খুব শিঘ্রই হয়তো আমরা বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামোয় একটি বড় পরিবর্তন দেখতে চলেছি। ইতোমধ্যে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন দুই শতাধিক সুপারিশ সংবলিত একটি প্রতিবেদন সরকারের কাছে দাখিল করেছে, যেখানে বাংলাদেশে চারটি প্রদেশ গঠনের পাশাপাশি ঢাকা শহরের জন্য একটি ‘ক্যাপিটাল সিটি গভর্নমেন্ট’ প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে।
ঢাকার চিরচেনা যানজট, কোলাহল ও অবকাঠামোগত চাপ আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে গেছে। কিন্তু, এই পরিস্থিতির মধ্যে কি কখনো ভেবেছেন, বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামো কতটা কার্যকর? ঢাকার বাইরের অঞ্চলগুলো কি নিজেদের উন্নয়নে যথেষ্ট সুযোগ পাচ্ছে? এবং বাংলাদেশ কি সত্যিই প্রশাসনিক ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের জন্য প্রস্তুত কিংবা বাংলাদেশকেও কি প্রদেশে ভাগ করা সম্ভব?
প্রদেশ কি
প্রথমেই জানি, প্রদেশ কি? প্রদেশ বলতে এমন একটি প্রশাসনিক অঞ্চলকে বুঝানো হয়, যা একটি বৃহত্তর রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে কিছু প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক দায়িত্ব পালন করে। প্রদেশ বা প্রাদেশিক সরকার ব্যবস্থা, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সফলভাবে কাজ করে আসছে।
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, জার্মানি, এমনকি বেলজিয়ামের মতো ছোট দেশেও ফেডারেল বা প্রাদেশিক পদ্ধতির উদাহরণ দেখা যায়। এক্ষেত্রে প্রতিটি প্রদেশের নিজস্ব প্রশাসনিক ক্ষমতা থাকে, যা তাদের নিজ এলাকার উন্নয়ন নিশ্চিত করে। তবে এ ব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় সরকারও থাকে একটি শক্তিশালী নীতি নির্ধারক হিসেবে।
কেন প্রদেশ গঠিত হয়
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রদেশ বা রাজ্যভিত্তিক প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে ওঠার কারণ মুলত দুটি।
প্রথমত, ভাষা, সংস্কৃতি এবং জাতিগত বৈচিত্র্যের কারণে, পৃথক পরিচয় ও স্বায়ত্তশাসনের প্রয়োজন হয়; যার ফলে প্রদেশ গঠন করা হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে ভারতের রাজ্যগুলো একটি স্পষ্ট উদাহরণ হতে পারে। ভারতের প্রতিটি রাজ্যেরই নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য রয়েছে। একইভাবে, পাকিস্তানের পাঞ্জাব, সিন্ধু, বেলুচিস্তান এবং খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশগুলো আলাদা জাতিগোষ্ঠী এবং ভাষার ভিত্তিতে গঠিত। দ্বিতীয়, কারণটি হলো, বড় ভৌগোলিক বিস্তৃতি এবং জনসংখ্যার চাপ সামলানোর জন্য প্রদেশ বা রাজ্যভিত্তিক প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করা হয়।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রদেশ গঠনের যৌক্তিকতা
তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট এসব দেশের তুলনায় পুরোপুরি ভিন্ন। আমাদের দেশে বেশিরভাগ মানুষ একই ভাষা, সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য ধারণ করে। পাশাপাশি, এখানে ভৌগোলিক বিস্তৃতিও সীমিত।
এই অর্থে প্রদেশ গঠন করার প্রস্তাব অপ্রয়োজনীয় বলে মনে করছেন কিছু মহল। তারা আশঙ্কা করছেন, প্রদেশ গঠনের ফলে দেশের জাতীয় ঐক্য এবং স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বর্তমানে বাংলাদেশ আটটি বিভাগে বিভক্ত। বিভাগ গুলো আলাদা প্রশাসনিক কাঠামো হিসেবে ভাগ করা হলেও তা এখনো যথাযথ কার্যকরভাবে পরিচালিত হচ্ছে না। এক্ষেত্রে, যদি চারটি প্রদেশ গঠিত হয়, তাহলে বাকি চারটি বিভাগ নিজেদের অবহেলিত এবং বৈষম্যের শিকার বলে মনে করতে পারে, যা আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা ও গণ-আন্দোলনের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলবে।
এই আশঙ্কা নিরসনে এবং ঢাকার ওপর প্রশাসনিক চাপ কমাতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সরকারি দপ্তরগুলোকে বিভাগীয় শহরে স্থানান্তর করা একটি কার্যকর সমাধান হতে পারে। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল যেমন চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট, খুলনা- প্রতিটি জায়গারই রয়েছে আলাদা বৈশিষ্ট্য এবং সম্ভাবনা।
চট্টগ্রাম, যেমন, দেশের বাণিজ্যিক কেন্দ্র, রাজশাহী হতে পারে গবেষণা ও শিক্ষা কেন্দ্র এবং খুলনা কৃষি ও শিল্প উৎপাদনের জায়গা। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এসব অঞ্চলে কি প্রাদেশিক ক্ষমতা দেয়া সম্ভব? তা হলে কি বাংলাদেশে প্রদেশে ভাগ হওয়া যুক্তিযুক্ত হবে?
