আপনি কি কখনও এমন কোনো জায়গার কথা শুনেছেন, যেখানে এখনও ডাকযোগে চিঠি পৌঁছাতে ১০ দিন পর্যন্ত লেগে যায়!
এখানে বিদেশি পর্যটকদের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, তবে সেখানে শুধুমাত্র ভারতীয় নাগরিকরা বিশেষ অনুমতি নিয়ে যেতে পারেন। বলছি আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের কথা। এই লেখায় আমরা জানবো আন্দামান ও নিকোবরের ইতিহাস, সংস্কৃতি, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, এখানকার রহস্যময় আদিবাসী গোষ্ঠীগুলো এবং বর্তমান সময়ের অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক চিত্র নিয়ে।
আন্দামান ও নিকোবরের অবস্থান ও ভৌগোলিক পরিচয়
চট্টগ্রামের উপকূলীয় এলাকা থেকে প্রায় ১,২০০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে এবং ভারতের চেন্নাই থেকে প্রায় ১,২০০ কিলোমিটার পূর্বে বঙ্গোপসাগরের বুকে অবস্থিত মনোরম দ্বীপপুঞ্জ আন্দামান ও নিকোবর। প্রায় ৫৮২টি দ্বীপ নিয়ে গঠিত এই দ্বীপপুঞ্জের মোট আয়তন প্রায় ৮,২৫০ বর্গকিলোমিটার। তবে, অবাক করা বিষয় হলো, এই দ্বীপগুলোর মধ্যে প্রায় ৩৮টি দ্বীপে মানুষ বসবাস করে, আর বাকি দ্বীপগুলো আজও জনমানবহীন ,নিস্তব্ধ এবং রহস্যময়।
নাম শুনেই বোঝা যাচ্ছে, আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ মূলত দুটি প্রধান ভাগে বিভক্ত। আন্দামান ও নিকোবর নামক এই দু’টি অংশের মধ্যে অবস্থিত ‘দশ-ডিগ্রি চ্যানেল’ নামক গভীর সমুদ্র চ্যানেলটি, তাদের ভৌগোলিকভাবে পৃথক করেছে।

আন্দামান ও নিকোবরের জলবায়ু ও প্রকৃতির রূপ
আন্দামান দ্বীপপুঞ্জ তুলনামূলকভাবে বড় ও জনবহুল, আর নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ অপেক্ষাকৃত ছোট এবং কম জনবসতিপূর্ণ। দক্ষিণ আন্দামানের মনোরম পরিবেশে অবস্থিত পোর্ট ব্লেয়ার শহর এই কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের রাজধানী হিসেবে পরিচিত। প্রশাসনিক ও পর্যটন উভয় ক্ষেত্রেই পোর্ট ব্লেয়ার প্রধান কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে।
আন্দামান ও নিকোবরের জলবায়ু উষ্ণমণ্ডলীয়। অর্থাৎ, এখানে সারাবছরই গরম ও আর্দ্র আবহাওয়া বিরাজ করে। মে থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত এখানে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়, যা এখানে একরকম “বৃষ্টির রাজত্ব” নামেই পরিচিত। দ্বীপগুলোর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আসল রূপ ফুটে ওঠে বর্ষার পর, যখন সবুজ বনভূমি, নীল সমুদ্র, আর রঙিন প্রবাল এক অপূর্ব সঙ্গম তৈরি করে।
জীববৈচিত্র্যে পরিপূর্ণ সবুজ দ্বীপ
