মাতৃতান্ত্রিক নয়, মাতৃসূত্রীয় পরিবার গারোদের
গারোরা বাংলাদেশ, ভারত এবং ভূটানের অসংখ্য জাতিস্বত্বার মধ্যে একটি আদিবাসী জাতি। তাঁদের নিজের আলাদা ভাষা ও অসম্ভব সুন্দর সংস্কৃতি রয়েছে। কিন্তু এর থেকেও আরও স্বতন্ত্র সৌন্দর্য বেশ কিছু বিষয় রয়েছে। তা হলো, তারা তাদের মা-বোনদের সমাজে সর্বোচ্চ সম্মান ও মর্যাদা দিয়ে থাকেন। মহিলারা তাদের সমাজে রাষ্ট্রপ্রধান বা রাষ্ট্রপতির মত, মেয়েরা রাজকন্যার মত।
আর পুরুষেরা? প্রাইম মিনিস্টারের মত! ভরণ – পোষণ, শাসন, বিচার কাজ সব তারাই করেন। ছেলেরা? তারা যেন এক একজন মন্ত্রী (চ্রা)! তারা পৃথিবীর অন্যান্য সমাজের চেয়ে এমন কি তাদের প্রত্যাশার চেয়েও অধিক বেশী দায়িত্ব এবং অধিকার ভোগ করেন! বলতে পারেন এইটাও তাদের সংস্কৃতির সৌন্দর্য! কিন্তু এখানেই শেষ নয়। আসল সৌন্দর্য অন্য কোথাও, অন্যকোন খানে!
গারোদের ইতিহাস ও সংগ্রাম
গারো আদিবাসীদের ইতিহাস শুরু হয়েছে খ্রিস্টপূর্ব ৪০০ সালে, চীনের তিব্বত অঞ্চল থেকে। তখন জাপ্পা জাল্লিম ফা, সুখ ফা ও বঙ্গি ফার নেতৃত্বে তাঁরা ব্রহ্মপুত্র নদী পার হয়ে মেঘালয়ের উপত্যকায় অস্থায়ী বসতি স্থাপন করেন। পরে মুঘল এবং ব্রিটিশদের সঙ্গে সংঘাতে তাঁদের অস্তিত্বের দৃঢ়তা ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে।
১৮০০ সালের আগের ব্রিটিশ রচনাগুলো গারোদের “রক্তপিপাসু বর্বর” এবং “অরণ্যে বসবাসকারী হেড হান্টার” হিসেবে চিত্রিত করত, যার অন্যতম প্রমাণ মেজর প্লেফেয়ারের ১৯০৯ সালের বিবরণ:
“The Garos were looked upon as blood thirsty savages, who inhabited a tract of hills covered with almost impenetrable jungle, the climate of which was considered so deadly as to make it impossible for a white man to live there”
১৮৭২ সালে ব্রিটিশ সরকার গারো হিলসে কর্তৃত্ব কায়েম করতে তিন দিক থেকে সেনা আক্রমণ চালায়। গারোরা অস্ত্রশস্ত্রে দুর্বল হলেও রংরেংগিরি দুর্গে বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করে। এই যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন সাহসী গারো যোদ্ধা পা টংগান এন সাংমা, যিনি গারো জাতির প্রথম শহীদ হিসেবে পরিচিত।
পরবর্তীতে পা সোনারাম সাংমা, এক গারো রাজনীতিক ও নেতা, ব্রিটিশ সরকারের চাকরি ত্যাগ করে গারোদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে যুক্ত হন। তাঁর নেতৃত্বে গারোরা নতুনভাবে সংগঠিত হয়। ব্রিটিশরা তাঁকে দমন করতে মামলা ও নির্যাতনের পথ বেছে নেয়। তিনি ১৯১৬ সালে প্রয়াত হন, তবে রেখে যান এক আত্মমর্যাদাশীল জাতির প্রতিরোধের ইতিহাস।
গারো জাতির শেকড়ের সন্ধানে
