Image default
উত্তর আমেরিকাদেশ পরিচিতি

মেক্সিকো – পৌরাণিক সভ্যতার দেশ

মেক্সিকোতে গেলে নাকি টাকোর জন্য আলাদা একটা পাসপোর্ট লাগে! একবার ঢুকলেই এক টাকো, দুই টাকো, তিন টাকোতেই পুরো মেক্সিকোর টেস্ট শুরু!

মেক্সিকো, নামটি উচ্চারণ করার সাথে সাথে অনেকের মনে আসবে রঙিন উৎসব, সুস্বাদু খাবার, এবং প্রাচীন সভ্যতার অমর কীর্তি কথা। কিন্তু, মেক্সিকো কি শুধুই টাকো আর আভ্যাকাডোর দেশ? কেন মেক্সিকো বিশ্বের ১৪তম বৃহত্তম দেশ হয়েও এত গুরুত্ব বহন করে? কর্কট ক্রান্তীয় রেখা মেক্সিকোর জলবায়ুকে কিভাবে ভেঙে ফেলেছে? কিংবা মেক্সিকোর ঐতিহ্যবাহী উৎসব, সংগীত, নৃত্য, এবং খাদ্য কেন  বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে?

এই ব্লগে আমরা মেক্সিকোর এই সকল দিক নিয়ে গভীরভাবে আলোচনা করব। তার ভূগোল থেকে শুরু করে ইতিহাসের পাতা, রাজনীতির গুঞ্জন থেকে অর্থনীতির শক্তিশালী খাতগুলো, সংস্কৃতির রঙিন ছোঁয়া থেকে পর্যটনের আকর্ষণীয় স্থানসমূহ সবকিছুই আমরা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরবো। তাহলে চলুন, মেক্সিকোর এই রোমাঞ্চকর যাত্রায় আমাদের সাথে যোগ দিন আর আবিষ্কার করুন কেন মেক্সিকো বিশ্ব মানচিত্রে অনন্য দেশ হিসেবে পরিচিত। 

রাজধানী মেক্সিকো সিটি
সরকারি ভাষা স্প্যানিশ
জনসংখ্যা  প্রায় ১২৮ মিলিয়ন
আয়তন প্রায় ১৯, ৭২, ৫৫০ বর্গকিলোমিটার 
মুদ্রা মেক্সিকান পেসো (MXN)
সময় অঞ্চল UTC-6, UTC-7, UTC-8

ভৌগোলিক জনসংখ্যা, আয়তন ও জলবায়ু

মেক্সিকোর জলবায়ু

উত্তর আমেরিকার দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত মেক্সিকোর আয়তন প্রায় ১৯ লাখ ৭২ হাজার ৫৫০ বর্গকিলোমিটার। এটি বিশ্বের ১৪তম বৃহত্তম দেশ। দেশটির উত্তরে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র আর দক্ষিণে গুয়াতেমালা ও বেলিজের। জেনে অবাক হবেন, দেশটির ৯ হাজার ৩৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ সমুদ্র উপকূল।

কর্কট ক্রান্তীয় রেখা মেক্সিকোকে সযত্নে দুই ভাগে ভাগ করে রেখেছে। এক পাশে রয়েছে নাতিশীতোষ্ণ আর অন্যপাশে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চল। উত্তরের শীত থেকে দক্ষিণের স্থির উষ্ণতা, এমন বৈচিত্র্যময় পরিবেশ প্রকৃতির অসামান্য সৃষ্টি!

দেশটির উত্তর দিকে শীতের মৌসুমী ঠাণ্ডা হাওয়া বইতে থাকে, আর দক্ষিণ দিকে সারা বছরই থাকে নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ু। পাহাড়ি এলাকাগুলোতে উচ্চতার পরিবর্তনের সঙ্গে তাপমাত্রারও তারতম্য দেখা যায়। তবে, দেশ জুড়ে এই বৈচিত্র্যকে আরও আকর্ষণীয় করেছে সামুদ্রিক বাতাস। 

এই বাতাস প্রতি বছর মে থেকে আগস্টের মধ্যে বৃষ্টি নিয়ে আসে। দক্ষিণের গ্রীষ্মমণ্ডলীয় নিম্ন ভূমিগুলোতে তো বছরে প্রায় ২০০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়। তখন মনে হয়, প্রকৃতি যেন এখানে খুশির বর্ষা-উৎসব করছে। 

মেক্সিকোর জঙ্গলে হারিয়ে যাওয়া মায়ান শহর

মেক্সিকোর উত্তর মরুভূমির এলাকা। সোনোরান মরুভূমিতে তাপমাত্রা কখনও কখনও ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যায়। আরও অবাক করা ব্যাপার হলো, মেক্সিকোতে সাতটি প্রধান জলবায়ু অঞ্চল রয়েছে! যেখানে দেশের দক্ষিণে উপকূলীয় অঞ্চলে পাওয়া যায় উষ্ণ, উপ-আর্দ্র জলবায়ু, আর উত্তরের কিছু অঞ্চলে শুষ্ক আর মরুভূমির রূপ দেখা যায়।