এখানকার বনভূমি ভারতের সবচেয়ে সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের একটি কেন্দ্র। দ্বীপপুঞ্জের প্রায় ৮৬ শতাংশ এলাকা বনভূমিতে আচ্ছাদিত। এর ভেতরে অর্ধেকই সংরক্ষিত বন। এই বনভুমিতে প্রায় ৩,০০০টিরও বেশি উদ্ভিদ প্রজাতি ও ২০০-রও বেশি পাখির প্রজাতি পাওয়া যায়, যার অনেকগুলোই স্থানীয় বা “এন্ডেমিক”। অর্থাৎ কেবল এখানেই দেখা যায়।

আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ প্রকৃতিপ্রেমী ও ভ্রমণপিপাসুদের জন্য এক অনন্য স্বপ্নরাজ্য। এই দ্বীপপুঞ্জের নীলচে সমুদ্র, সাদা বালির সৈকত, ঘন সবুজ অরণ্য, ঝিরিঝিরি জলপ্রপাত এবং রঙিন প্রবাল প্রাচীর একসাথে মিলিয়ে মনোরম পরিবেশ সৃষ্টি করে। এখানে ঘুরতে এলে মনে হবে, প্রকৃতির প্রতিটি রঙ এবং ছায়া এখানে জীবন্ত হয়ে উঠেছে।
হ্যাভলক দ্বীপ ও রাধানগর বিচ: পর্যটকদের স্বর্গরাজ্য
আন্দামানের সবচেয়ে জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র হ্যাভলক দ্বীপ। এই দ্বীপের রাধানগর বিচ তার অসাধারণ সাদা বালি এবং নীল সমুদ্রের জন্য বিশ্ব বিখ্যাত। সৈকতটি এতই চিত্তাকর্ষক যে “টাইম ম্যাগাজিন” একে এশিয়ার সবথেকে ভালো সমুদ্র সৈকত হিসেবে ঘোষণা করেছিল।
এই সৈকতের নীল ও ফিরোজা জল, সূর্যের আলোয় ঝিকমিক করা পানি, এবং সবুজ ঘাসে মোড়ানো তটরেখা এক অপূর্ব দৃশ্যপট তৈরি করে। ভ্রমণকারীরা এখানে স্কুবা ডাইভিং, স্নরকেলিং, কায়াকিং করতে পারেন। এখানকার আরেকটি বিশেষ আকর্ষণ হলো, ডলফিনের খেলা দেখা। সৈকতের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং শান্ত পরিবেশের কারণে এটি নিখুঁত রোমান্টিক গন্তব্য হিসেবেও বিবেচিত হয়।

শহিদ দ্বীপ: প্রশান্তির নীড়ে প্রকৃতির স্পর্শ
আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের আরেকটি শান্ত, মনোরম ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ দ্বীপ হলো শহিদ দ্বীপ। এটি আগে নীল দ্বীপ নামে পরিচিত ছিল। ছোট অথচ অপরূপ এই দ্বীপে রয়েছে একাধিক মনোমুগ্ধকর সৈকত, যার মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হলো লক্ষণপুর বিচ, ভারতপুর বিচ এবং সীতাপুর বিচ। সাদা বালির তটরেখা, স্বচ্ছ নীল জল, আর শান্ত পরিবেশ এই দ্বীপকে করে তুলেছে অনন্য। যেখানে প্রকৃতির মাঝে মিশে গিয়ে পাওয়া যায় প্রশান্তির ছোঁয়া।
শহীদ দ্বীপের পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত লক্ষণপুর সৈকতটি সূর্যাস্ত দেখার জন্য অন্যতম জনপ্রিয় স্থান। এখানে সমুদ্রের ঢেউ বেশ শান্ত। গোধূলী লগ্নে এখানে সাদা বালির উপর সূর্যের শেষ রশ্মি পড়ে এক অপূর্ব সোনালি আভা তৈরি করে। এছাড়াও, সৈকতের পাশে ছোট ছোট প্রবাল পাথর ছড়িয়ে আছে, যা নিম্ন জোয়ারের সময় সমুদ্রতটে এক ভিন্ন দৃশ্য সৃষ্টি করে। পর্যটকেরা বিকেলের দিকে এখানে বসে সূর্যাস্তের দেখতে ভালোবাসেন। এখানকার পানিও স্বচ্ছ, তাই জোয়ারের সময় স্নরকেলিং বা অল্প গভীর জলে হাঁটাহাঁটি করাও বেশ নিরাপদ ও মনোমুগ্ধকর।
