আপনি কি জানেন, পৃথিবীতে এমন একটি দেশ রয়েছে যেখানে সূর্য কখনও অস্ত যায় না! আবার শীতকালে এমন দিনও আসে যখন সূর্যের মুখই দেখা যায় না! আরও আশ্চর্যের ব্যাপার হলো ,এই দেশটির নিজস্ব কোনও মুদ্রা নেই। এমনকি মানুষ এখানে গাড়ির বদলে হেলিকপ্টারে কিংবা কুকুরে টানা স্লেজের মাধ্যমে যাতায়াত করে!
বলছি সেই রহস্যময় অথচ মনোমুগ্ধকর দেশ গ্রীনল্যান্ডের কথা। আপনি যদি পৃথিবীর মানচিত্রের উত্তর দিকটা ভালো করে দেখেন, তাহলে এক বিশাল সাদা ভূমি আপনার চোখে পড়বে, সেটিই হলো গ্রীনল্যান্ড।
গ্রিনল্যান্ডের ভৌগলিক অবস্থান, আয়তন ও জনসংখ্যা
এটি উত্তর আটলান্টিক ও আর্কটিক মহাসাগরের মাঝখানে অবস্থিত। এর একদিকে রয়েছে কানাডা, অন্যদিকে আইসল্যান্ড, আর চারপাশ জুড়ে রয়েছে অনন্ত বরফ আর নীল সমুদ্রের রাজ্য। আর মজার বিষয় হলো, এই অবস্থানের কারণেই গ্রীনল্যান্ডকে বলা হয় পৃথিবীর “উত্তরের রক্ষাকবচ”। কারণ, এখানকার বরফই পৃথিবীর জলবায়ুর ভারসাম্য ধরে রাখে।
জেনে অবাক হবেন, গ্রিনল্যান্ড হলো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দ্বীপ, যার আয়তন প্রায় ২১.৬ লাখ বর্গকিলোমিটার। অথচ, এত বিশাল ভূমিতে বাস করে মাত্র প্রায় ৫৮ হাজার মানুষ! আরও অবাক করা বিষয় হলো, এই দেশের প্রায় ২০ লাখ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে রয়েছে কেবল বরফ আর তুষার।
গ্রীনল্যান্ডের ইতিহাস
গ্রীনল্যান্ডের ইতিহাসও এর বরফের মতো স্তরে স্তরে জমে থাকা হাজার বছরের স্মৃতি। আজ যে ভূমিটাকে আমরা বিশাল এক বরফের দেশ হিসেবে দেখি, সেখানে প্রায় ৪,৫০০ বছর আগে মানুষ বসবাস শুরু করেছিল। এখানে প্রথমেই আসে আর্কটিক অঞ্চলের সাকাক ও ডরসেট সংস্কৃতির মানুষেরা। তবে, তারা একা আসে নি, সঙ্গে করে এনেছিল পাথরের সরঞ্জাম, পশমের পোশাক আর বেঁচে থাকার কৌশল।
তাদের কারণেই প্রথম গ্রীনল্যান্ডেরের মানুষ বরফে আগুন জ্বালাতে শিখেছিল। এছাড়াও, তারা সীল মাছ, ও মেরুভালুক শিকার করত। তাদের জীবন ছিল প্রকৃতির সঙ্গে এক নিরন্তর যুদ্ধ। কিন্তু অবাক করা বিষয় হলো, এই সংগ্রামের মধ্যেও তারা গড়ে তুলেছিল টিকে থাকার এক বিস্ময়কর অধ্যায়।

এরপর ইতিহাসে আসে এক নাটকীয় মোড় …ভাইকিংদের আগমন। খ্রিস্টীয় ৯৮৫ সালে, আইসল্যান্ড থেকে নির্বাসিত অভিযাত্রী এরিক দ্য রেড এই অচেনা বরফাচ্ছন্ন ভূমিতে এসে পৌঁছান। দ্বীপটি দেখে তিনি ভাবলেন, যদি এর নাম দেন “বরফের দেশ”, তাহলে কেউ আসতে চাইবে না। তাই তিনি নাম রাখলেন “Greenland” যার অর্থ “সবুজের দেশ”। মূলত মানুষকে আকৃষ্ট করার জন্য নামটি ছিল একপ্রকার বিজ্ঞাপন, কিন্তু সেই নামই পরবর্তীতে গ্রীনল্যান্ডকে বিশ্বের ইতিহাসে এক রহস্যময় পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত করে।