মেক্সিকোর আরও মজার দিক হলো, অঞ্চলভেদে শীত-গ্রীষ্মের আবহাওয়াতে ভিন্নতা এতটাই বিস্ময়কর যে বিশ্বের অন্য কোনো জায়গায় এরকম বৈচিত্র্যময় আবহাওয়া সহজে পাওয়া যায় না। এই অনন্য বৈচিত্র্য আর প্রাকৃতিক শক্তির মেলবন্ধন সত্যিই মেক্সিকোকে করে তুলেছে এক অনন্য পরিবেশ বৈচিত্র্যের দেশ।

মেক্সিকো বিশ্বের সবচেয়ে বেশি আগ্নেয়গিরির দেশ। মেক্সিকোর বেশিরভাগ অঞ্চলই পর্বতময়। এই কারণে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি আগ্নেয়গিরির দেশ হওয়া অবাক করার মত কিছু না। মজাদার তথ্য হলো, এখানে বিশ্বের সবচেয়ে ছোট আগ্নেয়গিরিও পাওয়া যায়। পুয়েবলার কাছে কুয়েক্সকোমাতে অবস্থিত এই আগ্নেয়গিরির উচ্চতা মাত্র ৪৩ ফুট। তবে এটি এখন সক্রিয় না।  

ম্যাপ

মেক্সিকোর ইতিহাস 

মেক্সিকোর ইতিহাস

মেক্সিকোর ইতিহাস যেন এক রঙিন কাহিনী। এই ইতিহাস আলোকবর্ষ পেরিয়ে আসা পুরনো সভ্যতা আর তাদের অবিস্মরণীয় স্থাপত্য, ধর্ম-বিশ্বাস আর যুদ্ধের গল্পে পরিপূর্ণ। প্রায় হাজার হাজার বছর ধরে মেক্সিকোর মাটি সাক্ষী হয়ে আছে, পৃথিবীর বুকে গভীর ছাপ রেখে যাওয়া সেই সব সভ্যতার। 

এই গল্পের শুরু আনুমানিক জন্ম ১২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ওলমেক সভ্যতার হাত ধরে। ওলমেকদের প্রাচীন মেসো-আমেরিকার প্রথম সভ্যতা হিসেবে ধরা হয়। এরপর আসে মায়া সভ্যতা। যাদের আবিষ্কৃত গণিত আর জ্যোতির্বিজ্ঞান আজকের বিজ্ঞানীদের কাছে এখনও বিষয় হয়ে রয়েছে। মায়ারা তাদের তীক্ষ্ণ বুদ্ধি আর স্থাপত্যশৈলী আজও সবাইকে অবাক করে। আর ঠিক এরপরই আসে অ্যাজটেকরা। অ্যাজটেকরা দেশটির টেনোচটিটলান অঞ্চলকে কেন্দ্র করে এক সুবিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিল। 

তবে ১৫১৯ সালে স্পেনের অভিযাত্রী হেরনান কর্টেজ এসে যখন এই চিরস্থায়ী সাম্রাজ্যের পেছনে ছুরি ঢুকালেন, তখন গোটা পৃথিবী যেন থমকে গেল। অ্যাজটেকদের যোদ্ধারা প্রাণ দিল, কিন্তু টেনোচটিটলান রক্ষা করতে পারলেন না। মেক্সিকো চলে গেলো স্পেনের হাতে। দেশটিতে প্রায় তিনশো বছর ধরে স্পেনের শাসন স্থায়ী হলো। এই সময়ে মেক্সিকোর মাটি দেখলো পরিবর্তনের ঢেউ। স্প্যানিশরা নিয়ে এল খ্রিস্টধর্ম, এমনকি বদলে দিল মেক্সিকোর ভাষা আর সংস্কৃতি। 

১৯ শতকের ওল্ড মেক্সিকো

কিন্তু মেক্সিকো এত সহজে হার মানার দেশ নয়। ১৮১০ সালে, মিগুয়েল ইদালগো নামে একজন ধর্মযাজক স্পেনের শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ডাক দিলেন। গ্রামের সাধারণ মানুষের কণ্ঠে যুক্ত হলো সাহসিকতার গান। দীর্ঘ ১১ বছরের সংগ্রাম শেষে ১৮২১ সালে মেক্সিকো স্বাধীনতার পতাকা উড়ালো। স্বাধীনতার পরপরই দেখা দিল অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, শাসকের পরিবর্তন, আর যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যুদ্ধ। ২০ শতকে শুরু হলো দেশটির এক নতুন অধ্যায়; মেক্সিকান বিপ্লব। এই বিপ্লব গোটা দেশকে নতুন আলোয় রাঙিয়ে দিল। বিপ্লবে ভূমি সংস্কার আর মানুষের অধিকারের বিজয় হলো।

আজকের মেক্সিকো এক সংস্কৃতির যাদুঘর, এক ইতিহাসের ক্যানভাস। প্রাচীন সভ্যতার পিরামিড থেকে শুরু করে আধুনিক শহরের আলোক ঝলমলে দৃশ্য, সব যেন এই জায়গায় এসে মিলে গেছে। মেক্সিকোতে গেলে মনে হবে যেন সেই সভ্যতাগুলো আজও বেঁচে আছে। 