আবার, ভরতপুর সৈকতটি শহীদ দ্বীপের উত্তর-পূর্ব পাশে অবস্থিত এবং তুলনামূলকভাবে অনেকটা প্রাণবন্ত স্থান। এই সৈকতের সমুদ্রজল একদম স্বচ্ছ নীলচে সবুজ, যা দূর থেকে দেখলেই মনে হয় যেন কোনো ছবির দৃশ্য। এটি সাঁতার, গ্লাস-বটম বোট রাইড, স্কুবা ডাইভিং, স্নরকেলিং এবং অন্যান্য জলক্রীড়ার জন্য বিখ্যাত। এখানকার প্রবাল প্রাচীরগুলি খুব কাছেই অবস্থিত, তাই নৌকায় চেপে বা সরাসরি পানির নিচে নামলেই দেখা যায় বিভিন্ন রঙের প্রবাল আর নানারকম মাছ।
আর শহীদ দ্বীপের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত সীতাপুর সৈকতটি মূলত সূর্যোদয় দেখার জন্য বিখ্যাত। ভোরের প্রথম আলো যখন দিগন্তে পড়ে, তখন সমুদ্রের জল সোনালি হয়ে ওঠে। চারপাশে খাড়া পাহাড়, নারকেল গাছের সারি, আর বিশাল নীল আকাশ পুরো দৃশ্যটিই মনোমুগ্ধকর। সীতাপুর সৈকতে ঢেউ একটু বেশি এবং জল তুলনামূলক বাকি দুটির চেয়ে গভীর, তাই এখানে সাঁতার কাটা সাধারণত পরামর্শযোগ্য নয়। তবে সৈকতের নির্জনতা, বাতাসের শব্দ আর সমুদ্রের গর্জন মনকে ছুঁয়ে যায়।
রস দ্বীপ: ব্রিটিশ আমলের নীরব সাক্ষী
আন্দামানে একটি জনপ্রিয় পর্যটনস্থান হলো রস দ্বীপ। এটি একসময় ব্রিটিশ প্রশাসনের সদর দপ্তর ছিল। আজও এখানে ঔপনিবেশিক যুগের ধ্বংসাবশেষ দেখা যায়। এই দ্বীপে কিছু পুরনো ভবন রয়েছে যার দেয়ালভেদ করে গাছের শেকড় বেড়িয়েছে। এই দ্বীপটি ইতিহাসপ্রেমী পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয়। এখানে হাঁটতে হাঁটতে ব্রিটিশ শাসনের স্মৃতি এবং পূর্বের স্থাপত্যশৈলীর নিদর্শন চোখে পড়ে। স্থানীয় গাইডরা প্রায়ই এই দ্বীপের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা লোককথা ও ঘটনার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা প্রদান করেন, যা ভ্রমণকে আরও সমৃদ্ধ করে।

বারাতাং দ্বীপ: রহস্যময় গুহা, ম্যাংগ্রোভ বন ও কাদা আগ্নেয়গিরি
এরপর আসা যাক আন্দামান ও নিকবরের বন – জঙ্গলে। এখানে অবস্থিত বারাতাং দ্বীপ পর্যটকদের জন্য এক রহস্যময় অভিজ্ঞতা। এখানে রয়েছে লাইমস্টোন গুহা, কাদা আগ্নেয়গিরি এবং ম্যাংগ্রোভ বন। নৌকায় করে এই বনভূমির মধ্য দিয়ে যাত্রা করা যেন রহস্যের ভেতরে প্রবেশ করার অনুভূতি দেয়। ম্যানগ্রোভের ঘন বন, কাদা আগ্নেয়গিরির বুদবুদ, এবং নৌকার নড়াচড়ার শব্দ একসাথে মিলিয়ে এক রহস্যময় প্রাকৃতিক পরিবেশ তৈরি করে। প্রকৃতিপ্রেমীরা এখানে পাখি পর্যবেক্ষণ, ফটোগ্রাফি, এবং ছোট নৌকাভ্রমণ করতে পারেন।
নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ: অচেনা অথচ অপূর্ব
নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ পর্যটনের জন্য পুরোপুরি উন্মুক্ত নয়, তবে কিছু নির্দিষ্ট দ্বীপে সীমিত প্রবেশাধিকার রয়েছে। ক্যাম্পবেল বে, এবং চিপারলাইট বিচ এখানে উল্লেখযোগ্য গন্তব্য। এই দ্বীপগুলির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অনন্য। এর শান্ত ঢেউ, স্বচ্ছ নীল সমুদ্রজল এবং সোনালি বালির সৈকত একে স্বপ্নপুরীতে পরিণত করেছে। মাঝে মাঝে পর্যটকেরা এখানে সীমিত পরিসরে ক্যাম্পিং, বোটিং ও ট্রেকিং উপভোগ করতে পারেন। নিকোবর অঞ্চলের অল্প পরিচিত থাকার মূল কারণ এর সংরক্ষিত জীববৈচিত্র্য এবং কঠোর প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ, যা প্রকৃতিকে অক্ষত রেখেছে এবং এই দ্বীপগুলোকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে।
আদিম জনগোষ্ঠী: মানবসভ্যতার জীবন্ত সাক্ষী
আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ কেবল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্যই নয়, মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক অমূল্য রত্ন। প্রায় চৌদ্দ কোটি বছর আগে, মিয়ানমার থেকে ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত বিশাল ভূমিখণ্ডের সম্প্রসারিত অংশ হিসেবে জন্ম নেয় এই দ্বীপপুঞ্জ।
আন্দামান ও নিকোবরের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো এখানকার আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী, যাদের ইতিহাস হাজার বছরেরও পুরোনো। ধারণা করা হয়, তারা প্রায় ৬০,০০০ বছর আগে আফ্রিকা থেকে আগত মানবগোষ্ঠীর বংশধর। এরা পরে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দ্বীপে ছড়িয়ে পড়ে।

আন্দামানের প্রথম অধিবাসী হিসেবে পরিচিত আন্দামানি উপজাতি। এদের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত হলো ঔঙ্গে গোষ্ঠী। তাদের জীবনযাপন অতীত যুগের জীবন্ত ছবি। কারণ, আজও তারা আধুনিক জীবনের বাইরে গিয়ে শিকার, মাছ ধরা, ফলমূল ও মধু সংগ্রহের মাধ্যমে জীবনধারণ করে। তাদের জীবনযাপন যেন অতীত যুগের জীবন্ত ছবি।
অন্যদিকে, নিকোবর দ্বীপের প্রধান আদিবাসী হলো শোমপেন সম্প্রদায়। জেনে অবাক হবেন, এরা মঙ্গোলীয় বংশোদ্ভূত, এবং আজও বাইরের বিশ্বের সঙ্গে প্রায় কোনো যোগাযোগ রাখে না। গহীন জঙ্গলের ভেতর তাদের বসতি। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তারা সভ্যতার কোলাহল থেকে দূরে, এক রহস্যময় ও নিভৃত অস্তিত্ব হিসেবে প্রকৃতির সঙ্গেই বেঁচে আছে।
কালাপানি: সমুদ্রের বুকে ভয়ঙ্কর কারাগার
কিন্তু এই নীল সমুদ্রঘেরা শান্ত দ্বীপপুঞ্জ একসময় পরিণত হয়েছিল এক ভয়ঙ্কর শাস্তিস্থলে। যাকে আজও “কালাপানি” নামে ইতিহাস মনে রাখে। ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের পর, ব্রিটিশরা ভারতের বিদ্রোহীদের দমন করতে শুরু করে ভয়ঙ্কর শাস্তি প্রথা। তারা চেয়েছিল এমন এক জায়গায় বন্দিদের পাঠাতে, যেখানে থেকে পালানো অসম্ভব। আর ঠিক তখনই তাদের চোখ পড়ে দিকে; সমুদ্রবেষ্টিত, জনবসতি-বিহীন, বিচ্ছিন্ন এক ভূখণ্ড।
