“তারা কোনো ছায়া নয়, কিন্তু তাদের উপস্থিতি ভয় জাগায়। তারা কোনো রাষ্ট্র নয়, তবুও তাদের আইন চলে শহরের অলিগলিতে। বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ংকর গ্যাংগুলোর ইতিহাস হলো এক রক্তাক্ত অধ্যায়, যেখানে ক্ষমতার জন্য মানুষ কেবল একটি সংখ্যা।“
মাফিয়া! গ্যাংস্টার!!
আতংক আর অপরাধের অন্ধকার এক জগৎ যেন শব্দ দুটোর সাথে মিশে আছে। সৃষ্টির আদিকাল থেকেই নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি মানুষের আগ্রহ। তাই তো বিশ্বের ভয়ংকর সব মাফিয়াদের নাম শুনলেই গা ছমছম করে উঠলেও তাদের ব্যাপারে জানার আগ্রহ কমবেশি সবারই আছে। নইলে আমেরিকান-ইতালিয়ান মাফিয়া সাম্রাজ্য নিয়ে লেখা মারিও পুজোর ক্লাসিক উপন্যাস ‘দ্য গডফাদার’ একইসাথে রূপালি পর্দায় কিংবা বইয়ের সাদা পাতায় তুমুল জনপ্রিয়তা পায় কীভাবে?
বিখ্যাত মাফিয়া কিংবা তাদের সংস্কৃতি এখন শুধুই অপরাধবিজ্ঞানী কিংবা ঐতিহাসিকদের আলোচনায় সীমাবদ্ধ নেই। মাফিয়ারা এখন ঠিক একেবারে রহস্যময় কিছু নয়, ওপেন সিক্রেট। কিন্তু যদি ভেবে থাকেন, বাস্তবের মাফিয়া গল্প কিংবা ছবির মতই হবে, তাহলে আপনাদের সেই ভুল ধারণা ভাঙ্গা দরকার। কারণ, বাস্তবের মাফিয়া আরও ভয়ংকর, আরও হিংস্র।
এই লেখায় আমরা তুলে ধরবো বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ংকর অপরাধী গ্যাংগুলোর ইতিহাস, তাদের উত্থান, ক্ষমতার বিস্তার, আধুনিক যুগে তাদের অপারেশন এবং বাংলাদেশসহ এশিয়াতে সক্রিয় গ্যাংগুলোর তথ্য।
ইতিহাসের সবচেয়ে বিপজ্জনক মাফিয়া সংগঠন
১. ইতালির ‘কোসা নোস্ত্রা’: বিশ্ব মাফিয়া কালচারের জন্মদাতা
১৯ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে সিসিলিতে কৃষকদের স্বার্থ রক্ষার নামে গড়ে ওঠা এই মাফিয়া সংগঠনটি পরবর্তীতে ভয়ংকর অপরাধ জগতে পরিণত হয়। তারা চাঁদাবাজি, হত্যাকাণ্ড, অস্ত্র ও মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ে। সে দিক দিয়ে এটিকে অন্যদের তুলনায় নতুনই বলা যায়। কিন্তু এই অল্প সময়ে এই দল যে পরিমাণ ত্রাসের সঞ্চার করেছে যে একে উপেক্ষা করার উপায় থাকেনা।
অন্যান্য সংগঠনের সাথে এর পার্থক্য হলো, এই সংগঠনটি কঠোরভাবে পরিবারভিত্তিক। সিসিলিয়ান কয়েকটি পরিবার এই সংগঠনটি নিয়ন্ত্রণ করে। এদের নিয়ম অত্যন্ত কঠোর। “নিখুঁত, নীরব এবং সতর্ক”; এই হলো তাদের মূলমন্ত্র। এই মূল মন্ত্র ওমের্তা (omertà) নামে পরিচিত।
এই মূলমন্ত্রের কারণেই তাদের কাজ অত্যন্ত সফলভাবে পূর্ণ হয়। ভুল-ত্রুটির কোনো স্থান এই সংগঠনে নেই। কারো উপর অর্পন করা কাজ করতে কেউ যদি ব্যর্থ হয়; তখন তার সাজা হয় একটাই, আর তা হলো মৃত্যুদণ্ড।
কোসা নোস্ত্রার সবচেয়ে কুখ্যাত ডনদের একজন ছিলেন সালভাতোরে “টোতো” রিনা, যিনি ১৯৭০-৯০-এর দশকে ইতালির মাফিয়া দুনিয়ায় আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিলেন। বলা হয়, এই মাফিয়া সংগঠন শুধু ইতালিই নয়, নিউইয়র্কসহ পুরো বিশ্বের অপরাধ জগতের একটা বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করেছিল।
