Image default
নগর পরিচিতি

সাত পাহাড়ের শহর রোম

বহুজাতিক রোম শহরের ডাক নাম ‘সাত পাহাড়ের শহর’। রহস্যময় ধ্বংসাবশেষ ও অতুলনীয় স্থাপত্যে আবিষ্ট প্রাচীন এ শহরের সৌন্দর্যের মাঝে হারিয়ে যাওয়া ছাড়া যেন কোন উপায় নেই!

ভূমিকা 

ইতালির রাজধানী রোম। শহরটি যেমন সুন্দর স্থাপত্যে পরিপূর্ণ, তেমনি বিষ্ময়কর এর ইতিহাস। ইউরোপের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির জন্মভূমি রোম নানা কারণেই ব্যতিক্রম এবং সকলের কাছে সুপরিচিত। হাজার বছরের পুরনো গীর্জা, রোমান ধ্বংসাবশেষ, ভাস্কর্য এবং শহরের সুদৃশ্য ফোয়ারাগুলো রোমকে নিয়ে গেছে এক অনন্য উচ্চতায়। 

রোমের ইতিহাস-ঐতিহ্য এবং মনোরম পরিবেশ অত্যন্ত সমৃদ্ধ। আর, এই কারণেই শহরটি ইউরোপ, তথা বিশ্বের অন্যতম পর্যটন রাজধানীগুলোর একটি। ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে পর্যটকদের কাছে পছন্দের তালিকায় রোম দ্বিতীয়। রোম নগরীর জীবন-যাপন পৃথিবীবাসীকে দারুণভাবে আকৃষ্ট করে। 

দেশ ইতালি 
অঞ্চল/রাজ্য রোম
আয়তন ১,২৮৫ বর্গকিমি  (৪৯৬.৩ বর্গমাইল)
জনসংখ্যা  ৪,৩৫৫,৭২৫ জন
সরকারি ভাষা ইতালিয়ান
প্রধান মুদ্রা ইউরো 
সময় অঞ্চল ইউটিসি +২
আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর রোম সিয়াম্পিনোল

রোমের অবস্থানঃ সাত পাহাড়ের দেশ 

টাইবার নদীর পূর্ব দিকে অবস্থিত রোমেকে ঘিরে রয়েছে সাতটি পাহাড়। রোমের সৌন্দর্যের পিছনে মূল কারণ হলো শহরটিকে ঘিরে থাকা এই সুন্দর পাহাড়গুলো। এই সাতটি পাহাড়ের মধ্যে, রোমুলস প্যালাটাইন হিলের উপর রোমের মূল শহরটি অবস্থিত। অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পাহাড়গুলো হল ক্যাপিটোলাইন হিল, ভিমিনাল হিল, এভেন্টাইন হিল, সেলিয়ান হিল, কুইরিনাল হিল এবং এস্কুইলাইন হিল।

ম্যাপ 

রোমের আয়তন ও জনসংখ্যা  

ইতিহাসের শুরু থেকেই রোম ইউরোপের অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি শহর হয়ে উঠেছিলো। আর তাই হয়তো, খ্রিষ্টের জন্মের পূর্বেই শহরটির জনসংখ্যা ১০ লাখে গিয়ে পৌছায়। তবে, বর্তমানে এ শহরের জনসংখ্যা প্রায় ৪৩ লক্ষ ৫৫ হাজার ৭২৫ জন। ১ হাজার ২৮৫ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে এই বিশাল জনগোষ্ঠী বসবাস করে। 

অতীতে রোম শহরের জনগণ এবং বর্তমান রোম শহরের জনগণ

তবে মজার বিষয় হলো, আধুনিক রোমের এই আয়তনের নীচেই লুকানো রয়েছে প্রাচীন রোমের একটি অংশ। যা বর্তমানে মাটির স্তরের ৮ থেকে ১১ মিটার নীচে অবস্থিত। বিগত কয়েক শতাব্দী জুড়ে বহুবার খনন কাজের মাধ্যমে বিশেষজ্ঞরা অনুমান করেছেন যে, রোমের বেশিরভাগ অংশ এখনও খনন করা হয়নি।

রোম শহরটিতে ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ুর প্রভাব স্পষ্ট। এই শহরের প্রত্যেকটি ঋতুর মধ্যে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়। এখানে গ্রীষ্মকাল উষ্ণ থেকে গরম হয় এবং শীতকালে মৃদু ঠান্ডা থাকে। শীতকাল ভ্রমণ করার জন্য বেশ উপযোগী আবহাওয়া। তবে, পর্যটকদের জন্য রোম ভ্রমণের সবচেয়ে সুবিধাজনক সময় বলা হয় বসন্ত এবং শরৎকাল। এই সময় রোমের আবহাওয়া হয়ে থাকে বেশ আরামদায়ক।

প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যের ইতিহাস 

পৃথিবীর সবথেকে প্রভাবশালী সভ্যতার মধ্যে একটি হচ্ছে রোমান সভ্যতা। যার ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, প্রকৌশল আজও বিশ্ববাসীকে মুগ্ধ ও অনুপ্রাণিত করে। 

গ্রীক সভ্যতার অবসানের আগেই ইতালিতে টাইবার নদীর তীরে একটি বিশাল সাম্রাজ্য ও সভ্যতা গড়ে ওঠে। এ সভ্যতা রোমান সভ্যতা নামে পরিচিত। মূলত রোমানরা নদী ব্যবহার করে দক্ষিণে গ্রীকদের সাথে এবং উত্তরে এপডিসকান সভ্যতার সাথে যোগাযোগ গড়ে তোলে। ফলে, এই দুই সভ্যতার প্রভাব পড়েছে রোমের শীল্প, ধর্ম ও সংস্কৃতিতে। 

খ্রীষ্টপূর্ব অষ্টম থেকে ষষ্ঠ শতাব্দীর মধ্যে রোমান রাজ্য সাধারণ এক বাণিজ্য নগরী থেকে সমৃদ্ধশালী এক নগরীতে পরিণত হয়। ফলে কেবল রোমের অধিবাসীই নয়, ইতালির বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষ এখানে বসতি গড়ে তোলে। 

