Image default
ঘটমান বর্তমান

আরাকান আর্মি ও নতুন একটি রাষ্ট্র

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি বর্তমান দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ নাম হয়ে উঠেছে।

১৭৮৪ সালে বার্মিজ রাজাদের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার আগ পর্যন্ত বর্তমানে রাখাইন নামে পরিচিত রাজ্যটি আরাকান নামে সম্পূর্ণ আলাদা একটি রাজ্য ছিল। মিয়ানমারের জান্তা হাটিয়ে প্রায় ২৪০ বছর পর আবারো নিজস্ব স্বপ্ন আরাকান রাজ্য। বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি গত এক বছরে জান্তা বাহিনীর সঙ্গে লড়াই করে অনেক গুরুত্বপূর্ণ এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। 

রাখাইনের ৬০ শতাংশ মানুষই জাতিগতভাবে রাখাইন বৌদ্ধ, আর, ৩৫ শতাংশ মুসলিম রোহিঙ্গা। রাখাইন রাজ্যে তাদের ক্রমবর্ধমান শক্তি, সামরিক কার্যক্রম এবং আঞ্চলিক দাবি দাওয়া শুধু মিয়ানমারের জন্য নয়, বাংলাদেশের জন্যও এক নতুন ধরনের নিরাপত্তা এবং কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। আরাকান আর্মি স্ব শাসিত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যে প্রচেষ্টা চালাচ্ছে, তা আঞ্চলিক নিরাপত্তার মানচিত্রে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।

আরাকান আর্মির উত্থান এবং লক্ষ্য

২০০৯ সালে প্রতিষ্ঠিত আরাকান আর্মি রাখাইন রাজ্যে একটি স্বায়ত্তশাসিত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে সশস্ত্র সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। এই সংগঠনটি প্রথমদিকে মিয়ানমারের অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর সশস্ত্র আন্দোলনের ছায়ায় থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করলেও, ২০১৫ সাল থেকে তারা নিজেদের সামরিক শক্তি ও প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করেছে।

আরাকান আর্মির ট্রেনিং

জান্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে আরাকান আর্মির লড়াইয়ে অগ্রগতির পর আবারো ৩০ লাখের বেশি জনসংখ্যার রাজ্যটি স্বপ্ন দেখছে নিজস্ব রাজ্যের। রাখাইন রাজ্যে তাদের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি তারা একটি কার্যকরী “ছায়া সরকার” গড়ে তুলেছে, যেখানে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং স্থানীয় বিচার ব্যবস্থাও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সরকার থেকে দূরত্ব বজায় রেখে নিজেদের শাসনব্যবস্থা পরিচালনার এই কৌশল তাদের প্রতি রাখাইন জনগণের সমর্থন বাড়িয়েছে।

বাংলাদেশের সীমান্ত পরিস্থিতি এবং আরাকান আর্মির ভূমিকা

মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চলীয় রাখাইন রাজ্যে যে কোনো মুহূর্তে গোটা রাখাইন রাজ্যেরও নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে গোষ্ঠীটি, এমন খবরও ছরিয়ে পরেছে গণমাধ্যম গুলোতে।

বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত, বিশেষত কক্সবাজার ও বান্দরবান এলাকার কাছাকাছি অঞ্চলগুলোতে আরাকান আর্মির তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে তাদের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে গোলাগুলি, অবৈধ অস্ত্র চালান এবং অন্যান্য নিরাপত্তা হুমকি নিয়ে উত্তেজনা সৃষ্টি হচ্ছে।

বাংলাদেশের সীমান্তে আরাকান আর্মির গোলাগুলি

আরাকান আর্মির কার্যক্রম কেবল সামরিক সংঘর্ষেই সীমাবদ্ধ নয়; তাদের কার্যক্রমের মাধ্যমে রাখাইন রাজ্যে মানবিক সংকটও তীব্র হচ্ছে। এই সংকট রোহিঙ্গা ইস্যুর সঙ্গে মিশে গিয়ে বাংলাদেশের ওপর চাপ আরও বাড়াচ্ছে। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীর ভার বহন করছে। এর মধ্যে নতুন করে আরাকান আর্মির সক্রিয়তা সীমান্ত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।

