Image default
ইতিহাসইতিহাস ১০১

ব্রেসিয়ারের ইতিহাস – নারীর সৌন্দর্য ও আত্মবিশ্বাসের চিরকালীন সঙ্গী

“ব্রা, এটা কি শুধুই একটি পোশাক, নাকি এটি নারী শরীরের এক অজানা আবেদন?”

ব্রা আসলে কী? এটা কি কেবলই একটি পরিধেয়? নাকি যৌবন ধরে রাখার মাধ্যম? প্রাচীন কাল থেকে নারীদের প্রয়োজন মেটাতে এটি কি শুধুমাত্রই একটি কাপড়ের টুকরো? নাকি এর পেছনে রয়েছে যুগ যুগ ধরে চলে আসা নারী সংগ্রামের ইতিহাস? 

নারীর সৌন্দর্য ধরে রাখার করুণ চেষ্টা থেকে শুরু করে, নারী স্বাধীনতার প্রতীক হয়ে ওঠা পর্যন্ত ব্রা এর ইতিহাস বৈচিত্র্যময়। সেই প্রাচীন গ্রীস এবং রোমান যুগ থেকে শুরু করে আধুনিককালের “ব্রা বার্নিং” আন্দোলন পর্যন্ত, ব্রা নারীদের জীবনের নানা পর্যায়ে নানান অর্থ বহন করে আসছে। চলুন, ঢুকে পড়ি সেই ইতিহাসের যাত্রায়।

ব্রা এর আদি রূপ

প্রাচীন গ্রীস ও রোমের স্ট্রোফিয়াম ব্যবহার

প্রাচীনকাল থেকেই নারীরা তাদের স্তনের সঠিক আকৃতি আর আকর্ষণ ধরে রাখতে কত কৌশলই না ব্যবহার করে আসছেন! স্তনের শোভা, আর, রহস্য রক্ষার এই প্রাচীন প্রচেষ্টাই যেন নারীর আত্মবিশ্বাসের এক নীরব সঙ্গী।  

মিনোয়ান সভ্যতায় ব্রাঃ অ্যাপোডেসমোস

মিনোয়ান সভ্যতার নারীরা ‘অ্যাপোডেসমোস’ নামে একধরনের বক্ষবন্ধনী পরতেন। এটি সামনে কাপড় দিয়ে মোড়ানো থাকত, আর পেছনে সেফটিপিনের মতো কোনো কিছু দিয়ে আটকে রাখা হতো। ভাবুন একবার, সেই প্রাচীন মেয়েরা তাদের স্তনের আকর্ষণ ছড়িয়ে দিচ্ছেন এভাবে! হোমারের ইলিয়াড-এ দেবী অ্যাফ্রোডাইটের রূপকথার মধ্যেও এক ধরনের বক্ষবন্ধনীর ইঙ্গিত আছে। মনে হয় যেন এই পরিধানেই লুকিয়ে আছে নারীর মাদকতায় ভরা সৌন্দর্যের মূল সুর!

অ্যাপোডেসমোস পরা নারী

গ্রিক ও রোমের সভ্যতার ব্রাঃ স্ট্রফিয়ন 

আর গ্রীসের নারীরা? তারা ‘স্ট্রফিয়ন’ নামের কাপড়ের বেল্ট পরতেন। পরে রোমে এসে সেটাই পরিণত হয় ‘স্ট্রফিয়াম’-এ। শুধু সৌন্দর্যই নয়, শরীরচর্চার সময়ও স্ট্রফিয়াম পরতেন নারীরা। সিসিলির ‘বিকিনি গার্লস’ মোজাইকে দেখা যায়, রোমান নারীরা স্ট্র্যাপলেস ব্রা পরে ব্যায়াম করছেন। প্রাচীনকালের সেই নারীদের ফিটনেস আর ফ্যাশন সেন্স যেন চোখের সামনেই ভেসে ওঠে।

গ্রিসের স্ট্রফিয়ন

চীনের ব্রাঃ xieyi

ভারতীয় উপমহাদেশেও নারীদের বক্ষবন্ধনীর আদি সংস্করণ ছিল। আর চীনের নারীরাও তাদের সৌন্দর্য ধরে রাখতে ‘xieyi’ নামে এক ধরনের বক্ষবন্ধনী ব্যবহার করতেন। ভাবা যায় তখন থেকেই নারীরা বুঝে গিয়েছিল কমফোর্ট আর আকর্ষণকে একত্রে রাখা সম্ভব! 

