Image default
এশিয়াদেশ পরিচিতি

মালয়েশিয়া: এক দেশ দুই ভূখণ্ড

মালয়েশিয়া যেন এক জাদুর বাক্স! যেখানে একদিকে রয়েছে আধুনিক শহরগুলোর ঝলমলে আলো, আর অন্যদিকে পৃথিবীর প্রাচীনতম রেইনফরেস্টের গহীন অন্ধকার।  

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিস্ময়কর দেশ মালয়েশিয়া। আধুনিকতার ছোঁয়ায় মালয়েশিয়া বদলে গেলেও এখনো তার ঐতিহ্য ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ঠিক আগের মতোই রয়ে গেছে। কুয়ালালামপুরের আকাশচুম্বী টাওয়ার থেকে শুরু করে, বোর্নিওর গভীর অরণ্য, এবং ল্যাংকাউইর বালির সৈকত, সব কিছুই যেন এক অসম্ভব স্বপ্নের মতো! 

চলুন এই বিস্ময়কর দেশটি সম্পর্কে আরও কিছু মজার তথ্য জানা যাক।

দেশ মালয়েশিয়া 
রাজধানী কুয়ালালামপুর 
আয়তন ৩,৩০,৮০৩ বর্গকিলোমিটার 
জনসংখ্যা ৩৪ মিলিয়ন 
ভাষা মালয়
মুদ্রা  রিঙ্গিত 

ম্যাপ 

ভৌগোলিক অবস্থান ও জলবায়ু 

মালয়েশিয়ার  ভৌগোলিক গঠন অন্যান্য দেশের থেকে একেবারেই আলাদা। মালয়েশিয়া দুটি অংশে বিভক্ত। এই দুই অংশ হলো-

পেনিনসুলার মালয়েশিয়া (পশ্চিম মালয়েশিয়া)- এটি মালয় উপদ্বীপের দক্ষিণাংশে অবস্থিত। এর উত্তরে থাইল্যান্ড, দক্ষিণে সিঙ্গাপুর ও পশ্চিমে মালাক্কা প্রণালী রয়েছে। এটি মালয়েশিয়ার বাণিজ্য, প্রশাসন ও আধুনিক শহরগুলোর কেন্দ্রস্থল।

বোর্নিও মালয়েশিয়া (পূর্ব মালয়েশিয়া)- এটি বোর্নিও দ্বীপের উত্তর অংশে অবস্থিত। প্রকৃতির এক রহস্যময় সাম্রাজ্য! প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ একটি  গহীন রেইনফরেস্ট। যা বন্যপ্রাণীদের আবাসস্থল।

মালয়েশিয়ার মাঝে অবস্থিত বিস্তৃত দক্ষিণ চীন সাগর। এই দক্ষিণ চীন সাগরই দেশটির দুই অংশকে পরস্পর থেকে পৃথক করেছে, যা মালয়েশিয়াকে এক অনন্য দ্বৈত ভূখণ্ডে পরিণত করেছে।

মালয়েশিয়ার জলবায়ু গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বর্ষণ অরণ্য জলবায়ু। দেশটিতে সারাবছরই সবুজ প্রকৃতি ও উষ্ণ আবহাওয়া বিরাজমান। তাপমাত্রা সারাবছর গড়ে ২৫°C থেকে ৩২°C পর্যন্ত হয়ে থাকে। জেনে অবাক হবেন, মালয়েশিয়া এমন একটি দেশ যেখানে কোন শীত নেই। তবে, পাহাড়ি এলাকাগুলোতে কিছুটা শীতল অনুভূত হয়। 

মালয়শিয়ার আয়তন ও জনসংখ্যা

আয়তনে বিশ্বের ৬৬তম বৃহত্তম দেশ মালয়েশিয়া। দেশটির মোট আয়তন ৩,৩০, ৮০৩ বর্গকিলোমিটার। আয়তনে বাংলাদেশের তুলনায় প্রায় দুই গুণ বড় মালয়েশিয়ার মোট জনসংখ্যা প্রায় ৩৪ মিলিয়ন (৩.৪ কোটি)। জনসংখ্যার দিক থেকে এটি বিশ্বের ৪৪তম জনবহুল দেশ হিসেবে বিবেচিত। 