এখানেই এরিক দ্য রেড স্থাপন করেন প্রথম নর্স বসতি, যেখানে প্রায় পাঁচ শতাধিক মানুষ এসে বসবাস শুরু করে। তারা গবাদি পশু পালন করত, মাছ ধরত, এবং ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্য করত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ভাইকিং সভ্যতা হারিয়ে যায়। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, অতিরিক্ত ঠান্ডা, খাদ্য সংকট, এবং সামাজিক দ্বন্দ্বের কারণে ১৫শ শতাব্দীর দিকে এই বসতি বিলুপ্ত হয়ে যায়।
এরপর দীর্ঘ সময় গ্রীনল্যান্ড প্রায় নির্জন হয়ে পড়ে, তবে এখানকার ইনুইট জাতিগোষ্ঠী তখনও টিকে ছিল। তারাই এখানে গড়ে তোলে তাদের এক স্বতন্ত্র সংস্কৃতি, যা ছিল পুরোপুরি প্রকৃতিনির্ভর। আর তাদের বিশেষত্ব ছিল, বরফের ব্লক দিয়ে ইগলু, আর তাদের নৌকা “কায়াক” তৈরি করা।

পরবর্তীতে ১৭২১ সালে ডেনমার্ক ও নরওয়ে আবার গ্রীনল্যান্ডে আগ্রহ দেখায়। তারা এখানে মিশনারি পাঠায় খ্রিস্টধর্ম প্রচারের জন্য, এবং ধীরে ধীরে পুরো দ্বীপটি তাদের নিয়ন্ত্রণে নয়ে নেয়। আর সেই সময় থেকে গ্রীনল্যান্ড হয়ে ওঠে ডেনমার্কের উপনিবেশ। ইউরোপীয় প্রভাবের সঙ্গে সঙ্গে এখানে ইনুইটদের ভাষা, পোশাক, ও জীবনধারা ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হতে থাকে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় গ্রীনল্যান্ডের কৌশলগত গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার মাঝামাঝি অবস্থানের কারণে যুক্তরাষ্ট্র এখানে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করে। যুদ্ধ শেষে গ্রীনল্যান্ডবাসীরা নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুনভাবে ভাবতে শুরু করে। ১৯৫৩ সালে গ্রীনল্যান্ড আনুষ্ঠানিকভাবে ডেনমার্কের একটি প্রদেশে পরিণত হয়। কিন্তু ইনুইটদের মধ্যে স্বাধীনতার স্বপ্ন তখন জেগে উঠছে। ফলে ১৯৭৯ সালে ডেনমার্ক গ্রীনল্যান্ডকে দেয় Home Rule অর্থাৎ নিজস্ব প্রশাসনিক ক্ষমতা।
পরবর্তীতে ২০০৯ সালে পাস হয় Self-Government Act, যার মাধ্যমে তারা নিজেদের অভ্যন্তরীণ প্রশাসন ও আইন প্রণয়নের স্বাধীনতা লাভ করে। তবে, আজও গ্রীনল্যান্ডের প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্রনীতি, ও আর্থিক সহায়তা অনেকটাই ডেনমার্কের হাতে।
গ্রীনল্যান্ডের সমাজব্যবস্থা
এবার আসি এই দ্বীপ রাষ্ট্রের সমাজব্যবস্থার দিকে। গ্রীনল্যান্ডের সমাজ ছোট হলেও, তারা পরস্পর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও সহযোগিতাপূর্ণ। এখানকার মোট জনসংখ্যা প্রায় ৯০ শতাংশই ইনুইট বা এস্কিমো বংশোদ্ভূত। এই সমাজে পরিবার, প্রকৃতি ও সম্প্রদায় এই তিনটিই জীবনের মূল ভিত্তি। প্রথাগতভাবে এখানে পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ছিল, কিন্তু এখন নারী-পুরুষের সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়েছে। নারীরা শিক্ষা, প্রশাসন ও রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে ভূমিকা রাখছে। এমনকি সংসদ ও সরকারি প্রতিষ্ঠানে বহু নারী নেতা কাজ করছেন, যা গ্রীনল্যান্ডের সমাজকে আধুনিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তুলেছে।
