তবে যাওয়ার আগে তারা অভিশাপ দিয়ে যায় কুলধারাকে যে, “কুলধারায় কখনও কোন জনবসতি গড়ে ওঠবে না। কুলধারা সর্বদা জনশূন্য থাকবে।”
১৭ শতকের গভীর রহস্যের মধ্যে ডুবে থাকা একটি গ্রাম কুলধারা। এখানকার প্রতিটি বাড়ি, রাস্তা এমনকি ভাঙা মন্দিরও বলে দেয় অনন্ত অন্ধকারের গল্প। কুলধারা গ্রাম এখনও নিস্তব্ধ। তবে এই নিস্তব্ধতার মধ্যেই লুকিয়ে আছে এক অজানা রহস্য। আপনি কি প্রস্তুত সেই রহস্যে ডুব দেওয়ার জন্য?
কুলধারা গ্রামের অবস্থান
রাজস্থান ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম সুন্দর ও ঐতিহাসিক একটি রাজ্য। প্রাচীন কেল্লা, মহল, মরুভূমি এমনকি সমৃদ্ধ সংস্কৃতির জন্য রাজস্থান সারাবিশ্বে পরিচিত। তবে এই রাজ্যের মাঝেই লুকিয়ে আছে অজানা এক গ্রাম ‘কুলধারা’।
রাজস্থানের জয়সলমের শহর থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত কুলধারা গ্রামটি। ভৌতিক কাহিনি ও রহস্যময় ইতিহাসের জন্য গ্রামটি বিখ্যাত।
কুলধারার ইতিহাস
১২৯১ খ্রিস্টাব্দে পালিওয়াল ব্রাহ্মণ হিন্দুরা কুলধারা গ্রামটি প্রতিষ্ঠা করেন। কৃষি ও বাণিজ্য দক্ষতার জন্য পালিওয়াল ব্রাহ্মণদের খুব সুখ্যাতি ছিল। গ্রামটিতে বেশ কিছু বড় জমিদার বাড়ি সহ ঐতিহাসিক অনেক স্থাপত্য ছিল। সেই সময় কুলধারার আশপাশে আরও ৮৪ টি গ্রাম গড়ে ওঠে। সবকয়টি গ্রামই ছিল সমৃদ্ধ ৷ তবুও ১৮২৫ সালের দিকে এক পূর্ণিমা রাতে রহস্যময়ভাবে গ্রামবাসীরা উধাও হয়ে যায়।
কিন্তু কেন? এই উধাও হয়ে যাওয়ার পিছনে কারণ কি?
কুলধারার অজানা অতীত ও লোককথা
২০০ বছর আগে পরিত্যক্ত হওয়া গ্রামটির সাথে জড়িয়ে আছে নানা অদ্ভুত ঘটনা। কিংবদন্তী অনুসারে, জয়সলমের নিষ্ঠুর শাসক সালিম সিং এর কু নজর পরে গ্রাম প্রধানের মেয়ের ওপর। সালিম সিং গ্রাম প্রধানের মেয়েকে বিয়ের প্রস্তাব পাঠায়। কিন্তু, গ্রাম প্রধান বিয়েতে রাজি না হলে সে পুরো গ্রামবাসীর ওপর অত্যাচার শুরু করে। এমনকি তাদের ওপর বেশি কর চাপিয়ে দেওয়ারও হুমকি দেয়। অব্রাহ্মনের সাথে ব্রাহ্মণ মেয়ের বিয়ে কোন ভাবেই মেনে নিতে পারেননি গ্রামবাসীরা।