দেশটির জনসংখ্যায় বৈচিত্র্যময়তা লক্ষ্য করা যায়। এখানে মূলত তিনটি প্রধান জাতিগোষ্ঠী বাস করে। যাদের মধ্যে মালয় প্রায় ৬৯%, চীনা প্রায় ২৩%, ভারতীয় প্রায় ৭%, অন্যান্য স্থানীয় আদিবাসী এবং অভিবাসী জনগোষ্ঠী ১%। মালয়েশিয়াকে এশিয়ার অন্যতম আধুনিক নগরায়িত দেশ বলা হয়। কারণ, এখানকার জনসংখ্যার প্রায় ৭৮% শহরাঞ্চলে বসবাস করে।

মালয়েশিয়ার ইতিহাস 

মালয়েশিয়ার ইতিহাসে রয়েছে রাজাদের শৌর্য-বীর্য, ইউরোপীয় উপনিবেশবাদীদের দখলদারি, এবং স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম। 

প্রাচীন মালয়েশিয়া: সোনালী যুগের সূচনা

হাজার বছর আগে মালয়েশিয়ার দ্বীপ ও উপদ্বীপ ছিল বণিকদের স্বপ্নরাজ্য। ভারত, চীন, আরব থেকে আগত বণিকরা এখানকার সমৃদ্ধ বন্দরগুলোর দিকে ছুটে আসত। শ্রীবিজয় (Srivijaya) ও মাজাপাহিত (Majapahit) সাম্রাজ্য তখন সমুদ্র বাণিজ্যে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছিল। এই সময় মালয় সংস্কৃতিতে ভারত ও চীনের গভীর প্রভাব পড়ে।

মালাক্কার উত্থান: ইসলাম ও বাণিজ্যের মিলনস্থল

১৪০০ সালের দিকে পরাক্রমশালী পারমেশ্বর ‘মালাক্কা সালতানাত’ প্রতিষ্ঠা করেন। এটা কেবল মালয় উপদ্বীপের নয়, বরং, পুরো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাণিজ্য কেন্দ্র হয়ে ওঠে। চিন্তা করুন সেই সময় বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যবসায়ীরা এখানকার বন্দরে এসে ভিড় জমাত। আর সেই সঙ্গে ইসলাম ধর্মও ধীরে ধীরে গোটা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে, যা মালয় সংস্কৃতিকে নতুন রূপ দেয়।

ঔপনিবেশিক দখল:  ক্ষমতার লড়াই 

মালাক্কার ঐশ্বর্য দেখে ইউরোপীয় শক্তিরা লোভ সামলাতে পারল না। আর তাই, ১৫১১ সালে পর্তুগিজরা এটিকে দখল করে নেয়। তারপর ডাচরা ১৬৪১ সালে এসে পর্তুগিজদের সরিয়ে দেয়। কিন্তু সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে ব্রিটিশরা, যারা ১৭৯৫ সালে পুরো মালয় উপদ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়।

ব্রিটিশ শাসনের সময় মালয়েশিয়ায় রাবার ও টিন শিল্প গড়ে ওঠে। এমনকি অর্থনীতির চাকা সচল রাখার জন্য চীন এবং ভারত থেকে শ্রমিকদের আনা হয়, যার ফলে মালয়েশিয়া ধীরে ধীরে একটি বহু-জাতিগত দেশ হয়ে ওঠে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও স্বাধীনতার দিকে যাত্রা