এই বরফাচ্ছন্ন ভূমিতে শিক্ষা ব্যবস্থার বিকাশও এক অনন্য উদাহরণ। গ্রীনল্যান্ডের শিক্ষা ব্যবস্থা অনেকটাই ডেনমার্কের আদলে গড়ে উঠেছে। এখানে শিশুদের জন্য প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক, এবং পাঠ্যভাষা দুটি …গ্রীনল্যান্ডিক ও ড্যানিশ। মূলত এই দুই ভাষায় শিক্ষাদান তাদের সাংস্কৃতিক দ্বৈত পরিচয়কে প্রতিফলিত করে।

এছাড়াও, রাজধানী নুক শহরে রয়েছে University of Greenland, যেখানে পরিবেশবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, ভাষাবিজ্ঞান, আর্কটিক গবেষণা এবং ইনুইট সংস্কৃতির ওপর বিশেষ কোর্স চালু আছে। এমনকি এখানকার ছোট শহর ও গ্রামের স্কুলগুলোতেও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। অনেক তরুণ শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য ডেনমার্কে যায়, আবার অনেকে ফিরে এসে নিজেদের সমাজে শিক্ষক বা প্রশাসক হিসেবে কাজ করে। শিক্ষাকে তারা দেখে উন্নয়নের চাবিকাঠি হিসেবে, কারণ তারা মনে করে এই প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করতে হলে জ্ঞানই তাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র।
গ্রীনল্যান্ডের সংস্কৃতি
গ্রীনল্যান্ডের সবচেয়ে পরিচিত বৈশিষ্ট্য হলো তাদের পোশাক। শত শত বছর আগে এখানে বসবাসকারী ইনুইট জনগোষ্ঠী বরফের মধ্যে বেঁচে থাকার জন্য যে পোশাক তৈরি করেছিল, তা কেবল শীত প্রতিরোধের উপায় নয়, বরং টিকে থাকার কৌশলও ছিল। তারা সিল বা তিমির চামড়া, রেনডিয়ার ও কারিবু প্রাণীর লোম দিয়ে বানাতো পার্কা, মোজা, আর গ্লাভসের মতো জিনিস। এই পোশাক তাদের হিমশীতল বাতাস ঠেকাতে সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম ছিল। এছাড়াও, নারীরা প্রায়ই সূহ্ম সূচিকর্ম ও পশমের নকশা দিয়ে পোশাক সাজাতো, যা আজও গ্রীনল্যান্ডের ঐতিহ্যবাহী পোশাকের সৌন্দর্য বাড়ায়। তবে সময়ের সাথে তারা এখন আধুনিক পোশাক, যেমন- থার্মাল জ্যাকেট, উলের হুডি, স্নো বুট ব্যবহার করে।
গ্রীনল্যান্ডের মানুষের জীবনযাত্রায় খাদ্য এক বিশেষ ভূমিকা রাখে। যেহেতু এখানে চাষাবাদ প্রায় অসম্ভব, তাই মানুষ মূলত নির্ভর করে সমুদ্রের ওপর। গ্রীনল্যান্ডবাসীর প্রধান খাবার হলো মাছ, সিল, তিমি, চিংড়ি, ও সামুদ্রিক পাখির মাংস।
