Image default
কী ও কেন

ল্যাবে তৈরি হচ্ছে কৃত্রিম মাংস: ভবিষ্যতের খাদ্য বিপ্লব

মাংস খাচ্ছেন, কিন্তু প্রাণী মরছে না—বিজ্ঞানের এই অসাধারণ বিপ্লব এখন বাস্তব! বিজ্ঞানের এই বিস্ময়কর বিপ্লব এখন আর কল্পনা নয়—ল্যাবে তৈরি কৃত্রিম মাংস এসেছে বাস্তবে! পরিবেশ রক্ষা, পশুদের মুক্তি আর স্বাস্থ্য সচেতনতায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তন।

কখনো কি ভেবে দেখেছেন, আমাদের প্রতিদিনের খাবারের পাতে থাকা একটুকরো মাংসের পেছনে লুকিয়ে আছে কত প্রাণের নিঃশেষ আর পরিবেশের ক্ষয়িষ্ণুতা? প্রতিনিয়ত বাড়তে থাকা জনসংখ্যার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে প্রাণিজ প্রোটিনের চাহিদা, আর তার জোগান দিতে গিয়ে ধ্বংস হচ্ছে প্রাকৃতিক বাস্তুসংস্থান। এমন বাস্তবতায় বিজ্ঞানীরা ভাবছেন—প্রাণ না নিয়েই যদি প্রাণিজ প্রোটিনের স্বাদ, গন্ধ আর পুষ্টিগুণ পাওয়া যেত?

ভাবনাটিকে বাস্তবে রূপ দিয়েছে বায়োটেকনোলজি। টিস্যু কালচারের মাধ্যমে এখন তৈরি হচ্ছে কৃত্রিম মাংস। এ  কৃত্রিম মাংস  দেখতে, খেতে, এমনকি গন্ধেও একেবারে আসল মাংসের মতো, কিন্তু এর পেছনে নেই কোনো পশুহত্যা। এই ‘কালচারড মাংস’ বা ‘ল্যাব-উৎপাদিত মাংস’ হয়ে উঠছে ভবিষ্যতের টেকসই খাদ্যসমাধান।

কৃত্রিম মাংস তৈরির পেছনের গল্প 

একসময় যা ছিল নিছক বৈজ্ঞানিক কল্পনা, আজ তা হয়ে উঠেছে ল্যাবের পরীক্ষাগার থেকে বাস্তব জীবনের প্লেটে উঠে আসা সম্ভাবনা। কৃত্রিম মাংস বা ‘কালচারড মিট’ তৈরির যাত্রা শুরু হয়েছিল প্রায় এক শতাব্দী আগে একটি ভবিষ্যদ্বাণীমূলক ভাবনা থেকে।

১৯৩১ সালে ব্রিটিশ রাষ্ট্রনায়ক উইনস্টন চার্চিল কল্পনা করেছিলেন এমন এক ভবিষ্যতের, যেখানে একটি আস্ত মুরগিকে না মেরে শুধুমাত্র তার বুক বা ডানা খাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় অংশটি আলাদা করে ‘উন্নত মিডিয়াম কালচারে’ উৎপাদন করা যাবে। সে সময় এটি কল্পবিজ্ঞানের মতোই শোনালেও, ভবিষ্যৎ তাকে সত্যে পরিণত করেছে।

এরপর ধীরে ধীরে নানা বৈজ্ঞানিক প্রচেষ্টায় এগিয়ে যেতে থাকে কৃত্রিম মাংস তৈরির গবেষণা।

