Image default
পথে প্রান্তরে

ঘুরে আসুন রাজশাহীর আলপনা গ্রাম

সকালের প্রথম আলো যখন আলপনা আঁকা দেয়ালে পড়ে, তখন মনে হয় পুরো গ্রামটা যেন শিল্পীর ক্যানভাসে পরিণত হয়েছে। প্রতিটি উৎসবে, বিশেষ করে পহেলা বৈশাখ কিংবা পূজা-পার্বণে, এই গ্রামের চেহারা একেবারে বদলে যায়। আলপনার বাহারে সেজে ওঠে প্রতিটি কোণা।

আলপনা আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যে এক অনন্য প্রতীক। কিন্তু আপনি জানলে অবাক হবেন, এই সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যকে কেন্দ্র করে একটি গ্রাম গঠিত হয়েছে, যার নাম আলপনা গ্রাম। এ গ্রামে পা রাখলেই মনে হবে যেন বাঙালির শৈল্পিক স্বপ্নে ভেসে যাচ্ছি। গ্রামটি তার রঙিন আলপনা, নিপুণ কারুকাজ, এবং আতিথেয়তার জন্য বিখ্যাত। গ্রামের প্রতিটি দেয়াল আর উঠান যেন ক্যানভাসে পরিণত হয়েছে; আর তাতে এঁকে দেওয়া হয়েছে জীবনের নানা গল্প। এ গ্রামে শিল্প আর প্রকৃতির এক অসাধারণ মিলন ঘটেছে, যা দেখলে মন ভরে যায়।  

আলপনা গ্রাম কোথায় অবস্থিত

আলপনা গ্রাম; যা টিকইল নামেও পরিচিত, বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার নাচোল উপজেলার নেজামপুর ইউনিয়নে অবস্থিত। গ্রামটি তার প্রতিটি বাড়ির দেয়ালে হাতে আঁকা নান্দনিক আলপনার জন্য পরিচিত, যা মূলত স্থানীয় নারীদের সৃজনশীলতারই প্রতিফলন। 

অপরূপ আলপনা গ্রাম

আলপনা গ্রামের ইতিহাস এবং তার গল্প

আলপনা গ্রাম— নামেই যেন এক ধরনের শিল্প লুকিয়ে আছে। প্রকৃতির কোলে গড়ে ওঠা এই ছোট্ট গ্রামটির ইতিহাস ও গল্প ভীষণ রঙিন।

আলপনা গ্রামের সূত্রপাত ঠিক কবে এবং কীভাবে হয়েছিল, তা আজও জানা যায়নি। তবে এখানকার মানুষ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। শস্য সংগ্রহ, ধর্মীয় অনুষ্ঠান এবং সামাজিক উৎসবের সময় বাড়ির উঠোনে আলপনা আঁকা ছিল একটি প্রচলিত প্রথা। এগুলোর মধ্যে প্রাকৃতিক উপকরণ যেমন চালের গুঁড়ো, হলুদ, কাঁচা হলুদ, এবং ফুলের রঙ ব্যবহার করা হত।

দেয়ালে আলপনা করছেন একজন নারী

মূলত আগেরকার দিনে গ্রামের নারীরা তাদের দেওয়ালে আলপনার কাজ করতেন আর সেখান থেকেই এই গ্রামের নাম ধীরে ধীরে হয়েছে আলপনা গ্রাম। গ্রামবাসীরা মনে করতো, এই আলপনা দেব-দেবতাদের আশীর্বাদ ডেকে আনে এবং দুঃখ-কষ্ট দূর করে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই গ্রামীণ শিল্পধারা শুধু ধর্মীয় গণ্ডিতেই আটকে থাকেনি, বরং এটি হয়ে উঠেছে গ্রামের জীবনের প্রতিচ্ছবি।

এছাড়াও, এসব আলপনার মধ্যে নাচলের রাণী বিপ্লবী ইলা মিত্র, মুক্তিযুদ্ধ, বাল্যবিবাহের ক্ষতিকর দিক, এবং অন্যান্য সমসাময়িক বিষয়ও ফুটে উঠেছে।

আলপনার উপকরণ

আলপনা আঁকার জন্য আগে রং এর সাথে খড়িমাটি, গিরিমাটি, তারপিন ব্যবহার করা হলেও, বর্তমানে বিভিন্ন রং এর সাথে গিরিমাটি, শুকনা বরই চুর্ণ আঠা, আমের পুরাতন আঁটির শাঁস চুর্ণ, মানকচু, কলাগাছের কস এক সঙ্গে মিশিয়ে কয়েকদিন ভিজিয়ে রেখে ঐ মিশ্রণ দিয়ে আল্পনা আঁকা হয়,  যার ফলে আল্পনার স্থায়িত্ব বেড়ে যায়। 

