একজন সুফি সাধকের এমন আর্তনাদ, যার শব্দ শুনে নাকি মৃত শিষ্য জীবিত হয়ে উঠেছিল! অবিশ্বাস্য মনে হলেও, এই গল্প আজও ভক্তরা মুখে মুখে বলেই চলেছে। আর এই রহস্যময় সাধক ছিলেন লাল শাহবাজ কালান্দার।xa0
“দামা দাম মস্ত কালান্দার” নামের জনপ্রিয় কাওয়ালি গানটি আমরা কম বেশি সবাই শুনেছি। এটি মূলত লাল শাহবাজ কালান্দারকে উৎসর্গ করা হয়েছে। আজও খ্যাতনামা সুফি সাধক এবং দরবেশ লাল শাহবাজ কালান্দার এর দরগাহ প্রতি সন্ধ্যায় ভরে ওঠে ধামালের উন্মাদনায়। আবার সেই দরগাহই কেঁপে উঠেছিল ভয়াবহ বোমা হামলায়।xa0
লাল শাহবাজ কালান্দারের পরিচিতি
লাল শাহবাজ কালান্দারের আসল নাম ছিল সৈয়দ উসমান মারওয়ানী। ১১৭৭ খ্রিস্টাব্দে আজকের আফগানিস্তানের মারওয়ান শহরে তিনি জন্ম গ্রহণ করেছিলেন। তিনি ছিলেন এক মহান বংশের সন্তান। মূলত তাঁর মাতা ছিলেন একটি রাজ পরিবারের সদস্য। বলা হয়, তিনি ছিলেন ইমাম জাফর আস সাদিক (রা.)-এর বংশধর। ইমাম জাফর আস-সাদিক (রা.) ছিলেন, ৮ম শতাব্দীর একজন সম্মানিত মুসলিম পণ্ডিত, জাফরি মাজহাবের প্রতিষ্ঠাতা এবং বহু সুন্নি মুসলিম পণ্ডিতের শিক্ষক। তাকে ইসলামের ফিকাহশাস্ত্রের বিকাশে, গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার জন্য স্মরণ করা হয়।xa0xa0

সেই বংশের সিলসিলা হিসেবেই, উসমান মারওয়ানী ছোট থেকেই পেয়েছিলেন ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতার এক গভীর শিক্ষা। তিনি প্রথমে নিজ শহর, মারওয়ানে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। পরে তিনি ইসলামী জ্ঞান ও আধ্যাত্মিক সাধনার প্রতি আরো গভীর ভাবে আকৃষ্ট হন, এবং তরুণ বয়সে তিনি একা একা ভ্রমণে বেরিয়ে পড়েন। কিন্তু তাঁর এই ভ্রমণ সাধারণ কোনো ভ্রমণের মতো ছিল না, এ ছিল তাঁর জ্ঞানের খোঁজে এক তীর্থযাত্রা। আর তাই তিনি একে একে পাড়ি দিলেন, মধ্য এশিয়া, ইরান, ইরাক, এমনকি আরব ভূমি।xa0
তাঁর ভ্রমণ তাঁকে নিয়ে যায় ইসলামের সবচেয়ে পবিত্র নগরী মক্কা ও মদিনায়, যেখানে তিনি হজ পালন করেন এবং হারাম শরীফে দীর্ঘ সময় কাটান। এরপর তিনি চলে যান কারবালা, যেখানে ইমাম হুসাইন (রা.) শাহাদাত বরণ করেন। ইমাম রেজা (রাঃ)-এর মাজারের জন্য প্রসিদ্ধ শহর, ইরানের মাশহাদ শহরেও তিনি সফর করেন। আর, এই স্থানেই তিনি নতুন জ্ঞান অর্জন করলেন, মানুষের সঙ্গে মিশলেন, আর আধ্যাত্মিক শিক্ষায় সমৃদ্ধ হলেন।মজার বিষয় হলো, তিনি শুধু ভ্রমণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না, ভ্রমণের পাশাপাশি তিনি প্রতিটি স্থানের ভাষাও শিখেন। একারণেই তিনি আরবি, ফার্সি, হিন্দি ও সিন্ধির মতো বহু ভাষায় দক্ষ হয়ে উঠেছিলেন।xa0
লাল শাহবাজের নামকরণ