রোমের জন্ম 

ধারণা করা হয়, রোম শহরের জন্ম হয়েছিলো ৭৫৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দের ২১ এপ্রিল। এই শহরের জন্ম নিয়ে প্রচলিত আছে নানা পৌরাণিক কাহিনি। এমনি একটি কাহিনি অনুযায়ী, ৭০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে হারকিউলিসের দুই পুত্র রোমিউলাস ও রেমাস রোমের আশেপাশের অঞ্চলের এক শক্তিশালী রাজাকে পরাজিত করে। এরপর তারা টাইবার নদীর কোল ঘেঁসে এক ছোট্ট গ্রামে নতুন সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তন করেন। তবে, রাজ্য শাসন নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে রেমাসকে হত্যা করে তার ভাই রোমিউলাস। এরপর সিংহাসনে বসে রোমিউলাস এবং তিনিই রোমকে গড়ে তোলেন। 

রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা 

তিন দশকের বেশি সময় ধরে রাজা হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর একদিন হঠাৎ করেই উধাও হয়ে যান রোমিউলাস। লোকগাঁথা অনুযায়ী, রোমিউলাসকে স্থায়ীভাবে মাউন্ট অলিম্পাসে নিয়ে যান রোমানদের প্রধান দেবতা জুপিটার। সেখানে তাকে ‘দেবতা’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। এরপর তার প্রতিষ্ঠিত শহর রোম প্রায় আড়াইশ বছর একটি রাজতন্ত্র হিসেবে টিকে ছিলো। 

রোমিউলাস কে দেবতাদের উপাধিতে ভূষিত করা

যদিও, এখানে উত্তরাধিকারসূত্রে রাজা নির্ধারণের বদলে সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন রাজা বেছে নেওয়ার নিয়ম শুরু হয়। আর এই নির্বাচিত রাজাই আমৃত্যু শাসনকার্য পরিচালনা করতেন। এই রীতি অনুযায়ী খ্রীস্টপূর্ব ৫৩৫ সালে টারকুইনিয়াস সুপারাবাস রোমের সপ্তম রাজা হিসেবে নির্বাচিত হন। বিবিধ কারনে টারকুইনিয়াসের শাসনে অতিষ্ট হয়ে, রোমান জনসাধারণ তাকে সিংহাসনচ্যুত করে। 

প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা 

টারকুইনিয়াসের পতনের পর, রোমান ইতিহাসের পরবর্তী ৫০০ বছর প্রজাতন্ত্র চলতে থাকে। এই সময়কে বলা হয় ধ্রপদী রোমান সভ্যতা। এসময় সিনেটের দিকনির্দেশনা অনুযায়ী, রোমের শাসনকাজ পরিচালনা করতেন দুইজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। নির্বাচিত এ দুই ব্যক্তির নিকট শাসনভার থাকলেও, এসময় শাসনব্যবস্থা গণতান্ত্রিক ছিলো না। কারণ, আড়াল থেকে পুরো বিষয়টির কলকাঠি নাড়তেন গুটিকয়েক প্রভাবশালী পরিবারের সদস্যরা। 

প্রতিবছর ঘুরেফিরে এ পরিবারগুলোর সদস্যরাই নির্বাচিত হতেন। এই প্রজাতান্ত্রিক আমলেই রোম তার সীমানা সম্প্রসারণের তৎপরতা শুরু করে। ধীরে ধীরে প্রতিবেশি এট্রুসকান এবং লাতিন জনপদগুলোতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে রোম। বর্তমান স্পেন এবং ফ্রান্সের পুরোটাই তখন রোম প্রজাতন্ত্রে পরিনত হয়।

প্রথম পিউনিক যুদ্ধ ও ভূমধ্যসাগরে রোমের নিয়ন্ত্রণ

এর জের ধরে ‘গল’ নামে পরিচিত বর্তমান ফ্রান্সের কয়েকটি গোত্রের সেনারা খ্রীস্টপূর্ব ৩৮৭ সালে রোম শহরটির উপর তাণ্ডব চালায়। সাফল্যের সাথে এ দুর্যোগ কাটিয়ে উঠার পর ভূ-মধ্যসাগরের অপর প্রান্তে অবস্থিত কার্থেগ সাম্রাজ্যের দিকে চোখ ফেলে রোম। ভূ-মধ্যসাগরীয় দ্বীপ সিসিলির উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করে প্রথম পিউনিক যুদ্ধে লিপ্ত হয় এ দুই পরাশক্তি। 

খ্রীস্টপূর্ব ২৬৪ থেকে ২৪১ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে চলা এ যুদ্ধের মাধ্যমে সিসিলি দ্বীপে রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করে রোম। কার্থেগ বাহিনীর সাথে ২য় ও ৩য়  পিউনিক যুদ্ধে জয়লাভের মধ্য দিয়ে ভূ-মধ্যসাগরে একচ্ছত্র পরাশক্তিতে পরিণত হয় রোম।

প্রথম পিউনিক যুদ্ধে রোমান ও গল সৈন্য

বহির্বিশ্বে নিজেদের প্রভাব বিস্তারে সফল হলেও অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে রোমে জনরোষের মাত্রা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছিলো। একদিকে গুটিকয়েক প্রভাবশালী পরিবারের হাতের পুতুল হিসেবে জীবনধারণ করার ক্ষোভ, আরেকদিকে সমাজে কৃতদাসের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় রোজগারের পথ বন্ধ হওয়া, সব মিলিয়ে খ্রীস্টপূর্ব প্রথম শতকে কয়েক দফা গৃহযুদ্ধের রক্তপাত দেখতে হয় রোমবাসীদের। এর মাধ্যমে খ্রীস্টপূর্ব ৬০ সালে রোমে প্রজাতন্ত্রের অবসান ঘটে।

রোমান সাম্রাজ্যের সূচনাঃ জুলিয়াস সিজার ও অগাস্টাস

বর্তমান ইতালিতে উৎপত্তি লাভ করে রোমান সাম্রাজ্যের ব্যপ্তি কালক্রমে উত্তর আফ্রিকা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল। বর্তমান সময়ের মরক্কো ও আলেজিয়ার উত্তর উপকূল রোমান সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। শত শত যুদ্ধ বিগ্রহ, অভ্যুত্থান, পাল্টা অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সমৃদ্ধির দিকে ক্রমে এগিয়ে যেতে থাকে রোমান সাম্রাজ্য।

এ সময় জুলিয়াস সিজার রোমের অত্যন্ত পরাক্রমশালী একজন সম্রাট হিসাবে আবির্ভূত হন। তিনি সমৃদ্ধশালী মিশর জয় করেন। আর মিশরের রানী ক্লিওপেট্রার সাথে তার প্রণয়ের কাহিনী তো সর্বজনবিদিত। তার সময়ে রোমানরা পরিণত হয়েছিল মেডিটেরিয়ান তথা ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের একচ্ছত্র অধিপতিতে।

