Image default
পথে প্রান্তরে

বাংলার অ্যামাজন – রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট ভ্রমণ

নিস্তব্ধ দুপুর, শুধু নৌকার বৈঠা শব্দ করছে ছলাৎ ছল ছলাৎ ছল, তটিনীর কূলে ডেকে যাচ্ছে একলা ডাহুক। রংবেরঙের নৌকা নদীর ওপর সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড়িয়ে আছে—বলছি বাংলার অ্যামাজন খ্যাত রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্টের কথা। 

রাতারগুলের বিস্তীর্ণ জলাবনে প্রবেশ করতেই, মনে হয় যেন প্রকৃতি নিজেই আপনাকে তার অন্দর মহলে ডেকে নিচ্ছে। এখানে প্রবাহিত পানির মাঝে ডুবে থাকা গাছ, শান্ত নদীর স্রোত এবং উদ্ভিদের অপরূপ দৃশ্য যেন এক বিশেষ জগৎ তৈরি করেছে। একমাত্র অ্যামাজন বনের সাথেই তুলনা চলে এই অনিন্দ্যসুন্দর বিশাল এ বনের। রেইন ফরেস্ট নামে পরিচিত হলেও বিশ্বের স্বাদুপানির সব চাইতে বড় সোয়াম্প ফরেস্ট কিন্তু ওই অ্যামাজনই। আর ঠিক অ্যামাজন সোয়াম্পের মতোই স্বাদুপানির বন আমাদের এই রাতারগুল। 

রাতারগুল বনের পরিচিতি 

রাতারগুল জলাবন সিলেটের গোয়াইনঘাটে অবস্থিত বাংলাদেশের এক অবিশ্বাস্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের স্থান। এক সময়, রাতারগুলকে বাংলাদেশের একমাত্র জলাবন হিসেবে ধরা হতো, কিন্তু পরে জানা যায়, বাংলাদেশে আরো কিছু জলাবন যেমন— জুগিরকান্দি মায়াবন, বুজির বন ও লক্ষ্মী বাওড় জলাবনও রয়েছে। জেনে অবাক হবেন, পৃথিবীতে মাত্র ২২টি মিঠাপানির জলাবন আছে, আর রাতারগুল তাদের মধ্যে অন্যতম। 

রাতার গুল সোয়াম্প ফরেস্টের আয়তন ৩,৩২৫.৬১ একর। এ বনের ৫০৪ একর এলাকাকে ১৯৭৩ সালে বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এছাড়াও, ২০১৫ সালে এই বনকে বিশেষ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করার মাধ্যমে বনের গুরুত্বকে আরও একধাপ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।

রাতারগুল

রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্টের অবস্থান 

সিলেট শহর থেকে ২৬ কিলোমিটার দূরে গোয়াইনঘাট উপজেলার ফতেহপুর ইউনিয়নের গুয়াইন নদীর দক্ষিণে রাতারগুলের অবস্থান। জলের মধ্যে ভেসে থাকা সবুজ বৃক্ষ, তার মাঝ দিয়ে নৌকায় করে রাতারগুলে ঘুরে বেড়ানোর যাবে মাত্র ১ থেকে ২ ঘন্টায়; চাইলে আরো বেশি সময়ও কাটাতে পারেন। 

বন বিভাগের তথ্যমতে, বনের আয়তন ৩ হাজার ৩শ ২৫ দশমিক ৬১ একর। ১৯৭৩ সালে বনের ৫০৪ একর বনভূমিকে বন্য প্রাণীর অভয়ারণ্য ঘোষণা করা হয়। স্থানীয় মানুষজনের কাছে এই বন “সুন্দরবন” নামেই বেশি পরিচিত।

রাতারগুলের নামকরণ

সিলেটের স্থানীয় ভাষায় মূর্তা গাছকে “রাতা গাছ” বলা হয়। সেই রাতা গাছের নামানুসারে এই বনের নামকরণ করা হয়েছে রাতারগুল। এই বনের নামকরণে স্থানীয় ভাষা ও সংস্কৃতির সংমিশ্রণের প্রতিফলন ঘটেছে।