২. মেক্সিকোর কুখ্যাত ড্রাগ কার্টেল: অপরাধের সাম্রাজ্য
মেক্সিকোর অর্থনীতির প্রায় ৬৩% ই মূলত ড্রাগ মানি। মেক্সিকোতে সংগঠিত প্রায় সকল অপরাধের পেছনেই এই ড্রাগ কার্টেল কোনো না কোনো ভাবে অবশ্যই জড়িত থাকে।
কিছুদিন পর পর ড্রাগ-ওয়ার (drug war) এর জন্যও এরাই মূলত দায়ী। খুন, ধর্ষণ, অপহরণ এমন কোনো অপকর্ম নেই, যা এই কার্টেলের সদস্যরা করে না। মোটকথা, এদের কাজে নীতির কোনো বালাই নেই। প্রায় সময়ই এর সদস্যদের রকেট-লঞ্চার, একে-৪৭ এর মতো সামরিক অস্ত্রশস্ত্র ব্যবহার করতে দেখা যায়।
বিশেষ করে, এল চ্যাপো, যার পুরো নাম জোয়াকিন এল চ্যাপো গুজমান ছিল সেই গ্যাংয়ের এক ভয়ংকর অপরাধীর নাম। তিনি বিশ্বের অন্যতম ধনী ও ক্ষমতাধর ড্রাগ লর্ড ছিলেন। মেক্সিকো থেকে যুক্তরাষ্ট্র পর্যন্ত মাদকের চোরাচালানে তার ভূমিকা ছিল অপরিসীম।
৩. জাপানের ইয়াকুজা মাফিয়া: কিভাবে গড়ে উঠেছিলো এই গ্যাং?
জাপানের ইয়াকুজা মাফিয়া গ্যাং বিশ্বে অন্যতম প্রভাবশালী গ্যাং। ১৭ শতকে এই গ্যাং ছিলো টোকিওর সামুরাই। তবে আধুনিক যুগে এটি জুয়ার ব্যবসা, মাদক, মানব পাচার এবং চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে।
এই কোরীয় জাপানিজ অর্গানাইজড ক্রাইম সিন্ডিকেটটি মাফিয়া জগতের একদম শীর্ষে আছে। তাদের চলন-বলনেই যার প্রমাণ পাওয়া যায়। কারণ, তাদের রয়েছে অফিস বিল্ডিং, আছে বিজনেস কার্ডও এবং মাঝে মাঝেই তারা স্থানীয় সংবাদপত্রের প্রধান ফোকাসে থাকে। এই গ্যাং এর বস ইউবিতসুমে (yubitsume) নামে পরিচিত।
এই চক্রের সদস্যরা সব সময় কালো স্যুট পরেন, আর দলের প্রতি অনুগত থাকার নিদর্শন হিসেবে নিজেদের হাতের কনিষ্ঠ আঙুল কেটে ফেলেন। ইয়াকুজার সদস্যরা রাজনীতির সঙ্গে যেমন জড়িত, তেমনি বিভিন্ন করপোরেট প্রতিষ্ঠানের পরিচালক পদেও আছেন। অথচ, ২০১১ সালে ভয়ংকর সুনামির পর তারাই ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য প্রথম ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেন।
৪. রাশিয়ান মাফিয়া: সোভিয়েত ইউনিয়নের ছায়ায় জন্ম নেওয়া অপরাধ সাম্রাজ্য
প্রাক্তন একজন F.B.I স্পেশাল এজেন্টের ভাষ্যমতে, রাশিয়ান মাফিয়া হলো পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ানক মানুষকে নিয়ে গঠিত সংগঠন। প্রায় ৪৫০ টি গ্রুপ নিয়ে এই পুরো সংগঠনটি গঠিত। এদের সদস্য সংখ্যা প্রায় ৩ লক্ষেরও অধিক। তাদের অর্গানাইজেশনের প্রতীকযুক্ত ট্যাটু দিয়ে এই অর্গানাইজেশনের সদস্যদের শনাক্ত করা যায়। প্রাক্তন কিছু সামরিক সেনারা এই অর্গানাইজেশনের সদস্য, যার ফলে তারা সবসময় সামরিক যুদ্ধকৌশল অনুসরণ করে থাকে।
রাশিয়ান মাফিয়ারা ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর সবচেয়ে বেশি ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠে। তারা মূলত অস্ত্র ব্যবসা, হ্যাকিং, এবং অর্থ পাচারের জন্য কুখ্যাত।