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় (১৯৪১-১৯৪৫) জাপান ব্রিটিশদের সরিয়ে মালয়েশিয়াকে দখল করে নেয়। কিন্তু যুদ্ধ শেষে ব্রিটিশরা আবার ফিরে আসে। তবে তখন মালয় জাতির মনে স্বাধীনতার স্বপ্নে জ্বল জ্বল করছিল! বহু সংগ্রামের পর ৩১ আগস্ট ১৯৫৭ সালে মালয় ফেডারেশন ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে।

মালয়েশিয়ার জন্ম: এক নতুন শক্তির উত্থান

১৯৬৩ সালে মালায়া, সাবাহ, সারাওয়াক এবং সিঙ্গাপুর মিলে “মালয়েশিয়া” গঠন করে। কিন্তু এই মিলন বেশি দিন টেকেনি। রাজনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে মাত্র দুই বছর পর অর্থাৎ ১৯৬৫ সালে সিঙ্গাপুর আলাদা হয়ে যায়। এরপর মালয়েশিয়া উন্নতির পথে এগিয়ে যায়। ১৯৮০-৯০ দশকে প্রযুক্তি, পর্যটন ও শিল্পখাতে বিপ্লব ঘটিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয় দেশটি। 

মালয়শিয়ার শাসনব্যবস্থা ও রাজনীতি

মালয়েশিয়া রাজতন্ত্র ও গণতন্ত্রের সংমিশ্রণে একটি অতুলনীয় রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি করেছে। মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রপ্রধান হলেন ইয়াং দি-পারতুয়ান আগং (Yang di-Pertuan Agong), যাকে সাধারণত রাজা বলা হয়। মালয়েশিয়ার সরকার পরিচালনা করেন প্রধানমন্ত্রী। রাজা দেশটির ঐতিহ্য ও পরিচয়ের প্রতীক হলেও প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ দেশের নীতি ও প্রশাসনের বাস্তব রূপ প্রদান করে। 

মালয়েশিয়ার পার্লামেন্ট দুই কক্ষে বিভক্ত। এর নিম্নকক্ষকে বলা হয়, দেওয়ান রাকিয়াত এবং আর উচ্চকক্ষের নাম হলো দেওয়ান নিগারা। পার্লামেন্ট আইন তৈরি এবং পাস করার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। 

মালয়েশিয়া বহুদলীয় গণতন্ত্র চর্চা করে। তবে কিছু দল দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় রয়েছে। তন্মধ্যে বারিসান ন্যাশনাল (BN) এবং পাকাতান হারাপান (PH) মালয়েশিয়ার দুইটি প্রধান রাজনৈতিক দল।

মালয়েশিয়ার দর্শনীয় ও পর্যটন স্থান

এক বিস্ময়কর দেশ মালয়েশিয়া। যা আপনার কল্পনাকেও হার মানাবে। আসুন এক ঝলকে দেখে নিই মালয়েশিয়ার সেই দর্শনীয় স্থানগুলো যা আপনাকে একেবারে মুগ্ধ করে ফেলবে-

কুয়ালালামপুর (Kuala Lumpur)

মালয়েশিয়ার অন্যতম প্রাণবন্ত একটি শহর কুয়ালালামপুর, যা দর্শনীয় স্থানগুলির জন্য বিখ্যাত। কুয়ালালামপুরের উজ্জ্বল আকাশচুম্বী টাওয়ার এবং আধুনিক শপিংমলগুলো পর্যটকদের কাছে এক আসাধারণ অভিজ্ঞতার সঞ্চার করে।

সূর্যাস্তের সময় টাওয়ারের গ্লাসে প্রতিফলিত আলো দেখে চোখ জুড়িয়ে যাবে। এমনকি শহরের কেন্দ্রে অবস্থিত বাজার এবং ঐতিহাসিক বাটু কেভস-এ গিয়ে আপনি রহস্যময় গুহার ভেতর এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা নিতে পারবেন।

পেট্রোনাস টুইন টাওয়ার

পেনাং 

পেনাং মালয়েশিয়ার এক অপূর্ব দ্বীপ। জর্জটাউন পেনাংয়ের প্রাণকেন্দ্র। এই শহরটি ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য স্থান হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। যেখানে রয়েছে রঙিন দেয়ালচিত্র, কফি হাউস এবং ঐতিহাসিক উপনিবেশিক স্থাপত্য।

