Image default
জীবনী

উর্দুভাষী সোহরাওয়ার্দী ও বঙ্গপ্রেম

গণতন্ত্রের মানসপুত্র’ মহান এই নেতা ভারতের ইতিহাসে শুধুই একজন ‘বিতর্কিত নেতা ‘। 

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি রাজনীতিবিদ, আইনজীবী ও বাংলার শেষ প্রধানমন্ত্রী (পাকিস্তানের ৫ম প্রধানমন্ত্রী)। গনতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা তথা জনগণের মতামতের প্রতি তিনি ছিলেন শ্রদ্ধাশীল। আর তাই তিনি ‘গণতন্ত্রের মানসপুত্র’ হিসাবে আখ্যায়িত হন। আমরা আজ জানবো বাংলাদেশের এই দুর্দান্ত মেধাবী, দেশপ্রেমিক সন্তানের কথা।

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ব্যক্তিগত জীবন

বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুর জেলার এক অভিজাত পরিবারে জন্ম তাঁর। বাবা জাহিদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন পেশায় একজন বিচারক, আর মা খুজাস্তা আখতার বানু ছিলেন নামকরা একজন উর্দু সাহিত্যিক। তাঁর পরিবারে সকলে উর্দু ভাষাভাষী হলেও হোসেন সোহরাওয়ার্দী ছিলেন বাংলা ভাষার প্রতি অনুরাগী। নিজ উদ্যোগে তিনি বাংলা শিখেন এবং চর্চা করেন। 

সোহরাওয়ার্দী কোলকাতা আলিয়া মাদ্রাসায় শিক্ষাজীবন শুরু করে পরবর্তীতে যোগ দেন সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে। এখান থেকে বিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন এবং এরপর তিনি  কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘আরবী ভাষা ও সাহিত্য’ বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯১৩ সালে তিনি যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান এবং সেখানে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিষয়ে সম্মানসহ স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। 

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী

আইনশাস্ত্রের প্রতিও তাঁর বিশেষ ঝোঁক ছিলো। তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়েও অধ্যয়ন করেন এবং বি.সি.এল.(Bachelor Of Civil Law) ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯১৮ সালে গ্রে’স ইন থেকে তিনি Bar at Law ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর ১৯২১ সালে তিনি কোলকাতায় ফিরে আসেন এবং আইন পেশায় নিজেকে নিয়োজিত করেন।

১৯২০ সালে সোহরাওয়ার্দি তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুর রহিমের কন্যা বেগম নিয়াজ ফাতেমাকে বিয়ে করেন। কিন্তু দূর্ভাগ্যবশত ১৯২২ সালেই বেগম নিয়াজ মারা যান। পরবর্তীতে হোসেন সোহরাওয়ার্দী দ্বিতীয় বিয়ে করেন একজন রাশিয়ান অভিনেত্রীকে।

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর রাজনৈতিক দর্শন  

সোহরাওয়ার্দী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসাবে নিজ আদর্শ, চেতনা বা দর্শন যথেষ্টভাবে বজায় রেখেছিলেন। এখন দেখা যাক তার রাজনৈতিক চেতনা তথা রাজনৈতিক দর্শন সম্বন্ধে- 

গণতন্ত্র

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর রাজনৈতিক দর্শনের মূল শেকড় ছিলো গণতন্ত্র। তিনি ছিলেন উপমহাদেশে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অন্যতম সক্রিয় প্রবক্তা। সোহরাওয়ার্দী বিশ্বাস করতেন যে, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নির্মাণ করার ক্ষেত্রে সর্বপ্রথম যা দরকার তা হলো, জনগণের মধ্যে গণতান্ত্রিক বোধ ও সংস্কৃতি নির্মাণ করা। এভাবে গণতন্ত্রকে স্বতঃসিদ্ধভাবে গ্রহণ করার কথা তিনি বলেন।

তাঁর মতে,’কোন ব্যাক্তির খেয়াল নয় বরং জনগণের ইচ্ছাই হবে সরকারি নীতি’

মানবকল্যাণ

সোহরাওয়ার্দীর গণতান্ত্রিক দর্শনের মূল উদ্দেশ্য হলো মানব কল্যাণ। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, একমাত্র গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় জনগণের কল্যাণ সম্ভব।

দেশপ্রেম

তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নরত অবস্থায়ই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে, তিনি সাধারণ মানুষদের জন্য সারাজীবন রাজনীতি করবেন। তার এই দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে কোন লোভ, ভোগ, সুবিধাবাদিতা ছিলো না। সবসময় তাঁর চিন্তায় প্রাধান্য পেত দেশমাতৃকার প্রতি গভীর প্রেম।