গারোরা একটি আদিবাসী জনগোষ্ঠী। যারা মূলত বাংলাদেশ ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ছড়িয়ে রয়েছে। ইতিহাসবিদদের মতে, গারো জাতির উৎপত্তি তিব্বত-বর্মা ভাষাগত পরিবারের অন্তর্ভুক্ত একটি শাখা থেকে। ভারতের মেঘালয় রাজ্যের গারো পাহাড় ও বাংলাদেশের ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, শেরপুর, টাঙ্গাইল অঞ্চলে এদের বসবাস। বাংলাদেশের জনসংখ্যা ও গৃহগণনা ২০১১ অনুযায়ী, প্রায় ১ লাখ গারো নাগরিক এ দেশে বসবাস করে।
ভারতের আসাম, গোয়ালপাড়া, ত্রিপুরা রাজ্য এবং গারো হিলসের মেঘালয় রাজ্যে আরো প্রায় ৬ লাখ গারো বাস করেন। কোচবিহার, দার্জিলিং এবং ওয়েস্ট বেংগাল এর দিনাজপুরে এবং ভূটানেও কিছু গারো আদিবাসী বাস করেন।
গারোরা নিজেদের মান্দি বলে পরিচয় দিতে ভালোবাসেন। ‘মান্দি’ শব্দের আক্ষরিক অর্থ ‘মানুষ’। তাঁরা নিজেদের ‘আচিক’ বলে পরিচিয় দিতেও পছন্দ বোধ করেন। ‘আচিক’ শব্দের অর্থ ‘পাহাড়ি মানুষ’। ‘উপজাতি’ বললে তাঁরা অপমানিত বোধ করেন।
গারো সমাজে পরিবার ছিল একটি মৌলিক প্রতিষ্ঠান, যেখানে বয়োজ্যেষ্ঠদের কথা শেষ কথা হিসেবে বিবেচিত হতো। সমাজে মাতৃকেন্দ্রিক উত্তরাধিকার প্রথা থাকায় মায়েরা পরিবারে নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করতেন, যা আজও তাদের এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য।
ধর্ম ও বিশ্বাসের ধারাবাহিকতা
গারোদের আদি ধর্ম “সাংসারেক” এক ধরনের প্রকৃতিপূজাভিত্তিক ধর্মবিশ্বাস, যেখানে পাহাড়, নদী, অরণ্য ও পূর্বপুরুষদের আত্মাকে শ্রদ্ধা করা হয়। তাদের মতে, প্রতিটি প্রাণী, গাছ, পাথর সবকিছুতেই আত্মা বা “চাকা” বসবাস করে। এই ধর্মবিশ্বাসে ‘মিসি সালজং’ নামের ফসল ও প্রাচুর্যের দেবতার পূজা অন্যতম। তারা বিশ্বাস করেন, পূর্বপুরুষের আত্মা পরবর্তী প্রজন্মের জীবন ও প্রাকৃতিক ভারসাম্যের সঙ্গে যুক্ত।
প্রতিটি মৌসুম, চাষাবাদ, মৃত্যু বা জন্মের মতো জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোর সঙ্গে জড়িত রয়েছে নানা প্রথা ও আচার। তবে বিশ শতকের গোড়া থেকে খ্রিস্টান মিশনারিদের প্রচারের ফলে বাংলাদেশের গারো সমাজে ব্যাপক ধর্মান্তর ঘটে। আজকের দিনে ৯০% গারো খ্রিস্টান, তবে অনেকেই সাংসারেক সংস্কৃতির ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন।
ভাষা ও ব্যাকরণ: এক জীবন্ত উত্তরাধিকার
গারো ভাষা সিনো-টিবেটান বডো ভাষার অন্তর্গত। যেহেতু তাদের নিজেদের স্বীকৃত, সার্বজনীন কোন লিখিত রূপ নেই, তারা বংশানুক্রমে তাদের সন্তানদের কাছে মুখে মুখে তাদের সমাজ, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, জীবন, বীরত্বগাথা এবং তাদের বোধ – বিশ্বাস সম্পর্কে তাদের প্রজম্মকে মুখে মুখে বলে থাকেন।