এখনকার আলোচনায় উঠে আসছে যদি ঢাকা থেকে প্রশাসনিক ক্ষমতা কিছুটা ভাগ করা যায়, তবে আঞ্চলিক ভারসাম্য তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে দেশের অর্থনীতি, শহরের চাপ এবং আঞ্চলিক বৈষম্য দূরীকরণের জন্য অনেকেই প্রদেশ ব্যবস্থার পক্ষে। সরকারও এখন প্রদেশের ধারণা নিয়ে ভাবছে।
তবে, এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, এ পরিস্থিতিতে যতটা রাজনৈতিক ঐক্যমত প্রয়োজন, ততটা দেখা যাচ্ছে না। রাজনৈতিক দলগুলো কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের প্রতি এতটাই নির্ভরশীল যে, আঞ্চলিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে অনেক সময় এবং শক্তির প্রয়োজন হবে। তবে প্রশ্ন হলো, এই প্রদেশ ব্যবস্থা বাস্তবায়ন সম্ভব করতে কি করা যেতে পারে?
যদি আসলেই বাংলাদেশ প্রদেশে ভাগ হয়, তবে এর সবচেয়ে বড় লাভ হতে পারে ঢাকার উপর থেকে অতিরিক্ত চাপ কমে যাবে। দেশের অন্য অঞ্চলের উন্নয়ন নিশ্চিত হবে, এবং স্থানীয় অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে। ঢাকার বাইরে ব্যবসা সম্প্রসারণ, সেবা খাতের উন্নয়ন, এবং অবকাঠামো সংস্কারে ব্যাপক উন্নতি হতে পারে। তবে, যদি এটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত না হয়, তবে স্থানীয় দুর্নীতি এবং প্রশাসনিক দক্ষতার অভাব সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রদেশ গঠনের চ্যালেঞ্জ
তবে, যে কোনো নতুন ব্যবস্থার সাথে কিছু চ্যালেঞ্জ থাকে। প্রদেশ তৈরির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জগুলো হলো- প্রথমত, এটি দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার সৃষ্টি করতে পারে। দ্বিতীয়ত, এর জন্য সংবিধান সংশোধন প্রয়োজন হবে। তৃতীয়ত, নতুন সরকারের জন্য প্রচুর আর্থিক খরচ লাগবে এবং প্রত্যেক প্রদেশের জন্য নতুন করে প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করতে হবে।
আবার আরেকটি আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে, প্রাদেশিক শাসনব্যবস্থা চালু করতে গেলে দেশের জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে নতুন প্রশ্ন উঠে আসতে পারে। যেমন বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশগুলো বিশেষ করে, ভারত এবং মিয়ানমারের সাথে সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে “প্রাদেশিক বিভাজন” কিছু সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে।
এসব বিবেচনায়, বাংলাদেশে প্রাদেশিক ব্যবস্থা কতোটা যুক্তিযুক্ত হতে পারে? এই প্রশ্নের উত্তর খোজা সহজ নয়। যেখানে একদিকে প্রাদেশিক ব্যবস্থার কিছু সুস্পষ্ট উপকারিতা রয়েছে, অন্যদিকে আছে এর সঙ্গে জড়িত কিছু গভীর চ্যালেঞ্জ। তবে, বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্য যদি হয় দেশকে ক্ষমতার ভারসাম্য দেয়া, তাহলে আমাদের উচিত সেই পথে কাজ করা। যদিও প্রদেশ গঠন নিয়ে আরও অনেক ভাবনা-চিন্তা করার অবকাশ রয়েছে।