Image default
নগর পরিচিতি

গাজা- ফিলিস্তিনের প্রাচীন শহর

বর্তমানে বিশ্ব রাজনীতিতে সবথেকে আলোচ্য বিষয় হলো ফিলিস্তিন-ইসরায়েল। পত্রিকার পাতা কিংবা খবরের কাগজ খুললেই গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলী হামলার খবর যেন প্রতিদিনের বিষয়। এমনকি অনেক বিশ্লেষকই ইসরায়েল-ফিলিস্তিনকে কেন্দ্র করে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কা করছেন। আর এই ফিলিস্তিন ও ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহর হলো গাজা। প্রাচীনকাল থেকেই শহরটি বাণিজ্যিক, রাজনৈতিক ও সংস্কৃতির কেন্দ্র হিসেবে বিশেষ গুরুত্ব পেয়ে আসছে। এই শহরের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এর দীর্ঘ ইতিহাস। গাজা এমন একটি স্থান যেখানে প্রাচীন সভ্যতার ধ্বংসাবশেষের পাশাপাশির বর্তমান সংঘাতের চিহ্ন স্পষ্ট। এই শহরের সংস্কৃতিতে আরব, প্রাচীন মিশরীয় ও বাইজান্টাইন সংস্কৃতির মিশ্রণ রয়েছে। বর্তমানে গাজা রাজনৈতিক সংকট এবং মানবিক সংকটের মূর্ত প্রতীক হয়ে উঠেছে। 

দেশ ফিলিস্তিন
অঞ্চল/রাজ্য গাজা
আয়তন ৪৫ বর্গকিলমিটার
জনসংখ্যা  ৫,১৫,৫৫৬
সরকারি ভাষা আরবি
প্রধান মদ্রুা মিশরীয় পাউন্ড (দে ফ্যাক্তো) ইসরায়েলি শেকেল (ILS)
সময় অঞ্চল UTC +2
আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ইয়াসির আরাফাত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর

ভৌগোলিক অবস্থান ও জলবায়ু  

ফিলিস্তিনের দক্ষিণ-পশ্চিমে ভূমধ্যসাগরের উপকূলে অবস্থিত গাজা। শহরটির পশ্চিমে রয়েছে সমুদ্র, আর পূর্বে ইসরায়েল। এখানকার জলবায়ু উষ্ণ এবং শুষ্ক। শীতকালে গজায় হালকা বৃষ্টি হয়, আর গ্রীষ্মকালের আবহাওয়া থাকে শুষ্ক ও গরম। মার্চ বা এপ্রিলের দিকে আসে বসন্ত। গাজার সবচেয়ে উষ্ণতম মাস হলো আগস্ট। এই সময় এখানকার তাপমাত্রা প্রায় ৩১.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত ওঠে। অন্যদিকে, সবচেয়ে ঠান্ডা মাস হলো জানুয়ারি, যখন তাপমাত্রা সাধারণত ১৮.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে আসে। এখানে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ খুবই কম; প্রতি বছর গাজায় প্রায় ৩৯৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়।

ম্যাপ

আয়তন ও জনসংখ্যা

ফিলিস্তিনের বৃহত্তম শহর গাজার আয়তন ৪৫ বর্গকিমি এবং জনসংখ্যা ৫,১৫,৫৫৬ জন। ধারণা করা হয়। এই জনসংখ্যার বেশিরভাগই সুন্নি মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ। ফাতেমী আমলে শিয়া ইসলাম গাজায় প্রাধান্য পেয়েছিল, তবে ১১৮৭ সালে সলাহুদ্দিন আয়ুবী শহর জয় করার পরে কঠোরভাবে সুন্নি ধর্মীয় ও শিক্ষানীতি প্রচার করা হয়। গাজায় প্রায় সাড়ে ৩ হাজার লোকের একটি ছোট ফিলিস্তিনী খৃষ্টান ধর্মাবলম্বী সম্প্রদায়ও বসবাস করে। 

গাজার ইহুদি সম্প্রদায়ের বয়স প্রায় ৩,০০০ বছর। ১৯৪৫ সালে গাজায় ৮০ জন ইহুদি ছিল। তাদের মধ্যে বেশিরভাগই ১৯৪৮ সালের যুদ্ধের পরে তাদের এবং আরব সংখ্যাগরিষ্ঠদের মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাসের কারণে এই শহর ত্যাগ করে চলে যায়। আজ, গাজায় কোনও ইহুদি নেই।