স্তনের সৌন্দর্য প্রকাশ যেন তাদের মনের ভেতর লুকিয়ে থাকা এক সুপ্ত আকাঙ্ক্ষা। বছরের পর বছর ধরে ব্রা-এর পরিবর্তন ঘটে চলেছে। কিন্তু নারীর সৌন্দর্য আর আত্মবিশ্বাসে এর আবেদন একই রয়ে গেছে। 

মধ্য যুগঃ স্তন ব্যাগ

লেংবার্গ ক্যাসেলে পাওয়া ব্রেসিয়ার

প্রাচীন যুগ থেকেই নারীরা এমন পোশাক পরতেন যা শুধু তাদের স্তনকেই আগলে ধরত না, বরং সযত্নে আড়ালেও রাখত। কবে থেকে এলো এই ব্রা? আজকের ব্রা বলতে আমরা বুঝি এমন এক পোশাক যার দুই পাশে আলাদা দুইটি কাপ আছে। এই কাপের ভেতরেই সুরক্ষিত থাকে নারী-স্তন। এই ব্রা নারীর শরীরকে আবেদনময় করে তুলতে সাহায্য করে। কিন্তু, বর্তমান ব্রা-এর মতো আধুনিক ডিজাইন কবে থেকে আসলো?

এই আধুনিক ব্রা-র ইতিহাস কিন্তু আপনার ভাবনার চেয়ে অনেক প্রাচীন। ২০০৮ সালে, অস্ট্রিয়ার লেনবার্গ ক্যাসেলে গবেষকরা খুঁজে পেয়েছিলেন চারটি লিনেনের পোশাক। এগুলোর নকশা প্রায় মধ্যযুগের। ধারনা করা হয়, ১৩৯০ থেকে ১৪৮৫ সালের মধ্যবর্তী কোন এক সময়ে এই পোশাক তৈরি করা হয়েছিল। এই পোশাকগুলো যেন আধুনিক ব্রা-এর আদিরূপ। আধুনিক সময়ের ছোট ট্যাঙ্ক টপ এর মত একপ্রকার কাপড়ও পাওয়া যায় সেখানে। এছাড়াও, ছিল ১৯৫০-এর লং-লাইন ব্রা-এর মতো একটি পোশাক, যা কোমর পর্যন্ত গিয়ে নারীর শরীরকে এক নতুন মাত্রার দৃঢ়তা প্রদান করতো। এর উপরে করা লেসের কাজ নারীর শরীরে যোগ করত শৈল্পিক সোহাগ।

এই পোশাক কতটা জনপ্রিয় ছিল? সে কথা আজও রয়ে গেছে অন্তরালে। তবে, তৎকালীন লেখকরা ঠিকই এর বর্ণনা দিয়েছেন। ভাবতে পারেন, তখনকার দিনে এই পোশাকের নাম ছিল “স্তন ব্যাগ”! ফ্রান্সের রাজা ফিলিপ দ্য ফেয়ার লুই দশমের শল্যচিকিৎসক হেনরি ডে মনডেভিল  ১৩১০ সালের দিকে লিখেছিলেন, 

“কিছু নারী তাদের পোশাকে দুটি ব্যাগ ঢুকিয়ে স্তন ধরে রাখে, যেন সেই দুই কোমল বস্তু শক্তভাবে বন্দি থাকে।”

১৪৮০-এর দশকে কনরাড স্টোল নামে এক লেখক বিরক্ত হয়ে বলেছিলেন যে, এই ব্রা নাকি নারীদের স্তনকে “অত্যন্ত অশালীন” করে উপস্থাপন করতো! আবার, ১৫শ শতকের এক জার্মান কবি তার কাব্যে লিখেছেন এক নারীর কথা, যিনি রাস্তা দিয়ে হাঁটতেন, আর তার “সুন্দর স্তন” যেন তরুণদের চোখে আগুন জ্বালিয়ে দিত। বড় স্তনের নারীরা তখন ব্যবহার করতেন “মোটা ব্যাগ”। যা তাদের মধুর শরীরী রহস্যকে আবৃত রাখত।