জুলিয়াস সিজার এবং ক্লিওপেট্রার প্রেমকাহিনী

জুলিয়াস সিজারের মৃত্যুর পর তার পালক পুত্র অগাস্টাস সিজার রোমের সিংহাসনে বসেন। এ সময় রোমজুড়ে বিভিন্ন ছোটখাটো যুদ্ধ বিগ্রহ দানা বাধছিল। অগাস্টাস এ দুর্যোগকালীন পরিস্থিতিতে রোমের হাল ধরেন। তিনি কঠোর হাতে একে একে সকল বিদ্রোহ ও বিশৃঙ্খলা দমন করে রোমের প্রথম সম্রাটের খেতাব অর্জন করেন। যার মধ্য দিয়ে রোমে সাম্রাজ্য যুগের সূচনা ঘটে।

এ আমলেই রোম সর্বোচ্চ বিস্তৃতি লাভ করে। বর্তমান যুক্তরাজ্য, স্পেন এবং ফ্রান্সসহ ইউরোপের প্রায় তিন ভাগের দুইভাগই তখন রোমের অংশ ছিলো। 

রোমান সাম্রাজ্যের সমাপ্তি

রোমান সাম্রাজ্যের অধিনে থাকা বিপুল পরিমান এলাকা ও অভিবাসীদের উপর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে ৩৯৫ খ্রিষ্টাব্দে রোমান সাম্রাজ্যেকে পুর্ব এবং পশ্চিম, এ দু ভাগে বিভক্ত করা হয়। কালের পরিক্রমায় ৪৭৬ সাল নাগাদ পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের বিলুপ্তি ঘটে। 

তবে, এসময়ও পূর্ব রোমান সাম্রাজ্য পরবর্তী প্রায় এক হাজার বছর একক শক্তিশালী পরাশক্তি হিসেবে টিকে ছিলো। শেষ পর্যন্ত ১৪৫৩ সালে অটোমানদের হামলায় পরাজিত হয় কনস্টান্টিনোপল তথা পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যের কেন্দ্র। যার মাধ্যমে বর্নিল রোমান সাম্রাজ্যে উপাখ্যানের সমাপ্তি ঘটে।

রোমের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি

রোমান সাম্রাজ্যের স্থায়ীত্বই ল্যাটিন ও গ্রীক ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্ম, আবিষ্কার, স্থাপত্য, দর্শন, আইন ও সরকারের গঠন নিশ্চিত করেছিল। রোমান সাম্রাজ্যের এসব অবদান পশ্চিমা সভ্যতার ভিত্তি স্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে, যা আজও প্রতিফলিত হয়।  

শিক্ষা, সাহিত্য ও লিখন পদ্ধতি 

রোমান সাম্রাজ্যে শিক্ষা বলতে মূলত বোঝাত বীরদের স্মৃতিকথা বর্ননা করা। যুদ্ধ বিগ্রহের মধ্য দিয়ে রোমের যাত্রা শুরু হয়েছিলো সুতরাং তাদের সব কিছুই ছিলো যুদ্ধকে কেন্দ্র করে। 

রোমান লিপি

উচ্চ শ্রেণির রোমানদের কাছে গ্রীকভাষা শিক্ষা ছিলো এক ধরনের বিলাসিতা। ফলে, রোমানদের মধ্যে অনেকেই গ্রীক সাহিত্যকে লাতিন ভাষায় অনুবাদ করার দক্ষতা অর্জন করেছিলেন। রোমের অভিজাত যুবকেরা গ্রীসের বিভিন্ন বিখ্যাত বিদ্যাপিঠে শিক্ষালাভের উদ্দেশ্যে যেতো। 

সে যুগে সাহিত্যে অবদানের জন্য প্লুটাস ও টেরেন্সর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তারা দু’জন মিলনাত্মক নাটক রচনার ক্ষেত্রে কৃতিত্ব অর্জন করেছিলেন।

ইউরোপের বৃহত্তম এবং বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয়

১৩০৩ খ্রিস্টাব্দে রোমে প্রতিষ্ঠিত হয় ইউরোপের বৃহত্তম এবং বিশ্বে দ্বিতীয় বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে – লা সাপিয়েঞ্জা। এটি রোমের সবচেয়ে পুরনো বিশ্ববিদ্যালয়।

লা সাপিয়েঞ্জা বিশ্ববিদ্যালয়

সাপিয়েঞ্জা বিশ্ববিদ্যালয়টির অবস্থান ইতালির রোমের প্রাণকেন্দ্রে। যার আনুষ্ঠানিক নাম হল ইউনিভার্সিটা দেগলি স্টুদি দি রোমা “লা সাপিয়েঞ্জা”। সাপিয়েঞ্জা মূলত পাবলিক রিসার্চ বিশ্ববিদ্যালয় এবং এটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ এবং সম্মানিত ইতালীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে একটি। এখানকার বেশ কিছু প্রাক্তন শিক্ষার্থী বর্তমানে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নিজেদের অবদান রেখেছেন। 

স্থাপত্য, ভাস্কর্য ও বিজ্ঞান 

রোমান স্থাপত্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিলো এর বিশালতা। সম্রাট হার্ডিয়ানের তৈরি ধর্মমন্দির প্যানথিয়ন রোমান স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন। 

প্যানথিওন মন্দির

স্থাপনা শিল্পের পাশাপাশি এ যুগে রোমানরা ভাস্কর্য কর্মেও উৎকর্ষ সাধন করেছিলো। রোমান ভাস্করগণ দেবদেবী, সম্রাট, পৌরাণিক বিভিন্ন চরিত্রের মূর্তি তৈরি করতেন। এসব মূর্তি তৈরিতে মার্বেল পাথর ব্যবহার করা হতো।

রোমান ভাস্কর্য

রোমান বিজ্ঞানীদের মধ্যে অনেকেই গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হন। তাদের মধ্যে প্লিনি বিজ্ঞান সম্পর্কে বিশ্বকোষ প্রণয়ন করেন। এতে প্রায় পাঁচশ বিজ্ঞানীর গবেষনা কর্ম তালিকাভুক্ত হয়েছে। তাছাড়া, চিকিৎসা বিজ্ঞানেও রোমানদের অবদান ছিলো অবিস্মরণীয়। এঁদের মধ্যে সেলসাস, গ্যালেন রুফাসের মতো বিজ্ঞানীদের নাম উল্লখযোগ্য।

