বলিউডের বিখ্যাত একটা ডায়লগ হল, “এক বার মুম্বাই আ গেয়া তো ফির কাভি কাহিঁ অউর কি তামন্না নেহি কারোগে” অর্থাৎ, একবার মুম্বাই চলে আসলে আর কোথাও যাওয়ার ইচ্ছা হবে না।
আসলেই মনে হয় তাই। মুম্বাই হল আধুনিকতা আর ঐতিহ্যের অসাধারণ মিশ্রণ। যেখানে কেউ আসে তারকা হতে আবার কেউ আসে জীবন গড়তে। মুম্বাই আসলে “জিন্দেগি কা ফিল্ম”; মানে জীবনের চলচ্চিত্র। আর এই ফিল্মে প্রত্যেকেই তার নিজ গল্পের হিরো!
পূর্বে বোম্বে নামে পরিচিত এই শহর, ব্রিটিশ শাসনামলের সময় ভারতের অন্যতম প্রধান বন্দর নগরী হয়ে ওঠে। মুম্বাই তার প্রাণবন্ত সংস্কৃতি, বলিউড এবং বাণিজ্যিক শক্তির জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। ভারতজোড়া উচ্চাকাঙ্খী মানুষদের প্রধান আকর্ষণ এই শহরটি। আর এই বৈচিত্র্যময় জনসংখ্যা, বহুতল ভবন, ব্যস্ত রাস্তা, এবং সমৃদ্ধ ঐতিহ্য শহরটিকে একটি অনন্য রূপ দিয়েছে।
দেশ | ভারত |
অঞ্চল/রাজ্য | মহারাষ্ট্র |
আয়তন | ৬০৩.৪ বর্গকিলোমিটার |
জনসংখ্যা | প্রায় ২ কোটি (২০২৩) |
সরকারি ভাষা | মারাঠি |
প্রধান মুদ্রা | ভারতীয় রুপি (INR) |
সময় অঞ্চল | ভারতীয় মান সময় (UTC+5:30) |
আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর | ছত্রপতি শিবাজী মহারাজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর |
মুম্বাই এর অবস্থান ও জলবায়ু
আরব সাগরের তীরে সাতটি দ্বীপ নিয়ে মুম্বাই শহর গঠিত। মুম্বাই ভারতের পশ্চিম উপকূলে সালসেট দ্বীপের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত। এর পশ্চিমে রয়েছে আরব সাগর এবং পূর্বে থানে ক্রিক ও উত্তরে ভাসাই ক্রিক। মুম্বাইয়ের মোট এলাকা ৬০৩.৪ বর্গকিলোমিটার। এটি ভূমিকম্প প্রবণ অঞ্চল। এখানে রিখটার স্কেলে ৬.৫ মাত্রার ভূমিকম্প হতে পারে।
মুম্বাইয়ের জলবায়ু আর্দ্র এবং শুষ্ক প্রকৃতির। অক্টোবর থেকে মে মাস পর্যন্ত বেশিরভাগ সময় বৃষ্টিপাত হয় না এবং জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমী বৃষ্টিপাত দেখা যায়।এখানকার গড় বার্ষিক বৃষ্টিপাত ২,২১৩ মিমি এবং তাপমাত্রা ২৭° সেলসিয়াস। শহরটি সুমুদ্রের পাশে অবস্থিত হলেও এখানে ঘূর্ণিঝড় কম দেখা যায়। সর্বশেষ ১৯৪৮ সালে একটি বড় ঘূর্ণিঝড় মুম্বাইকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল। মুম্বাই মৌসুমী বন্যারও শিকার। এর কারণ হল অপরিকল্পিত নিষ্কাশন ব্যবস্থা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং অপরিকল্পিত বসতির দ্রুত বৃদ্ধি।শেষ ২০০৫ সালে ভয়াবহ বন্যা হয়।
ম্যাপ
মুম্বাইয়ের ইতিহাস
মুম্বাইয়ের ইতিহাস অনেক প্রাচীন। মুম্বাইয়ে প্রথম কখন বসতি হয়েছিল তা সঠিকভাবে জানা যায় না। তবে উত্তর মুম্বাইয়ের কান্দিভালির আশেপাশে উপকূলীয় অঞ্চলে পাওয়া প্লাইস্টোসিন থেকে বোঝা যায় যে, দক্ষিণ এশীয় প্রস্তর যুগ থেকে এখানে জনবসতি ছিল। খ্রিস্টপূর্ব ৩য় শতাব্দীতে এই দ্বীপগুলি মৌর্য সাম্রাজ্যের অধীনে আসে।