তবে ঐতিহ্যবাহী ও জনপ্রিয় খাবার হলো মধ্যে মাট্টাক (“Mattak)”। এই খাবারটি মূলত তিমির চামড়া ও চর্বি দিয়ে তৈরি হয়। এই খাবার শীতকালে শরীরকে উষ্ণ রাখে, তাই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে খাবারটি ইনুইট সংস্কৃতির অংশ হয়ে আছে। এছাড়া স্যুসাট (Suaasat) নামে এক ধরণের স্যুপও এখানে জনপ্রিয়। এই স্যুপ যসিল বা রেনডিয়ারের মাংস ও সবজি দিয়ে রান্না করা হয়। আধুনিক যুগে অবশ্য আমদানি করা খাবার যেমন রুটি, দুধ, ফল, ও চা গ্রীনল্যান্ডের ঘরে নিয়মিত খাওয়া হয়। তবে গ্রীনল্যান্ডবাসী আজও বিশ্বাস করে, যে খাবার প্রকৃতি থেকে আসে, সেটিই সবচেয়ে তাদের জন্য পবিত্র ও শক্তির উৎস।

আবার, ধর্মীয় দিক থেকে গ্রীনল্যান্ডের মানুষ বেশ শান্ত ও সহনশীলতার অধিকারী। এখানে বেশিরভাগ মানুষ লুথেরান খ্রিস্টান, তবে প্রাচীন ইনুইট ধর্মবিশ্বাস আজও রয়ে গেছে। পুরোনো ইনুইটরা বিশ্বাস করত, প্রকৃতির প্রতিটি উপাদানেরই আত্মা আছে। অর্থাৎ, বরফ, সমুদ্র, সূর্য, এমনকি বাতাসও জীবন্ত। তাদের কাছে শিকার মানে কেবল খাদ্য সংগ্রহ নয়, বরং প্রকৃতির সঙ্গে এক আত্মিক সম্পর্ক। আধুনিক গ্রীনল্যান্ডবাসী এই পুরোনো বিশ্বাস আর খ্রিস্টধর্ম দুটোকেই এখানে সমান সম্মান করে।
গ্রীনল্যান্ডে উৎসব মানেই মানুষ, সংগীত, আর প্রকৃতির মেলবন্ধন। এখানকার সবচেয়ে বড় উৎসব হলো গ্রীনল্যান্ডের জাতীয় দিবস, যা ২১ জুন পালিত হয়। এটি বছরের সবচেয়ে দীর্ঘ দিন, যেদিন সূর্য অস্ত যায় না। এই দিনে মানুষ ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে, পতাকা উড়িয়ে, নাচে-গানে মুখরিত হয়ে ওঠে। শিশুরা বাইরে খেলাধুলা করে, আর বড়রা সমুদ্রতীরে বারবিকিউ করে। এই উৎসব তাদের জাতীয় গর্বের প্রতীক।

তবে, ক্রিসমাস ও নিউ ইয়ার-ও এখানে খুব আনন্দের সঙ্গে পালিত হয়। বরফে মোড়া রাতে বাড়িগুলো আলোকসজ্জায় ঝলমল করে, মানুষ একে অপরকে উপহার দেয়, গরম কফির কাপ হাতে গল্প করে। আরেকটি উল্লেখযোগ্য ঐতিহ্য হলো ড্রাম ডান্স। এটি একটি ইনুইট নাচ, যেখানে ঢোলের তালে তালে মানুষ অতীতের কাহিনি বলে, যা তাদের সংস্কৃতির গভীর স্মৃতিচিহ্ন বহন করে।
গ্রীনল্যান্ডের পর্যটন স্থান
গ্রীনল্যান্ডের বরফে মোড়া স্বপ্নিল রাজ্যের অনেক বিখ্যাত পর্যটন স্থান রয়েছে।
ইলুলিসাত আইস ফিয়র্ড
এখানকার সবচেয়ে বিখ্যাত স্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ইলুলিসাত আইস ফিয়র্ড। বলা হয়, এটি বিশ্বের সবচেয়ে মনোমুগ্ধকর হিমবাহ অঞ্চলের একটি। এই স্থানকে ২০০৪ সালে, ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে ঘোষণা করে। এখানে হাজার বছরের পুরোনো বরফের স্তূপ প্রতিনিয়ত আটলান্টিক মহাসাগরের দিকে ভেসে যায়। বিশালাকার হিমশৈলগুলো ধীরে ধীরে গলে সমুদ্রের দিকে এগিয়ে যায়, আর সেই দৃশ্য দেখার জন্য প্রতি বছর হাজারো পর্যটক ভিড় জমায়। দিনের বেলায় সূর্যের আলো যখন বরফের ওপর পড়ে, তখন পুরো ফিয়র্ড ঝলমল করে ওঠে, সাদা আর নীলের মিশ্র প্রতিফলনে। কখনও সেই বরফে ধরা পড়ে সূর্যাস্তের সোনালি আভা, যা মুহূর্তের জন্য পুরো অঞ্চলটিকে স্বপ্নরাজ্যে পরিণত করে।
