ভাবুন তো, ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণে একজন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বের হঠাৎ মৃত্যু! তার ঘরে পড়ে আছে নিথর দেহ, চারপাশে নীরবতার ঘন চাদর…কিন্তু, তার মৃত্যুটা কি স্বাভাবিক? নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে কোন রহস্য, যা উন্মোচন করলে কেঁপে উঠবে গোটা সাম্রাজ্য?
১৭৭৪ সালের ২২ নভেম্বরের সন্ধ্যায় লন্ডনের অভিজাত পাড়ার এক বাড়িতে বিরাজ করছিলো অস্বাভাবিক নীরবতা। সেই বাড়ির ভেতর যে মানুষটি ছিলেন, তাকে নিয়ে সমগ্র ইউরোপ ও ভারতের ইতিহাস ছিল মুখরিত।
রবার্ট ক্লাইভ, ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এক কিংবদন্তি নাম। তার নেতৃত্বে পলাশীর যুদ্ধে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়েছিল। কিন্তু, তার নিজের জীবনের সূর্যাস্ত? সেটি আজও আবৃত এক গভীর রহস্যে।
এই মানুষটি কেন বিতর্কিত? কেন তাকে কখনো সাহসী নেতা, আবার কখনো লোভী শাসক হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়? তার উত্থান যেমন চমকপ্রদ, তেমনি তার পতন ছিল অন্ধকারে মোড়া। এই মৃত্যু কি তার শত্রুদের ষড়যন্ত্রের ফল, নাকি তার নিজের মানসিক যুদ্ধের সমাপ্তি? ইতিহাসের পাতা সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে আজও থমকে দাঁড়িয়ে আছে। আপনার কি মনে হয়, এই রহস্যের সমাধান সম্ভব?
চলুন, একে একে খুলে দেখি ইতিহাসের পাতা।
শৈশব থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি
রবার্ট ক্লাইভের জীবন শুরু হয়েছিল ১৭২৫ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর ইংল্যান্ডের শ্রপশায়ারের এক ছোট গ্রামে। তার পিতা রিচার্ড ক্লাইভ ছিলেন একজন আইনজীবী। শৈশবে ক্লাইভ ছিলেন দুষ্টু এবং একরকমের অবাধ্য প্রকৃতির। ছোটবেলায় তার বিদ্রোহী মানসিকতা এবং অস্থিরতা তার ভবিষ্যত নিয়ে এক ধরনের পূর্বাভাস দিচ্ছিলো হয়তো!
ক্লাইভের পড়াশোনার ক্ষেত্রে তেমন উজ্জ্বল সাফল্য ছিল না। তার শিক্ষকেরা প্রায়ই তার প্রতি বিরক্ত হতেন। কিন্তু তারা একথাও স্বীকার করতেন যে, ক্লাইভের মধ্যে ছিল নেতৃত্বের গুণাবলী। কিন্তু, পরিবারের মানুষেরা তার ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিলো চিন্তিত। এই কারণে তাকে ১৭৪৪ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কেরানি পদে যোগদানের জন্য ভারতে পাঠানো হয়।
ভারতে এসে ক্লাইভের জীবনের মোড় ঘুরে যায়। প্রথমদিকে মাদ্রাজে (বর্তমান চেন্নাই) একটি সাধারণ কর্মচারী হিসেবে কাজ শুরু করেন। কিন্তু, ফরাসি এবং ব্রিটিশদের মধ্যে চলমান সংঘর্ষের সময় তার সাহসী এবং কৌশলী ভূমিকা তাকে দ্রুত উচ্চ পদে নিয়ে যায়। বিশেষ করে, ১৭৫১ সালে আরকোট দুর্গের যুদ্ধ তাকে ইতিহাসে স্থান করে দেয়। তিনি মাত্র ৫০০ সৈন্য নিয়ে একটি শক্তিশালী ফরাসি এবং তাদের ভারতীয় মিত্র বাহিনীকে পরাজিত করেন। এখান থেকেই শুরু হয় তার উত্থান।