আইন প্রনয়ণ

বিশ্বসভ্যতার ইতিহাসে রোমানদের সর্বশ্রেষ্ঠ এবং গুরুত্বপূর্ণ অবদান হচ্ছে আইন প্রণয়ন। খ্রিস্টপূর্ব পাঁচ শতকের মাঝামাঝি সময়ে রোমানরা ফৌজদারি  ও দেওয়ানী আইনগুলো সুষ্ঠু ভাবে একসঙ্গে সাজাতে সক্ষম হন।

রোমে বিড়ালদের জন্য আইনি সুরক্ষা

মজার বিষয় হচ্ছে, রোমে বিড়ালদের জন্য আইনি সুরক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। রোম শহরের প্রতিটি কোণে বিড়ালের উপস্থিতি আবিষ্কার করা যায়; তারা রোমে সর্বব্যাপী। রোমে প্রায় তিন লক্ষ বিড়ালের উপস্থিতি রয়েছে এবং তারা মুক্তভাবে চলাচল করে। আকর্ষণীয়ভাবে, বিড়ালদের জন্য এই আইনি সুরক্ষা ব্যবস্থা লঙ্ঘন করলে কিছু গুরুতর পরিণতির সম্মুখীনও হতে হবে যে কোন ব্যক্তিকে। 

রোমান আইন অনুসারে, একটি বিড়ালকে আঘাত করা দণ্ডনীয় অপরাধ এবং একটি বিড়াল যেখানেই চায় সেখানেই বাস করতে পারে; তাকে জোর করে সরানো যাবে না। বিড়ালপ্রেমীদের জন্য, রোমের ঐতিহাসিক সাইট লার্গো ডি টোরে নামক বিড়াল আশ্রয়স্থল রয়েছে।

রোম শহরে বিড়ালদের পায়চারী

সবচেয়ে বড় স্টেডিয়াম

রোম শহরের ঐতিহ্যের কথা আসলে সবচেয়ে বড় স্টেডিয়ামের কথা বলতেই হয়। এক্ষেত্রে অনেকের মনেই কলোসিয়াম স্টেডিয়ামের কথা আসতে পারে। তবে, আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে, রোমের সবথেকে বড় স্টেডিয়াম কলোসিয়াম নয়।

প্রাচীন রোমের সবচেয়ে বড় স্টেডিয়াম ছিল সার্কাস ম্যাক্সিমাস, যা ৬ষ্ঠ শতাব্দীর পূর্বে, খ্রিষ্টপূর্ব ৬০০ সালের দিকে নির্মিত হয়। রোমানদের কাছে সবচেয়ে জনপ্রিয় বিনোদনের একটি মাধ্যম ছিল রথ দৌড়। আর এই খেলাকে মাথায় রেখেই তৈরি করা হয় সার্কাস ম্যাক্সিমাস। সার্কাস ম্যাক্সিমাস প্রায় ২,৫০,০০০ জন দর্শক ধারণ করতে পারতো, যেখানে কোলোসিয়ামের দর্শক ধারণ ক্ষমতা প্রায় ৬০,০০০ জন।

সার্কাস ম্যাক্সিমাস স্টেডিয়াম

বিশ্বের প্রথম শপিং মল 

মজার ব্যাপার হচ্ছে, বিশ্বের প্রথম শপিং মল বা মার্কেট তৈরি হয়েছিল রোমে। ‘ট্রাজানের মার্কেট’ ইতিহাসের প্রাচীনতম শপিং মল হিসেবে বিবেচিত হয়। ট্রাজানের মার্কেট নির্মিত হয়েছিল ১০০ থেকে ১১০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে। এটি প্রাচীন রোমের অন্যতম আকর্ষণীয় ভবনগুলোর একটি। এখানে প্রায় ১৫০টি দোকান ছিল, যেখানে প্রাচীন রোমের বণিকরা তাদের পণ্য বিক্রি করতেন। বর্তমানে এখানে মিউজিয়াম অফ ইম্পেরিয়াল ফোরাম নির্মিত হয়েছে।

ট্রাজানের মার্কেট

মিথ্যা শনাক্তকারী যন্ত্র

১৫শ শতকে রোমে মিথ্যা শনাক্তকারী যন্ত্র বসানো হয়েছিলো। এই যন্ত্রটির নাম ছিলো বোক্কা ডেলা ভেরিতা, যার অর্থ “সত্যের মুখ”। বোক্কা ডেলা ভেরিতার অবস্থান সান্তা মারিয়া ইন কস্মেদিন গির্জায়। এটি একটি বিশাল প্রাচীন মার্বেলের তৈরি মুখোশ। মুখোশটির প্রতিরুপ তৈরি হয়েছে সমুদ্রদেবতা ওশিয়ানাসের মুখের আকৃতিতে।

মিথ্যা শনাক্তকারী যন্ত্র বোক্কা ডেলা ভেরিতা

প্রাচীন রোমে অবিচার বা মিথ্যাচারের অভিযোগে অভিযুক্তদের সনাক্তকরণের জন্য বোক্কা ডেলা ভেরিতা ব্যবহার করা হতো। বিশেষ করে, যারা দাম্পত্য জীবনে অবিচার বা মিথ্যাচারের অভিযোগে অভিযুক্ত হতেন কিংবা সন্দেহজনক স্বামীরা সাধারণত তাদের স্ত্রীর সততার পরীক্ষা নিতে এই যন্ত্র ব্যবহার করতেন। 

অভিযুক্ত ব্যক্তি এই ভাস্কর্যের মুখের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে রাখতেন, এবং যদি তারা মিথ্যা বলতেন, তাদের হাত টুকরো টুকরো হয়ে যেত, আর সত্য বললে হাত অক্ষত থাকতো। 

রোমের খাবার ও রেস্তোরাঁ 

রোমে বসবাসকারী মানুষজন বেশ ভোজনরসিক। রোমে অনেক ভালো ভালো রেস্তোরাঁ রয়েছে, বিশেষ করে সন্ধ্যায় বাইরে বসে খাবার উপভোগ করার জন্য রেস্তোরাঁগুলো বেশ জনপ্রিয়।রোমের বিখ্যাত খাবার গুলোর মধ্যে রয়েছে –

