Image default
ইতিহাসইতিহাস ১০১

পুরান ঢাকার জমজমাট সাকরাইনঃ ধর্মীয় থেকে সার্বজনীনতার গল্প

সাকরাইনের ইতিহাসের সাথে হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি যোগসূত্র থাকলেও এই উৎসব শুধুমাত্র হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের জন্য নয়। ইতিহাস থেকে এটাও জানা যায় যে, মোঘল আমলে, ১৭৪০ সালে, পৌষ মাসের শেষ দিনে, নায়েব-ই-নাজিম নওয়াজেশ মোহাম্মদ খানের আমলে ঘুড়ি উড়ানোর প্রচলন হয়েছিলো।

বাংলাদেশ পালা পার্বণের দেশ। এখানে বারো মাসে তেরো পার্বণ চলে। এমনই একটি পার্বণ হলো পৌষ সংক্রান্তি বা সাকরাইন বা ঘুড়ি উৎসব। প্রতিবছর শীতকালে,জানুয়ারির মাঝামাঝিতে ছেলে-বুড়ো সকলের অংশগ্রহণে, আড়ম্বরে বাংলাদেশে পুরান ঢাকায় উদযাপিত হয়ে থাকে এই উৎসব।

সাকরাইনের ইতিহাস

সাকরাইন শব্দটি সংস্কৃত শব্দ ‘সংক্রাণ’ থেকে উদ্ভূত। এর অর্থ, ‘বিশেষ মুহূর্ত’। অর্থাৎ, বিশেষ মুহূর্ত উপলক্ষে যে উৎসব পালিত হয় তাই হলো সাকরাইন। সৌর পঞ্জিকা অনুসারে, পৌষ মাসের শেষ দিনে সূর্য অর্থাৎ সূর্য দেবতা মকর রাশিতে আসে এবং দক্ষিণমুখী যাত্রা করে কর্কটক্রান্তির দিকে অগ্রসর হয়। তৎকালীন কৃষিপ্রধান সমাজের অন্যতম প্রধান আরাধ্য দেবতা ছিলেন সূর্যদেবতা। ভালো ফসলের জন্য সূর্যদেবতার পূজা করার নিয়ম ছিলো। সূর্যদেবতার দিক পরিবর্তন তাই প্রাচীনকালে ধুমধাম করে, রং-বেরঙের ঘুড়ি উড়িয়ে উদযাপন করা হতো। 

সেই থেকে আজ অবধি পৌষ মাসের শেষ দিনে আয়োজন করা হয় এই উৎসবের। সূর্য মকর রাশিতে এসে থামে বলে এটাকে ‘মকর সংক্রান্তি’ ও বলা হয়। বাংলাদেশের পুরান ঢাকা এবং প্রতিবেশী অন্যান্য দেশে নির্দিষ্ট অঞ্চলভিত্তিক নিজস্ব সাংস্কৃতিক ধাঁচে এই উৎসবটি পালন করা হয়।

বাংলাদেশে সাকরাইন ভারতে মকর সংক্রান্তি 

সাকরাইন উৎসব যেমন আমাদের কাছে পরিচিত তেমনি ভারতীয়দের কাছে এটি ‘মকর সংক্রান্তি’ নামে পরিচিত। মকর সংক্রান্তি একটি প্রাচীন ভারতীয় সৌর উৎসব। বর্তমানে ভারতের বহু রাজ্যে ভিন্ন নামে এই দিনটি উদযাপিত হয়। বৈদিক মতে, যে সময়ে সূর্য মকরক্রান্তিতে প্রবেশ করে সেই সময়টি হয় আধ্যাত্মিক, পূণ্য সাধনার সময়। 

ভারতে মকর সংক্রান্তিতে গঙ্গা স্নান

এ সময় সূর্যদেবতা ছাড়াও বিষ্ণু ও লক্ষী দেবীর পূর্জা অর্চনা করা হয়। পাপমুক্তির জন্য বিশেষ আরাধনা (পূণ্যস্নান) এর রীতিও রয়েছে এ তিথিতে। এ সময়টায় পঞ্চনদী (গঙ্গা, গোদাবরী, যমুনা, কৃষ্ণা ও কাবেরী)তে স্নান করে, সূর্যদেবতাকে প্রণাম জানিয়ে পাপমোচনে ব্রতী হোন সকল ভক্ত। এছাড়াও মকর সংক্রান্তিতে বিভিন্ন স্থানে গ্রাম্য মেলা, পিঠা-পুলি ও মিষ্টান্নর আয়োজন করা হয়।

মকর সংক্রান্তি মূলত ভারতীয়দের জন্য একটি ধর্মীয় উৎসব বটে! সেখানে ধর্মীয় অনুশাসন মোতাবেক উদযাপিত হয় এই দিনটি।

