“ছায়ায় থাকা শক্তিগুলোই পৃথিবীকে চালায়। সামনে থাকা মুখগুলোতো শুধুই একটা মুখোশ।” তেমনই এক শক্তি হচ্ছে হুতি।
এ নামটি শুনলে মনে হতে পারে এটি কেবল একটি সন্ত্রাসীগোষ্ঠী। অনেকেই ভাবে এরা মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা সৃষ্টি করছে। কিন্তু বাস্তবতা আসলে ভিন্ন। হুতি আন্দোলন সম্পর্কে আমরা অনেকেই জানি না বা ভুলভাবে জানি। হুতি আন্দোলন কোনো সাম্প্রতিক ঘটনা নয়। এটি শতাব্দী প্রাচীন একটি ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা রক্ষার চেস্টা। হুতিরা কি শুধুমাত্র একটি বিদ্রোহী দল, নাকি তারা আরও বৃহত্তর কোনো আঞ্চলিক কৌশলের অংশ? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে হুতিদের ইতিহাস, তাদের সামরিক কৌশল, এবং সামাজিক প্রভাবের দিকে নজর দিতে হবে।
হুতি আন্দোলনের জন্ম ও এর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
হুতিরা হলো ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলের জাইদী শিয়া মুসলিম সম্প্রদায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাদের নাম এসেছে হুতি পরিবারের নাম থেকে। আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন বাদ্রউদ্দিন আল-হুতি। তিনি ১৯৯০-এর দশকে এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। প্রথমদিকে হুতি আন্দোলন ছিল একটি শান্তিপূর্ণ সংগ্রাম, যার উদ্দেশ্য ছিল সামাজিক ও ধর্মীয় অধিকারের জন্য লড়াই করা। এছাড়াও ইয়েমেনের সরকারের ক্রমবর্ধমান সৌদি আরব ও পশ্চিমা দেশগুলির সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা হুতিরা মেনে নিতে পারে নি। তাদের মতে, ইয়েমেনের সামাজিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্যকে ধ্বংস করে পশ্চিমা প্রভাব আরও বিস্তৃত হতে চলেছে। এরই প্রতিবাদে হুতি আন্দোলন শুরু হয়।
হুতি আন্দোলনের শুরু ধর্মীয় হলেও পরবর্তীতে আস্তে আস্তে রাজনৈতিক হয়ে ওঠে। হুসেইন আল-হুতি আন্দোলনকে একটি রাজনৈতিক বিদ্রোহে রূপান্তর করেন। এই বিদ্রোহ ছিল ইয়েমেন সরকারের বিরুদ্ধে। এই বিদ্রোহের মাধ্যমে তিনি ইয়েমেনে একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক বিপ্লব ঘটানোর লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যান। অনেকেই জানেন না যে, এই বিদ্রোহের মূল লক্ষ্য ছিল আঞ্চলিক উন্নয়ন ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু পরিস্থিতির অবনতির সঙ্গে সঙ্গে এটি বৃহৎ সামরিক সংঘাতের রূপ নেয়।
হুতি বিদ্রোহের প্রাথমিক কারণ
ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত হয়ে আসছিল। ১৯৬২ সালে ইয়েমেনের রাজতন্ত্রের পতনের পর থেকেই দেশটি একের পর এক রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সংঘাতের মুখোমুখি হয়েছে। এই সময় তারা জীবিকা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা সব ক্ষেত্রেই বঞ্চনার শিকার হত। এখান থেকেই তাদের বিদ্রোহের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়।
বিদ্রোহের সবচেয়ে প্রাথমিক কারণ ছিল, শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি সরকারের অবহেলা। হুতিরা দাবি করেছিল যে, উত্তরাঞ্চলে পর্যাপ্ত স্কুল বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নেই। যা তরুণদের ভবিষ্যৎকে বিপন্ন করে তুলছে। বিশেষ করে ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলের তুলনায় উত্তরাঞ্চল ছিল অবহেলিত। শিক্ষা ব্যবস্থার এই চিত্রকে আঞ্চলিক বৈষম্যের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়েছিল। হুতিরা এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলে একটি শান্তিপূর্ণ আন্দোলন শুরু করে।
আন্তর্জাতিক জটিলতা: ইয়েমেন যুদ্ধ
