ভাবতে পারেন পৃথিবীতে এমনও একটি দেশ আছে, যেখানে বছরে একটি-দুইটি নয়, বরং ২ হাজার–এরও বেশি ভূমিকম্প হয়। এমনকি দেশটির মাটি প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪ থেকে ৫ বার কেঁপে ওঠে।
আশ্চর্যের ব্যাপার কি জানেন, দৈনিক এতবার ভূমিকম্প হবার পরও দেশটি কোন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় নি, বরং নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত, নিরাপদ এবং সুশৃঙ্খল একটি দেশ হিসেবে। বলছি পূর্ব এশিয়ার দেশ জাপানের কথা।
কিন্তু কিভাবে এটি সম্ভব হলো?
জাপানে ভূমিকম্পের উতপত্তিস্থল- রিং অফ ফায়ার
পূর্ব এশিয়ার দ্বীপরাজ্য খ্যাত “জাপান” হোক্কাইদো, হোঁন্সু, শিকোকু, এবং কিউশু নামক চারটি বড় দ্বীপ সহ ৬,৮৪৮ টি ছোট ছোট দ্বীপের সমন্বয়ে গঠিত। প্রায় ৩ লক্ষ ৭৮ হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তনের দেশটি প্রশান্ত মহাসাগরের “রিং অফ ফায়ার”-এর উপর অবস্থিত। “রিং অব ফায়ার” এর অর্থ হলো আগুনের গোলা। এটি এমন একটি কাল্পনিক বেল্ট, যা মূলত ঘোরার খুরের মত করে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলগুলোকে ঘিরে রেখেছে। আর প্রায় ৪০ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ এই রিং অব ফায়ার অঞ্চলে রয়েছে ৪৫২ টির মতো সক্রিয় আগ্নেয়গিরি, যা পৃথিবী পৃষ্ঠের মোট আগ্নেয়গিরির প্রায় ৭৫ শতাংশ। এমনকি এই “রিং অব ফায়ারের’’ মধ্যে রয়েছে একাধিক টেকটোনিক প্লেট। এই টেকটোনিক প্লেটগুলো যখন একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষ লিপ্ত হয়, ঠিক তখনই সৃষ্টি হয় প্রলয়ঙ্কারী ভূমিকম্পের।

কেন জাপানে ভূমিকম্প হয়?
পূর্ব এশিয়ার দ্বীপরাজ্য খ্যাত “জাপান” হোক্কাইদো, হোঁন্সু, শিকোকু, এবং কিউশু নামক চারটি বড় দ্বীপ সহ ৬,৮৪৮ টি ছোট ছোট দ্বীপের সমন্বয়ে গঠিত। প্রায় ৩ লক্ষ ৭৮ হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তনের দেশটি প্রশান্ত মহাসাগরের “রিং অফ ফায়ার”-এর উপর অবস্থিত। “রিং অব ফায়ার” এর অর্থ হলো আগুনের গোলা।
এটি এমন একটি কাল্পনিক বেল্ট, যা মূলত ঘোরার খুরের মত করে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলগুলোকে ঘিরে রেখেছে। আর প্রায় ৪০ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ এই রিং অব ফায়ার অঞ্চলে রয়েছে ৪৫২ টির মতো সক্রিয় আগ্নেয়গিরি, যা পৃথিবী পৃষ্ঠের মোট আগ্নেয়গিরির প্রায় ৭৫ শতাংশ। এমনকি এই “রিং অব ফায়ারের’’ মধ্যে রয়েছে একাধিক টেকটোনিক প্লেট। এই টেকটোনিক প্লেটগুলো যখন একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষ লিপ্ত হয়, ঠিক তখনই সৃষ্টি হয় প্রলয়ঙ্কারী ভূমিকম্পের।
পৃথিবীর সবচেয়ে ভূমিকম্পপ্রবণ দেশগুলোর মধ্যে একদম ওপরের সারিতে রয়েছে জাপানের অবস্থান। রিং অব ফায়ারে অবস্থিত হওয়ায় জন্যেই জাপান বিশ্বের সবচেয়ে ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকাগুলোর মধ্যে একটি। দেশটিতে প্রায়শই ভূমিকম্প, সুনামি এবং অগ্ন্যুৎপাতের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলো সংঘটিত হয়ে থাকে।
জাপানের ঐতিহাসিক ভূমিকম্প
