Image default
ইতিহাসইতিহাস ১০১

“ডেটিং অ্যাপ: ভালবাসার ডিজিটাল ঠিকানা”

“Love at first swipe” আসলেই কি তা সম্ভব!! 

ডেটিং অ্যাপ! নামটাই যেন এক আধুনিক রোমাঞ্চের গল্পের মতো শোনায়। আগেকার দিনে প্রেমের গল্পের শুরু হতো স্কুলের বেঞ্চে বা পারিবারিক আলাপচারিতথি, চিঠি বা পাড়া মহল্লায়। 

আর এখন? স্মার্টফোনে একটা ট্যাপ, একটা সুইপ, আর শুরু হল কোন এক নতুন প্রেমের গল্প । 

ডিজিটাল যুগের এই ডেটিং এপগুলো ঠিক কীভাবে কাজ করে? সহজ – অ্যাপে প্রোফাইল বানাও, নিজের পছন্দ-অপছন্দ জানাও, আর দেখো কার সাথে মেলে। তারপর একটা ছোট্ট সুইপ ডানে বা বামে। যাকে পছন্দ, তাকে সুইপ ডান; যাকে নয়, তাকে বামে। সহজ, না?

ডেটিং অ্যাপ আমাদের জীবনযাত্রার এক নতুন অধ্যায় খুলে দিয়েছে। এখন শুধু নিজের শহর নয়, সারা দুনিয়ার মানুষের সাথে সংযোগ স্থাপন সম্ভব।

তবে মজার বিষয় হল, এখানে শুধু প্রেম খোঁজা নয়, বন্ধুত্ব থেকে শুরু করে কাজের পার্টনার খোঁজা পর্যন্ত সম্ভব! কেউ হয়তো ক্যাজুয়াল আড্ডার জন্য আসে, কেউ আবার জীবনের সঙ্গী খুঁজতে।

ডেটিং অ্যাপ এর ইতিহাস

ডেটিং অ্যাপ আধুনিক প্রযুক্তির জগতে যে পরিবর্তন এনেছে, তা নিঃসন্দেহে ডেটিংয়ের পুরোনো দিনের পুরো ধারণাই পাল্টে দিয়েছে। বর্তমানে মানুষ তার জীবন সঙ্গী খুঁজে পেতে এবং নতুন নতুন সম্পর্ক তৈরি করতে, বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর উপর অনেকটাই নির্ভরশীল। 

ডেটিং অ্যাপের গল্প শুরু হয় ২০০০ সালের দিকে, যখন অনলাইন ডেটিং সাইটগুলো ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হতে শুরু করেছিল। তবে, স্মার্টফোন আসার পরই শুরু হয় প্রকৃত বিপ্লব।

ডিজিটাল ডেটিং ওয়েবসাইট

ডেটিং অ্যাপের জার্নি: এক নজরে

আপনার মনে নিশ্চয়ই প্রশ্ন জেগেছে, ডেটিং অ্যাপের শুরুটা আসলে কবে বা কীভাবে? এর উত্তর জানতে আমাদের ফিরে যেতে হবে ১৯৬৫ সালের দিকে।

১৯৬৫ সালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই তরুণ ছাত্র একটি IBM 1401 কম্পিউটার ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম কম্পিউটার-ভিত্তিক ম্যাচমেকিং পরিসেবা চালু করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের ডেটিং জীবনের হতাশাজনক অবস্থা দেখে তারা এই পরিসেবা চালু করেন।

তারা প্রেমের সন্ধানকারীদের জন্য ৭৫টি প্রশ্ন নিয়ে একটি বিশেষ সার্ভে তৈরি করে। যেখানে অবিবাহিত ব্যক্তিরা প্রশ্নগুলো পূরণ করে মেইল করতে পারবেন এবং এর সঙ্গে ৩ ডলার ফি জমা দিবেন। এরপর কম্পিউটার সেই উত্তরগুলো বিশ্লেষণ করে তাদের জন্য মানানসই সঙ্গীর তালিকা প্রস্তুত করবে।

পরবর্তীতে ১৯৬৬ সাল আসতে না আসতেই, “অপারেশন ম্যাচ” ঘোষণা দেয় — ইতিমধ্যে তাদের সার্ভিস ব্যবহার করছে প্রায় ৯০,০০০ মানুষ!