পেনাং হিল থেকে দ্বীপটির ওপরে উঠলে দেখা যাবে সবুজ পাহাড়, সোনালী সূর্য, আর শান্ত সাগরের দৃশ্য। আর সৈকত প্রেমীদের জন্য এখানে রয়েছে, বাটু ফেরিঙ্গি সৈকত। 

পেনাং দ্বীপ

লাংকাউই

লাংকাউই দ্বীপটি সাদা বালির সৈকতের জন্য বিখ্যাত। এই দ্বীপের ল্যাংকাওই স্কাই ব্রিজ একটি বিখ্যাত স্থান। এই ব্রিজের উপর দিয়ে পুরো দ্বীপের উপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মনে হবে আপনি যেন আকাশের সাথে কথা বলছেন। 

আবার ম্যাট রায়ার ভিউপয়েন্ট থেকে দ্বীপের দিগন্তজুড়ে নীল সমুদ্র, সবুজ পাহাড় এবং মেঘে দেখা এক অন্যরকম আনন্দ। আর সমুদ্রের নীল জল উপভোগ করতে হলে, যেতে হবে, অসাধারণ বিচগুলোতে। 

লাংকাউই দ্বীপ

বোরনো

বিশ্বের বৃহত্তম রেইনফরেস্ট, কেব্রিল ব্রাউনস-এর গোপন নদী আর বন্যপ্রাণী দেখতে পাওয়া যাবে মালয়শিয়ার এই দ্বীপে। পর্যটকদের জন্য এখানে রিভার ক্রুজ-এ ভ্রমণ করার সুযোগ রয়েছে। । এখানে অনেক বিরল ও বন্যপ্রাণী দেখতে পাওয়া যায়।

মালাক্কা

মালাক্কা শহরটি মালয়েশিয়ার ইতিহাসের হৃদয়। এই শহরের পথে হাঁটলে মনে হবে যেন সময় এখানে থেমে গেছে। মালাক্কা শহরের সঙ্গীত, শিল্প এবং সংস্কৃতি মিশে এক ঐতিহ্যবাহী পটভূমি তৈরি করেছে।

হেল্মেট রাস্তা এবং স্টেডহাউস থেকে শুরু করে ক্রিসচার্চ-এর লাল ইটের দেয়াল সব কিছুই মালয়েশিয়ার পুরনো যুগের গল্প শোনায়। 

এখানকার নাইট মার্কেট এবং স্থানীয় খাবারের স্বাদও পর্যটকদের বেশ আকর্ষণ করে। শহরের এক কোণায় রয়েছে বোট রাইড, যার মাধ্যমে পুরনো শহরের তীর ধরে ভ্রমণ করার সুবর্ণ সুযোগ রয়েছে। 

মালাক্কা শহর

টামান নেগারা

মালয়েশিয়ার টামান নেগারা হলো একটি প্রাচীন বন, যা ৪,৩৩১ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত। এই বনটি  বিভিন্ন ধরনের ধরনের বন্যপ্রাণী এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত। পর্যটকরা এখানে ক্যানোপি ওয়াক, রেইনফরেস্ট ট্রেইল এবং নদী পার করে বিভিন্ন অভিযান করতে পারেন। এটি প্রকৃতি প্রেমী ও অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমী মানুষদের জন্য একটি সুন্দর গন্তব্য।

কিনাবালু পর্বত (Mount Kinabalu)