শীতকালে ইলুলিসাতের আরেকটি চমক হলো নর্দান লাইটস বা অরোরা বোরিয়ালিস। আকাশজুড়ে সবুজ, বেগুনি, নীল, গোলাপি আলোর ঢেউ যেন এখানে পর্দার মতো নাচে। এই দৃশ্য দেখে মনে হয় যেন প্রকৃতির নিজের আঁকা রঙের খেলা। স্থানীয়দের কাছে এটি এক পবিত্র ও রহস্যময় ঘটনা, আর ভ্রমণকারীদের কাছে এটি জীবনের একবার দেখার মতো অভিজ্ঞতা। হাড়কাঁপানো ঠান্ডা উপেক্ষা করে অনেকেই এখানে ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করেন, শুধু সেই জাদুকরী আলোয় আকাশ দেখার জন্য।

কাংগারলুসুয়াক গ্লেসিয়ার
দেশটির আরও একটি অনন্য স্থান হলো কাংগারলুসুয়াক গ্লেসিয়ার অঞ্চল, যা গ্রীনল্যান্ডের সবচেয়ে সহজে প্রবেশযোগ্য হিমবাহ এলাকা। এখানে পর্যটকরা সরাসরি বরফের ওপর হাঁটতে পারেন, আইস-ট্রেকিং বা স্নো-হাইকিং করে বরফের বুকে অভিযানে যেতে পারেন। সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো, এখানকার আইস কেভ বা বরফের গুহা; যেখানে ভেতরে ঢুকলে দেখা যায় নীলচে আলোয় ভরা স্বচ্ছ বরফের দেয়াল, যা সূর্যের আলোয় হিরার মতো ঝলমল করে ।
স্কাইস্ক্র্যাপার অব নেচার
গ্রীনল্যান্ড শুধু বরফ আর হিমবাহের দেশ নয়, এখানে রয়েছে অসাধারণ পাহাড়ি সৌন্দর্য। দক্ষিণ গ্রীনল্যান্ডের নানোরটালিক শহরের আশেপাশের পাহাড়গুলোকে স্থানীয়রা “স্কাইস্ক্র্যাপার অব নেচার” বলে থাকে। কারণ, এই পাহাড়গুলো আকাশকে ছুঁয়ে ওঠে, আর নিচে গলে থাকা হিমবাহগুলো গড়ে তোলে এক মনোমুগ্ধকর উপত্যকা। পাহাড়ের শৃঙ্গ থেকে ভেসে আসা নদী ও ঝর্ণাগুলো এই দৃশ্যকে আরও জীবন্ত করে তোলে। পর্যটকরা এখানে হাইকিং করতে করতে প্রকৃতির চমৎকার খেলায় মগ্ন হতে পারেন। আর ছবি তোলার জন্যও এটি এক স্বর্গের মতো স্থান।
এছাড়াও, পূর্ব গ্রীনল্যান্ডের তাসিলাক শহর ও তার পার্শ্ববর্তী পাহাড়ি অঞ্চলও পর্যটকদের কাছে খুবই জনপ্রিয়। চারপাশে ফিয়র্ড, ছোট নদী এবং হিমবাহের মেলবন্ধন এখানে এক অনন্য প্রাকৃতিক পরিবেশ তৈরি করেছে। গ্রীষ্মকালে উপত্যকাগুলো সবুজ ঘাসে ঢাকা পড়ে, আর দূরের বরফের পাহাড়ে সূর্যের আলো পড়ে এক প্রকার পরাবাস্তব দৃশ্য সৃষ্টি করে। এখানে হাইকিং, মাউন্টেন ক্লাইম্বিং এমনকি কায়াকিং করার সুযোগও আছে, যা প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এক দারুণ অভিজ্ঞতা।
নুক শহর ও ন্যাশনাল মিউজিয়াম অব গ্রীনল্যান্ড