সেই সময় থেকেই এই দ্বীপকে বানানো হয় এক নির্বাসন কারাগার। হাজার হাজার স্বাধীনতা সংগ্রামী, বিদ্রোহী সৈনিক, এমনকি মুঘল রাজপরিবারের সদস্যদেরও পাঠানো হয়েছিল এই দ্বীপে। আর এখানে তাদের জন্য অপেক্ষা করত শুধু যন্ত্রণা আর মৃত্যুর ভয়।

১৮৭২ সালে ব্রিটিশ গভর্নর লর্ড মায়ো আন্দামান পরিদর্শনে আসেন। কিন্তু সেখানেই ঘটে এক ঐতিহাসিক ঘটনা। আফগান বংশোদ্ভূত এক পলাতক সৈনিক বন্দি শের আলি আফ্রিদি তীর মেরে হত্যা করেন লর্ড মায়োকে। এটি ছিল ব্রিটিশ শাসকের বিরুদ্ধে এক সাহসী প্রতিরোধের প্রতীক। পরবর্তীতে শের আলিকে আন্দামান নিকোবরের ভাইপার দ্বীপে ফাঁসি দেওয়া হয়।
তবে এর চেয়েও ভয়ঙ্কর অধ্যায় শুরু হয় পরে, যখন ব্রিটিশরা এখানে সেলুলার জেল গড়ে তোলে। ১৮৯৬ সালে এই জেলের নির্মাণ কাজ শুরু হয়ে ১৯০৬ সালে তা সম্পূর্ণ হয়। বার্মা থেকে আনা লাল ইটের তৈরি এই কারাগারে ছিল সাতটি বিশাল শাখা। প্রতিটি শাখায় ছিলো ৬৩৩টি করে ছোট কক্ষ বা ‘সেল’। প্রতিটি কক্ষের আয়তন ছিল মাত্র ১৩.৫ ফুট লম্বা ও ৭ ফুট চওড়া। প্রতিটি সেল এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল, যাতে এক বন্দি আরেক বন্দিকে দেখতে বা কথা বলতে না পারে।
এমন ভাবে কারাগার তৈরির কারণ হলো, ব্রিটিশরা চেয়েছিল বন্দিদের সম্পূর্ণ মানসিকভাবে ভেঙে ফেলতে। জেলের ভেতর প্রতিদিনই চলত জোরপূর্বক শ্রম আর নির্যাতন। তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা তেলের ঘানি টানত, শিকল বেঁধে কাজ করত। আর এর বদলে অনেক সময় তাদের কোনো খাবারও দেওয়া হতো না। সাথে ‘ফ্লগিং ট্রায়াঙ্গেল’-এ বেত্রাঘাত তো ছিল প্রতিদিনের নিয়ম। আর যদি কেউ কাজ করতে অস্বীকার করত, তাকে পেটানো হতো, অনাহারে রাখা হতো, কখনও কখনও উল্টো করে ঝুলিয়ে রাখা হতো।
জেনে অবাক হবেন, এই ভয়ঙ্কর জেলেই বন্দি ছিলেন ভারতের অসংখ্য মহান স্বাধীনতা সংগ্রামী। আর তাই, বিপ্লবী বীর সাভারকর, বটুকেশ্বর দত্ত, যোগেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, উল্লাসকর দত্ত, ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তীর মতো বিপ্লবীদের নাম আজও আন্দামানের বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয়। আরও অবাক করা বিষয় হলো, প্রায় ৮০,০০০ বন্দিকে পাঠানো হয়েছিল এই জেলে, যাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ ছিল বাঙালি বিপ্লবী। এই জেল শুধু বন্দিদের নয়, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতীকে পরিণত হয়েছিল। এখানে শিকলবন্দি প্রতিটি মানুষ বিশ্বাস করত, তাদের এই আত্মত্যাগ একদিন স্বাধীনতার সূর্যোদয় আনবেই।