কথিত আছে, তিব্বেত থেকে গারো হিলস আসার পথে গারোরা তাদের লিখিত বর্ণমালা হারিয়ে ফেলেন। এ নিয়ে একাধিক গল্প প্রচলিত আছে। তবে জাহাঙ্গীনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের এক গারো ছাত্রের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশেই বর্তমানে ৮ রকমের গারো বর্ণমালা বিদ্যমান রয়েছে। এর সম্ভাব্য কারণ, গারোরা ঐ ৮ গবেষকের কারোর আবিষ্কৃত বর্ণমালায়ই আমলে নেননি! গবেষণায় এও দেখা গেছে ঐ ৮ জনের আবিষ্কৃত বর্ণমালাগুলোর সাথে একে অপরের আবিষ্কৃত বর্ণমালার উল্লেখ করার মত সাদৃশ্য দেখা যায় না।
গারোদের অনেক উপ-ভাষাও রয়েছে। তার মধ্যে আবেং, আত্তং, মেগাম, মাচ্ছি, দোয়াল, চিবক, চিসাক, গারা-গাঞ্চিং উল্লেখযোগ্য। ত্রিপুরাদের কক বরক ভাষার সাথে গারো ভাষার বেশ কিছু মিল পাওয়া যায়। গারো এবং ত্রিপুরা দুই সহোদর বোনের বংশধর বলে লোককাহিনী গারো সমাজে প্রচলিত রয়েছে।
প্রথমদিকে গারো ভাষা অলিখিত ছিল। কিন্তু মিশনারিরা রোমান হরফে লেখার ব্যবস্থা করেন এবং বাইবেল অনুবাদের মাধ্যমে লিখিত সাহিত্য গড়ে ওঠে। বর্তমানে গারো ভাষায় স্কুল পাঠ্যবই, গল্পগ্রন্থ এবং কিছু মৌলিক সাহিত্য রচনা হচ্ছে। গারো সাহিত্য এখন সামাজিক আন্দোলনের অংশ হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তবে আধুনিক প্রজন্মের মধ্যে ভাষা-চর্চার হার কমছে বাংলা ও ইংরেজির প্রভাব এবং শহরায়ণের কারণে অনেকেই মাতৃভাষা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। এ নিয়ে সম্প্রদায়ের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে এবং কিছু সংগঠন ভাষা সংরক্ষণে কাজ করছে।
উৎসব: আত্মপরিচয়ের উৎসারণ
গারোদের সবচেয়ে বড় উৎসব হলো ওয়ানগালা। এটি ফসল কাটার পর দেবতা সালজং-এর উদ্দেশ্যে ধন্যবাদজ্ঞাপন উৎসব। ঢোল, বাঁশি, মুখোশ, রঙিন পোশাক এবং ঐতিহ্যবাহী নৃত্যের মাধ্যমে গারো তরুণ-তরুণীরা অংশ নেয় এই উৎসবে। উৎসবের প্রধান আকর্ষণ ‘চাংগালা ড্যান্স’, যেখানে সারিবদ্ধভাবে ছেলেমেয়েরা হাত ধরে ছন্দের তালে তালে নৃত্য করে থাকেন।
তাছাড়া খ্রিস্টীয় উৎসব যেমন বড়দিন, ইস্টার, এবং গির্জাভিত্তিক বার্ষিক অনুষ্ঠানও পালন করে থাকে গারোরা। গির্জার আয়োজনে থিয়েটার, কোরাস গান ও সামাজিক খাবার ভাগাভাগির মধ্য দিয়ে ধর্ম ও সংস্কৃতির এক চমৎকার মেলবন্ধন ঘটে।
আরো আছে “দেন বেলা” বা পূর্বপুরুষদের স্মরণে প্রার্থনা, যেখানে পরিবার ও আত্মীয়রা একত্র হয়ে স্মৃতিচারণ করে।
গারো সমাজে নারীর অবস্থান: শক্তি, সম্মান ও সৌন্দর্যের ভারসাম্য