কিনাবালু পর্বত মালয়েশিয়ার বোর্নিও দ্বীপে অবস্থিত, যা মালয়েশিয়ার সবচেয়ে উঁচু পর্বত হিসেবে খ্যাত। এই পর্বতে ট্রেকিং পর্যটকদের এক অন্যরকম অনুভূতি প্রদান করে। প্রতি বছর হাজার হাজার পর্যটক এই পর্বতটি চূড়ান্তভাবে আরোহণ করতে আসেন। পর্বতটি শুধুমাত্র পর্বতারোহীদের জন্য নয় বরং প্রকৃতির প্রেমিকদের জন্যও একটি আদর্শ স্থান। এখানে অনেক বিরল প্রজাতির প্রাণী এবং উদ্ভিদ রয়েছে।

কিনাবালু পর্বত

মালয়েশিয়ার খাদ্য 

মালয়েশিয়ার খাবার মানেই স্বাদ, মশলা আর বৈচিত্র্যের এক অনন্য মেলবন্ধন। এখানে আপনি পাবেন মালয়, চাইনিজ, ভারতীয় ও থাই সংস্কৃতির মিশ্রণের তৈরি সব পদ।

নাসি লেমাক 

নাসি লেমাক মালয়েশিয়ার জাতীয় খাবার। নারকেল দুধে রান্না করা ভাতের সঙ্গে শুঁটকি, ভাজা চিনাবাদাম, সিদ্ধ ডিম, শসা, আর সেই বিখ্যাত মশলাদার সাম্বাল সস (মশলাদার চিলি সস) যোগে পরিবেশন করা হয় নাসি লেমাক। মিষ্টি, ঝাল ও নোনতার এক দারুণ মিশ্রণ, নাসি লেমাককে খুবই জনপ্রিয় করে তুলেছে। এটি শুধু মালয়েশিয়ার ঐতিহ্যের অংশ নয় বরং সারা বিশ্বে মালয় খাবারের পরিচিত মুখ।

লাকসা

লাকসা হলো মালয়েশিয়ার এক দুর্দান্ত স্যুপ নুডল, যা ঝাল, মশলাদার ও সুগন্ধি স্বাদের জন্য বিখ্যাত। নারকেল দুধের মিষ্টি স্বাদ আর ঝালের মিশ্রণে লাকসা তৈরি করা হয়। এটি চিংড়ি, মুরগি ধনেপাতা দিয়ে পরিবেশন করা হয়।এই খাবার লেবুর রস ও সাম্বাল চাটনির সঙ্গে খেলে এর স্বাদ আরও বেড়ে যায়।

লাকসা

রেন্ডাং

মুসলিম দেশ মালয়েশিয়ার আরো একটি জনপ্রিয় খাবার রেন্ডাং। যারা গরুর মাংস ভালোবাসেন তাদের জন্য রেন্ডাং। ধীরগতিতে দীর্ঘ সময় ধরে রান্না করা এই মাংসটা এতটাই নরম আর মশলাদার যে একবার খেলে বারবার খেতে মন চাইবে।

মালয়েশিয়াকে বলা হয় এশিয়ার সত্যিকারের প্রতিচ্ছবি।কারণ এখানে একসঙ্গে বহু জাতি, সংস্কৃতি ও ধর্মের মানুষ বাস করে। আর এই বৈচিত্র্য সবচেয়ে সুন্দরভাবে ফুটে ওঠে তাদের উৎসব উদযাপনের মাধ্যমে।মালয়, চীনা, ভারতীয়, খ্রিস্টান ও আদিবাসী প্রত্যেক জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব উৎসব রয়েছে। যা একসঙ্গে মালয়েশিয়াকে করে তুলেছে এক প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক মিলনমেলা।

মালয়েশিয়ার উৎসব

হরি রায়া আইদিলফিতরি 

হরি রায়া আইদিলফিতরি মূলত মালয়ে ভাষায় ঈদ উল ফিতরের অপর নাম। রমজানের মাসের শেষে সকালে ঈদের নামাজ, কবর জিয়ারত ও আত্মীয়দের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় দিয়ে দিনটি শুরু হয়।