গ্রীনল্যান্ডের ছোট ছোট শহরগুলো বরফের মাঝে মানবিক উষ্ণতার নিদর্শন। নুক হলো দেশের রাজধানী এবং সবচেয়ে প্রাণবন্ত শহর। এখানে আধুনিকতা আর ঐতিহ্য একসঙ্গে দেখা যায়। নুকে ঘুরে দেখা যায় ন্যাশনাল মিউজিয়াম অব গ্রীনল্যান্ড, যেখানে সংরক্ষিত আছে ইনুইট জনগোষ্ঠীর প্রাচীন পোশাক, শিকার সরঞ্জাম এবং ঐতিহাসিক নিদর্শন। মিউজিয়ামটির বাইরের আকৃতি বেশ সরল কিন্তু মার্জিত। ধূসর রঙের আধুনিক কাঠামো বরফের পরিবেশের সঙ্গে যেন এক নতুন ছন্দ তৈরি করে। হালকা ঢালু ছাদের ডিজাইন এবং বড় কাচের জানালা বাইরে থেকে সূর্যের আলোকে ভিতরে প্রবেশ করায়, যা ভেতরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে একটা উষ্ণ অভ্যর্থনার অনুভূতি দেয়। এখানকার বিশেষ আকর্ষণ হলো কুইলযকিটস্ক মামিস (Qilakitsoq Mummies), যা ৫০০ বছরের পুরনো ইনুইট নারী ও শিশুর দেহাবশেষ। এটি বিশ্বের অন্যতম সংরক্ষিত মমি হিসেবে বিখ্যাত।
সিসিমিউট
অন্যদিকে, সিসিমিউট হলো গ্রীনল্যান্ডের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর। এটি সংস্কৃতি এবং অভিযাত্রার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। এখানে দেখতে পাওয়া যায় ঐতিহ্যবাহী কাঠের গির্জা, স্থানীয় বাজার, এবং কুকুর টানা স্লেজে চড়ে শহর ঘোরার সুযোগ। সিসিমিউটের বার্ষিক স্নো-ফেস্টিভাল গ্রীনল্যান্ডের অন্যতম বড় উৎসব, যেখানে স্থানীয়রা বরফের ভাস্কর্য বানায়, গান গায়, এবং বরফের মাঝে আগুন জ্বালিয়ে একসাথে গল্প বলে। এই শহরটি পর্যটককে গ্রীনল্যান্ডের মানবিক, সাংস্কৃতিক এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্য একসঙ্গে উপভোগ করার সুযোগ দেয়।

ডিস্কো বে
গ্রীনল্যান্ডের পশ্চিম উপকূলও ভ্রমণকারীদের জন্য এক অনন্য অভিজ্ঞতার ক্ষেত্র। এখানে অবস্থিত ডিস্কো বে সমুদ্রপ্রেমীদের স্বপ্নের ঠিকানা। বিশাল বরফখণ্ডে ঘেরা এই জাদুকরী অঞ্চল গ্রীষ্মকালে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। কারণ এসময় এখানে দেখা যায় হাম্ব্যাক, ফিন এবং বেলুগা প্রজাতির তিমি। এখানে বরফের মধ্যে ভেসে থাকা তিমির পিঠের ঝলক চোখে পড়ার মুহূর্তটি দর্শকের মনে স্থায়ী ছাপ ফেলে। সমুদ্রের নীরবতা এবং হিমশৈলের চমৎকার সৌন্দর্য একসঙ্গে মিলে তৈরি করে এক আবহমান পরিবেশ, যা সত্যিই জীবনের একবার দেখা উচিত।
এছাড়াও, উত্তরের দিকে এগোলেই দেখা মেলে উপসিক উপকূল। এই স্থানটি প্রায় একশোরও বেশি ছোট দ্বীপ নিয়ে গঠিত। প্রতিটি দ্বীপের চারপাশে বরফের স্তূপ, মাঝে মাঝে দেখা মেলে নীলচে হিমবাহের টুকরো। এখানে স্থানীয় মৎস্যজীবীরা কাঠের নৌকায় বরফের ফাঁকে ভেসে বেড়ান, যা প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সমন্বয় ও সহাবস্থানের এক জীবন্ত চিত্র উপস্থাপন করে।
গ্রীনল্যান্ডের অন্ধকার বাস্তবতা
তবে গ্রীনল্যান্ডের এই বরফের চাদরের নিচে লুকিয়ে আছে এক অন্ধকার বাস্তবতা। এখানকার মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে বাঁচতে জানে, কিন্তু অনেক সময় সেই লড়াইটা হয় নিজের ভেতরের দানবের সঙ্গে। মানুষের মনে জমে থাকা নিঃসঙ্গতার আগুন এখানে সবচেয়ে ভয়ংকর। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক চাঞ্চল্যকর জরিপ জানায়, আত্মহত্যার দিক থেকে গ্রীনল্যান্ড পৃথিবীর প্রথম সারিতে। প্রতি ১ লাখে প্রায় ৮৩ জন মানুষ নিজের জীবনের ইতি টানেন।