গারো সমাজের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো এর মাতৃতান্ত্রিক কাঠামো। তবে এই ব্যবস্থাকে একপেশে নারীপ্রধান মনে করলে ভুল হবে। এখানে নারী ও পুরুষ—উভয়ের ভূমিকাই পরস্পর-সম্পূরক এবং গঠনতান্ত্রিকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ।
বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই দুঃখজনকভাবে নিজেদের সমাজ, সংস্কৃতি, এবং ঐতিহ্য সম্পর্কে প্রায় অজ্ঞ। ফলে গারোদের সমাজব্যবস্থা সম্পর্কে ভুল ধারণা ও হতাশাও তৈরি হচ্ছে। একে শুধুই ‘মেয়েদের সম্পত্তির মালিকানা’ হিসেবেই দেখা হয়, অথচ এর পেছনে রয়েছে গোত্রভিত্তিক এক যৌথ মালিকানা ব্যবস্থা, যাকে বলা হয় “মাচং”। এখানে ব্যক্তিগত মালিকানা নেই, সম্পত্তির মালিক গোটা গোষ্ঠী। গারো নারীরা সেই সম্পত্তির ‘মালিক’ হিসেবে পরিচিত হলেও, আসলে তারা একজন রক্ষক ও ব্যবস্থাপক মাত্র। যদি কোনো নারী তাঁর দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হন, মাচং সেই সম্পত্তি অন্য নারীর হাতে ন্যস্ত করতে পারে।
বিয়ের ক্ষেত্রে গারো সমাজে ছেলেরা মেয়ের বাড়িতে গিয়ে সংসার শুরু করেন। কিন্তু এর মানে এই নয় যে তারা অসহায় বা দুর্বল অবস্থানে আছেন। বরং এই সাংস্কৃতিক রীতি মেয়েদের মতো ছেলেদেরকেও সম্মান দেয়। গারো সমাজে ব্যক্তি নয়, বরং গোত্র হলো মর্যাদার একক। ফলে একজন রিছিল অপমানিত হলে গোটা রিছিল গোষ্ঠী অপমানিত বোধ করেন; একজন নকরেক যদি ভালো কিছু করেন, গোটা নকরেক গোষ্ঠী গর্বিত হন।
বিয়ের কিছু মাস পরই নবদম্পতি পরিবার থেকে আলাদা হয়ে নতুন সংসার শুরু করেন। এই সময়টিকে প্রশিক্ষণকাল হিসেবে ধরা হয়। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ব্যবস্থা যা ছেলেমেয়েদের আত্মনির্ভরতা শেখায়।
যদিও গারো সমাজ মাতৃতান্ত্রিক, তবু বিচার-সালিশ, সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা, এমনকি সামাজিক নেতৃত্বে ছেলেরাই মূল চালিকাশক্তি। একে অনেকটা ‘ছায়া নেতৃত্ব’ বলা যায়—নারীর হাতে বাহ্যিক মালিকানা, পুরুষের হাতে কার্যকর প্রশাসন। এই কাঠামো নারীদের জন্য একপ্রকার সামাজিক নিরাপত্তা বলয় তৈরি করেছে, যেখানে তারা সম্মান, অধিকার ও সহমর্মিতার নিশ্চয়তা পায়।
এই অনন্য গারো সমাজ কাঠামো আজও একটি উদাহরণ হয়ে আছে, যেখানে নারীর ক্ষমতায়ন ও পুরুষের দায়িত্বশীলতা একে অপরের পরিপূরক। এটাই গারো সংস্কৃতির অন্যতম সৌন্দর্য—নামমাত্র অধিকারের চেয়ে গভীরতর এক সামাজিক ভারসাম্যের গল্প।
জীবনধারা ও খাদ্যাভ্যাস
গারোদের জীবন প্রাকৃতিক নির্ভর। বনজ সম্পদ, জুম চাষ, মাছ ধরা, মৌচাক সংগ্রহ তাদের জীবিকার প্রধান উৎস। তাদের খাদ্যতালিকায় রয়েছে চাল, শাকপাতা, বাঁশকোরল, হাঁস-মুরগি, শুকরের মাংস ও দেশি পানীয়। তারা অ্যালকোহল জাতীয় পানীয়ও তৈরি করে সামাজিক বা ধর্মীয় অনুষ্ঠানে ব্যবহার করে।