আরাকান আর্মি নিয়ে যত ভূ-রাজনীতি

আরাকান আর্মির কার্যক্রম শুধু স্থানীয় বা আঞ্চলিক সীমায় সীমাবদ্ধ নয়; এই ইস্যুটি ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক মহলের নজরে কেড়েছে। চীন, ভারত এবং যুক্তরাষ্ট্রের মতো বৃহৎ রাষ্ট্রগুলোর কাছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক ক্ষেত্র।

চীনের ভূমিকা

মিয়ানমার দক্ষিণ এশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত। রাখাইন রাজ্য চীনের “বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ” (BRI)-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। চীন আরাকান আর্মির সঙ্গে সরাসরি জড়িত না থাকলেও, রাখাইন অঞ্চলের স্থিতিশীলতা তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। চীন মিয়ানমারের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে চায়, তবে তাদের ভূ-রাজনৈতিক কৌশল আরাকান আর্মির কার্যক্রমকে সমর্থন দিচ্ছে বলে অনেকেই  মনে করেন।

ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি

ভারত চায় রাখাইন রাজ্য এবং বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চল শান্তিপূর্ণ থাকুক, কারণ উত্তর-পূর্ব ভারতের নিরাপত্তা রাখাইন রাজ্যের স্থিতিশীলতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। তাছাড়া, ভারত নিজেও রাখাইন রাজ্যে “কালাদান মাল্টি-মডাল প্রজেক্ট” পরিচালনা করছে, যা তাদের জন্য অর্থনৈতিক ও কৌশলগত ভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমা বিশ্ব

যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নিয়েছে। তবে তারা আরাকান আর্মির কার্যক্রমকে তেমন গুরুত্ব দিচ্ছে না। তারা মূলত রোহিঙ্গা ইস্যুতে মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করেছে।

নতুন রাষ্ট্রের সম্ভাবনা এবং এর প্রভাব

আরাকান আর্মি যদি রাখাইন রাজ্যে তাদের দাবি প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়, তবে এটি মিয়ানমারের ভৌগোলিক অখণ্ডতার ওপর বড় প্রভাব পরবে। পাশাপাশি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় একটি নতুন রাষ্ট্রের আবির্ভাব এ অঞ্চলের শক্তি-সমীকরণ বদলে দেবে।

নতুন দেশের পতাকা হাতে আরাকান আর্মি

একটি স্বাধীন আরাকান রাষ্ট্রের সৃষ্টি হলে এর প্রভাব সরাসরি বাংলাদেশের ওপর পড়বে। নতুন রাষ্ট্র গঠন হলে সীমান্তে সংঘাত কমার সম্ভাবনা থাকলেও, ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বাড়বে। বাংলাদেশ এই পরিস্থিতিতে একটি ভারসাম্যপূর্ণ কৌশল অবলম্বন করতে বাধ্য হবে।

রোহিঙ্গা ইস্যু এবং আরাকান আর্মি 

রোহিঙ্গা ইস্যুতে আরাকান আর্মির অবস্থান বরাবরই ধোঁয়াসায় থেকে গেছে। তারা রোহিঙ্গাদের “জাতিগত সহযোগী” হিসাবে দাবি করলেও তাদের অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে বড় ধরনের কোনো ভূমিকা পালন করেনি।

মিয়ানমারের চলমান এই যুদ্ধে রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গা সহযোগী সংগঠন আরাকান রোহিঙ্গা আর্মি-এআরএ ও আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি বা আরসাসহ কয়েকটি সংগঠনের অবস্থান ছিল জান্তা বাহিনীর পক্ষে।

রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মধ্যে আরাকান আর্মির প্রতি কিছু অংশের সহানুভূতি দেখা যাচ্ছে, যা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী আরাকান রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার ফলে নতুন করে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের ও বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন দীর্ঘায়িত হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি

আরাকান আর্মির কার্যক্রম এবং মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষের ফলে বাংলাদেশের সীমান্ত অঞ্চলে একটি অস্থির পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। সীমান্তবর্তী অঞ্চলে গোলাগুলি এবং নিরাপত্তাহীনতা কেবল স্থানীয় জনজীবনে প্রভাব ফেলছে না; এটি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের ওপরও প্রভাব ফেলছে।

কেউ কেউ মনে করেন সুনির্দিষ্ট কিছু কারণে আরাকান আর্মির সাথে দ্রুত অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ করা উচিত বাংলাদেশের। এর প্রধান কারণ হলো সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, যাতে করে নতুন করে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ আর না ঘটতে পারে।

তাছাড়া সাম্প্রতিক সময়ের লড়াইয়ে হেরে সরকারি বাহিনী বিপুল অস্ত্র ফেলে গেছে বলে ধারণা করা যায়। এগুলোর চোরাচালানের আশংকা আছে বাংলাদেশের দিক থেকে এবং এই নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণেও অনেকে আরাকান আর্মির সাথে যোগাযোগের তাগিদ দিচ্ছেন।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যে সীমান্তে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে। তবে এই পরিস্থিতি সমাধানে সামরিক প্রস্তুতির পাশাপাশি কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সমাধানের পথ

কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করা

বাংলাদেশকে কূটনৈতিকভাবে আরও সক্রিয় হতে হবে। মিয়ানমার এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে একটি স্থায়ী সমাধান বের করতে হবে।

আন্তর্জাতিক সহযোগিতা

রোহিঙ্গা সংকট এবং আরাকান আর্মির কার্যক্রমের প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও বাড়াতে হবে। জাতিসংঘ এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার মাধ্যমে সীমান্ত নিরাপত্তা এবং শরণার্থী ইস্যুতে সমর্থন চাওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

সীমান্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা উন্নত করা

সীমান্ত অঞ্চলে নজরদারি এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে হবে। প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত সরঞ্জাম এবং প্রশিক্ষিত বাহিনী মোতায়েনের মাধ্যমে সীমান্তে সংঘর্ষ এড়ানো সম্ভব।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ও পুনর্বাসন

রোহিঙ্গা সংকট সমাধান বাংলাদেশের জন্য অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। রোহিঙ্গাদের স্বদেশে প্রত্যাবাসনের মাধ্যমে এই সংকটের একটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান খুঁজতে হবে।

উপসংহার

আরাকান আর্মি এবং তাদের কার্যক্রম শুধু মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের সীমান্ত নিরাপত্তা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু।

সীমান্তে সংঘর্ষ, রোহিঙ্গা সংকট এবং নতুন রাষ্ট্রের সম্ভাবনা বাংলাদেশের জন্য বড় ধরনের কূটনৈতিক এবং নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশকে শক্তিশালী কূটনৈতিক পদক্ষেপ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং সীমান্ত নিরাপত্তার ওপর আরও জোর দিতে হবে।

বিশ্ব রাজনীতির এই ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে বাংলাদেশ একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও কার্যকরী নীতি গ্রহণ করতে সক্ষম হলে, এটি শুধু সীমান্ত পরিস্থিতি নয়, আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে।

রেফারেন্সঃ

Related posts

মহাকাশীয় ঘটনার দুর্দান্ত বছর ২০২৫

নারী ক্রিকেট বিশ্বকাপই পৃথিবীর প্রথম ক্রিকেট বিশ্বকাপ!

তালেবান-পাকিস্তান: বন্ধু থেকে শত্রু

ইসরাত জাহান ইরা

Leave a Comment

Table of Contents

    This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More