Image default
নগর পরিচিতি

হংকং – এক দেশ দুই নীতির শহর

‘এক সময়ের মৎস্য পল্লী এখন মেগা মেট্রোপলিস ‘

হংকং, পূর্ব এশিয়ার একটি অনন্য ভূখণ্ড। এই শহর বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি, সমৃদ্ধ ইতিহাস এবং বিশ্বব্যাপী প্রভাবশালী অর্থনীতির জন্য পরিচিত। হংকং চীনের একটি বিশেষ প্রশাসনিক অঞ্চল। হংকং ‘এক দেশ, দুই নীতি’র আওতায় চীনের মূল ভূখণ্ড থেকে ভিন্ন এক শাসন ব্যবস্থায় পরিচালিত হয়। এই প্রবন্ধে হংকংয়ের ইতিহাস, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, এবং এর অনন্য বৈশিষ্ট্যগুলো তুলে ধরার চেষ্টা করা হবে, যা শহরটির বিশেষত্ব এবং গুরুত্বকে জানতে সহায়তা করবে।

দেশ হংকং
রাজধানী নেই
আয়তন ২৭৫৫ কি.মি
জনসংখ্যা ৭.৫ মিলিয়ন প্রায়
সরকারি ভাষা চীনা, ইংরেজি
প্রধান মুদ্রা হংকং ডলার
সময় অঞ্চল ইউটিসি+৮ (এইচকেটি)
আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হংকং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর

হংকংয়ের ভৌগলিক অবস্থান ও আবহাওয়া

হংকং: এক ভৌগলিক বিস্ময়ের দেশ

হংকং, এই শহরের নাম শুনলেই চোখে ভেসে ওঠে আকাশচুম্বী বিল্ডিং, ব্যস্ত রাস্তা এবং আলোকিত বাণিজ্যিক কেন্দ্র। তবে, হংকং শুধু তার আধুনিকতা আর প্রযুক্তির জন্যই পরিচিত নয়, এর ভৌগলিক অবস্থানও এটি একটি বিশেষ স্থান বানিয়েছে।

হংকং চীনের দক্ষিণ উপকূলে অবস্থিত এবং দক্ষিণ চীন সাগরের তীরে এক ঐতিহাসিক বন্দর নগরী হিসেবে গড়ে উঠেছে। শহরটির ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত কৌশলগত। এটি চীনের গুয়াংডং প্রদেশের উপকূলের কাছে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক রুটের খুব কাছাকাছি।  

হংকংয়ের উপকূলীয় এলাকা প্রাকৃতিকভাবে অনেক সুন্দর এবং বাণিজ্যিক দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর বন্দরের সুবিধা বিশ্বব্যাপী সি-ট্রেডের জন্য অপরিহার্য।

হংকংয়ের প্রতিটি ঋতুই যেনো একেকটি কবিতা

চার ঋতুর দেশ হংকং। হংকংয়ের এর প্রতিটি ঋতু নিজস্ব রূপ, রঙ, ও আবহ নিয়ে আসে, যা শহরের জীবনে যোগ করে ভিন্নমাত্রা। তবে মজার ব্যাপার হলো হংকংয়ের ঋতু পরিবর্তন এবং বাংলাদেশের ঋতু পরিবর্তনে প্রকৃতির যে পরিবর্তন তা অনেকটা একই রকম। আরো মজার ব্যাপার বাংলাদেশি কোনো পর্যটক খুব সহজেই নিজের দেশের কোনো একটা ঋতুকে ভিন্নভাবে উপভোগ করতে পারবে হংকং ভ্রমণে গিয়ে

ম্যাপ 

হংকংয়ের আয়তন ও জনসংখ্যা 

আয়তনে ছোট্ট শহর হংকং। আয়তন ২৭৫৫ কিলোমিটার। হংকংয়ের জনসংখ্যা প্রায় ৭.৫ মিলিয়ন, এবং এটি বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা হিসেবে পরিচিত। তবে, এই বিশাল জনসংখ্যার মধ্যে রয়েছে এক অদ্ভুত বৈচিত্র্য। অধিকাংশ বাসিন্দা চীনা বংশোদ্ভূত হলেও, এখানে বিভিন্ন জাতি, ধর্ম এবং ভাষার মানুষের উপস্থিতি একে এক বৈশ্বিক শহর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