উসমান মারওয়ানী তার কাওয়ালীর জন্যও বিশ্ব বিখ্যাত ছিলেন। অনেকের মতে, তাঁর কণ্ঠে যখন ভেসে উঠত আধ্যাত্মিক কবিতা বা কাওয়ালি, তখন নাকি মানুষ নিজের জীবনের সমস্ত দুঃখ কষ্ট ভুলে যেত। অবশেষে, বিভিন্ন স্থান ভ্রমণ করার পর, উসমান মারওয়ানীর জীবনযাত্রা এসে থামল পাকিস্তানের সিন্ধ প্রদেশের সেহওয়ান শহরে। এখানেই তিনি স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করলেন। তাঁর রূপ, আচার আর আধ্যাত্মিক মহিমার কারণে, সেহওয়ানের মানুষ তাঁকে এক নতুন নামে ডাকতে শুরু করল, আর সেই নাম হলো, লাল শাহবাজ কালান্দার।xa0
এই নামের পিছনে একটি মজার যুক্তিও রয়েছে। যেহেতু তিনি সবসময় লাল রঙের পোশাক পরতেন, তাই মানুষ তাঁকে ডাকল “লাল”। আবার, তাঁর অপরিসীম শক্তি আর মহিমার কারণে তাঁর নাম হলো “শাহবাজ”, অর্থাৎ রাজকীয় বাজ। আর শেষের “কালান্দার” শব্দটি, এক বিশেষ সুফি সম্প্রদায়ের নাম। এর অর্থ হলো, যারা দুনিয়ার মোহ ত্যাগ করে, শুধু আধ্যাত্মিকতার পথে চলেন।
আধ্যাত্মিকতার পথের গল্পxa0
এক প্রচলিত লোকগল্প অনুযায়ী, বোদলা বাহার নামে শাহবাজ কালান্দারের একজন প্রিয় শিষ্য ছিলেন। তৎকালীন রাজা সেই বোদলা বাহার এর জনপ্রিয়তা দেখে, ঈর্ষান্বিত হয়ে তাঁকে হত্যা পরিকল্পনা করেন। এরপর তাঁকে টুকরো টুকরো করে হত্যা করা হয়। এই ঘটনা শাহবাজ কালান্দার এর কানে গেলে তিনি কষ্টে, ভিষণ জোরে, এক আর্তনাদ করে বসেন। আর রহস্যজনকভাবে সে আর্তনাদ শুনে শিষ্য পুনরুজ্জীবিত হয়ে ওঠেন। কিছু বিবরণে বলা হয়, যেখানে তার শিষ্যকে টুকরো করে ফেলা হয়, শাহবাজ কালান্দারের চিৎকার শুনে, সে জায়গা থেকে, “আয়া সরকার” বা “আমি আসছি, প্রভু”, বলে শব্দ শোনা যায়। এই ঘটনাটি অনেকেই সত্য বলে বিশ্বাস করে। এই কাহিনী সেহওয়ান ও আশপাশে মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত এবং মাজার দর্শনার্থীদের মধ্যে জনপ্রিয় গল্প।xa0
লাল শাহবাজ কালান্দার ১২৭৪ খ্রিস্টাব্দে ইন্তেকাল করেন। ইন্তেকালের পর তাঁর ভক্ত ও অনুসারীরা তাঁকে সেহওয়ান শহরেই দাফন করেন। প্রথমে এটি একটি সাধারণ কবরই ছিল। পরবর্তীতে ১৩৫৬ খ্রিস্টাব্দে তুঘলকি শাসনের সময় এটি দরগাহ হিসেবে গড়ে ওঠে। মূলত সেই সময় একটি প্রাথমিক কাঠামো গড়ে তোলা হয়, যা ধীরে ধীরে ভক্তদের মিলনস্থলে পরিণত হয়।
লাল শাহবাজ কালান্দরের দরগাহxa0
পরবর্তীতে ১৬৩৯ সালে এই দরগাহ উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারিত হয়। সেই সময়কার শিল্পীরা মাজারটিকে নকশা-করা টাইলস, সরুকৃত কারুকাজ ও চমৎকার অলঙ্করণে সজ্জিত করেন। এখানকার গম্বুজ ও প্রবেশদ্বারে নাইলন টাইলস, ধাতব নকশা ও ক্যালিগ্রাফির সমন্বয় দৃষ্টিনন্দন সৌন্দর্য এনে দেয়। অভ্যন্তরে আরবি-ফারসি লিপি, জ্যামিতিক নকশা, মিরর-কাজ ও সূক্ষ্ম কারুকার্য ভক্তদের মুগ্ধ করে।xa0

