Image default
রহস্য রোমাঞ্চ

মৃত্যু সম্পর্কে অন্যান্য প্রাণীর ধারণা: প্রাণীদের কাছে মৃত্যু কী?

মৃত্যু! এক নির্মম পরিণতি, যা থেকে মানুষসহ কোন প্রাণীই রেহাই পায় না। কিন্তু আমাদের মতো প্রাণীরাও কি এই মৃত্যুতে শোক পালন করে? আবার, এমনও হতে পারে যে, তারা আমাদের চেয়ে আরো সুন্দরভাবে, নিজস্ব রীতিতে চলে যাওয়া প্রাণকে বিদায় দেয়, যা আমরা বুঝতে পারি না। মৃত্যু যখন সকলেরই শেষ পরিণতি, তবে কেন আমরা সকল মৃত্যুতে শ্রদ্ধাশীল হতে পারি না? 

প্রাণী ও মৃত্যু: দর্শন এবং বিজ্ঞান  

প্রাণীজগতে মৃত্যু জীবনচক্রের এক অবিচ্ছেদ্য ঘটনা। মানুষের আবির্ভাবের বহু আগে থেকেই প্রাণীজগতে মৃত্যু প্রকৃতির অংশ হিসেবে ছিল। কিন্তু সব প্রাণী কি তাদের মৃত্যু নিয়ে সচেতন? যখন তাদের সামনেই তাদের সঙ্গী বা সন্তান মারা যায়, তখন তাদের ছলছল চোখ কী যেনো বুঝাতে চায়! তাদের ভাষা আমরা সরাসরি বুঝি না। কিন্তু তাদের চাহনি এবং আচরণও কি আমরা বুঝার চেষ্টা করতে পারি না?

চার্লস ডারউইন নিজেও এই প্রশ্ন করেছিলেন যে, 

“কে বলতে পারে, গাভীরা কী অনুভব করে, যখন তারা মৃত কোন সঙ্গীকে ঘিরে থাকে এবং গভীরভাবে তাকায়?”

সঙ্গীর মৃত্যুতে শোকাহত প্রাণী

বিজ্ঞান প্রাণীদের এমন অনেক আচরণের ব্যাখ্যা খুঁজেছে এবং খোঁজার চেষ্টা করছে। 

মৃত্যু সম্পর্কে বিজ্ঞান 

বিজ্ঞান মৃত্যুকে একটি জৈবিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখে। কোন জীবে কোষ বিভাজন যখন থেমে যায়, অঙ্গ প্রত্যঙ্গের কার্যক্ষমতা যখন হারিয়ে যায় এবং অবশেষে সেই জীব নিথর এক অবয়বে পরিণত হয়ে, এই প্রক্রিয়াই একটি জীবের মৃত্যু। এখানে বিভিন্ন জৈবিক ক্ষেত্র যেমন বয়স জনিত মৃত্যু, পরিবেশগত প্রভাব ও ইকোসিস্টেমের ভূমিকা বিশ্লেষণ করা হয়। এই প্রক্রিয়াটি মানুষ এবং প্রাণী উভয় ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

গবেষণায় মানুষের মতো বিভিন্ন প্রাণীর মধ্যেও মৃতদের প্রতি ভিন্ন ব্যবহার করতে দেখা গিয়েছে। তারাও তাদের কারোর মৃত্যুতে কখনো বিশেষ কায়দায় মৃত দেহকে রক্ষা করতে বা বহন করতে এমনকি তাদের নিজস্ব পদ্ধতিতে কবর দিতেও দেখা গিয়েছে।

মৃত্যু সম্পর্কে দর্শন

কিন্তু দর্শন প্রাণীর মৃত্যুকে কি একই চোখে দেখে? দর্শন মৃত্যুকে নিয়ে জীবনের একটি গভীর অর্থ দাঁড় করায়। তারা মৃত্যু এবং অস্তিত্ববাদকে এক জায়গা নিয়ে আসে। অস্তিত্ববাদীরা মনে করে মৃত্যু জীবনের সীমাবদ্ধতা দেখিয়ে দেয় এবং জীবনে অর্থ খুঁজে বের করার প্রেরণা জাগিয়ে তুলে। 

