Image default
ঘটমান বর্তমান

গণভোট এর ইতিহাস- ৩৪ বছর পর হঠাৎ কেন আলোচনার শীর্ষে গণভোট?

 ফ্রান্সে প্রথম গণভোট অনুষ্ঠিত হলেও, সুইজারল্যান্ডকে বলা হয় গণভোটের রাজধানী। 

দেশ জুড়ে চলছে সংস্কারের মহোৎসব। সংস্কারের এই উদ্যোগকে ঘিরে দেশ ব্যাপী আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু এখন গণভোট। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যখন সংবিধান সংস্কারের উদ্যোগ নেন  ঠিক তখনই সবার নজরে আসে গণভোটের বিষয়টি। তবে এই গণভোট আসলে কী? আর কেনই বা ৩৪ বছর পর আবার এটি নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে? 

গণভোট কী

রেফারেন্ডাম’; বাংলায় যাকে আমরা বলি ‘গণভোট’। এটি এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে জনগণ সরাসরি ভোটের মাধ্যমে দেশের কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাদের মতামত প্রকাশ করেন। দেশের বড় কোন সিদ্ধান্ত যেমন সংবিধান পরিবর্তন, নতুন আইন প্রণয়ন, রাজনৈতিক সংকট সমাধান কিংবা শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। জনগণের মতামত জানার  সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায় হলো এই গণভোট।

সাধারণ নির্বাচনের ক্ষেত্রে, যেখানে ভোটারের সামনে প্রার্থী, প্রতীক কিংবা দলীয় পরিচিতি থাকে সেখানে গণভোটের ক্ষেত্রে এসবের কোন কিছুই থাকে না। গণভোটের ক্ষেত্রে ভোটারকে ব্যালটে থাকা প্রশ্নের পক্ষে অথবা বিপক্ষে, ‘হ্যাঁ’ কিংবা ‘না’ এর মাধ্যমে, তাদের গুরুত্বপূর্ণ মতামত প্রকাশ করতে হয়। আর এই ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ই প্রমাণ করে, ভোটাররা প্রস্তাবটি আদৌও সমর্থন করছেন নাকি তা প্রত্যাখ্যান করছেন।

গণভোটের ইতিহাস

বিশ্বের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অনেক সিদ্ধান্ত ই গণভোটের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে। ইতিহাসে ১৭৯৩ সালে প্রথমবারের মতো গণভোটের সূচনা হয় ফ্রান্সে। নতুন সংবিধান অনুমোদনের প্রশ্নে সেসময় পুরো দেশজুড়ে আয়োজন করা হয় এক ঐতিহাসিক গণভোটের। 

ইতিহাসে প্রথম গণভোট

তবে, ফ্রান্সে প্রথম গণভোট অনুষ্ঠিত হলেও, সুইজারল্যান্ডকে বলা হয় গণভোটের রাজধানী। কারণ দেশটিতে প্রায় প্রতি বছর বিভিন্ন বিষয়ে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। বিশ্বের ইতিহাসে এমন অনেকেই গণভোটের নজির রয়েছে যা একদিনেই বদলে দিয়েছে, একটি দেশের রাজনীতি ও রাষ্ট্রের রূপরেখা।

বাংলাদেশে গণভোট

তবে বাংলাদেশের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে দেশে এখন পর্যন্ত বিভিন্ন রাজনৈতিক কারণে মোট তিনবার গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। আর এর মধ্যে দুটি প্রশাসনিক গণভোট এবং আরেকটি সাংবিধানিক গণভোট। 