পলাশীর যুদ্ধ এবং তার পরবর্তী সময়ের ভূমিকা
১৭৫৭ সালের ২৩ জুন, পলাশীর যুদ্ধ বাংলার ইতিহাসে এক চিরস্মরণীয় অধ্যায় রচনা করে। নবাব সিরাজউদ্দৌলার বিপক্ষে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সেনাপতি রবার্ট ক্লাইভের নেতৃত্বে এক ক্ষুদ্র বাহিনী জয়লাভ করে। এই যুদ্ধের ফলে ব্রিটিশরা বাংলার শাসনভার নিজেদের হাতে নিয়ে নেয়।
যুদ্ধের পটভূমি
সিরাজউদ্দৌলার শাসন ছিল তখন নানান প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি। ব্রিটিশ এবং ফরাসি বণিকরা উপমহাদেশে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারে লিপ্ত ছিল। সিরাজউদ্দৌলা ব্রিটিশদের বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে চেয়েছিলেন। যা ব্রিটিশদের স্বার্থে আঘাত হানে। এই পরিস্থিতিতে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নবাবের সেনাপতি মীর জাফরসহ কয়েকজন উচ্চপদস্থ ব্যক্তির সঙ্গে মিলে নবাবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করে। এর ফলস্বরূপ, পলাশীর যুদ্ধে সিরাজউদ্দৌলা পরাজিত হন।
যুদ্ধ-পরবর্তী পরিবর্তন
যুদ্ধের পর ক্লাইভ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জন্য বিশাল ধনসম্পদ সংগ্রহ করেন। মীর জাফরকে বাংলার নবাব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হলেও, প্রকৃত ক্ষমতা ছিল ব্রিটিশদের হাতে। পলাশীর যুদ্ধের পর বাংলার অগাধ সম্পদ ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে চলে আসে। ক্লাইভ নিজেও এ থেকে বিপুল ধনসম্পদ অর্জন করেন।
লন্ডনে ফেরা: বিতর্কিত সম্মান এবং নতুন সংকট
পলাশীর যুদ্ধ এবং তার পরবর্তী সময়ে বাংলায় ব্রিটিশ শাসনের ভিত মজবুত করার পর রবার্ট ক্লাইভ ইংল্যান্ডে ফিরে যান। ১৭৬০ সালে লন্ডনে তার প্রত্যাবর্তন ছিলো মূলত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের এক সফল সেনাপতির প্রত্যাবর্তন।
বাংলার ধনসম্পদ এবং ক্লাইভের বিত্ত
লন্ডনে ফিরে ক্লাইভ তখন এক বিত্তশালী ব্যক্তি। পলাশীর যুদ্ধ এবং বাংলার নবাবদের সঙ্গে করা চুক্তি থেকে তিনি বিপুল পরিমাণ ধনসম্পদ সংগ্রহ করেছিলেন। অনুমান করা হয়, ক্লাইভের ব্যক্তিগত সম্পত্তির পরিমাণ ছিল সেই সময়ের হিসাবে প্রায় £২,৩৪,০০০, যা আজকের মূল্যে কয়েক মিলিয়ন পাউন্ড। এই অর্থে তিনি ইংল্যান্ডে একটি প্রাসাদোপম বাড়ি তৈরি করেন।
ক্লাইভের দ্বিতীয়বার ভারতে প্রত্যাবর্তন ও দ্বৈত শাসন
১৭৬৫ সালে, ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনে নানা অনিয়ম এবং আর্থিক সমস্যার কারণে ক্লাইভকে আবার ভারতে পাঠানো হয়। তার দ্বিতীয়বার ভারতে যাওয়ার মূল উদ্দেশ্য ছিল কোম্পানির শাসনব্যবস্থাকে সংস্কার করা। তিনি সেখানে দ্বৈত শাসনব্যবস্থা চালু করেন। এর ফলে বাংলার নবাব নামমাত্র শাসক থাকলেও প্রকৃত ক্ষমতা ছিল কোম্পানির হাতে।