পিজ্জা আল তাগ্লিও

“পিজ্জা আল তাগ্লিও” রোম সহ ইতালি যুগের বিখ্যাত একটি খাবার। এটি মূলত একটি পুরু ক্রাস্টের পিৎজা, যা একটি বড় প্যানে রান্না করা হয়। সাধারণত বড় পিৎজা গুলোকে কেটে টুকরো করে পরিবেশন করা হয়। মজার ব্যাপার হলো রোমে পিৎজা ওজন অনুযায়ী বিক্রি হয়। পিৎজার টুকরোগুলোকে একটির উপর আরেকটি রেখে স্যান্ডউইচের মতো খাওয়া হয়। রোমানরা কাঁটাচামচ দিয়ে পিৎজা খায়। 

পিজ্জা আল তাগ্লিও

ট্রিপ্পা আল্লা রোমানা

একটি তুমুল জনপ্রিয় রোমান খাবার হচ্ছে ট্রিপ্পা আল্লা রোমানা। এটি একসময় কৃষকদের খাবার ছিলো। কিন্তু বর্তমানে এই খাবার রোমানদের প্রধান খাবারের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে। গরুর মাংসের সাথে ইতালির বিশেষ টমেটো সস আর বেকেরিনো পনির দিয়ে তৈরি এ খাবার যে কারো জিভে জল এনে দেয়।

ট্রিপ্পা আল্লা রোমানা

পাস্তা

রোমান খাবারের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হচ্ছে পাস্তা। পাস্তার সাথে সবজি, পনীর, বিশেষ সস, মাখন ব্যবহার করে নানা স্বাদের বৈচিত্র্যময় খাবার তৈরি হয়। ইতালি বা রোমের রেস্তোরাঁ গুলোর সব থেকে জনপ্রিয় এবং সহজলভ্য খাবার হচ্ছে পাস্তা।

রোমের ভেতর স্বাধীন রাষ্ট্রঃ ভ্যাটিকান

রোম শহরটি টিরবিনিয় সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত। মজার বিষয় হলো- রোমের ভিতরে রয়েছে আরেকটি স্বাধীন দেশ; যার নাম ভ্যাটিকান। এই দেশটি ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র। এবং এটিই পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট দেশ। 

পুরো দেশটিই রোমের ভেতরে মাত্র ৩৯ ফিট উঁচু প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। এটি রোম শহরের ভেতরেই অবস্থিত একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। ভ্যাটিকান সিটির আয়তন মাত্র ১১০ একর এবং জনসংখ্যা প্রায় ৯০০। এই রাষ্ট্রটির প্রধান হচ্ছেন পোপ, যিনি ক্যাথলিক চার্চের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা। 

ভ্যাটিকেন সিটি

ভ্যাটিকান সিটির মূল আকর্ষণগুলো হলো বিশাল সেন্ট পিটার’স স্কয়ার, সেন্ট পিটার’স ব্যাসিলিকা, এবং ভ্যাটিকান মিউজিয়াম। এই স্থানগুলোতে প্রতিদিনই ধর্মপ্রাণ খ্রিস্টান এবং হাজার হাজার পর্যটকের ভিড় জমে।

রোমের দর্শনীয় স্থান 

রোম শহরজুড়ে রয়েছে দুই হাজারটিরও বেশি ফোয়ারা। যেগুলো থেকে ইচ্ছে করলেই পানি পান করা যায়। 

ট্রেভি ফোয়ারাঃ ইচ্ছাপূরণের ফোয়ারা 

রোমে অবস্থিত অসংখ্য ফোয়ারার মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর ও আকর্ষণীয় ফোয়ারা হচ্ছে ট্রেভি ফোয়ারা। ১৭৬২ সালে নির্মাণ শেষ হওয়া এই ফোয়ারার নকশা করেছিলেন বিখ্যাত নকশাবিদ নিকালা সালভি। এটি দেখতে প্রচুর পর্যটক ভিড় করেন। 

লোকবিশ্বাস আছে যে, যদি কেউ ট্রেভি ফোয়ারায় পিছন ফিরে একটি মুদ্রা ছুঁড়ে ফেলে, তবে তার আবার রোমে ফিরে আসা নিশ্চিত হয়। এই ঐতিহ্যের জন্য প্রতিদিন অসংখ্য পর্যটক এখানে মুদ্রা ছুঁড়ে ফেলে। এই গল্পই ফোয়ারাটির প্রতি এক বিশেষ আকর্ষণ যোগ করেছে।

ট্রেভি ফোয়ারা

কারাকাল্লা স্নান ঘর

রোমের দর্শনীয় স্থান হচ্ছে কারাকাল্লা স্নান ঘর। এটি রোমান সম্রাট কারাকাল্লা তৃতীয় শতাব্দীতে নির্মাণ করেছিলেন। সম্রাট তার প্রজাদের মন জয় করতে স্নানাগারটি নির্মাণ করেন। প্রায় তিনশো বছর চালু থাকার পর লুটপাট ও ভুমিকম্পের শিকার হয়ে বর্তমানে এটি অনেকটাই ধ্বংসপ্রাপ্ত।

কারাকাল্লা স্নানঘর

অ্যাপিয়ান ওয়ে

প্রাচীন রোমের আরেকটি অনন্য পর্যটক আকর্ষণ হচ্ছে অ্যাপিয়ান ওয়ে। একসময় এটি সেনাবাহিনীর জন্য তৈরি একটি বিশেষ রাস্তা ছিলো। আট কিলোমিটার লম্বা এ রাস্তার চারপাশে অনেক ঐতিহাসিক স্থাপত্য রয়েছে। ৩১২ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে নির্মিত এ রাস্তায় খ্রিস্টান ধর্মের প্রবর্তক যিশু খ্রিস্ট হেটেছিলেন বলে কথিত আছে।

পর্যটন আকর্ষণ হিসেবে গির্জা সমূহ 

রোমের অধিবাসীরা অধিকাংশই খিস্টান। এ কারণেই সমগ্র শহরজুড়ে রয়েছে ৯০০টিরও বেশি গির্জা। এদের প্রতিটিই অনন্য স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত। গির্জাগুলোতে রেনেসাঁ এবং বারোক যুগের আর্কিটেকচারের অনুপম নিদর্শন এর দেখা মেলে। রোমের প্রতিটি স্থাপত্যের আর্কিটেকচার ও ভবনের ডিজাইনে প্রাচীন রোমান এবং খ্রিস্টধর্মের মেলবন্ধন লক্ষ্য করা যায়। 