মূর্তা গাছ

বনের জলবায়ু

রাতারগুলের জলবায়ু অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। সিলেটের উত্তর-পূর্বে অবস্থিত এই বন প্রতিবছর ভারী বৃষ্টিপাতের মুখে পড়ে। সিলেট আবহাওয়া কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, এখানে বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ প্রায় ৪১৬২ মিলিমিটার। জুলাই মাসে বৃষ্টিপাত হয় সবচেয়ে বেশি। এ সময় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ থাকে প্রায় ১২৫০ মিলিমিটার। আবার, ডিসেম্বর মাসটি সবচেয়ে শুষ্ক থাকে। এখানে গ্রীষ্মে তাপমাত্রা ৩২°C হলেও, শীতে তা ১০-১২°C পর্যন্ত নেমে আসে।

রাতারগুলে যা যা দেখবেন

অদ্ভুত এই জলের রাজ্য ভ্রমণে দেখা যাবে, কোনো গাছের কোমর পর্যন্ত ডুবে আছে পানিতে। একটু ছোট যেগুলো, সেগুলোর আবার শরীরের অর্ধেকটায় ডুবে গেছে জলে। ঘন হয়ে জন্মানো গাছপালার কারণে কেমন যেন আলো-আধারির এক মাদকতাময় খেলা চলে বন জুড়ে। বনের মাঝ দিয়ে চলতে গেলে ভ্রমণ পিসাসুদের জড়িয়ে ধরবে নানা ধরনের গাছপালা। 

রাতারগুলের উদ্ভিদ বৈচিত্র্য

রাতারগুল জলাবনে দুই স্তরের উদ্ভিদ দেখা যায়। উপরের স্তরে রয়েছে বৃক্ষজাতীয় গাছ, আর নিচে রয়েছে ঘন পাটিপাতা। এ বনে ৭৩টি প্রজাতির উদ্ভিদের সন্ধান পাওয়া গেছে। মূলত প্রাকৃতিক বন হলেও, বাংলাদেশ বন বিভাগ এখানে জলসহিষ্ণু গাছ যেমন- বেত, কদম, হিজল, মূর্তা, করচ, বরুণ ইত্যাদি গাছের চাষ করেছে। এসব গাছ এই জলাবনকে এক অনন্য পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।

রাতারগুলের বিভিন্ন গাছ

প্রাণীজগতের বৈচিত্র্য

রাতারগুলের জলমগ্ন পরিবেশে সাপ, জোঁক, বানর, গুই সাপ এবং নানা প্রজাতির পাখি এবং মাছ বাস করে। বিশেষত, শীতকালে এখানে পরিযায়ী পাখির সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। যেমন- বালিহাঁস, শকুন, সাদা বক, মাছরাঙ্গা, টিয়া, বুলবুলি ইত্যাদি। মাছের মধ্যে টেংরা, খলিসা, পাবদা, রুই, আইড়, কালবাউশ ইত্যাদি মাছ পাওয়া যায়।

জলের নিচের অপূর্ব জগৎ

বর্ষায় রাতারগুলের স্বচ্ছ পানির নিচে ডুবে থাকা গাছগুলো দেখার অভিজ্ঞতা অপূর্ব। বন এভাবে জলে ডুবে থাকে বছরে চার থেকে সাত মাস। বর্ষা কাটলেই দেখা যাবে অন্য চেহারা। সে সৌন্দর্য আবার অন্য রকম! শীতকালে পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে জেগে ওঠে মূর্তা ও জালি বেতের বাগান। তখন বনের ভেতরের ছোট নালাগুলো পরিণত হবে পায়ে চলা পথে। সেই পথ দিয়ে হেঁটে অনায়াসে ঘুরে বেড়ানো যায়।

রাতারগুল বনে ঢুকতে হয় ডিঙি নৌকায় চেপে। নৌকা একবার বনে ঢুকলেই আর কথা নেই !  দুটি মাত্র শব্দ লাগবে আপনার ভাব প্রকাশের জন্য, আপনি হয় তো বলে উঠবেন- “আমি মুগ্ধ” ! আর বোনাস হিসেবে পাবেন গোয়াইন নদী দিয়ে রাতারগুল যাওয়ার অসাধারণ সুন্দর পথ, বিশেষ করে বর্ষায়। এ ছাড়া নদীর চারপাশের দৃশ্যের সঙ্গে দেখবেন দূরে ভারতের মিজোরামের উঁচু সবুজ পাহাড়।

