ভুটান পৃথিবীর একমাত্র দেশ যারা পরিবেশ রক্ষায় এতটাই কঠোর যে, তাদের দেশের অন্তত ৬০ শতাংশ এলাকা সবসময় বনাঞ্চল থাকতে হবে বলে সংবিধানে বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
ভূমিকা
হিমালয়ের সুউচ্চ পর্বতশৃঙ্গের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক মায়াবী ভূখণ্ডের নাম ভুটান। শান্ত পরিবেশের এই দেশটিকে বলা হয় ‘ল্যান্ড অফ দ্য থান্ডার ড্রাগন’ বা ‘বজ্র ড্রাগনের দেশ’। যখন সারা বিশ্ব জিডিপি বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পেছনে অন্ধের মতো ছুটছে, তখন ভুটান একমাত্র দেশ যারা মেপে দেখে তাদের নাগরিকরা কতটা সুখে আছে। স্বচ্ছ বাতাস, সবুজে ঢাকা পাহাড় আর মানুষের অকৃত্রিম হাসি ভুটানকে পৃথিবীর বুকে এক অনন্য স্বর্গে পরিণত করেছে। আজকের এই আর্টিকেলে আমরা জানবো আধুনিক পৃথিবীর ব্যস্ততা থেকে দূরে থাকা এই সুখী দেশ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য।
এক নজরে ভুটানের মৌলিক তথ্য:
| রাজধানী: | থিম্পু |
| জনসংখ্যা: | প্রায় ৮ লক্ষের কাছাকাছি |
| সরকারি ভাষা: | জংখা |
| মুদ্রা: | গুলট্রাম। তবে ভারতীয় রুপিও এখানে চলে |
| সময় অঞ্চল: | UTC+6 (বাংলাদেশের সময়ের সমান) |
অবস্থান ও ভৌগোলিক রূপ
ভুটান দক্ষিণ এশিয়ার একটি ছোট স্থলবেষ্টিত রাষ্ট্র। ভৌগোলিকভাবে এর অবস্থান হিমালয় পর্বতমালার পূর্ব অংশে। ভুটানের উত্তরে চীনে তিব্বত অঞ্চল এবং দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিমে ভারতের সীমানা অবস্থিত। দেশটির আয়তন প্রায় ৩৮,৩৯৪ বর্গ কিলোমিটার। ভূ-প্রকৃতি মূলত পাহাড়ি। এখানে কোনো সমতল ভূমি নেই বললেই চলে। উঁচু পাহাড় আর গভীর উপত্যকা এই দেশের মূল বৈশিষ্ট্য। ভুটানের জলবায়ু অঞ্চলভেদে ভিন্ন। দক্ষিণের নিচু অঞ্চলে ক্রান্তীয় আবহাওয়া থাকলেও উত্তরাঞ্চলের পাহাড়ি এলাকায় সারা বছর তুষারপাত হয়।
ম্যাপ
ভুটানের ইতিহাস ও নামকরণ
ভুটান একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ। আশ্চর্যের বিষয় হলো, ভুটান কোনোদিন কোনো বিদেশি শক্তির উপনিবেশ ছিল না। প্রাচীনকালে ভুটান অনেকগুলো ছোট ছোট এলাকায় বিভক্ত ছিল। ১৭শ শতাব্দীতে তিব্বতি লামা জাবদ্রুং নাওয়াং নামগিয়াল ভুটানকে ঐক্যবদ্ধ করেন এবং দেশটিকে স্বতন্ত্র রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। ভুটানিরা তাদের দেশকে ‘দ্রুক ইউল’ (Druk Yul) বলে ডাকে, যার অর্থ ‘বজ্র ড্রাগনের দেশ’। হিমালয়ের ভয়ংকর বজ্রপাতের শব্দের কারণেই এই নামকরণ করা হয়েছে।
ভুটান কেন সুখী দেশ: গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস কী?