    • ১৯৭১ সালে বিজ্ঞানী রাসেল রস সফলভাবে একটি মিডিয়ামের মধ্যে আট সপ্তাহ ধরে মাংসপেশির কোষ চাষ করেন। প্রথমে এক স্তরের মাসল ফাইবার তৈরি হলেও পরবর্তীতে তিনি বহুস্তরেও সফলতা পান।
  • ২০০১ সালে, ডারমাটোলজিস্ট উইতে অয়েস্টারহফ, চিকিৎসক উইলিয়েম ভ্যান এলেন এবং ব্যবসায়ী উইলিয়েম ভ্যান কুতেন যৌথভাবে ঘোষণা করেন যে তারা একটি কার্যকর পদ্ধতিতে কোষ-চাষের মাধ্যমে মাংস তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন।
  • ২০০২ সালে, NSR/Tuoro Applied BioScience Consortium প্রথমবারের মতো গোল্ডফিশের কোষ থেকে চাষকৃত ভোজ্য মাংসপেশি তৈরি করে।

এই গবেষণাকে আরও এগিয়ে নিতে PETA ঘোষণা দেয়—২০১২ সালের মধ্যে যদি কোনো প্রতিষ্ঠান বাণিজ্যিকভাবে কৃত্রিম মাংস উৎপাদন করতে পারে, তবে তারা এক মিলিয়ন ডলার পুরস্কার পাবে। এদিকে ডাচ সরকারও চার মিলিয়ন ডলার অনুদান দেয় এই গবেষণায় উৎসাহ দিতে।

২০১২ সালের মধ্যে বিশ্বের ৩০টিরও বেশি গবেষণাগার ঘোষণা দেয়, তারা কৃত্রিম মাংস উৎপাদনের জন্য সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।

এইসব ঐতিহাসিক মুহূর্তগুলোই আজকের ‘ল্যাব-উৎপাদিত মাংস’ নামক বিপ্লবের ভিত্তি তৈরি করেছে—যা হয়তো ভবিষ্যতে খাবারের সংজ্ঞাই বদলে দেবে।

প্রথম ল্যাবে উৎপাদিত মিট-স্টেক

২০১৩ সালে ল্যাবে তৈরি প্রথম গরুর মাংসের বার্গার যেভাবে ইতিহাস গড়েছিল

প্রায় এক দশক আগে, যেদিন মানুষ চাঁদে পা রাখার মতো বিস্ময়ের সঙ্গে চেয়েছিল একটি প্লেটের দিকে—সেদিনই খাদ্য ইতিহাসে লেখা হয়েছিল এক নতুন অধ্যায়। ২০১৩ সালের ৫ আগস্ট, বিশ্বের চোখ তখন লন্ডনের এক ছোট্ট মঞ্চে। মাস্ট্রিখট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মার্ক পোস্ট তুলে ধরলেন ইতিহাসের প্রথম ল্যাবে তৈরি গরুর মাংসের বার্গার, যার মূল্য ছিল চোখ কপালে তোলার মতো—২,৫০,০০০ ইউরো!

বিজ্ঞানীরা গরুর শরীর থেকে কোষ সংগ্রহ করে সেগুলিকে ধাপে ধাপে মাংসপেশিতে রূপান্তর করেন। পরে সেগুলো দিয়ে তৈরি হয় বার্গারের পেটি। 

কালচারড মাংসে তৈরি প্রথম হ্যামবার্গার

খাদ্য সমালোচকরা যখন প্রথমবারের মতো ল্যাবে তৈরি মাংসের স্বাদ গ্রহণ করেন, তখন তাদের প্রতিক্রিয়ায় ফুটে ওঠে বিস্ময়, সম্ভাবনা আর কিছুটা স্বাদ-সংক্রান্ত বাস্তবতা।

হ্যানি রুজলার বলেন,

“এর প্রতিটি কামড়ে রয়েছে মাংসের স্বাদ। তবে আমি জানি, এর ভেতরে কোনো ফ্যাট নেই, তাই এটি মাংসের মত রসালো হতে পারবে না—সেটাই স্বাভাবিক। তবে ‘মাংস’ বলতেই আমার কোনো দ্বিধা নেই। শুধু গঠনটা যদি আরেকটু নরম হতো, তাহলে আরো ভালো লাগত।”

অন্যদিকে, খাদ্য লেখক জোস সোনাল্ড মন্তব্য করেন,

“এটা আসলে মাংসের মতোই। কিন্তু আমি ফ্যাট মিস করছি খুব। সব মিলিয়ে এটা একেবারে আসল হ্যামবার্গারের মতোই খেতে।”