এশিয়ায় সাকরাইনের আরও নাম 

খোদ ইন্ডিয়াতেই একাধিক নামে পরিচিত এই সাকরাইন। যেমন: খিচারি (অন্ধ্রপ্রদেশ), পোঙ্গাল(তামিল নাড়ু), মাঘ বিহু(আসাম), মাঘি সাযি(হিমচল), দাহি চুরা(বিহার), শিশুর সেনক্রাথ(কাশ্মীর)ইত্যাদি।

এছাড়া নেপালে ‘মাঘে সংক্রান্তি’, থাইল্যান্ডে ‘সংক্রান’, মিয়ানমারে ‘থিঙ্গইয়্যান’, কম্বোডিয়ায় ‘মহান সংক্রান’ নামে এশিয়া জুড়ে উদযাপিত হয় পৌষ সংক্রান্তি বা আমাদের ভাষায়, সাকরাইন। 

সাকরাইন কি শুধু হিন্দু সম্প্রদায়ের উৎসব

সাকরাইনের ইতিহাসের সাথে হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি যোগসূত্র থাকলেও এই উৎসব শুধুমাত্র হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের জন্য নয়। ইতিহাস থেকে এটাও জানা যায় যে, মোঘল আমলে, ১৭৪০ সালে, পৌষ মাসের শেষ দিনে, নায়েব-ই-নাজিম নওয়াজেশ মোহাম্মদ খানের আমলে ঘুড়ি উড়ানোর প্রচলন হয়েছিলো। এরপর থেকে সাকরাইন উৎসব আর নির্দিষ্ট ধর্মাবলম্বীদের জন্য সীমাবদ্ধ থাকেনি। 

বর্তমানে আমরা সেই ঘুড়ি উৎসবেরই সিলসিলা দেখতে পাই পুরান ঢাকায়। পুরান ঢাকার মানুষেরা ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলে মিলেই উদযাপন করে এই ঘুড়ি উড়ানোর উৎসব।

যেভাবে পালিত হয় সাকরাইন

এই দিনে রঙ-বেরঙের ঘুড়ি উড়ানো হয়। পুরো আকাশ ছেয়ে যায় রঙ-বেরঙের এসব ঘুড়িতে। ছেলে থেকে বৃদ্ধ সবাই মেতে উঠে এই ঘুড়ি উড়ানোর উৎসবে। এরই মাঝে একটা ছোট্ট প্রতিযোগিতাও হয়ে যায় যে, কার ঘুড়ি কতগুলো ঘুড়িকে কেটে উপরে উঠতে পারে। জমাজমাট উত্তেজনাপূর্ণ এই প্রতিযোগিতায় আছে চ্যাম্পিয়ন, রানার্স আপ নির্ধারণ। কি যে জাঁকজমকপূর্ণ হয় এই পুরস্কার বিতরণী সংবর্ধনা! যার ঘুড়ি যত জনকে কাটতে পারবে এবং শেষ পর্যন্ত উড়বে, সে হবে চ্যাম্পিয়ন। এই আনন্দে সবাই শরীক।

এরপর সন্ধ্যার পর আতশবাজি ফোটানো হয় পুরো আকাশ জুড়ে। একেক রঙের একেক আলোর বিন্দুতে আকাশ হয়ে উঠে এক চিত্রপট। এ অসাধারণ দৃশ্য উপভোগ করতে সব পরিবারে আত্মীয় স্বজনেরও হিড়িক পড়ে যায়। বাড়িতে বাড়িতে চলে তাই পিঠা-পুলি পরিবেশন। স্বজন-পড়শী মিলে সকলের উৎসব হয়ে উঠে এই সাকরাইন উৎসব।

কেমন হয় পুরান ঢাকার সাকরাইন উৎসব

ঘুড়ি উড়ানো

বাংলাদেশে মকর সংক্রান্তি নাম বদলে সাকরাইন নামে সমাদৃত হবার কারণে এ ই উৎসব নিজেকে ধর্মীয় আবরণ থেকে নিজেকে মুক্ত করেছে। এখানকার উৎসবে ধর্মীয় অনুশাসন নেই। এটা পুরান ঢাকার নিজেদের উৎসবই বলা যায়। পুরান ঢাকার প্রায় সবটা জুড়ে চলে এই উৎসব। তবে এই আয়োজনের আমেজ লক্ষীবাজার, সূত্রাপুর, গেন্ডারিয়া, সদরঘাট, ধোলাইখাল, ইসলামপুর হাজারীবাগ, নবাবপুর, তাঁতিবাজার এলাকায় বেশি দেখা যায়। 