প্রথম গণভোটটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৭৭ সালের ৩০ মে, মেজর জিয়াউর রহমানের আমলে। সদ্য সেনাপ্রধান থেকে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেওয়া জিয়াউর রহমানের শাসনকাজের বৈধতা এবং তাঁর নীতি ও কর্মসূচির প্রতি, জনগণের আস্থা আছে কি না, সে বিষয়ে দেশের জনগণের মতামত জানতে আয়োজন করা হয়েছিল এই গণভোটের। সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী, সেসময় প্রায় ৮৮ দশমিক ১ শতাংশ জনগণের অংশগ্রহণের মাধ্যমে সম্পন্ন হয় স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম গণভোট। এরমধ্যে ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছিল ৯৮ দশমিক ৯ শতাংশ এবং অন্যদিকে ‘না’ ভোট ছিল মাত্র ১ দশমিক ১ শতাংশ।

বাংলাদেশে প্রথম গণভোট

পরবর্তীতে, ১৯৮৫ সালের ২১ মার্চ অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় গণভোট। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের নীতি ও কর্মসূচির বৈধতা যাচাইয়ের জন্য আয়োজন করা হয়েছিল দেশের দ্বিতীয় গণভোটটির। তবে, এই গণভোটের উদ্দেশ্য ছিল জনগণের আস্থা অর্জন করা এবং এরশাদের প্রতি জনগণ আস্থা রাখেন কি না তা যাচাই করা। নির্বাচন কমিশনের তথ্যানুযায়ী, সে বছর প্রায় ৭২ দশমিক ২ শতাংশ জনগণ অংশগ্রহণ করেছিল গণভোটে। যার মধ্যে ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছিল ৯৪ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ‘না’ ভোট ছিল ৫ দশমিক ৫ শতাংশ।

অবশেষে, গণআন্দোলনের মুখে পড়ে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর যখন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ পদত্যাগ করেন; ঠিক তখনই ১৬ বছরের রাষ্ট্রপতি-শাসিত শাসন থেকে প্রধানমন্ত্রী-শাসিত সংসদীয় পদ্ধতি প্রতিষ্ঠার জন্য, ১৯৯১ সালের ৬ আগস্ট সংসদে বিল পাস করা হয়।

আর সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর ওই বিলে রাষ্ট্রপতি সম্মতি দেবেন কি না, তা নির্ধারণের জন্যই ওই বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর দেশের ইতিহাসে অনুষ্ঠিত হয় তৃতীয় গণভোট। জাতীয় নির্বাচনের ঠিক পরপরই গণভোটটি অনুষ্ঠিত হওয়ার জন্য, সেবারের গণভোটে সাধারণ জনগণের তেমন একটা আগ্রহ ছিল না। যার ফলে মাত্র ৩৫ দশমিক ২ শতাংশ জনগণের অংশগ্রহণের মাধ্যমে শেষ হয় দেশের তৃতীয় গণভোটে। এই গণভোটে ৮৪ দশমিক ৩৮ শতাংশ ভোটার ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়ে সংসদীয় প্রজাতন্ত্রকে সমর্থন করলেও, ১৫ দশমিক ৬২ শতাংশ ভোটার ‘না’ ভোট দিয়ে সংসদীয় প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করে।

জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৮৯ সালের পর থেকে বিশ্বজুড়ে গণভোটের প্রবণতা ব্যাপক হারে বেড়ে যায়। রাজনৈতিক পরিবর্তন কিংবা সংবিধান সংশোধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে, জনগণ সরাসরি অংশ নিতে শুরু করে। এরপর থেকে ধীরে ধীরে বহু দেশের সংবিধানে গণভোটের বিধান যোগ হয়। এই বিধান জনমতের শক্তিকে আরও দৃঢ়ভাবে ফুটিয়ে তোলে।

বাংলাদেশের সর্বশেষ গণভোটের পর পেরিয়ে গেছে তিন দশকেরও বেশি সময়। ফলে নতুন প্রজন্মের ভোটারদের কাছে গণভোট শব্দটি যেন একেবারেই অপরিচিত একটি শব্দ। আওয়ামী সরকারের পতনের পর অন্তবর্তীকালীন সরকার সংস্কারের বিভিন্ন উদ্যোগ নিলে, নতুন করে গণভোটের বিষয়টি আলোচনায় আসে।

