Image default
যাপন

চুল নষ্ট হবে না হেলমেট থাকলেও: সঠিক যত্ন ও স্টাইলের কৌশল

ব্যস্ত শহরের রাস্তায় বাইকই ভরসা, কিন্তু হেলমেট পরলেই মন খারাপ হয় চুলের জন্য প্রতিদিনের হেলমেটের ঘষা, ঘাম আর চিটচিটে ভাব এসবেত কারনে। তবে হেলমেটে আর ভয় নয়। কারন, স্টাইল আর সুরক্ষা হবে একসাথে যদি মেনে চলেন কিছু স্মার্ট কৌশল।

দৈনন্দিন যাতায়াত বা দীর্ঘ বাইক যাত্রায় হেলমেট শুধু একটি আইনি বাধ্যবাধকতা নয়, এটি জীবন রক্ষাকারী একটি অপরিহার্য উপকরণও। তবুও, অনেক বাইকারের মনেই একটা নীরব শঙ্কা কাজ করে, এই হেলমেটই বুঝি তাদের সাধের চুলের শত্রু। সারাদিন হেলমেট পরে থাকার কারণে অতিরিক্ত ঘাম, চিটচিটে ভাব, চুল ঝরে যাওয়া বা চুল ফাটার মতো সমস্যাগুলো যেন বাইকারদের পিছু ছাড়েই না। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামান্য সচেতনতা আর কিছু স্মার্ট চুল ও হেলমেটের যত্নের কৌশলে আপনি আপনার চুলকে রাখতে পারেন সম্পূর্ণ সুরক্ষিত, এমনকি হেলমেট পরা অবস্থাতেও।

হেলমেট পরে চুল ঝরছে কেন 

চুল ঝরার কারণটা স্রেফ হেলমেট পরার কারনে  নয়, বরং হেলমেটের কারণে সৃষ্ট কিছু প্রতিক্রিয়া ফলে ঘটে।

১. অতিরিক্ত ঘষা বা ফ্রিকশন (Friction):

ভুল সাইজের হেলমেট পরলে বা দীর্ঘক্ষণ বাইক চালানোর সময় মাথার সামান্য নড়াচড়াতেও চুল ও হেলমেটের ভেতরের লাইনারের মধ্যে লাগাতার ঘষা লাগে। এই ঘষা চুলের গোড়ায় বা ফলিকলে চাপ সৃষ্টি করে, যা চুল ঝরা-র একটি প্রধান কারণ। দুর্বল চুল তখন গোড়া থেকে ভেঙে যায় বা ঝরে যায়।

প্রতিকার: সমস্যার সমাধানে প্রয়োজন হেলমেটের সাইজ ও ফিট সম্পর্কে চুলের স্বাস্থ্যের সম্পর্ক বোঝা। হেলমেট এমনভাবে ফিট হওয়া উচিত যেন তা টাইট না হয়, আবার অতিরিক্ত ঢিলে হয়ে নড়াচড়াও না করে। 

হেলমেট পরে বাইক চালানো

২. আর্দ্রতা, ঘাম ও চিটচিটে ভাব:

হেলমেটের ভেতরের পরিবেশ বাতাস চলাচলের অভাবে দ্রুত উষ্ণ ও আর্দ্র হয়ে ওঠে। দীর্ঘসময় হেলমেট পরে থাকলে মাথার ত্বক পর্যাপ্ত বাতাস পায় না, ফলে অতিরিক্ত ঘাম হয়। এই ঘাম এবং মাথার ত্বকের স্বাভাবিক তেল (Sebum) চুলের গোড়ায় জমে যায়। এতে ছত্রাক সংক্রমণ (ড্যান্ড্রাফ), চুলকানি ও গোড়া দুর্বল হয়।

করণীয়: ঘামে ভিজে হেলমেট পরার পর চুল রক্ষা করবেন কিভাবে? প্রথমত, বাইরে থেকে ফিরে দ্রুত হেলমেট খুলে চুলকে শুকিয়ে নিন। দ্বিতীয়ত, সপ্তাহে অন্তত তিনবার অ্যান্টি-ড্যান্ড্রাফ শ্যাম্পু ব্যবহার করুন।

. অপরিষ্কার হেলমেট লাইনার:

হেলমেটের লাইনারে ঘাম, তেল, ধুলো এবং মৃত কোষ জমে থাকে। এই নোংরা স্তরটি সরাসরি চুলের সংস্পর্শে এলে অ্যালার্জি, সংক্রমণ বা চুল ঝরা বাড়াতে পারে

করনীয় – নিয়মিত হেলমেটের লাইনার পরিষ্কার করা।

বাইক চালানোর সময় হেলমেট পরলেও চুল কেমন থাকবে ভালো?