মেক্সিকোর শাসনব্যবস্থা ও রাজনীতি

মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লডিয়া শেনবাউম

মেক্সিকো একটি ফেডারেল রিপাবলিক দেশ। এখানকার শাসনব্যবস্থা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে। তবে প্রতিটি রাজ্যেও নিজস্ব সরকার ব্যবস্থা আছে। দেশটিতে মোট ৩১ টি রাজ্য এবং একটি ফেডারেল অঞ্চল আছে।

মেক্সিকোর প্রধান নেতা হলেন রাষ্ট্রপতি। প্রতি ছয় বছর পর সরাসরি ভোট দিয়ে একজন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়। মেক্সিকোর নিয়ম অনুসারে, একজন রাষ্ট্রপতি জীবনে একবারই ক্ষমতায় আসতে পারেন। অর্থাৎ তিনি আর কখনো পরবর্তী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন না। 

রাজনীতির মাঠে মেক্সিকোতে তিনটি বড় দল আছে। এরা হল PRI, PAN এবং মোরেনা। PRI দল বহু বছর ধরে ক্ষমতায় ছিল। এখন মোরেনা সবচেয়ে শক্তিশালী দল হিসেবে পরিচিত। বর্তমানে এই দলের নেতা হলেন বর্তমান রাষ্ট্রপতি ক্লডিয়া শেনবাউম । তিনি মেক্সিকোর ৬৬ তম এবং মেক্সিকোর ইতিহাসের প্রথম নারী রাষ্ট্রপতি।   

মেক্সিকোর অর্থনীতি

মেক্সিকোর অর্থনীতি

মেক্সিকো উত্তর আমেরিকার অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ। এই দেশের অর্থনীতি বিভিন্ন খাতের উপর যেমন তেল, উৎপাদন, কৃষি, পর্যটন এবং সেবা খাতগুলোর উপর নির্ভরশীল। মেক্সিকো যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বাণিজ্যিক অংশীদার। তাদের মধ্যে থাকা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি, NAFTA (বর্তমানে USMCA), দেশটির অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করেছে।

সেবা খাত

সেবা খাত মেক্সিকোর অর্থনীতির প্রধান চালিকা শক্তি ও সবচেয়ে বড় খাত। মেক্সিকোর সেবা খাতটি দেশের অর্থনীতিতে প্রায় ৬০% অবদান রাখে। ব্যাংকিং, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং তথ্যপ্রযুক্তি পরিষেবাগুলো সেবা খাতের মূল স্তম্ভ। 

সাম্প্রতিক বছরে ই-কমার্স ও ডিজিটাল ব্যাংকিং খাতে দ্রুত প্রবৃদ্ধি হয়েছে।  এই খাতটি থেকে বছরে প্রায় ৬০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় হয়। প্রযুক্তি খাতের সম্প্রসারণের ফলে নতুন স্টার্টআপ এবং আইটি সেবা প্রদানকারী কোম্পানিগুলি মেক্সিকোর অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে।

তেল ও খনিজ সম্পদ

মেক্সিকোর অর্থনীতির প্রধান স্তম্ভগুলোর মধ্যে রয়েছে তেল এবং খনিজ সম্পদ। দেশটির মোট জিডিপির ১০% আর রপ্তানি আয়ের প্রায় ১৭% আসে এই খাত থেকে। Pemex, মেক্সিকোর রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি। এই কোম্পানি বছরে প্রায় ৫৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের তেল রপ্তানি করে। এই তেল খাত দেশের রাজস্ব বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান উৎস। মেক্সিকো তেল উৎপাদনকারী শীর্ষ দশটি দেশের মধ্যে একটি। এছাড়াও, মেক্সিকো রূপা ও তামা উৎপাদনে বিশ্বে শীর্ষস্থানে অবস্থান করছে।

উৎপাদন খাত

মেক্সিকোর উৎপাদন খাত অত্যন্ত শক্তিশালী, বিশেষ করে গাড়ি এবং ইলেকট্রনিক্স শিল্পে। দেশটি গাড়ি উৎপাদনে বিশ্বের ৬ষ্ঠ বৃহৎ উৎপাদক। প্রতিবছর মেক্সিকো গাড়ি রপ্তানি করে প্রায় ৫৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করে। মজুরি তুলনামূলক কম হওয়ায় ফোর্ড, টয়োটা, এবং জেনারেল মোটরসের মতো বড় বড় গাড়ি প্রস্তুতকারক কোম্পানি মেক্সিকোতে তাদের কারখানা স্থাপন করেছে। এই খাত সমগ্র অর্থনীতিতে প্রায় ১৮% অবদান রাখে।  এই খাত দেশের জনগণের জন্য প্রায় ২০% কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে।

