Image default
পথে প্রান্তরে

মিরিঞ্জা ভ্যালি: মেঘের রাজ্যে স্বপ্নিল ভ্রমণ

এটি এমন এক ভ্রমণ যেখানে নেই কোন বিদ্যুৎ বা ইন্টারনেট আছে শুধুই প্রকৃতির নির্জনতা! 

শহরের ব্যস্ততা ও যান্ত্রিকতা থেকে যদি কিছুদিনের জন্য শান্তির ছুটি পাওয়া যায়, তাহলে কেমন হয়? এক গবেষণায় দেখা গেছে, ভ্রমণ মানুষের ক্লান্তি ও দুশ্চিন্তা দূর করার টনিক হিসেবে কাজ করে।

আর এমনই এক স্থান হলো বান্দরবানের মিরিঞ্জা ভ্যালি, যেখানে আপনি প্রকৃতির কাছে পাহাড়ি অরণ্যে চাইলেই হারিয়ে যেতে পারেন। এখানে পাহাড়, নদী, ঝর্ণা, বনাঞ্চল এবং বিচিত্র গাছপালা মিলে এক অনন্য সৌন্দর্যের সৃষ্টি করেছে, যা প্রকৃতিপ্রেমী ও অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয়দের জন্য পারফেক্ট।

মিরিঞ্জা ভ্যালির অবস্থান

মিরিঞ্জা ভ্যালি বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বান্দরবান জেলার লামা উপজেলায় অবস্থিত। লামা উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার এবং বান্দরবান জেলা শহর থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত এই মিরিঞ্জা ভ্যালি প্রায় ১৬৪০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত, যা বান্দরবানের অন্যতম উচ্চতম পর্যটন স্থানগুলোর একটি।

মিরিঞ্জা ভ্যালির উৎপত্তি 

পাহাড়প্রেমীদের জন্য মিরিঞ্জা ভ্যালি বর্তমানে খুব জনপ্রিয় একটি স্থান। কিন্তু এর আগে এর অস্তিত্ব কি ছিলো না? 

আসলে, মিরিঞ্জা ভ্যালির সুনির্দিষ্ট ইতিহাস বা নামকরণের উৎপত্তি সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। তবে, ২০০৩ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর যখন প্রায় ১৬ একর পাহাড়ি ভূমির ওপর মিরিঞ্জা পর্যটন কমপ্লেক্স প্রতিষ্ঠিত হয় তখন এই পর্যটন কেন্দ্রটির বিকাশ ঘটে। এর আগে এটি ছিলো মূলত ট্রেকারদের জন্য একটি আকর্ষণীয় গন্তব্য। তবে কমপ্লেক্স গড়ে ওঠার পর সাধারণ দর্শনার্থীদের আনাগোনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে।

পরবর্তীতে, ২০০৫ সালের ১৯ এপ্রিল, মিরিঞ্জা পাহাড়ের দক্ষিণ প্রান্তে বিশাল টাইটানিক জাহাজের আদলে একটি ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়, যা দ্রুত পর্যটকদের মূল আকর্ষণে পরিণত হয়।

মিরিঞ্জা ভ্যালির টাইটানিক জাহাজের আদলে ভাস্কর্য

মিরিঞ্জা ভ্যালির সংস্কৃতি

মিরিঞ্জা ভ্যালির আশেপাশে নানা উপজাতি সম্প্রদায় রয়েছে, যেমন চাকমা, মণিপুরী, ত্রিপুরা এবং অন্যান্য পাহাড়ি জাতি। এদের জীবনযাত্রায় এখনও প্রাচীন ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতি রক্ষা করা হচ্ছে। তারা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান এবং বিভিন্ন উৎসব পালন করে, যা তাদের সংস্কৃতির বিশেষ অংশ।

মিরিঞ্জা ভ্যালিতে ঘুরতে গেলে, আপনি এই সম্প্রদায়গুলোর জীবনযাত্রা এবং তাদের ঐতিহ্য সঙ্গে পরিচিত হতে পারবেন। তাদের মুখরোচক খাবার, রঙিন পোশাক, অতিথিপরায়ণতা এবং নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আপনাকে মুগ্ধ করবে। ঐতিহ্যবাহী গান, নৃত্য এবং ধর্মীয় রীতিনীতি উপভোগ করা এখানকার ভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণ।