শান্তা মারিয়া

রোমের যত পুরোনো গির্জা আছে তার মধ্যে অন্যতম হলো শান্তা মারিয়া। ঐতিহাসিকরা বিশ্বাস করেন, এটি ৪র্থ শতাব্দীতে নির্মিত হয়েছিলো। যদিও সময়ের সাথে সাথে বার বার এটি পুনর্নির্মিত হয়েছে। বিশেষকরে, ১২০০ শতাব্দীর দিকে এর দেয়ালে করা মোজাইকের কাজ এখনো মানুষের মনে মুগ্ধতা ছড়ায়। ভার্জিন মেরির উদ্দেশ্যে নির্মিত এই গির্জার ভিতরে রোমান স্থাপত্য রীতি মেনে ১২টি গ্রানাইডের কলাম নির্মাণ করা হয়েছে। 

দর্শকদের কাছে সব থেকে দৃষ্টিনন্দন বস্তু হচ্ছে গির্জার স্বর্নালী ছাদ। এই ছাদজুড়ে রয়েছে অসম্ভব সুন্দর সব চিত্রকর্ম। ভার্জিন মেরি থেকে শুরু করে যিশুর জীবনের বিভিন্ন ঘটনা স্বর্নখচিত মোজাইক দ্বারা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এছাড়াও খ্রীষ্টধর্মের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির প্রতিকৃতিও আছে এখানে।

শান্তা মারিয়া গির্জা

সান ক্লেমেন্তে বাসিলিকা

রোমের আরেকটি অপূর্ব সুন্দর স্থাপত্যের গির্জা হচ্ছে সান ক্লেমেন্তে বাসিরিকা। এর দেয়ালে ও ছাদে রয়েছে ফ্রেস্কো এবং মোজাইকের কাজ। এ দৃষ্টিনন্দন কারুকার্যে পর্যটকদের চোখ আটকে যেতে বাধ্য। তবে, আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে এটি চতুর্থ শতকে নির্মিত আরেকটি প্রাচীন গির্জার উপর নির্মিত হয়েছিল। 

সান জিওভানি

রোমে নির্মিত প্রথম ক্যাথলিক গির্জা হচ্ছে সান জিওভানি। জন ব্যাপিটিস্টকে উৎসর্গ করা এ গির্জাটিকে বাইরে থেকে দেখে একদমই গির্জা মনে হয়না। কিন্তু, এর ভেতরের সৌন্দর্য মুগ্ধ করবে যে কাউকে। এই গীর্জার ভেতরে রয়েছে চমৎকার সব দেয়ালচিত্র, যা বাইবেল থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে খোদায় করা হয়েছে।

সেন্ট পিটার’স ব্যাসিলিকা 

সেন্ট পিটারস বাসিলিকা বিশ্বের সবচেয়ে বড় গির্জা। এটি রোমের ভ্যাটিকান সিটিতে অবস্থিত বিশ্বের রোমের অন্যতম বৃহৎ পর্যটক আকর্ষণ। এই গির্জার নির্মাণ শেষ হতে প্রায় ১৫০ বছর সময় লেগেছিল। রেনেসাঁ কালের এই গির্জাটি ১৫০৬ থেকে ১৬২৬ সালের মধ্যে তৈরি হয়।

সুবিশাল সেন্ট পিটার’স ব্যাসিলিকার ভেতরের কারুকাজ আদতেই নজরকাড়া। ধর্মীয় দিক থেকেও এ গির্জাটির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। এর প্রতিটি অংশে রয়েছে অতি যত্নসহকারে তৈরি শিল্পকর্ম, যা দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে। এই গির্জাটিতে রয়েছে শুরু থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত সকল পোপের সমাধি, যা ইতিহাস এবং ধর্মীয় গুরুত্বের এক বিরল সংগ্রহ।

সেন্ট পিটার’স ব্যাসিলিকা

রোমের বিভিন্ন প্রাচীন স্থাপনা 

রোম মানে কেবল গির্জা নয়। রোমান সাম্রাজ্যের অনেক প্রাচীন এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা দেখা যায় শহরজুড়ে। 

ক্যাসেল সেন্ট এঞ্জেলো

রোমান সম্রাট হাড্রিয়ানের শাসনামলের একটি নিদর্শন হলো ক্যাসেল সেন্ট এঞ্জেলো। ১৩৫ এবং ১৩৯ খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝি সময়ে এটি তৈরি করা হয়েছিলো। পরবর্তীতে এর উপরে একটি দূর্গ তৈরি করা হয়। ফলে একইসাথে এটি মধ্যযুগীয় পোপদের উপাসনালয় এবং আবাসস্থল হয়ে উঠে। মজার বিষয় হলো, ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এটি কারাগার হিসেবেও ব্যবহার করা হয়েছিল। বর্তমানে স্থাপনাটিকে একটি জাদুঘরে পরিণত করা হয়েছে। 

ক্যাসেল সেন্ট এঞ্জেলো

রোমান ফোরাম

প্রাচীন রোম সাম্রাজ্যের ধ্বংসাবশেষ দেখার জন্য অন্যতম জায়গা হচ্ছে রোমান ফোরাম। প্যালাটাইন ও ক্যাপিটোলিন পর্বতের মাঝখানে অবস্থিত এ ধ্বংসাবশেষে এখনো হাজার বছর পুরোনো শহরের নানা অবশিষ্টাংশ রয়ে গেছে। 

রোমান ফোরাম

দ্য রোমান কলোসিয়াম 

রোম শহরের নাম শুনলেই যে রোমান স্থাপত্য চোখের সামনে ভেসে ওঠে তা হচ্ছে দ্য রোমান কলোসিয়াম। কলোসিয়াম স্টেডিয়ামের নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছিলো ৭২ খ্রিস্টাব্দে এবং শেষ হয় ৮০ খ্রিস্টাব্দে। 

এই বিশাল এমপিথিয়েটারে একসাথে প্রায় ৬০ হাজার মানুষ বসতে পারতো। সেসময় এখানে লোকজন জমায়েত হতেন এক হিংস্র খেলা উপভোগ করতে। যেখানে ‘গ্লাডিয়েটর’ নামে পরিচিত রাজবন্দীরা নিজেদের জীবন রক্ষার্থে লড়াই করতেন ক্ষুধার্থ পশুর সাথে। 

