Image default
রহস্য রোমাঞ্চ

মৌরিতানিয়ার অদ্ভুত ডিভোর্স মার্কেটের অবিশ্বাস্য গল্প

তারা বলে থাকে, “ডিভোর্সড উওম্যান ইজ এ ডায়মন্ড”, অর্থাৎ ডিভোর্স হওয়া নারী হলো হীরার মতো মূল্যবান।

একজন নারী যখন বিবাহবিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেন, তখন তাকে কেবল পারিবারিক চাপ নয়, সামাজিক কটূক্তি ও বিদ্রূপেরও শিকার হতে হয়। অনেকেই মনে করেন, বিবাহবিচ্ছেদ মানেই একজন নারীর জীবনের ব্যর্থতা। কিন্তু যদি বলি পৃথিবীর এমন এক দেশ আছে, যেখানে ডিভোর্সকে দুঃখ নয়, বরং নতুন সম্ভাবনার দরজা হিসেবে দেখা হয়? আর আশ্চর্যের বিষয় সেই সম্ভাবনাকে কেন্দ্র করে আবার গড়ে উঠেছে এক অদ্ভুত সামাজিক প্রথা, যার নাম ডিভোর্স মার্কেট।

আজকে আমরা জানব আফ্রিকার মরুভূমি ঘেরা দেশ মৌরিতানিয়ার সেই আশ্চর্যজনক ডিভোর্স মার্কেটের গল্প; যা শুনলে হয়তো আপনার চোখ কপালে উঠবে। 

মৌরিতানিয়ার পরিচিতি 

আফ্রিকার উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত মৌরিতানিয়া একটি মরুপ্রধান দেশ। দেশটির অধিকাংশ অংশ জুড়েই রয়েছে সাহারা মরুভূমি।  দেশটির উত্তরে পশ্চিম সাহারা, পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বে মালি, দক্ষিণ-পশ্চিমে সেনেগাল এবং পশ্চিমে আটলান্টিক মহাসাগর যা মৌরিতানিয়াকে ভৌগোলিকভাবে একটি অনন্য অবস্থান দিয়েছে। 

১৯৬০ সালে ফ্রান্সের কাছ থেকে স্বাধীনতা অর্জনের পর মৌরিতানিয়া একটি ইসলামী প্রজাতন্ত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। তবে, জনসংখ্যার প্রায় ১০০% মুসলিম হলেও এখানকার সামাজিক রীতিনীতি ইসলামের প্রচলিত ধারণা থেকে অনেক ক্ষেত্রে ভিন্ন। এখানকার সরকারি ভাষা আরবি হলেও ফরাসি ভাষাও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে বহুল ব্যবহৃত হয়। জাতিগতভাবেও দেশটি আরব-বারবার ও আফ্রিকান জনগোষ্ঠীর সমন্বয়ে গঠিত, যার প্রভাব এর সংস্কৃতি ও জীবনধারায় স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়।

মৌরিতানিয়ার মানুষের জীবনযাত্রা

অর্থনৈতিকভাবে মৌরিতানিয়া মূলত প্রাকৃতিক সম্পদের উপর নির্ভরশীল। লৌহ আকরিক, সোনা, তামা এবং মাছ ধরা এখানকার প্রধান আয়ের উৎস। বিশেষ করে এখানকার আটলান্টিক মহাসাগরের তীরবর্তী অঞ্চল মাছের প্রাচুর্যের জন্য বিখ্যাত। তবে দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক বৈষম্য এখনো দেশের বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়ে গেছে। যেহেতু মরুভূমি এলাকা হওয়ায় দেশটিতে কৃষি উৎপাদন সীমিত, তাই বেশিরভাগ মানুষ পশুপালন ও ক্ষুদ্র ব্যবসার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে।   

সংস্কৃতি ও সামাজিক রীতিনীতি মৌরিতানিয়াকে বিশ্বে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে। আরব ও আফ্রিকান ঐতিহ্যের মিশ্রণে এখানে সংগীত, পোশাক ও দৈনন্দিন জীবনধারায় এক ধরনের স্বকীয়তা লক্ষ্য করা যায়। তবে সবচেয়ে বেশি অবাক করা বিষয় হলো তাদের বিবাহ ও বিবাহবিচ্ছেদ বিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গি। 

মৌরিতানিয়ায় ডিভোর্স

আমরা সকলে জানি, বাংলাদেশ, ভারত কিংবা ইউরোপ-আমেরিকার বেশিরভাগ সমাজে ডিভোর্সকে সাধারণত পরিবার ভেঙে যাওয়া, মানসিক কষ্ট এবং সামাজিক লজ্জার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। এসব দেশে বিবাহবিচ্ছেদ নিয়ে প্রচলিত ধ্যানধারণা অনেক সময় নারীদের ওপর নেতিবাচক মনোভাব সৃষ্টি করে। ডিভোর্স হওয়া নারীর প্রতি পরিবারের সদস্য, আত্মীয় বা সমাজের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি প্রায়শই নেতিবাচক হয়। এ ধরনের সমাজে ডিভোর্স মানেই ব্যর্থতা, যা নারীর মর্যাদা ও সামাজিক অবস্থানকে কমিয়ে দেয়। কিন্তু আফ্রিকার এই মৌরিতানিয়ার সামাজিক বাস্তবতা এই সাধারণ বিশ্বাসের সম্পূর্ণ বিপরীত। 