পরবর্তীতে আশেপাশের ৮৪ টি গ্রামের লোকজন একত্রিত হয়ে সিদ্ধান্ত নেয়, তারা কুলধারা ছেড়ে চলে যাবে। যেই বলা সেই কাজ, ব্রাহ্মণরা তাদের প্রিয় কুলধারা ছেড়ে চলে যায়। তবে যাওয়ার আগে তারা অভিশাপ দিয়ে যায় কুলধারাকে যে,
“কুলধারায় কখনও কোন জনবসতি গড়ে ওঠবে না। কুলধারা সর্বদা জনশূন্য থাকবে।”
তবে কুলধারাকে নিয়ে আরো একটি প্রচলিত লোককথা রয়েছে যে, গ্রামবাসীরা কুলধারা ছেড়ে চলে যাওয়ার সময় গ্রাম প্রধানের মেয়েকে খুন করে নদীর পাড়ে ফেলে রেখে যায়। মেয়েটির অতৃপ্ত আত্মা এখন ও কুলধারার আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়ায়।
যে কারণে পরিত্যক্ত হয়েছিল কুলধারা
ব্রাহ্মণদের চলে যাওয়ার পর বিভিন্ন সম্প্রদায়ের লোক জনপদ স্থাপনের জন্য কুলধারায় আসে। তবে, লোক মুখে শোনা যায় পরবর্তীতে যারা যেখানে বসতি স্থাপনের জন্য আসে তারা অনেক ভুতুড়ে অভিজ্ঞতা সম্মুখীন হয়। মাঝরাতে গা ছমছমে পরিবেশের মধ্যে দূর থেকে ভেসে আসে কান্নার আওয়াজ।
গ্রামবাসীরা সেখানে অদ্ভুত শক্তির উপস্থিতি অনুভব করে। পরবর্তীতে তারাও কুলধারা থেকে চলে যেতে বাধ্য হয়। কুলধারা পরিত্যক্ত হওয়ার পিছনে আরও একটি জনশ্রুতি প্রচলিত আছে। কুলধারা মরুভূমির মাঝে অবস্থিত হওয়ায় সেখানে প্রয়োজনীয় পানির অভাব ছিল। জীবিকা নির্বাহ কিংবা কৃষি কাজ করা গ্রামেবাসীদের জন্য কষ্টকর হয়ে পড়ে। খরা এবং কঠোর পরিবেশের জন্য গ্রামবাসীরা অন্যত্র চলে যায়।
অভিশাপ ও ভৌতিক ঘটনা এবং প্রতিকূল পরিবেশের কারণে ৮৬ বর্গকিলোমিটারের কুলধারা পরিত্যক্ত ও জনশূন্য থেকে যায়।
রহস্যময় ঘটনা ও অশুভ শক্তির উপস্থিতি
অদৃশ্য শক্তির চাদরে আচ্ছাদিত কুলধারা। জনশুন্য ধূ ধূ মরুর মাঝে এক অন্য রকমের অ্যাডভেঞ্চার। দিনের বেলা গ্রামের কিছু কিছু স্থানে লোকজনের বিচরণ থাকলে ও রাতের অন্ধকারে কি ঘটে সেখানে?
শুন্য কুলধারা রাতের আঁধারে অন্য রূপ ধারণ করে। আকাশের চাঁদ যখন পূর্ণ হয়ে ওঠে কুলধারা তখন অন্য দুনিয়ায় চলে যায়। হঠাৎ করে গ্রামের ওপর ভেসে ওঠে রহস্যময় আলো। রাতের অন্ধকারে গায়েবি হাওয়া আসা ও বাচ্চাদের নিখোঁজ হওয়া।
এগুলো কি শুধুই মানুষের কল্পনা নাকি রহস্য? কোন অশুভ শক্তির উপস্থিতি! কি বলে বিজ্ঞান?
বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা ( বাস্তবতা নাকি মিথ!)