তবে একই সঙ্গে বিস্ময় এবং মজার ব্যাপার হলো প্রাকৃতিকভাবে এর জনসংখ্যার ঘনত্ব অনেক বেশি হলেও এই সংকটকে হংকং তার উন্নত পরিবহন ব্যবস্থা, সুউচ্চ ভবন এবং আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে সহজে মোকাবিলা করেছে। 

হংকংয়ের জনসংখ্যা

হংকংয়ের ইতিহাস: আফিমযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংকট 

আফিম যুদ্ধ

উনিশ শতকে ব্রিটেনে চায়ের চাহিদা বেড়ে গেলে ব্রিটিশ সরকার চীন থেকে চা আমদানি করতে চায়। কিন্তু চীন ব্রিটিশ পণ্য কেনায় আগ্রহী না হওয়ায়, চা কেনার কৌশল হিসেবে ব্রিটেন চীনের কাছে আফিম রপ্তানি শুরু করে। চীনা সরকার আফিম আমদানির বিরোধিতা করলে, ১৮৩৯ সালে আফিম ধ্বংসের পর ব্রিটেন চীনের বিরুদ্ধে প্রথম আফিম যুদ্ধ ঘোষণা করে। যুদ্ধ শেষে ১৮৪২ সালে নানকিং চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যার ফলে ব্রিটেন হংকং দখল করে।

ব্রিটেনের কাছে ইজারা

এরপর, ১৮৯৮ সালে ব্রিটেন চীনের কাছে হংকং ও সংলগ্ন অঞ্চল ৯৯ বছরের জন্য ইজারা নেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর হংকং আবার ব্রিটেনের অধীনে চলে আসে, কিন্তু ১৯৪৯ সালে কম্যুনিস্ট চীন প্রতিষ্ঠিত হলে হংকং নিয়ে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি হয়। ১৯৮৪ সালে ব্রিটেন এবং চীন ‘এক দেশ, দুই ব্যবস্থা’ নীতি মেনে হংকং চীনের কাছে হস্তান্তরের চুক্তি স্বাক্ষর করে, যেখানে হংকং ৫০ বছর স্বায়ত্তশাসন পাবে।

১৯৯৭ সালে হংকং চীনকে হস্তান্তর করা হয়, কিন্তু চীন হংকংয়ের রাজনৈতিক স্বাধীনতা সীমিত করতে চেষ্টা করে, যা মাঝে মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে।

চীন-হংকং সম্পর্ক : এক দেশ দুই নীতি

চীন একটি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র যেখানে সব ব্যাপারেই কঠোর বিধি-নিষেধ আরোপ করা আছে। চীন হংকং শহরকে ‘এক দেশ দুই নীতি’ এই আলোকে শাসন করে। অর্থাৎ, হংকং সমাজতান্ত্রিক চীন থেকে উচ্চ পর্যায়ের স্বাধীন অর্থনৈতিক এবং সামাজিক স্বাধীনতা ও স্বাতন্ত্র্য ভোগ করবে। এই নীতি ১৯৯৭ সাল থেকে পরবর্তী ৫০ বছরের জন্য প্রযোজ্য হবে। 

হংকংয়ের আলাদা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং বিচার ব্যবস্থা থাকলেও সামরিক প্রতিরক্ষা ও কুটনৈতিক বা পররাষ্ট্র ব্যবস্থা নেই, এদিকটা চীনই সামলায়। ১৯৯৭ সালে ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীকে প্রত্যাহার করে পিপলস লিবারেশন আর্মি অব চায়নার হাতে হংকংকে তুলে দেয়া হলে চীন সেখানে তাদের নিজস্ব সামরিক ঘাঁটি তৈরী করে।

হংকংয়ের অর্থনীতি

হংকং বিশ্বের অন্যতম মুক্ত অর্থনীতির দেশ হিসেবে পরিচিত। হংকংয়ের ব্যাংকিং, বীমা, এবং পুঁজিবাজারের মতো খাতগুলো আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে শক্তিশালী ভূমিকা পালন করে। হংকংয়ের অর্থনৈতিক অবকাঠামো উদার বাণিজ্য নীতি, কম করের হার, এবং বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে দৃঢ় সংযোগের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। ‘এক দেশ, দুই নীতি’ অধীনে এটি চীনের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক বজায় রেখে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিনিয়োগে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। 