আপনার হেলমেট চুল রক্ষার কাজটি শুরু করতে হবে যাত্রা শুরুর আগেই।

শুষ্ক চুলই স্বাস্থ্যের চাবিকাঠি: কখনোই ভেজা বা সামান্য ভেজা চুলে হেলমেট পরবেন না। ভেজা চুল এমনিতেই দুর্বল থাকে, তার উপর হেলমেটের ফ্রিকশন ও ঘাম পেলে তা আরও দ্রুত ভেঙে যেতে পারে। চুল সম্পূর্ণ শুকিয়ে তবেই বাইকে উঠুন।

সিরাম/লিভ-ইন কন্ডিশনার: যাত্রার আগে হাতের তালুতে সামান্য সিরাম / শ্যাম্পু হেলমেট পরের হালকা লিভ-ইন কন্ডিশনার নিয়ে শুধু চুলের ডগা ও মাঝের অংশে লাগিয়ে নিন। এটি চুলের উপর একটি মসৃণ সুরক্ষা স্তর তৈরি করে, যা শুষ্কতা ও ফ্রিকশন থেকে চুলকে বাঁচায়।

হেলমেটের নিচে হালকা কাপড় ব্যবহার

বাইকারদের চুলের যত্নে সবচেয়ে কার্যকর এবং সহজলভ্য সমাধান হলো হেলমেটের নিচে হালকা কাপড় ব্যবহার। একটি পাতলা সুতির বা বিশেষ ফাইবারযুক্ত ক্যাপ, যা বালকাভা (Balaclava) বা হেড-সোক নামে পরিচিত, ব্যবহার করা অত্যন্ত জরুরি। এই কাপড়টি হেলমেট এবং চুলের মধ্যে একটি নরম সুরক্ষা স্তর তৈরি করে, যা সরাসরি ঘষা বা ফ্রিকশন সম্পূর্ণরূপে প্রতিরোধ করে। এছাড়াও, এটি আপনার মাথার ত্বক থেকে নিঃসৃত অতিরিক্ত ঘাম ও তেল সরাসরি হেলমেটের লাইনারে না লেগে নিজের মধ্যে শোষণ করে নেয়। ফলে হেলমেটের লাইনার পরিষ্কার থাকে এবং চুলের গোড়া অতিরিক্ত আর্দ্র হয় না। পাশাপাশি, নিয়মিত এই ক্যাপটি ধোয়া সহজ, যা হেলমেটকে জীবাণুমুক্ত রাখে। এটিই বাইকারদের চুল রক্ষায় একটি সস্তা ও কার্যকরী পদ্ধতি।

হেলমেটের নিচে হালকা কাপড় ব্যবহার

চুল বেঁধে হেলমেট পরার সঠিক স্টাইল ও উপায়

চুল খোলা রেখে হেলমেট পরলে তা বাতাসের সাথে এলোমেলো হয়ে ফ্রিকশনজনিত ক্ষতি ও চুল ফাটা-র ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। তাই সঠিক উপায়ে চুল বাঁধা জরুরি।

লম্বা চুলের স্টাইল: লম্বা চুল শক্ত করে টেনে বাঁধবেন না। হালকা করে আলগা বেণী (Braids) করে নিন অথবা ঘাড়ের একদম নিচের দিকে একটি আলগা পনিটেল করুন। শক্ত বাঁধন চুলের গোড়ায় অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। খেয়াল রাখুন, পনিটেলটি যেন ঘাড়ের এমন অংশে থাকে, যেখানে হেলমেট চাপ সৃষ্টি করবে না।

মাঝারি বা ছোট চুলের স্টাইল: চুলকে আলতো করে পেছনে আঁচড়ে নিন এবং ছোট চুলের ক্ষেত্রে হালকা হেয়ার ব্যান্ড ব্যবহার করতে পারেন, যাতে কোনো চুল এলোমেলোভাবে বা হেলমেটের ভেতরের লাইনারের সাথে না আটকায়।