সোহরাওয়ার্দী যে বিশ্বাস বা আদর্শ নিজের মাঝে ধারণ করতেন তা নিজ কাজের মাধ্যমে ফুটিয়েও তুলতেন। এই হিসাবে তাকে রাজনৈতিকভাবে ‘প্রয়োগবাদী দার্শনিকও’ বলা যায়।

এক নজরে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর রাজনৈতিক জীবন

স্বরাজ পার্টি ও বেঙ্গল প্যাক্ট

১৯২৩ সালে সোহরাওয়ার্দী চিত্তরঞ্জন দাশের স্বরাজ পার্টিতে যোগ দেন। তখন এটি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের একটি ছোট গ্রুপ ছিলো। ১৯২৩ সালে বেঙ্গল প্যাক্ট স্বাক্ষরে সোহরাওয়ার্দী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

কোলকাতার ডেপুটি মেয়র নিয়োগ

প্রগতিশীলতা এবং ঐক্যবদ্ধ বৃহৎ বাংলার পক্ষে থাকায় পরবর্তীতে ১৯২৪ সালে সোহরাওয়ার্দী কোলকাতা পৌরসভার ডেপুটি মেয়র (মেয়র চিত্তরঞ্জন দাশ) নির্বাচিত হন।

পরবর্তীতে ১৯২৭ সালে এ পদ থেকে তিনি পদত্যাগ করেন। ১৯২৮ সালে মুসলিমদের খেলাফত আন্দোলন সংগঠিত হয়। সোহরাওয়ার্দী এই খেলাফত আন্দোলন ও সর্বভারতীয় মুসলিম সম্মেলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। মুসলিমদের মধ্যে তার ব্যাপক সাড়া থাকলেও তিনি ১৯৩৬ সালের পূর্বে মুসলিম লীগে যোগ দেননি। এর স্পষ্ট কারণ জানা যায় না।

ইন্ডিপেন্ডেন্ট মুসলিম পার্টি গঠন

১৯৩৬ সালের শুরুর দিকে তিনি ‘ইন্ডিপেন্ডেন্ট মুসলিম পার্টি’ নামক নতুন একটা দল গঠন করেন এবং বছরের শেষের দিকে তার এই দলটি তিনি প্রাদেশিক (বাংলা) মুসলিম লীগের সঙ্গে একীভূত করেন। পরবর্তীতে এ সুবাদে তিনি বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগ এর সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৪৩ সাল অবধি তিনি এই পদে নিজেকে বহাল রাখেন।

মন্ত্রী সভার সদস্য

১৯৪৩ সালে তার রাজনৈতিক জীবনে আরেকটি নতুন মোড় আসে। এ সময় শ্যামা-হক মন্ত্রীসভার পদত্যাগের পর খাজা নাজিমুদ্দিন একটি মন্ত্রীসভা গঠন করেন। আর এই মন্ত্রীসভায় সোহরাওয়ার্দী একজন জাঁদরেল সদস্য ছিলেন। তিনি এ মন্ত্রীসভায় শ্রমমন্ত্রী ও পৌর সরবরাহ মন্ত্রীর দায়িত্বপালন করেন। 

১৯৪৬ সালে বাংলায়  প্রাদেশিক মুসলিম লীগের বিপুল বিজয়ে তার কৃতিত্বই ছিলো মূল। ১৯৪৬ সালে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হন। তৎকালীন পাকিস্তান আন্দোলনে তিনি পূর্ণ সমর্থন প্রদান করেন। এরপর তার রাজনৈতিক জীবনে আরেকটা মোড় আসে।

হিন্দু মুসলিম দাঙ্গা মহাত্মা গান্ধী ও সোহরাওয়ার্দী

১৯৪৬ সালে স্বাধীন ভারতবর্ষের বিপক্ষে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ আগস্টের ১৬ তারিখ ‘প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস’ এর ডাক দেন। সোহরাওয়ার্দী এতে পূর্ণ সমর্থন জানান এবং ঐদিন বাংলা প্রদেশে সরকারি ছুটি ঘোষণা করেন। এদিন আলাদা রাষ্ট্রের দাবিতে মুসলমানরা ব্যাপক বিক্ষোভ করলে কোলকাতায় হিন্দু-মুসলিম ভয়ানক দাঙ্গা বেঁধে যায়। সোহরাওয়ার্দী এ সময় নিশ্চুপ থাকায় হিন্দুদের কাছে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা কমে যায়। 

 

১৯৪৬ সালে হিন্দু মুসলিম দাঙ্গা

১৯৪৭ সালে তিনি বাংলার মুখ্যমন্ত্রী পদ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন। পদত্যাগের পর কোলকাতাতেই ছিলেন তিনি। পরবর্তীতে আরেকটি হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার সম্ভাবনা দেখায় সোহরাওয়ার্দী এবার মহাত্মা গান্ধীর সাহায্য চান। মহাত্মা গান্ধী ও সোহরাওয়ার্দী দু’জনের ভূমিকায় হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা প্রশমনে ডাক দেয়া হয়।

ভারতীয় এজেন্ট হিসেবে বিতর্কিত হয়ে ওঠা

১৯৪৭ সালের আগস্টে পাকিস্তানের স্বাধীনতার পর মুসলিম লীগের রক্ষণশীল নেতারা খাজা নাজিমুদ্দিনের নেতৃত্বে অনেক শক্তিশালী হয়ে উঠেন আর প্রগতিশীল নেতারা হয়ে পড়েন কোণঠাসা। খাজা নাজিমুদ্দিন সোহরাওয়ার্দীকে ‘ভারতীয় এজেন্ট’,’পাকিস্তানের শত্রু’ হিসাবে অ্যাখ্যা দেন। এমনকি সোহরাওয়ার্দীকে পাকিস্তানের আইনসভার সদস্য পদ থেকেও বহিষ্কার করা হয়।

পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগ(নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগ) গঠন

পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগ গঠন

এরপর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশেমেরর নেতৃত্বে তৎকালীন বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের একাংশের সম্মেলনের মাধ্যমে ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকায় ‘পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগ’ গঠন করা হয়। পরবর্তীতে পুরো পাকিস্তানের ক্ষেত্রে নাম দেয়া হয় ‘নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগ’ (মুসলিম শব্দটা অসাম্প্রদায়িক চেতনার লক্ষে বাদ দেয়া হয়)। এই সংগঠনের সভাপতি হন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী।

যুক্তফ্রন্ট গঠন

১৯৫৪ সালের নির্বাচনে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য ১৯৫৩ সালে সোহরাওয়ার্দী, এ.কে. ফজলুল হক, মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী মিলে যুক্তফ্রন্ট গঠন করেন। যুক্তফ্রন্ট ২১ সভার একটি নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করে যার মধ্যে প্রধান দাবি ছিলো ‘লাহোর প্রস্তাব’(লাহোর প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। 

এরপর ১৯৫৪ এর নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট অভূতপূর্ব জয় লাভ করে। সোহরাওয়ার্দীকে এখানে আইন মন্ত্রী হিসাবে নিযুক্ত করা হয়। ১৯৫৫ সাল অবধি তিনি এ পদে ছিলেন। এরপর তিনি পাকিস্তানের বিরোধী দলীয় নেতা এবং পরবর্তীতে ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হন। প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন তিনি পূর্ব এবং পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বৈষম্য দূরীকরণে সর্বাত্মক চেষ্টা করেন। কিন্তু এরপর থেকেই বিরোধিতার কবলে পড়তে থাকে তার রাজনৈতিক জীবন। 

১৯৫৪ এর নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের অভূতপূর্ব জয়

ইস্কান্দার মির্জার অপবাদ ও কারাবরণ

১৯৫৮ সালে ইস্কান্দার মির্জা পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারি করেন এবং রাষ্ট্রোবিরোধী অপবাদ দিয়ে (১৯৬২ সালের ৩০ জানুয়ারি)হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে গ্রেফতার করেন। ১৯ আগস্ট,১৯৬২ তে তিনি মুক্তি পান এবং আবার রাজনীতিতে সরব হন। তিনি আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনের উদ্দেশ্যে ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (NDF) গঠন করেন।

 শারীরিক অসুস্থতার কারণে মহান এই নেতা, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর রাজনৈতিক জীবনের এখানেই পরিসমাপ্তি ঘটে। 

বৃহৎ বাংলা ভাবনায় সোহরাওয়ার্দীর উদ্যেগসমূহ

‘বৃহৎ বাংলা গঠন’ আর ‘ঐকবদ্ধ বাংলা’ এখানে একই টার্ম। কেননা বৃহৎ বাংলায় যদি ঐক্য বজায় থাকে তবে—বাংলা একটা বৃহৎ স্বতন্ত্র সফল দেশ হবে। কৃষি, শিল্প, বাণিজ্যের ভিত্তিতে বাংলাকে হতে হবে এমন একটা ধনী রাষ্ট্র, যা জনগণকে উন্নত জীবনযাত্রা উপহার দিবে।

কিন্তু, এসব তখনই সম্ভব হবে যখন বৃহৎ বাংলার মানুষের মাঝে ঐক্য থাকবে। তাই হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের প্রতি গুরুত্ব দিয়ে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন।