ভুটান সম্পর্কে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো তারা কতটা সুখী। আসলে ‘সুখ’ শব্দটিকে ভুটান কেবল কথার কথা হিসেবে নেয় না, বরং এটি তাদের রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ভিত্তি। ১৯৭২ সালে ভুটানের চতুর্থ রাজা জিগমে সিংয়ে ওয়াংচুক ‘গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস’ এর ধারণা প্রবর্তন করেন। তার মতে, বস্তুবাদী উন্নতির চেয়ে মানসিক ও আধ্যাত্মিক প্রশান্তি বেশি জরুরি।
জিএনএইচ-এর চারটি প্রধান স্তম্ভ রয়েছে:
১. সুশাসন।
২. টেকসই আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন।
৩. সাংস্কৃতিক সংরক্ষণ।
৪. পরিবেশ সংরক্ষণ।
ভুটান পৃথিবীর একমাত্র দেশ যারা পরিবেশ রক্ষায় এতটাই কঠোর যে, তাদের দেশের অন্তত ৬০ শতাংশ এলাকা সবসময় বনাঞ্চল থাকতে হবে বলে সংবিধানে বাধ্যবাধকতা রয়েছে। বর্তমানে তাদের ৭০ শতাংশেরও বেশি এলাকা বনাঞ্চল। ভুটান পৃথিবীর একমাত্র ‘কার্বন নেগেটিভ’ দেশ, অর্থাৎ তারা যতটুকু কার্বন নিঃসরণ করে তার চেয়ে বেশি শোষণ করে নেয়।

ভুটানের ধর্ম ও সমাজব্যবস্থা
ভুটানের প্রধান ধর্ম হলো বৌদ্ধধর্ম। এখানকার মানুষ মূলত মহাযান বৌদ্ধ মতবাদে বিশ্বাসী। ভুটানের প্রতিটি পাহাড়ের চূড়ায় বা নদীর মোড়ে ড্রাগন আঁকা পতাকা এবং প্রার্থনালয় দেখতে পাওয়া যায়। সমাজব্যবস্থায় ধর্মীয় গুরু ও মঠগুলোর গভীর প্রভাব রয়েছে। ভুটানের আইনসভার নাম ‘তশোগদু’ । আগে এটি রাজতন্ত্র থাকলেও ২০০৮ সালে দেশটি সাংবিধানিক রাজতন্ত্রে রূপান্তরিত হয়, যেখানে রাজার পাশাপাশি নির্বাচিত সংসদ দেশ পরিচালনা করে।
ভুটানের সংস্কৃতি, মানুষ ও জীবনযাত্রা
ভুটানের মানুষ নম্র, লাজুক এবং অতিথিপরায়ণ। সুখী দেশ হওয়ায় তাদের জীবনযাত্রাও বেশ সহজ-সরল। এছাড়া ভুটানের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতি দেশের মানুষের রয়েছে অগাধ শ্রদ্ধা ও ভালবসা। ভুটানের পুরুষদের পোশাককে বলা হয় ‘ঘো’ এবং নারীদের পোশাককে বলা হয় ‘কিরা’। স্কুল, সরকারি অফিস বা যেকোনো আনুষ্ঠানিক স্থানে ভুটানিদের জন্য তাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরা বাধ্যতামূলক।
ভুটানের মানুষের প্রধান খাবার হলো ভাত এবং মরিচ। তাদের সব বিখ্যাত খাবারে প্রচুর মরিচ ব্যবহার করা হয়। তাদের সবচেয়ে জনপ্রিয় খাবারের নাম ‘এমা দাতশি’ , যা মূলত লঙ্কা ও পনির দিয়ে তৈরি। তামাক ও ধূমপান এই দেশে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, যা বিশ্বের অন্য কোথাও সচরাচর দেখা যায় না।