কৃষি খাত

মেক্সিকো কফি, টমেটো এবং এভোকাডো উৎপাদনে বিশ্বজুড়ে পরিচিত। মেক্সিকো বিশ্বের শীর্ষ এভোকাডো উৎপাদনকারী দেশ। এভোকাডো রপ্তানি করে বছরে প্রায় ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করে। এজন্যই এভোকাডোকে “সবুজ সোনা” বলা হয়। এছাড়াও টমেটো এবং কফি রপ্তানিতেও মেক্সিকো শীর্ষে রয়েছে। কৃষি খাতটি মেক্সিকোর মোট জিডিপিতে প্রায় ৪% অবদান রাখে এবং কর্মসংস্থানের প্রায় ১৩% আসে এই খাত থেকে। 

পর্যটন খাত

মেক্সিকোর পর্যটন শিল্প

মেক্সিকোর পর্যটন খাত থেকে দেশের মোট জিডিপির প্রায় ৮% আসে। কানকুন, পুয়ের্তো ভাল্লার্টা, এবং প্লায়া দেল কারমেনের মতো স্থানগুলোতে প্রতি বছর প্রায় ৪০ মিলিয়ন পর্যটক আসে। পর্যটন খাত থেকে  বছরে প্রায় ২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় হয়। এই খাত স্থানীয় জনগণের জন্য প্রায় ৪ মিলিয়ন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে।

তবে, মেক্সিকোর অর্থনীতি এখনো বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, যেমন আয় বৈষম্য, বেকারত্ব, এবং মুদ্রাস্ফীতি। সরকার এই সব মোকাবেলার জন্য নানান অর্থনৈতিক সংস্কার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। 

মেক্সিকোর সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য

মেক্সিকোর সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য

মেক্সিকোতে হাজার বছরের পুরনো আদিবাসী ঐতিহ্য আর স্প্যানিশ ঔপনিবেশিক সংস্কৃতি একত্রে মিলিত হয়েছে। এই দেশটি তার কারুশিল্প, উৎসব, নৃত্য, খাদ্য, আর বিভিন্ন সাংস্কৃতিক চর্চার জন্য পরিচিত। মেক্সিকোর প্রাচীন মায়া ও আজটেক সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ এখনো সারা বিশ্বকে মুগ্ধ করে। জেনে অবাক হবেন, মেক্সিকোতেও পিরামিড রয়েছে। চিচেন ইৎজা এবং তেওতিহুয়াকান এর পিরামিডগুলো অতীতের ইতিহাসকে আজও জীবন্ত রাখে।

দিয়া দে লোস মুয়ের্তোস’ বা ‘মৃত্যু দিবস

মেক্সিকোর সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের মূল আকর্ষণ হলো এর বিভিন্ন রঙিন উৎসব। ‘দিয়া দে লোস মুয়ের্তোস’ বা ‘মৃত্যু দিবস’ মেক্সিকোর একটি বিখ্যাত উৎসব। প্রতি বছর ১ ও ২ নভেম্বর এই উৎসব পালিত হয়। এর মূল উদ্দেশ্য হলো প্রয়াত আত্মীয়স্বজন ও প্রিয়জনদের স্মরণ করা। মেক্সিকান সংস্কৃতিতে বিশ্বাস করা হয়, এই বিশেষ দিনগুলোতে মৃত আত্মারা জীবিতদের মাঝে ফিরে আসে এবং পরিবারের সাথে কিছু সময় কাটায়। 

এই উপলক্ষে বাড়ি ও কবরস্থানে রঙিন ফুল, মোমবাতি, মিষ্টান্ন, আর প্রিয়জনের প্রিয় খাবার সাজিয়ে তাদের স্মরণ করা হয়। এই উৎসবে বিশেষ আকর্ষণ হলো ‘সুগার স্কাল’ বা চিনির মাথার খুলি। এই উৎসব নিয়ে একটি অসাধারণ সিনেমাও রয়েছে। “The Book of life” নামের এই সিনেমাটি মেক্সিকোর মৃত্যু উৎসব নিয়ে আপনাকে ‘ওয়ান্স ইন এ লাইফটাইম’ অভিজ্ঞতা দিবে।

সংগীত ও নৃত্য

মেক্সিকোর ঐতিহ্যবাহী ‘জারাবে তাপাতিও’ নৃত্য

মেক্সিকোর সংস্কৃতির অন্যতম গর্ব হলো তাদের ঐতিহ্যবাহী সংগীত ও নৃত্য। বিশেষ করে ‘মারিয়াচি’ সংগীত ও ‘জারাবে তাপাতিও’ নৃত্য। ‘মারিয়াচি’ মূলত মেক্সিকোর রাঞ্চো বা গ্রামীণ জীবনের গানে পরিণত হয়েছে। এই গান করা হয় সুর, গিটার, ট্রাম্পেট আর ভায়োলিনের সমন্বয়ে। শিল্পীরাও ঐতিহ্যবাহী ও রঙিন পোশাক পরে। গানের প্রতিটি সুরে মেক্সিকোর ইতিহাস, ভালোবাসা, আর জীবনের সংগ্রামের গল্প ফুটে ওঠে।