গাজার জনসংখ্যা

ইতিহাস 

গাজা একটি অতি প্রাচীন শহর। এখানকার জনবসতি স্থাপনের ইতিহাস প্রায় ৫০০০ বছরের পুরানো। খ্রিস্টপূর্ব কমপক্ষে পঞ্চদশ শতাব্দী পূর্বে এখানে প্রথম জনবসতি স্থাপিত হয়েছিল। গাজার পুরো ইতিহাস জুড়ে বিভিন্ন শাসক এবং সাম্রাজ্যের আধিপত্য রয়েছে। প্রাচীন মিশরীয়রা প্রায় ৩৫০ বছর ধরে গাজা শাসন করার পরে ফিলিস্তিনীরা শহরটিকে তাদের পেন্টাপোলিসের একটি অংশ করেছিল। সাধারণত ভৌগলিকভাবে একসাথে থাকা পাঁচটি শহরকে একত্রে পেন্টাপলিস বলা হয়। রাজনৈতিক, বাণিজ্যিক এবং সামরিক কারণে প্রাচীন বিশ্বে এই জাতীয় শহর তৈরি করা হতো। 

প্রাথমিকভাবে গাজা শহর বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছিল। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এটি মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা এবং ইউরোপের মধ্যে বাণিজ্যিক পথের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়। প্রাচীন মিশরীয়রা প্রথম এখানে বন্দর স্থাপন করেছিল। গাজা তখন থেকেই আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বাণিজ্যিক প্রবেশপথ হিসেবে ব্যবহৃত হত। পরবর্তীতে, এই শহর রোমান সাম্রাজ্যের অধীনে আসে। এই সময় গাজার বিস্তর উন্নতি ঘটে। এইসময় এটি সমৃদ্ধশালী শহরে পরিণত হয়। বাইজেন্টাইন এবং উসমানীয় শাসনামলেও গাজা অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি শহর ছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে উসমানীয় সাম্রাজ্যের পতনের  পর গাজা ব্রিটিশদের নিয়ন্ত্রনে আসে।

গাজার আধুনিক ইতিহাস মূলত ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের সঙ্গে বিশেষ ভাবে জড়িত। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সময় ফিলিস্তিনীদের একটি বিশাল অংশ গাজায় আশ্রয় নেয়। সেই থেকে গাজা ফিলিস্তিনি প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে ওঠে। বিশেষ করে ১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধে ইসরায়েল গাজা দখল করে। এই যুদ্ধ ফিলিস্তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে। গাজার ইতিহাস অত্যন্ত জটিল। গাজার ইতিহাসের প্রতিটি স্তর এখানকার জনগণের ধৈর্য, প্রতিরোধ, অস্তিত্ব ও সংগ্রামের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

অর্থনীতি ও শিল্প  

বহুকাল ধরেই অবরোধ, সংঘাত এবং রাজনীতি গাজার অর্থনীতিকে অস্থির, সীমাবদ্ধ ও ক্ষতিগ্রস্ত করে রেখেছে। এখানকার অর্থনৈতিক কাঠামো মূলত স্থানীয় পর্যায়ের ছোটখাট শিল্প, কৃষি, এবং মাছ ধরার ওপর নির্ভরশীল। এই অঞ্চলের প্রধান কৃষি পণ্য হল স্ট্রবেরি, সাইট্রাস, খেজুর, জলপাই, ফুল এবং শাকসবজি। তবে দূষণ ও পানির অভাবে উৎপাদন কমে গেছে। গাজায় কিছু ক্ষুদ্র শিল্প কারখানাও গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে রয়েছে প্লাস্টিক, টেক্সটাইল, আসবাবপত্র এবং খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ। কিন্তু, অর্থনৈতিক অবরোধের কারণে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে গাজায় বেকারত্বের হার প্রায় ৫০% ছুঁয়েছে। যা বিশ্বের সর্বোচ্চ বেকারত্বের হারগুলোর মধ্যে একটি।। গাজায় শুধুমাত্র খাদ্যদ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধির কারণে, পরিবারগুলো তাদের আয়ের ৬২% ব্যয় করতে বাধ্য হচ্ছে। এছাড়াও, এই অঞ্চলে গ্যাস ও তেলের মজুদ রয়েছে।

