কেউ গুলিতে মারা গেছেন, কেউ ফাঁসিতে ঝুলেছেন, কেউ জনগণের কাছে লাঞ্ছিত হয়েছেন, আবার কেউ চিরজীবন বিদেশে পালিয়ে থেকেও শান্তি পাননি।
বিশ্বের ইতিহাসে একেকজন স্বৈরশাসকের গল্প একেক রকম, কিন্তু একটি জায়গায় সবার মিল। আর তা হচ্ছে, খুব শক্তশালীভাবে তাঁরা ক্ষমতায় থাকলেও, তাঁদের শেষটা হয়েছে খুব করুণভাবে। কেউ গুলিতে মারা গেছেন, কেউ ফাঁসিতে ঝুলেছেন, কেউ জনগণের কাছে লাঞ্ছিত হয়েছেন, আবার কেউ চিরজীবন বিদেশে পালিয়ে থেকেও শান্তি পাননি। তাই একেকজনের জীবন যেমন নাটকীয় ছিল, তেমনি তাঁদের মৃত্যু ছিল আরও বেশি নাটকীয়।
চলুন, জেনে নেই সেই রকমই পাঁচজন স্বৈরশাসকের শেষ পরিণতি এবং তাদের মৃত্যু কিভাবে হয়েছিল।
বেনিতো মুসোলিনি
প্রথমেই আসি ইতালির স্বৈরশাসক বেনিতো মুসোলিনির কথায়। ১৯২২ থেকে ১৯৪৩ সাল পর্যন্ত ইতালি শাসন করা এই শাসক ছিলেন মূলত ফ্যাসিবাদী মতবাদের প্রতিষ্ঠাতা। বেনিতো মুসোলিনির শাসনামলে তার বিরোধীরা কোনো কথা বলতে পারত না। যাঁরা মতবিরোধ করতেন, তাঁদের ওপর নির্যাতন করা হতো। কিন্তু ১৯৪৩ সালে তাঁর ভাগ্যের বড় পরিবর্তন আসে। তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে, আর ইতালির মানুষ বুঝে ফেলেছিল যে যুদ্ধ জেতা আর সম্ভব না। তাই সবাই মুসোলিনির বিরুদ্ধে যেতে শুরু করে। শেষ পর্যন্ত জুলাই মাসে তাঁকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এটাই ছিল তাঁর পতনের শুরু।
ক্ষমতা হারানোর পরই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর তাঁকে পাহাড়ের ওপরে থাকা “হোটেল কাম্পো ইমপেরাতোরে” নামের একটি জায়গায় বন্দি করে রাখা হয়। সেখানে তিনি কয়েক মাস থাকেন। তারপর সেপ্টেম্বর মাসে জার্মানির ছত্রীসেনারা এসে তাঁকে উদ্ধার করে। তাঁকে প্রথমে জার্মানিতে নেওয়া হয়, তারপর আবার ইতালির উত্তর অঞ্চলে লুকিয়ে রাখা হয়।

১৯৪৫ সালের এপ্রিল মাসে মুসোলিনি তাঁর প্রেমিকা ক্লারা পেতাচ্চিকে নিয়ে স্পেনে পালাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তারা পালাতে পারেননি। পথে তাঁদের ধরে ফেলা হয়। এরপর দুজনকেই গুলি করে হত্যা করা হয়। হত্যার পর তাঁদের মৃতদেহ মিলানের “পিয়াৎসালে লোরেতো” চত্বরে নিয়ে যাওয়া হয়। বলা হয়ে থাকে, সেখানে রাগে ফুঁসে থাকা জনগণের সামনে তাঁদের মরদেহ উল্টো করে ঝুলিয়ে রাখা হয়। এসময় অনেক পথচারী নাকি মরদেহ দেখে থুতু দিত এবং পাথর ছুড়ে মারত।
নিকোলাই চসেস্কু
এরপর এ তালিকায় নিকোলাই চসেস্কুর নাম যুক্ত করা যায়। রোমানিয়ার স্বৈরশাসক নিকোলাই চসেস্কু ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত দেশের শাসক ছিলেন। কিন্তু সেই বছরই তাঁর শেষ সময় এসে যায়। ডিসেম্বর মাসে রোমানিয়ার মানুষ তাঁর বিরুদ্ধে প্রচণ্ড রাগ নিয়ে রাস্তায় নেমে আসে। দেশের পরিস্থিতি সে সময় খুব বেশি উত্তপ্ত হয়ে পড়ে। পরিস্থিতি ঠান্ডা করতে ২১ ডিসেম্বর চসেস্কু একটি বড় বক্তব্য দেন। এর মাধ্যমে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে তিনি চেয়েছিলেন মানুষকে শান্ত করতে। কিন্তু এই উপায় একদমই কাজে আসেনি। বরং মানুষ আরও ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে।