ভুটানি সংস্কৃতিতে কেউ যদি আপনাকে খাবার সেধে থাকেন, তবে প্রথমবারেই তা গ্রহণ করাকে অভদ্রতা মনে করা হয়। তাদের নিয়মানুযায়ী আপনাকে মুখে হাত দিয়ে বিনয়ের সাথে ‘মেশু মেশু’ বলে না করতে হবে। আয়োজক যখন দ্বিতীয় বা তৃতীয়বার সাধবেন, তখনই কেবল আপনি খাবারটি গ্রহণ করতে পারবেন।
ভুটানের মানুষ নিজেদের বিশ্বাসের ব্যাপারে কতটা দৃঢ়, তা একটি উদহারণ দিলেই বুঝতে পারবেন। ‘গ্যাংখার পুয়েনসুম’ হলো বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ ৭,৫৭০ মিটার, যার চূড়ায় আজ পর্যন্ত কোনো মানুষ ওঠেনি। ভুটানিরা পর্বতকে দেবতাদের পবিত্র বাসস্থান মনে করে, তাই ২০০৩ সাল থেকে সেখানে যেকোনো ধরনের পর্বত আরোহণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

ভুটানের প্রকৃতি ও পরিবেশ
ভুটান কি সুন্দর দেশ? যারা একবার সেখানে গিয়েছেন, তারা বলবেন পৃথিবীর সুন্দরতম দেশগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। এখানে পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে যায় খরস্রোতা সব নদী যেমন ওয়াং চু, পুনাৎ সাং চু। ভুটানে গেলে মনে হবে প্রকৃতি দেশটিতে তার সবটুকু রূপ ঢেলে দিয়েছে। বসন্তকালে রডোডেনড্রন ফুলে ছেয়ে যায় পাহাড় আর শীতকালে সাদা বরফে ঢাকা পড়ে থিম্পু থেকে পারো। পাহাড়ের মাঝে ছোট ছোট গ্রাম আর সেখানে কাঠের তৈরি কারুকার্যময় বাড়িগুলো দেখলে মনে হবে কোনো ছবির ফ্রেম।
পর্যটকদের কাছে ভুটান এক স্বপ্নের দেশ। তবে ভুটান সরকার পর্যটনের ক্ষেত্রে ‘উচ্চ মান, স্বল্প প্রভাব’ নীতি অনুসরণ করে যাতে পর্যটকদের ভিড়ে তাদের পরিবেশ নষ্ট না হয়। ভুটান ভ্রমণের সবচেয়ে ভালো সময় হলো বসন্তকাল (মার্চ থেকে মে) এবং শরৎকাল (সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর)। এই সময় আকাশ পরিষ্কার থাকে এবং হিমালয়ের চূড়াগুলো স্পষ্ট দেখা যায়।
চলুন ঘুরে আসি ভুটানের সেরা ভ্রমণের স্থানগুলো থেকে-
থিম্পু:
জানলে অবাক হবেন, থিম্পু পৃথিবীর একমাত্র রাজধানী যেখানে কোনো ট্রাফিক সিগন্যাল নেই। এখানকার প্রধান আকর্ষণ হলো বুদ্ধ ডর্ডেনমা (বিশাল সোনালি বুদ্ধ মূর্তি), ন্যাশনাল মেমোরিয়াল চোরতেন এবং তাসিছো জং।

পারো:
হিমালয়ের কোলে গড়ে ওঠা এই সুন্দর শহরেই রয়েছে ভুটানের একমাত্র আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। পারোর অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো ‘টাইগার্স নেস্ট’ বা পারো তাকৎসাং। পাহাড়ের প্রায় ৩০০০ ফুট উঁচুতে একটি খাড়া পাহাড়ের গায়ে এই মঠটি অবস্থিত। এখানে পৌঁছাতে পাহাড় বেয়ে ট্রেকিং করতে হয় যা পর্যটকদের জন্য অত্যন্ত রোমাঞ্চকর।
পুনাখা:
এক সময় এটি ভুটানের রাজধানী ছিল। এখানকার পুনাখা জং বিশ্বের অন্যতম সুন্দর স্থাপত্য। দুটি নদীর মিলনস্থলে এই জংটি অবস্থিত।