লন্ডনে পুনরায় প্রত্যাবর্তন এবং মানসিক সংকট
১৭৬৭ সালে ক্লাইভ আবার লন্ডনে ফিরে আসেন। তবে, এবার তার ফিরে আসা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। বাংলার সম্পদ লুটপাট এবং তার শাসননীতি নিয়ে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে তার বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়। ১৭৭২ সালে তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু হয়। ক্লাইভ পার্লামেন্টে নিজেকে রক্ষা করতে সক্ষম হন। তবে এই বিতর্ক তার মানসিক স্বাস্থ্যের উপর গভীর প্রভাব ফেলে।
১৭৭৪ সালের ২২ নভেম্বর: এক রহস্যময় দিন
১৭৭৪ সালের ২২ নভেম্বর। লন্ডনের একটি অভিজাত বাড়িতে রবার্ট ক্লাইভের মৃতদেহ পাওয়া যায়। পাশেই পড়ে ছিল একটি কলম-ছুরি, আর টেবিলে রাখা ছিল একটি অসমাপ্ত চিঠি।
এই ঘটনাটি নিয়ে তখন থেকেই রহস্য ঘনীভূত হতে শুরু করে। ক্লাইভ কি আত্মহত্যা করেছিলেন, নাকি এটি ছিল একটি পরিকল্পিত হত্যা? তার মৃত্যুর পেছনে কি লুকিয়ে ছিল কোনো গভীর ষড়যন্ত্র?
চিকিৎসকের বক্তব্য: মানসিক চাপের ইঙ্গিত
ক্লাইভের ব্যক্তিগত চিকিৎসকের মতে, তিনি দীর্ঘদিন ধরে মানসিক চাপ এবং বিষণ্ণতায় ভুগছিলেন। ইতিহাসবিদদের মতে, ক্লাইভ আফিম জাতীয় মাদকের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েছিলেন। এই আসক্তি তার মানসিক অবস্থা আরও জটিল করে তোলে।
শারীরিক অসুস্থতা ও মানসিক উদ্বেগের ফলে তার জীবনের প্রতি আগ্রহ কমে গিয়েছিল। চিকিৎসক ধারণা করেছিলেন, এই চাপই তাকে আত্মহত্যার মতো চরম সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছিল।
ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব: পরিকল্পিত হত্যা?
অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন, ক্লাইভের মৃত্যু আত্মহত্যা নয়, বরং এটি ছিল একটি পরিকল্পিত হত্যা। ব্রিটিশ অভিজাত সমাজে তিনি অস্বস্তিকর একটি চরিত্রে পরিণত হয়েছিলেন। ভারত থেকে ফিরে আসার পর তার কর্মকাণ্ড নিয়ে তীব্র সমালোচনা হয়। বিশেষ করে, ভারতীয় সম্পদ লুটপাটের অভিযোগ তিনি অনেকের শত্রুতে পরিণত হন। এর ফলে অনেকেই মনে করেন, তার মৃত্যু ছিল সেই শত্রুদের পরিকল্পনার অংশ।
পরিবারের মধ্যে কলহ: চাপের আরেকটি উৎস
রবার্ট ক্লাইভের পরিবারেও চলছিল অভ্যন্তরীণ কলহ। তার স্ত্রী ও ছেলেদের মধ্যে সম্পদের উত্তরাধিকার নিয়ে মতবিরোধ ছিল। পারিবারিক এই অস্থিরতা তার মানসিক চাপ আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। ক্লাইভের মৃত্যুর পর এই কলহ আরও প্রকট হয়। কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন, এই পারিবারিক দ্বন্দ্বই তাকে মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে বাধ্য করেছিল।