এখানে একজন নারী যদি বিবাহবিচ্ছেদ নেন, তাকে ব্যর্থ বা হেরে যাওয়া হিসেবে দেখা হয় না। বরং সমাজ তাকে অভিজ্ঞ, স্বাধীন এবং সংসার চালনায় দক্ষ হিসেবে বিবেচনা করে। এখকার মানুষ মনে করেন, এমন নারী সংসারের সকল নিয়ম-কানুন, রান্নাবান্না এবং দৈনন্দিন দায়িত্ব অত্যন্ত ভালোভাবে জানেন। তার অভিজ্ঞতা তাকে বিয়ের ক্ষেত্রে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে। অনেক পুরুষই ডিভোর্স হওয়া নারীদের বিয়ে করতে বেশি পছন্দ করেন, কারণ তারা মনে করেন এই নারীরা বাস্তবধর্মী, দায়িত্বশীল এবং সংসার পরিচালনায় সক্ষম। 

অবিশ্বাস্য ডিভোর্স মার্কেট

অবিশ্বাস্য শোনালেও সত্যি, মৌরিতানিয়ায় একজন নারী যদি জীবনে তিন-চারবারও ডিভোর্স হন, তাও সেটি সেখানকার সমাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে না। বরং অনেক ক্ষেত্রে এটি তার মর্যাদা, সামাজিক গুরুত্ব এবং সম্মান বাড়িয়ে দেয়। আর এই অবিশ্বাস্য সত্য থেকে হয়তো জন্ম নিয়েছে এখানকার ডিভোর্স মার্কেট। এখাকার কিছু শহরে সপ্তাহে নির্দিষ্ট দিনে বসে এই বিশেষ বাজার, যা স্থানীয়দের কাছে “মার্কেট ফর ডিভোর্সড উইমেন” নামে পরিচিত।

এই মার্কেটে ডিভোর্স হওয়া নারীরা রঙিন ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে হাজির হন। তাদের সঙ্গে থাকেন তাদের আত্মীয়-স্বজন বা বান্ধবীরা, যারা নানাভাবে তাদের সমর্থন করেন। অন্যদিকে পুরুষরা আসে নতুন বিয়ের সম্ভাবনা খুঁজতে। মজার বিষয় হলো, এই বাজারটি কোনো লুকানো বা গোপন অনুষ্ঠান নয়। বরং এটি খোলাখুলিভাবে আয়োজন করা হয়। হাসি-আড্ডা, গান-বাজনায় চারদিক এক উৎসবের রূপ নেয়। নারীরাও এখানে নিজেদের আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে উপস্থাপন করেন। এখানে কোন লজ্জা বা সংকোচ থাকে না। 

মৌরিতানিয়ার ডিভোর্স উৎসব

এখন প্রশ্ন আসতেই পারে যে এই  ডিভোর্স মার্কেটের উৎপত্তি কিভাবে হলো কিংবা কিভাবে গড়ে উঠলো? মৌরিতানিয়ার এই ডিভোর্স মার্কেট কোনও আকস্মিক বা কল্পনাপ্রসূত ঘটনা নয়। এটি ধীরে ধীরে সামাজিক, ধর্মীয় এবং সাংস্কৃতিক কারণের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে। দেশটির ১০০% মুসলিম জনসংখ্যা, ইসলামি শরিয়াহ এবং বিশেষ পারিবারিক কাঠামো এই বাজারের প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে। ইসলাম ধর্মে ডিভোর্স বৈধ, ফলে নারীরা নিজ ইচ্ছায় তালাক চাইতে পারেন এবং এই সমাজ তা স্বাভাবিকভাবে মেনে নেয়। 

কেন ডিভোর্স মার্কেট জনপ্রিয়

শুধু তাই নয়, সামাজিক কাঠামো এবং পরিবারগুলোর রীতিনীতি বাজারের বিকাশকে উৎসাহ দিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, নারীরা স্বামীর সঙ্গে অসন্তুষ্ট থাকলে বা অত্যাচারের শিকার হলে তারা ডিভোর্স নেন। সমাজ এ সিদ্ধান্তকে নেতিবাচক হিসেবে না দেখে, তাদের স্বাধীনতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা স্বীকৃতি দেয়। ফলে নারীও আত্মবিশ্বাসীভাবে নিজের জীবন নতুনভাবে সাজাতে পারছেন।