বিশ্বের অন্যতম কুখ্যাত “ব্রাটভা” (Bratva) হলো রাশিয়ান মাফিয়া নেটওয়ার্ক, যারা আমেরিকা, ইউরোপ ও এশিয়াতেও সক্রিয়। তারা সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে মিলে অস্ত্র চোরাচালানে ব্যাপকভাবে জড়িত।
৫. কলম্বিয়ার মেদেলিন কার্টেল: পাবলো এস্কোবারের সাম্রাজ্য
পাবলো এস্কোবারের নেতৃত্বে মেদেলিন কার্টেল ছিল কলম্বিয়ার সবচেয়ে ভয়ংকর মাদক চক্র। ১৯৭০ থেকে ১৯৯৩ সালের মধ্যে এস্কোবার একাই যুক্তরাষ্ট্রের ৮০% কোকেন সরবরাহ করেছিল।
তার প্রতিপত্তি এতটাই বেশি ছিল যে, সে কলম্বিয়ার সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল এবং অনেক বিচারক, পুলিশ ও সাংবাদিকদের হত্যা করেছিল। ১৯৯৩ সালে এস্কোবার নিহত হলেও, কলম্বিয়ার ড্রাগ চোরাচালান আজও বন্ধ হয়নি।
৬. আলবেনিয়ান মাফিয়া: ইউরোপের সবচেয়ে ভয়ংকর গ্যাং
ইউরোপে ভয়ংকর অপরাধী সংগঠনগুলোর মধ্যে আলবেনিয়ান মাফিয়া অন্যতম। তারা বিশেষভাবে পরিচিত মাদক চোরাচালান, মানব পাচার এবং অস্ত্র ব্যবসার জন্য।
এদের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, তারা ভাষাগতভাবে বিচ্ছিন্ন এবং সিক্রেট অপারেশন চালাতে সক্ষম। ইউরোপের বেশ কিছু বড় অপরাধ চক্র তাদের সাহায্যে কার্যক্রম চালায়।
৭. যুক্তরাষ্ট্রের কুখ্যাত গ্যাং: MS-13 এবং ক্রিপস-ব্লাডস গ্যাং
(ক) MS-13: সবচেয়ে হিংস্র গ্যাং
এল সালভাদর থেকে আসা MS-13 (Mara Salvatrucha) গ্যাং এতটাই ভয়ংকর যে, এফবিআই তাদের ‘সর্বাধিক হিংস্র গ্যাং’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। তারা অত্যন্ত নৃশংসভাবে হত্যা, অপহরণ এবং মাদক চোরাচালান চালায়।
(খ) ক্রিপস ও ব্লাডস: কালো আমেরিকান গ্যাং যুদ্ধ
লস অ্যাঞ্জেলেসে ক্রিপস এবং ব্লাডস গ্যাংয়ের সৃষ্টি হয়। তারা একসময় ব্ল্যাক কমিউনিটির রক্ষাকর্তা ছিল, কিন্তু পরবর্তীতে ভয়ংকর ড্রাগ এবং অস্ত্র ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ে।
বিশ্বের ভয়ংকর মাফিয়া সংগঠনগুলো শুধু অপরাধ চালিয়েই ক্ষান্ত হয়নি—তারা যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি, অর্থনীতি এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকেও প্রভাবিত করেছে।
বাংলাদেশে অপরাধী গ্যাংয়ের উত্থান ও প্রভাব
বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মাফিয়া গ্যাংগুলোর প্রভাব তুলনামূলক কম হলেও দেশীয় কিছু গ্যাং ক্রমশই ভয়ংকর হয়ে উঠছে। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, আইনশৃঙ্খলার দুর্বলতা, এবং সহজলভ্য অবৈধ অর্থের কারণে এসব গ্যাং দ্রুত বিস্তার লাভ করেছে।
ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা ও সীমান্তবর্তী এলাকায় এসব অপরাধী চক্রের কার্যক্রম বেশি দেখা যায়। বিশেষ করে চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী হামলা, মাদক ব্যবসা, মানব পাচার, এবং অস্ত্র চোরাচালান—এসব কাজে তাদের সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে।
১. ঢাকার কুখ্যাত ক্যাডার বাহিনী ও মাদক সিন্ডিকেট
রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে ক্যাডার বাহিনী, যারা রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় বেআইনি কর্মকাণ্ড চালায়। বিশেষ করে পুরান ঢাকা, যাত্রাবাড়ী, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, এবং উত্তরা এলাকায় ভয়ংকর কিশোর ও তরুণ গ্যাং সক্রিয় রয়েছে।
এদের মূল কাজ হলো- চাঁদাবাজি ও দখলবাজি, মাদক ব্যবসা (ইয়াবা, গাঁজা, ফেনসিডিল সরবরাহ), সন্ত্রাসী কার্যকলাপ ও হামলা।
পুরান ঢাকার কিছু ক্যাডার গ্যাং কুখ্যাত ছিল, যারা ৯০-এর দশকে শুরু হয়ে এখনও বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয়। এদের মধ্যে গোল্ডেন গ্রুপ, তমিজ গ্রুপ, বাবু বাহিনী, শাহাদাত বাহিনী ইত্যাদি বেশ পরিচিত নাম।
২. কিশোর গ্যাং: ভয়ংকর বাস্তবতা
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিশোর গ্যাং কালচার ভয়ংকর রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, এবং গাজীপুর এলাকায় ব্ল্যাক কোবরা, ডি-ম্যান, নাইন স্টার, ভাইবোন গ্রুপ, ডিসকো বয়েজ-এর মতো কিশোর গ্যাং সক্রিয়।
কিশোর গ্যাংদের মধ্যে দেখা যায়- অস্ত্রবাজি ও মারামারি, টিকটক ও ফেসবুক লাইভে এসে হুমকি দেওয়া, মাদক সেবন ও ব্যবসায় জড়িত হওয়া, প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রুপের সঙ্গে বিভিন্ন সময় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়া।
বিশেষ করে, গ্যাংগুলোর সদস্যরা বড় গ্যাংস্টারদের অনুসরণ করে এবং মাফিয়া কালচারের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রভাবিত হয়ে তারা গ্যাংভুক্ত হয় এবং ভয়ংকর অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে।
৩. সীমান্তবর্তী গ্যাং ও চোরাচালান সিন্ডিকেট
বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় মাদক চোরাচালান ও অস্ত্র ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে একাধিক গ্যাং। এই গ্যাংগুলোর মধ্যে রয়েছে “নুর মোহাম্মদ সিন্ডিকেট,” “হাকিম গ্রুপ,” এবং “বর্ডার কিংস”—যারা সীমান্তজুড়ে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করে।
তাদের মধ্যে নির্দিষ্ট কিছু এলাকা চিহ্নিত করা আছে, যেখান থেকে বিভিন্ন চক্র একসাথে কাজ করে থাকে। যেমন-
টেকনাফ ও কক্সবাজার- ইয়াবা ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে কয়েকটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট, যা মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের কারবারিদের সঙ্গে যুক্ত।
যশোর, সাতক্ষীরা ও চুয়াডাঙ্গা- ভারত থেকে ফেনসিডিল, গাঁজা ও হেরোইন আমদানি করা হয়।
রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ- চোরাচালান, অবৈধ অস্ত্র সরবরাহ এবং স্বর্ণ পাচারের কেন্দ্রবিন্দু।
দক্ষিণ এশিয়ার ভয়ংকর গ্যাং ও তাদের কার্যক্রম
বাংলাদেশের গ্যাংগুলোর পাশাপাশি, ভারত, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন এবং পাকিস্তানেও ভয়ংকর অপরাধী গ্যাং রয়েছে, যারা পুরো এশিয়াজুড়ে রীতিমতো ত্রাসের সঞ্চার করেছে। এগুলো হলো-