রবার্ট ক্লাইভের মৃত্যু নিয়ে এত বছর পরেও প্রশ্ন থেকে যায়। আত্মহত্যা, ষড়যন্ত্র, না পারিবারিক চাপ—কোনটি ছিল তার জীবনের শেষ অধ্যায়ের মূল কারণ? এই রহস্যের সমাধান আজও অধরা।
ব্রিটিশ সমাজের প্রতিক্রিয়া
রবার্ট ক্লাইভের মৃত্যুর পর ব্রিটিশ সমাজে তীব্র মতবিরোধের সৃষ্টি হয়। সমাজের একাংশ তাকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা এবং একজন কৌশলী নেতা হিসেবে স্মরণ করে। তাদের মতে, ক্লাইভের নেতৃত্ব ও বুদ্ধিমত্তা ব্রিটেনকে ভারতের সম্পদশালী ভূমিতে একটি শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে সহায়তা করে।
অন্যদিকে, অনেকেই তাকে লোভী, স্বার্থপর এবং নিষ্ঠুর শাসক হিসেবে চিহ্নিত করেন। তাদের দৃষ্টিতে, ক্লাইভ কেবলমাত্র ব্যক্তিগত লাভের জন্য কাজ করেছেন এবং তার শাসনকাল ভারতীয় জনগণের জন্য শোষণ ও দুঃখের সময় ছিল।
তার মৃত্যুর পর ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমে এই বিতর্ক ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। পত্রপত্রিকায় ক্লাইভের জীবনের সাফল্য ও ব্যর্থতা নিয়ে লেখালেখি শুরু হয়। একদিকে তার সামরিক কৃতিত্বের প্রশংসা করা হয়, অন্যদিকে তার শাসনকাল ও নৈতিকতা নিয়ে তীব্র সমালোচনা করা হয়। এই আলোচনা বহুদিন ধরে চলতে থাকে এবং ব্রিটিশ সমাজে ক্লাইভের উত্তরাধিকার নিয়ে দ্বন্দ্বও অমীমাংসিত থেকে যায়।
ক্লাইভের মৃত্যু: ঐতিহাসিক বিতর্ক
রবার্ট ক্লাইভের মৃত্যু নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে নানা মতামত বিদ্যমান। ঐতিহাসিক এ. এল. রাউস এবং পি.জে. মার্শাল মনে করেন, ক্লাইভের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি এবং ব্যক্তিগত জীবনের চাপে তিনি আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিলেন। রাউস বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন যে, ক্লাইভ দীর্ঘদিন ধরে হতাশা এবং অবসাদে ভুগছিলেন।
অন্যদিকে, ইতিহাসবিদ উইলিয়াম ডালরিম্পল এবং রিচার্ড বার্থলোমিউ ষড়যন্ত্রমূলক হত্যার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেননি। তাদের মতে, ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ভেতরে থাকা শত্রুরা এবং ক্লাইভের বিরুদ্ধে থাকা রাজনৈতিক শক্তিগুলো এই মৃত্যুর পেছনে থাকতে পারে।
রবার্ট ক্লাইভের জীবন যেমন বীরত্ব, বিতর্ক, এবং বিত্তের এক মিশ্রণ, তার মৃত্যু তেমনই এক ধোঁয়াশা। হয়তো আমরা কখনোই জানতে পারব না, আসল সত্যটি কী। তবে একথা নিশ্চিত—তার মৃত্যু ইতিহাসের এক রহস্যময় অধ্যায়, যা আমাদের কৌতূহল জাগিয়ে রাখে।
আপনার মতে, ক্লাইভের মৃত্যু কি সত্যিই আত্মহত্যা ছিল, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো গভীর ষড়যন্ত্র? আপনার মতামত শেয়ার করুন।
তথ্যসূত্র
https://www.historytoday.com/archive/history-matters/death-clive-india