১৬শ শতকের মাঝামাঝি সময়ে পর্তুগিজরা এই দ্বীপগুলি দখল করে নেয়। এখানে তারা বিভিন্ন দুর্গ গড়ে তুলে। সেই সাথে তারা মুম্বাই বন্দরকে আরব সাগরের একটি প্রধান সমুদ্রবন্দর হিসেবে গড়ে তুলে। এরপর, ১৬৬১ সালের পর ইংরেজরা মুম্বাই দখল করে। ব্রিটিশরা শহরের গুরুত্ব বুঝতে পেরে এর বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়ন শুরু করে।
১৬৮৭ সালে, ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাদের সদর দপ্তর সুরাট থেকে মুম্বাইতে স্থানান্তর করে। শহরটি শেষ পর্যন্ত বোম্বে প্রেসিডেন্সির সদর দফতরে পরিণত হয়। ১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতার পর, বোম্বে প্রেসিডেন্সি পুনর্গঠিত হয়ে বোম্বে রাজ্য গঠিত হয়। ১৯৬০ সালে ভাষার ভিত্তিতে মহারাষ্ট্র রাজ্য গঠন করা হয়। যেখানে মুম্বাই হয় মহারাষ্ট্রের রাজধানী । স্বাধীনতার পর থেকেই মুম্বাই শিল্প, বাণিজ্য, এবং বিনোদনের কেন্দ্রস্থল হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
মুম্বাই এর অর্থনীতি ও শিল্প
মুম্বাই দেশের আর্থিক ও বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে পরিচিত। শহরটি ভারতের মোট জিডিপির ৬.১৬% উৎপন্ন করে। এখানে বোম্বে স্টক এক্সচেঞ্জ (BSE), ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জ (NSE), এবং ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংকের (RBI) মতো প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
দেশের ২৫% শিল্প উৎপাদন এবং ৩৩% আয়কর মুম্বাইতে সংগ্রহ হয়। এছাড়াও শুল্কের ৬০% এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের ৪০% আয় হয় এই শহর থেকে । এছাড়া লার্সেন অ্যান্ড টুব্রো, রিলায়েন্স, টাটা গ্রুপের মতো বড় কর্পোরেশনগুলিও এই শহরের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। ১৯৯১ সালের উদারীকরণের পর থেকে আইটি, পরিষেবা ও আউটসোর্সিং শিল্প উন্নতি করে। ২০২৪ সালের হিসাবে, মুম্বাইয়ের অর্থনীতি $৯০০ বিলিয়ন পর্যন্ত অনুমান করা হয়।
এ ছাড়াও শহরের অর্থনীতিতে অবদানকারী অন্যান্য খাতগুলি হল অর্থ, রত্ন ও গহনা, চামড়া প্রক্রিয়াকরণ, টেক্সটাইল, পেট্রোকেমিক্যাল, অটোমোবাইল এবং বিনোদন। টেক্সটাইল খাত মুম্বাইয়ের ঐতিহ্যবাহী শিল্পগুলির মধ্যে একটি। ১৯৭০ এর দশক পর্যন্ত এই খাত মুম্বাইয়ের মূল অর্থনৈতিক চালক ছিল।
মুম্বাই বিনোদন শিল্পের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। এখানে আয়ের বিশাল অংশ জোগায়, বলিউড ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি এবং টেলিভিশন প্রোডাকশন । বান্দ্রা-কুরলা কমপ্লেক্স এবং নরিমান পয়েন্ট শহরের প্রধান আর্থিক কেন্দ্র।
মুম্বাই শহরে বিশ্বের তৃতীয় সর্বোচ্চ সংখ্যক বিলিয়নেয়ারের আবাসস্থল । মুম্বাইইয়ের আয় বৈষম্যে অর্থনীতির অন্যতম বড় সমস্যা। ২৫% পরিবারের মাসিক আয় ১২,৫০০-রুপির থেকে কম। যেখানে মুম্বাইয়ের গড় বেতন প্রায় ৪৫,০০০ রুপির মত।