২০১৫ সালে হুতি বিদ্রোহ একটি বৃহৎ যুদ্ধের রূপ নেয়। সৌদি আরবের নেতৃত্বে একটি বৃহৎ জোট হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে। বরাবরের মত এইবারও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য পশ্চিমা দেশগুলি এই আক্রমণ সমর্থন করে। তাদের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল হুতিদের প্রতিরোধ করা এবং ইয়েমেনের বৈধ সরকারকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। এর ফলে, হুতি আন্দোলন মধ্যপ্রাচ্যের একটি আন্তর্জাতিক সংকটে পরিণত হয়।
আক্রমণ শুরু হলে হুতিরা সামরিকভাবে অপ্রত্যাশিত শক্তি দেখাতে সক্ষম হয়। তারা বিভিন্ন ধরনের আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র, ড্রোন, এবং ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলিতে আঘাত করে। ২০১৯ সালে হুতিদের আক্রমণে সৌদি আরবের একটি তেল শোধনাগারে বিশাল ক্ষয়ক্ষতি হয়। যা বিশ্ব বাজারে তেলের দাম প্রায় ২০ শতাংশ বাড়িয়ে দেয়। আন্তর্জাতিক অস্ত্র বাজার থেকে সৌদি আরব এবং হুতি উভয় পক্ষই অস্ত্র সংগ্রহ করে আসছে। এই যুদ্ধে ইয়েমেনের ভূমি শুধু একটি যুদ্ধক্ষেত্র না, বরং আন্তর্জাতিক অস্ত্র বাজারের জন্য নতুন একটি ক্ষেত্রে রুপান্তরিত হয়েছে।
বতর্মান সংঘাতের ধারা: বিদ্রোহ এখন কোথায় দাঁড়িয়ে
বর্তমানে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট এবং হুতিদের মধ্যে সংঘাত অব্যাহত রয়েছে। ২০২৪ সালের জাতিসংঘের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইয়েমেনে প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ মানুষ খাদ্য সংকটে ভুগছে। যুদ্ধের কারণে ইয়েমেনে মানবিক সংকটের মাত্রা অত্যন্ত ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে, এবং এর শেষ এখনো দেখা যাচ্ছে না।
হুতিদের সামরিক শক্তি তাদের আন্দোলনের মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা ড্রোন, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং অন্যান্য আধুনিক সামরিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রতিপক্ষের উপর আক্রমণ চালাচ্ছে। ইরানের সামরিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা হুতি আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করেছে। ইরান থেকে আসা সামরিক সহায়তার ফলে হুতিরা তাদের কৌশলগত আক্রমণগুলোকে আরও কার্যকর করতে সক্ষম হয়েছে। হুতিদের ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এমন মাত্রায় পৌঁছেছে যে, তারা সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে আঘাত হানতে সক্ষম। এর ফলে হুতিদের সামরিক সক্ষমতা এবং আঞ্চলিক প্রভাব আরও জোরালোভাবে বিশ্ববাসীর সামনে আসে। ইরানের সমর্থন মূলত কৌশলগত এবং নৈতিক সহযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ।
হুতি আন্দোলনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তাদের ফিলিস্তিন ইস্যুর সঙ্গে দৃঢ় সংহতি। হুতিরা ফিলিস্তিনের জনগণের অধিকারের প্রতি তাদের সমর্থন জানিয়েছে। তাদের স্লোগান “ঈশ্বর সর্বশ্রেষ্ঠ, আমেরিকা মৃত্যু, ইজরায়েলের মৃত্যু, ইহুদীদের উপর ইসলামের বিজয় অভিশাপ”। এই স্লোগান মূলত ইসরায়েলি দখলের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থানের প্রকাশ।
ফিলিস্তিন ইস্যুতে হুতিদের সমর্থন শুধু রাজনৈতিক নয়, বরং এর ধর্মীয় ভিত্তিও রয়েছে। তাদের এই সমর্থন মধ্যপ্রাচ্যের শিয়া-সুন্নি বিরোধ এবং ইরান-ইসরায়েল বিরোধের সঙ্গেও সম্পর্কিত। ইরান ফিলিস্তিনের প্রতিরোধ আন্দোলনগুলিকে সমর্থন দেয় এবং একইভাবে হুতিরাও সেই একই ধারাবাহিকতায় তাদের সমর্থন প্রকাশ করে। বর্তমানে ইসরায়েলের হামলার প্রতিবাদে তারা ইসরায়েলের মালিকানাধীন বিভিন্ন জাহাজে হামলা চালাচ্ছে। আবার ইসরায়েলের ভূখন্ডে ড্রোন হামলা পরিচালনা করছে। এছাড়াও হিজবুল্লাহ ও হামাসকে বিভিন্ন ভাবে সাহায্য করে।
হুতিদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব
হুতিদের প্রভাব শুধু সামরিক ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকছে না। তারা সমাজ ও সংস্কৃতিতেও গভীর পরিবর্তন আনতে শুরু করেছে। প্রথমে তারা শুধু ইয়েমেনের গ্রামীণ এলাকায় সক্রিয় ছিল, কিন্তু এখন শহুরে এলাকায়ও তাদের প্রভাব দেখা যাচ্ছে। তাদের আন্দোলন একটি সামাজিক পরিবর্তনের পথে এগিয়ে চলেছে।
হুতিরা প্রচলিত শাসনব্যবস্থার বাইরে গিয়ে নিজেদের মতো করে একটি নতুন প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করতে চায়। তারা এমন একটি সমাজ গড়ে তোলার চেষ্টা করছে, যেখানে তাদের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক মূল্যবোধ বেশি গুরুত্ব পাবে। এভাবে, তারা ইয়েমেনের সমাজে এক নতুন ধরনের পরিবর্তনের সূচনা করেছে। যা শুধু তাদের আঞ্চলিক প্রভাবই নয়, বরং দেশের সাংস্কৃতিক মানসিকতাকেও প্রভাবিত করছে।
চলমান সংঘাত ও মানবিক বিপর্যয়
ইয়েমেনের জনগণের দুর্দশা সম্পর্কে আমরা প্রায়ই খবরের শিরোনাম দেখি, কিন্তু অনেক বিষয়ই আলোচনা থেকে বাদ পড়ে যায়। এই যুদ্ধে লক্ষ লক্ষ মানুষ গৃহহীন হয়েছে এবং বহু শিশু অপুষ্টিজনিত কারণে মারা যাচ্ছে। ২০১৮ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, ১০,০০০ এরও বেশি শিশু অপুষ্টিজনিত কারণে মারা গেছে। এটি ইয়েমেনের মানবিক সংকটের একটি করুণ চিত্র তুলে ধরে।
হুতিদের ভবিষ্যৎ এবং ইয়েমেনের রাজনীতি
বিশ্ব রাজনীতিতে হুতিদের উত্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। শুধু ইয়েমেন নয়, হুতিদের প্রভাব ধীরে ধীরে পুরো মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকেও প্রভাবিত করতে শুরু করেছে। বর্তমানে, হুতিরা ইয়েমেনের একটি বিশাল অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যদি হুতিরা তাদের সামরিক এবং রাজনৈতিক শক্তি ধরে রাখতে সক্ষম হয়, তবে তারা আগামীতে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে উঠবে। যুক্তরাষ্ট্র এবং জাতিসংঘ ইতিমধ্যে হুতিদের সঙ্গে সরাসরি শান্তি আলোচনা এবং কূটনৈতিক সমাধানের চেষ্টা করছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত তেমন কোন সফলতা পায়নি।
হুতির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আসে। প্রথমত, তাদের সামরিক শক্তি ধরে রাখতে ইরানের সমর্থন কতটা কার্যকর থাকবে, এবং দ্বিতীয়ত, ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি কীভাবে পরিবর্তিত হবে।
যদি ইয়েমেনের সরকার হুতিদের সঙ্গে কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়, তবে দেশটি দীর্ঘমেয়াদে আরও সংঘাতের মুখোমুখি হতে পারে। এই পরিস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশকেও অস্থির করে তুলতে পারে। বিশ্বের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, হুতিদের উত্থান এবং তাদের কৌশলী পরিকল্পনা আগামী দশকে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। হুতিরা যদি তাদের ক্ষমতা ধরে রাখতে পারে এবং আন্তর্জাতিক চাপ মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়, তবে তারা আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হবে। তবে এটি মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
হুতি বিদ্রোহ এবং ইয়েমেনের যুদ্ধ আমাদের শেখায় যে, সামরিক শক্তির পাশাপাশি সামাজিক আন্দোলনও একটি অঞ্চলকে বদলে দিতে পারে। এই যুদ্ধ শুধুমাত্র একটি সামরিক সংঘাত নয়, বরং একটি দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। হুতি আন্দোলন শুধু একটি স্থানীয় বিদ্রোহ নয়, এটি একটি বড় রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তির প্রতিফলন। ইয়েমেনে চলমান যুদ্ধ, ফিলিস্তিন ইস্যুর প্রতি তাদের সমর্থন এবং ইরানের সহায়তা হুতি আন্দোলনকে এমন একটি অবস্থানে নিয়ে এসেছে, যা ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে আরও গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই হুতি আন্দোলনকে শুধুমাত্র ইয়েমেনের একক সমস্যা হিসেবে দেখা যাবে না। বরং এটি পুরো মধ্যপ্রাচ্যের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক ইস্যু।