বিজ্ঞানীরা এবং প্রত্নতাত্ত্বিকরা কুলধারা গ্রামটির রহস্য ব্যাখ্যা করতে একাধিক তত্ত্ব পেশ করেছেন। কিছু বিজ্ঞানী মনে করেন, গ্রামটি হয়তো এক ধরণের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের শিকার হয়েছিল। যার কারণে গ্রামের মানুষদের একত্রিতভাবে চলে গিয়েছিল।
অন্যরা বলছেন, সমাজিক, রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক কারণে সম্ভবত গ্রামটি পরিত্যক্ত হয়েছিল। এছাড়া, কিছু বিশেষজ্ঞ বলেন যে, গ্রামের কিছু স্থাপনা এবং তার নির্মাণশৈলী তাদের কাছেও রহস্যময় মনে হয়। বিশেষত, গ্রামের পুরানো মন্দির ও ঘরবাড়িগুলির ভগ্নাবস্থার পর, সেগুলির মধ্যে কিছু অতিপ্রাকৃত শক্তি থাকতে পারে।
কুলধারার পর্যটন আকর্ষণ
অতি প্রাকৃত ঘটনা ও রহস্যের জন্য কুলধারা পর্যটকদের কাছে বেশ আকর্ষণীয়। রাজস্থানের ট্যুরিজম কর্তৃপক্ষ এই স্থানকে পর্যটকদের জন্য সুগম করে দিয়েছে। অ্যাডভেঞ্চার প্রেমীরা লোমহর্ষক অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে কুলধারায় পাড়ি জমায়। আপনি কি রোমাঞ্চকর ভূতুড়ে অভিজ্ঞতা নিতে চান?
তাহলে রাজস্থানের জয়সলমীর থেকে ট্যাক্সি বা ব্যক্তিগত গাড়ি ভাড়া করে খুব সহজেই পৌঁছে যেতে পারবেন কুলধারায়। কুলধারায় গিয়ে প্রাচীন মন্দির, ধ্বংসপ্রাপ্ত ঘরবাড়ি দেখার পাশাপাশি এক রাতের ভূতুড়ে অভিজ্ঞতা ও নিতে পারবেন।
পর্যটকদের ভ্রমণ অভিজ্ঞতা
কিছু সাহসী পর্যটক কুলধারায় রাত কাটানোর জন্য যায়। কিন্তু কেউ সেখানে বেশিক্ষণ থাকার সাহস পায়নি। গ্রামটিতে প্রবেশ করলে অদৃশ্য শক্তির অস্তিত্ব অনুভূত হয়। কিছু সময় পর অস্থিরতা কাজ করে।
পর্যটকরা নানা ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করে গ্রামটির রহস্য উন্মোচনের চেষ্টা করেছে। তবে সেগুলো কখনোই সফল হয়নি। ড্রোন ক্যামেরা, থার্মাল ইমেজিং, এবং অন্যান্য আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ও গ্রামটির রহস্য উন্মোচন করতে পারেনি।
২০১০ সালে দিল্লির প্যারানরম্যাল সোসাইটির একটি দল এই গ্রামে এক রাত কাটানোর জন্য আসে। এখানে একাধিক ভৌতিক ঘটনা ঘটেছে বলেও দাবি করেছিলেন ওই দলের সদস্যরা। আর এই সব ঘটনা মিলিয়েই পাকাপাকিভাবে অভিশপ্ত গ্রামের তকমা লেগে যায় কুলধারা গ্রামের গায়ে। এক ধরনের অতিপ্রাকৃত শক্তি হয়তো এই গ্রামকে গ্রাস করেছে, যা মানুষ এবং প্রযুক্তি উভয়কেই হার মানিয়েছে।
কুলধারা গ্রামটি রাজস্থানের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এক অদ্ভুত ও রহস্যময় অধ্যায়। গ্রামটির প্রতি মানুষের আকর্ষণ কখনই কমবে না। গ্রামটির অতীত, অশুভ শক্তির উপস্থিতির ইতিহাসের এক রহস্যময় পর্ব হিসেবে আমাদের মনে রয়ে গেছে। গ্রামটির রহস্যময়তা ও রহস্যবোধ আজও অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
সূত্র
- https://www.anandabazar.com/ananda-utsav/travel-guide/know-the-history-of-the-haunted-village-kuldhara-in-rajasthan-dgtl-photogallery/cid/1473728?slide=4
- https://en.wikipedia.org/wiki/Kuldhara
- https://timesofindia.indiatimes.com/etimes/trending/the-lesser-known-story-of-kuldhara-the-ghost-village-of-india/photostory/10766626.cms