তবে ১৯২৩ সালের গ্রেট কান্তো এবং ২০১১ সালের টোহোকু ছিল জাপানের ইতিহাসের ঘটে যাওয়া সবচেয়ে প্রলয়ঙ্কারী ভূমিকম্প। ১৯২৩ সালে ঘটে যাওয়া “গ্রেট কান্তো” ভূমিকম্পটি মুহূর্তের মধ্যেই যেন লন্ডভন্ড করে দিয়েছিল সবকিছু। মাত্র কয়েক মিনিটের এই কম্পনে ফলে প্রায় ১ লক্ষ ৪০ হাজার সাধারণ মানুষ তাদের জীবন হারায়। শুধু তাই নয়, সেসময় টোকিও এবং ইয়োকোহামা শহরের প্রায় ৪০% স্থান ও পরিণত হয়েছিল ধ্বংসস্তূপে।

২০১১ সালের ১১ মার্চ । জাপানে ইতিহাসে ঘটে আরেকটি ভয়াবহ ভূমিকম্প। ৯.০ মাত্রার সেই কম্পন যেন কয়েক মুহূর্তেই পুরো এলাকার চেহারাপুরোপুরি পাল্টে দেয়। কম্পন থামার আগেই শুরু হয় সুনামির তাণ্ডব। ১০–১৫ মিটার উঁচু ভয়ংকর সেই সুনামির ঢেউ মুহূর্তের মধ্যেই প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল প্রায় ২০,০০০ সাধারন মানুষের।
এই প্রলয়ঙ্কারী ভূমিকম্প দুইটি জাপানিজদের মনে চিরস্থায়ী দাগ কেটেছে। তবে এসব প্রতিকূলতাকে মোকাবিলা করে টিকে থাকতে জাপানের মানুষ সবসময়ই দেখিয়েছে অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও সাহস। আর এজন্যই ভূমিকম্পের বিষয়টিকে মাথায় রেখে দেশটিতে নির্মিত হয়েছে নানা স্থাপনা।
জাপানের ভূমিকম্প নিরাপত্তা ব্যবস্থা
পৃথিবীর সবচেয়ে আধুনিক এবং নিরাপদ নকশার ভিত্তি স্থাপন করে জাপানের সরকার। কারণ, তারা বেশ ভালো করেই জানেন যে, ভূমিকম্পকে কখনো থামানো যায় না। তবে কিছু সঠিক পরিকল্পনা এবং প্রস্তুতির মাধ্যমে এর ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কমিয়ে আনা যায়। আর এই বিশ্বাস থেকেই তারা তৈরি করেছে পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত ভূমিকম্প প্রতিরোধক স্ট্রাকচার ব্যবস্থা।
টোকিও স্কাইট্রি, রপ্পঙ্গি হিলসের মরি টাওয়ার, সেন্ডাই মিডিয়াথেক, এমনকি আসাকুসা কালচার ট্যুরিস্ট সেন্টারের মতো বিখ্যাত ভূমিকম্প-সহনশীল স্থাপনাগুলো নির্মাণ করে জাপান যেন সারাবিশ্বকে তাকে লাগিয়ে দিয়েছে। বেজ আইসোলেশন, সিসমিক ড্যাম্পার, স্টিল ব্রেসিং এবং নমনীয় কাঠামোর মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করে নির্মিত এসব ভূমিকম্প সহনশীল আর্কিটেকচার বর্তমানে বিশ্বজুড়ে বেশ সু-পরিচিত।

এমনকি ভূমিকম্প প্রতিরোধ করতে জাপান সরকার প্রণয়ন করেন কঠোর ভূমিকম্প বান্ধব নীতি ও বিল্ডিং কোড । জাপানের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও বেশি শক্তিশালী করে তাদের এই বিল্ডিং কোড। দেশটিতে কেউ কোনো নতুন ভবন বানাতে চাইলে, তাকে অবশ্যই শুরু থেকেই কঠিন কম্পন-পরীক্ষা, নকশার নমনীয়তা যাচাই সহ লোড-বেয়ারিং মতো নিরাপত্তা ব্যবস্থাগুলো মানতে হয়। ভবন নির্মাণের অনুমতি পাওয়ার জন্য এখানকার সকলকেই বাধ্যতামূলক ভাবে এসব নিয়ম মেনে চলতে হয়। আর ঠিক এই কারণেই জাপানের প্রতিটি ভবনই যেন একেকটি নিরাপত্তার শক্ত ঢাল। তাদের এই ভূমিকম্প-বান্ধব নীতি ও বিল্ডিং কোডই যেন দেশটিকে নিরাপদ রাখার সবচেয়ে বড় শক্তি।