জারাবে তাপাতিও’ মেক্সিকোর ঐতিহ্যবাহী নৃত্য। এটি ‘মেক্সিকান হ্যাট ড্যান্স’ নামেও পরিচিত। এই নাচে পুরুষ ও নারী নৃত্যশিল্পীরা ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে বিশেষ এক ছন্দে নাচেন। পুরুষদের বড় হ্যাট এবং নারীদের রঙিন স্কার্ট নাচটিকে আরো আকর্ষণীয় করে তোলে। এই নাচ মূলত প্রেমের প্রতীক। 

মেক্সিকোর খাবার

মেক্সিকোর ঐতিহ্যবাহী খাবার

খাদ্যও মেক্সিকোর সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এখানে প্রতিটি খাবারের পেছনে থাকে একটি গল্প, একটি বিশেষ ঐতিহ্য। টাকোস, বুরিতোস, এনচিলাডাস, আর তামালের মতো খাবার মেক্সিকোর পাশাপাশি সারা বিশ্বে জনপ্রিয়। 

টাকোতে থাকে মাংস বা সবজি, তাজা লেটুস আর নানা ধরনের সসের সংমিশ্রণ। এটির স্বাদ একেবারেই স্থানীয়। 

বুরিতো আর এনচিলাডাতে থাকে মসলাযুক্ত  মাংস, ডাল, আর চিজ। তামাল হল ভুট্টার খোসায় মোড়ানো একপ্রকার স্ন্যাকস। এটা মাংস, পনির এবং মসলা দিয়ে তৈরি করা হয়। তামাল বহু প্রাচীনকালের খাবার। এই খাবার আজও মেক্সিকোর ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে টিকে আছে। 

মেক্সিকোর রান্নায় ‘চিলি’, ‘লেমন’, ‘ধনে পাতা’, আর ‘অ্যাভোকাডো’র মতো মসলা প্রায়ই ব্যবহৃত হয়। এই মসলার ব্যবহার স্থানীয় স্বাদকে পুরোপুরি ফুটিয়ে তোলে।

মেক্সিকোর জাতীয় পাখি

গোল্ডেন ঈগল মেক্সিকোর ঐতিহ্যের অংশ। এটি মেক্সিকোর জাতীয় পাখি। এই পাখি দেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। প্রাচীন আজটেকরা বিশ্বাস করতো যে, ঈগলটি তাদের শহরের উপর উড়তে থাকলে দেবতার আশীর্বাদ তাদের উপর বজায় থাকবে। আজও মেক্সিকোর পতাকায় গোল্ডেন ঈগলের চিত্র দেখা যায়, যেখানে পাখিটি একটি সাপ ধরে আছে। এই পাখিটি বিশ্বে সবচেয়ে শক্তিশালী শিকারি পাখি, এবং মেক্সিকোর পার্বত্য অঞ্চলে এটি সহজেই দেখা যায়। গোল্ডেন ঈগল মেক্সিকোর স্বাধীনতা, শক্তি ও গৌরবের প্রতীক। 

মেক্সিকোর জাতীয় পাখি

রঙিন টিভির আবিষ্কার: মেক্সিকোর অবদান

বর্তমান জীবনে টেলিভিশন একটি অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন ধরনের শো, খবর, সিনেমা, এবং সিরিয়াল আমাদের দৈনন্দিন জীবনের এক অংশ হয়ে উঠেছে। কিন্তু কখনো কি ভেবেছেন, এই প্রযুক্তি কোথায় এবং কিভাবে প্রথম এসেছে? সাধারণত আমরা জানি, টেলিভিশন প্রযুক্তি প্রথম আবিষ্কৃত হয়েছিল পশ্চিমা দেশগুলোতে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে। তবে একটি চমকপ্রদ তথ্য হলো, কালার টিভি প্রথম (রঙিন টেলিভিশন) আবিষ্কৃত হয়েছিল মেক্সিকোতে।

হ্যাঁ, ঠিকই শুনছেন! ১৯৬৩ সালে মেক্সিকান প্রকৌশলী গুইলহেরমো গনজালেজ ক্যামারোনা তাঁর আবিষ্কার “ট্রাইক্রোম্যাটিক সিকোয়েনশিয়াল ফিল্ড সিস্টেম” বা রঙিন টিভি প্রযুক্তি চালু করেন। তখনই প্রথম মেক্সিকোতে টিভির জনপ্রিয় অনুষ্ঠান Paraíso Infantil (শিশুদের স্বর্গ) রঙিন আকারে সম্প্রচারিত হয়েছিল। 

মেক্সিকোর প্রথম রঙিন টিভি আবিষ্কার

মেক্সিকোতে আমেরিকার প্রথম প্রিন্টিং প্রেস

আমেরিকার ছাপাখানাও মেক্সিকোর অবদান। মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক কেন্দ্রে রয়েছে “কাসা দে লা প্রিমেরা ইম্প্রেন্টা দে আমেরিকা,” যেখানে আমেরিকার প্রথম প্রিন্টিং প্রেস প্রতিষ্ঠিত হয়। আপনি এখানে এই প্রিন্টিং প্রেসটি দেখতে পাবেন।  যা ইউনিভার্সিদাদ ১৫ দ্বারা পরিচালিত একটি ভবনে রয়েছে।