হংকং বন্দর তার কৌশলগত অবস্থানের জন্য আন্তর্জাতিক শিপিং এবং লজিস্টিকস সেবার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। পাশাপাশি, পর্যটনও অর্থনীতির একটি অন্যতম প্রধান খাত। এখানে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ পর্যটক আসে এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, আধুনিক অবকাঠামো, এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য উপভোগ করতে। 

হংকংয়ের পর্যটন স্থান

হংকং, এশিয়ার অন্যতম আধুনিক এবং ঐতিহ্যবাহী শহর হিসেবে অসংখ্য পর্যটন আকর্ষণ নিয়ে হাজির। ভিক্টোরিয়া পিকের চূড়া থেকে হংকংয়ের স্কাইলাইন উপভোগ করা হোক বা ডিজনি ল্যান্ডের আনন্দময় অভিজ্ঞতা প্রত্যেকটি জায়গা ভ্রমণকারীদের জন্য বিশেষ হয়ে ওঠে।

হংকং মহাসাগর পার্ক

হংকং মহাসাগর পার্ক দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম ওসেনেরিয়াম। সহজ ভাষায় বললে, সামুদ্রিক প্রাণীর একটি বিশাল অ্যাকুরিয়াম ও দারুণ একটি থিম পার্ক। এখানে পর্যটকরা যেমন অনেক কাছ থেকে সমুদ্রের ছোট-বড় প্রাণী দেখতে পারেন, তেমন একটু সাহসী হলে ডাইভিংও করতে পারেন। হংকংয়ে যারা বেড়াতে আসেন, তাদের অন্যতম প্রিয় জায়গা এটি। ২০০৬ সালে ফোর্বস ম্যাগাজিন একে ‘বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় দশটি থিম পার্কের অন্যতম’ হিসেবে নির্বাচিত করে।

রিপালস্‌ বে

রিপালস্ বে হংকংয়ের একটি বিখ্যাত উপসাগরীয় সমুদ্র সৈকত। সমুদ্র সৈকতটি হংকং দ্বীপের দক্ষিণ অংশে অবস্থিত। এর সাদা বালি, পরিষ্কার নীল পানি ও সমুদ্র সৈকতের জন্য বিখ্যাত। এই সৈকতের আশেপাশে ক্যাফে, রেস্টুরেন্ট এবং হোটেল রয়েছে, যা পর্যটকদের আরামদায়ক সময় কাটানোর সুযোগ করে দেয়।

রিপালস্ বে সমুদ্র সৈকত

মাদাম তুসোর মোমের জাদুঘর

বিশ্বের বিভিন্ন তারকার মোমের তৈরি মূর্তি সংরক্ষিত আছে এই জাদুঘরে। মূর্তিগুলো দেখলে মনে হবে যেনে সত্যি মানুষই দাঁড়িয়ে আছে। এখানে চীনের সাবেক প্রেসিডেন্ট হু চিন থাও, বাস্কেটবল তারকা ইয়াও মিং ও হংকং তারকা অ্যান্ডি লাউ’সহ অনেক বিখ্যাত মানুষের মোমের মূর্তি আছে।

মাদাম তুসোর মোমের জাদুঘর

তারকা এভিনিউ বা এভিনিউ অব স্টারস

হংকংয়ের তারকা এভিনিউ-এ ৭৩টি উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র নির্মাতাদের ফলক স্থাপন করা হয়েছে। তারকা এভিনিউয়ে হাঁটার সময় হংকংয়ের বিখ্যাত ভিক্টোরিয়া পিকের সুন্দর দৃশ্য উপভোগ করার মতো। এ ছাড়া হংকং দ্বীপের তীরে বিশিষ্ট স্থাপত্য নিদর্শন আছে, আছে যা সিম্ফনি অব লাইট উপভোগের সুযোগ। 

ভিক্টোরিয়া পিক

হংকংয়ের বৃহত্তম পার্ক। প্রতি বছরের বসন্ত উৎসব চলাকালে চীনা ফুলের বৃহত্তম প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয় এখানে। হংকংয়ের বিখ্যাত কনভেনশন অ্যান্ড এক্সিবিশন সেন্টার এখানে অবস্থিত।

