Image default
নগর পরিচিতি

ভেনিস: পানির উপর দাঁড়িয়ে থাকা পৃথিবীর একমাত্র ভাসমান শহর!

আপনাকে যদি বলা হয়, একটি শহর কিসের উপর দাঁড়িয়ে থাকে? আপনি হয়তো বলবেন পাথর, মাটি আর কংক্রিট… কিন্তু যদি বলি, ইউরোপের এমন একটি শহর রয়েছে , যা দাড়িয়ে রয়েছে শুধুমাত্র কাঠের স্তম্ভের উপর! তাও এক-দুই বছর ধরে না। বরং হাজার বছর ধরে! এমনকি এই শহরে নেই কোন রাস্তা! শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও এটাই সত্যি।

পৃথিবীর প্রায় সব শহর মাটির উপর গড়ে উঠলেও, একমাত্র ইতালির ভেনিস শহরের ভিত্তি গড়ে উঠেছে পানির নিচে। তাই তো, ভেনিসকে বলা হয় পৃথিবীর একমাত্র ভাসমান শহর। শুধু তাই নয়, ভেনিস শহরকে “City of Canals”, “Queen of the Adriatic”, “Floating City”, কিংবা “City of Love” ও বলা হয়। 

ভেনিসের অবস্থান

ভেনিস ইতালির উত্তর-পূর্বে ভেনেতো অঞ্চলে অবস্থিত। মূলত আড্রিয়াটিক সাগরের উত্তর-পশ্চিম উপকূলে, ‘ভেনিস লাগুনা’ নামের এক অগভীর লবণাক্ত উপসাগরের ভেতরে শহরটি গড়ে উঠেছে। মজার বিষয় হলো, প্রায় ১১৮টি ছোট দ্বীপ নিয়ে ভেনিস গঠিত। আর তাই তো, শহরটিতে কোন রাস্তা নেই। বিভিন্ন সেতু ও খালের মাধ্যমে শহরটি একে অপরের সঙ্গে যুক্ত। এখানে কোনো গাড়ি বা সাইকেল চলে না, সমস্ত যোগাযোগ হয় নৌকায়। তার মধ্যে গন্ডোলা নৌকা এখানে সবচেয়ে  জনপ্রিয়।

ভেনিসের ইতিহাস

ভেনিসের ইতিহাসও বেশ রোমাঞ্চকর। আজকের এই ভেনিস মানব সভ্যতার এক অসাধারণ প্রকৌশল চেতনার প্রতীক। মূলত এই শহরের জন্ম হয়েছিল বিপর্যয়ের মুখে বাঁচার এক অনন্য প্রয়াস থেকে। 

সময়টা তখন পঞ্চম শতাব্দী। রোমান সাম্রাজ্য প্রায় ধ্বংসের পথে, আর উত্তর দিক থেকে হুন ও লোম্বার্ড জাতিরা ইতালির শহরগুলোর উপর ভয়াবহ আক্রমণ চালাচ্ছিল। ভূমি তখন আর নিরাপদ ছিল না, তাই উপকূলবর্তী মানুষেরা আশ্রয় নিতে শুরু করে, অ্যাড্রিয়াটিক সাগরের অগভীর জলাভূমির ছোট ছোট দ্বীপে।

যেভাবে পানির উপর শহর গড়লো 

এই আশ্রয়প্রার্থীরা ছিল মূলত কৃষক, জেলে ও সাধারণ নাগরিক। তারা বাঁচার তাগিদে জলের মাঝে গড়ে তুলেছিল নতুন এক জীবন। ধীরে ধীরে এই দ্বীপগুলোর একত্রিত নাম হয়ে যায় “Venezia”, অর্থাৎ আজকের ভেনিস।

প্রথম দিকে দ্বীপগুলোতে ছিল অস্থায়ী কাঠের ঘর, খুঁটির উপর দাঁড়ানো ছিল ছোট ছোট বসতি। কিন্তু সময়ের সাথে, সেই সাধারণ আশ্রয়স্থলই রূপ নেয় এক বিস্ময়কর শহরে। যেখানে রাস্তার জায়গায় খাল, গাড়ির জায়গায় নৌকা, আর শক্ত মাটির নিচে লুকিয়ে রয়েছে হাজার হাজার কাঠের খুঁটি, যা এখনো ধরে রেখেছে এই জলের শহরকে। বর্তমানে পুরো শহর জুড়ে রয়েছে প্রায় ১৫০টিরও বেশি খাল ।