এভাবেই, বহু প্রজন্ম ধরে নারীরা তাদের ব্রা দিয়ে তৈরি করে চলেছেন এক লুকোনো মোহময়ী ইতিহাস।  প্রয়োজন আর সৌন্দর্যের মোহনীয় এই মিলনে, ফ্যাশন হয়ে উঠেছে এক চিরকালীন ফ্যান্টাসি।

করসেট যুগ: আরাম নয়, সৌন্দর্যই প্রধান

প্রাচীন করসেট

রেনেসাঁস যুগ থেকে ২০শ শতকের শুরু পর্যন্ত করসেট ছিল পশ্চিমা বিশ্বের ফ্যাশন সচেতন নারীদের জন্য এক আবশ্যিক পোশাক। এটা কখন প্রথম চালু হয়েছিল বা কে প্রথম এটার নামকরণ করেছিলেন সেটা বলা মুশকিল। 

মধ্যযুগে ‘করসেট’ শব্দটি মূলত পুরুষদের জন্য তৈরি এক ধরনের আবরণ বোঝাতে ব্যবহৃত হতো। ১৩০০ সালের দিকে প্রথম করসেটের দেখা মেলে। সেসময় এগুলো মূলত কোমরকে আকর্ষণীয়ভাবে তুলে ধরার জন্য তৈরি করা হয়েছিল। 

সে সময় দীর্ঘ, সরু কোমর আর শক্ত কোটি পরা ফ্যাশন ছিল। করসেট কোমরের ঠিক নিচে বেল্ট এর মত ব্যবহার করত। আকর্ষণীয় রূপ পেতে নারীরা ‘কটে’ নামক একটি পোশাক পরতেন। এই পোশাক তখন পুরুষ ও নারী উভয়ের পোশাক হিসেবে ব্যবহৃত হতো। 

ষোড়শ শতকে এসে এটি নারীদের অন্তর্বাসে রূপান্তরিত হয়। লিনেন কাপড়ের তৈরি এই অন্তর্বাসটি ছিল কোমরের আকার ঠিক রাখার নরম শেপার। সময়ের সাথে সাথে এটি আরও শক্ত এবং দৃঢ় হতে থাকে। পনের শতকে এই পুরো শরীরের শেপারকে বলা হতো ‘বডি’। 

 

করসেট পরিহিত মেয়ে

সপ্তদশ শতকে ‘বডি’ দুইভাগে বিভক্ত হয় – উপরিভাগকে বলা হতো ‘কর’ আর নিচের অংশকে বলা হতো ‘কটে’ বা স্কার্ট। এটি ঊনবিংশ শতক পর্যন্ত ‘স্টেই’ নামেও পরিচিত ছিল। করসেটগুলো শুধুমাত্র শরীরের শেপিংয়ের জন্য ছিল না। এটি ‘কিউপিডের কেটলড্রাম’ অর্থাৎ স্তনের আকৃতি পরিবর্তনেও ভূমিকা রাখতো। 

কিন্তু, আধুনিক ব্রা এর মতো এতে কোন আলাদা কাপ ছিল না। তিমির হাড় এবং পরবর্তীতে ইস্পাত দিয়ে তৈরি এই করসেট নারী শরীরকে একটি কোণের আকৃতি দিতো। এটি পরার পর স্তনগুলো বড় এবং উঁচু দেখাতো। রানী মেরি দ্বিতীয় (১৬০০-এর দশক), মেরি অ্যান্টোইনেট (১৭০০-এর দশক), এবং ইউরোপের অনেকেই স্তনের আকর্ষণীয় এবং উঁচু শেপ পাওয়ার জন্য এই পোশাক পরতেন। ফ্রেঞ্চ স্টাইলের এই পোশাকে স্তনবৃন্তের কাছাকাছি একটি বর্গাকার নেকলাইন থাকতো। এই আকারের কারণে সে সময় নারী-বক্ষকে বিড়ালের মাথার সাথে তূলনা করা হতো।

তবে, সবাই তাদের “বিড়ালের মাথা” দেখাতে চাইতো না। ঐ সময়ের সিনেমাগুলো যত কিছু দেখাক না কেন, সাধারণ সমাজের অনেক নারী তাদের বক্ষ আড়াল করতে ‘ফিচু’ নামের এক ধরনের কাপড় গলায় জড়িয়ে রাখতেন। সেসময় এই ফিচুই ফ্যাশন আর সাধারণ যৌনকর্মীর সাজের মাঝে সূক্ষ্ম একটি রেখা টেনে দিয়েছিল।