ঝলমলে পোশাক, সুস্বাদু খাবার ও উষ্ণ আতিথেয়তা সব মিলিয়ে এক অসাধারণ উৎসব।  এই বিশেষ দিনটিতে রেনডাং, লেমাং ও কেটুপাটের সুগন্ধে প্রতিটি ঘর ভরে যায়। এই দিনে শুধু আনন্দই নয় বরং “মাফ জহির বাতিন” বলে একে অপরকে ক্ষমা করে।

পরিবারের সবার সাথে ঈদ উদযাপন

চীনা নববর্ষ 

মালয়েশিয়ার চীনা সম্প্রদায়রা চীনা নববর্ষ উৎসবটিকে অনেক ধুমধাম করে উদযাপন করে। এই বিশেষ দিনে পুরো দেশ লাল রঙে সেজে ওঠে। কারণ, চীনা সম্প্রদায়ের কাছে লাল রং মানেই সৌভাগ্য।

এই দিনে মালয়েশিয়ার রাস্তায় লায়ন ড্যান্স (সিংহ নাচ) আর ড্রাগন ড্যান্স দেখা যায়। দিনটিতে আর ও অর্থবহ করতে পরিবার-পরিজন মিলে ইয়ে সাং (রঙিন মাছ সালাদ) খায়। এমনকি পরিবারের
ছোটদেরকে অ্যাঙ্গ পাও (লাল খামে টাকা উপহার) দেওয়া হয়।

থাইপুসাম 

মালয়েশিয়ার সবচেয়ে আশ্চর্যজনক হিন্দু উৎসব থাইপুসাম। যেখানে ভক্তরা দেবতা মুরুগানের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে আশ্চর্য রকমের প্রতিজ্ঞা পালন করে। এই উৎসবে ভক্তরা শরীরে সূচ ফুটিয়ে কাওডি নামের বিশাল কাঠামো বহন করে মন্দিরে যায়। এই উৎসবের সবচেয়ে বড় আয়োজন করা হয় মালয়েশিয়ার বাতু গুহাতে, যেখানে হাজার হাজার মানুষ সমবেত হয়।

থাইপুসাম উৎসব

মালয়েশিয়ার অর্থনীতি 

মালয়েশিয়াকে এশিয়ার টাইগার বলা হয়। কারণ, এটি দ্রুত শিল্পায়ন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ও রপ্তানি নির্ভর প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে শক্তিশালী অর্থনৈতিক দেশ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। 

ব্যাংকিং, আর্থিক পরিষেবা, আইটি, এবং পর্যটন খাত মালয়েশিয়ার অর্থনীতির প্রধান চালিকা শক্তি। আপনি জানলে অবাক হবেন মালয়েশিয়া প্রতি বছর প্রায় ৩ কোটির বেশি পর্যটক আসে। 

একসময় প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভরশীল এই দেশটি এখন ইলেকট্রনিক্স, পরিষেবা ও আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে বৈশ্বিক বাজারে নিজের অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে। মালয়েশিয়ার ল্যাপটপ, স্মার্টফোন চিপ, গাড়ির যন্ত্রাংশ, এমনকি মেডিকেল সামগ্রী এখন বিশ্বের নানা প্রান্তে রপ্তানি হয়। বিশ্বব্যাপী সেমিকন্ডাক্টর বাজারের বিশাল একটা অংশ মালয়েশিয়ার হাতে।

মালয়েশিয়ার শিক্ষা ব্যবস্থা যে কারনে অনন্য

মালয়েশিয়া শুধু পর্যটনের জন্যই বিখ্যাত নয়। বরং দেশটির শিক্ষা ব্যবস্থাও দারুণভাবে প্রশংসিত।

মালয়েশিয়ায় বেশিরভাগ স্কুলে “ICT in Education” নামে একটি উদ্যোগ রয়েছে, যার মাধ্যমে শিশুরা ছোটবেলা থেকেই কম্পিউটার ও ডিজিটাল দক্ষতা শিখতে শুরু করে। মালয়েশিয়ার অনেক স্কুলে Robotics & AI (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) ক্লাব রয়েছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা  খুব সহজেই রোবট বানানো এবং কোডিং শিখতে পারে।