বিশ্বের বৃহত্তম পিরামিডও মেক্সিকোতে

যদিও মিশরের পিরামিডগুলি সবচেয়ে বিখ্যাত তবে মেক্সিকোতেও একটি বিশাল পিরামিড রয়েছে । এটি পুয়েবলা শহরের বাইরে শোলুলা পিরামিড নামে পরিচিত। যা ভলিউমের দিক থেকে গিজার পিরামিডকেও ছাড়িয়ে গেছে। যদিও এটি  গিজার তুলনায় খুব পুরানো নয় ।

মেক্সিকোর পর্যটন আকর্ষণ

চিচেন ইত্জা (Chichen Itza)

চিচেন ইত্জা, মেক্সিকো

চিচেন ইত্জা মায়ান সভ্যতার কৃতিত্বের এক উজ্জ্বল নিদর্শন। এটি মেক্সিকোর ইউকাটান উপদ্বীপে অবস্থিত একটি বিখ্যাত প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান। এটি মায়ান সভ্যতার দ্বারা নির্মিত একটি প্রধান প্রাক-কলম্বিয়ান শহর। বর্তমানে এটি ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসাবে স্বীকৃত। জায়গাটি বিশেষভাবে সংরক্ষিত পিরামিড, মন্দির এবং অন্যান্য কাঠামোর জন্য পরিচিত যা মায়া জনগণের স্থাপত্য ও গাণিতিক জ্ঞানকে প্রদর্শন করে।

চিচেন ইতজার সবচেয়ে আইকনিক কাঠামো হল কুকুলকান পিরামিড, যা ‘এল কাস্টিলো’ নামেও পরিচিত। এই পিরামিডটি পালকযুক্ত সর্প দেবতা কুকুলকানকে উৎসর্গ করা হয়েছে। বসন্ত এবং শরৎ ঋতুতে আলো এবং ছায়ার খেলা পিরামিডের সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসে, এসময় সিড়িতে সাও রয়েছে বলে বিভ্রম তৈরি হয়।

দ্য টেম্পল অফ দ্য ওয়ারিয়র্স, গ্রেট বলকোর্ট, ক্যারাকল অবজারভেটরি এবং সেনোট সাগ্রাডো (পবিত্র সেনোট) চিচেন ইতজাতে পাওয়া অন্যান্য উল্লেখযোগ্য স্থাপনাগুলির মধ্যে রয়েছে। এর ঐতিহাসিক এবং স্থাপত্য গুরুত্বের কারণে, চিচেন ইতজা সারা বিশ্ব থেকে বিপুল সংখ্যক পর্যটকদের আকর্ষণ করে। এটি মেক্সিকোতে সর্বাধিক পরিদর্শন করা প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলির মধ্যে একটি এবং এটি প্রাচীন মায়া সভ্যতার উল্লেখযোগ্য সাফল্যের প্রমাণ।

ক্যানকুন (Cancún)

মেক্সিকোর ক্যানকুন সমুদ্র সৈকত

মেক্সিকোর সাদা বালির এই সৈকতটিতে বিশ্বের বিভিন্ন স্থান থেকে পর্যটক আসে। এখানে বিলাসবহুল রিসোর্ট, নীল সাগর এবং রাত মিলিয়ে এক চমৎকার পরিবেশের সৃষ্টি হয়। ক্যানকুনে পানির নিচের সংগ্রহশালা সমুদ্রপ্রেমীদের জন্য এক স্বপ্নের মতো। এছাড়াও এখানে স্কুবা ডাইভিংও করা যায়। 

টিউলাম (Tulum)

মেক্সিকোর টিউলাম সমুদ্র সৈকত

মেক্সিকোর আরেকটি সুন্দর সমুদ্র সৈকত হল টিউলাম। এখানে মায়া সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ দেখতে পাওয়া যায়। পাহাড়ের উপর নির্মিত মন্দির এবং নিচে সমুদ্রের ঢেউ যেন এক অপরুপ অভিজ্ঞতা দেয়। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ইতিহাস এবং আধুনিক সুযোগ-সুবিধার সমন্বয়য়ে টিউলাম অনন্য। 

টেকিলা শহর (Tequila Town)

অ্যাগেভ গাছের খামার মেক্সিকো

টেকিলা শব্দটি শুনলেই  টেকিলা পানীয়টির কথা মাথায় আসে। মেক্সিকোর এই ছোট শহরটি টেকিলা উৎপাদনের মূল কেন্দ্র। শহরটির চারপাশে রয়েছে অ্যাগেভ গাছের খামার এবং টেকিলা উৎপাদনের কারখানা। পর্যটকরা এখানে এসে টেকিলা তৈরির প্রক্রিয়া দেখতে পায় এবং টেস্টিং করতে পারে। এটি ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবেও স্বীকৃত।

গুয়াদালাজারা (Guadalajara)