পর্যটন আকর্ষণ  

অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সমস্যার মধ্যেও গাজা  ভ্রমণ সত্যিই মনোমুগ্ধকর হতে পারে। কারণ এখানে  এমন কিছু জায়গা আছে যা প্রকৃতি, সংস্কৃতি, আর ইতিহাসকে একসাথে বেধে রেখেছে। সমুদ্রের নীল পানির ওপর সূর্যাস্ত দেখলে মনে হবে যেন সূর্যাস্ত ছবির ফ্রেমে আটকে গেছে। এছাড়াও মালেকা হাউস স্থানীয় কারুশিল্পের জন্য বিখ্যাত। এখানকার মাটির পাত্র, গয়না, আর বিভিন্ন হস্তশিল্পে গাজার স্থানীয় সংস্কৃতি ফুটে উঠে। শিশুদের নিয়ে ঘুরতে চাইলে আল-আমাল পার্ক এক দারুণ জায়গা। এখানে সবুজ গাছপালা, ফোয়ারা আর ছোটখাটো রাইড আছে। গাজার রাস্তার বিখ্যাত দেয়াল চিত্রগুলো অন্যতম পর্যটন আকর্ষণ । এই ছবিগুলো গাজার সংগ্রামের গল্প আর শান্তির আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করে। 

সমুদ্র পাশে অবস্থিত আল-বাহার রিসোর্টটি শান্ত ও আরামদায়ক সময় কাটানোর জন্য উপযুক্ত। সমুদ্রের স্নিগ্ধ বাতাস এবং পরিবেশ উপভোগ করার এক চমৎকার সুযোগ এখানে মিলবে।রোমাঞ্চপ্রিয় হলে জিপ সাফারি ট্যুরও করা যায়। যেখানে গাজার গ্রামীণ এলাকা আর বালিয়াড়ির সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। আধ্যাত্মিক শান্তি খুঁজতে চাইলে ‘বাতান আল-হাওয়া’ মাজার ঘুরে আসা যেতে পারে। এখানে ইতিহাস আর আধ্যাত্মিকতার এক অসাধারণ মেলবন্ধন রয়েছে। প্যালেস্তাইন মিউজিয়াম, ফিলিস্তিনি সভ্যতা, সংস্কৃতি, এবং সংগ্রামের নানা নিদর্শন প্রদর্শন করে। এখানে ব্রিটিশ ম্যান্ডেট, ১৯৪৮ সালের নাকবা (উদ্বাস্তু সঙ্কট) এর ছবি রয়েছে। এছাড়াও  সাম্প্রতিক সময়ের রাজনৈতিক আন্দোলন এবং সংগ্রামের চিত্রগুলি এখানে সংরক্ষিত আছে।

সংস্কৃতি ও জীবনধারা  

গাজার সংস্কৃতি অত্যন্ত সমৃদ্ধ এবং বহু পুরনো ঐতিহ্যে ঘেরা। গাজার মানুষদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো তাদের অতিথি পরায়ণতা। এখানকার মানুষের জীবনযাত্রায় পরিবার, ধর্ম, এবং সম্প্রদায়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় ফিলিস্তিনি জনগণ তাদের ধর্মীয় এবং সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের প্রতি গভীরভাবে শ্রদ্ধাশীল। এই বিষয় গুলো তাদের প্রতিদিনের জীবন এবং উৎসবগুলোতে ফুটে ওঠে। বর্তমানে  ইসলামিক সংস্কৃতি গাজার দৈনন্দিন জীবনযাত্রার কেন্দ্রে অবস্থান করে। ধর্মীয় অনুষ্ঠান, যেমন রমজান ও ঈদের সময় পুরো শহরটি উৎসবের আমেজে মুখরিত হয়ে ওঠে।