দেশটিতে বেশ কয়েকটি বিশ্বমানের পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। যেমন- University of Malaya (UM), Universiti Teknologi Malaysia (UTM), Monash University Malaysia।এমনকি মালয়েশিয়ায় ব্রিটিশ, অস্ট্রেলিয়ান, এবং আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসও রয়েছে। যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে শিক্ষার্থীরা পড়তে আসে। ইউরোপ ও আমেরিকার তুলনায় মালয়েশিয়ায় শিক্ষার খরচ কম হওয়ার জন্য বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের শিক্ষার্থীরা দেশটিতে পাড়ি  জমায়।

যেভাবে মালয়েশিয়া যাবেন

মালয়েশিয়া যেতে হলে অবশ্যই মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (MRP) লাগবে। পাসপোর্টের মেয়াদ কমপক্ষে ৬ মাস থাকতে হবে। 

বাংলাদেশি নাগরিকদের মালয়েশিয়ায় প্রবেশের জন্য eVISA বা Sticker Visa প্রয়োজন। ভিসার জন্য পাসপোর্ট (৬ মাসের মেয়াদ), ব্যাংক স্টেটমেন্ট (৩-৬ মাসের), ফ্লাইট টিকেট (রিটার্নসহ), হোটেল বুকিং কনফার্মেশন এবং সাদা ব্যাকগ্রাউন্ডের ছবি প্রয়োজন।

মালয়েশিয়া সম্পর্কে মজার কিছু তথ্য

মালয়েশিয়ার জঙ্গল আমাজনের চেয়েও পুরনো

মালয়েশিয়ার তামান নেগারা রেইনফরেস্ট প্রায় ১৩০ মিলিয়ন বছর পুরনো, যা আমাজন জঙ্গল থেকেও পুরনো এবং বিশ্বের প্রাচীনতম বনগুলোর মধ্যে একটি।

মালয়েশিয়ার সাবাহ রাজ্যে নীল রঙের কাঁকড়া পাওয়া যায়।

এখানে এক ধরনের “সাবাহ ব্লু ক্র্যাব” পাওয়া যায়, যা উজ্জ্বল নীল রঙের এবং খুবই বিরল!

মালয়েশিয়ায় সোনার তৈরি বিশাল রুটির statue আছে!

জোহর রাজ্যে বিশ্বের সবচেয়ে বড় “রোটি চানাই” স্ট্যাচু রয়েছে, যা স্বর্ণের রঙে রাঙানো হয়েছে। এটি দেশের ফেভারিট খাবারের প্রতীক।

মালয়েশিয়ার বিখ্যাত ‘জল শহর’

পুলাউ কেটাম (Pulau Ketam) হলো একটি ভাসমান গ্রাম, যা পানির ওপরে কাঠের পিলারের ওপর তৈরি। পুরো গ্রামটাই যেন জলের ওপর ভাসছে।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফুল মালয়েশিয়ায়

রাফলেসিয়া নামে একটি দৈত্যাকার ফুল রয়েছে, যা পচা মাংসের মতো গন্ধ ছড়ায়। কিন্তু এটি দেখতে অত্যন্ত সুন্দর!

মালয়েশিয়ার জলে থাকে ‘জ্বলন্ত’ প্ল্যাঙ্কটন

ল্যাংকাউই ও বোর্নিওতে বায়োলুমিনেসেন্ট প্ল্যাঙ্কটন দেখা যায়। যা রাতে পানিতে নীল আলো ছড়ায়। যেন তারা জলের মধ্যে তারা জ্বলছে

তথ্যসূত্র

Related posts

পৃথিবীর কেন্দ্র ইকুয়েডর

আবু সালেহ পিয়ার

প্রমিজ ল্যান্ড ইসরায়েল

মেক্সিকো – পৌরাণিক সভ্যতার দেশ

আবু সালেহ পিয়ার

Leave a Comment

Table of Contents

    This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More