হংকং ডিজনিল্যান্ড

এখানে চীনা কার্টুন চরিত্র এবং পশ্চিমা কার্টুন চরিত্রের সমাহার দেখা যায়। এ ছাড়া, ডিজনিল্যান্ডে রয়েছে হংকং ডিজনিল্যান্ড হোটেল ও ডিজনির হলিউড হোটেল। এখানে রূপকথার বিশ্ব ও চলচ্চিত্র বিশ্বের বিস্ময়কর আনন্দ উপভোগ করা যায়। 

হংকং বিজ্ঞান জাদুঘর

হংকং বিজ্ঞান জাদুঘর পর্যটকদের জন্য আরেকটি আকর্ষণ। এখানে কম্পিউটার, যন্ত্রমানব, জ্বালানিসম্পদ, টেলিযোগাযোগ ও পরিবহন ইত্যাদি খাতের বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত প্রদর্শিত হয়।

ছিং মা সেতু

হংকংয়ের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও শহরের মূল রাজপথকে সংযুক্ত করা বিশ্ব পর্যায়ের স্থাপত্য এই সেতু। এটি হংকংয়ের প্রতীক। সেতুর দৈর্ঘ্য ২.২ কিলোমিটার। সমুদ্র থেকে ৬০ মিটার উঁচুতে সেতুর অবস্থান। সেতুতে ব্যবহৃত ঝুলন্ত ইস্পাতের রশির মোট দৈর্ঘ্য ১ লাখ ৬০ হাজার কিলোমিটার। বিশ্বের সবচেয়ে লম্বা ঝুলন্ত সেতু এটি।

ছিং মা সেতু

ভিক্টোরিয়া হারবার

ভিক্টোরিয়ার হারবার হংকংয়ের একটি প্রাকৃতিক বন্দর। এটি পর্যটকদের কাছে অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। এখানে বসে বিশ্বের বৃহত্তম স্থায়ী লাইট অন্ড সাউন্ড শো (সিম্ফনি অব লাইট) উপভোগ করা যায়। সিম্ফনি অব লাইট প্রতিদিন সন্ধ্যায় হারবারের আকাশ জুড়ে প্রদর্শিত হয়ে থাকে। এছাড়াও, এখান থেকে হংকংয়ের বিখ্যাত স্কাইলাইন সবচেয়ে সুন্দরভাবে উপভোগ করা যায়। এটি ফটোগ্রাফি, নৌবহর, এবং শহরের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি উপভোগের জন্য উপযুক্ত স্থান।

ভিক্টোরিয়া হারবার

হংকংয়ের বৈচিত্রময় খাবার

হংকং স্টাইল নুডলস

ন্যুডলস হংকংয়ে খুবই জনপ্রিয় একটি খাবার। হংকংয়ে নুডলসের বিভিন্ন ধরনের রেসিপি আছে, যেমন শুড়ের শোরমা, হংকং স্টাইল হট পট,  চাও মিয়ান, স্যুপ ও ডিম নুডলস। 

ডিম রোল 

ডিম রোল, হংকংয়ের একটি জনপ্রিয় স্ট্রিট ফুড। এটি সাধারণত ডিমের পুর দিয়ে তৈরি একধরনের রোল যা খেতে খুবই সুস্বাদু। ডিম রোলের বাইরের অংশ মুচমুচে হয় এবং ভেতরে মিষ্টি ডিমের পুর থাকে। 

হংকং স্টাইল হট পট

হংকংয়ের হট পট বা শ্যাবু-শ্যাবু একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় খাবার। যেখানে বিভিন্ন ধরনের মাছ, মাংস, শুঁটকি, শাকসবজি এবং নুডলস একসাথে ঝোলের মধ্যে ফুটিয়ে খাওয়া হয়। 

স্টিমড ডাম্পলিংস

হংকংয়ের আরেক জনপ্রিয় খাবার হল স্টিমড ডাম্পলিংস। এই ডাম্পলিং সাধারণত শুঁটকি, মাংস বা শাকসবজির পুর দিয়ে তৈরি করা হয়। এগুলো একধরনের পুডিংয়ের মতো এবং বেশিরভাগ হংকংয়ের রেস্তোরাঁর জনপ্রিয় খাবার। সীমাও (Siu mai) স্টিমড ডাম্পলিংস খাবারগুলোর মধ্যে অন্যতম। 