সমাজ, সংস্কৃতি ও জীবনধারা
ভারতের অংশ হলেও, আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের সমাজব্যবস্থা ভারতের মূল ভূখণ্ডের থেকে কিছুটা আলাদা ও বৈচিত্র্যময়। এখানকার সমাজ গড়ে উঠেছে বিভিন্ন উৎস, সংস্কৃতি ও জনগোষ্ঠীর সংমিশ্রণে। যেখানে একদিকে রয়েছে আদিম উপজাতির জীবনধারা, অন্যদিকে রয়েছে আধুনিক নাগরিক সমাজের কাঠামো।
বর্তমানে এই দ্বীপপুঞ্জে প্রায় ৪ লাখের বেশি মানুষ বসবাস করে, যাদের অধিকাংশই ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে আগত বাঙালি, তামিল, তেলেগু, পাঞ্জাবি, মালয়ালি ও উত্তর ভারতের জনগোষ্ঠী। তারা মূলত স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে এখানে সরকারিভাবে পুনর্বাসিত হয়েছিলেন। তবে এখানকার মূল ও প্রাচীন অধিবাসী হলো আদিম উপজাতি সম্প্রদায়। যারা হাজার হাজার বছর ধরে এই দ্বীপে বসবাস করছে। এদের মধ্যে গ্রেট আন্দামানিজ, ওঙ্গি, জারোয়া, শোমপেন এবং সেন্টিনেলিজ সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য।

অন্যদিকে, পোর্ট ব্লেয়ারসহ শহরাঞ্চলগুলোয় আধুনিক নাগরিক সমাজ গড়ে উঠেছে। এখানে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানের সুযোগ অনেক বেড়েছে। শিক্ষার হার প্রায় ৯০%, যা ভারতের গড়ের চেয়েও বেশি। মহিলাদের শিক্ষায় অংশগ্রহণ এবং সরকারি চাকরিতে নিয়োগও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
স্বাস্থ্যব্যবস্থা এখন আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের অন্যতম শক্তিশালী দিক। রাজধানী পোর্ট ব্লেয়ার-এ রয়েছে গোবর্ষ্যর সরকারি হাসপাতাল, যা আধুনিক চিকিৎসা সুবিধাসহ দ্বীপের মূল রেফারেল সেন্টার হিসেবে কাজ করে। এছাড়াও, প্রতিটি বড় দ্বীপে কমিউনিটি হেলথ সেন্টার, প্রাইমারি হেলথ সেন্টার, এবং সাব-সেন্টার রয়েছে, যেখানে স্থানীয়দের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়।
দ্বীপগুলোর বিচ্ছিন্ন অবস্থার কারণে, চিকিৎসাসেবা অনেক সময় নির্ভর করে এয়ার অ্যাম্বুলেন্স ও নৌবাহিনীর সহায়তার ওপর। জরুরি রোগীদের দ্রুত চিকিৎসার জন্য ভারতীয় বিমানবাহিনী ও উপকূলরক্ষী বাহিনী সহযোগিতা করে।
দ্বীপের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ভারতের এক ক্ষুদ্র প্রতিচ্ছবি। এখানে হিন্দু, মুসলিম, খ্রিষ্টান ও শিখ সব ধর্মের মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান করছে। দুর্গাপূজা, দীপাবলি, ঈদ, বড়দিন বা পোঙ্গাল, সব উৎসবই এখানে মিলেমিশে উদযাপন করা হয়। ফলে দ্বীপের সমাজব্যবস্থা এক সহনশীল ও আন্তঃসম্পর্কযুক্ত সমাজে পরিণত হয়েছে।