১. দাউদ ইব্রাহিমের “D-Company” (ভারত)
মুম্বাই থেকে পরিচালিত ভারতের সবচেয়ে বড় অপরাধী সংগঠন। এদের প্রধান কাজ- ড্রাগ, অস্ত্র চোরাচালান, হত্যা, চাঁদাবাজি।
পাকিস্তানের জঙ্গী গোষ্ঠী ISI-এর সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে এদের। ১৯৯৩ সালে মুম্বাই বোমা হামলায় সরাসরি সম্পৃক্ততা ছিল এদের।
২. শান ইউনিয়ন (থাইল্যান্ড)
শান ইউনিয়ন থাইল্যান্ড ও মিয়ানমারের সীমান্তে মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে। অপরাধের পাশাপাশি তারা রাজনীতিতেও ব্যাপক প্রভাবশালী। স্বর্ণ ও রত্ন পাচারের সাথে জড়িত এদের নাম।
৩. ট্রাইয়াড (হংকং, চীন)
বিশ্বের অন্যতম ধনী ও সুসংগঠিত গ্যাং ট্রাইয়াড। অবৈধ ক্যাসিনো, সাইবার ক্রাইম, মানব পাচার এবং ড্রাগ ব্যবসা রয়েছে এদের। চীনের মূল ভূখণ্ড, হংকং, এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াজুড়ে এরা বিস্তৃত।
৪. কম্বোডিয়ান ক্রাইম সিন্ডিকেট (কম্বোডিয়া)
এরা কম্বোডিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী অপরাধী চক্র। কম্বোডিয়ার সব ধরনের অপরাধের সাথেই এদের সম্পৃক্ততা থাকলেও এরা বিশেষভাবে মাদক চোরাচালান, মানব পাচার, এবং অবৈধ ক্যাসিনো ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে।
৫. আবু সালেম গ্যাং (ভারত)
ভারতীয় মাফিয়া নেতা আবু সালেম, যিনি মুম্বাইয়ের আন্ডারওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রণ করতেন। মাদক চোরাচালান, অস্ত্র সরবরাহ, এবং চাঁদাবাজি করে সম্পদের বিশাল পাহাড় গড়ে তুলেছে তারা।
আধুনিক যুগের গ্যাং ও মাফিয়াদের নতুন কৌশল ও অপারেশন
সময় বদলেছে, বদলেছে গ্যাংস্টারদের কৌশলও। আগের মতো শুধু সড়কের দখলদারি, চাঁদাবাজি বা খুনোখুনি করেই গ্যাং ও মাফিয়ারা টিকে নেই। তারা এখন আরও স্মার্ট, গ্লোবাল এবং প্রযুক্তি-নির্ভর অপরাধ জগৎ গড়ে তুলেছে।
বিশ্বের অনেক প্রভাবশালী অপরাধী সংগঠন এখন বিটকয়েন ও ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার করে অর্থ লেনদেন করছে, যাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের কার্যকলাপ শনাক্ত করতে না পারে। একই সঙ্গে সাইবার ক্রাইম, হ্যাকিং, ডার্ক ওয়েব অপারেশন, এবং আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালানের মাধ্যমে আধুনিক অপরাধ জগতে নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করছে।
১. ডার্ক ওয়েবে অপরাধ: গ্যাংস্টারদের নতুন যুদ্ধক্ষেত্র
বর্তমানে ডার্ক ওয়েব অপরাধ জগতের সবচেয়ে নিরাপদ যোগাযোগ মাধ্যম হয়ে উঠেছে। এখানে ড্রাগ, অস্ত্র, মানব পাচার, এবং ভাড়াটে খুনির ব্যবসা চলে নিরবচ্ছিন্নভাবে।
বিশ্বের কুখ্যাত মাফিয়া ও গ্যাং সংগঠনগুলো ডার্ক ওয়েব ব্যবহার করে গোপন বাজার পরিচালনা করে। এখানে কোনো সরকারি নজরদারি ছাড়াই অপরাধীরা লেনদেন করতে পারে এবং নিজেদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে।