হংকং স্টাইল চা

হংকংয়ের ঐতিহ্যবাহী ‘মিল্ক টি’ একটি সেরা পানীয়। এটি হংকংয়ের চা সংস্কৃতির অংশ। এই চা বিশেষত মিষ্টি এবং কড়া, এবং এটি সাধারণত হালকা বা ভারী খাবারের সাথে পরিবেশন করা হয়। হংকংয়ের চা অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং এটি বিশেষত রাস্তায় নানা দোকানে পাওয়া যায়।

হংকংয়ের সংস্কৃতি

চীনা সংস্কৃতির প্রাধান্য

হংকংয়ের মূল জনগণ হল চীনা। তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য গভীরভাবে চীনা পরম্পরার দ্বারা প্রভাবিত। এখানে বিভিন্ন চীনা উৎসব যেমন- চীনা নববর্ষ, মিড-অটাম ফেস্টিভ্যাল, এবং চীনা ড্রাগন বোট রেস ধুমধাম করে উদযাপিত হয়।

ড্রাগন বোট রেস

পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রভাব

অপরদিকে ব্রিটিশ শাসনের সময়কালে (১৮৪২-১৯৯৭) হংকংয়ের মধ্যে পশ্চিমা সংস্কৃতি ব্যাপকভাবে প্রবাহিত হয়। বিশেষ করে আইন, শিক্ষা এবং স্থাপত্যের ক্ষেত্রে এই প্রভাব আজও দেখা যায়। এখানকার আধুনিক স্কাইলাইন, পশ্চিমা স্থাপত্য শৈলী, এবং শপিং সেন্টারগুলো প্রমাণ করে যে, ঐতিহাসিকভাবে হংকং এ পশ্চিমা সংস্কৃতির ব্যাপক প্রভাব ছিল।

ধর্মীয় ক্ষেত্রে হংকংয়ে চীনা ধর্মীয় বিশ্বাস, বৌদ্ধধর্ম, তাওবাদ এবং খ্রিস্টান ধর্মের প্রভাব রয়েছে। একইসাথে হংকং বিশ্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, যেখানে চিত্রকলা, চলচ্চিত্র, মঞ্চ নাটক, এবং নৃত্যের প্রচলন রয়েছে।

হংকং: মৎস্য পল্লী থেকে মেগা সিটি

হংকং এক সময় ছিল একটি মৎস্য পল্লী। ইতিহাস জাদুঘরে ‘হংকং স্টোরি’ নামক প্রদর্শনীর মাধ্যমে হংকং শহরের এই পরিবর্তনকে জানা যায়। প্রদর্শনীটি দেখলে বুঝতে পারা যায় কীভাবে হংকং একটি সাধারণ মৎস্য বন্দর থেকে আজকের বিশাল মেগা মেট্রোপলিসে পরিণত হয়েছে। 

জনপ্রিয় কুংফুর দেশ

হংকং ঐতিহ্যবাহী চীনা মার্শাল আর্টসকে একটি পপ কালচার ফেনোমেননে পরিণত করেছে। কিভাবে এই পপ কালচার তৈরি হয়েছে তা দেখতে হলে অবশ্যই হংকং হেরিটেজ মিউজিয়াম পরিদর্শন করতে হবে। মিউজিয়ামটিতে ড. লুই চা-এর কাজের একটি স্থায়ী প্রদর্শনী রয়েছে। 

এছাড়াও, কুংফু নিয়ে আরো বিভিন্ন প্রদর্শনী রয়েছে এই হেরিটেজ মিউজিয়ামে। এই কাজগুলো টিভি শো, চলচ্চিত্র, ভিডিও গেমস এবং কমিক বইসহ নানা মাধ্যমে প্রভাব ফেলেছে।

দৈহিক শাস্তিকে নিরুৎসাহিত করে হংকং

হংকংয়ের বিচার ব্যবস্থায় দৈহিক শাস্তির চেয়ে পুনর্বাসনে বেশি মনোযোগ দেয়। এক সময় শাস্তির জন্য দেহাতীত শাস্তি যেমন- ক্যানিং। ক্যানিং হল শারীরিক শাস্তির একটি রূপ যেখানে বেত দিয়ে শরীরে আঘাত করা হতো। ১৯৯০ সালে একটি আইন বাতিলের মাধ্যমে এ ধরনের শারীরিক শাস্তি নিষিদ্ধ করা হয়।