পানীয়টির নাম “চা রপা”—এটি চাল ও গাঁজন করা বিভিন্ন গাছগাছড়ার মিশ্রণে তৈরি। এ পানীয় খাওয়ার রীতি, পরিবেশন এবং পান করার প্রক্রিয়াও উৎসবমুখর।
তাদের পোশাক সাধারণত হাতবোনা, রঙিন ও সরল নকশার। নারীরা পরে “ধাকমান্ডা” এবং পুরুষেরা পরে “গামছা” ধরনের ঢিলেঢালা কাপড়। বাসস্থান কাঠ ও বাঁশ দিয়ে নির্মিত, পাহাড়ি ঢালু অনুযায়ী তৈরি। বাড়ির নিচে পাথর বা বাঁশের খুঁটি ব্যবহার করা হয় বন্যা ও সাপ থেকে বাঁচার জন্য।
শিক্ষা ও আধুনিকতা
খ্রিস্টান মিশনারিরা গারোদের মধ্যে প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রচলন করেন। বর্তমানে গারোদের মধ্যে শিক্ষার হার অন্যান্য আদিবাসী জনগোষ্ঠীর তুলনায় বেশি। অনেক গারো তরুণ-তরুণী বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পড়াশোনা করে সাংবাদিকতা, শিক্ষকতা, প্রশাসন ও সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজে যুক্ত হচ্ছেন।
তবে আধুনিক জীবনধারার সঙ্গে সঙ্গে তাদের ঐতিহ্যগত জীবনও দ্রুত বদলে যাচ্ছে—এটি যেমন অগ্রগতি, তেমনি কিছু সংকটের পূর্বাভাসও বটে। শিক্ষিত যুবসমাজ গ্রামে ফিরতে চায় না, ফলে অনেক জ্ঞান ও সংস্কৃতি বিলুপ্তির পথে।
ভারত ও বাংলাদেশের গারোদের পার্থক্য
মেঘালয়ের গারোরা সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত “স্বতন্ত্র জাতিগোষ্ঠী” হিসেবে অধিক রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার ভোগ করে। তাদের নিজস্ব স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল আছে, যেখানে স্থানীয় সিদ্ধান্তগুলো নিজেরাই নিতে পারে। মেঘালয়ে গারো ভাষা স্কুল, মিডিয়া ও সাহিত্যচর্চায় প্রতিষ্ঠিত।
বাংলাদেশে গারোদের সাংবিধানিক অধিকার কিছুটা সীমিত, তবে বেসরকারি ও এনজিও পর্যায়ে উন্নয়ন কার্যক্রম চোখে পড়ার মতো। ধর্ম ও ভাষায় মিল থাকলেও প্রশাসনিক ব্যবস্থায় পার্থক্য স্পষ্ট। তবুও দুই দেশের গারোদের মধ্যে আত্মীয়তা, উৎসব ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।
শেষ কথা: ঐতিহ্য, সংগ্রাম ও ভবিষ্যৎ
গারো জাতি শুধু একটি জনগোষ্ঠী নয়, এটি একটি জীবন্ত ইতিহাস, একটি সংস্কৃতি, একটি জীবনদর্শন। তাদের ভাষা, বিশ্বাস, উৎসব ও নারীতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা আমাদের সমাজের জন্য এক অনন্য শিক্ষা। উন্নয়নের ছোঁয়া যেন তাদের সাংস্কৃতিক শিকড় না মুছে ফেলে সেদিকে তারা সতর্ক।
আদিবাসী জনগোষ্ঠী হিসেবে গারোদের জীবন সংগ্রাম এবং স্বকীয়তা রক্ষা করা রাষ্ট্র, সমাজ ও নাগরিক সকলের দায়িত্ব। তাদের গল্প আসলে আমাদেরই গল্প, ভিন্ন এক ভাষায় বলা, পাহাড়ের ঢেউয়ে লেখা।