রাতারগুলে ভ্রমণের জন্য ব্যবহৃত ডিঙ্গি নৌকা

যেভাবে রাতারগুল যেতে হবে

বেশ কয়েকটি পথে রাতারগুল যাওয়া যায়। তবে, যেভাবেই যান, প্রথমে যেতে হবে সিলেট।

প্রথম উপায়

সিলেট থেকে জাফলং–তামাবিল রোডে সারীঘাট হয়ে সরাসরি গোয়াইনঘাট পৌঁছানো যায়। 

এরপর গোয়াইনঘাট থেকে রাতারগুল বিট অফিসে আসবার জন্য ট্রলার ভাড়া করতে হবে; ভাড়া ৯০০–১৫০০ এর মধ্যে (আসা-যাওয়া); আর সময় লাগে দুই ঘণ্টা। 

বিট অফিসে নেমে ডিঙ্গি নৌকা নিয়ে বনে ঢুকতে হবে, এতে ঘণ্টাপ্রতি লাগবে ২০০-৩০০ টাকা।

দ্বিতীয় উপায়

সিলেটের আম্বরখানা পয়েন্ট থেকে সিএনজি নিয়ে গোয়াইনঘাট পৌঁছানো যায়, সেক্ষেত্রে ভাড়া পড়বে ৫০০ টাকা। ওসমানী এয়ারপোর্ট–শালুটিকর হয়ে যাওয়া এই রাস্তাটা বর্ষাকালে খুবই সুন্দর। 

এরপর একইভাবে গোয়াইনঘাট থেকে রাতারগুল বিট অফিসে আসবার জন্য ট্রলার ভাড়া করতে হবে, ভাড়া ৯০০–১৫০০ টাকার মধ্যে (আসা-যাওয়া); আর সময় লাগে দুই ঘণ্টা। 

বিট অফিসে নেমে ডিঙ্গি নৌকা নিয়ে বনে ঢুকতে হবে, এতে মাঝি ঘণ্টাপ্রতি নেবে ২০০-৩০০ টাকা।

তৃতীয় উপায়ঃ সবচেয়ে কম খরচে রাতারগুল 

আরো একটি উপায়ে আপনি পৌঁছাতে পারেন রাতারগুল। 

সেক্ষেত্রে সিলেটের আম্বরখানা পয়েন্ট থেকে সিএনজি নিয়ে মোটরঘাট (সাহেব বাজার হয়ে) পৌঁছাতে হবে। ভাড়া নেবে ২০০-৩০০ টাকা আর সময় লাগবে ঘণ্টাখানেক। 

এরপর মোটরঘাট থেকে সরাসরি ডিঙ্গি নৌকা নিয়ে বনে চলে যাওয়া যায়, এতে ঘণ্টাপ্রতি ২০০-৩০০ টাকা লাগবে। এই তৃতীয় পথটিতেই সময় ও খরচ সবচেয়ে কম।

কখন রাতারগুল যাবেন 

রাতারগুল যাওয়ার সব থেকে ভালো সময় হলো বর্ষাকাল। সে সময়ই এই বনের পরিপূর্ণ সৌন্দর্য দেখার সুযোগ মেলে। তবে খেয়াল রাখতে হবে যেন তা মাঝ বর্ষা না হয়। তখন বন্যায় সব কিছু ডুবে যায়। 

সব থেকে ভালো হয় বর্ষাকাল যখন শুরু হচ্ছে অথবা শেষ হচ্ছে তখন। মে মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে জুনের মাঝামাঝি সময়টি রাতারগুল ভ্রমনের জন্য উত্তম।

