যদি বলি পৃথিবীতে এমন একটি জায়গা আছে, যেখানে রাস্তা এতই সংকীর্ণ যে, দুইজন মানুষ পাশাপাশি হেঁটে যেতে পারলেও, গাড়ি চলার জায়গা নেই। হ্যাঁ, এটি বিশ্বের সবচেয়ে সরু শহর—ইয়ানজিন! এখানকার ঘরবাড়ি, দোকান এবং ভবনগুলো যেন একে অপরের ওপর স্তূপাকারে গড়ে উঠেছে। ছোট ছোট সরু রাস্তা, নদীর ধারে উঁচু ভবন, আর স্থানীয়দের ঘনিষ্ঠ জীবন—সব মিলিয়ে এই শহরটি একেবারে ভিন্ন অভিজ্ঞতা।
চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমে ইউনান প্রদেশের পাহাড়ি অঞ্চলে অবস্থিত এক অদ্ভুত শহর—ইয়ানজিন। এই শহরকে বলা হয় পৃথিবীর সবচেয়ে সরু শহর। কারণ, শহরটি গড়ে উঠেছে একেবারে পাহাড়ের কোল ঘেঁষে, একটি সরু উপত্যকার ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া নানসি নদীর দুই তীরে। শহরের দৈর্ঘ্য প্রায় ৭ কিলোমিটার হলেও, প্রস্থ মাত্র ৩০ থেকে ৩০০ মিটার পর্যন্ত। অর্থাৎ, একটি ফুটবল মাঠের চেয়েও কম চওড়া জায়গার ওপর, দাঁড়িয়ে আছে পুরো একটি শহর। উপরে উঁচু পাহাড়, নিচে নদী- এর মাঝেই যেন জাদুর মতো জায়গা করে নিয়েছে ইয়ানজিন।
এই শহরে বর্তমানে প্রায় সাড়ে চার লাখ মানুষ বসবাস করে। আর তাদের জীবনের প্রতিটি দিকেই জায়গার সংকীর্ণতা প্রভাব ফেলেছে। ঘরবাড়ি তৈরি হয়েছে একে অপরের গায়ে ঠেসে। নদীর দুই ধারে সারি সারি ভবন আর সরু রাস্তাগুলোতে সবসময়ই ব্যস্ততা লেগে থাকে। যানবাহন খুব সীমিত, বেশিরভাগ মানুষ হাঁটতে হাঁটতেই একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে যায়।
ম্যাপ
ইয়ানজিন শহরের ইতিহাস
ইয়ানজিন শহরের ইতিহাস বেশ পুরোনো। ধারণা করা হয়, শত শত বছর আগে নদীর আশেপাশের উর্বর জমিতে কৃষিকাজের জন্যই এখানে মানুষ বসবাস শুরু করে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই নদীই হয়ে ওঠে, তাদের জীবনধারার কেন্দ্রবিন্দু। বহু বছর ধরে, নানসি নদীই শহরের প্রধান জলস্রোত এবং যোগাযোগের মাধ্যম ছিল। আর পাহাড়, শহরটিকে প্রাকৃতিক দুর্গের মতো নিরাপত্তা দিয়েছে। সেই কারণেই চীনের প্রাচীন কিছু বাণিজ্যিক পথেরও অংশ ছিল ইয়ানজিন।
এই শহরের মানুষ মূলত চীনের হান ও ইয়ি জাতিগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। তারা পরিশ্রমী ও অতিথিপরায়ণ। তাদের সংস্কৃতিতে পাহাড় ও নদীকে ঘিরে অসংখ্য কাহিনি ও লোকবিশ্বাস জড়িয়ে আছে। বছরের নির্দিষ্ট সময়ে নদী দেবীর পূজা ও পাহাড় দেবতার উদ্দেশ্যে নৈবেদ্য উৎসর্গ প্রথা, এখনো স্থানীয়দের জীবনের অংশ। তাদের পোশাকেও দেখা যায় গ্রামীণ সরলতা। এই শহরের মেয়েরা রঙিন স্কার্ট ও ফুলেল নকশার জামা পরে, আর ছেলেরা সাধারণ শক্ত কাপড়ের পোশাক পরতে পছন্দ করে।
ইয়ানজিনের পর্যটনকেন্দ্র