তবে বর্তমানে পুনর্বাসনকে হংকংয়ের দণ্ড ব্যবস্থার প্রধান লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। এই শহরের অপরাধ এবং শাস্তির পদ্ধতি ১৭০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বিকশিত হয়েছে। 

হংকং:বিশ্ব ব্যবসাকেন্দ্রের এশিয়ান টাইগার

পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় বিশ্বের এক জমজমাট ব্যবসাকেন্দ্র হংকং; সমাজতান্ত্রিক চীনের ভেতরের এক শহরে যা ভাবতেও কষ্ট হয়। কিন্তু চীন তার নিজ স্বার্থেই মুক্ত বাজার অর্থনীতি চালু করেছে এই শহরে। যা থেকে তারা সুফল ভোগ করে সমাজতন্ত্রের ঝান্ডা উড়িয়েও। 

হংকংয়ে রয়েছে মুক্ত বাজার এবং খুবই অল্প ট্যাক্সের সুবিধা। মুক্তবাজার সুবিধার অর্থ পণ্য যেকোনো দেশে রপ্তানি বা আমদানীতে কোনো বাধা যেমন—কোটা, উচ্চহারে শুল্ক, ব্যাপক কঠোর নিয়ম-কানুন ইত্যাদি না থাকা। সেই সাথে এখানে রয়েছে খুবই অল্পহারের ট্যাক্স যা ব্যবসাবান্ধব। বিশ্বের সমস্ত বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তাদের ব্যবসা পরিচালনা করে থাকে এখান থেকে। ফলে ১৯৭০ এর দশকে হংকং পরিচিত পায় ‘এশিয়ান টাইগার’ হিসেবে।

হংকংয়ের শেয়ার বাজার বিশ্বের ৭ম বৃহৎ শেয়ার বাজার। এটি পুঁজি বাড়ানোর জন্যে সবচেয়ে উপযুক্ত জায়গাগুলোর ভেতর একটি। হংকংয়ের মুদ্রা ‘হংকং ডলার’ বিশ্বের ১৩তম বহুল ব্যবহৃত মুদ্রা। মাথাপিছু আয়েও হংকং শীর্ষ দেশগুলোর কাছাকাছি, যদিও আয়ের ভারসাম্যহীনতা রয়েছে প্রচুর, অর্থাৎ ধনী-গরিবের ব্যবধান অনেক।

কেনাকাটার স্বর্গ হংকং

হংকং কেনাকাটার জন্য আদর্শ স্থান। যে কেউ এখানে দারুণ শপিং করতে পারবে। বিশেষ করে ফ্যাশন, প্রযুক্তি, গয়না এবং স্যুভেনির জাতীয় জিনিসগুলো কেনার জন্য বিখ্যাত কিছু জায়গা রয়েছে। যেমন-

পাশিফিক প্লেস

এটি একটি শপিং মল যেখানে আপনি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের পোশাক, গয়না, প্রযুক্তি দ্রব্যাদি কিনতে পারা যায়। আধুনিক এবং বিলাসবহুল কেনাকাটার অভিজ্ঞতা উপভোগ করতে এটি একটি আদর্শ স্থান।

মং কক মার্কেট

মং কক বাজারটি হংকংয়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় স্ট্রীট মার্কেট। এখানে সস্তায় কাপড়, গয়না, স্মৃতি চিহ্ন, এবং হস্তশিল্পের পণ্য পাওয়া যায়।

মং কক মার্কেট

স্ট্যানলি মার্কেট

স্ট্যানলি মার্কেট হংকংয়ের একটি ঐতিহ্যবাহী বাজার, যা মূলত স্মৃতি চিহ্ন এবং সস্তা পোশাকের জন্য বিখ্যাত।

অবশেষে হংকং

হংকং তার অনন্য ভৌগোলিক অবস্থান, আধুনিক অবকাঠামো, বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ভূমিকার জন্য বিশ্বব্যাপী বিশেষভাবে পরিচিত। এ শহরটি শুধু একটি আন্তর্জাতিক আর্থিক কেন্দ্র নয়, বরং প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মেলবন্ধনের প্রতীক। এখানকার ইতিহাস, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, এবং উন্নত জীবনযাত্রা এটিকে ভ্রমণ, শিক্ষা, ও বাণিজ্যের জন্য আকর্ষণীয় করে তুলেছে।  