এই কৃত্রিম মাংস তখন দেখতে কিছুটা সাদাটে ছিল। কারণ এতে মায়োগ্লোবিন ছিল না , যা মাংসকে দেয় সেই লালচে আকর্ষণীয় রঙ। পরবর্তীতে বিজ্ঞানীরা এটিও যোগ করার পরিকল্পনা করেন, যেন স্বাদ, গন্ধের পাশাপাশি এটি আসল মাংসের মত দেখায়।

কৃত্রিম মাংস বিপ্লবের পথচলা

২০১৩ সালের ঐতিহাসিক বার্গারের উপস্থাপনার পরপরই বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে কালচারড মাংস নিয়ে স্টার্টআপ উদ্যোগের জোয়ার। গবেষণাগার থেকে প্লেটে মাংস আনার এই স্বপ্ন বাস্তব রূপ নিতে থাকে নানা কোম্পানির হাত ধরে।

এরমধ্যে অন্যতম পথিকৃৎ প্রতিষ্ঠান হলো ‘মেমফিস মিট’। ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে তারা প্রথম গরুর মাংসের তৈরি মিটবল প্রকাশ্যে আনে। এরপর মার্চ মাসেই তারা আরও এক ধাপ এগিয়ে, উপস্থাপন করে মুরগি ও হাঁসের কোষ থেকে তৈরি কৃত্রিম মাংস। এটি ছিল একটি বৈপ্লবিক মুহূর্ত। কারণ এর মাধ্যমে বোঝা গেল, শুধু গরুই নয়, বিভিন্ন প্রাণীর মাংসও একই প্রক্রিয়ায় উৎপাদন সম্ভব।

তবে বাস্তবতা হলো, এই মাংস এখনো আমাদের সবার নাগালের মধ্যে নেই। প্রতি কেজি কালচারড মুরগির মাংসের দাম দাঁড়ায় প্রায় ১৮ লক্ষ টাকা (বাংলাদেশি মুদ্রায়)। যা সাধারণের জন্য নিছক কল্পনা।

তবু আশাবাদীরা বলছেন, প্রযুক্তির উন্নয়ন ও উৎপাদন ব্যয়ের হ্রাস ঘটলেই খুব দ্রুত এই মাংস বিকল্প বাজারে আধিপত্য বিস্তার করতে পারে।

এদিকে, ইসরায়েলি কোম্পানি ‘সুপার মিট’ ২০১৬ সালে একটি ভাইরাল ক্রাউডফান্ডিং ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে ব্যাপক দৃষ্টি কাড়ে। শুধু প্রযুক্তি নয়, জনগণের প্রত্যক্ষ সমর্থন আর আগ্রহও কালচারড মাংসকে নতুন গতি দেয়।

কেন ল্যাব-মাংস দরকার হচ্ছে?

বিশ্বের জনসংখ্যা বাড়ছে, সেই সাথে বাড়ছে মাংসের চাহিদা। কিন্তু ঐতিহ্যবাহী পশুপালন পরিবেশের উপর অনেক চাপ দিচ্ছে। বন ধ্বংস হচ্ছে, পানি দূষিত হচ্ছে, কার্বন নির্গমন বাড়ছে। এসব সমস্যা সমাধানে বিজ্ঞানীরা ল্যাবে তৈরি মাংসের বিকল্প খুঁজছেন।

এই মাংস তৈরিতে পশুকে হত্যা করতে হয় না। বরং পশুর শরীর থেকে কোষ নিয়ে সেটিকে ল্যাবে বড় করে তোলা হয়। এতে এক দিকে পশুর কষ্ট কমে, অন্যদিকে পরিবেশের ওপর চাপও কম হয়। কিন্তু এই প্রযুক্তি এখনো পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে। এর উৎপাদন খরচ বেশি, স্বাদ-গন্ধ নিয়ে প্রশ্ন আছে, এবং অনেক দেশ এখনো এটি আইনি স্বীকৃতি দেয়নি।