মেক্সিকোর গুয়াদালাজারা শহর

মেক্সিকোর সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত গুয়াদালাজারা শহর। এটি মেরিয়াচি সঙ্গীতের জন্য বিখ্যাত। এখানে সারা বছর নানা ধরনের উৎসব পালিত হয়ে থাকে। ঐতিহ্যবাহী মেক্সিকান খাবার, শিল্পকলা এবং স্থাপত্যের সাথে পরিচিত হতে চাইলে গুয়াদালাজারা সেরা স্থান। এই শহরের কেন্দ্রে রয়েছে ঐতিহাসিক চার্চ এবং বিখ্যাত হসপিসিও ক্যাবানিয়াস। 

ফ্রিদা কাহলো মিউজিয়াম (Frida Kahlo Museum)

ফ্রিদা কাহলো মিউজিয়াম মেক্সিকো

এই জাদুঘরটি বিশ্ববিখ্যাত শিল্পী ফ্রিদা কাহলোর বাসস্থান। পরবর্তীতে তারই নামে এই মিউজিয়ামের নামকরণ হয়। “ব্লু হাউস” নামে পরিচিত এই মিউজিয়ামে তার জীবন ও শিল্পকর্মের বিভিন্ন নিদর্শন সংরক্ষিত আছে। ফ্রিদা কাহলোর রঙিন ও চমকপ্রদ চিত্রকর্ম এবং তার ব্যক্তিগত জিনিসপত্র শিল্প প্রেমিকদের আকর্ষণ করে।

কোপার ক্যানিয়ন (Copper Canyon)

কোপার ক্যানিয়ন মেক্সিকো

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর কোপার ক্যানিয়ন মেক্সিকোর আরেকটি “মাস্ট গো” স্থান। এটি গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের থেকেও বড়। এখানে পর্যটকরা ট্রেকিং, হাইকিং এবং রেলযাত্রার মাধ্যমে প্রকৃতির সংস্পর্শে আসতে পারে। 

গোলাপি হ্রদ

লাস কলোরা দাস ইউকাতান উপদ্বীপে অবস্থিত। এখানে পানি গোলাপি তুলার মতো। এবং প্রায়ই আকাশ নীল থাকে, যা এর সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে তোলে। এটি এমন একটি জায়গা যেখানে আপনি আরাম করতে পারেন এবং প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা

মেক্সিকোর শিক্ষাব্যবস্থা

মেক্সিকো শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছে। শিক্ষাব্যবস্থার দিকে তাকালে দেখা যায়, মেক্সিকো সরকার বিনামূল্যে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা প্রদান করছে। এই বাবস্থা দেশের শিশুদের মধ্যে শিক্ষার প্রসারে বড় ভূমিকা রাখছে। সরকারি বিদ্যালয়ের পাশাপাশি অনেক বেসরকারি বিদ্যালয়ও রয়েছে। তবে অনেক শিশু এখনও অর্থনৈতিক সমস্যার কারণে বিদ্যালয়ে যেতে পারে না। শিক্ষার মানে কিছুটা পার্থক্য দেখা যায় শহর ও গ্রামের মধ্যে। গ্রামের থেকে শহরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলিতে তুলনামূলকভাবে বেশি সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যায়।

মেক্সিকো সরকার নাগরিকদের জন্য একটি সমন্বিত স্বাস্থ্যসেবার নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠা করেছে। সরকার পরিচালিত হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জন্য বিনামূল্যে বা কম খরচে চিকিৎসা সেবা দেওয়া হয়। দেশটির স্বাস্থ্যবিমা প্রকল্প “Seguro Popular” জনস্বাস্থ্যের মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তবে, বিশেষায়িত সেবার জন্য ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যসেবা নেওয়ার প্রবণতা বেশি। অনেক ক্ষেত্রেই স্বাস্থ্যসেবার মান শহর ও গ্রামাঞ্চলে ভিন্ন।

মেক্সিকোর স্বাস্থ্য ও শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে, যেমন- উপকরণ ও শিক্ষকদের অভাব, উন্নত চিকিৎসা সেবার সীমিত ইত্যাদি। তবে, মেক্সিকো সরকার প্রতিনিয়ত নতুন নতুন পদক্ষেপ গ্রহণ করছে এবং দেশের স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মান উন্নয়নে প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।

উপসংহার

মেক্সিকো

মেক্সিকো সময়ের ধারায় বয়ে যাওয়া ইতিহাস, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যে, এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপূর্ব প্রদর্শনী। ওলমেকের প্রাচীন মায়া ও অ্যাজটেক সভ্যতার নিদর্শন থেকে শুরু করে আধুনিক নগরীর উজ্জ্বল আলো, প্রতিটি দিকেই মেক্সিকোর সমৃদ্ধি এবং বৈচিত্র্য ফুটে ওঠে। রাজনীতি এবং অর্থনীতিতে মেক্সিকোর স্থিতিশীলতা এবং উদ্ভাবনী প্রচেষ্টা দেশটিকে একটি অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত করেছে। মেক্সিকোর সংস্কৃতির রঙিন উৎসব, মারিয়াচি সংগীত, জারাবে তাপাতিও নৃত্য, এবং সুস্বাদু খাবার, এখানকার মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলেছে।