পরবর্তীতে, করসেটের কারণে নারীদের স্বাস্থ্যের উপর ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠতে থাকে। ভিক্টোরিয়ান যুগের নারী অধিকার আন্দোলনকারীরা বিশ্বাস করতেন যে, করসেট নারীদের মুক্তির পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে, করসেটের বিতর্কিত ইতিহাসে ডুব দেওয়া যাবে অন্য কোন লেখায়। চলুন এবার দেখি এটি কিভাবে এই পোশাক আধুনিক ব্রা এ রূপান্তরিত হলো।

আধুনিক ব্রা-এর আবিষ্কার এবং উন্নয়ন

মেরি ফেলপস জ্যাকব এবং তার তৈরি প্রথম ব্রা

ভেবেছেন কখনো, প্রতিদিনের ব্যবহৃত একটি ছোট্ট পোশাকের পেছনে কতটা গোপন ইতিহাস লুকিয়ে রয়েছে? এই নির্দিষ্ট পোশাকটি আজকের দিনে নারীর জীবনযাত্রার অপরিহার্য অংশ। আধুনিক ব্রা-এর আবিষ্কার এবং তার পরবর্তীতে ঘটে যাওয়া বিবর্তন যেন একটি নাটকীয় যাত্রা। 

১৮৮৯ সালে, ফরাসি নারী হার্মিনি কাদোল (Herminie Cadolle) আধুনিক ব্রা-এর প্রথম প্রোটোটাইপ তৈরি করেন। তৎকালীন কর্সেটের চাপ থেকে মুক্তি পেতে তিনি এই ডিজাইন তৈরি করেন। যদিও, সেই সময়ে সবাই এই নতুন ধারণাকে গ্রহণ করেনি। তবে, হার্মিনির চিন্তা ছিল একদম সঠিক। সৌন্দর্য এবং স্বাচ্ছন্দ্য নারীদের শরীরে একে অপরের পরিপূরক হয়ে সহঅবস্থান করতে পারে!

কিন্তু, ব্রা-এর আধুনিক রূপটির আসল যাত্রা শুরু হয় ১৯১৪ সালে। মারি ফেল্পস জ্যাকব (Mary Phelps Jacob) প্রথম শরীরের আরাম এবং ফ্যাশনকে একত্রিত করতে সফল হন। এক রাতে ডিনারে যাওয়ার আগে তার কর্সেটে সমস্যা দেখা দেয়। আর এই সমস্যা থেকেই উদ্ভাবন হয় এক নতুন ধরনের ব্রা। এক মুহূর্তের বিচক্ষণতায়, তিনি দুটো রুমালের সাহায্যে এক নতুন ধরনের পোশাক বানান। যা পরবর্তীতে আধুনিক ব্রা-এর ভিত্তি হয়ে ওঠে। তিনি এটিকে “ব্যাকলেস ব্রাসিয়ার” নামে পেটেন্টও করেন।  

প্রথম বিশ্বযুদ্ধকালীন সময়ে নারীদের ব্রা

পরবর্তীতে, বিশ্বযুদ্ধের সময় ইস্পাতের কমতির জন্য কর্সেট এর ব্যবহার কমতে শুরু করে। আর এই সময়ই কর্সেটের পরিবর্তে আরামদায়ক এবং হালকা এই ব্রা নারীদের প্রথম পছন্দে পরিণত হয়। এই  সময়ে মেয়েরা শ্রমশক্তির অংশ হিসেবে কর্মস্থলে প্রবেশ করায় তাদের এই ব্রা এর চাহিদা আরও বেড়ে যায়।

কালের পরিক্রমায় ব্রা-এর ডিজাইন, আকার, এবং ফ্যাশনে এসেছে নানা পরিবর্তন। ১৯৪০-এর দশকে বুলেট ব্রা, ১৯৬০-এর দশকে পুশ-আপ ব্রা এবং আরও পরে ওয়ান্ডার ব্রা, টিস্যু ব্রা—নানা ধরণের নতুনত্ব ব্রা ডিজাইনে আনে বৈচিত্র্য। আজকের ব্রা বলতে গেলে নারীদের এক ধরনের ‘পাওয়ার হাউস’। 