হংকংয়ের আকাশচুম্বী ভবন, যেমন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কেন্দ্র (ICC), এর উন্নতির প্রতীক। পাশাপাশি শহরের ঐতিহ্যবাহী স্থানগুলি, যেমন ভিক্টোরিয়া হারবার এবং টেম্পল স্ট্রিট, ইতিহাস এবং আধুনিকতার সমন্বয়কে তুলে ধরে। এই শহর তার সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার যাত্রায় প্রযুক্তি, পরিবেশ-সচেতনতা, এবং উদ্ভাবনী উদ্যোগ গ্রহণ করছে। হংকং একটি বিশ্বব্যাপী উদাহরণ যে কীভাবে একটি ছোট অঞ্চল বিশাল অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব রাখতে পারে। 

হংকং সম্পর্কে কিছু মজার তথ্য

বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু বিল্ডিংয়ের শহর
হংকংকে বলা হয় “বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু দালানের শহর,”। কারণ এখানে প্রায় ৮,০০০টির বেশি উঁচু ভবন রয়েছে। এই সংখ্যা নিউইয়র্ক এবং দুবাইয়ের চেয়েও বেশি।

বিশ্বের সবচেয়ে ব্যস্ততম বন্দর
১৯৮০ এবং ১৯৯০-এর দশকে হংকং বিশ্বের সবচেয়ে ব্যস্ততম কন্টেইনার বন্দর ছিল। আজও এটি শীর্ষস্থানে রয়েছে।

এশিয়ার নিউইয়র্ক
হংকংয়ের আকাশচুম্বী ভবন এবং শহরের কোলাহলপূর্ণ জীবনধারার কারণে একে “এশিয়ার নিউইয়র্ক” বলা হয়।

ডিম টার্টের জন্য বিখ্যাত
হংকংয়ের রাস্তার দোকানগুলোতে পাওয়া যায় “এগ টার্ট,” যা স্থানীয় এবং পর্যটকদের মধ্যে ভীষণ জনপ্রিয়। এটি ঐতিহ্যবাহী ক্যান্টোনিজ খাবার।

পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থার অসাধারণ দক্ষতা
হংকংয়ের প্রায় ৯০% মানুষ পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার করেন, যা বিশ্বের অন্য কোনো শহরের তুলনায় বেশি।

পিক ট্রাম
১৮৮৮ সালে চালু হওয়া পিক ট্রাম হংকংয়ের অন্যতম পুরোনো এবং বিখ্যাত আকর্ষণ। এটি শহরের উঁচু পয়েন্ট থেকে মনোরম দৃশ্য উপভোগের সুযোগ দেয়।

পানির চেয়ে চা বেশি জনপ্রিয়
হংকংয়ের মানুষ চা পছন্দ করেন অত্যন্ত। এখানে চা পান করা শুধু একটি অভ্যাস নয়, বরং এটি একটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য।

রেস্তোরাঁর স্বর্গ হংকং
হংকংয়ে প্রায় ১৫,০০০ রেস্তোরাঁ রয়েছে, যেখানে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন রকম খাবার পাওয়া যায়। এটি “গ্যাস্ট্রোনমিক রাজধানী” নামেও পরিচিত।

ল্যান্টাউ দ্বীপের টিয়ান তান বুদ্ধ
ল্যান্টাউ দ্বীপে অবস্থিত বিশালাকার টিয়ান তান বুদ্ধ মূর্তি হংকংয়ের অন্যতম প্রতীক। এটি ৩৪ মিটার উঁচু এবং ব্রোঞ্জের তৈরি।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় সিঁড়ি
হংকংয়ের মিড-লেভেল এসকেলেটর বিশ্বের দীর্ঘতম আচ্ছাদিত এসকেলেটর সিস্টেম, যা প্রায় ৮০০ মিটার লম্বা।

সূত্রঃ

Related posts

মুম্বাই – মেরি জান

আবু সালেহ পিয়ার

ওয়াশিংটন ডিসি – আমেরিকার ঐতিহাসিক শহর

গণতন্ত্রের আঁতুড়ঘর- এথেন্স

আশা রহমান

Leave a Comment

Table of Contents

    This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More