প্রথম উদ্যোগ 

শহীদ সোহরাওয়ার্দী ১৯২৩ সালে চিত্তরঞ্জন দাশের ‘স্বরাজ পার্টিতে’ যোগ দিয়ে রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন। একই বছরে বেঙ্গল প্যাক্ট স্বাক্ষর হয়। এটি এমন একটি চুক্তি যার দ্বারা বৃহৎ বাংলার হিন্দু-মুসলিম বৈষম্যের একটা বিহিত করা হয়৷ অর্থাৎ, এই চুক্তি বৃহৎ বাংলার হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের উদ্দেশ্যে প্রণয়ন করা হয়। 

এই চুক্তিগ্রহণে প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন চিত্তরঞ্জন দাশ আর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিলো হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর। যদিও কট্টর হিন্দুত্ববাদীদের জন্য এ চুক্তি পাশ হয়নি, কিন্তু, বাংলার মুসলিম ও প্রগতিশীল জনগণ এর পক্ষে ছিলেন। পরবর্তীতে উপমহাদেশের রাজনীতিতে এই চুক্তি সুদূরপ্রসারী প্রভাবও বিস্তার করেছিলো। 

দ্বিতীয় উদ্যোগ

১৯৪৭ সালের ২৭ এপ্রিল, বাংলার মুখ্যমন্ত্রী এবং মুসলিম লীগ নেতা, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী বঙ্গভঙ্গবিরোধী বক্তব্যের বিরোধিতা করে কোলকাতার একটি সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন। তিনি বাংলাকে ভারত বা পাকিস্তান কারোর অংশ হিসাবে চাননি। তাই এই বক্তব্যে তিনি “স্বাধীন, অবিভক্ত ও সার্বভৌম বাংলা” গঠনের প্রস্তাব রাখেন এবং গঠনের লক্ষ্যে সকল প্রকার ধর্মীয় বিভেদকে দূরে রাখার জন্য তিনি এক আবেগঘন বক্তব্য রাখেন।

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ‘অবিভক্ত বাংলার’ স্বপ্ন

স্বতন্ত্র বাংলা বা বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন সোহরাওয়ার্দীর রাজনৈতিক জীবনের একদম শুরু থেকেই ছিলো। তিনি বঙ্গভঙ্গ এবং বৃহত্তর বাংলার মাঝে ঐক্যের পক্ষে ছিলেন। তার রাজনৈতিক জীবন পর্যালোচনা করলে পাওয়া যায়—

বাংলা হবে স্বতন্ত্র রাজ্য

বঙ্গভঙ্গের সময় সোহরাওয়ার্দী একটি আলাদা, গঠনমূলক একটি পরিকল্পনা পেশ করেন। এখানে থেকে তিনি দেখান যে, ভারত বা পাকিস্তানের অংশ হিসাবে নয়, বরং, বাংলা একটি স্বতন্ত্র রাজ্য হিসাবে আত্মপ্রকাশ করার দাবিদার। এক্ষেত্রে তিনি আসাম, বিহার, বাংলা, সিংভূম এবং পূর্ণিয়া জেলার সমন্বয়ে বাংলার একটি রূপরেখা অঙ্কন করেন, যা বাংলাদেশ গঠনের পূর্বাভাস বলা চলে।

সোহরাওয়ার্দীর নিজস্ব দল গঠন

মুসলিমদের একচ্ছত্র গ্রহণযোগ্যতা পেয়েও তিনি মুসলিম লীগে যুক্ত হয়েছিলেন না। ১৯৩৬ সালে ইন্ডিপেন্ডেন্ট মুসলিম পার্টি নামে নিজস্ব একটি দল গঠন করেন এবং বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সঙ্গে যুক্ত হোন। এই বছরের শেষের দিকে তিনি বঙ্গীয় মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। অর্থাৎ, এর দ্বারা এটা বোঝা যায় যে, তিনি প্রভাবশালী নেতৃত্ব চাননি, বরং, বাংলাকে ভালোবেসে তিনি শুধু বাংলার হয়ে থাকতে চান। স্বতন্ত্রভাবে বাংলাকে দাঁড় করাতে চান।

যুক্তফ্রন্ট গঠন

১৯৫৪ সালের আশু নির্বাচনে মুসলিম লীগকে পরাস্ত করার জন্য হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, এ.কে.ফজলুল হক এবং মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে যুক্তফ্রন্ট গঠন করেন। নির্বাচনের আগে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনী ইশতেহার হিসাবে ২১ দফা ঘোষণা দেয়। এর মধ্যে অন্যতম দফা ছিলো লাহোর প্রস্তাব। এই লাহোর প্রস্তাবের মূল ছিলো পূর্ব বাংলার পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন কায়েম করা।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীত্ব গ্রহণ

১৯৫৬ সালে তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে আসন গ্রহণ করেন। প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন তিনি পূর্ব পাকিস্তান এবং পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে সৃষ্ট হওয়া অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণে পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।

অতএব বলা যায়, আলাদা রাষ্ট্র হিসাবে বাংলা তথা বাংলাদেশকে গঠন করার স্বপ্নদ্রষ্টা সোহরাওয়ার্দীই ছিলেন। এছাড়াও তিনি সবসময় স্বতন্ত্র এই রাষ্ট্রের স্বার্থরক্ষার বিষয়টিও দেখতেন।

বৃহৎ বাংলা দর্শনের প্রভাব

যদি একদম ইতিহাস ঘেঁটে দেখতে হয় তবে, প্রাচীন বঙ্গদেশ তথা বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা, আন্দামান ও নিকোবর রাজ্য মিলে একতাবদ্ধ জাতি রাষ্ট্রের ধারণাকে বৃহৎ বাংলা বা বাংলাদেশ বলা হতো।

এই বৃহৎ বাংলার ইতিহাস তাও চার হাজার বছরের পুরাতন। ইতিহাস ঘাটলে বোঝা যায় যে, বাঙালি জাতি উপমহাদেশের একটি অন্যতম প্রভাবশালী জাতি ছিলো, যা গড়ে উঠে বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার মাধ্যমে। এই জাতির আদর্শ ছিলো বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা। বাঙালি জাতীয়তাবাদ তৎকালীন ব্রিটিশ সময়ে অন্যতম প্রভাবশালী জাতিও ছিলো। বাঙালিদের ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের রূপকারও বলা হয়। এই ব্রিটিশদের চক্রান্তেই পরে বাংলা বিভক্ত হয়।

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী ও শরৎচন্দ্রবসু বাংলাকে আবার স্বাধীন, সার্বভৌম করার শক্ত সমর্থক ছিলেন। এরপর এটি একটি আন্দোলনে রূপ লাভ করে।

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও ভারত-পাকিস্তান

১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ ভেঙে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি রাষ্ট্রের জন্ম হয়। এর পেছনের পথিকৃৎ হিসাবে জওহরলাল নেহেরু এবং মোহাম্মদ আলী জিন্নাহের নাম সবসময় আলোচনায় থাকলেও যে নামটা আলোচনায় থাকেনা তিনি হলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী।

ভারত-পাকিস্তান নিয়ে আলোচনায় হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী

১৯৪৭ সালে যেসব ঘটনাপ্রবাহের ভিত্তিতে ভারত-পাকিস্তানের জন্ম হয়েছিল, সেখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। কিন্তু ১৯৪৬ এর দাঙ্গায় সোহরাওয়ার্দীর নীরব অবস্থান ভারতের ইতিহাসে তাঁকে একজন বিতর্কিত নেতা হিসাবে অ্যাখ্যা দেয়। এবং সোহরাওয়ার্দী অখণ্ড বাংলার প্রতি বেশি ঝুঁকে পড়েন বলেও তারা তা মনে করে।

আর পাকিস্তানের ক্ষেত্রে বলা যায়, যদি কোন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব জনগণকে তৎকালীন শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে যেতে পারেন, তবে, তিনি হলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। সোহরাওয়ার্দী আইয়ুব খানের জন্য হুমকিস্বরূপ ছিলেন; ছিলেন শক্তিশালী বিরোধীদলীয় নেতা। চিরকাল গণতন্ত্রের জন্য লড়ে যাওয়া এই নেতা ভারত বিভাজন ও পাকিস্তান সৃষ্টির ঘটনায় সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন।

উর্দূ ভাষার ধ্যানধারণা নিয়ে বড় হওয়া সোহরাওয়ার্দী অখণ্ড বাংলা, বাংলা ভাষা, অবহেলিত মুসলিমদের জন্য যা ভেবেছেন এবং করেছেন তা বিশ্বরাজনীতির ইতিহাসে দেশপ্রেমিকতার এক অনন্য উদাহরণ হয়ে থাকবে। মহান এই নেতা আজও রাজনীতি অঙ্গনে আদর্শ হিসাবে গৃহীত হয়।

রেফারেন্সঃ

Related posts

যোগেন মন্ডল- রাজনীতির হারিয়ে যাওয়া নক্ষত্র

দ্য রেড মাওলানা-আবদুল হামিদ খান ভাসানী

Leave a Comment

Table of Contents

    This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More