অস্তিত্ববাদ (Existentialism) মূলত মানুষের জীবন, স্বাধীনতা, এবং অস্তিত্বের অর্থ নিয়ে একটি দার্শনিক প্রবাহ। এটি প্রাণীদের প্রেক্ষাপটে সরাসরি প্রযোজ্য নয়, কারণ প্রাণীরা সাধারণত “অস্তিত্বের অর্থ” বা “স্বাধীনতা” নিয়ে চিন্তা করার ক্ষমতা রাখে না। তবে, অস্তিত্ববাদের কয়েকটি মূল ধারণাকে প্রাণীদের জীবনের সাথে মিলিয়ে দেখলে আকর্ষণীয় কিছু দৃষ্টিভঙ্গি পাওয়া যায়।

প্রাণী ও মৃত্যুর অস্তিত্ববাদী দৃষ্টিভঙ্গি

অস্তিত্ববাদে মৃত্যুকে জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হয়। প্রাণীরা জীবনের কোন গভীর অর্থ না বুঝে থাকলেও, তারা বেঁচে থাকার জন্য প্রতিনিয়ত খাবার খোজা, শিকার থেকে বেঁচে থাকার এবং বংশবিস্তারের চেষ্টা করে। তাদের এই সংগ্রাম অস্তিত্ববাদে অর্থহীনতার কনসেপ্ট এর সঙ্গে মিলে যায়। অস্তিত্ববাদীরা যেমন, (জ্যাঁ-পল সার্ত্র এবং আলবেয়ার কাম্যু) মনে করেন, মহাবিশ্ব বা সৃষ্টির কোনো নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য নেই। অস্তিত্ববাদ অনুসারে জীবনের অর্থহীনতা একটি প্রাথমিক সত্য। আর সত্যই মানুষকে নিজেদের জীবনের অর্থ নির্মাণের স্বাধীনতা ও দায়িত্ব দেয়।

পিঁপড়া বা মৌমাছিদের দেখা যায় তারা সারা জীবন অত্যন্ত পরিশ্রম করে এবং তাদের সামষ্টিক দায়িত্ব পালন করতে থাকে। কিন্তু তারা জীবনের কী অর্থ বোঝে? প্রাণীর ক্ষেত্রে, তারা সরাসরি মৃত্যুর অর্থ বোঝে না, তবে তাদের কর্মকাণ্ড অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার প্রবৃত্তির পরিচায়ক। জ্যাঁ-পল সার্ত্র (Jean-Paul Sartre) এর মতে, 

“মৃত্যু জীবনের শেষ বিন্দু হলেও, এটি জীবনকে অর্থ দেয়।”

প্রাচীন দর্শন: প্রকৃতির অংশ হিসেবে মৃত্যু

স্টোইক দর্শন (Stoicism) 

স্টোইকরা মনে করতেন, জীব ও প্রাণী উভয়ই প্রকৃতির নিয়ম মেনে চলে। মৃত্যু এই চক্রের একটি স্বাভাবিক এবং অনিবার্য অংশ।

নৈতিক দর্শন: প্রাণীর মৃত্যু ও মানব দায়িত্ব

সমসাময়িক নৈতিক দর্শনে প্রাণীর মৃত্যু নিয়ে বেশ তর্ক-বিতর্ক তৈরি হয়েছে। পিটার সিঙ্গার একজন প্রখ্যাত অস্ট্রেলিয়ান দার্শনিক এবং নৈতিকতাবিদ, যিনি মূলত প্রয়োগ নৈতিকতা (Applied Ethics) এবং প্রাণী অধিকার (Animal Rights) নিয়ে কাজের জন্য বিখ্যাত।

পিটার সিঙ্গার (Peter Singer) এর মতে, প্রাণীদের জীবন ও মৃত্যুকে গুরুত্ব দেওয়া মানুষের নৈতিক দায়িত্ব। প্রাণীদের মৃত্যু নিয়ে সচেতন হওয়া এবং তাদের প্রতি সহানুভূতি দেখানো আমাদের মানবিক দায়িত্ব।

পরিবেশবাদী দর্শন: ইকোসিস্টেমে মৃত্যু

পরিবেশবাদী দর্শন বলে, প্রাণীর মৃত্যু জীবজগতের ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়ক। তাই মৃত্যু কেবল নেতিবাচক বিষয় নয়, বরং প্রয়োজনীয় একটি প্রক্রিয়া।

আরনে নেস (Arne Naess) এর মতে, গভীর পরিবেশবাদী দর্শনে প্রাণীর মৃত্যু প্রাকৃতিক চক্রের অংশ হিসেবে দেখা হয়। এটি জীবনের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করে। মৃত প্রাণীর মাধ্যমে পুষ্টি চক্র এবং খাদ্য চক্র পূর্ণ হয়, যা সমগ্র ইকোসিস্টেমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