ইয়ানজিনে বড় কোনো আধুনিক পর্যটনকেন্দ্র না থাকলেও শহরটি নিজেই এক দর্শনীয় বিস্ময়। শহরের ওপর থেকে তাকালে দেখা যায়—নদীর দুপাশে ঘনবসতিপূর্ণ ঘরবাড়ি, মাঝে সরু জলধারা, আর তার দুই পাশে সুউচ্চ পাহাড় যেন প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে আছে। অনেকে এটিকে “চীনের প্রাকৃতিক ক্যানিয়ন সিটি” বলে অভিহিত করে।

পাথরের গায়ে গড়ে তোলা ঘরবাড়ি, সরু রাস্তায় হেঁটে চলা মানুষ আর নদীর স্রোতের সঙ্গে তাল মিলিয়ে গড়ে ওঠা জীবন সব মিলিয়ে ইয়ানজিন শহর এক বাস্তব অভিজ্ঞতার জায়গা। এখানকার ঘরগুলো অনেক জায়গায় পাহাড়ের ঢালে বা পাথরের গায়ে নির্মিত, কারণ সমতল ভূমি এখানে খুবই অল্প। অনেক বাড়িই নদীর তীর ঘেঁষে তৈরি, যাতে বাসিন্দারা সহজে পানি ব্যবহার করতে পারেন।
শহরের রাস্তাগুলো এতটাই সরু যে অনেক জায়গায় দুইজন মানুষ পাশাপাশি হাঁটতে কষ্ট হয়। তবুও এখানে প্রতিদিন নিয়মিত জীবনযাপন চলে—মানুষ কাজ করে, শিশুরা স্কুলে যায়, আর নদীর পাড়ে বাজার বসে।
ইয়ানজিনের খাবার
ইয়ানজিনের অন্যতম জনপ্রিয় খাবার হলো রাইসকেক উইথ লোকাল হার্বস। অর্থাৎ ভেষজ মেশানো চালের কেক। এটি সাধারণত চালের গুঁড়া দিয়ে তৈরি হয়, পরে স্থানীয় পাহাড়ি ভেষজ ও মশলা মিশিয়ে বাষ্পে রান্না করা হয়। গরম অবস্থায় পরিবেশন করা এই কেক নরম ও হালকা মিষ্টি-নোনতা স্বাদের হয়। কখনও কখনও এর ওপর ভাজা তিল, পেঁয়াজপাতা বা মরিচের তেল ছড়িয়ে দেওয়া হয়, যা খাবারটিকে আরও সুগন্ধি ও আকর্ষণীয় করে তোলে।

এরপর তাদের খাবারের তালিকায় আসে টোফু। এটি চীনা খাবারের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ইয়ানজিনের টোফু সাধারণত স্থানীয়ভাবে তৈরি হয়, তাই এর স্বাদ অনেকটাই খাঁটি। এখানে টোফু অনেকভাবে রান্না করা হয়। ভাজা, স্যুপে দেওয়া, বা ঝোলের সঙ্গে পরিবেশন করা ইত্যাদি। এই খাবারগুলোর সঙ্গে অনেক সময় স্থানীয়রা চা পান করে। বিশেষ করে ফুলের চা বা ভেষজ চা। পাহাড়ি এলাকার ঠান্ডা আবহাওয়ায় গরম চা আর ঝাল খাবারের সংমিশ্রণ তাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ।
ইয়ানজিনের অর্থনীতি
ইয়ানজিনের মানুষ মূলত কৃষিকাজ, ছোট ব্যবসা এবং পরিবহণ কাজের সঙ্গে যুক্ত। নদীর তীর ঘেঁষে ছোট ছোট দোকান, রেস্টুরেন্ট ও স্থানীয় বাজার রয়েছে। অনেকে মাছ ধরা এবং নদীসংলগ্ন জমিতে সবজি চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। শহরের অর্থনীতি ছোট হলেও, স্থানীয় বাণিজ্য ও পর্যটনের ওপর এটি টিকে আছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শহরটি সোশ্যাল মিডিয়ায় জনপ্রিয় হয়ে ওঠায়, আশেপাশের অঞ্চল থেকেও অনেক পর্যটক এখানে আসতে শুরু করেছেন।