এছাড়াও দেশটির প্রতিটি বিল্ডিং এমনভাবে নির্মিত যে ভূমিকম্প এলেও এসব বিল্ডিং ভেঙে না পড়ে কম্পনের সাথে নমনীয়ভাবে দুলতে থাকে এবং প্রয়োজনীয় শক্তি শোষণ করে। শুধু তাই নয় প্রতিটি বিল্ডিং এর নিচে বসানো হয় বেস আইসোলেশন প্যাড, যা কম্পনকে মাটিতেই আটকে রাখে। এমনকি উঁচু বিল্ডিংগুলোতে থাকে শক অ্যাবজরবার ড্যাম্পার, যা ভূমিকম্পনের সময় বিল্ডিং কে স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করে। এছাড়া পুরোনো ভবনগুলো ও নিয়মিত রেট্রোফিটিং করা হয়, যা ভূমিকম্পের সময় প্রাণহানির ঝুঁকি নাটকীয়ভাবে কমাতে বেশ সহায়তা করে। এই নমনীয় স্থাপত্য ডিজাইনই যেন জাপানের প্রতিটি নগর কে করে তুলেছে আরও বেশি নিরাপদ।

তবে জাপানের আরেকটি বড় শক্তি হলো তাদের দ্রুত ভূমিকম্প সতর্কীকরণ ব্যবস্থা EEW। এই ব্যবস্থাই ভূমিকম্পের প্রথম তরঙ্গ ধরা পরতেই, কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ভূমিকম্পের সতর্কবার্তা পৌঁছে যায় সকলের মোবাইল ফোন, টিভি, রেডিও, স্কুল–কলেজ, অফিস এমনকি চলন্ত ট্রেন ও। আর এই সতর্কতা পাওয়া মাত্রই “শিনকানসেন” সহ উচ্চগতির সকল ট্রেন অটোমেটিক ব্রেক করে থেমে যায়, এমনকি লিফটও থেমে যায় তার নিকটতম ফ্লোরে, যাতে যাত্রীরা নিরাপদে নামতে পারেন। শুধু তাই নয় এ্যালার্ম বাজা মাত্রই দেশটির সকল গ্যাস লাইন অটোমেটিক বন্ধ হয়ে যায়, এতে করে আগুন লাগার ঝুঁকি অনেকাংশে কমে যায়। সব মিলিয়ে, মাত্র কয়েক সেকেন্ডের এই এ্যালার্ম ব্যবস্থা যেন লাখো মানুষের জীবনকে নিরাপদ রাখে।
ভূমিকম্প সম্পর্কে জনসচেতনতা
শুধু প্রযুক্তিই নয় জাপানের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের সাধারণ মানুষ। ছোটবেলা থেকেই এখানকার সবাইকে শিখানো হয় কিভাবে ভূমিকম্পের সময় নিজেকে রক্ষা করতে হবে এবং কখন, কোথায়, এবং কিভাবে আশ্রয় নিতে হবে এসব কিছু। আর জন্যই প্রতি বছর ১ সেপ্টেম্বর দেশটিতে অনুষ্ঠিত হয় “দুর্যোগ প্রস্তুতি দিবস”। যেখানে সবাই একসঙ্গে দুর্যোগের প্রস্তুতির সম্পর্কিত এসব মহড়ায় অংশ নেয়।
এসব প্রস্তুতির পাশাপাশি জাপান গবেষণাকে ও দিয়েছে সর্বোচ্চ গুরুত্ব। গভীর সমুদ্রের সেন্সর নেটওয়ার্ক, স্যাটেলাইট ট্র্যাকিং, কৃত্রিম ভূমিকম্প সিমুলেশন, উচ্চমানের সিসমিক মনিটরিং, সবই যুক্ত হয়েছে তাদের ভূমিকম্পের পূর্ব প্রস্তুতিতে। এমনকি দুর্যোগ পরবর্তী উদ্ধার অভিযানে ও তারা যেন অদ্বিতীয়। হাই-স্পিড রেসকিউ টিম, ড্রোন সার্ভেইল্যান্স সহ রোবট উদ্ধারকারী; সবকিছুই কম্পনের ক্ষয়ক্ষতি এবং প্রাণহানি দ্রুত কমিয়ে আনতে বেশ কার্যকরী।
সবদিক বিবেচনা করলে দেখা যায়, জাপানের ভূমিকম্প প্রতিরোধ ব্যবস্থা একক কোনো কৌশলের উপর নির্ভরশীল নয়। বরং প্রযুক্তি, গবেষণা, কঠোর আইন এবং শক্তিশালী অবকাঠামো—যেন দেশটির প্রতিরোধ ব্যবস্থা কে করেছে আর ও বেশি শক্তিশালী।
তথ্যসূত্র:
- Japan Meteorological Agency, ২০২৩
- National Research Institute for Earth Science and Disaster Resilience (NIED)
- “Disaster Prevention in Japan,” Cabinet Office, Government of Japan, ২০২২
- https://samakal.com/international/article/216936/%E0%A6%AF%E0%A7%87%E0%A6%AD%E0%A6%BE%E0%A6%AC%E0%
- https://www.kalerkantho.com/online/science/2024/01/04/1351906