চিচেন ইত্জা থেকে ক্যানকুনের সাদা বালির সৈকত, টিউলামের ঐতিহাসিক মন্দির, টেকিলা শহরের পানীয় শিল্প, এবং ফ্রিদা কাহলো মিউজিয়ামের শিল্পকর্ম, সবকিছুই মেক্সিকোর বৈচিত্র্যময় সৌন্দর্যকে তুলে ধরে। এখানকার মানুষের আতিথেয়তা, উৎসব, এবং প্রাকৃতিক দৃশ্যগুলো মেক্সিকোকে একটি জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। মেক্সিকো যেন জীবন্ত ক্যানভাস! মেক্সিকো, এটি সত্যিই বিশ্বের একটি বিস্ময়।

মেক্সিকো সম্পর্কে আকর্ষণীয় কিছু তথ্য

মরিচের জন্মস্থান: মরিচ গাছের আদি উৎস হলো মেক্সিকো। বিশ্বের বিভিন্ন রেসিপিতে ব্যবহৃত এই জনপ্রিয় মসলাটি প্রথমে মেক্সিকোতেই পাওয়া গিয়েছিল।

চ্যাম্পুলিন বা পঙ্গপাল: পঙ্গপাল মেক্সিকোতে একটি প্রচলিত খাবার। এটি “চ্যাম্পুলিন” নামে পরিচিত। এটি সাধারণত ভাজা বা গ্রিল করে পরিবেশন করা হয়। পঙ্গপালকে প্রোটিনের ভালো উৎস হিসেবে ধরা হয়।

সোনারূপার দেশ: মেক্সিকো পৃথিবীর বৃহত্তম রূপা উৎপাদনকারী দেশগুলোর একটি। প্রাচীন যুগ থেকেই মেক্সিকোতে সোনার চেয়ে রূপার উৎপাদন বেশি ছিল।

ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলরেখা: মেক্সিকোতে প্রায় ৫০০টি প্রজাতির কাঁকড়া পাওয়া যায়, যা দেশটির সমুদ্র তীরবর্তী খাদ্যশিল্পকে সমৃদ্ধ করেছে।

সুরার উৎস: মেক্সিকোতেই প্রথম টেকিলা নামের মদ উদ্ভাবিত হয়েছিল। এটি আগাভ নামের একটি বিশেষ উদ্ভিদ থেকে তৈরি হয়। এটি শুধুমাত্র নির্দিষ্ট অঞ্চলগুলিতেই উৎপাদিত হতে পারে।

তৃতীয় বৃহত্তম পিরামিড: চিচেন ইত্জা ছাড়াও মেক্সিকোতে একটি প্রাচীন পিরামিড রয়েছে, যার নাম “পিরামিড অফ সান” বা “সূর্যের পিরামিড”। এটি তৃতীয় বৃহত্তম পিরামিড এবং প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন।

বিশ্বের সবচেয়ে বেশি জাগুয়ারের আবাসস্থল: আমাজন বনাঞ্চল ছাড়াও, মেক্সিকো জাগুয়ারের আবাসস্থল হিসেবে বিখ্যাত। এই দেশটির রেইন ফরেস্ট জাগুয়ারের অন্যতম আশ্রয়স্থল।

স্প্যানিশের বাইরে স্থানীয় ভাষার প্রচলন: মেক্সিকোতে প্রায় ৬৮টি আদিবাসী ভাষা রয়েছে। স্প্যানিশের পাশাপাশি মায়া, নাহুয়াতল, এবং মিজটেকসহ অন্যান্য ভাষায়ও মানুষ কথা বলে।

ভূগর্ভস্থ নদী: বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘ ভূগর্ভস্থ নদী মেক্সিকোতে রয়েছে। ইউকাটান পেনিনসুলায় অবস্থিত “সেনোটেস” নামের এই অদ্ভুত জলাশয় পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়।

বিশ্বের অন্যতম সক্রিয় আগ্নেয়গিরি: পোপোকাতেপেতল নামের এই আগ্নেয়গিরি এখনো সক্রিয় এবং মেক্সিকোর সবচেয়ে বিখ্যাত পাহাড়গুলোর একটি। আগ্নেয়গিরির কারণে এই অঞ্চলটি বারবার আন্তর্জাতিক মনোযোগে আসে।

মেসকাল: এটি মেক্সিকোর ঐতিহ্যবাহী অ্যালকোহলিক পানীয়। মেসকাল আগাভে গাছ থেকে তৈরি হয়। এটি টাকিলা’র মতই জনপ্রিয় এবং মেক্সিকোর খাদ্য সংস্কৃতির এক অংশ।

Related posts

ইনকা সভ্যতার রহস্যময় দেশ পেরু

শেখ আহাদ আহসান

নিউজিল্যান্ড – ‘আয়োটেয়ারোয়া’ বা সাদা মেঘের দেশ

ইসলামের আদি ঐতিহ্যের সিরিয়া

শেখ আহাদ আহসান

Leave a Comment

Table of Contents

    This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More