দ্বীপবাসীরা সাধারণত যৌথ পরিবারব্যবস্থা মেনে চলে। পারস্পরিক সহযোগিতা, অতিথিপরায়ণতা ও প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক এখানকার সমাজের মূল ভিত্তি। উপজাতিদের মধ্যেও পরিবারই সমাজের কেন্দ্রবিন্দু। তারা সম্মিলিতভাবে বসবাস করে এবং শিকার বা আহারের ফল ভাগাভাগি করে নেয়।
তবুও এই সমাজব্যবস্থার কিছু সমস্যা রয়ে গেছে। যেমন-উপজাতিদের জীবনধারা ও আধুনিক সমাজের সংস্পর্শের ফলে ধীরে ধীরে তাদের সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রা বিপন্ন হচ্ছে। অন্যদিকে, শিক্ষা ও প্রযুক্তির বিস্তার সত্ত্বেও কিছু প্রত্যন্ত দ্বীপে এখনো স্বাস্থ্য ও যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
আন্দামান নিকোবরের অর্থনীতি: কৃষি, মাছধরা ও পর্যটন
আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের অর্থনীতি গড়ে উঠেছে মূলত কৃষি, মৎস্য, বনজসম্পদ ও পর্যটনের ওপর ভিত্তি করে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিক্ষা, অবকাঠামো, ও সরকারি কর্মসংস্থানও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছে। দ্বীপের অবস্থানগত গুরুত্বের কারণে ভারত সরকার একে এখন কৌশলগত এবং অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলছে।
এই দ্বীপপুঞ্জের মাটিতে কৃষিকাজ করা সহজ নয়, কারণ অধিকাংশ জায়গাই পাহাড়ি ও বনাঞ্চল। তবুও মানুষ পরিশ্রম করে এখানকার উর্বর জমিতে ধান, নারিকেল, সুপারি, কলা, আনারস, পেঁপে ইত্যাদি ফসল উৎপাদন করে। এখানকার নিকোবর অঞ্চলে নারিকেল চাষ সবচেয়ে লাভজনক কৃষিপণ্য। এখানকার নারিকেল তেল, শুকনো নারিকেল ও সুপারি ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে রপ্তানি হয়।
এই দ্বীপপুঞ্জের চারপাশে বিস্তৃত বঙ্গোপসাগর ও আন্দামান সাগরে রয়েছে প্রচুর সামুদ্রিক সম্পদ। স্থানীয়দের একটি বড় অংশ মৎস্য আহরণ ও মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণে যুক্ত। চিংড়ি, টুনা, কাঁকড়া, ও শামুকের বাণিজ্য এখানকার অর্থনীতিতে বিশেষ ভূমিকা রাখে। ভারত সরকার এখন “ব্লু ইকোনমি” পরিকল্পনার আওতায় এই অঞ্চলের মৎস্যশিল্পকে আধুনিক প্রযুক্তিতে উন্নত করছে।
আজ এই দ্বীপপুঞ্জ শান্ত, সুন্দর ও পর্যটকদের স্বর্গরাজ্য। এখানকার সমুদ্রের নীল জলরাশি এতটাই নির্মল যে, আকাশ ও সমুদ্রের সীমা মেলানো দায়। পাখির চোখে তাকালে মনে হয়, নীল সমুদ্রের বুকে যেন পান্নার মালা ছড়িয়ে আছে। বাঙালির সঙ্গে এই দ্বীপের সংযোগ আজও অটুট। এর একদিকে এখানে রয়েছে আদিম উপজাতিদের প্রাচীন জীবনরীতি, অন্যদিকে আধুনিক নাগরিক সমাজের বিকাশ। এই দুইয়ের ভারসাম্যই এই দ্বীপপুঞ্জকে করেছে অনন্য ।যেখানে মানুষ, প্রকৃতি ও ইতিহাস মিলেমিশে এক জীবন্ত সভ্যতার গল্প বলে যাচ্ছে।