কেন গণভোট আলোচনার শীর্ষে

তবে, ৩৪ বছর পর পুনরায় দেশে চতুর্থবারের মতো গণভোট আয়োজনের প্রস্তাব দিয়েছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ জনগণ অনুমোদন করবে কি না, এটা নিয়ে হবে সম্ভাব্য চতুর্থ গণভোট। জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের জন্য জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই, এবার গণভোটের লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ। 

এখন প্রশ্ন হলো কেন জুলাই সনদ নিয়ে গণভোটটি এত গুরুত্বপূর্ণ? বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত একটি দলিল “জুলাই সনদ”। এটি একটি লিখিত চুক্তি বা প্রতিশ্রুতি দলিল, যেখানে দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ ও বিশেষজ্ঞরা একত্র হয়ে, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও রাষ্ট্রীয় সংস্কারের একটি নতুন রূপরেখা প্রস্তাব দিয়েছেন।

বাংলাদেশে গণভোটের দাবিতে সমাবেশ

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে “জুলাই সনদ” হতে পারে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের উদ্যোগে গঠিত জুলাই সনদ বাস্তবায়ন চুক্তিতে অংশ নিয়েছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, শিক্ষাবিদ, আইনজ্ঞ ও প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞরা। ১৬টি ধারা বা ধারাবন্ধ প্রতিশ্রুতিতে সাজানো এই সনদটিতে রয়েছে, রাষ্ট্র ও প্রশাসনের মূল কাঠামোগত পরিবর্তনের রূপরেখা।  এই সনদকে বলা হচ্ছে একটি ‘রাজনৈতিক চুক্তিপত্র। যেখানে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো একত্রে প্রতিশ্রুত দিচ্ছে রাষ্ট্রব্যবস্থা, প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের সংকট ও অসংগতি দূর করে, একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও জনগণনির্ভর শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলার। 

এই সনদ একদিকে যেমন আশার প্রতীক, ঠিক তেমনি একে ঘিরে তৈরি হয়েছে বিভিন্ন বিতর্ক, ভিন্নমত ও সংশয়ের ঘন আবহ। সনদে বর্ণিত গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সংস্কার প্রস্তাবে ভিন্নমত জানিয়েছে বিএনপি সহ বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল, জুলাই জাতীয় সনদে সেগুলো যুক্ত করা হয়েছে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ নামে। ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় আগেই বলা হয়েছিল, যেসব দলের, যে যে প্রস্তাবে নোট অব ডিসেন্ট রয়েছে, তারা ক্ষমতায় গেলে ওই প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে তাদের ওপর কোন বাধ্যবাধকতা থাকবে না।

অবশেষে, জুলাই সনদের বৈধতা নিয়ে সকল রাজনৈতিক দলগুলো একমত হলেও গণভোটের সময়সীমা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে রয়েছে মতভেদ।‌ বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ কয়েকটি দল জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে গণভোটের আয়োজনের দাবি তুললেও বিএনপিসহ অন্যান্য জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একসঙ্গে আয়োজন করার পক্ষে।

তবে গণভোট কি আলাদা হবে, নাকি সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে হবে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন অন্তর্বর্তী সরকার।তবে বাংলাদেশ যতবারই গণভোটের আয়োজন করছে ততবারই বাংলাদেশের ইতিহাসে এসছে নতুন কোন পরিবর্তন। এবারো কি তেমন কিছু হবে।

তথ্যসূত্রঃ

Related posts

কোভিড ভ্যাকসিন – ষড়যন্ত্র নাকি সুস্থতা?

আবু সালেহ পিয়ার

স্টেম সেল থেরাপিঃ মৃত্যুকে জয় করার দ্বার প্রান্তে

ক্লাউড ক্যাপিটালিজম- ইলন মাস্ক ও পুঁজিবাদের নতুন ধারা

admin

Leave a Comment

Table of Contents

    This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More