ব্রা-এর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব  

১৯৬০-এর দশকে নারীদের সংগ্রাম

ব্রা কি শুধুই পোশাক? সত্যি বলতে, ব্রা আসলে একটা পোশাকের চেয়ে অনেক বেশি কিছু! এটি একই সাথে নারীর নিজস্ব ব্যক্তিত্ব, আভিজাত্য এবং স্বাধীনতার প্রতীক, আবার এক অনিশ্চিত বিদ্রোহের প্রতিফলন। ব্রা এর প্রতিটি স্তর যেন প্রকাশ করে নারীর এক ভিন্ন মাধুর্য।

ঊনবিংশ শতাব্দীতে এটি নারীর শরীরকে একটু গুছিয়ে সাজিয়ে তোলার জন্যই ব্যবহৃত হতো। কিন্তু, ধীরে ধীরে ব্রা হয়ে উঠল শরীরের একান্ত অনুভূতির আরেক নাম। এ যেন নারীর নিজস্ব পরিচয়ের গভীর প্রকাশ। এটি নারীর আত্মবিশ্বাসের পোশাক। যার মাধ্যমে সে নিজের রূপ এবং শরীরের জাদুকে উপভোগ করতে পারে। আধুনিক সমাজে ব্রা এখন শুধু রুচির পরিচয় নয়, এটি নারী শরীরের অভ্যন্তরের সৌন্দর্যকে প্রকাশ করার একটি পন্থাও বটে!

ব্রা বার্নিং

প্রথমদিকে, ব্রা ছিল নিছক একটি আরামদায়ক পোশাক। কিন্তু ধীরে ধীরে এটি নারীর আত্মবিশ্বাস ও স্বাতন্ত্র্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। নারীদের বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলনের একটি শক্তিশালী প্রতীক হয়ে ওঠে ব্রা। এটি প্রতীকী অর্থে “বন্ধনের” বিরুদ্ধে নারীর স্বাধীনতার দাবিকে চিহ্নিত করতে শুরু করল। 

সত্তরের দশকে ‘ফেমিনিস্ট আন্দোলন’ ব্রা এর সামাজিক প্রভাবকে নতুন মাত্রায় নিয়ে আসে। একদল নারী তাদের ঐতিহ্যগত পোশাকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে “ব্রা বার্নিং” কর্মসূচিতে অংশ নেন। এর মাধ্যমে ব্রা বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। এই সব নারীর স্বাধীনতার উপর সামাজিক চাপ নিয়ে সমাজকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।

বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন সংস্কৃতিতেও ব্রা গ্রহণযোগ্যতা এবং ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক চিন্তার উত্থান হয়েছে। বিশেষ করে ভারতীয় উপমহাদেশের মতো রক্ষণশীল সমাজে ব্রা নিয়ে বেশিরভাগ নারী নিঃশব্দে যুদ্ধ করে গেছেন। ব্রা এর ব্যবহার কীভাবে নারীর সামাজিক মর্যাদাকে প্রভাবিত করে। ব্রা এর গ্রহণযোগ্যতার পেছনের দৃষ্টিভঙ্গিগুলো কেমন, তা নিয়ে সমাজে এক ধরণের দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়েছে।

ব্রা তৈরির প্রাথমিক উপকরণ এবং পরিবর্তন

ব্রা এর শুরু থেকে একবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত এর উপকরণের তালিকায় অনেক পরিবর্তন এসেছে। প্রথম দিকে ব্রা তৈরিতে ব্যবহৃত হতো প্রাকৃতিক উপকরণ যেমন, কাপড়, লিনেন, আর কখনো কখনো পশুর চামড়া। মিশরের নারীরা এতে সুতার তৈরি তন্তু ব্যবহার করত, যা ছিল হালকা এবং আরামদায়ক। তারপর গ্রিক এবং রোমান সংস্কৃতিতেও বিভিন্নভাবে নারীদের স্তনকে সুরক্ষিত করতে কাপড়ের বন্ধনী ব্যবহার করা হতো। এইসব প্রাকৃতিক উপকরণগুলোই ছিল ব্রা এর মূল ভিত্তি।