ল্যাবে কৃত্রিম মাংস তৈরি হচ্ছে

কালচারড মাংস তৈরির প্রক্রিয়া

বায়োটেকনোলজি ব্যবহার করে টিস্যু কালচারের মাধ্যমে তৈরি হচ্ছে কৃত্রিম মাংস। এই প্রক্রিয়াটি তুলনামূলকভাবে সহজ হলেও সময়সাপেক্ষ এবং ব্যয়বহুল। মূলত পশুর শরীর থেকে সংগ্রহ করা স্টেম সেল একটি পুষ্টিসমৃদ্ধ পরিবেশে বর্ধিত করা হয়, যা ধীরে ধীরে মাংসের মতো গঠনে পরিণত হয়। উদ্ভিদ-ভিত্তিক খাবার তৈরির কিছু ধাপের সঙ্গে এর মিল থাকলেও মূল পার্থক্য হলো—প্রোটিন উৎসটি কোষ-নির্ভর।

 ধাপ ১: স্টেম সেল সংগ্রহ

শুরুতে পশুর শরীর থেকে স্টেম সেল বা মূল কোষ সংগ্রহ করা হয়। এই কোষগুলোই মূলত পরে মাংস, চর্বি বা টিসুতে পরিণত হয়।

 ধাপ ২: কোষের বৃদ্ধি ‘কাল্টিভেটরে’

এই সেলগুলো রাখা হয় বায়োরিয়্যাক্টর বা ‘কাল্টিভেটর’ নামক একধরনের কৃত্রিম পরিবেশে, যেখানে পুষ্টিসমৃদ্ধ দ্রবণ (যেমন অ্যামিনো অ্যাসিড, গ্লুকোজ, ভিটামিন) দিয়ে কোষগুলোকে পালিত করা হয়।

ধাপ ৩: গঠনের দিকে যাত্রা

কিছুদিনের মধ্যে কোষগুলো রূপ নেয় মাংসের তিনটি প্রধান উপাদানে:

  • মাংসপেশি (Muscle fiber) 
  • চর্বি (Fat) 
  • সংযোগকারী টিসু (Connective tissue)

ধাপ ৪: স্ক্যাফোল্ডিং—গঠন তৈরি

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো স্ক্যাফোল্ডিং, যেখানে কোষগুলোকে এমনভাবে সাজানো হয় যেন এগুলো বাস্তব মাংসের মতো দেখতে এবং খেতে হয়। বার্গার তৈরিতে তুলনামূলকভাবে স্ক্যাফোল্ডিং কম লাগে, কিন্তু স্টেকের মতো জটিল গঠন পেতে হলে অনেক নিখুঁত স্ক্যাফোল্ডিং দরকার।

পুরো প্রক্রিয়াটি শেষ হতে লাগে মাত্র ২ থেকে ৮ সপ্তাহ—যা বাস্তব পশু পালনের চেয়ে কয়েকগুণ দ্রুত!

কৃত্রিম মাংসের ভবিষ্যৎ 

বিশ্বব্যাপী দ্রুত বাড়তে থাকা জনসংখ্যা, পশু কল্যাণ এবং পরিবেশগত সংকটের কারণে মাংস উৎপাদনের বিকল্প খোঁজার প্রবণতা বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে, ল্যাবে উৎপাদিত কৃত্রিম মাংস—যাকে কালচারড মিট, ল্যাব মিট, বা সেলুলার মিট বলা হয়—একটি বিপ্লবী উদ্ভাবন হিসেবে উঠে এসেছে।

সম্ভাবনা ও উন্নয়ন:

  • মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং সিঙ্গাপুরে ইতোমধ্যে ল্যাব মাংস মানুষের খাদ্য বা পোষা প্রাণীর খাদ্য হিসেবে অনুমোদিত হয়েছে। 
  • ম্যাককিন্সির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০৩০ সাল নাগাদ ল্যাবে উৎপাদিত মাংস বিশ্বের মাংস বাজারের ০.৫% দখল করতে পারে, যা ২৫ বিলিয়ন ডলারের একটি শিল্প হয়ে উঠবে। 
  • কৃত্রিম মাংস উৎপাদনের মাত্রা বাড়ালে এটি জলবায়ু পরিবর্তন রোধ, প্রাণী নির্যাতন হ্রাস এবং খাদ্য নিরাপত্তা বৃদ্ধিতে অবদান রাখতে পারে।

প্রযুক্তিগত অগ্রগতি:

  • মাত্র ০.০০১ পাউন্ড গরুর কোষ থেকে ৪.৪ বিলিয়ন পাউন্ড মাংস উৎপাদন সম্ভব, যা অভাবনীয়। 
  • টিস্যু কালচার প্রযুক্তি, জৈবপ্রযুক্তি (Biotechnology) এবং বায়োরিঅ্যাক্টর প্রযুক্তির সহায়তায় মাংস উৎপাদন করা হচ্ছে, যার ফলে পশু হত্যা ছাড়াই মাংস খাওয়া সম্ভব হচ্ছে।

চ্যালেঞ্জ:

  • বর্তমানে এটি প্রাকৃতিক মাংসের তুলনায় প্রায় ৪০% বেশি ব্যয়বহুল। 
  • অনেক দেশ এখনও এর আইনি স্বীকৃতি দেয়নি। ইতালি তো এই প্রযুক্তিকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ করেছে।

যদিও এটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে, কিন্তু পশু কল্যাণ ও পরিবেশ রক্ষায় এর ভূমিকা অপরিসীম। ভবিষ্যতে প্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে কৃত্রিম মাংস আরও সহজলভ্য, সাশ্রয়ী এবং পুষ্টিকর হয়ে উঠবে।

কৃত্রিম মাংসের স্বাস্থ্য ঝুঁকি আছে কি? 

ল্যাব মাংস স্বাস্থ্যসম্মত কি না, তা নিয়ে অনেক বিতর্ক ও গবেষণা চলছে। এটির পক্ষে যেমন শক্তিশালী যুক্তি রয়েছে, তেমনি কিছু ঝুঁকিও অস্বীকার করা যায় না।

ইতিবাচক দিক:

  • চর্বি, গ্লুটেন, স্যাচুরেটেড ফ্যাট ইচ্ছেমতো নিয়ন্ত্রণ করা যায়। 
  • কোলেস্টেরল বা অ্যালার্জির রোগীদের জন্য উপযোগী। 
  • অ্যান্টিবায়োটিক বা হরমোন ব্যবহার ছাড়াই তৈরি হয়।

সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি:

  • ল্যাবে উৎপাদিত মাংসে প্রাকৃতিক খাদ্য শৃঙ্খলার পুষ্টিগুণ কৃত্রিমভাবে সংযোজন করতে হয়। এটি দীর্ঘমেয়াদে শরীরের উপর কেমন প্রভাব ফেলবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। 
  • যেহেতু কোষগুলোতে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকে না, তাই উৎপাদন প্রক্রিয়াকে ১০০% জীবাণুমুক্ত রাখতে হয়, যা চ্যালেঞ্জিং। 
  • পুষ্টিগুণ এবং হজমযোগ্যতা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি মানব গবেষণা প্রয়োজন।

বর্তমানে কৃত্রিম মাংস নিরাপদ মনে হলেও, এটি সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ার আগে বিস্তৃত, দীর্ঘমেয়াদী ক্লিনিকাল ট্রায়াল ও গবেষণা প্রয়োজন। তবে তুলনামূলকভাবে এটি প্রাকৃতিক মাংসের চেয়ে কম স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

ল্যাব মিট কিভাবে পরিবেশ রক্ষা করে? 