রাতারগুল গিয়ে কোথায় থাকবেন

রাতারগুলে থাকার মতো তেমন ভালো কোনো কিছুই নেই। পর্যটকেরা সাধারনত রাতারগুল দেখা শেষ করে সিলেট শহরে চলে আসে। এখানে বিভিন্ন মান ও দামের হোটেল পাওয়া যায়। ১০০০-২০০০ টাকার ভিতর ভালো মানের হোটেল পেয়ে যেতে পারেন। তবে হোটেল নেয়ার সময় খেয়াল রাখবেন অবশ্যই হোটেলটি যেন আন্বারখানা এলাকায় হয়। কারণ, এখান থেকে আশেপাশে সকল জায়গায় যাতায়াত করা সুবিধা এবং যানবাহন পেতেও সুবিধা হয়।

সিলেটে কোথায় খাবেন

সিলেট জিন্দাবাজার এলাকায় খাবারের জন্য বেশ কিছু ভালো মানের রেস্টুরেন্ট রয়েছে। পাঁচ ভাই, পানশি,পালকি এসব সিলেটের বিখ্যাত হোটেল। এদের মধ্যে পাঁচ ভাই রেস্টুরেন্টের খাবারের মান বেশ ভালো এবং তুলনামূলকভাবে দামে সস্তা। হরেক রকমের ভর্তা, মাংস, খিচুড়ির স্বাদ এখানে দারুন।

এখানকার পাঁচ মিশালি আইটেমটি বেশ জনপ্রিয়। সাথে একটা মাছ কিংবা মাংস নিলে ভাত এবং ডাল একদম ফ্রি। বলে রাখা ভালো, এয়ার কন্ডিশন রুমে না বসে খেলে খাবারের বিল কিছুটা কম আসবে।

আশেপাশের দর্শনীয় স্থান 

রাতারগুল সহ এর আশেপাশে বেশ কিছু দর্শনীয় স্থান পেয়ে যাবেন। হাতে সময় থাকলে এসব স্থান ভ্রমণ করে আসাই ভালো।সেগুলোর মধ্যে কিছু অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং দর্শনীয় স্থান হলো-জাফলং, বিছানাকান্দি, ভোলাগঞ্জ সাদা পাথর।

বিছানাকান্দি ও ভোলাগঞ্জ সাদা পাথর

রাতারগুল ভ্রমণে কিছু সতর্কতা

১. রাতারগুল বা তার আশপাশে খাবারের হোটেল বা থাকার কোনো ভালো ব্যবস্থা নেই। তাই খাবার গোয়াইনঘাট বা সিলেট থেকে নিয়ে যেতে পারেন।

২. নৌকায় করে বেড়ানোর সময় পানিতে হাত না দেয়াই ভালো। জোঁকসহ বিভিন্ন পোকামাকড় তো আছেই, বর্ষায় বিষাক্ত সাপও পানিতে বা গাছে দেখতে পাওয়া যায়। সাঁতার না জানলে সঙ্গে লাইফ জ্যাকেট রাখা জরুরি।

৩. এ ছাড়া ছাতা, বর্ষাতি কিংবা রোদ টুপিও সঙ্গে নিতে হবে। এখানে বেড়ানোর নৌকাগুলো অনেক ছোট। এক নৌকায় পাঁচজনের বেশি উঠবেন না।

৪. পলিথিন, বোতল, চিপসের খোসা, বিস্কুটের খোসা ইত্যাদি জিনিস পানিতে ফেলবেন না দয়া করে। আমাদের নিজেদের প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষার দায়িত্ব আমাদেরই।

শহরের কোলাহল থেকে দূরে এই অমলিন জায়গা আপনার মনে গভীর ছাপ রেখে যাবে। প্রকৃতির মাঝে হারিয়ে গিয়ে, আপনি খুঁজে পাবেন আত্মার শান্তি। তাই রাতারগুল শুধু একটি জায়গা নয়, এটি এমন এক অভিজ্ঞতা যেখানে প্রকৃতি আপনাকে তার অন্দরে আমন্ত্রণ জানায়, আপনাকে নিজেকে পুনরুদ্ধার করতে বলে।

রেফারেন্স: 

Related posts

জাফলং ভ্রমণ: এক টিকেটে বহু সিনেমা

ইসরাত জাহান ইরা

ঘুরে আসুন রাজশাহীর আলপনা গ্রাম

পৌরাণিক নগরী মহাস্থানগড় ভ্রমণ

Leave a Comment

Table of Contents

    This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More