কালের পরিক্রমায় ব্রা তৈরির উপকরণে এসেছে অনেক নতুনত্ব। বিশ শতকের প্রথম দিকে বোনা সুতি এবং রেশম, ব্রা তৈরির প্রধান উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে। সৌন্দর্য আর স্টাইলের সংমিশ্রণ ঘটাতে তখন থেকেই আস্তে আস্তে সুতা ও লেসের পাশাপাশি ইলাস্টিক ফ্যাব্রিকও ব্যবহার শুরু হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বিশ্বব্যাপী রেশমের ঘাটতি দেখা দিলে নাইলন এবং পলিয়েস্টার জনপ্রিয় হতে থাকে।

আধুনিক যুগে, প্রযুক্তির বিকাশের সাথে সাথে ব্রা তৈরির উপকরণেও এসেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। আজকাল ব্যবহৃত হয় স্প্যানডেক্স, মাইক্রোফাইবার, এবং মেমোরি ফোমের মতো অত্যাধুনিক উপকরণ। এগুলো শুধুই স্তনকে সুরক্ষা দেয় না, পাশাপাশি বিভিন্ন আকার ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণের সুবিধাও দেয়।

ব্রা ব্যবহারের সুবিধা এবং শারীরিক প্রভাব

ব্রা পরিহিতা একজন নারী আরামদায়ক অবস্থায়

শারীরিক আরাম ও স্বাস্থ্যকর দেহগঠন

ব্রা শারীরিক আরাম ও সুস্থতার জন্য অপরিহার্য। এটি নারীদের দৈনন্দিন জীবনে আত্মবিশ্বাস ও সুস্বাস্থ্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ব্রা সঠিকভাবে স্তনকে সাপোর্ট দেয়। এতে শরীরের ভারসাম্য বজায় থাকে। নারীদের স্তনগুলো নরম এবং প্রাকৃতিকভাবেই দেহের সাথে ঝুলন্ত অবস্থায় থাকে। তাই ব্রা পরলে স্তনের আকৃতি সঠিক হয় এবং সুন্দর আকারে দেখা যায়, যা নারী শরীরকে আকর্ষণীয় করে তুলতেও সাহায্য করে।

ব্রা ব্যবহারের অন্যতম প্রধান কারণ হলো, শরীরের উপর অতিরিক্ত চাপ কমানো। স্তন সঠিকভাবে সাপোর্ট না পেলে পিঠে ব্যথা, কাঁধে চাপ এবং অস্বস্তির মতো সমস্যাগুলো সৃষ্টি হতে পারে। বিশেষ করে, বড় স্তনধারী নারীদের জন্য ব্রা একটি আবশ্যিক পোশাক। কারণ, এটি স্তনের ওজন সামলাতে সাহায্য করে। পুশ-আপ বা সাপোর্টিভ ব্রাগুলো স্তনকে আকর্ষণীয় ভাবে ফুটিয়ে তোলে। 

ভুল ব্রা পরা একজন নারী বিরক্তিকর অবস্থায়

স্বাস্থ্যজনিত সুবিধা

সঠিক মাপের ব্রা ব্যবহার করলে স্তনের মাপ ঠিক থাকে। এছাড়াও, এটি দীর্ঘমেয়াদে স্তনের ঝুলে যাওয়া থেকে রক্ষা করে। গবেষণায় দেখা গেছে, সঠিক মাপ এবং উপযুক্ত ব্রা, নারীদের হাড়ের সমস্যা, পিঠ ও কাঁধের ব্যথা থেকে মুক্তি দেয়। 

তবে টাইট বা অনুপযুক্ত মাপের ব্রা দীর্ঘসময় ধরে ব্যবহার করা স্তনের স্বাস্থ্যের ভাল না। টাইট ব্রা রক্ত সঞ্চালনে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। এর ফলে, স্তন অঞ্চলে ফোলাভাব বা অস্বস্তি দেখা দিতে পারে। এইজন্যই সঠিক মাপের ব্রা নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ব্রা বিকাশে বিখ্যাত ব্র্যান্ড ও ডিজাইনারদের ভূমিকা

ভিক্টোরিয়া’স সিক্রেট ব্র্যান্ডের ব্রা

ব্রা বিকাশে অনেক খ্যাতনামা ব্র্যান্ড ও ডিজাইনাররা, নারীদের আরাম, আস্থা, এবং আভিজাত্যকে একত্রে আনতে সক্ষম হয়েছে। Victoria’s Secret বা La Perla-এর নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে অসাধারণ কিছু ডিজাইন। এসব ব্র্যান্ডের ডিজাইনাররা এমন একটি জগৎ তৈরি করেছেন যেখানে নারী দেহের স্বতন্ত্র সৌন্দর্য এবং রহস্যময়তা আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠে।