এদিকে স্থানীয় প্রশাসন সীমিত জায়গার মধ্যেও নাগরিক সুবিধা উন্নত করার চেষ্টা করছে। শহরের উঁচু দালানগুলোতে এখন স্কুল, হাসপাতাল ও অফিস গড়ে তোলা হচ্ছে। অনেক বাসিন্দা ছোট নৌকা ব্যবহার করেন নদী পারাপারের জন্য, কারণ সেতুর সংখ্যা এখনো খুবই সীমিত।
সংকীর্ণ হলেও, এই শহরের মানুষ নতুন কোথাও গিয়ে বসবাসের কথা খুব একটা ভাবে না। কারণ, এই সরু উপত্যকার মধ্যেই গড়ে উঠেছে তাদের দীর্ঘ প্রজন্মের বসতি ও সামাজিক সম্পর্ক। তাদের জীবনযাত্রা সংকীর্ণ জায়গার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া হলেও এখানে রয়েছে দৃঢ় সম্প্রদায়বোধ ও পারস্পরিক সহযোগিতা।
ইয়ানজিন শহরের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সত্যিই বৈচিত্রপূর্ণ। এখানে বছরের বিভিন্ন সময়ে নানা ধরনের উৎসব অনুষ্ঠিত হয়, যা শুধু স্থানীয়দের জীবনকে প্রাণবন্ত করে তোলে না, বরং শহরটিকে ভ্রমণপ্রেমীদের জন্যও আকর্ষণীয় করে তোলে।
ইয়ানজিনের উৎসব
এরমধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসব হলো লণ্ঠন উৎসব। সাধারণত চীনা নতুন বছরের পরবর্তী ১৫ দিনে এই উৎসব পালিত হয়। ইয়ানজিনে, শহরের সরু রাস্তা ও নদীর ধারে হাজার হাজার রঙিন লণ্ঠন ঝুলানো থাকে। এই লণ্ঠনগুলো শুধুমাত্র আলোকসজ্জা নয়, বরং বিভিন্ন নকশা, প্রাণী বা পৌরাণিক গল্পের প্রতীক হিসেবে তৈরি করা হয়। স্থানীয়রা রাস্তায় দাঁড়িয়ে লণ্ঠন প্রদর্শনী দেখে, খাওয়া-দাওয়া করে এবং সঙ্গীত ও নাচের অনুষ্ঠানে অংশ নেয়। ছোট বাচ্চারা লণ্ঠন হাতে নিয়ে রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়, যা শহরের সরু পথগুলোকে জীবন্ত করে তোলে।
এখানকার আরেকটি জনপ্রিয় উৎসব হলো ড্রাগন বোট উৎসব । সাধারণত এটি প্রতি বছরের ষষ্ঠ চীনা মাসে পালিত হয়। এসময় ইয়ানজিনে, নদীর তীরে ছোট ছোট ড্রাগন আকৃতির নৌকা সাজানো হয়। স্থানীয় যুবকরা দলবদ্ধভাবে নৌকা চালায় এবং দ্রুততার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে। নদীর ধারে দর্শকরা দাঁড়িয়ে তাদের উৎসাহ দেয়, আর ছোট দোকানগুলোতে স্থানীয় খাবার ও চা বিক্রি হয়। এই উৎসবের মাধ্যমে শহরের মানুষ শুধুমাত্র বিনোদন পায় না, বরং স্থানীয় ঐতিহ্য ও সম্প্রদায়বোধও শক্তিশালী হয়।

আজকাল অনেক ভ্রমণপ্রেমী ও আলোকচিত্রশিল্পী ছুটে যান ইয়ানজিনের বিস্ময় দেখার জন্য। কেউ আসে ছবি তুলতে, কেউ আসে শহরটির অদ্ভুত স্থাপত্য ও মানব অভিযোজনের গল্প শুনতে। প্রকৃতির কঠিন সীমাবদ্ধতার মধ্যেও কিভাবে একটি শহর বাঁচে, বেড়ে ওঠে এবং সৌন্দর্যের প্রতীক হয়ে ওঠে—ইয়ানজিন তার জীবন্ত উদাহরণ। পাহাড়, নদী আর মানুষের সংগ্রামের এই সরু শহর তাই পৃথিবীর বুকে এভাবেই অনন্য বিস্ময় হয়ে টিকে থাকুক।
তথ্যসূত্রঃ
https://share.google/OX1PrzNFEQr7Ivryd
https://share.google/lpjbz0Jrs5UEO9Jvt
https://share.google/SOOEayT1AcXZJ4d84