পাথর ও কংক্রিটের তৈরি এ স্থাপত্য রোমান শাসনামলের সেরা স্থাপত্যকর্ম বলে মনে করা হয়। প্রতিবছর হাজার হাজার পর্যটক এ কোলোসিয়াম দেখতে আসেন।

দ্য রোমান কলোসিয়াম

রোমের নাইট লাইফ 

রোম কেবলমাত্র এর প্রাচীন স্থাপত্য কিংবা রোমান সাম্রাজ্যের ইতিহাসের জন্যই বিখ্যাত নয়; বরং রোম তার প্রাণবন্ত এবং বৈচিত্র্যময় নাইটলাইফের জন্যও খ্যাতিসম্পন্ন। শহরটি যেন দিন ও রাত উভয় সময়ই উচ্ছলতায় ভরপুর।

শহরের কেন্দ্রীয় এলাকাসহ ট্রাস্টেভেরে, সান লরেঞ্জো, পিগনেটো, টেস্টাসিও এবং রিওন মন্টির মতো অঞ্চল রাতের বেলা যেন আরো বেশি জাঁকজমকপূর্ণ হয়ে ওঠে। এসব অঞ্চলে রয়েছে অসংখ্য বার, এবং ডিস্কো উপভোগ করার জন্য মনোরম সব জায়গা। এগুলো একই সাথে রোমানদের বিনোদনের চাহিদাও পূরণ করে থাকে।

মজার ব্যাপার হচ্ছে, অঞ্চলগুলোর রয়েছে নিজস্ব বিশেষ বৈশিষ্ট্য। যেমন, ট্রাস্টেভেরে রোমান ও পর্যটকদের প্রতিদিন সন্ধ্যায় মিলিত হবার স্থান হিসেবে বিশেষভাবে জনপ্রিয়। 

অন্যদিকে, সান লরেঞ্জো এবং পিগনেটো এলাকাগুলোতে বেশিরভাগই ইউনিভার্সিটি ছাত্রছাত্রীরা রাতভর আড্ডাসহ নানা কর্মকাণ্ডে মেতে থাকে। 

রোমের ডিস্কো বার

এছাড়াও রাতভর রোমের রাস্তাগুলোতে স্ট্রিট ফুড এর দোকানের সমাহার বসে যা খাদ্য রসিক পর্যটকদের জন্য অতুলনীয় অভিজ্ঞতা। শহরের বিভিন্ন স্থানে ছোট ছোট খাবারের স্টলগুলোতে ইতালির জনপ্রিয় সব খাবারের স্বাদ পাওয়া যায়।

রোম শহরের বিখ্যাত আর্ট গ্যালারিও মিউজিয়াম

রোমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিল্প-প্রদর্শনীগুলির মধ্যে একটি হলো রোম কোয়াড্রিয়েনালে। এটি প্রতি চার বছর পরপর অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। আন্তর্জাতিক ভিজ্যুয়াল আর্ট জগতের এই বিশিষ্ট প্রদর্শনীটি ১৯৩১ সাল থেকে শুরু  হয়।

রোম কোয়াড্রিয়েনালে ইতালীয় চিত্রকলা ও ভাস্কর্যের বিভিন্ন নিদর্শন উপস্থাপন করা হয়। তবে, এ আর্ট গ্যালারির বিশেষ আকর্ষণ হচ্ছে সাদা-কালো রঙে আঁকা চিত্রকর্ম এবং গ্রাফিক্সের কাজ। ইতালির শিল্পকলার বৈচিত্র্য ও উৎকর্ষতা তুলে ধরার পাশাপাশি এখানে আন্তর্জাতিক শিল্পের বিভিন্ন কারুকাজের শৈল্পিকতাকেও প্রতিফলিত করে।

পৃথিবীর সবথেকে ছোট দেশ ভ্যাটিকান সিটির অন্যতম আকর্ষণ হলো ভ্যাটিকান মিউজিয়াম। ভ্যাটিকান মিউজিয়ামটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৬ শতকের শুরুতে এবং এটি প্রতিষ্ঠা করেন পোপ জুলিয়াস (দ্বিতীয়)। এই জাদুঘরে পোপ ও ক্যাথলিক চার্চের সংগ্রহ করা শিল্পকর্মের বিশাল সংগ্রহ রয়েছে। 

ভ্যাটিকান মিউজিয়াম

এখানে মোট ৭০,০০০টি শিল্পকর্ম রয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ২০,০০০টি দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত। এগুলো ভ্যাটিকান মিউজিয়াম প্রাচীন রোমান ভাস্কর্য থেকে শুরু করে রেনেসাঁর বিখ্যাত শিল্পকর্ম দ্বারা পরিপূর্ণ। এ মিউজিয়ামটি পশ্চিমা শিল্পকলা ও ঐতিহ্যের এক অনন্য সংগ্রহশালা।

বিশ্বের একমাত্র পাস্তা মিউজিয়াম 

ইতালি বরাবরই তার সুস্বাদু রান্নার জন্য বিখ্যাত। বিশেষ করে পাস্তা, যা ইতালিয়ান রান্নার মধ্যে সর্বাধিক জনপ্রিয়। আশ্চর্যজনকভাবে, এই দেশটির পাস্তার প্রতি ভালোবাসা এতই গভীর যে, এখানে একটি পূর্ণাঙ্গ মিউজিয়াম রয়েছে যা শুধুমাত্র পাস্তা কেন্দ্রীক।

পাস্তা মিউজিয়াম

এই মিউজিয়ামটি কোর্টে দি গিয়ারোলা-তে অবস্থিত। এটি পাস্তা প্রেমীদের জন্য একটি স্বর্গ। এখানে আসলে জানা যাবে পাস্তার ইতিহাস, উদ্ভাবন, পাস্তার বিভিন্ন ধরনের উৎপাদন প্রণালী সম্পর্কে। এখানে রয়েছে বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও মেশিন যেগুলো যুগে যুগে পাস্তা তৈরির জন্য ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