কিন্তু কেন এমন? বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্রীনল্যান্ডের ইনুইট জনগোষ্ঠীর জীবনে নিঃসঙ্গতা যেন অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী। বছরের বেশির ভাগ সময় বরফে ঢেকে থাকা পরিবেশ, সীমিত যোগাযোগ, দীর্ঘ অন্ধকার রাত সব মিলিয়ে মানুষ ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলে জীবনের উচ্ছ্বাস। কেউ বলে, এটি জলবায়ু বা পরিবেশের প্রভাব; আবার কেউ বলে, এটা মানসিক শূন্যতার ফল।
তবে, গ্রীনল্যান্ডবাসীরা অনেক সময় মৃত্যুকেও জীবনযাত্রার অংশ হিসেবে মেনে নেয়। যেন মৃত্যুকে ভয় নয়, বরং এক মুক্তির রূপে গ্রহণ করা তাদের সংস্কৃতির গভীরে গেঁথে আছে। মনোবিশেষজ্ঞদের মতে, যখন পরিবারের কোনো সদস্য আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়, তখন আশেপাশের লোকেরাও একই মানসিক প্রভাবে ঝুঁকে পড়ে। তাই একের পর এক জীবন নিভে যায় এই নীরব সংক্রমণে।
সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো,এই দেশটি যতটা সুন্দর, এখানে যাতায়াত ততটাই কঠিন। অন্য দেশ থেকে সরাসরি গ্রীনল্যান্ডে যাওয়া প্রায় অসম্ভব, কারণ এখানে নেই কোনো আন্তর্জাতিক ফেরি সার্ভিস। যদিও দেশটি সমুদ্রপৃষ্ঠে অবস্থিত, কিন্তু বিশাল বরফে ঘেরা উপকূলই তার চারপাশে এক প্রাকৃতিক দেয়াল তৈরি করেছে।
এছাড়াও, দেশের ভেতরের চিত্র আরও কষ্টকর। গ্রীনল্যান্ডে প্রায় ১৬টি বড় শহর থাকলেও এক শহর থেকে আরেক শহরে যাতায়াত করা সহজ নয়। বছরের অধিকাংশ সময় বরফে ঢাকা থাকে এখানকার রাস্তাঘাট, নদী, এমনকি খালবিলও। নেই কোনো রেলপথ, নেই অভ্যন্তরীণ সড়ক বা নৌপথ। তাই পরিবহন ব্যবস্থা বলতে কার্যত কিছুই নেই।
এই কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও গ্রীনল্যান্ডবাসীরা নিজেদের মতো করে তৈরি করেছে এক অনন্য পরিবহন সংস্কৃতি। তাদের প্রধান ভরসা উড়োজাহাজ ও হেলিকপ্টার। কিন্তু গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে মানুষ যাতায়াত করে স্থানীয়ভাবে বানানো যানবাহনে, যেমন স্লেজ, কায়াক ও স্নো-স্যু। স্লেজগুলো বানানো হয় রেইনডিয়ারের খুলি, তিমির চোয়াল, শিলমাছের হাড় এবং কাঠ দিয়ে। আর এই স্লেজ টানে প্রশিক্ষিত কুকুরের দল, যাদের প্রতি স্থানীয়দের ভালোবাসা অপরিসীম।
দ্বিতীয় বৃহত্তম বরফের আস্তানা
গ্রীনল্যান্ডকে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম বরফের আস্তানা বলা হয়। এখানে পৃথিবীর মোট মিঠা পানির প্রায় ৮০% মজুদ আছে। এই বরফই গ্রীনল্যান্ডের পরিচয়, এর সৌন্দর্য, আবার এই বরফই আজ গলে গলে গ্রীনল্যান্ডের ভবিষ্যৎকে বদলে দিচ্ছে।