প্রাণীদের মৃত্যুর প্রতি তাদের আচরণ

এটা বলা বাকি নেই যে প্রাণীরাও মৃত্যুতে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। এক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রাণীদের মধ্যে বিভিন্ন রকম প্রতিক্রিয়া দেখা যায় মৃত্যুকে ঘিরে। 

হাতি

হাতি একটি অত্যন্ত বুদ্ধিমান এবং সংবেদনশীল প্রাণী। গবেষকরা পর্যবেক্ষণ করে দেখেন যে, তাদের মৃত্যুর প্রতিক্রিয়ায় একটি গভীর দিক রয়েছে। তারা শুধু নিজেদের প্রজাতির মৃত্যু নয়, বরং, অন্য প্রাণীর মৃত্যুও উপলব্ধি করতে সক্ষম।

হাতি মৃত হাতিকে ঘিরে জড়ো হয়ে আছে

হাতিরা সবসময় দলবদ্ধ হয়ে চলাচল করে। তাদের দলের কোন সদস্য বা পরিচিত হাতির মৃত্যু হলে তারা মৃতদেহের কাছে জমায়েত হয়। মৃতদেহের উপর শুঁড় দিয়ে স্পর্শ করে, গন্ধ নেয় এবং কখনো কখনো মৃত দেহের চারপাশে দাঁড়িয়ে থেকে সম্মান জানায়। এভাবে তারা মৃত্যুর অর্থ বোঝার চেষ্টা করে বলে মনে করেন গবেষকরা।

কোন হাতি মারা যাওয়ার পর বেঁচে থাকা হাতিরা কয়েকদিন পর্যন্ত শান্ত থাকে ও কম চলাফেরা করে। মৃত হাতির শাবক থেকে থাকলে শাবকদের যত্ন নেওয়ার চেষ্টা করে এবং দলীয় সংহতি বজায় রাখে।

শুধু তাই নয় হাতিরা মাঝেমাঝে মৃতদেহের উপর গাছের ডাল ও পাতা দিয়ে মাটিতে চাপা দেয়ার চেষ্টা করে। হাতির স্মৃতিশক্তি এতই উন্নত এবং প্রখর যে তারা বছর পর বছর তাদের প্রিয়জনের মৃত্যু স্থান বা স্মৃতি মনে রাখতে পারে। মৃত হাতির  শুঁড়, দাঁত বা হাড় দীর্ঘ সময় পরেও তারা চিনতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে যে, হাতিরা মাঝে মাঝে মানুষের মৃতদেহ বা হাড়ের প্রতিও আগ্রহ প্রকাশ করে। তাদের মতে, হাতির আচরণে স্পষ্ট শোক স্মৃতি এবং সম্পর্কের গুরুত্ব ফুটে ওঠে ।

কাক

কাকদের অনেক সময় কোন এলাকার ওপর একসাথে জড়ো হয়ে অনেক ডাকতে ডাকতে উড়তে দেখা যায়। খেয়াল করলে সেখানে কাক বা অন্য কোন প্রাণী বিপদে আছে এমন পাওয়া যেতে পারে।

কাকেরা সাধারণত একটি মৃত কাক বা অন্য কোন বিপদের অস্তিত্ব টের পেলে বিশেষ ধরনের ডাক দেওয়া শুরু করে। এই ডাক শোনার পর নিকটবর্তী কাকেরা দ্রুত সেখানে জড়ো হয়। এই আচরণকে অনেক সময় কাকের শেষকৃত্য (Crow funeral) বলে অভিহিত করা হয়। কাকদের সাধারণত মৃতদেহ স্পর্শ করতে দেখা যায় না। কারণ, এটি তাদের শিকারির উপস্থিতির শঙ্কা বা রোগ সংক্রমণের ঝুঁকি এড়ানোর কৌশল।

কাকের শেষকৃত্য

কাকেরা শুধু মৃতদেহের চারপাশে ভিড় করেই থেমে যায় না, বরং, তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে থাকে। এভাবে তারা শিকারীর উপস্থিতি বা কোন বিপদের কারণে মৃত্যু ঘটেছে তথা মৃত্যুর কারণ বোঝার চেষ্টা করে। কাকদের মধ্যেও দেখা যায় তারা মৃত্যুর স্থান দীর্ঘদিন স্মৃতিতে ধরে রাখতে পারে।