ভেনিসের বাড়ি গুলোর নির্মাণকালীন ছবি

ভেনিস জন্ম যেমন ছিল অদ্ভুত, তার নির্মাণ কৌশলও তেমনি বিস্ময়কর। ভেনিসবাসীরা বুঝেছিলেন, ভারী ভবন বানালে বিপদ হতে পারে। তাই তারা বানালেন হালকা ও টেকসই স্থাপনা। সিমেন্টের পরিবর্তে ব্যবহার করলেন এক বিশেষ ধরনের লাইম মর্টার, যা মাটি সামান্য সরে গেলেও ফাটে না, বা ভেঙে পড়ে না। তারা তিন তলার বেশি ভবন তৈরি করতেন না।

তাদের এই পরিকল্পনা সফল হয় খুব দ্রুত। আর এই পদ্ধতিকে আঁকড়ে ধরে আশেপাশের দ্বীপগুলোতেও বসতি ছড়িয়ে পড়ে। জলের উপর গড়ে ওঠা এই শহরকে টিকিয়ে রাখতে লেগুনের নিচের কাদামাটিতে গেঁথে দেওয়া হয়েছিল হাজার হাজার কাঠের খুঁটি। যা ছিল মূলত অ্যালডার, ওক ও লার্চ গাছের কাঠ।

আশ্চর্যের বিষয়, অক্সিজেনবিহীন পানির নিচে এই কাঠগুলো কখনো পচে যায়নি; বরং সময়ের সাথে আরও শক্ত হয়ে গেছে, যা প্রায় পাথরের মতো দৃঢ় বলা যায়। সেই কাঠের স্তম্ভের উপর বসানো হয়েছে পাথরের ব্লক, আর তার ওপরই ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে প্রাসাদ, গির্জা, সেতু, বাজার আর মানুষের বসতি।

খাবার পানির সংকট মোকাবেলা 

প্রথমদিকে ভেনিসবাসীরা বিভিন্ন সমস্যা মধ্যে পড়ে। তার মধ্যে প্রধান ছিল খাবার পানির সংকট । যেহেতু চারদিকে শুধু লবণাক্ত সমুদ্রের পানি, তাই পান করার মতো মিষ্টি পানির জোগান ছিল ভেনিসবাসীর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

প্রথমদিকে মূল ভূখণ্ড থেকে নৌকায় করে পানি আনা হতো, যা ছিল ব্যয়বহুল ও অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। তখনই ভেনিসের প্রকৌশলীরা বের করলেন এক অভিনব ও যুগান্তকারী সমাধান। শহরের বিভিন্ন জায়গায় খোঁড়া হলো বড় বড় গর্ত বা কূপ। এই গর্তগুলো বিশেষভাবে কাদামাটি দিয়ে ঢেকে তৈরি করা হয়, যাতে পানি নিচে সেঁধিয়ে না যায়। তার উপর দেওয়া হলো বালু ও পাথরের স্তর।

ভেনিস শহরের কূপ

বৃষ্টির পানি টাইলের তৈরি সরু পাইপ দিয়ে এসে জমত এই কূপগুলোতে। ধীরে ধীরে বালু ও পাথরের স্তর ছেঁকে পানি হয়ে উঠত বিশুদ্ধ ও পানযোগ্য। শহরের মানুষ দৈনন্দিন কাজে এই কূপের পানি ব্যবহার করত। জেনে অবাক হবেন, পুরো ভেনিস শহরজুড়ে তৈরি হয় প্রায় ৬০০টি কূপ, যা ছিল সেই সময়ের এক অবিশ্বাস্য প্রকৌশল কীর্তি।

ভেনিসের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা

তবে তখনও থেকে গিয়েছিল আরেকটি বড় সমস্যা, আর তা হলো, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। শুরুর দিকে ঘরের জানালা দিয়ে সরাসরি খালে বর্জ্য ফেলা হতো, ফলে শহর হয়ে উঠেছিল অস্বাস্থ্যকর ও দুর্গন্ধযুক্ত। কিন্তু ভেনিসের প্রকৌশলীরা আবারও তাদের দক্ষতার প্রমাণ দিলেন। তারা প্রতিটি বাড়ির নিচে তৈরি করলেন সরু সরু নালা বা চ্যানেল, যেখানে বর্জ্য জমা থাকত। 

প্রতিদিন জোয়ারের সময় সমুদ্রের লবণাক্ত পানি এসে সেই বর্জ্য ভাসিয়ে নিয়ে যেত। এই স্বয়ংক্রিয় প্রাকৃতিক ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজন হয়নি কোনো পাম্প বা আধুনিক যন্ত্রপাতি। প্রকৃতির নিয়মেই শহর ছিল পরিচ্ছন্ন, জীবাণুমুক্ত ও দুর্গন্ধহীন, যা এক হাজার বছর আগেই ভেনিসকে বিশ্বের অন্যতম পরিকল্পিত ও উন্নত নগরীতে পরিণত করেছিল।

বাণিজ্যের কেন্দ্র ভেনিস

পরবর্তীতে সময়ের সাথে সাথে জলের শহরটি ধীরে ধীরে হয়ে উঠল বাণিজ্যের কেন্দ্রও। ৮ম থেকে ১২ শতাব্দীর মধ্যে, ভেনিস ভূমধ্যসাগরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যবন্দর হিসেবে পরিচিতি পায়। এর অবস্থানও ছিল কৌশলগত বেশ ভালো জায়গায়। ঠিক পূর্বের বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য ও পশ্চিম ইউরোপের মাঝখানে। এই সুবিধা কাজে লাগিয়ে ভেনিসের বণিকরা ভারত, আরব, আফ্রিকা, এমনকি দূর চীনের সঙ্গেও বাণিজ্য শুরু করে। তারা মসলা, রেশম, সোনা, রূপা ও মূল্যবান পাথর এনে ইউরোপে সরবরাহ করত, ফলে শহরটি হয়ে ওঠে ধন-সম্পদে পরিপূর্ণ এক সামুদ্রিক শক্তি।

কিন্তু কোনো সাম্রাজ্যই চিরস্থায়ী নয়। ১৫ শতকের শেষ দিকে ভেনিসের বাণিজ্য কেন্দ্র সরে যায় আটলান্টিকের দিকে। তখন স্পেন ও পর্তুগাল নতুন বাণিজ্য শক্তি হিসেবে উঠে আসে। পাশাপাশি অটোমান সাম্রাজ্যের উত্থান ভেনিসের ভূমধ্যসাগরীয় আধিপত্য কমিয়ে দেয়। একদিকে যুদ্ধ, অন্যদিকে অর্থনৈতিক ক্ষতি, সব মিলিয়ে ভেনিসের গৌরব ধীরে ধীরে ম্লান হতে থাকে।

১৭৯৭ সালে ফরাসি সেনাপতি নেপোলিয়ন বোনাপার্ট ভেনিস আক্রমণ করেন। এক হাজার বছরের পুরনো প্রজাতন্ত্র তখন কোনো যুদ্ধ ছাড়াই পতন স্বীকার করে। শহরটি অস্ট্রিয়ার হাতে যায়, পরে আবার ফরাসি শাসনে ফিরে আসে। শেষ পর্যন্ত ১৮৬৬ সালে ভেনিস ইতালির রাজ্যের অংশ হিসেবে যুক্ত হয়।

ভেনিসের উৎসব

বর্তমানে ভেনিসের প্রায় ২ লক্ষ ৪৯ হাজার ৪৪৬ জন বসবাস করে। ভেনিসের প্রধান ধর্ম খ্রিস্টধর্ম। শহরের জীবনযাত্রা, উৎসব ও সামাজিক রীতি প্রায়শই ক্যাথলিক ধর্মের প্রভাব দেখা যায়। তবে, শহরটির  সবচেয়ে প্রসিদ্ধ উৎসব হলো ভেনিস কার্নিভাল। প্রতি বছর ফেব্রুয়ারির দিকে এটি আয়োজন করা হয়। এই উৎসবটি কয়েকশ বছর ধরে ভেনিসের মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

মজার বিষয় হলো, উৎসবটির মূল আকর্ষণ হলো মুখোশ। মানুষ বিভিন্ন রঙের, সোনালি ও রঙিন মুখোশ পরে রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়। শুরুতে এই মুখোশ ছিল সামাজিক স্তরের ভেদ ভুলিয়ে আনন্দ উপভোগের জন্য। ধীরে ধীরে এটি পর্যটক ও শিল্পীদের জন্য এক আন্তর্জাতিক আর্কষণীয় ঘটনা হয়ে ওঠে। রঙিন পোশাক, নৃত্য, সঙ্গীত আর নৌকায় ভেসে বেড়ানো অনুষ্ঠানটি দর্শককে এক অন্য জগতে নিয়ে যায়।

এছাড়া আছে রেগেটা স্টোরিকা উৎসব, যা মূলত এক ঐতিহাসিক নৌকা দৌড় প্রতিযোগিতা। এই সময় শত শত রঙিন গন্ডোলা সাজানো হয়, এবং এটি ভেনিসের প্রাচীন সামুদ্রিক ঐতিহ্যের প্রতীক।

ভেনিসের পর্যটন স্থান

আমরা আগেই জেনেছি ভেনিস এমন একটি শহর, যেখানে রাস্তাগুলোর জায়গায় বয়ে চলে খাল, আর গাড়ির বদলে চলে গন্ডোলা। ইতালির এই রূপকথার শহরটি যেন জল আর পাথরের গড়া এক শিল্পকর্ম। শহরের প্রতিটি কোণায় লুকিয়ে আছে ইতিহাস, প্রেম, আর শিল্পের ছোঁয়া। তবে, এখানে অসংখ্য জনপ্রিয় পর্যটন আকর্ষণ রয়েছে। 

সান মারকো স্কয়ার

তবে, ভেনিস ভ্রমণের প্রাণকেন্দ্র বলা হয়, সান মারকো স্কয়ারকে। এটি হলো ভেনিসের প্রধান শহর চত্বর, যেখানে চারদিক জুড়ে রয়েছে প্রাচীন ইউরোপীয় স্থাপত্য, গির্জা, টাওয়ার আর রাজকীয় ভবন। দিনের আলোয় সান মারকো স্কয়ার ঝলমল করে সাদা মার্বেলের প্রতিফলনে, আর রাতে সেই একই জায়গা রূপ নেয় আলো আর সুরের মেলায়। 

সান মারকো স্কয়ার

Saint Mark’s Basilica

স্কোয়ারের ঠিক সামনেই দাঁড়িয়ে আছে ভেনিসের প্রতীক Saint Mark’s Basilica। বাইজেন্টাইন গম্বুজ আর সোনালি মোজাইকে সাজানো এই গির্জার ভেতরে ঢুকলেই চোখে পড়ে আকাশছোঁয়া ছাদ, স্বর্ণ খচিত দেয়াল, আর ঝলমলে ধর্মীয় ছবি। গির্জার বাহিরটা রঙিন মার্বেল ও স্বর্ণের কারুকাজে ভরা, আর ভেতরে আছে হাজার বছরের পুরনো শিল্পকর্ম।

সেইন্ট মার্ক্স ক্যাম্পেনাইল

বাসিলিকার পাশেই উঠে গেছে লাল ইটের সেইন্ট মার্ক্স ক্যাম্পেনাইল । ৯৮ মিটার উঁচু এই ঘণ্টা টাওয়ার, একসময় এটি ছিল জাহাজের দিক নির্দেশক। আর আজ এটি পর্যটকদের চোখে শহরের প্যানোরামিক দৃশ্য দেখার জানালা। এর উপরে উঠলে মনে হবে ভেনিস যেন হাতের মুঠোয় এসে গেছে। দূর দূরান্ত পর্যন্ত চোখে পড়ে সবুজ লেগুন, চকচকে খাল আর সাদা পালতোলা নৌকার সারি। 

ডোজেস প্যালেস

শহরটিতে আরও রয়েছে, ডোজেস প্যালেস। ভেনিসের সেন্ট মার্ক স্কোয়ারের পাশে অবস্থিত এই রাজকীয় প্রাসাদটি, একসময় ছিল ভেনিস প্রজাতন্ত্রের শাসকদের আবাস। গোলাপি ও সাদা মার্বেলের মিশ্রণে তৈরি গথিক স্থাপত্যশৈলীর এই প্রাসাদটি যেন শিল্পের এক জীবন্ত নিদর্শন। এখানকার বিচারকক্ষ থেকে বন্দীদের নেওয়া হতো ব্রিজ অফ সাই কারাগারে। বলা হয়, সেই সেতু পার হওয়ার সময় বন্দীরা শেষবারের মতো স্বাধীনতার বাতাসে নিঃশ্বাস ফেলত। আর এ কারণেই এর নাম ব্রিজ অফ সাই বা দীর্ঘ নিঃশ্বাসের সেতু।

ডোজেস প্যালেস

পেগি গোগেইনহাইম কালেকশন

ভেনিসের জলপথে এগোলে দেখা মেলে আরও এক শিল্পের জগৎ পেগি গোগেইনহাইম কালেকশন। আধুনিক শিল্পের এই গ্যালারিতে প্রদর্শিত হচ্ছে পিকাসো, দালি, আর পোলকের কাজ। এখানকার প্রতিটি চিত্র যেন শহরের আত্মাকে নতুন করে ব্যাখ্যা করে। এর ঠিক কাছেই রয়েছে গ্যালারি দেল আক্কাডেমিয়া । যেখানে সংরক্ষিত ভেনিসীয় রেনেসাঁস যুগের অমূল্য শিল্পভান্ডার। এখানে আসলে টিশিয়ান, বেল্লিনি আর কার্পাচ্চিওর তুলির টানে সময় যেন থেমে যায়।

গ্র্যান্ড ক্যানাল

কিন্তু ভেনিস মানেই তো জল। আর জল মানেই গ্র্যান্ড ক্যানাল। শহরের এই মূল খালটি ভেনিসের প্রাণরেখা। খালের দুই ধারে রয়েছে সারি সারি প্রাসাদ, গির্জা, আর পুরনো ভবন। গন্ডোলায় চড়ে এই ক্যানালের ভেতর দিয়ে ভেসে যাওয়া এক অনন্য অভিজ্ঞতা। পাশাপাশি দেখা মেলবে পোন্টে ডি রিয়াল্টো, যা শহরের প্রাচীনতম ও সবচেয়ে বিখ্যাত সেতু। এর পাশেই বসে মেরকাটো ডি রিয়াল্টো , যা ভেনিসের সবচেয়ে প্রাণবন্ত ও ঐতিহাসিক বাজার। এখানে প্রতিদিন সকালে তাজা মাছ, ফল আর মসলার গন্ধে ভরে ওঠে বাতাস। 

গ্র্যান্ড ক্যানাল

লাইব্রেরিয়া একুয়া অল্টা

গন্ডোলা ভ্রমণ শেষে যদি একটু ভিন্ন স্বাদের কিছু চান, তবে ঘুরে দেখতে পারেন অদ্ভুত এক বইয়ের দোকান, লাইব্রেরিয়া একুয়া অল্টা তে। মজার বিষয়, এখানে বইগুলো রাখা আছে পুরনো নৌকা, টব, এমনকি বাথটাবের মধ্যে। এর মূল কারণ শহরে প্রায়ই জল উঠে যায় তাই বই যেন না  ভিজার জন্য এমন ব্যবস্থা । এখানে বইয়ের দেওয়ালে উঠে বসে ছবি তোলার অভিজ্ঞতাটাও ভেনিসের মতোই ব্যতিক্রমী।  

ভেনিসের সমাজব্যবস্থা আগে ছিল অত্যন্ত অভিজাত ও বণিকনির্ভর। মধ্যযুগে ভেনিস ছিল ইউরোপের সবচেয়ে ধনী শহরগুলোর একটি, যার নাগরিকরা বাণিজ্য, নৌচালনা ও প্রশাসনে প্রভাবশালী ছিল। আজকের দিনে সমাজ কাঠামো অনেক পরিবর্তিত হলেও সামাজিক সম্প্রীতি ও ঐক্যের ঐতিহ্য এখনো অটুট।

লাইব্রেরিয়া একুয়া অল্টা

তবে সমাজের একটি বড় পরিবর্তন হলো, আজকের ভেনিসবাসীদের অনেকে পর্যটনের উপর নির্ভরশীল। ফলে, স্থানীয়দের জীবনযাত্রায় কিছুটা চাপ তৈরি হয়েছে। তবে, আজও শহরের প্রতিটি ভবন, সেতু আর খাল যেন হাজার বছর আগের মানুষের বুদ্ধিমত্তা, দক্ষতা আর টিকে থাকার তীব্র আকাঙ্ক্ষার সাক্ষ্য দেয়। প্রায় এক সহস্রাব্দ পেরিয়েও ভেনিসের সেই কাঠের ভিত্তি আজও অবিশ্বাস্যভাবে টিকে আছে, যা শহরের স্থায়িত্ব ও ইতিহাসের অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রেফারেন্স:

Related posts

ভারতের বিহার: গৌতম বুদ্ধের দেশ থেকে অপরাধের রাজ্য

বিপ্লবের শহর- কিয়েভ

আশা রহমান

ডাবলিন: ভালোবাসা ও তারুণ্যের এক শহর

Leave a Comment

Table of Contents

    This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More