গাজার খাদ্যাভ্যাসও তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের একটি বড় অংশ। এখানকার জনপ্রিয় খাবারগুলোর মধ্যে ‘ফালাফেল’, ‘হুমুস’, ‘কুনাফা’, এবং ‘মাকলুবা’ উল্লেখযোগ্য। এসব খাবার আন্তর্জাতিক পর্যায়েও ব্যাপক জনপ্রিয়। রমজান মাসে বিশেষ ইফতারি এবং সেহরির জন্য অনেক ধরনের ঐতিহ্যবাহী খাবার তৈরি করা হয়। যা গাজার সাংস্কৃতিক ধাঁচকে আরো সমৃদ্ধ করে। গাজার বিয়ের অনুষ্ঠানগুলো খুবই জমকালো হয়ে থাকে। এসব অনুষ্ঠানে বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী ফিলিস্তিনি বাদ্যযন্ত্র বাজানো হয়। এদের মধ্যে জনপ্রয় হলো দফ। এটি ঢোলের মতো একটি বাদ্যযন্ত্র। আরেকটি জনপ্রিয় এবং সুরেলা বাদ্যযন্ত্র হলো  ওউদ, যা এক ধরনের তার জাতীয় বাদ্যযন্ত্র। গাজার সাংস্কৃতিক উৎসব ও পারিবারিক অনুষ্ঠানে এসব বাদ্যযন্ত্রের সুরে ঐতিহ্যবাহী ফিলিস্তিনি গান পরিবেশিত হয়।

গাজায় ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসবগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং মানুষের জীবনে বিশেষ স্থান দখল করে আছে। ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আজহা হলো সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব, যেখানে পরিবার ও বন্ধুরা একত্রিত হয়ে উপহার বিনিময় করে।  এছাড়াও, ১৫ নভেম্বর ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা দিবস, গাজায় গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। এই দিনে স্বাধীনতার জন্য শহীদদের স্মরণ করা হয় এবং কুচকাওয়াজসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। 

যোগাযোগ ব্যবস্থা 

গাজাবাসীরা শহরের ভেতরে যাতায়াতের জন্য সাধারণত বাস এবং ট্যাক্সি ব্যবহার করে। তবে, গাজার রাস্তাগুলো সরু এবং পুরনো হওয়ায় যানজট শহরের একটি সাধারণ সমস্যা। অনেকই যাতায়াতের জন্য মোটরসাইকেল, বাইসাইকেল, এবং পায়ে হেঁটে চলাফেরা করে। জ্বালানি সংকট ও অবকাঠামোগত সমস্যার কারণে এখানকার যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রায়ই বাধাগ্রস্ত হয়। বাইরের বিশ্বের সাথেও গাজার যোগাযোগ খানিকটা জটিল। এক্ষেত্রে প্রধানত মিসর ও ইসরায়েলের সীমান্ত পয়েন্টগুলোর মাধ্যমে গাজার সাথে বহিঃবিশ্বের যোগাযোগ হয়ে থাকে। মিসরের সঙ্গে গাজার প্রধান প্রবেশদ্বার হলো রাফাহ ক্রসিং। তবে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে এটি বন্ধ থাকে। এরেজ ক্রসিং হলো ইসরায়েলের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের একমাত্র পথ । তবে, এটিও কঠোর ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। গাজার ইয়াসির আরাফাত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ২০০১ সালে ধ্বংসপ্রাপ্ত হওয়ার পর থেকে বন্ধ রয়েছে। আন্তর্জাতিক বিমানে ভ্রমণ করতে হলে সীমান্ত পার হয়ে যেতে হয়। সমুদ্রবন্দরও কার্যত বন্ধ রয়েছে, এতে গাজার বাণিজ্য ও সামুদ্রিক যোগাযোগকে ব্যাহত হচ্ছে।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা 

গাজায় বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, যেমন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় অব গাজা এবং আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়। এখানে, হাজার হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোর অবকাঠামো সংকট, শিক্ষক স্বল্পতা, এবং শিক্ষার উপকরণের অভাবে শিক্ষার মান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এছাড়াও, সংঘাতের সময় শিক্ষার্থীদের নিয়মিতভাবে পড়াশোনায় বিঘ্ন ঘটে। 

স্বাস্থ্যসেবা ক্ষেত্রেও গাজার পরিস্থিতি সংকটপূর্ণ। হাসপাতাল এবং ক্লিনিকের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। পর্যাপ্ত চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ওষুধের অভাবে রোগীদের সঠিক চিকিৎসা সবসময় সম্ভব হয় না। দীর্ঘদিনের অবরোধের কারণে প্রয়জনীয় চিকিৎসা সামগ্রী অভাব দেখা যায় প্রতিনিয়ত। ২০১৮ সালের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, গাজার ৫৩% মানুষ মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছে। এটি সংঘাত ও অবরোধের প্রত্যক্ষ প্রভাব।