তিমি 

তিমির পডের (দল বা পরিবারের) কেউ মারা গেলে, পডের সদস্যরা মৃতদেহের আশেপাশে “ভয়েস” বা সুর পরিবর্তন করে ধীরে ধীরে সাঁতার কাটে। এই দৃশ্য দেখে মনে হয় যেন, তারা মৃত তিমির প্রতি সম্মান জানাচ্ছে। বিশেষ করে মা তিমিদের ক্ষেত্রে দেখা যায় তারা মৃত শাবককে দীর্ঘ সময় ধরে নিজেদের সঙ্গে জলে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। কয়েক দিন থেকে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত তার শরীরের সঙ্গে ঠেলে নিয়ে বেড়ায়। যেমন এক কিলার তিমিকে তাঁর মৃত শাবককে ১৭ দিন ধরে জলে ভাসিয়ে নিয়ে চলতেও দেখা গেছে। গবেষকদের মতে তাদের শোক প্রকাশের আচরণ অনেকাংশে মানুষের শোকের সঙ্গে তুলনীয়। 

তিমি তাঁর মৃত বাচ্চাকে সাথে করে নিয়ে ভাসছে

মৃত্যু নিয়ে মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর পার্থক্য ও মিল

এক সময় মৃত, অসুস্থ বা অক্ষম ব্যক্তিদের প্রতি সহানুভূতিশীল আচরণকে একটি অনন্য মানবিক বৈশিষ্ট্য হিসাবে বিবেচনা করা হতো। কিন্তু আধুনিক গবেষণা ও পর্যবেক্ষণে এটি স্পষ্ট হয়েছে যে, বিভিন্ন প্রাণী বিশেষত উচ্চ স্তরের প্রাণী যেমন- তিমি, হাতি, শিম্পাঞ্জি প্রভৃতির ক্ষেত্রে অসুস্থ, মরণাপন্ন এবং মৃত সমগোত্রীয় প্রাণীর প্রতি সহানুভূতিশীল আচরণ মোটেই দুর্লভ কোন বিষয় নয়। 

পোষা প্রাণীর শোক

যাদের একাধিক পোষা প্রাণী থাকে তারা জানে যে তাদের পোষা প্রাণীর মধ্যে কোন একজন যদি মারা যায়, অন্যরা অনেক দিন যাবত দুঃখী বা চুপচাপ থাকে। এমনকি তারা খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে দেয়। শুধু তাই নয় প্রাণী চিকিৎসকদের মতে, তারা মৃত্যুর শোকে মানুষের চেয়েও মারাত্মক ডিপ্রেশনে যেতে পারে এবং এ থেকে তাদের মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।

এই জন্য দেখা যায়, কোন পোষা প্রাণীর মৃত্যুতে তার সঙ্গী পোষা প্রাণীকে আরো বেশি আদর যত্নে রাখতে হয়। কখনো প্রয়োজন হলে তার নতুন সঙ্গী ও আনতে হয়। এ থেকে কোন গবেষণা ছাড়া একটু পর্যবেক্ষণ করলেই বুঝা যায় প্রাণীরা মৃত্যুতে শোকাহত হয়ে। প্রাণীদেরকেও তাদের সঙ্গীর মৃত্যু আঘাত আনে। 

উপসংহার

মৃত্যু ঘুরে ফিরে সকল জীবের জীবনেই আসে। প্রাণীর মৃত্যু তুচ্ছ হয়ে যায় তখনই যখন মৃত্যুকে মানুব-কেন্দ্রিক বিষয় ভাবা হয়। কিন্তু মৃত্যু কি আসলেই মানুষ কেন্দ্রিক কোন কিছু?

মানুষ সহ সকল প্রাণীদের মৃত্যু প্রাকৃতিক চক্রের একটি অংশ। আমরা যদি মানুষ এবং প্রাণী কে শুধুমাত্র পৃথিবীতে বসবাসরত জীব হিসেবে কল্পনা করি, তবে, মৃত্যুর সবার জন্যই এক। কারো হয়তো আগে, কারো পরে। কেউ হয়তো তার জীবন নিয়ে ভাবে, কেউ ভাবে না। কিন্তু মৃত্যু সবারই শেষ পরিণতি।

রেফারেন্সঃ

Related posts

সাম্রাজ্যবাদী রবার্ট ক্লাইভ ও তাঁর মৃত্যু রহস্য

আবু সালেহ পিয়ার

খুনেই আনন্দ!-জোডিয়াক কিলার

নেফারতিতিঃ রহস্যময় মিশরীয় রাণীর মৃত্যুরহস্য

Leave a Comment

Table of Contents

    This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More