৩০৯ বছর… একটি গভীর ঘুম… একটি রহস্যময় গুহা… এবং একটি কুকুর! এই ঘটনাটি শুধু একটি কাহিনী নয় বরং এটি একটি অলৌকিক নিদর্শন। এটি পবিত্র কোরআনে বর্ণিত সবচেয়ে রহস্যময় ও চমকপ্রদ ঘটনাগুলোর মধ্যে একটি। এটি হলো আসহাবে কাহাফ বা গুহাবাসীদের কাহিনী।
এক অত্যাচারী রাজা, যার সামনে মাথা নত করতে অস্বীকার করলেন সাত যুবক। তাদের ঈমানের দৃঢ়তা এতটাই প্রবল ছিল যে, তারা মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়েও পালিয়ে গেলেন একটি গুহায়। কিন্তু কী ঘটেছিল সেখানে? কীভাবে তারা ৩০৯ বছর ঘুমিয়ে থাকলেন? আর কি সেই কুকুরের কাহিনী, যে গুহার মুখে পাহারা দিচ্ছিল? কুরআনে এই কুকুরটির কথা চারবার উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু কেন?
এই লেখায় আমরা আসহাবে কাহাফ সম্পর্কে এমনই অজানা প্রশ্নের উত্তর খুঁজবো।
আসহাবুল কাহফ কারা
আরবি ‘আসহাবুল কাহফ’ শব্দের অর্থ গুহাবাসী। পবিত্র কোরআনে একদল বিদ্রোহী যুবকদের আসহাবুল কাহফ বলা হয়েছে। যাঁরা একজন খোদাদ্রোহী অত্যাচারী শাসকের হাত থেকে বাঁচতে এবং নির্বিঘ্নে আল্লাহর ইবাদত করতে পাহাড়ের গুহায় আশ্রয় নিয়েছিলেন।
মূল ঘটনা জানতে হলে ফিরে যেতে হবে ইসলাম পূর্ব যুগে।
আসহাবে কাহাফ যে স্থানে ঘটেছিলো
আসহাবে কাহাফের কাহিনী শুধু মুসলিমদের কাছে নয়, বরং খ্রিস্টানদের কাছেও একটি খুব জনপ্রিয় ও অলৌকিক ঘটনা। এই ঘটনা কোথায় ঘটেছিল, তা নিয়ে দুটি মত রয়েছে।
বেশিরভাগ মুফাসসির মনে করেন, এটি জর্ডানের প্রাচীন নগরী পেত্রায় ঘটেছিল। আবার কেউ কেউ তুরস্কের ইজমিরকেও উল্লেখ করেছেন।
আসহাবে কাহাফ এর গল্প
সে সময় এক অঞ্চলের মানুষেরা আল্লাহ তা’লাকে ভুলে মূর্তি পূজায় লিপ্ত ছিল। তারা নিজেদের তৈরি কাঠ-পাথরের মূর্তিকে মা’বুদ মনে করে পূজা করত। তবে, সেখানে সাতজন ধর্ম প্রাণ যুবক ছিল যারা এই মূর্তি পূজাকে কোনভাবেই মেনে নিতে পারছিল না। তাদের মনে প্রশ্ন জাগলো যে, হাতে গড়া মূর্তির ইবাদত করা কিভাবে সম্ভব? মহান আল্লাহর পরিবর্তে কাঠ কিংবা পাথরের মূর্তি কি কখনো তাদের মা’বুদ হতে পারে? এ ধরনের প্রশ্ন তাদের হৃদয়কে কাঁপিয়ে তুললো।
এরপর একদিন, তারা সবাই একে অপরের কাছে তাদের সন্দেহ এবং বিশ্বাসের কথা প্রকাশ করল। তারা বুঝতে পারল, তাদের দ্বীন তো আল্লাহরই। কিন্তু তখনই, তাদের মনে এক ভয়াল চিন্তা ঘুরপাক খেতে শুরু করলো; তারা অত্যাচারী রাজা দাকইয়ানুসের কথা ভেবে তারা শঙ্কিত হয়ে পড়ল। দাকইয়ানুস তার রাজ্যে সবাইকে মূর্তি পূজা করতে বাধ্য করতো, এবং কেউ এর বিরোধীতা করলে তার প্রাণনাশ করতে একবারও ভাবতো না।
এক সময়, রাজা যুবকদের নতুন ধর্ম গ্রহণের কথা জানতে পারলেন। তিনি রেগে গিয়ে তাদের রাজ দরবারে নিয়ে আসলেন। রাজা তাদের ওপর প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হয়ে তাদের মাথা বিচ্ছিন্ন করার হুমকি দিলেন। কিন্তু, তাদের ঈমান এতই শক্তিশালী ছিল যে, তারা এতটুকুও ভয় পেলো না। তারা জানতো, তাদের সাথে রয়েছে একমাত্র রক্ষাকর্তা মহান আল্লাহ তায়ালা।