ধীরে ধীরে প্রযুক্তির বিপ্লব ঘটতে থাকে  এবং শুরু হয় ডিজিটাল রোমান্স  (১৯৯৫–২০০০)

৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে ইন্টারনেট সবার হাতে আসতে শুরু করলে, মানুষ প্রথমবারের মতো ভার্চুয়াল ডেটিং এর সাথে পরিচিত হয়।

১৯৯৫ সালে Match.com  এসে পুরো ডেটিং সিনকে বদলে দেয়। এটি  প্রথম বাণিজ্যিক ডেটিং ওয়েবসাইট হিসেবে পরিচিত।

match.com ওয়েবসাইট

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে eHarmony (২০০০) এবং OkCupid -এর মতো সাইটগুলোও জনপ্রিয় হয়। এই সাইটগুলো আরও উন্নত অ্যালগরিদম ব্যবহার করে ম্যাচ মেকিং এর কাজ করতো।

মোবাইল ডেটিং: সুইপ রাইটের আগমন (২০০৯–২০১২)

২০১০ সালে স্মার্টফোনের জনপ্রিয়তা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মোবাইল ডেটিং অ্যাপের ব্যবহারও বাড়তে থাকে। ২০১২ সালে Tinder চালু হওয়ার পর, এর “সোয়াইপ রাইট” “সোয়াইপ লেফট” ফিচার দ্রুতই খুব জনপ্রিয় হয়ে যায়। এই ফিচার ডেটিংকে সহজ, দ্রুত এবং মজার করে তোলে।

Tinder-এর সাফল্যের পরে Bumble, Hinge-এর মতো আরও অনেক অ্যাপ বাজারে আসে। Bumble মেয়েদের প্রথমে মেসেজ পাঠানোর সুযোগ দেয়, তাই কম সময়ে এটি জনপ্রিয়তা লাভ করে।

ছেলেমেয়েরা ফোন ব্যবহার করছে

আর Hinge এমন লোকেদের জন্য ছিল যারা একটু সিরিয়াস রিলেশনশিপ খুঁজছে। ধীরে ধীরে এই ধরণের স্পেশালাইজড অ্যাপগুলো মানুষের আলাদা পছন্দ-অপছন্দের জন্য একদম পারফেক্ট সলিউশন হয়ে দাঁড়াল।

আধুনিক ডেটিং অ্যাপ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভূমিকা (২০২০-এর দশক)

এই সময়ে ডেটিং অ্যাপগুলোতে ভিডিও প্রোফাইল, লাইভ চ্যাট ইত্যাদি আসা শুরু হয়েছে। এখন মানুষ আর শুধু টেক্সটেই আটকে থাকছে না, বরং ভিডিওতে কথা বলে একে অপরকে আরও ভালোভাবে জানার সুযোগ পাচ্ছে। সাথে AI আর মেশিন লার্নিং তো আছেই, যা পুরো ব্যাপারটাকে আরও স্মার্ট আর এক্সাইটিং করে তুলেছে।

COVID-19 এর সময়, যখন সবাই ঘরে বসে ছিল, তখনও কিন্তু ডেটিং থেমে থাকেনি। সেসময় ভিডিও কল আর ভার্চুয়াল মিটআপ হয়ে গেছেলো একদম স্বাভাবিক ব্যাপার। ডেটিং অ্যাপগুলোও নিজেদেরকে আপডেট করে নিয়েছিলো এই নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে। ফলে এখন ভিডিও ডেটিং শুধু একটা অপশনই নয়, বরং ডেটিংয়ের মূল অংশ হয়ে উঠেছে।

ভার্চুয়াল রিয়েলিটি প্রযুক্তি

তাছাড়া অগমেন্টেড রিয়েলিটি (AR) আর ভার্চুয়াল রিয়েলিটি (VR) এর মতো প্রযুক্তি ডেটিংকে আরও মজার আর ইন্টারেস্টিং করে তুলবে বলে ধারনা করা হচ্ছে। ভার্চুয়াল কোনো সুন্দর পার্কে হাঁটা বা ডিজিটাল জগতে সঙ্গীর সঙ্গে একসাথে সবকিছু উপভোগ করা কোনটি আর অসম্ভব থাকবে না। 

বাংলাদেশে ডেটিং অ্যাপের ইতিহাস 

বাংলাদেশে ডেটিং অ্যাপের ইতিহাস বেশ নতুন এবং আকর্ষণীয়। গত দশকে এই অ্যাপগুলোর জনপ্রিয়তা একটু বাড়লেও, এখনও পুরোপুরি সাধারণের কাছে অতটা জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারেনি। 