সাকরাইন উৎ​সবে দুই তরুণী’র ঘুড়ি ওড়ানো

প্রতিবছর এ সময়ে উক্ত এলাকার দোকানপাট ভরে যায় রঙিন ঘুড়ি তে। প্রায় ভোর থেকেই শুরু হয় ঘুড়ি নিয়ে উন্মাদনা। প্রতিটি দোকানে বেচাকেনাও চলে জমজমাট। এজন্য অনেক চা ওয়ালা, সবজি বিক্রেতাও সিজনাল ব্যবসা হিসাবে এ সময় ঘুড়ি বিক্রি করা শুরু করেন। সকলের মুখে থাকে আমেজ আমেজ ভাব। দুপুর থেকে শুরু হয় নানা গঠন, রঙের, সাইজের ঘুড়ি উড়ানো। সকলে মিলে টানটান উত্তেজনার সাথে ঘুড়ি উড়ায়। কে কার ঘুড়ির সুতা কাটতে পারলো, কে কতদূর ঘুড়ি নিয়ে যেতে পারলো এসব আনন্দে প্রতিটি ঘুড়ির সাথে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে মানুষের উচ্ছ্বাস।

আতশবাজি ফোটানো

এরপর সন্ধ্যার পর শুরু হয় ছাদে ছাদে উঠে আতশবাজি ফোটানো। এই সময় সন্ধ্যার অন্ধকার আকাশ আলোকিত হয়ে যায় আতশবাজিতে। সেই সাথে উড়ানো হয় রঙবেরঙের ফানুশ। কলরবে, উচ্ছ্বাসে, আমোদে সকলে এই ঐতিহ্য উপভোগ করে।

আগুন খেলা

এইসময় তরুণরা মুখে কেরোসিন নিয়ে জ্বলন্ত আগুনে তা মুখ থেকে নিক্ষেপ করে।

মুখ থেকে আগুন অবধি আগুন দলায় পরিণত হয়। এটা ‘আগুন খেলা’ নামে সমাদৃত। এই কাজটায় বালক-বৃদ্ধদের দেখা যায় না। তরুণরাই উৎসাহের সাথে করে এটা।

সাকরাইন উৎ​সবে আগুন খেলা

ডিজে পার্টি

পুরান ঢাকার ঘুড়ি উৎসবে অতি সম্প্রতি যোগ হয়েছে নতুন জিনিস। রাতে বাড়ির ছাদে ছাদে আনা হয় প্রফেশনাল ডিজে। এভাবে রাতভর চলতে থাকে বলিউডের সব হিট হিট গান এবং তার সাথে হৈ-হুল্লোড়।

উৎসব মানেই তা আনন্দ আনে। পুরান ঢাকায় সাকরাইনের ঐতিহ্য এভাবেই মিলিত হয়েছে আধুনিকতার সাথে। আনন্দের ফুল প্যাকেজ নিশ্চিত করতে এখানে কতক সংগঠনও গড়ে উঠেছে। যেমন— এক্সটিসি, গোল্ডেন কাইটার, মাঞ্জা ইত্যাদি। এসব মহল্লাভিত্তিক সংগঠন ছাদে ছাদে ঘুড়ি ওড়ানো, বিনোদনের ব্যবস্থা করে।

সাকরাইন উৎ​সবে ডিজে পার্টি

সাকরাইনের ঘুড্ডিনামা

সাকরাইন উৎসবে বিভিন্ন প্রকারের ঘুড্ডি বা ঘুড়ি’র পসরা সাজিয়ে রাখা হয় দোকানে দোকানে। বিভিন্ন ডিজাইনের ঘুড়ি পাওয়া যায়। এইসব ঘুড়িরও রয়েছে সুন্দর সুন্দর সব নাম। যেমন—  পানদার, মাসদার, গরুদান, কয়ড়া, লেজ লম্বা, চারভুয়াদার, গায়েল ইত্যাদি।

সাধারণ ঘুড়ির দাম এখানে ৫-২৫ টাকা অবধি। আর ডিজাইন করা ঘুড়ি ১৫০-৬০০ টাকায় পাওয়া যায়।

পুরান ঢাকার ঘুড়ির দোকান

বিভিন্ন জিনিস দিয়ে তৈরি ঘুড়ি ও পাওয়া যায়। যেমন— কোনটা হয় বাহারি রঙের কাগজ দিয়ে তো কোনটা হয় পাতলা বাঁশ দিয়ে, নয়তো পলিথিন দিয়ে তৈরি হয় ঘুড়ি। আর প্রতিটা ঘুড়ির সঙ্গে থাকে ‘নাটাই’ (নাটাই দিয়ে ঘুড়ি নিয়ন্ত্রণ করা হয়)।