Maidenform ব্রাঃ Lift and Separate

Maidenform, ১৯২২ সালে যার প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। এই ব্র্যান্ডটি ছিল প্রথম যারা “Lift and Separate” ধারণাটি নিয়ে আসে। অর্থাৎ ব্রার মাধ্যমে নারীর বক্ষকে এমনভাবে তুলে ধরা যাতে এর সৌন্দর্য্য আলাদা করে প্রকাশ পায়। তাদের ক্লাসিক বিজ্ঞাপনগুলোর একটিতে দেখা যায়, এক নারী গর্বের সাথে ঘোষণা করে “I dreamed I went shopping in my Maidenform bra” এই বিজ্ঞাপন ব্র্যান্ডটিকে বিপুল জনপ্রিয়তা এনে দেয়।

মাইডেনফ্রম ব্রা

Victoria’s Secret: ফ্যাশন, গ্ল্যামার এবং সৌন্দর্যের প্রতীক

১৯৭৭ সালে Victoria’s Secret-এর জন্ম হয়। এই ব্র্যান্ড ব্রা এবং ল্যাঞ্জারি শিল্পকে আক্ষরিক অর্থে বদলে দেয়। তাদের ডিজাইনগুলি ছিল ফ্যাশন, গ্ল্যামার এবং সৌন্দর্যের প্রতীক। মডেলদের নিয়ে বড় বড় ফ্যাশন শো, বিলাসবহুল আউটলেট, এবং স্বতন্ত্র ডিজাইনের মাধ্যমে Victoria’s Secret নারীদের মনে এক নতুন আস্থা এবং ফ্যাশন চেতনা প্রতিষ্ঠা করে।

ভিক্টোরিয়া’স সিক্রেট ফ্যাশন শো

Jean-Paul Gaultier এবং Christian Dior

Jean-Paul Gaultier এবং Christian Dior-এর মতো ফ্যাশন ডিজাইনাররাও ব্রা ডিজাইনে নতুনত্ব এনেছেন। Gaultier ম্যাডোনার জন্য কনকল আকৃতির ব্রা তৈরি করে। Dior এর ডিজাইনগুলি প্রচলিত ব্রা এর নতুন রূপ দেয়। তাদের, ব্রা-তে সূক্ষ্ম লেসের কাজ, ঝলমলে রঙ, এবং কারুকাজের মেলবন্ধন ছিল। 

আজকের দিনে, Aerie, ThirdLove এর মতো ব্র্যান্ডগুলো নারী দেহের বিভিন্নতা এবং স্বতন্ত্রতাকে প্রাধান্য দিয়ে ব্রা তৈরি করছে। ThirdLove-এর মতো ব্র্যান্ডগুলি আকারের বিভিন্নতার দিকে মনোযোগ দেয়। এই ব্র্যান্ড এবং ডিজাইনাররা শুধু ব্রা ফ্যাশন শিল্পে বিপ্লব নিয়ে আসে তা নয়; তারা নারীদের ব্রা-এর মাধ্যমে নিজেকে প্রকাশের সুযোগও তৈরি করে দিয়েছেন।

বিভিন্ন ধরনের ব্রা এবং স্তনের ধরণ অনুযায়ী সঠিক ব্রা নির্বাচন

স্তনের আকার এবং আকার অনুযায়ী সঠিক ব্রা নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্তনের আকার সাধারণত কয়েকটি ক্যাটাগরিতে বিভক্ত করা হয় যেমন ছোট, মাঝারি, বড় এবং খুব বড়। চলুন বিভিন্ন স্তনের আকার অনুযায়ী ব্রা এবং কাপ সাইজ নিয়ে আলোচনা করা যাক।

১. ছোট স্তন (Small Breasts)

যাদের স্তনের আকার ছোট, তাদের সাধারণত A বা B কাপ ব্রা পরিধান করা উচিত। এই ধরনের স্তনের জন্য হালকা প্যাডিং বা পুশ-আপ ব্রা পরিধান করা যেতে পারে। এতে স্তন আরও সুগঠিত ও সুন্দর দেখায়।