পরের দিন উত্তেজিত জনতার দল পৌঁছানোর আগেই চসেস্কু এবং তাঁর স্ত্রী এলেনা হেলিকপ্টারে বুখারেস্ট থেকে পালিয়ে যান। কিন্তু এভাবে পালিয়ে তাঁরা রক্ষা পাননি। ওই দম্পতিকে সেনাবাহিনী নিরাপত্তা হেফাজতে নেয়। জাতিগত নিধন ও দুর্নীতির অভিযোগে তাঁদের বিচারের মুখোমুখি করা হয় এবং মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

আনুষ্ঠানিকভাবে রায়ের বিরুদ্ধে আবেদন জানানোর জন্য ১০ দিনের সময় রাখা হয়েছিল। ওই সময় শেষ হওয়ার পরপরই রায় কার্যকর করা হয়। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে ওই দম্পতির হাত বাঁধা হয় এবং তাঁদের একটি দেয়ালের সামনে দাঁড় করানো হয়। সেখানে ফায়ারিং স্কোয়াডে তাঁদের ওপর গুলি চালানো হয়।
সাদ্দাম হোসেন
ইরাকের সাদ্দাম হোসেনের গল্পও অনেকটা এই রকম। সাদ্দাম হোসেন একসময় ইরাকের সবচেয়ে শক্তিশালী নেতা ছিলেন। ১৯৭৯ সালে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর তিনি কঠোর হাতে দেশ শাসন করতেন। শুরুতে মানুষ তাঁকে ভয় পেত, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর সিদ্ধান্তগুলোই বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
১৯৯০ সালের আগস্টে সাদ্দামের সেনারা প্রতিবেশী কুয়েত দখল করে। ধারণা করা হয়েছিল, কুয়েতের তেল ইরাকের অর্থনীতি শক্তিশালী করার জন্য প্রয়োজন। কিন্তু বিশ্ব তখনই রেগে যায়। এই ঘটনায় মার্কিন নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক জোট, ইরাকের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এরপরেও সাদ্দাম সেনা প্রত্যাহারের কোনো সিদ্ধান্ত নেননি।

পরের বছর, ১৯৯১ সালের জানুয়ারিতে শুরু হয় উপসাগরীয় যুদ্ধ। ছয় সপ্তাহের মধ্যে আন্তর্জাতিক জোট, ইরাককে হারের মুখে ফেলে কুয়েত ছাড়তে বাধ্য করে। এই পরাজয় দেশের মধ্যে বিদ্রহীদের উসকে দেয়। এমনকি ইরাকি শিয়া ও কুর্দি সম্প্রদায়ের মানুষেরা শরণার্থী হয়ে যায়, আর অনেককে নির্যাতন ও হত্যা করা হয়।
২০০৩ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ তাঁকে পদত্যাগ করতে বলেন। তবে এ প্রস্তাবে সাদ্দাম রাজি হননি। ২০ মার্চ যুক্তরাষ্ট্র ইরাক আক্রমণ করে। যুদ্ধের সময় তিনি আত্মগোপনে চলে যান। শেষ পর্যন্ত ১৪ ডিসেম্বর তাঁর জন্মস্থান তিকরিতের কাছে একটি সুড়ঙ্গ থেকে মার্কিন সেনারা তাঁকে আটক করে। পরবর্তীতে ২০০৫ সালে বিচারের মাধ্যমে তাঁকে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। ২০০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর, ঈদুল আজহার দিনে বাগদাদে ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
মুয়াম্মার গাদ্দাফি
