫. পানামায় ‘গোল্ডেন ফ্রগকে’ (সোনালি ব্যাঙ) সৌভাগ্যের প্রতীক বলা হয়।
৬. লাতিন আমেরিকার ৮০% সামুদ্রিক বীমা এখান থেকে ম্যানেজ হয়।
৭. পানামা খালের জল সরবরাহের জন্য নির্মিত গাটুন লেক বিশ্বের সবচেয়ে বড় কৃত্রিম হ্রদগুলোর মধ্যে একটি।
৮. পানামা খাল এতটাই বিস্তৃত যে এটি আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন (ISS) থেকে স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
৯. পানামা খাল নির্মাণের আগে ১৮৫৫ সালে পানামা রেলপথ তৈরি হয়। এই রেলপথ সর্বপ্রথম আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগরকে যুক্ত করে।
১০. পানামা সিটিতে অবস্থিত মেট্রোপলিটন ন্যাশনাল পার্ক শহরের ভেতরে অবস্থিত একমাত্র রেইনফরেস্ট। বিশ্বে আর কোথাও এমনটা দেখা যায় না।
১১. পান-আমেরিকান হাইওয়ে পানামা সিটির মধ্য দিয়ে গেছে। এই রাস্তা আলাস্কাকে আর্জেন্টিনার সাথে যুক্ত করেছে।
১২. পানামা সিটিতে জুতা নোংরা রাখা অভদ্রতা হিসেবে ধরা হয়। নোংরা বা ধুলোমাখা জুতা পরে সামাজিক অনুষ্ঠানে যাওয়াকে অভদ্রতা মনে করা হয়।
সূত্র
- https://www.visitpanamacitybeach.com/events/
https://www.tourismpanama.com/plan-your-vacation/festivals-and-events-in-panama/ - https://www.banglatribune.com/foreign/america/794361/%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%B6-%E0%A6%AA%E0%A6%B0%E0%A6%BF%E0%A6%9A%E0%A6%BF%E0%A6%A4%E0%A6%BF-%E0%A6%AA%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A6%BE%E0%A6%AE%E0%A6%BE?utm_source=chatgpt.com
- https://en.wikipedia.org/wiki/Panama_City
- https://www.youtube.com/watch?v=KxzgKgUkf5Q