ফোবজিকা ভ্যালি:
যদি আপনি প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং শান্ত পরিবেশ পছন্দ করেন, তবে এই উপত্যকাটি আপনার মন জয় করবে। শীতকালে এখানে সাইবেরিয়া থেকে আসা ব্লাক-নেকড ক্রেন বা বিরল সারস পাখি দেখা যায়।

ভুটান যাওয়ার খরচ
বাংলাদেশ থেকে সড়কপথ ও আকাশপথ দুইভাবেই ভুটান যাওয়া যায়। সড়কপথে বুড়িমারী বর্ডার দিয়ে ভারতের চ্যাংড়াবান্ধা হয়ে জয়গাঁও বর্ডার দিয়ে ভুটানে প্রবেশ করা যায়। বাংলাদেশিদের জন্য ভুটান ভ্রমণে আগে ফ্রি এন্ট্রি থাকলেও বর্তমানে দৈনিক ‘সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট ফি’ (SDF) প্রদান করতে হয়। তবে অন্যান্য বিদেশি পর্যটকদের চেয়ে দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর নাগরিকদের জন্য এই ফি কিছুটা কম। খরচ নির্ভর করে আপনি কতদিন থাকবেন এবং কেমন হোটেলে থাকবেন তার ওপর। গড়ে ৫-৭ দিনের ভ্রমণের জন্য জনপ্রতি ৪০ থেকে ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে।
উপসংহার
ভুটান দেশটি সারা বিশ্বের জন্য এক বড় অনুপ্রেরণা। যে সময়ে মানুষ প্রকৃতির বিনাশ ঘটিয়ে উন্নয়ন খুঁজছে, সেখানে ভুটান দেখিয়ে দিয়েছে কীভাবে প্রকৃতিকে ভালোবেসেও মানুষ শান্তিতে ও সুখে থাকতে পারে। তাদের শান্ত জীবনযাপন, আধ্যাত্মিক চিন্তা এবং পরিবেশের প্রতি দায়বদ্ধতা ভুটানকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী দেশে পরিণত করেছে। আপনি যদি নিজের মধ্যে শান্তির খোঁজ করতে চান, তবে ভুটান আপনার জন্য সেরা গন্তব্য।
ভুটান সম্পর্কে কিছু মজার তথ্য
- ট্রাফিক সিগন্যালহীন শহর: থিম্পু হলো বিশ্বের একমাত্র আধুনিক রাজধানী যেখানে কোনো ট্রাফিক সিগন্যাল নেই। এখানে পুলিশ হাতের ইশারায় ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করে।
- টেলিভিশন ও ইন্টারনেটের আগমন: ১৯৯৯ সালের আগে ভুটানে টেলিভিশন ও ইন্টারনেট সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল।
- প্লাস্টিক মুক্ত দেশ: পরিবেশ রক্ষায় ১৯৯৯ সাল থেকেই ভুটানে প্লাস্টিক ব্যাগ ব্যবহার নিষিদ্ধ।
- জন্মদিনের সংস্কৃতি: ভুটানের অনেক মানুষ তাদের সঠিক জন্ম তারিখ জানেন না। তাই নতুন বছরের প্রথম দিনেই সবাই আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের বয়স এক বছর বাড়িয়ে নেন!
- ফ্রি হেলথ কেয়ার: ভুটানের নাগরিক ও পর্যটকদের জন্য প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে প্রদান করা হয়।
- অদ্ভুত জাতীয় প্রাণী: ভুটানের জাতীয় প্রাণীর নাম হলো ‘টাকিন’। এই প্রাণীটি দেখতে বেশ অদ্ভুত—এর মুখটা অনেকটা ছাগলের মতো আর শরীরটা গরুর মতো!
Reference:

