Image default
রহস্য রোমাঞ্চ

বাংলাদেশের দ্বীপ কন্যা, প্রকৃতির মিনি সুন্দরবন চর কুকরি মুকরির গল্প!

একসময় যেখানে কুকুর আর ইঁদুরের খেলা চলত, আজ সেই স্থানই পরিণত হয়েছে প্রকৃতিপ্রেমী ভ্রমণকারীদের স্বপ্নের গন্তব্যে। 

মেঘনার নদীর বুকে জেগে ওঠা এই দ্বীপচরটি যেন এক জীবন্ত বিস্ময়। বলছি “চর কুকরি-মুকরির” কথা। ভোলা শহর থেকে প্রায় ১২০ কিলোমিটার দূরে বঙ্গোপাসাগরের কোল ঘেঁষে মেঘনা নদীর মোহনায় অবস্থিত চর কুকরি মুকরি যেন নিঃশব্দ এক বিস্ময়। ৮,৫৬৫ হেক্টর আয়তনের বিস্তৃত এই দ্বীপটি যেন প্রকৃতির নিজ হাতে আঁকা এক অনন্য ক্যানভাস। সাগরের কোল ঘেষে জন্ম নেওয়া এই চরটি দ্বীপ কন্যা হিসেবেও বেশ পরিচিত। 

ম্যাপ

কুকরি-মুকরির ইতিহাস ও নামকরণ

সবুজ দ্বীপ আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি খ্যাত কুকরি-মুকরির ইতিহাস বেশ রহস্যময়। প্রায় ৭০০ বছর আগে পর্তুগীজ জলদস্যুরা তাদের গোপন আস্তানা গড়েছিল এই চরটিতে। তবে, কালের বিবর্তনে একসময় পানিতে তলিয়ে গেলেও, ১৯১২ সালে চরটি পুনরায় উঠে দাঁড়ায়। এ যেন প্রকৃতির নিজের ছন্দে লেখা এক জাদুকরী পুনর্জন্মের গল্প।

“চর কুকরি-মুকরির”  নামের পেছনে ও লুকিয়ে আছে অদ্ভুত এক মজার গল্প। ঘন ঝোপঝাড়ে ভরা এই চরে এক সময় বিচরণ ছিল কুকুর ও মেকুর অর্থাৎ ইঁদুরের। কুকুর এবং ইঁদুরের মতো প্রাণীরা  অবাধে দৌড়ঝাপ এবং লুকোচুরি করত এই বিস্তৃর্ণ অভয়ারণ্যে। কুকুর ও ইঁদুরের সেই খেলারই প্রতিফলন থেকে জন্ম নেয় ‘কুকরি-মুকরি’ নামটি। চরটির নামটি আজও যেন অতীতের সেই বন্য, চঞ্চল ও রহস্যময় প্রকৃতির পরিচয় বহন করে।

১৯৮৯ সালের ১৪ মে বন বিভাগের তত্ত্বাবধানে এই চরে শুরু হয় এক নজরকাড়া বনায়ন অভিযান। উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জান-মাল রক্ষায় ভোলাজুড়ে প্রায় ৩ লাখ ৬০ হাজার একর জমিতে রোপণ করা হয়, শ্বাসমূলীয় ম্যানগ্রোভ গাছ। শুরুতে শুধু গোলপাতা ও গেওয়া জাতীয় গাছ লাগানো হলেও পরবর্তীতে ক্রমান্বয়ে এই বনে যুক্ত হয় সুন্দরী, পশুর, এবং অন্যান্য প্রজাতির গাছের সারি।

কুকরি-মুকরির জীব বৈচিত্র্য

চোখ মেলে তাকালে দেখা যায়, কেওড়া গাছের বিশাল সমাহার। বিস্তৃর্ণ এলাকা জুড়ে গড়ে ওঠা এসব গাছ এবং আশপাশের নারিকেল গাছ, বাঁশ ও বেত বন মিলেই এখানে তৈরি হয়েছে আকর্ষণীয় একটি ম্যানগ্রোভ বা শ্বাসমূলীয় বনাঞ্চল। বনের মোহময় সৌন্দর্য দেখলে মনে হবে এ যেন সুন্দরবনের মিনি ভার্সন।

বর্তমানে কুকরি-মুকরি চরে প্রায় ২১৭ হেক্টর জায়গা শুধু বন্যপ্রাণীর জন্য সংরক্ষিত। বন্যপ্রাণীর এই অভয়াশ্রমে প্রবেশ করলেই মনে হবে এ যেন এক জীবন্ত প্রাকৃতিক চিড়িয়াখানা। যেখানে মুক্ত আকাশের নিচে অবাধে বিচরণ করে চিত্রা হরিণের দল, গাছের ডালে লাফিয়ে বেড়াযচ্ছে দুষ্টু বানর, দূর থেকে ভেসে আসছে বনমোরগের ডাক। শিয়াল, উদবিড়াল, বন্য মহিষ ও গরু এবং বনবিড়ালের মতো প্রাণীরা, এই বনকে করেছে আরও রহস্যময়। এছাড়াও, চারপাশে ছড়িয়ে আছে নানান রঙের সরীসৃপ। সবমিলিয়ে এই চর যেন তাদেরই রাজ্য।

চর কুকরি-মুকরির প্রাণী বৈচিত্র্য

শীতকালে কুকরি-মুকরির দ্বীপের চেহারা একেবারেই বদলে যায়। জেনে অবাক হবেন, এই সময় সুদূর সাইবেরিয়া থেকে আসা অতিথি পাখিদের আগমনে, চরটি যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সময়ে স্থানটিতে বাংলাদেশে প্রায় ৬৫০ প্রজাতির অতিথি পাখি আসে। আর এসব অতিথি পাখির বেশিরভাগই থাকে ভোলা অঞ্চলে। আর তাই, শীতকালে পাখির কলরবে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো চর।

গভীর বনভূমির পাশাপাশি  চরটিতে রয়েছে নিরব ও শান্ত  সমুদ্রসৈকত। তবে কুকরি মুকরির প্রধান আকর্ষণ তার সাগরপাড়। স্থানীয় লোকজন এই জায়গা টিকে বালুর ধুম নামেই ডাকে। বালুর ধুম” নামে পরিচিত সৈকতে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত বা সূর্যোদয়ের দৃশ্য বরাবরই পর্যটকদের মুগ্ধ করে। সাগরপাড়ের এই অপরূপ দৃশ্য উপভোগ করতে দেশ বিদেশের ভ্রমণপিপাসুরা পাড়ি জমায় এই চরে। সাগরপাড়ের বালি,  চর আর সমুদ্রের ঢেউ, একসাথে মিলে যেন কক্সবাজারের খোলা সৈকত আর কুয়াকাটার রোমাঞ্চকর অনুভূতি জাগায় চর কুকরি মুকরি। এছাড়াও, অ্যাডভেঞ্চার প্রেমীদের জন্য দর্শনীয় স্থান হিসেবে রয়েছে চর কুকরি-মুকরিতে রয়েছে ভাড়ানি খালের দুই পাড়ের ম্যানগ্রোভ, নারিকেল বাগান, বালুর ধুম। 

খালের পাশে ম্যানগ্রোভ বন

চর কুকরি-মুকরি এখন শুধু একটি দ্বীপ নয় বরং এটি পর্যটকদের জন্য স্বপ্নের ঠিকানা। পর্যটকদের কথা মাথায় রেখে এখানে গড়ে উঠেছে একের পর এক আধুনিক ও আকর্ষণীয় স্থাপনা। এরই মধ্যে নির্মিত হয়েছে পাখি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র, ওয়াচ টাওয়ার, বন বিভাগের ফাইভ স্টার মানের কোস্টাল ফরেস্ট ডেভলপমেন্ট কাম রেস্ট হাউস, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এফডিএ) এমনকি কোস্ট ট্রাস্ট এবং ইউনিয়ন পরিষদের রেস্ট হাউসের মতো নানা স্থাপনা। শুধু তাই নয়, ভ্রমণকারীদের সুবিধার্তে সৌরবিদ্যুৎ চালিত মোবাইল চার্জ দেওয়ার বিশেষ ব্যবস্থাও চালু করা হয়েছে এখানে। তাছাড়াও, রয়েছে রাত্রি যাপন ও খাবারের সুব্যবস্থা। 

চর কুকরি-মুকরি জীবন ও সংস্কৃতি

স্বপ্নের দ্বীপ চর কুকরি মুকরি’র বাকি ৪,৮১০ হেক্টর, জুড়ে রয়েছে মানুষের বসতি ও কৃষিজমি। জাল ফেলা, মাছ ধরা এমনকি ধান চাষ, এসবই তাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কুকরি-মুকরিতে প্রকৃতি ও মানুষ যেন একে অপরের অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী। 

এমনকি চরের  বাসিন্দাদের খাদ্যসংস্কৃতিও  গড়ে উঠেছে নদী এবং কৃষিকে  কেন্দ্র করে। মাছ, ঝিনুক, ধান, নারিকেল এবং স্থানীয় সবজি এই দ্বীপের বাসিন্দাদের প্রধান খাদ্য। ভাপা মাছ, মাছের ঝোল এমনকি শুকনো মাছের স্বাদ কেবল পেট ভরায় না, বরং তাদের সংস্কৃতিকে আরো উজ্জ্বলভাবে ফুটিয়ে তোলে।

চরের মানুষের মাছ ধরার দৃশ্য

চর কুকরি-মুকরি শুধু একটি দ্বীপচর নয়, এটি বাংলাদেশের বাংলাদেশের লুকানো স্বর্গ” কুকুর আর ইঁদুরের নামেই যে দ্বীপের পরিচয় শুরু হয়েছিল, আজ তা পর্যটনপ্রেমীদের স্বপ্নের ঠিকানা হয়ে উঠেছে। আপনি যদি প্রকৃতি, শান্তি এবং রহস্যময় সৌন্দর্য খুঁজে থাকেন তবে চর কুকরি-মুকরিতে  ভ্রমণ  আপনার জন্য হতে পারে এক স্মরণীয় অভিজ্ঞতা। চর কুকরি মুকরি এভাবেই তার সৌন্দর্য ছড়াতে থাকুক।

রেফারেন্সঃ

Related posts

খাবারের ষড়যন্ত্র? ম্যাকঅ্যালেন শহরের স্থূলতার রহস্য

ইলন মাস্ক: মানুষ নাকি এলিয়েন?

আবু সালেহ পিয়ার

রাশিচক্র কি ছদ্মবিজ্ঞান নাকি ভবিষ্যৎ জানার মাধ্যম?

Leave a Comment

Table of Contents

    This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More