হেলমেট পরে চুল ফাটা রোধ করার উপায়

চুল ফাটা বা ডগা ফেটে যাওয়া (Split Ends)-এর প্রধান কারণ হলো শুষ্কতা এবং রুক্ষতা। হেলমেট ব্যবহারের কারণে এই শুষ্কতা আরও বাড়ে। সপ্তাহে অন্তত দু’বার নারকেল তেল, বাদাম তেল বা ক্যাস্টর অয়েলের মতো প্রাকৃতিক তেল সামান্য গরম করে মাথার ত্বকে মালিশ করুন। এটি চুল সুস্থ থাকার উপায়। এছাড়াও, হেলমেট পরে চুল ফাটা রোধ করার উপায় হিসেবে যাত্রা শুরুর আগে চুলের ডগায় লিভ-ইন কন্ডিশনার বা অ্যান্টি-ফ্রিজ সিরাম ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক। এটি চুলের ডগাকে প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা প্রদান করে এবং রুক্ষতা দূর করে। দীর্ঘ যাত্রায় বা কাজের মাঝে যদি চুল চিটচিটে হয়ে যায়, তখন ড্রাই শ্যাম্পু ও হেয়ার প্রোডাক্ট ব্যবহার করেও চুল রক্ষা করা সম্ভব। ড্রাই শ্যাম্পু কেবল চুলের গোড়ায় হালকাভাবে ব্যবহার করুন, চুলে নয়। এটি দ্রুত অতিরিক্ত তেল ও ঘাম শুষে নেয়। তবে এটি যেন নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত না হয়। এছাড়াও, জেল, স্প্রে বা অন্যান্য ভারী স্টাইলিং প্রোডাক্ট ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকুন। এই প্রোডাক্টগুলো ঘামের সাথে মিশে চুলের গোড়ায় জমে এবং ফলিকল বন্ধ করে দেয়, যা হেলমেট পরার পর চুল-কে আরও চিটচিটে করে তোলে।

হেলমেট ব্যবহারের কারণে চুল ফেটে যাওয়া

হেলমেটের ভেতরের লাইনার পরিষ্কার রাখার টিপস 

হেলমেট লাইনার স্বচ্ছতা বজায় রাখা আপনার চুলের স্বাস্থ্যের জন্য এক অপরিহার্য ধাপ। অপরিষ্কার লাইনার সরাসরি চুলের ক্ষতি করে।

যদি আপনার হেলমেটের লাইনারটি খুলে ধোয়ার যোগ্য হয়, তবে কমপক্ষে মাসে একবার হালকা শ্যাম্পু বা সাবান ব্যবহার করে ঠান্ডা জলে পরিষ্কার করুন। সাবান বা শ্যাম্পু যেন মৃদু হয়। এছাড়াও, প্রতিবার ব্যবহারের পর হেলমেটটিকে কিছুক্ষণ খোলা হাওয়া এবং সামান্য সূর্যের আলোতে রাখুন, যাতে ভেতরের আর্দ্রতা দূর হয় এবং ব্যাকটেরিয়া বা ছত্রাকের বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। পাশাপাশি, নিয়মিত হেড-সোক বা বালকাভা ব্যবহার করলে লাইনারটি সহজে নোংরা হয় না এবং পরিষ্কার করার ফ্রিকোয়েন্সিও কমানো যায়।

হেলমেট পরে নতুন চুল গজাতে কি করণীয়

যদি হেলমেট ব্যবহারের কারণে চুল পাতলা হয়ে যায় বা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ঝরে যায়, তবে নতুন চুল গজানোর জন্য চাই দীর্ঘমেয়াদী পরিচর্যা। এজন্য প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর আগে ৫-১০ মিনিটের জন্য আঙ্গুল দিয়ে হালকাভাবে মাথার ত্বক ম্যাসাজ করুন। এটি চুলের গোড়ায় রক্ত সঞ্চালন বাড়ায় এবং চুলের ফলিকলকে উদ্দীপিত করে। পাশাপাশি, প্রোটিন (ডিম, মাছ, ডাল), আয়রন (সবুজ শাকসবজি) এবং বায়োটিন সমৃদ্ধ খাবার পর্যাপ্ত পরিমাণে গ্রহণ করুন। এটি চুল সুস্থ থাকার উপায়।

হেলমেট আপনার সুরক্ষা নিশ্চিত করে, আর সঠিক যত্ন নিশ্চিত করে আপনার চুলের সৌন্দর্য। বাইকারদের চুল সংরক্ষণ করার জন্য প্রয়োজন কেবল এই কৌশলগুলো মেনে চলা। আর, এই অভ্যাসগুলো নিশ্চিত করলে আপনার বাইক যাত্রা হবে নিরাপদ, আনন্দদায়ক এবং আপনার চুল থাকবে ঝলমলে ও স্বাস্থ্যোজ্জ্বল, কোনো রকম ক্ষতি ছাড়াই।

তথ্যসূত্র –

Related posts

৫টি কার্যকরী টিপস: অনলাইনে টেকসই ও পরিবেশবান্ধব শপিং করার উপায়

ফাবিহা বিনতে হক

২০২৫ সালের সেরা সরকারি চাকরির প্রস্তুতি: টিপস ও কৌশল!

সময় কম? দেখে নিন আপনার জন্য উপযুক্ত ব্যায়াম

Leave a Comment

Table of Contents

    This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More