মিরিঞ্জা ভ্যালিতে যা যা দেখা যাবে

পাহাড়ি দৃশ্য 

মিরিঞ্জা ভ্যালির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো এখান থেকে বিস্তৃত পাহাড়ি এলাকা ও উপত্যকাগুলো দেখা যায়। দূর থেকে সারি সারি পাহাড়ের নীলচে রঙ এক অপূর্ব দৃশ্য তৈরি করে। বিশেষ করে শীতকালে পাহাড়ের গায়ে লেগে রাখা সকালের কুয়াশা, যে কাউকে মুগ্ধ করবে।

মেঘের রাজ্য

মিরিঞ্জা ভ্যালির অন্যতম বড় আকর্ষণ হলো এর মেঘে ঢাকা অপরূপ দৃশ্য। চারপাশে ভাসমান মেঘ দেখে মনে হবে, যেন আপনি মেঘের রাজ্যে দাঁড়িয়ে আছেন। সকালবেলায় কুয়াশার চাদরে মোড়ানো পাহাড়গুলো এতটাই মনোমুগ্ধকর যে, মনে হবে হাত বাড়ালেই মেঘ ছোঁয়া যাবে। যারা পাহাড়ের মেঘের সৌন্দর্য উপভোগ করতে চান, তাদের জন্য এটি সত্যিকারের এক স্বর্গীয় স্থান।

মেঘে ঢাকা মিরিঞ্জা ভ্যালি

সুর্যোদয় ও সূর্যাস্তের মোহময় দৃশ্য

মিরিঞ্জা ভ্যালি থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের দৃশ্য সত্যিই অতুলনীয়। ভোরে, যখন সূর্য ধীরে ধীরে পূর্ব আকাশে উঁকি দেয়, চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে সোনালি আভা। আবার বিকেলে, সূর্য পশ্চিমে ডুবতে থাকলে পাহাড়ের গায়ে লালচে আলো পড়ে।

সাঙ্গু নদীর অপূর্ব দৃশ্য

পরিষ্কার আবহাওয়ায় মিরিঞ্জা ভ্যালি থেকে বাংলাদেশের একমাত্র পাহাড়ি নদী সাঙ্গু এবং তার আশপাশের মনোরম প্রকৃতি দেখা যায়। সবুজ পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে বয়ে চলা এই নদী বান্দরবান শহরের দিকে গেছে। পাহাড়ের চূড়া থেকে সাঙ্গু নদীর এই মনোরম দৃশ্য পর্যটকদের মুগ্ধ করে। 

ঝরনা ও সবুজ বন: প্রকৃতির নিবিড় আলিঙ্গন

মিরিঞ্জা ভ্যালির আশপাশে রয়েছে ছোট ছোট ঝরনা ও গভীর সবুজ অরণ্য। তার সাথে পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা ঝরনার ঝিরঝির ধ্বনি প্রকৃতিপ্রেমীদের মনে প্রশান্তি এনে দেয়। চারদিকে ঘন সবুজ বন, যেখানে নানা প্রজাতির গাছপালা পরিবেশকে আরও মনোমুগ্ধকর করে তোলে।

 মিরিঞ্জা ভ্যালি কিভাবে যাবেন 

ঢাকা থেকে বান্দরবানের জন্য বেশ কয়েকটি ট্রান্সপোর্ট সার্ভিস রয়েছে। 

বাসে মিরিঞ্জা ভ্যালি 

মিরিঞ্জা ভ্যালি বাস সার্ভিস আছে। এই বাসগুলোতে ঢাকা থেকে বান্দরবান যেতে প্রায় ৯-১০ ঘণ্টা সময় লাগে। 

ঢাকা থেকে যাত্রা শুরু করার জন্য ঢাকার রাজারবাগ, ফকিরাপুল, সায়েদাবাদ বা কলা বাগান থেকে  বিভিন্ন বাস কোম্পানি যেমন- সোহাগ, শ্যামলী, হানিফ, সেইন্ট মার্টিন ট্রাভেলস, মার্শা ইত্যাদির বাস পাওয়া যায়। এসব বাস সাধারণত রাত ৮টা থেকে ১০টার মধ্যে বান্দরবানের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়।