মুম্বাই এর পর্যটন আকর্ষণ
মুম্বাইতে অসংখ্য জনপ্রিয় পর্যটন আকর্ষণ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম
গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়াঃ এটি ১৯২৪ সালে নির্মিত হয়। এর স্থাপত্যে মুগল এবং গথিক শৈলীর মিল দেখা যায়। এটি সমুদ্রের পাশেই অবস্থিত।এখানকার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হচ্ছে নৌভ্রমণ।ফেরীতে করে এই ভ্রমন হতে পারে আপনার জীবনের অন্যতম সেরা অভিজ্ঞতা। তাছাড়াও এর পাশে বিখ্যাত তাজমহল হোটেল অবস্থিত। এখানকার ঐতিহ্যবাহী খাবার খেতে খেতে সূর্যাস্ত দেখার জন্য প্রচুর মানুষ এখানে ঘুরতে আসে।
ছত্রপতি শিবাজি টার্মিনাসঃ ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে পরিচিত। এটি মুম্বাইয়ের একটি রেলওয়ে স্টেশন।আপনি বাইরে থেকে দেখে হয়ত এটিকে প্রাসাদ ভেবে ভুল করতে পারেন। এটি ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন।
গিলবার্ট হিলঃ আরেকটি বিখ্যাত ল্যান্ডমার্ক গিলবার্ট হিল। এটি আন্ধেরিতে অবস্থিত, ৬১ মিটার উঁচু ব্যাসল্ট পাথরের স্তম্ভ যা ৬৬ মিলিয়ন বছর আগে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ফলে তৈরি হয়েছিল। এর শীর্ষে অবস্থিত হিন্দুমন্দির থেকে শহরকে অনেক সুন্দর দেখায়।
জুহু ও চোপাটি সি বীচঃ এই দু’টি সৈকত মুম্বাই এর অন্যতম পর্যটন আকর্ষণ। জুহু বীচ বলিউড তারকাদের প্রিয় স্থান। যেখানে তারকাদের দেখার জন্য অনেকে ঘুরতে যাই। প্রেমিক জুটিদের অন্যতম পছন্দের স্থান হল চোপাটি বীচ। এখানকার বাতাসে বিকেলের সময় নানা ধরনের খাবার ও স্ন্যাকসের সাথে সুর্যাস্ত দেখা একটা সেরা মুহূর্তের অভিজ্ঞতা দেয়।
হাজি আলী দরগাহঃ পর্যটকদের জন্য একটি জনপ্রিয় কেন্দ্র হচ্ছে হাজি আলী দরগাহ। এটি সমুদ্রের মধ্যে অবস্থিত একটি মাজার। হাজি আলী দরগাহর প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল হাজি আলী নামের এক ধনী মুসলিম বণিকের স্মৃতির উদ্দেশ্যে। তিনি মক্কায় হজ পালন করতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেছিলেন। সমুদ্রের মাঝে থাকা এই মাজারটি অসাধারণ প্রাকৃতিক দৃশ্য উপহার দেয়। এছাড়াও এখানে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ প্রার্থনা করতে আসেন।
মুম্বাইয়ের নাইটলাইফঃ মুম্বাইয়ের নাইটলাইফও বেশ সমৃদ্ধ। যেখানে ক্লাব, বার এবং লাইভ মিউজিকের স্থানগুলি মানুষের আনন্দের জন্য সারারাত খোলা থাকে। এছাড়াও মুম্বাইয়ের নাইট মার্কেটগুলোও বেশ জনপ্রিয়।
বলিউড এবং তারকাদের বাসস্থান: বলিউডের হৃদয়স্থল মুম্বাই। এখানে বলিউড তারকাদের বাড়ি দেখার আকর্ষণও পর্যটকদের কাছে অন্যতম। শাহরুখ খান, অমিতাভ বচ্চনের মতো সুপারস্টারদের বাড়ি মানুষজন বাইরে থেকে ঘুরে দেখে। তাদের বাড়ির সামনে ভক্তদের ভিড় লেগেই থাকে। বিশেষ করে উৎসব বা জন্মদিনের দিনগুলোতে সারা দেশ থেকে প্রচুর মানুস তাদের একবার দেখার জন্য আসে।