বিশ্বের স্বৈরশাসকদের কথা এলে স্বাভাবিকভাবেই আরেকটি নাম চলে আসে, মুয়াম্মার গাদ্দাফি। মুয়াম্মার গাদ্দাফি লিবিয়া শাসন করেছেন চার দশকেরও বেশি সময় ধরে। ১৯৬৯ সালে তিনি এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাজা ইদ্রিসকে ক্ষমতাচ্যুত করে দেশের নিয়ন্ত্রণ নেন এবং ২০১১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকেন। সেই সময়ে তাঁর শাসন কঠোর এবং অনেকটা ভীতিকর ছিল।
২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে আরব বসন্তের ঢেউ লিবিয়াতেও পৌঁছায়। বেনগাজিতে মানুষ রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ শুরু করে এবং ধীরে ধীরে তা পুরো দেশে ছড়িয়ে পড়ে। গাদ্দাফি সরকার এই আন্দোলন দমন করতে পুলিশ, সৈন্য এবং ভাড়াটে বাহিনী ব্যবহার করে। শুধু তাই নয়, তিনি গোলাবারুদ, যুদ্ধবিমান এবং হেলিকপ্টার ব্যবহার করে বিদ্রোহীদের ওপর আক্রমণ চালান। এই সহিংসতার কারণে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও বিভিন্ন দেশ তার কড়া সমালোচনা করে।

গাদ্দাফির এই কঠোর নীতি সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদেরও বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাদের কেউ পদত্যাগ করেন, আবার কেউ বিদ্রোহীদের সমর্থন দেন। এত কিছুর পরেও, ২২ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে তিনি বক্তৃতা দিয়ে পদত্যাগ অস্বীকার করেন, এবং বিক্ষোভকারীদের দেশদ্রোহী ও নাশকতাকারী বলে অভিহিত করেন। তিনি দাবি করেন, আল-কায়েদার নির্দেশেই এই বিদ্রোহ হচ্ছে।
কিন্তু বিদ্রোহী জনগণ শক্তিশালী হয়ে ওঠে। আগস্টে তারা ত্রিপোলির বড় অংশ দখল করে এবং ২৩ আগস্ট শহরের সদর দপ্তর বাব আল-আজিজিয়া নিয়ন্ত্রণে আনে। গাদ্দাফি পালানোর চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত ধরা পড়েন। ২০১১ সালের ২০ অক্টোবর, লিবিয়ার সিরতে শহরে বিদ্রোহীরা তাঁকে আটক করে। এরপর সেখানে সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার মধ্যে গাদ্দাফি নিহত হন। ফলে চার দশকের দীর্ঘ শাসন, যা শুরু হয়েছিল শক্তি ও ভয় দিয়ে, শেষ হয় বিদ্রোহী জনগণ ও সহিংসতার মাধ্যমে।
মেঙ্গিস্তু হাইলে মারিয়াম
স্বৈরশাসকের তালিকায় এমনই আরেকটা নাম ইথিওপিয়ার মেঙ্গিস্তু হাইলে মারিয়াম। মেঙ্গিস্তু একসময় ইথিওপিয়াকে শক্ত হাতে শাসন করতেন। তিনি ডারগ নামক এক সামরিক জান্তার নেতা হিসেবে ইথিওপিয়ার ক্ষমতা দখল করেন এবং ১৯৭৭ সালে রাষ্ট্রপ্রধান হন। তাঁর শাসনামলে ইথিওপিয়া একটি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত হয় এবং তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপন করেন।
প্রথম থেকেই তিনি দেশকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য কঠোর ব্যবস্থা নেন। মেঙ্গিস্তু বিশ্বাস করতেন, মানুষের ওপর ভইয়ের বিস্তার করলে, তাঁকে কেউ চ্যালেঞ্জ করতে পারবে না। তাই তিনি “রেড টেরর” নামে এক ভয়ঙ্কর অভিযান চালান। এই অভিযানের মধ্যে হাজার হাজার মানুষ হত্যা বা গুম হয়। অনেক মানুষ নিখোঁজ হয়ে যায়, কারো খবর পাওয়া যেত না। তাঁর শাসনামলে ইথিওপিয়ায় গৃহযুদ্ধ এবং ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ-এর মতো মানবিক সংকট দেখা দেয়, যার জন্য তিনি বিশ্বব্যাপী সমালোচিত হন।