ঢাকা থেকে বান্দরবান যাওয়ার বাস ভাড়া সাধারণত ৬০০ থেকে ১৫০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। এই ভাড়া নির্ভর করে বাস কোম্পানি এবং বাস শ্রেণীর ওপর।

ট্রেনে বান্দরবান

ট্রেনে করে সরাসরি বান্দবান যাওয়া যায় না। এক্ষেত্রে প্রথমে চট্টগ্রাম যেতে হবে। যদি আপনি ট্রেনে যেতে চান তাহলে, ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে সরাসরি চট্টগ্রাম পর্যন্ত যেতে পারেন। ট্রেনে চট্টগ্রাম যেতে সময় লাগবে প্রায় ৬ ঘণ্টা। 

রেলপথে ভাড়া প্রায় ৩৫০ থেকে ১০০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। চট্টগ্রামে পৌঁছানোর পর, বাস বা প্রাইভেট গাড়িতে সরাসরি চকরিয়া বাস টার্মিনালে যেতে পারবেন। এক্ষেত্রে বাসে ভাড়া পড়বে ৩৫০ টাকা। 

চকরিয়া থেকে লামা-আলীকদম সড়ক ধরে মিরিঞ্জা ভ্যালিতে যাওয়ার জন্য সিএনজি, চাঁদের গাড়ি বা লোকাল বাস পাওয়া যায়। বাস কিংবা জিপের ভাড়া ৮০-১২০ টাকা। এই পরিবহনগুলো আপনাকে মিরিঞ্জা পাহাড়ের কাছে নামিয়ে দেবে। গাড়ি থেকে নেমে ১০ মিনিট হাঁটলেই মিরিঞ্জা ভ্যালির রিসোর্টগুলো দেখতে পাবেন।

যারা ট্রেকিং করতে চান, তাদের জন্য চকরিয়া থেকে চান্দের গাড়িতে মুরুম পাড়া পর্যন্ত যেতে হবে। এখান থেকে পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে ২০ মিনিটের সহজ ট্রেকিং পথ রয়েছে। এছাড়া, চান্দের গাড়িগুলো মিরিঞ্জা পর্যন্তও যায়। যেখানে মেইন রোড থেকে ভ্যালি মাত্র ১০ মিনিট হাঁটার দূরত্বে।

কোথায় থাকবেন ও খাবেন?  

থাকার ব্যবস্থা 

মিরিঞ্জা ভ্যালির পাহাড়ের উপরের বাঁশ ও খড়ের মাচাং এবং জুম ঘরগুলো যথেষ্ট পরিবেশবান্ধব । ভ্যালিতে ৪০টিরও বেশি জুম ঘর ও রিসোর্ট রয়েছে। যার ভাড়া প্রতি রাত ২-৬ হাজার টাকা। এখানে বিদ্যুৎ নেই, তবে সোলার প্যানেলের সাহায্যে প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। অনেক রিসোর্টে মোবাইল ফোন এবং অন্যান্য ডিভাইস চার্জ করার জন্য জেনারেটর ব্যবহার করা হয়।

জুম ঘর ছাড়াও এখানে তাবুতে থাকার ব্যবস্থা আছে। খাবারের প্যাকেজসহ তাবুর ভাড়া জনপ্রতি ৮০০-১০০০ টাকা। যেহেতু বর্তমানে স্থানটি বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছে, তাই যেতে চাইলে আগেই কোন রিসোর্ট বুকিং দিয়ে যাওয়া ভালো হবে। না হলে থাকার জায়গা পাওয়া কষ্টকর হতে পারে।

খাবার

মিরিঞ্জা ভ্যালির রিসোর্টগুলোতে তিনবেলা প্যাকেজ খাবারের ব্যবস্থা থাকে। এর মধ্যে, সকালের খাবারে ডিম-খিচুড়ি অথবা মুরগির মাংস প্রদান করা হয়। দুপুরে সাদা ভাত, ডাল, মুরগি, এবং সবজি ও সালাদ থাকে। রাতে বারবিকিউ, চিকেন, কাবাব ও পরোটার ব্যবস্থা আছে। 