তবে, গত কয়েক দশকে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, গ্রীনল্যান্ডের বরফ ভয়াবহ হারে গলছে। প্রতিদিন প্রায় ২৮৫ বিলিয়ন টন বরফ হারিয়ে যাচ্ছে সমুদ্রে। এই গলন শুধু স্থানীয় পরিবেশে নয়, পুরো পৃথিবীর জলবায়ুর ওপর প্রভাব ফেলছে। যদি গ্রীনল্যান্ডের বরফ সম্পূর্ণ গলে যায়, তাহলে পৃথিবীর সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা প্রায় ৭ মিটার পর্যন্ত বাড়তে পারে। যার মানে হলো, উপকূলবর্তী অনেক দেশ ও শহর ধীরে ধীরে ডুবে যাবে।
গ্রীনল্যান্ডে বরফ গলতে শুরু করলে প্রথমে যেটা ঘটবে, তা হলো জীবনযাত্রার পরিবর্তন। যেসব স্থানে আগে সারা বছর বরফে ঢাকা থাকত, এখন সেখানে নদী বয়ে যাবে, নতুন নতুন গাছপালা জন্ম নিবে। কিন্তু পাশাপাশি, পুরোনো গ্রামগুলো বিপদের মুখে পড়বে। বরফ গলে গেলে মাটি আলগা হয়ে যা্বে, ফলে অনেক গ্রাম বসবাসের অযোগ্য হয়ে ওঠবে। শিকারীদের জন্য এই পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়বে, কারণ তারা যে বরফের ওপর দিয়ে সিল বা তিমি শিকার করত, সেই বরফ এখন আগেভাগেই ভেঙে যাবে।

এখানেও একটি আশার কথা রয়েছে, গ্রীনল্যান্ডের বরফ গলার সঙ্গে সঙ্গে উন্মোচিত হচ্ছে এর আরেকটি নতুন মুখ, এখানকার প্রাকৃতিক সম্পদ। মাটির নিচে পাওয়া যাচ্ছে ইউরেনিয়াম, রেয়ার আর্থ মেটাল, আর প্রাকৃতিক গ্যাসের মতো মূল্যবান সম্পদ। যা ভবিষ্যতে গ্রীনল্যান্ডের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করতে পারে, তবে একইসাথে এই খনিজ উত্তোলন নতুন পরিবেশগত বিপর্যয়ও ডেকে আনতে পারে।
গ্রীনল্যান্ডের সরকার ও জনগণ এই বাস্তবতাকে গভীরভাবে এই বিষয়কে উপলব্ধি করছে। তাই অনেক তরুণ এখন পরিবেশ সচেতনতা বাড়াতে কাজ করছে, পাশাপাশি জলবায়ু বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করছে। তাদের কাছে গ্রীনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ মানে শুধু অর্থনৈতিক উন্নতি নয়, বরং প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা। তারা জানে, এই বরফই তাদের জীবন, এই বরফই তাদের অস্তিত্ব।

গ্রীনল্যান্ড শুধু এক ভূখণ্ড নয়, এটি বরফের নিচে জমে থাকা এক জীবন্ত ইতিহাস। কেউ একে বলে বিশ্বের সবচেয়ে বড় দ্বীপ, কেউ বলে এক স্বাধীন দেশ। কিন্তু সত্যি হলো, গ্রীনল্যান্ড এই দুই পরিচয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এক অনুভূতির নাম। আজ যখন জলবায়ু পরিবর্তনের হুমকি গোটা মানবজাতিকে ভাবিয়ে তুলছে, তখনও গ্রীনল্যান্ড আমাদের শেখায় ,স্বাধীনতা মানে কেবল সীমারেখার স্বাধীনতা নয়; প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানও এক ধরনের মুক্তি।