২. ক্রিপ্টোকারেন্সি: অপরাধীদের নিরাপদ ব্যাংকিং ব্যবস্থা
আগে মাফিয়ারা টাকা ব্যাংকে রাখার ঝুঁকি নিতো না। তারা ক্যাশ বা স্বর্ণ জমিয়ে রাখতো। কিন্তু এখন ক্রিপ্টোকারেন্সি প্রযুক্তির মাধ্যমে গ্যাং ও মাফিয়ারা তাদের কালো টাকা নিরাপদে লুকিয়ে রাখছে। ব্যাংকের পরিবর্তে বিটকয়েন বা অন্য ক্রিপ্টো ব্যবহার করে তারা মাদক ও অস্ত্র কেনাবেচা করে।
অন্যদিকে অপরাধ থেকে অর্জিত টাকা বিভিন্ন ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে সাদা করে ফেলতেও তাদের জুড়ি নেই। এমনকি বড় বড় মাফিয়া সংগঠনগুলো এখন সাইবার ক্রাইম করে বড় প্রতিষ্ঠানকে হ্যাক করে এবং মুক্তিপণ দাবি করে ক্রিপ্টোকারেন্সিতে।
এক গবেষণা অনুযায়ী, বিশ্বের ৩০% এর বেশি অপরাধী গ্যাং এখন ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে লেনদেন করছে, যা তাদেরকে পুলিশের হাতে ধরা পড়তে অনেক কঠিন করে তুলেছে।
৩. সাইবার ক্রাইম: আধুনিক যুগের ভয়ংকর গ্যাং ও মাফিয়াদের অস্ত্র
অতীতের গ্যাংস্টাররা পিস্তল আর ছুরি দেখিয়ে মানুষকে নাস্তানাবুদ করতো, হয়রানি করতো। এসব দিন এখন ইতিহাস হয়ে গেছে৷ বর্তমানের মাফিয়ারা ল্যাপটপ আর ইন্টারনেট ব্যবহার করেই হাজার কোটি টাকা লুট করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৪ সালের মধ্যে সাইবার অপরাধের কারণে বিশ্বব্যাপী প্রায় ১০ ট্রিলিয়ন ডলার ক্ষতি হয়েছে, যেখানে গ্যাং ও মাফিয়াদের বড় ভূমিকা রয়েছে।
৪. মাদক চোরাচালানে নতুন কৌশল: ড্রোন ও সাবমেরিনের ব্যবহার
মাদক ব্যবসা সবসময়ই গ্যাংস্টারদের প্রধান আয়ের উৎস। কিন্তু এখন গ্যাং ও মাফিয়ারা ড্রোন, সাবমেরিন এবং হাই-টেক গোপন টানেল ব্যবহার করে মাদক পাচার করছে। বিশেষ করে, মেক্সিকোর সিনালোয়া কার্টেল ও কলম্বিয়ার ড্রাগ লর্ডরা এখন অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে মাদক পাচার করছে।
বিশ্বজুড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আধুনিক অপরাধ মোকাবিলায় কাজ করছে, তবে অপরাধীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও নেটওয়ার্ক এতটাই শক্তিশালী যে, তাদের দমন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। আগামী দিনে গ্যাং ও মাফিয়াদের এই আধুনিক কৌশল আরও বিপজ্জনক হতে পারে, যদি বিশ্বব্যাপী সাইবার নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা শক্তিশালী না করা হয়।
তথ্যসূত্র
- https://itibritto.com/10-mafia-group-in-the-world/
- https://www.risingbd.com/feature-news/215358
- https://archive.roar.media/bangla/main/world/the-code-of-omerta
- https://www.prothomalo.com/opinion/column/6ggy6d8s14
- https://bn.wikipedia.org/wiki/কিশোর_গ্যাং
- https://telegrafi.com/en/these-are-the-ten-most-dangerous-mafia-organizations-in-the-world/amp/
- https://en.m.wikipedia.org/wiki/American_Mafia
- https://www.watchmojo.com/articles/top-20-most-dangerous-real-life-gangs-in-the-world