মানুষ ভয়ে কেঁপে থাকলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিরোধীর সংখ্যা বেড়ে যায়। সাধারণ জনগণ অসহায়, কিন্তু তারা চুপচাপ থাকতে থাকতে শেষ পর্যন্ত শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ১৯৯১ সালে বিদ্রোহীরা বড় আকারে আন্দোলন শুরু করে। এতে দেশব্যাপী বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে। মেঙ্গিস্তুর সেনারা আর পুরো দেশ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছিল না। তখন তিনি বুঝতে পারেন যে তাঁর ক্ষমতা শেষের দিকে। নিজের জীবন বাঁচাতে তিনি দেশ থেকে পালিয়ে যান এবং জিম্বাবোয়েতে আশ্রয় নেন। এদিকে, আদালত তাঁকে “রেড টেরর” অভিযানের জন্য দোষী সাব্যস্ত করে এবং মৃত্যুদণ্ড দেন। তিনি বর্তমানে জিম্বাবুয়েতে বসবাস করছেন এবং ইথিওপিয়ার সরকার তাঁর বিরুদ্ধে এখনও মামলা চালাচ্ছে।
শেখ হাসিনা
আর এই তালিকায় নতুন নাম লেখালেন বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনাকে নিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ছিল নানা অভিযোগ। তাঁর আমলে উন্নয়ন, অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে যেমন আলোচনা ছিল, তেমনি মানবাধিকার পরিস্থিতি, বিরোধী দলগুলোর প্রতি কঠোরতা, রাজনৈতিক মামলার সংখ্যাবৃদ্ধি ও নিখোঁজের ঘটনাগুলো নিয়েও সমালোচনা ছিল।
আর তাই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দেশের মধ্যে ক্ষোভ বাড়তে থাকে এবং ব্যাপক আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। এরপর বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাঁর বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা করা হয় এবং শেষ পর্যন্ত তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। যদিও রায় ঘোষণার সময় শেখ হাসিনা বাংলাদেশে নেই। ফলে রায় কার্যকর করা সম্ভব হয়নি, তবে এটি দেশের রাজনীতিতে নতুন এক আলোচনা তৈরি করে। তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের মতো তাঁর পতনও নানা মতামত ও ব্যাখ্যার জন্ম দিচ্ছে। রায় কার্যকর করা হবে কিনা বা কিভাবে হবে এ নিয়ে নানা জল্পনা চলছে। তবে রায় কার্যকর করা সম্ভব হোক বা না হোক, এই রায় যে তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে এবং কার্যত তাঁর রাজনৈতিক অধ্যায়ের ইতি টেনেছে এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে স্বৈরশাসকদের শেষ পরিণতি প্রমাণ করে যে, নির্যাতন আর অন্যায় কখনো স্থায়ী হয় না। মানুষের ভয় একসময় সাহসে পরিণত হয়, আর সেই সাহসেই গড়ে ওঠে শাসকদের শেষ অধ্যায়।তাই পৃথিবীর সকল শাসকদের ক্ষমতা টিকে থাকুক দায়িত্ব ও ন্যায়পরায়ণতার উপর, ভয় ও জুলুমের উপর নয়- এই কামনায় শেষ করছি বিশ্ব প্রান্তরের আজকের পর্ব।