ল্যাবে উৎপাদিত মাংস জলবায়ু সংকট মোকাবিলা ও বাস্তুতন্ত্র রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

পরিবেশগত সুবিধা:

  • Worldwatch Institute জানায়, পশুপালন বিশেষ করে পোল্ট্রি ও গবাদিপশু খাতে বিশ্বব্যাপী ৫১% গ্রিনহাউস গ্যাসের উৎস। কৃত্রিম মাংস এই নির্ভরতা অনেকাংশে কমাতে পারে। 
  • বনভূমি ধ্বংস, জলদূষণ, অতিরিক্ত পানি ও খাদ্য ব্যবহার- এই সমস্যাগুলো থেকে অনেকটাই মুক্তি পাওয়া সম্ভব। 
  • মাংস শিল্পের জন্য প্রতিবছর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ১ বিলিয়ন মুরগি হত্যা করা হয়, যা ল্যাব মাংসের মাধ্যমে কমে যেতে পারে।

শক্তির ব্যবহার ও পরিবেশ:

  • যদিও বর্তমানে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় শক্তি ব্যবহার হয়, তবে ভবিষ্যতে নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহার করে কার্বন নিঃসরণ আরও কমানো সম্ভব। 
  • খাদ্য অপচয় কমানো, পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিং এবং দীর্ঘস্থায়ী সংরক্ষণের মাধ্যমে পরিবেশগত চাপ হ্রাস পাবে।

ল্যাব মাংস যদি বিশ্বব্যাপী প্রাকৃতিক মাংসের চাহিদার মাত্র ৩০–৫০% প্রতিস্থাপন করে, তবেই গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন, পানির অপচয় এবং পশু নির্যাতন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।

কৃত্রিম মাংস কি হালাল?

বিশ্বে মাংসের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। এই চাহিদা মেটাতে অনেক দেশ এখন ল্যাবে তৈরি কৃত্রিম মাংস উৎপাদনের দিকে ঝুঁকছে। তবে অনেক মুসলিম ভোক্তার মনে একটি প্রশ্ন দেখা দিয়েছে- এই কৃত্রিম মাংস কি ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী হালাল? বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃত্রিম মাংস হালাল হতে পারে, তবে নির্দিষ্ট কিছু শর্ত মানতে হবে।

গুড মিট নামের একটি স্টার্টআপ কোম্পানির তিনজন শরিয়াহ বিশেষজ্ঞের মতে, কৃত্রিম মাংস সাধারণত পশুর শরীর থেকে নেওয়া জীবিত কোষ দিয়ে তৈরি হয়। এই কোষ যদি ইসলামিক নিয়ম অনুযায়ী জবাই করা পশু থেকে নেওয়া হয়, তবে সেগুলো থেকে তৈরি মাংসকে হালাল বলা যাবে। 

একটি প্রশ্ন আমাদের ভাবনায় জায়গা করে নিচ্ছে—আমরা কি শুধুমাত্র স্বাদ বা অভ্যাসের জন্য প্রাণী হত্যা করছি?  যদি প্রযুক্তির সহায়তায় একই স্বাদ, পুষ্টিগুণ এবং নিরাপত্তা পাওয়া যায় প্রাণহানি ছাড়াই, তবে সেই বিকল্পকে গুরুত্ব দেওয়া কি যুক্তিসঙ্গত নয়?

ল্যাবে তৈরি কৃত্রিম মাংস আমাদের সামনে এমন একটি সম্ভাবনা খুলে দিয়েছে, যেখানে খাদ্য উৎপাদন আরও নৈতিক, পরিবেশবান্ধব এবং দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হতে পারে। এই প্রযুক্তি হয়তো ভবিষ্যতে প্রাণী নির্ভরতা কমিয়ে আমাদের খাদ্যব্যবস্থায় একটি গঠনমূলক পরিবর্তন আনবে।

তথ্যসূত্রঃ

Related posts

কেন বাড়ি ভাড়া বাড়তেই থাকে? বাড়ি ভাড়া বৃদ্ধির কারণ ও সমাধান

চুল পড়ার আসল বৈজ্ঞানিক কারণ কী?

প্লুটো: কেন একে রহস্যময় গ্রহ বলা হয়

Leave a Comment

Table of Contents

    This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More