এছাড়াও নাটাই এবং ঘুড়ির মধ্যে সম্মন্ধকারী সুতাও পাওয়া যায় বিভিন্ন রকম ও রঙের। যেমন— রক সুতা, ক্লাক ডেভিল, ডাবল গান, ব্ল্যাক গান, কিংকোবরা, সম্রাট, লালগান, টাইগার, মানজা, বর্ধমান ইত্যাদি।

সাকরাইনের খাবার

সাকরাইন উৎসব হয় পৌষ মাসের শেষ দিন। অর্থাৎ জানুয়ারির মাঝামাঝি। তো এই সময় থাকে কড়া শীত। এই শীত ও সাকরাইন দুইটা মিলেই বাড়ি বাড়ি বিভিন্ন ধরনের পিঠা-পুলির ধুম পড়ে যায়। 

এছাড়াও এলাকাভেদে বিখ্যাত খাবার রান্না করা হয়। যেমন— পুরাণ ঢাকার ঐতিহ্য হিসাবে কাচ্চি,ভেজা বাকরখানি এবং বিভিন্ন ধরণের মিষ্টি পরিবেশন করা হয়।

সাকরাইন ঐতিহ্যের সামাজিক গুরুত্ব

তথ্য-প্রযুক্তির এ যুগে সবকিছুই হাতের নাগালে। চাইলেই প্রিয়জনদের সাথে দূরে থেকেও কানেক্টেড থাকা যায়। কিন্তু প্রযুক্তি মানুষে মানুষে যে নিবিড়, আত্মার বন্ধন সেটা দিতে পারে না। এই দূরত্ব কমাবার সাধ্য প্রযুক্তির নেই। তাই কর্মব্যস্ত জীবনে প্রতিটি মানুষই চায় পরিবার-পরিজনদের সান্নিধ্য। এক্ষেত্রে প্রতিটা উৎসব যেন একেকটা সুযোগ মানুষকে মানুষের কাছে টানার। 

তবে, সাকরাইন উৎসব উপলক্ষ্যে আশির দশকে লোকগীতি, পল্লিগীতি গানের আসর বসতো। ছাদে ছাদে বসানো হতো মাইক। এখন ডিজে পার্টি চলে। তরুন সমাজ এখানে যুক্ত করেছে রঙ খেলা, বলিউড গানে নাচানাচি, হৈ-হুল্লোড় ইত্যাদি।

আমাদের সংস্কৃতি বদলাচ্ছে। কিন্তু একটা সুহ্ম দিক এখানে দেখা যায় যে, তখনও মানুষ মানুষের সান্নিধ্য উপভোগ করতো; আজও করে। উদযাপনের তরিকা বদলেছে শুধু। সাকরাইন উপলক্ষে প্রতিটি মহল্লার পরিবার, আত্মীয়, পড়শিদের একে অপরের মাঝে যে আত্মিক মেলবন্ধন তৈরি হয় এটাই এর সামাজিক তাৎপর্য।

সাকরাইন উদযাপনে সতর্কতা

উৎসব-অনুষ্ঠান আসে মানুষের মনকে প্রশান্তি দেবার জন্য। কিন্তু এই উৎসব উদযাপনের নামে যদি মাত্রাতিরিক্ত বাড়াবাড়ি হয় তা সকলের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। রাতভর আতশবাজি ফোটানো শিশু, বৃদ্ধ এবং অসুস্থ মানুষের জন্য আনন্দদায়ক হয় না। তারা এতে কষ্ট বোধ করেন।

এছাড়াও পুরান ঢাকায় ঘিঞ্জি বসতির মাঝে ‘আগুন খেলা’ ক্ষণিকেই রূপ নিতে পারে ভয়াবহ দুর্ঘটনায়। একটু অসাবধানতায় পুড়ে ছাই হয়ে যেতে পারে পুরো এলাকা।

আবার, ডিজে অনুষ্ঠানের আয়োজন, এর থেকে সৃষ্ট শব্দ দূষণ কোন সভ্য সংস্কৃতির প্রকাশ হতে পারে না।

 সাকরাইন উৎসব বাঙালির নিজস্ব উৎসব। এটাকে বাঙালির ঐক্য ও বন্ধুত্বের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। এ উৎসবকে সুন্দরভাবে ধারণ করা আমাদের দায়িত্ব।

সোর্স:

Related posts

ভালোবাসা দিবসের সাতকাহন

“ডেটিং অ্যাপ: ভালবাসার ডিজিটাল ঠিকানা”

নির্বাচনের ইতিহাস- এথেন্স থেকে AI

Leave a Comment

Table of Contents

    This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More