বিনোদন ও ক্রিয়াকলাপ

গাজায় বিনোদনের সুযোগ সীমিত হলেও স্থানীয় মানুষ নানা উপায়ে তাদের জীবন উপভোগ করার চেষ্টা করে। পার্ক, খেলার মাঠ, এবং স্থানীয় কফিশপগুলো নগরবাসীর বিনোদনের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। বিশেষ করে কফিশপগুলো শুধু কফি পান করার জায়গা নয়, বরং সামাজিক মেলামেশার স্থান হিসেবে জনপ্রিয়। এখানকার মানুষ টিভিতে ফুটবল খেলা দেখে আনন্দ উপভোগ করে। শিশুদের জন্য কিছু খেলার মাঠ এবং বিনোদন কেন্দ্র রয়েছে, যেখানে তারা খেলাধুলা এবং বিভিন্ন ক্রিয়াকলাপে অংশ নিতে পারে। সংকট এবং অবরোধের মধ্যেও গাজার মানুষ তাদের জীবনকে আনন্দময় করার উপায় খুঁজে বের করেছে, যেমন ছাদ বাগান তৈরি করে সেখানে সময় কাটানো এবং স্থানীয়ভাবে ফুটবল প্রতিযোগিতার আয়োজন।

গাজা শহরটি ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং সংকটের একটি অদ্ভুত মিশ্রণ। প্রাচীনকাল থেকেই এটি বাণিজ্য, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। এখানে সমৃদ্ধ ইতিহাসের পাশাপাশি বর্তমান মানবিক সংকটের চিহ্ন ফুটে উঠেছে। এখানে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনেক সমস্যা রয়েছে। তবুও গাজার মানুষ নিজেদের সংস্কৃতি এবং জীবনযাত্রা ধরে রাখার চেষ্টা করে। গাজার প্রতিটি কোণে ইতিহাসের সাক্ষ্য রয়েছে, যা এই শহরকে অন্যান্য শহর থেকে আলাদা করে তোলে।

আরও কিছু মজার তথ্য 

  • শরণার্থীঃ গাজার জনসংখ্যার একটি বড় অংশ শরণার্থী, যারা ১৯৪৮ সালের যুদ্ধের সময় এ অঞ্চলে আশ্রয় নেয়।
  • সবচেয়ে কনিষ্ঠ জনসংখ্যাঃ গাজার জনসংখ্যার প্রায় ৫০% মানুষ ১৫ বছরের কম বয়সী। যা এটিকে বিশ্বের সবচেয়ে কনিষ্ঠ জনসংখ্যার একটি এলাকা হিসেবে পরিচিত করেছে।
  • ধর্মঃ গাজা শহরটি খ্রিস্টান এবং ইসলামিক উভয় ধর্মের জন্যই ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে।
  • নবী মুহাম্মদের দাদাঃ বিশ্বাস করা হয় যে ‘সৈয়দ হাসান আল-নাসের’ মসজিদে নবী মুহাম্মদের দাদা নবী হাশেমকে সমাধিস্থ করা হয়েছিল। 
  • গাজা কাসল দুর্গঃ গাজা কাসল দুর্গটি গাজার প্রতিরক্ষা এবং কৌশলগত অবস্থানের জন্য নির্মিত হয়েছিল। বর্তমানে এটি একটি পর্যটন আকর্ষণ হিসেবে পরিচিত।
  • শহীদ কবরস্থানঃ গাজার শহীদ কবরস্থান এখানে ইসরায়েল-প্যালেস্টাইন সংঘর্ষে নিহত মুক্তিযোদ্ধাদের সমাধি রয়েছে।
  • শরণার্থী শিবিরঃ জাবালিয়া শরণার্থী শিবির বৃহত্তম শরণার্থী শিবির, যেখানে বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের জীবনধারার প্রকৃত চিত্র পাওয়া যায়।

Related posts

আচমকা খুঁজে পাওয়া শহর কেপ টাউন

ওয়াশিংটন ডিসি – আমেরিকার ঐতিহাসিক শহর

ফুটবলের রাজধানী মাদ্রিদ

Leave a Comment

Table of Contents

    This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More