সাংস্কৃতিক কারণেও দেশটিতে ডিভোর্স মার্কেটকে এক ধরনের সামাজিক অনুষ্ঠান হিসেবে দেখা হয়। এখানে নির্দিষ্ট দিনে বাজার বসার প্রথা তৈরি হয়েছে, যেখানে ডিভোর্স হওয়া নারীরা রঙিন পোশাক পরে হাজির হন, আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুদের সঙ্গে আসেন। পুরুষরা আসেন নতুন বিয়ে করার সম্ভাবনা খুঁজতে। হাসি-আড্ডা, গান-বাজনা এবং মজার পরিবেশ এই বাজারকে কেবল ব্যবসা বা বিয়ের জায়গা নয়, বরং সামাজিক উৎসবে পরিণত করেছে।

আবার, অর্থনৈতিক ও ব্যক্তিগত কারণও ডিভোর্স মার্কেটকে শক্তিশালী করেছে। অভিজ্ঞ নারীরা সংসার চালনায় দক্ষ, তাই পুনর্বিবাহের ক্ষেত্রে তাদের চাহিদা বেশি। এটি নারীর জন্য স্বনির্ভরতার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। ফলে বাজারের ধারাবাহিকতা এবং গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়েছে।

মৌরিতানিয়ার ডিভোর্স মার্কেট অনেকের জন্য অবিশ্বাস্য হলেও এটি এই দেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতার অংশ। আফ্রিকার মধ্যে মৌরিতানিয়ার ডিভোর্স রেট সবচেয়ে বেশি। অন্য কোনো দেশের তুলনায় এখানে ডিভোর্সকে কলঙ্ক বা ব্যর্থতা হিসেবে দেখা হয় না। বরং এটি নারীর স্বাধীনতা এবং জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু করার এক প্রক্রিয়া হিসেবে সমাজে স্বীকৃত।

এখানে একজন নারী জীবনে গড়ে তিন-চারবার বিয়ে করলেও তা একেবারেই স্বাভাবিক। সমাজে এটি নেতিবাচকভাবে প্রতিফলিত হয় না। স্থানীয় সংস্কৃতিতে এমন নারীদের মূল্যায়ন করার একটি প্রবাদ আছে। তারা বলে থাকে, “ডিভোর্সড উওম্যান ইজ এ ডায়মন্ড”, অর্থাৎ ডিভোর্স হওয়া নারী হলো হীরার মতো মূল্যবান। এই মূল্যায়ন শুধু সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতেই নয়, বরং অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে নারীর গুরুত্বও বৃদ্ধি করে।

এতে দেখা যায়, অনেক ডিভোর্স হওয়া নারী পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক, ব্যবসায়িক বা সামাজিক নেতৃত্বের দায়িত্বও গ্রহণ করেছেন। তাদের অভিজ্ঞতা, দক্ষতা এবং স্বাধীন চিন্তাভাবনা সমাজে নেতিবাচক নয়, বরং প্রশংসনীয় হিসেবে বিবেচিত হয়। ডিভোর্স মার্কেট কেবল একটি সামাজিক প্রথা নয়, এটি নারীর ক্ষমতায়ন এবং স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার প্রদর্শনের প্রতীক।

অবশ্যই, এই বাজার ও প্রথার সমালোচকও আছেন। তারা মনে করেন, অতিরিক্ত ডিভোর্স পরিবার ভাঙনের সংস্কৃতি তৈরি করতে পারে। বাচ্চাদের মানসিক প্রভাবিত করার আশঙ্কা রয়েছে, কারণ পরিবার বিচ্ছিন্ন হলে শিশুরা স্থির ও নিরাপদ পরিবেশ পায় না। এছাড়া সমাজে দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের গুরুত্ব কমে যেতে পারে, যা সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

তবুও মৌরিতানিয়ার মানুষ ডিভোর্স মার্কেটকে তাদের সংস্কৃতির অঙ্গ হিসেবে দেখে। এখানে ডিভোর্সকে শেষ বলে মনে করা হয় না; বরং এটি জীবনের নতুন সুযোগ, নারীর স্বাধীনতা এবং সামাজিক মর্যাদার এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। সমাজ নারীর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তকে সম্মান করে এবং তাকে নতুনভাবে জীবন শুরু করার সুযোগ দেয়। ফলে, মৌরিতানিয়ার ডিভোর্স মার্কেট কেবল পারিবারিক বা সামাজিক নয়, এটি নারীর স্বাধীনতা, মর্যাদা এবং ক্ষমতায়নের এক অসাধারণ উদাহরণ হিসেবে দাঁড়িয়েছে, যা বিশ্বের অন্যান্য সমাজের তুলনায় একেবারেই ভিন্ন ও চমকপ্রদ।

তথ্যসূত্র-

Related posts

থাইপুসাম উৎসব: ভক্তরা কেন শরীর বিদ্ধ করেও ব্যথা অনুভব করেন না?

চীনের ‘স্টোন ফরেস্ট’: প্রকৃতির বিস্ময় এক পাথরের বন!

ভৌতিক গ্রাম কুলধারা: বাস্তবতা নাকি নিছক গল্প!

Leave a Comment

Table of Contents

    This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More