সেরা ব্রা টাইপ

পুশ-আপ ব্রা, টিশার্ট ব্রা, নো-ওয়্যার ব্রা।

২. মাঝারি স্তন (Medium Breasts)

মাঝারি আকারের স্তনের জন্য C কাপ ব্রা সবচেয়ে মানানসই। মাঝারি স্তনের জন্য প্যাডেড বা সেমি-কভারেজ ব্রা চমৎকার। এ ধরনের ব্রা স্তনের প্রাকৃতিক আকৃতি ধরে রাখে এবং সুন্দর আকার প্রদান করে।

সেরা ব্রা টাইপ

প্লাঞ্জ ব্রা, বলকনেট ব্রা, টিশার্ট ব্রা।

৩. বড় স্তন (Large Breasts)

 

বড় স্তনের জন্য সাধারণত D বা DD কাপ ব্রা পরিধান করা উচিত। বড় স্তনের জন্য পূর্ণ কভারেজ ও ওয়েল-সাপোর্টেড ব্রা প্রয়োজন হয়। এটি স্তনকে ঠিকভাবে ধরে রাখতে সাহায্য করে এবং কাঁধের উপর চাপ কমায়।

সেরা ব্রা টাইপ

ফুল-কভারেজ ব্রা, ওয়্যারড ব্রা, বলকনেট ব্রা।

৪. খুব বড় স্তন (Very Large Breasts)

DD বা তার বেশি আকারের স্তনের জন্য বিশেষ ব্রা দরকার হয়। বড় স্তনের জন্য মোল্ডেড কাপ বা মিনিমাইজার ব্রা বেছে নেওয়া যেতে পারে। এগুলা স্তনের সাইজকে কিছুটা কমিয়ে দেয়।

সেরা ব্রা টাইপ

মিনিমাইজার ব্রা, ফুল-কভারেজ ব্রা, সাপোর্ট ব্রা।

উপসংহার

ব্রা বিক্রয় কেন্দ্র

এতক্ষণ ধরে ব্রা এর ইতিহাস নিয়ে যে গভীর আলোচনা চললো তা থেকে নিশ্চয় আমরা অনেক কিছু শিখতে পারলাম। এবার একটা মজার কথা শোনা যাক- 

“ব্রা হলো একমাত্র ফ্যাশন আইটেম যেটা কিনতে গেলে দোকানদার বলে,

 ‘ছোট না; আরেকটু বড় ট্রাই করে দেখেন!’ ”

ছোট্ট এই পোশাকটির উপর নারীদের আত্মবিশ্বাস, স্বাচ্ছন্দ্য, এমনকি কখনো কখনো হাসি পর্যন্ত নির্ভর করে। আর সঠিক ব্রা বেছে না নিলে তো “ব্রা আছে, তবুও যেন নেই” এমন মনে হবে! তাই নিজেকে ঠিকঠাক ভাবে গুছিয়ে তোলার জন্য সঠিক ব্রা বেছে নেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ আর কি হতে পারে?

ইতিহাসের যাত্রাটা মজার ছিল, তাই না? কে জানে, হয়তো এবার থেকে প্রতিবার ব্রা কেনার সময় আপনার মনে এই ব্লগের কথা একটু হলেও আসবে! মনে রাখবেন, 

“ব্রা বেছে নিতে ভুল নেই, ভুল শুধু নিজের সাইজ না বুঝে বেছে নিতে!”

 

রেফারেন্স লিঙ্কঃ 

  1. https://www.anaono.com/blogs/dressing-room/the-history-and-evolution-of-the-bra?srsltid=AfmBOorGnc3cc87X7T3qVMK7QM3VjQsUvxZ10rhuq_s9eOwwx1vDieIk
  2. https://www.history.com/news/bra-inventions-timeline
  3. https://www.theexploresspodcast.com/episodes/the-evolution-of-the-bra 

Related posts

সুন্দরবনের বনবিবি – এক আরব কন্যার বনবাস

সাবরিনা শায়লা ঊষা

কিভাবে পশ্চিম জয় করলো ইরান: ইতিহাসের এক রোমাঞ্চকর অধ্যায়

আবু সালেহ পিয়ার

নির্বাচনের ইতিহাস- এথেন্স থেকে AI

Leave a Comment

Table of Contents

    This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More