রোমের যোগাযোগ ব্যবস্থা

সড়ক সংযোগ

রোমানরা সড়ক নির্মাণে ছিলো অত্যন্ত দক্ষ। খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকের আগেই, রোমে চারটি প্রধান সড়ক তৈরি হয়েছিল; এগুলো হলো ভিয়া অ্যাপিয়া, ভিয়া ফ্লামিনিয়া, ভিয়া অরেলিয়া, এবং ভিয়া অ্যামিলিয়া। প্রায় ৫০,০০০ মাইল বা তারও বেশি দীর্ঘ এই সড়ক নেটওয়ার্কে মহাসড়কও অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই মহাসড়কটি যুদ্ধের সময় রোমানদের নানা ভাবে উপকৃত করেছিলো। এ সড়ক দ্বারা রোম থেকে ইউরোপে সহজেই যাতায়াত করা যেতো। যুদ্ধকালীন কৌশলগতভাবে সেনাবাহিনী স্থানান্তরে এ সড়কটি ভূমিকা রেখেছিলো যার ফলে শত্রুর পরাজয় সহজ হতো।

একটি প্রবাদ প্রচলিত আছে যে, “সব সড়ক রোমে চলে আসে।” কারণ, রোমানরা প্রায়শই তাদের সাম্রাজ্যে নতুন একটি করে সড়ক যোগ করতো, যাতে রোম এবং নতুন অধিকৃত অঞ্চল বা শহরগুলোর মধ্যে একটি উন্নত এবং সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরি হয়। এর মধ্যে অ্যাপিয়ান ওয়ে অন্যতম সর্বশ্রেষ্ঠ উদাহরণ। 

ইউরোপের প্রথম সুপার হাইওয়ে 

রোমের অন্যতম জনপ্রিয় আকর্ষণ হলো অ্যাপিয়ান ওয়ে। এটি ছিল ইউরোপের প্রথম সুপার হাইওয়ে। অ্যাপিয়ান ওয়ে ৩১২ খ্রিস্টপূর্বে নির্মিত হয়েছে ।

এই সড়ক নির্মাণের কাজ শুরু করেছিলেন রোমান সেন্সর অ্যাপিয়াস ক্লডিয়াস কেসকুস। তার নামেই এ রাস্তার নামকরণ করা হয়েছে ‘অ্যাপিয়ান ওয়ে’ ।

অ্যাপিয়ান ওয়ে

অ্যাপিয়ান ওয়ে মূলত রোমের পূর্ব দিকের প্রবেশদ্বার ছিল, যা রোম থেকে ক্যাম্পানিয়া এবং দক্ষিণ ইতালি পর্যন্ত বিস্তৃত। সড়কটি ৪০০ মাইল দূরে এসে ব্রিনডিসিতে মিলিত হয়েছিল। এটি ছিল রোমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক,সামরিক মহাসড়ক এবং সবচেয়ে পুরনো মহাসড়ক।মহাসড়কটি  এখনও বর্তমান। 

বর্তমানে রোম শহরের যোগাযোগ ব্যবস্থা

বর্তমান রোমে একটি আধুনিক ও বিস্তৃত অভ্যন্তরীণ পরিবহণ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, যা শহরের অভ্যন্তরীণ সার্বিক এবং টেকসই গতিশীলতাকে নিশ্চিত করছে। বর্তমানে রোমের পরিবহন ব্যবস্থা টেকসই গতিশীলতার দিকে আরও বেশি মনোনিবেশ দিয়েছে।

ক্লাসিক ও ফ্রি-ফ্লো কার শেয়ারিং পরিসেবাগুলোর প্রতি আগ্রহ বাড়ছে রোমানদের। শহরে বেশ কয়েকটি কার শেয়ারিং পরিসেবা রয়েছে। যেমন- রোম কারশেয়ারিং।

রোম শহরে যানবাহন ব্যবস্থা

এছাড়াও, শহরের বৈদ্যুতিক যানবাহন ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করার জন্য ৩৫৮৮টি চার্জিং স্টেশন তৈরি করা হয়েছে, যা রোমের পরিবহন ব্যবস্থাকে আরও সহজ, সুবিধাজনক এবং পরিবেশবান্ধব করে তুলেছে।

উপসংহার 

রোম কেবলই একটি শহর নয়, এ শহরের সাথে জড়িয়ে আছে হাজারও ইতিহাস। অসাধারণ স্থাপত্য আর সুস্বাদু খাবারের পাশাপাশি তারা মানবসভ্যতাকে দিয়েছে ইংরেজি ক্যালেন্ডার, রোমান সংখ্যার মতো কালজয়ী সব কীর্তি। আর তাই পৃথিবীর ইতিহাসে রোম চিরকালই একটি সময়ের উর্ধ্বে উঠা মহান শহর হিসেবে স্মরনীয় হয়ে থাকবে।

রোম সম্পর্কে আরো কিছু মজার তথ্য 

বিনামূল্যে পনি সরবরাহ: রোম শহর তার পানি সরবরাহ সিস্টেমের জন্য বিখ্যাত। প্রাচীনকাল থেকেই এখানকার পানি সরবরাহ ব্যবস্থা খুবই উন্নত। এখনও সরকার প্রতিটি বাড়িতে বিনামূল্যে পনি সরবরাহ করে।

বিপুল সংখ্যক পর্যটক: প্রতিবছর রোমে এত বেশি পর্যটক আসেন যে, রাস্তায় বের হলে দেখা যায়, রোমানদের চেয়ে পর্যটকের সংখ্যা বেশি।

এলজিবিটি: রোম তার এলজিবিটি সম্প্রদায়ের জন্যও একটি সম্পূর্ণ স্বীকৃত ও উদার পরিবেশ তৈরি করেছে। শহরে প্রচুর কুইয়ার-ফ্রেন্ডলি বার এবং ক্লাব রয়েছে, যেখানে LGBTQI+ সম্প্রদায় নির্দ্বিধায় নিজের মতো সময় কাটাতে পারে। রোমকে ইউরোপের সবচেয়ে সমকামী-বান্ধব শহরগুলোর মধ্যে অন্যতম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। 

রেফারেন্স:

১. https://en.wikipedia.org/wiki/History_of_Rome

২. https://bn.wikipedia.org/wiki/%E0%A6%B0%E0%A7%8B%E0%A6%AE

৩. https://youtu.be/Iys_hkeCTIQ?si=lMvYosvJPz6EqUJF

৪. https://youtu.be/-t0fI3uyjHY?si=0O5OqJ649329zIVg

৫. https://youtu.be/s6PpXYTZOfs?si=BY0bNw3JiahrjjXh

 

Related posts

অ্যানিমের শহর- টোকিও

কায়রো – প্রাচীন কোলাহলের শহর

ইরানের সাজানো শহর – তেহরান

শেখ আহাদ আহসান

Leave a Comment

Table of Contents

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More