ঘরের দেয়ালে আলপনা

আলপনা গ্রামে এ গিয়ে যা যা দেখতে পাবেন

আলপনা গ্রামে গেলে মুগ্ধ হওয়ার মতো অনেক কিছু দেখতে পাবেন। গ্রামজুড়ে কাঁচা রাস্তা, দুপাশে খেজুর গাছ, মাটির দু’তলা বাড়ি আর গ্রামীণ বাংলার সেই চিরচেনা সাদামাটা সৌন্দর্য।

সেখানে স্থানীয় নারীরা নিজের হাতে মাটি দিয়ে তৈরি ঘরগুলোর দেয়ালে দারুণ সব আলপনার কাজ করেছেন। কাছেই হয়তো গাছের ছায়ায় দলবেঁধে গল্প করছে কিশোরীরা।

আলপনা গ্রামের সৌন্দর্য

এখানকার মানুষজন খুবই সরল। সকালের প্রথম আলো যখন আলপনা আঁকা দেয়ালে পড়ে, তখন মনে হয় পুরো গ্রামটা যেন শিল্পীর ক্যানভাসে পরিণত হয়েছে। প্রতিটি উৎসবে, বিশেষ করে পহেলা বৈশাখ কিংবা পূজা-পার্বণে, এই গ্রামের চেহারা একেবারে বদলে যায়। আলপনার বাহারে সেজে ওঠে প্রতিটি কোণা।

আলপনা গ্রামে কিভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে বাস বা ট্রেনে আপনি চাঁপাইনবাবগঞ্জ যেতে পারবেন। ঢাকা থেকে সড়কপথে চাঁপাইনবাবগঞ্জের দূরত্ব ২৯৬ কিঃমিঃ এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে আলপনা গ্রাম ২৮ কিলোমিটার দূরে।  

ঢাকার কল্যানপুর বা গাবতলী থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের উদ্দেশ্যে নিয়মিতভাবে বাস যায়।

এসি /নন এসি এসব বাসের ভাড়া ৮২০ থেকে ১৪০০ টাকার মধ্যে হয়ে থাকে।  

চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ৫০ টাকা বাস ভাড়ায় নাচোল যাওয়া যায়। নাচোল থেকে অটোরিক্সা, সিএনজি কিংবা ভ্যানে করে আলপনা গ্রামে যাওয়া আসার ভাড়া লাগবে ৪০০ টাকা।

এছাড়া ট্রেনে যাওয়ার ক্ষেত্রে পদ্মা, সিল্ক সিটি বা ধূমকেতু এক্সপ্রেস ভালো অপশন। 

আবাসন ও খাওয়া-দাওয়া 

আলপনা গ্রামের থাকার জন্য তেমন কোনো ভালো জায়গা নেই, তাই থাকতে চাইলে চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরে চলে আসতে হবে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের মোটামুটি মানের কিছু হোটেল রয়েছে। আগে থেকে বুকিং দিয়ে রাখলে শিবগঞ্জ উপজেলার ডাকবাংলোতেও থাকা যায়।

আবার কেউ যদি গ্রামের প্রকৃতির মাঝে থাকতে চায় তাহলে তাঁবু নিয়ে ক্যাম্পিং করার অপশনও ভালো। এক্ষেত্রে স্থানীয়দের সাথে কথা বলে নেওয়া ভালো হবে । 

আলপনা গ্রামে খাওয়ার মত তেমন কোন স্থান নেই। তাই খাবারের জন্য চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরে যেতে হবে। সেখানে বিভিন্ন মানের হোটেল বা রেস্টুরেন্ট রয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জে গেলে কিছু খান আর না খান সেখানকার বিখ্যাত চমচম একবার হলেও খাবেন।

সতর্কতা

১। যেহেতু এখানে অনেক মানুষের বসবাস তাই গ্রামবাসীদের সমস্যা হয় এমন কোন কাজ করা উচিত না।

২। গ্রামের কারো অনুমতি ছাড়া ভিডিও বা ছবি তোলা থেকে বিরত থাকুন ।

রেফারেন্সঃ

Related posts

বাংলাদেশে বাইক রাইড ট্রিপ এর সেরা রাস্তা

পুশরাম চন্দ্র

শাল গাছের মেলাঃ মধুপুর উদ্যান ভ্রমণ

পুশরাম চন্দ্র

২০২৫-এ কোথায় কোথায় ঘুরতে যাচ্ছেন?

ইসরাত জাহান ইরা

Leave a Comment

Table of Contents

    This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More