মুম্বাই আসলে একটি শহর যা প্রতিটি অলিগলিতে নতুন নতুন পর্যটন আকর্ষণ তৈরি হয়। তাই পর্যটকদের কাছে মুম্বাই কখনোই পুরনো হয় না, বরং প্রতিবার নতুন কিছু উপহার দেয়।”
মুম্বাই এর সংস্কৃতি ও জীবনধারা
মুম্বাইয়ের সংস্কৃতি অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। যা এর খাদ্যাভ্যাস, ভাষা, এবং উৎসবে প্রতিফলিত হয়। এখানে মারাঠি, গুজরাটি, দক্ষিণ ভারতীয় এবং বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষ একত্রে বাস করে। এছাড়া, শহরটি তার ফ্যাশন, নাইটলাইফ এবং খাদ্যপ্রেমের জন্যও বিখ্যাত।
শহরটি ভারতের সবচেয়ে বড় কসমোপলিটান শহর। যেখানে বিভিন্ন সংস্কৃতি, ধর্ম এবং রান্নার মিলন ঘটে। শহরের সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান অংশ হল বলিউড। মুম্বাই হল ভারতীয় চলচ্চিত্রের জন্মস্থান। যেখানে দাদাসাহেব ফালকের সিনেমা থেকে বলিউডের যাত্রা সুরু হয়। এখানে মুম্বাই ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের মতো ইভেন্ট অনুষ্ঠিত হয়।
গণেশ চতুর্থী হল মুম্বাইয়ের সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎসব। এটি উদযাপনের জন্য শহরে প্রায় ৫০০০টি গণপতি প্যান্ডেল স্থাপন করা হয়। অন্যান্য উৎসব যেমন দিওয়ালি , হোলি , নবরাত্রি , বড়দিন , মকর সংক্রান্তি , দশেরা , ঈদ , দুর্গাপূজা , রাম নবমী , শিব জয়ন্তী এবং মহা শিবরাত্রি হল শহরের কিছু জনপ্রিয় উৎসব। এছাড়াও, এলিফ্যান্টা উৎসব , কালা ঘোড়া আর্ট ফেস্টিভ্যাল এবং বঙ্গাঙ্গা উৎসবের মতো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
মুম্বাইয়ের স্থানীয় খাবারগুলো বৈচিত্র্যময় এবং মুখরোচক। এই খাবারগুলো শহরের প্রতিটি অলিতে-গলিতে পাওয়া যায়। শহরের অন্যতম জনপ্রিয় খাবার হলো ভাড়া পাও। এটাকে মুম্বাইয়ের বারগার বলা হয়। পাও ভাজি ও মিসাল পাও বেশ বিখ্যাত। এগুলা নরম রুটি এবং মশলাদার তরকারির সঙ্গে পরিবেশন করা হয়। মুম্বাইয়ের রাস্তায় ভেলপুরি, সেভপুরি এবং পানি পুরির স্বাদও পর্যটকদের মন কাড়ে। বোম্বাই ডাক নামে পরিচিত একটি ছোট্ট মাছের ডিশ ঐতিহ্যবাহী খাবার। ইরানি ক্যাফেগুলোর চা ফালুদা আপনাকে মুগ্ধ করবে। মুম্বাইয়ের বিখ্যাত কোলাপুরি থালি মশলাদার খাবারপ্রেমীদের জন্য এক আদর্শ পদ। শহরের এই খাবারগুলো মুম্বাইয়ের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকেও তুলে ধরে।
যোগাযোগ ব্যবস্থা
মুম্বাইতে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট সিস্টেমের মধ্যে রয়েছে মুম্বাই লোকাল , মনোরেল , মেট্রো , বাস, কালো-হলুদ মিটার ট্যাক্সি , অটো রিকশা এবং ফেরি । শহরের প্রধান পরিবহন মাধ্যমগুলির মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মুম্বাই লোকাল ট্রেন। এটি প্রতিদিন প্রায় ৬৩ লক্ষ যাত্রি পরিবহন করে। মনোরেল ও মেট্রোরেল যাতায়াতের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। মুম্বাই মনোরেল ভারতের একমাত্র কর্মক্ষম মনোরেল ব্যবস্থা। আর বিশ্বের সপ্তম বৃহত্তম মনোরেল ব্যবস্থা।