এই মাজারের ভেতরে সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ হলো ‘সিলভার-ক্যানোপি’। এটি মূলত একটি চাদরবেষ্টিত কাঠামো, যা মূল সমাধির উপরে স্থাপন করা হয়েছে। ভক্তরা এখানে এসে শ্রদ্ধা হিসেবে ফুল ও চাদর দেন এবং কবর জিয়ারত করেন। এর সামনের প্রাঙ্গণ বিশাল এবং চারপাশে রয়েছে পথচারীদের চলাচলের জন্য প্রবেশপথ ও রাস্তা। প্রতিদিন অসংখ্য ভক্ত এখানে সমবেত হন, কারও হাতে থাকে চাদর, কারও হাতে ফুল, আবার কেউ আসে শুধু মাথা নত করে শ্রদ্ধা জানাতে।xa0
এছাড়াও এখানে, প্রতিদিন এখানে সন্ধ্যার পর ধামাল শুরু হয়। যেখানে ঢোল-তবলার তালে ভক্তদের নৃত্য, এর আধ্যাত্মিক উন্মেষকে আরও বাড়িয়ে দেয়। পাশাপাশি কাওয়ালি, লোকগান ও “দামা দাম মস্ত কালান্দার” এর মতো গান মাজারটিকে আরও মানুষের সাংস্কৃতিক জীবনের সাথেও যুক্ত করে তোলে। প্রতি বছর শাবান মাসের ১৮ তারিখে এখানে উরস আয়োজিত হয়।xa0 তিনদিনব্যাপী এ উরস এ লাখো ভক্ত সমবেত হন।
দরগায় সন্ত্রাসী হামলাxa0
তবে এই শান্তি ও সহনশীলতার মাঝে ২০১৭ সালে ঘটে যায় এক ভয়াবহ এক সন্ত্রাসী হামলা। দিনটি ছিল বৃহস্পতিবার, আর সেদিনও সন্ধ্যার সময় দরগাহর ভেতরে চলছিল ঐতিহ্যবাহী ধামাল। ভক্তরা ঢোল-তবলার তালে আত্মহারা হয়ে নৃত্যে মগ্ন ছিলেন, আর ঠিক তখনই ঘটে এক বিভীষিকাময় ট্র্যাজেডি।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় জানা যায়, প্রথমে হামলাকারী একটি গ্রেনেড ছুড়ে, যা বিস্ফোরিত হয়নি। এরপরই সে ভিড়ের মাঝে নিজেকে বোমা লাগিয়ে তা বিস্ফোরিত করে। মুহূর্তের মধ্যে আনন্দ-উল্লাসের পরিবেশ পরিণত হয় কান্না, চিৎকার আর ধ্বংসস্তূপে। এই হামলায় প্রায় ৮৮ জন নিহত হন এবং ২৫০ জনের বেশি আহত হন। আহতদের মধ্যে নারী, শিশু ও বয়স্ক ভক্তরাও ছিলেন।xa0
এই ভয়াবহ আত্মঘাতী হামলার পর লাল শাহবাজ কালান্দারের দরগাহ কিছু সময়ের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায়। শতাধিক প্রাণহানি ও শোকের আবহ সেহওয়ান শহরকে স্তব্ধ করেছিল। কিন্তু ভক্তরা দ্রুতই জানিয়ে দেয়, এখানকার প্রতি তাদের আধ্যাত্মিক ভালোবাসা ও ধামালের শক্তি কোনোভাবেই থামানো যাবে না। হামলার পরের দিন ভোরে দরগাহর খাদেম ঘণ্টা বাজিয়ে ঘোষণা করেন, “আমরা ভয় পাব না।” সেই দিন থেকেই আবার নিয়মিত আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়।

লাল শাহবাজ কালান্দার দরগাহ শুধু একটি মাজার নয়, এক অবিস্মরণীয় আধ্যাত্মিক ক্ষেত্র। শতাব্দী ধরে এই স্থানে অহংকার, বিভাজন ও সীমানা অতিক্রম করে মানুষের হৃদয়ে প্রেম, বিশ্বাস ও একাত্মতার অনুভূতি সঞ্চারিত হয়েছে। শাহবাজ কালান্দারের জীবন, দর্শন ও মাজারের ধারাবাহিকতা , সব মিলিয়ে একটি চিরন্তন বার্তা প্রদান করে। এমনকি ২০১৭ সালের ভয়ঙ্কর হামলাও এই বার্তাকে স্তব্ধ করতে পারেনি। মানুষ আবারও মাজারে ফিরে এসেছে, ধামাল হয়েছে, দু’য়া হয়েছে, আল্লাহর কাছে নিজেকে মানুষ সমর্পন করেছে।