আর তাই, তারা সফর সামগ্রী প্রস্তুত করে নিজ দেশ ছেড়ে এক অজানা পথের উদ্দেশ্যে হিজরত শুরু করলেন। পথ চলতে চলতে এক সময়, একটি কুকুর তাদের সাথী হয়ে গেল। কুকুরটি তাদের সাথে একই পথে চলতে চলতে ভালবাসার বন্ধনে আটকে গেল এবং তাদের প্রহরী হওয়ার দায়িত্ব পালন করতে শুরু করলো।
এরপর ঘটল সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনা! আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে এমন এক গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন করে দিলেন যে দেখতে দেখতে ৩০৯ বছর পেরিয়ে গেল। কী আশ্চর্য, এত বছর পেরিয়ে গেলো অথচও একবারও তাদের ঘুম ভাঙেনি! এই ঘুম কীভাবে সম্ভব? এমনকি, তাদের শরীরেও কোনো ধরনের পরিবর্তনও ঘটেনি। আর এই সমস্ত সময় ধরে, তাদের একমাত্র সঙ্গী, সেই বিশ্বস্ত কুকুরটি গুহার মুখে নিঃশব্দে পাহারা দিচ্ছিল।
আরো আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, ৩০৯ বছর পর যখন তারা ঘুম থেকে উঠলেন, তারা ভেবেছিলেন মাত্র একদিন ঘুমিয়েছেন। কিন্তু তারা শহরে গিয়ে দেখলেন সবকিছু বদলে গেছে! তাদের পুরনো মুদ্রাও এখন অচল। লোকেরা তাদের দেখে অবাক হয়ে গেল। তারা বুঝতে পারলেন, আল্লাহ যে তাদেরকে জাগিয়ে তুলেছেন, এটি আল্লাহর একটি অলৌকিক নিদর্শন ছাড়া আর কিছুই না।
আসহাবে কাহাফের কুকুর রহস্য
এবার একে একে কয়েকটি বহুল আলোচিত প্রশ্নের দিকে নজর দেয়া যাক। কুকুরটি সম্পর্কে কোরআনে কী বলা হয়েছে এবং এর বৈধতা নিয়ে কেন এত তর্ক বিতর্ক? আসহাবে কাহফের কুকুরটি ইসলামী জ্ঞানচর্চায় একটি আলোচিত বিষয়। কোরআনে আসহাবে কাহফের কুকুরটির কথা মোট চারবার উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে, এ বিষয়ে কিছু বিতর্কও রয়েছে। কিছু মুফাসসির বলেছেন, আরবি ‘কালব’ শব্দটি বাঘের জন্যও ব্যবহৃত হতে পারে, তাই তারা কুকুরের বদলে বাঘের কথা বলেছেন। কিন্তু, অধিকাংশ মুফাসসির এটিকে বাঘ নয়, বরং, কুকুর বলে দাবি করেছেন।
এবার আসা যাক, আরেকটি প্রশ্নের দিকে। কুকুরটি কি আসলেই জান্নাতে যাবে? তাফসির গ্রন্থে, খালেদ ইবনে মাদান (রহ.)-এর উদ্ধৃতিতে বলা হয়েছে, “আসহাবে কাহফের কুকুর এবং বালআম বাউরের গাধা ছাড়া কোনো চতুষ্পদ জন্তু জান্নাতে যাবে না।”
তবে, এ বিষয়ে কোরআন বা হাদিসে সরাসরি কোনো উল্লেখ নেই, এমনকি এ ব্যাপারে কোনো সাহাবির বক্তব্য সহিহ সনদে পাওয়া যায় না। ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, জান্নাতে কেবল মানুষ ও জিনই প্রবেশ করবে, এবং অন্যান্য সৃষ্টির হিসাব-নিকাশ পরবর্তীতে আল্লাহর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী হবে।
ঘটনার স্থান নিয়ে যতই মতবিরোধ থাকুক না কেন, এই ঘটনা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, বিশ্বাস এবং ইতিহাসের সম্পর্ক কতটা গভীর। সৃষ্টিকর্তার প্রতি আমাদের বিশ্বাস সব সময় অটুট থাকুক, এই কামনাই নিয়ে শেষ করছি বিশ্ব প্রান্তরের আজকের পর্ব।
চিকিৎসা বিজ্ঞানে মুসলিমদের অবদান- সার্জারি থেকে মৃতদেহ সংরক্ষণ