মুম্বাইয়ের বাস দৈনিক ৫৫,০০০০০ লক্ষ এর বেশি যাত্রি পরিবহন করে। এছাড়াও, আছে ট্যাক্সি এবং অটো-রিকশা। এসব বাহন স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকদের স্বাচ্ছন্দ্যের সাথে চলাচল নিশ্চিত করে। এর সঙ্গে উবার এবং ওলা এর মতো অনলাইন ক্যাব সার্ভিসগুলোও শহরের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরো উন্নত করেছে। এগুলো ব্যবহারকারীদের জন্য দ্রুত এবং সুবিধাজনক যাতায়াতের সুযোগ করে দেয়।
মুম্বাই এর শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা
মুম্বাইয়ের শিক্ষা ব্যবস্থা অত্যন্ত উন্নত । শহরের স্কুলগুলো সাধারণত দুটি ভাগে বিভক্ত: পৌর বিদ্যালয়, যা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন দ্বারা পরিচালিত, এবং বেসরকারি বিদ্যালয়। এই বিদ্যালয়গুলো বিভিন্ন বোর্ডের অধীনে পরিচালিত হয়, যেমন মহারাষ্ট্র রাজ্য বোর্ড, সিবিএসই এবং আইবি। এমসিজিএম পরিচালিত প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রায় ৪,৮৫,০০০ শিক্ষার্থী লেখাপড়া করছে।
এছাড়াও এখানে কিছু নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেমন ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি (IIT Bombay), টাটা ইনস্টিটিউট অফ সোশ্যাল সায়েন্সেস (TISS) এবং মুম্বাই ইউনিভার্সিটি। এই প্রতিষ্ঠানগুলো উচ্চমানের শিক্ষা প্রদান করে এবং দেশের তরুণদের জন্য পেশাগত প্রস্তুতির ভিত্তি গড়ে তোলে। মুম্বাই ভেটেরিনারি কলেজ, ১৮৮৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। যা ভারত ও এশিয়ার প্রাচীনতম ভেটেরিনারি কলেজ। টাটা ইনস্টিটিউট অফ ফান্ডামেন্টাল রিসার্চ (TIFR) এবং ভাভা অ্যাটমিক রিসার্চ সেন্টার (BARC) শহরের উল্লেখযোগ্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান।
স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও মুম্বাই অন্যান্য শহরের থেকে এগিয়ে। এখানে আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষ চিকিৎসক দ্বারা পরিচালিত সরকারি এবং বেসরকারি হাসপাতালগুলো রয়েছে। যেমন টাটা মেমোরিয়াল হাসপাতাল, লীলাবতী হাসপাতাল, এবং কোকিলাবেন ধীরুভাই আম্বানি হাসপাতাল। শহরের স্বাস্থ্যসেবার এই ব্যবস্থা নাগরিকদের স্বাস্থ্য ও সুস্থতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বিনোদন ও ক্রিয়াকলাপ
এখানে বহু সিনেমা হল, থিয়েটার, আর্ট গ্যালারি, শপিং মল, এবং পার্ক রয়েছে। বিশেষ করে, শহরে বলিউডের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি থাকায় চলচ্চিত্র বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম হয়ে গেছে। মুম্বাইয়ের চলচ্চিত্র শিল্পের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ভারতীয় সংস্কৃতি প্রসার পাচ্ছে।