এই তিনবেলা খাবারের প্যাকেজের মূল্য সাধারণত ৭০০-১০০০ টাকা হয়ে থাকে। এছাড়া, আপনি চাইলে নিজে রান্না করে খাওয়ার ব্যবস্থা করে নিতে পারেন।

মিরিঞ্জা ভ্যালির রিসোর্ট

মিরিঞ্জা ভ্যালি ভ্রমণের সেরা সময়

মিরিঞ্জা ভ্যালি ভ্রমণের সেরা সময় হল শীতের শুরু, বিশেষ করে নভেম্বর মাস। এই সময় কুয়াশার ঘনঘটা তেমন থাকে না, ফলে পাহাড়ের উপরের দৃশ্যগুলো স্পষ্টভাবে দেখা যায়। বর্ষাকালের শেষ থেকে শরৎকাল পর্যন্ত, প্রায় সারাদিনই পরিষ্কার আকাশে শুভ্র মেঘের খেলা দেখা যায়, পাহাড়ের চূড়া থেকে এই দৃশ্য দেখার অনুভূতির কোনো বিকল্প হয় না। তবে, এই সময় পাহাড়ি পথ পিচ্ছিল থাকে এবং উষ্ণ মৌসুমের কারণে ট্রেকিং কিছুটা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। তাই নভেম্বর মাসই মিরিঞ্জা ভ্যালি ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সময়।

সতর্কতা

  • মিরিঞ্জা ভ্যালিতে প্রাকৃতিক বিপদ যেমন ভূমিধ্বস, বন্যা, বা আকস্মিক আবহাওয়া পরিবর্তন ঘটতে পারে। এ কারণে আবহাওয়ার পূর্বাভাস আগে দেখে নিন।
  • সতর্কভাবে হেঁটে চলুন এবং ভারি ব্যাগ বহন এড়িয়ে চলুন।
  • অবশ্যই দল বেঁধে যাওয়া চেষ্টা করবেন।
  • যদি আপনি একা ভ্রমণ করেন, জনবসতি বা ভ্রমণকারী এলাকায় থাকার চেষ্টা করুন।
  • খাবার পানি,শুকনো খাবার, টর্চলাইট ও প্রাথমিক চিকিৎসার সরঞ্জাম সাথে রাখুন।
  • মিরিঞ্জা ভ্যালির আশপাশে বন্যপ্রাণীর উপস্থিতি থাকতে পারে। নিরাপদ দূরত্বে থেকে তাদের পর্যবেক্ষণ করুন।
  • সার্বিক নিরাপত্তার প্রয়োজনে কিছু জায়গায় চেকিং হতে পারে। তাই সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্র বা পেশাগত বা ইউনিভার্সিটির পরিচয়পত্র রাখুন।
  • আদিবাসী সম্প্রদায়ের প্রতি কোনো অবস্থাতেই যেন কোনো অযাচিত মনোভাব প্রদর্শন না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখুন।

মিরিঞ্জা ভ্যালি প্রকৃতির সৌন্দর্য এবং নৈসর্গিক দৃশ্যের এক অপূর্ব মিশ্রণ। এটি এমন একটি স্থান যা প্রকৃতি, সংস্কৃতি, এবং অ্যাডভেঞ্চারের এক চমৎকার সমন্বয়। যদি আপনি শহরের ব্যস্ত জীবন থেকে প্রকৃতিকে উপভোগ করতে এখানে আসেন, আপনি সেটিও করতে পারবেন। আবার যদি আপনি অ্যাডভেঞ্চারের জন্য এখানে আসেন সেটাও উপভোগ করতে পারবেন। 

রেফারেন্স

Related posts

জাফলং ভ্রমণ: এক টিকেটে বহু সিনেমা

ইসরাত জাহান ইরা

​’লাল’ নয় ‘সাদা কেল্লা’ ভ্রমণ

বাংলাদেশে বাইক রাইড ট্রিপ এর সেরা রাস্তা

পুশরাম চন্দ্র

Leave a Comment

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More