শুরুতে, আন্তর্জাতিক ডেটিং অ্যাপগুলো যেমন Tinder, Bumble, OkCupid ইত্যাদি বেশ পরিচিত হয়ে ওঠে। তবে, ২০১০ সালের পর থেকেই, বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম এসব অ্যাপ ব্যবহার করতে শুরু করে। শুধু ডেটিং অ্যাপ নয়, সামাজিক মিডিয়া যেমন- Facebook এবং Instagram ডেটিং প্ল্যাটফর্ম হিসেবেও কাজ করতে শুরু করে।

Tinder ডেটিং অ্যাপ

তবে, বাংলাদেশের সমাজে পরিবার ও সামাজিক সম্পর্ক অনেক বড় ব্যাপার, তাই অনেকেই নিজেদের পরিচয় বা সম্পর্ক প্রকাশে বেশি খোলামেলা হতে চায় না। এ কারণে, বেশিরভাগ ডেটিং অ্যাপ ব্যবহারকারী গোপনীয়তা বজায় রেখে সীমিত পরিসরে সম্পর্ক গড়তে পছন্দ করে। 

ধীরে ধীরে, স্থানীয় কিছু ডেটিং অ্যাপও বাজারে এসেছে, যেমন- “Bdating” এবং “Mingle”, যেগুলো বাংলাদেশের সংস্কৃতি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী তৈরি হয়েছে। এসব অ্যাপ ব্যবহারকারীদের প্রোফাইল তৈরি, ছবি শেয়ার এবং অন্যদের সঙ্গে চ্যাট করার সুযোগ দেয়।

mingle ডেটিং অ্যাপ

এছাড়া, মোবাইল ইন্টারনেটের দাম কমে যাওয়ার ফলে ডেটিং অ্যাপের ব্যবহারও বেড়েছে। যদিও এই অ্যাপের ব্যবহার নিয়ে সমাজে বিতর্ক ছিল, তবে নতুন প্রজন্মের মধ্যে এর গ্রহণযোগ্যতা অনেক বেড়েছে। 

ডেটিং অ্যাপের প্রভাব 

হাসিখুশি দম্পতি

ইতিবাচক প্রভাব

  • বর্তমানে ডেটিং অ্যাপগুলোর অ্যালগোরিদম অনেক স্মার্ট। এগুলো শুধু  আপনার পছন্দ-অপছন্দ বুঝবে তাই নয়, আপনার  জন্য সেরা ম্যাচ খুঁজে বের করে দিবে।   
  • ডেটিং অ্যাপগুলোতে জিওলোকেশন ফিচার থাকার ফলে একই এরিয়ার কিংবা আপনার পছন্দের জায়গার মানুষের সাথে ম্যাচ করা যায়। এতে যারা লোকাল সংযোগ খুঁজছেন বা অচেনা জায়গায় নতুন কারো সাথে দেখা করতে চান, তারা এই ফিচার ব্যবহারের সুবিধা ভোগ করতে পারবেন। একই এলাকায় থাকা মানুষদের সাথে ম্যাচ হওয়ার ফলে বাস্তব জীবনে দেখা করার সম্ভাবনা বেশি থাকে।  
  • বাস্তবজীবনে নানা সীমাবদ্ধতা থাকায় ভার্চুয়াল ডেটিং খুব দ্রুত জনপ্রিয়তা পেয়েছে। ভিডিও কল এবং ভার্চুয়াল ইভেন্টের মতো ফিচার ব্যবহার করে  পৃথিবীর যেকোন স্থান থাকে সহজেই সম্পর্ক গড়া সম্ভব হচ্ছে। 

এটি কেবল দূরত্ব কমিয়ে আনেনি সময়ের চাহিদা পূরণই করেছে, এবং, একে অপরকে সামনাসামনি দেখার আগেই ভালোভাবে জানার একটি সুযোগ তৈরী  করে দিয়েছে।

  • ডেটিং অ্যাপ এখন নির্দিষ্ট আগ্রহ, জীবনযাপন বা সংস্কৃতির মতো ফিচার সংযুক্ত হয়েছে। আপনার বিশেষ চাহিদার প্রতি এখানে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। একই রকম চাহিদা কিংবা চিন্তাধারার মানুষদের এই ফিচারের মাধ্যমে  একত্রিত করে, যার ফলে তাদের মধ্যকার ম্যাচ মেকিং সঠিক এবং যুক্তিযুক্ত হয়।  
  • ডেটিং অ্যাপ এর যুগে প্রেমের দুনিয়ায় প্রবেশ আরো সহজলভ্য হয়েছে। আগে যেমন প্রেমের জন্য ভাগ্যের উপর নির্ভর করতে হতো, এখন ডেটিং অ্যাপ এর দুনিয়ায় সহজেই ম্যাচ মেকিং এর মাধ্যমে নিজের পছন্দের মানুষের সাথে কথা বলা কিংবা দেখা করা যাচ্ছে। যারা বাস্তবজীবনে ব্যস্ত থাকেন অথবা ইন্ট্রোভার্ট তাদের জন্য পছন্দের মানুষ খুঁজে বের করার আদর্শ ব্যবস্থা ডেটিং অ্যাপ।

নেতিবাচক প্রভাব

  • ডেটিং অ্যাপ আসলে সবার জন্য একরকমভাবে কাজ করে না। এগুলো এমনভাবে বানানো যে দ্রুত ম্যাচ খুঁজে পাওয়া যায়, কিন্তু এত দ্রুততায় অনেক সময় সম্পর্ক গভীর হওয়ার সুযোগই থাকে না। তাই যারা একটু সিরিয়াস কিছু চান, তাদের জন্য হতাশার কারণ হতে পারে।
  • তার ওপর, এত অপশন থাকে যে মাথা ঘুরে যায়! কাকে বেছে নেবো, কীভাবে জানবো কে ভালো—এই সিদ্ধান্তহীনতা অনেককেই ভোগায়। 

আবার কিছু মানুষ শুধু মজার জন্য আসে, স্বল্পমেয়াদী কিছু খোঁজে। তখন যারা দীর্ঘমেয়াদী সম্পর্ক চায়, তারা কনফিউশন বা হতাশায় পড়ে।

  • আর ম্যাচ না হলে মনে হতে পারে, “আমার কি কিছু কমতি আছে?” এটা আত্মবিশ্বাসে ধাক্কা দেয়। উল্টোদিকে, বেশি ম্যাচ পেয়ে কেউ কেউ এমনভাব ধরে নেয়, যেন তারা পৃথিবীর সেরা।
  • নিরাপত্তা আর গোপনীয়তার কথা বললে, ডেটিং অ্যাপ ব্যবহারে সত্যি একটু সতর্ক থাকতে হয়। সবাই যে তাদের সঠিক তথ্য দেবে, সেটা কিন্তু ধরে নেওয়া ভুল। 

অনেক সময় কেউ ফেক প্রোফাইল বানিয়ে ফাঁদ পাতে—কেউ হয়তো টাকা চায়, কেউ আবার মানসিকভাবে মানুষকে বিপদে ফেলে। তাই একদম শুরুতেই কারো উপর ভরসা না করাই ভালো।

স্মার্টফোনে আসক্তি
  • আসক্তি ব্যাপারটা তো এই ক্ষেত্রে খুবই রিয়েল। মনে হয়, “ওহ, আরেকটু স্ক্রল করি, হয়তো পরের জনটা পারফেক্ট হবে!” কিন্তু আসলে এভাবেই অনেকটা সময় পার হয়ে যায়। রিয়েল লাইফে মনোযোগ দেওয়া কমে যায়।
  • শেষে আসে মানসিক চাপ—একটা ম্যাচ হলো, এরপর চ্যাট করছো, কিন্তু উত্তরের জন্য বসে থাকলে হতাশ লাগতে পারে। আবার যদি ম্যাচ না হয়, তখনও মনে হতে পারে, “আমার কি কোনো সমস্যা আছে?” এটা পুরোপুরি মাথার খেলা, আর একটু রিল্যাক্স থেকে এগুলো নিতে হবে।

কয়েক দশকের মধ্যে ডেটিং অ্যাপগুলো ডেস্কটপ স্ক্রিনের সোজা-সাপ্টা প্রোফাইল থেকে এখন হাতের মুঠোয় চলে এসেছে । এই বদল আসলে প্রযুক্তির উন্নতি আর মানুষের সম্পর্কের পরিবর্তনের গল্প বলে। আমরা যত বেশি সুইপ, ম্যাচ মেকিং আর  ডেটিং অ্যাপ এর অ্যালগরিদমের সাথে পরিচিত হব, তত একটা জিনিস স্পষ্ট হবে। আর তা হলো ডেটিং অ্যাপের উত্থান আসলে সেই চিরন্তন চেষ্টা, যেখানে আমরা আমাদের জন্য পারফেক্ট সঙ্গী খুঁজে নিতে চাই।

রেফারেন্স

Related posts

জনপ্রিয় ফাস্ট ফুড- বার্গার এর ইতিহাস

ইতিহাসের পাতায় মাদক: এক অপ্রত্যাশিত যাত্রা

আবু সালেহ পিয়ার

পুরান ঢাকার জমজমাট সাকরাইনঃ ধর্মীয় থেকে সার্বজনীনতার গল্প

ইসরাত জাহান ইরা

Leave a Comment

Table of Contents

    This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More