এছাড়াও, ক্রিকেট বিনদনের সেরা মাধ্যম। ব্র্যাবোর্ন স্টেডিয়াম ও মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়াম শহরের ক্রিকেট স্টেডিয়ামগুলোর মধ্যে অন্যতম। এইখানে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও ঘরোয়া ক্রিকেট ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। শহরের বিভিন্ন পার্ক এবং সমুদ্র সৈকত স্থানীয়দের জন্য প্রিয় গন্তব্য হিসেবে পরিচিত। এদের মধ্যে জুহু, মেরিন ড্রাইভ উল্লেখযোগ্য।তাছাড়াও মুম্বাইয়ের বিভিন্ন বার, কফিশপ বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম। মুম্বাইয়ের এই বৈচিত্র্যময় বিনোদনমূলক কার্যক্রম শহরটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে।
আরব সাগরের তীরে দাঁড়িয়ে থাকা একটি জাদুকরী শহর মুম্বাই। এখানে শিল্পের বিস্তৃতি এবং অর্থনীতির গতি, সব কিছু মিলে তৈরি করেছে এক স্বপ্নময় জগত। মুম্বাইয়ের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য যেন এক রঙিন প্যালেট। যেখানে খাবার, ভাষা, ও উৎসবের মিষ্টি সুরেলা সঙ্গীত বাজে। গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়া ও বলিউডের তারকাদের জগৎ দর্শকদের কাছে মুম্বাইয়ের মায়ার গল্প শোনায়। উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, শিক্ষা, এবং স্বাস্থ্যসেবা এখানে এক নতুন জীবনের সম্ভাবনা এনে দেয়। মুম্বাই হয়ে ওঠে স্বপ্নের এক শহর। মুম্বাই নিয়ে মোঃ রাফির গাওয়া গানের মধ্যে একটি স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়:
“ইনশান কা নাহি, নাম ও নিশা,
যারা হ্যাটকে, যারা বাঁচকে,
এ হ্যা বোম্বে মেরি জান।”
মুম্বাই সম্পর্কে কিছু মজার তথ্য
১. মুম্বাইয়ের পুরোনো নাম ছিল বোম্বে, যা এসেছে পর্তুগিজ শব্দ “বোম বায়া” থেকে, যার অর্থ “ভালো উপসাগর”।
২. গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়া থেকে প্রতিদিন সাগরে ৫০০ টনের বেশি মাছ ধরা হয়।
৩. পৃথিবীর সবচেয়ে দামি বাড়ী “অ্যান্টিলিয়া” মুম্বাইয়ে অবস্থিত। এটি রিলায়েন্সের মুকেশ আম্বানির বাড়ি।
৪. মুম্বাইয়ে চালিত ডাব্বাওয়ালা সিস্টেমটি পৃথিবীর অন্যতম সংগঠিত এবং কার্যকর খাদ্য বিতরণ ব্যবস্থা।
৫. বিশ্বের অন্যতম ব্যয়বহুল রিয়েল এস্টেট মার্কেট মুম্বাইয়ে অবস্থিত।
৬. মারিন ড্রাইভকে “কুইন্স নেকলেস” বলা হয়, কারণ রাতের বেলায় এখানকার বাতিগুলো একসাথে হীরার মালার মতো দেখায়।
৭. মুম্বাইয়ের তাজ হোটেল প্রথম বিদ্যুৎ বাতি স্থাপন করে।
৮. মুম্বাইয়ের লোকাল ট্রেন সিস্টেমে প্রতিদিন প্রায় ৩০০০ ট্রেন চলাচল করে।
৯. শহরের দারিদ্র্যপ্রবণ এলাকাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় হলো ধারাভি বস্তি। এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় বস্তি হিসেবেও পরিচিত।
১০. মুম্বাইয়ের রাস্তায় প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৭০০ নতুন গাড়ি যুক্ত হয়।